জয় বাংলা বেতার কেন্দ্র এক অজানা ইতিহাস

Wareless যার বাংলা আবিধানিক অর্থ বেতার।বেতার বললেই কানে ভেসে আসে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের সেই সুরেলা কন্ঠস্বর, ”আপনারা শুনছেন স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র” কিংবা স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের সূচনা সংগীত ”…..জয় বাংলা,বাংলার জয়”।


Wareless যার বাংলা আবিধানিক অর্থ বেতার।বেতার বললেই কানে ভেসে আসে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের সেই সুরেলা কন্ঠস্বর, ”আপনারা শুনছেন স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র” কিংবা স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের সূচনা সংগীত ”…..জয় বাংলা,বাংলার জয়”।

কি পোলারে বাঘে খাইলো? শ্যাষ। আইজ থাইক্যা বঙ্গাল মুলুকে মছুয়াগো রাজত্ব শ্যাষ। ঠাস্ কইয়্যা একটা আওয়াজ হইলো। কি হইলো? কি হইলো? ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে পিঁয়াজী সাবে চেয়ার থনে চিত্তর হইয়া পইড়া গেছিলো। আট হাজার আষ্টশ চুরাশি দিন আগে ১৯৪৭ সালের ১৪ই আগষ্ট তারিখে মুছলমান-মুছলমানভাই-ভাই কইয়া, করাচী-লাহুর-পিন্ডির মছুয়া মহারাজরা বঙ্গাল মুলুকে যে রাজত্ব কায়েম করছিল, আইজ তার খতম্ তারাবি হইয়া গেল।

এটা ছিল ১৯৭১ সালের ১৬ ই ডিসেম্বর স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্র থেকে প্রচারিত এম আর আখতার মুকুলের কন্ঠে চরমপত্রের অংশবিশেষ।

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় এই বেতার আর বেতার যন্ত্র হয়ে উঠেছিল যোগাযোগের অন্যতম প্রধান মাধ্যম।নতুন কোন খবর কিংবা মুক্তিযোদ্ধাদেরসফল কোন অভিযানের খবর শুনতে অধীর আগ্রহে বেতারযন্ত্রে কান পাততো স্টেনগান হাতে গেরিলা-যোদ্ধা থেকে শুরু করে সকল স্তরের মুক্তিকামী মানুষ।১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে মুক্তিযোদ্ধাদেরএবং যুদ্ধের খবর ও দেশাত্মবোধক বিখ্যাত সব গান প্রচার করে বেতার কেন্দ্রগুলো মুক্তিকামী মুক্তিযোদ্ধা এবং সাধারন মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষার কেন্দ্রস্থল হয়ে উঠেছিল।

১৯৭১ সালে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের মত আরও একটি বেতার কেন্দ্র গড়ে উঠেছিল যার নাম ছিল ”জয় বাংলা” বেতার কেন্দ্র।

১৯৭১ সালের মার্চ মাসের ১ম সপ্তাহের (নির্দিষ্ট তারিখ জানা সম্ভব হয়নি) শুরুর দিকে জ্যোতি,সাত্তার ও বাচ্চু নামক ৩ জন মুক্তিপাগল তরুণের অক্লান্ত পরিশ্রমে সিরাজগঞ্জ শহরে ”জয় বাংলা” নামক বেতার কেন্দ্রটি গড়ে উঠেছিল।সিরাজগঞ্জ শহরের কেন্দ্রস্থলে “আলফা ইলেক্ট্রিক্যাল সার্ভিস” নামের একটি দোকানে ”জয় বাংলা” বেতার কেন্দ্রটি স্থাপন করা হয়।মাত্র ১ কিলোওয়াট শক্তির ১টি ট্রান্সমিটার, ১টি মাইক্রোফোন, ১টি চেঞ্জার এবং দেশাত্মবোধক গানের কিছু রেকর্ডকে সম্বল করে গড়ে উঠেছিল এই বেতার কেন্দ্রটি। অসহযোগ আন্দোলনের শুরুতে শর্ট ওয়েভের ৭৫ মিটার ব্যান্ডে হঠাৎ একদিন সিরাজগঞ্জবাসীর কানে ভেসে আসে, “জয়বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে বলছি”।

”জয় বাংলা” বেতার কেন্দ্রের তিন প্রতিষ্ঠাতা জ্যোতি ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েরফলিত পদার্থবিদ্যা বিভাগের ডেমনেস্ট্রেটর, সাত্তার ছিলেন দোকান মালিক ও ইলেকট্রিক মেকানিক এবং বাচ্চু ছিলেন ঢাকা পলিটেকনিক ইনষ্টিটিউটের শেষ বর্ষের ছাত্র।

