‘আমার ধারণা আমার আসলে…’

চিকিৎসক যখন কোন রুগীকে দেখেন, তখন তাঁকে একই সঙ্গে অনেকগুলো কাজ করতে হয়। রুগীর সমস্যা শোনা, রুগীকে প্রশ্ন করা, রুগীকে পরীক্ষা করা এবং অবশেষে চিকিৎসা পত্র দেয়া। কাজগুলো বেশির ভাগ সময়েই ধাপে ধাপে হয়। রোগ ধরার ক্ষেত্রে তিনি পুরোপুরি নিশ্চিত না হলে কিংবা সন্দেহ থাকলে কিছু পরীক্ষা নিরীক্ষা দিয়ে থাকেন। এই পদ্ধতিতেই, সাধারণতঃ হয়ে থাকে কিংবা হওয়া উচিত। অন্যথা হয় না বা কোন চিকিৎসক এমনটা করেন না, এমন দাবী আমি করছি না। বলতে চাইছি, একজন ডাক্তারের কি করা উচিত সে ব্যাপারে চিকিৎসা শাস্ত্রে বেশ কিছু নির্দেশনা দেয়া আছে। অন্যদিকে আবার ডাক্তারের কি করা উচিত কিংবা ডাক্তার কি রোগ সনাক্ত করবেন, সে ব্যাপারে একজন রুগীরও অনেক সময় কিছু প্রত্যাশা থাকে। এবং মজার ব্যাপার হচ্ছে সেই প্রত্যাশার ব্যাপ্তি। ‘ভালো ভাবে দেখা’ থেকে শুরু করে কখনও কখনও ‘নির্দিষ্ট একটি রোগ’ পর্যন্ত বিস্তৃত হয়।
রুগী দেখার শুরুতে, কম বেশি সব ডাক্তারই যে কাজটি করেন, তা হচ্ছে, রুগীকে তাঁর সমস্যা বিস্তারিত বলতে বলেন। কিছু রুগী খুব সুন্দর ভাবে নিজের সমস্যা জানিয়ে ক্ষান্ত দেন। কিছু রুগী সমস্যার সঙ্গে বেশ কিছু আনুসাঙ্গিক তথ্য উপাত্ত যোগ করতে শুরু করেন। ‘আমার বাবারও এই সমস্যা ছিল’ কিংবা ‘আগে কখনই আমার এই সমস্যা হয় নি’। যদিও নিয়ম অনুসারে একজন ডাক্তার এইসব প্রশ্ন আরেকটু পরেই করতেন কিংবা করা উচিত, তারপরও অনেক ক্ষেত্রেই রুগী সেই ঝুকি নিতে চান না। ‘যদি ডাক্তারের জিজ্ঞেস না করে?’ ‘আজকাল তো ডাক্তার রা রুগীর কথা মন দিয়ে শোনেই না। তাই সম্পুরক প্রশ্ন করবে তাঁর নিশ্চয়তা কি? প্রশ্নই ওঠে না’ তাই এই ফর্মুলা, নিজে থেকেই সব জানানো।
কখনও তথ্য দেয়ার ছলে আসে একটা আবদার। বিনে পয়সায় চিকিৎসা করিয়ে নেয়ার ক্ষুদ্র একটা চেষ্টা। ‘ডাক্তার সাহেব, আমার মেয়েটারও এই সমস্যা, ওর জন্যও যদি একটু ওষুধ লিখে দেন। এমনি কাগজে লিখে দিলেই হবে।’ অর্থাৎ একজন চিকিৎসকের প্রেস্ক্রিপশানের প্যাডের একটা পাতার মূল্য হচ্ছে তাঁর ভিজিট। প্যাডে না লিখলে, সেই চিকিৎসা ফ্রি। অনেকটা বাদাম কেনার পরে লবণ ফ্রি নেয়ার মত একটি চেষ্টা। কাজটা অনেক চিকিৎসক করেন। কেউ আবার ইচ্ছে করেই এমন ওষুধ লেখেন, যেটায় কাজ হবে না। চেম্বারের কাঠের কাজ করে দেয় এমন এক মিস্ত্রি একবার জোর করে ভিজিট দিয়েছিল। যদিও কম দিয়েছিল। তাঁর যুক্তি, ভিজিট না দিলে ওষুধে কাজ করবে না। কিছু কম দিলেও, ভিজিট তো। কনসেশান নিতে রাজী আছে তবে ফ্রি না।
অতিরিক্ত তথ্য দেয়ার ব্যাপারটা কখনও আরও একটু বিস্তৃত হয়। ‘ ‘আমার ধারণা একবার শীতের সময় রাতের বেলা আইসক্রিম খেয়েছিলাম, সে কারনেই এই সমস্যা’। কিংবা তিন বছর আগে বুকে আঘাত পাইছিলাম, মানে একটা গরু ঢিস দিসিল, তারপর থেকেই…’। এধরনের তথ্য দেয়া রুগীগুলো অপেক্ষাকৃত ভয়ঙ্কর হয়। যদি রুগীর মনের সন্দেহ টা হালকা হয়, তবে অনেক সময় ডাক্তারের বুঝিয়ে বলার পরেই তিনি আশ্বস্ত বোধ করেন। ‘তিন বছর আগের আঘাতে এখন ব্যথা করবে না’। সমস্যা শুরু হয় রুগী যদি নিজের সন্দেহ সম্পর্কে অতিমাত্রায় আত্মবিশ্বাসী হন। ‘এদেশের ডাক্তার রা কিছু জানে নাকি?’ কিংবা ‘ডাক্তার তো আমার কথা মনোযোগ দিয়ে শুনলোই না।‘ এরপরের কর্মপন্থা অনেকটাই নির্দিষ্ট। হয় ‘ইন্ডিয়া’ ভ্রমণ নয়তো এদেশের ডাক্তারের গুষ্টি উদ্ধারে বাকী জীবন সমর্পণ।