প্রতিদিন সকাল বিকাল ও রাতে ১ ঘন্টা করে মোট ৩ ঘন্টার অনুষ্ঠান প্রচার করা হতো। বেতার কেন্দ্রটি চালু হওয়ার কিছুদিনের মধ্যে বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের সেই ঐতিহাসিক ভাষণের রেকর্ড জয়বাংলা বেতার কেন্দ্রের হাতে আসে। এরপর থেকে ঐ রেকর্ড বাজিয়েই প্রতিটি অধিবেশন শুরু করা হতো। সিরাজগঞ্জ মহকুমার প্রায় ১০ বর্গমাইল এলাকায় স্পষ্ট শোনা যেতো এই বেতার কেন্দ্রের অনুষ্ঠান। পঁচিশে মার্চের কাল রাতের পর সিরাজগঞ্জে শুরু হয়ে যায় প্রতিরোধ সংগ্রাম। সংগ্রাম পরিষদ এই বেতার কেন্দ্রটিকে তখন শক্তিশালী করার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে। সিরাজগঞ্জের তৎকালীন মহকুমা প্রশাসক শামসুদ্দীনসহ সকল শ্রেণীপেশার মানুষ এই বেতার কেন্দ্রের সাহায্যার্থে এগিয়ে আসে। বেতার কেন্দ্রের পরিধি বাড়তে থাকে। এপ্রিলের গোড়ার দিকে এই কেন্দ্রের অনুষ্ঠান ২৫-৩০ মাইল পর্যন্ত শোনা যায়। প্রতিটি অধিবেশনের সময় দ্বিগুণ করে দেয়া হয়। দিনে মোট ৬ ঘন্টা অনুষ্ঠান প্রচার করা শুরু হয়। রাজনৈতিক পর্যালোচনা, কথিকা, সংগ্রাম পরিষদের নেতাদের বেতার ভাষণ, বিভিন্ন নির্দেশাবলী, সংবাদ নিবন্ধ, গণমুখী নাটক, গীতি-নক্সা, সাহিত্যের আসর, আবৃত্তি প্রচারিত হতে থাকে। দেশাত্মবোধক গান, খবর আর ৭ই মার্চের সেই ভাষণ তো আছেই।

খবর তৈরী করা ও পড়ার দায়িত্বে ছিলেন, খায়রুল কবীর, মনিরুল কবীর ও মঞ্জুরুল হক মুন্না। সংবাদ পর্যালোচনা করতেন আমিনুল ইসলাম ও আব্দুর রউফ পাতা। রাজনৈতিক ভাষ্যকার ছিলেন প্রতিষ্ঠিত সাহিত্যিক ও সাংবাদিক ফজলুল হক। সাহিত্য আসর পরিচালনা ও আবৃত্তি করতেন খ.ম.আখতার হোসেন। সংবাদ নিবন্ধ লিখতেন ও পড়তেন দৈনিক আজাদের সাংবাদিক আনোয়ার হোসেন সিকদার। এছাড়া আনোয়ার হোসেন রতু, আশুতোষ বড়ুয়া, নেহাল, মঈনুল কবির, মাসুদা বেগম ও মোহনসহ নাম না জানা অনেকেই এ বেতার কেন্দ্রে অনুষ্ঠান করেছেন।

২৬ এপ্রিলের মধ্যরাত যেদিন তিন দিক দিয়ে পাকিস্তানী জারজ বাহিনী সিরাজগঞ্জ শহরে ঢুকে পড়ে ঐতিহ্যবাহী শহরটিকে ধ্বংসস্তুপে পরিণত করে সেদিনই স্তব্ধ হয়ে যায় জয়বাংলা বেতার কেন্দ্র। এই বেতার কেন্দ্রের উপর জিঘাংসা নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে পাকিস্তানী জারজেরা। আর বিহারীরা লুট করে নিয়ে যায় এই বেতারকেন্দ্রের সকল স্মৃতিচিহ্ন। নিশ্চিহ্ন হয়ে যায় সবকিছু। হারিয়ে যায় এই বেতার কেন্দ্রের কর্মীরাও। কেউ কেউ সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করে। কেউ কেউ রাজাকারের হাতে নৃশংসভাবে মৃত্যুবরণ করে।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

২০ thoughts on “জয় বাংলা বেতার কেন্দ্র এক অজানা ইতিহাস

  1. চমৎকার তথ্যপূর্ণ একটা
    চমৎকার তথ্যপূর্ণ একটা পোস্ট… :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: আর এমনি ভাবে আমাদের বিভিন্ন বিষয় জানানোর জন্য ধন্যবাদ, খাবা… :ধইন্যাপাতা: :ধইন্যাপাতা: :গোলাপ: :গোলাপ: :ফুল: :ফুল: শেয়ার দিলাম… :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ:

  2. এই ইতিহাসটা জানা ছিল না ।
    এই ইতিহাসটা জানা ছিল না । শুধু কলকাতার জয়বাংলা বেতার কেন্রর কথাই জানতাম । :গোলাপ: :গোলাপ: :গোলাপ: :ধইন্যাপাতা: :ধইন্যাপাতা: :ধইন্যাপাতা:

    খাজা বাবা ভাই, আমু কি একেবারে ছেড়ে দিলেন ?

    1. মহান মুক্তিযুদ্ধের হাজারো
      মহান মুক্তিযুদ্ধের হাজারো ইতিহাস এখনও আমাদের অজানা রয়ে গেছে।ঠিক তেমনি এক ইতিহাস এই জয় বাংলা বেতার কেন্দ্র।

      [অ.ট.- হুম চাষা দা আমু অনেকটা ছেড়েই দিয়েছি।ইস্টিশনেই লিখতে ভাল লাগে, আসলে ইস্টিশন পরিবারের মত।তাই ইস্টিশনেই লিখি।

      তারপর কেমন আছেন চাষা দা???]

      1. খাজা ভাই আপনাদের সকলের দোয়াতে
        খাজা ভাই আপনাদের সকলের দোয়াতে ভালই আছি ।
        এখানে মন্তব্য করতে সবাই কেমন যেন কিপ্ট্যামি করে , কেন করে তা কি জানা আছে ? আমুতে প্সরায় বাই বেশ সরব । এখানেও কি তেমনটা করা যায় না ? ভাল থাকবেন ।

  3. মুক্তিযুদ্ধের মুখপত্র জননেতা
    মুক্তিযুদ্ধের মুখপত্র জননেতা আব্দুল মান্নানের সাপ্তাহিক ‘জয় বাংলা’ পত্রিকার কথা জানা ছিল। কলকাতার বালু হাককাক লেনে ছিল পত্রিকার অফিস। একইসাথে অফিসটি ছিল কবি সাহিত্যিক সাংবাদিকদের যোগাযোগ কেন্দ্র। স্বাধীন বাংলা বেতারের প্রশাসন চলতো সেই অফিস থেকেই আব্দুল মান্নানের মাধ্যমে। আজ জয়বাংলা বেতার কেন্দ্রের কথা জানলাম।তথ্যবহুল এই লেখাটির জন্য আপনাকে অসংখ্য :ধইন্যাপাতা: :ধইন্যাপাতা: :ধইন্যাপাতা: এবং :গোলাপ: :গোলাপ: :গোলাপ:

    1. কারাগার ভাই আসলে জয় বাংলা
      কারাগার ভাই আসলে জয় বাংলা বেতার কেন্দ্রটি নিয়ে খুব বেশি লেখালেখি হয় নি তাই এটি রয়ে গেছে আমাদের অজানা।১৯৭২ সালের আগস্ট কিংবা সেপ্টেম্বর মাসে ”ঝিনুক” নামক অখ্যাত এক পত্রিকায় প্রথম এই বেতার কেন্দ্রটির কথা উঠে আসে।তারপরও এটি রয়ে গেছে লোকচক্ষুর আড়ালে।

  4. আমার বাড়ি সিরজাগঞ্জ জেলায়
    আমার বাড়ি সিরজাগঞ্জ জেলায় কিন্তু আমি এ ব্যাপারে বিস্তর জানতাম না। অনেক অনেক ভাল লাগলো আপনার এই পোস্ট পড়ে। প্রিয়তে নিলাম। :bow: :bow: :bow:

    1. আমার বাড়ি সিরজাগঞ্জ জেলায়

      আমার বাড়ি সিরজাগঞ্জ জেলায় কিন্তু আমি এ ব্যাপারে বিস্তর জানতাম না।

      …..আসলে কিরণ দা এই বেতার কেন্দ্রটি সম্পর্কে কেউ ই তেমন জানে না।

    2. আমার বাড়ি সিরজাগঞ্জ জেলায়

      আমার বাড়ি সিরজাগঞ্জ জেলায় কিন্তু আমি এ ব্যাপারে বিস্তর জানতাম না।

      …..আসলে কিরণ দা এই বেতার কেন্দ্রটি সম্পর্কে কেউ ই তেমন জানে না।

  5. আগে প্রিয়তে নিছি… সেইরাম
    আগে প্রিয়তে নিছি… সেইরাম একটা কাজ করছে ভাই… :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :মাথানষ্ট: :ধইন্যাপাতা: :ধইন্যাপাতা: :গোলাপ: :বুখেআয়বাবুল:

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

89 + = 90