কিছু রুগী থাকেন একটু নরম প্রকৃতির। নিজের সমস্যা জানান, সঙ্গে মনের গহীনে একটি সন্দেহ ও পুষে রাখেন, তবে মুখ ফুটে সেটা বলেন না। তবে মনে প্রাণে চান, ডাক্তার সাহেব সেই অসুখটাই যেন ভেবে নেন। এধরনের রুগীদের সন্দেহের তালিকার প্রথম অসুখ হচ্ছে, ‘হার্টের অসুখ’। বুকে ব্যথা হয়েছে কি ডাক্তারের কাছে হাজির। ব্যথার বর্ণনার সময় আপ্রাণ চেষ্টা করেন, পুরো আবেগ ঢেলে দিতে। ‘এমন ব্যথা হয় ডাক্তার সাহেব কি বলব’। এরপরে সবচেয়ে জরুরী যে তথ্যটা দেন তা হচ্ছে, ‘ব্যথাটা বুকের বাম দিকে হয়’। হার্ট যেহেতু বুকের বামে থাকে, তাই বুকের বাম দিকে হওয়া যেকোনো ব্যথার একমাত্র কারণ অবশ্যই ‘হার্ট’। তাই তথ্যটা দিয়ে তিনি আশা করেন, ডাক্তারের এবার আর কোন উপায় নেই। তাকেও অকপটে মেনে নিতে হবে ‘এই ব্যথা হার্টের ব্যথা’। ব্যথা
প্রায় বেশির ভাগ ডাক্তার ই ব্যাপারটা বোঝেন। কখনও প্রয়োজনীয় প্রশ্ন করেন। সেসব থেকে রুগীর অজান্তেই মূল তথ্য আবিস্কার করে ফেলেন। ‘ব্যথা কোন দিকে যায় কি না?’ ‘ব্যথাটা কেমন?’ ‘খাওয়ার সাথে সম্পর্ক আছে কি না?’ কিংবা ‘এক আঙ্গুল দিয়ে দেখান তো কোথায় ব্যথা?’ হার্টের ব্যথার ক্ষেত্রে এসব প্রশ্নের কি উত্তর হবে, প্রায় কোন রুগীর ই এসব জানা থাকে না। ফলে এসব প্রশ্নের উত্তরে কি বললে ডাক্তার হার্টের সমস্যা ভাববে, তা বুঝে উঠতে পারে না। এসব প্রশ্নে রুগীর দেয়া উত্তর থেকেই ডাক্তার বেশ কিছু ব্যাপার আঁচ করে ফেলেন। সাথে সাথে ডাক্তার তাঁর রোগ নির্ণয়ের কাজটা সেরে ফেলেন।
ব্যথা সিরিজে দ্বিতীয় যে সমস্যায় কম বেশি সব ডাক্তারকেই ভুগতে হয়, তা হচ্ছে, ‘কিডনি’। কোমরের পাশে ব্যথা নিয়ে আশা রুগীদের প্রথম প্রত্যাশা থাকে ডাক্তার সাহেব এই ব্যথার কারণ হিসেবে ‘কিডনি’ কে দায়ী করবেন। মিলে গেলে আনন্দ, দুঃখ একসঙ্গে ই হয়। আনন্দ, নিজের সন্দেহ সঠিক প্রমাণিত হওয়ায়। আর দুঃখ কিডনি নষ্ট হওয়ায়। এখানে সাধারণতঃ যে জায়গায় রুগীরা ভুল করে, তা হচ্ছে, ব্যথাটা নড়াচড়া করে কি না। কিংবা করলে কোন দিকে যায়।
চিকিৎসা বিজ্ঞানে প্রত্যেক সমস্যার ই নির্দিষ্ট বর্ণনা আছে। যার অনেকটাই রুগী বলে, এবং নির্দিষ্ট কিছু শব্দ ব্যবহার করে বলে। নির্দিষ্ট স্থানে ব্যথা বলে কিংবা ব্যথা নির্দিষ্ট দিকে যায়, এমনটা বলে। একজন ডাক্তার যখন দেখেন, সব কিছু ঠিক খাপে খাপ মিলছে না, তখন ই তিনি ধরে নেন, সমস্যাটা ‘সন্দেহ’ ঘটিত। আসলে এই সমস্যায় কম বেশি সব ডাক্তার ই ভোগেন, ‘আমার মনে হয় হার্টে সমস্যা আছে’। রুগীর নিজের সন্দেহের সঙ্গে মাঝে মাঝে যোগ হয় শুভাকাঙ্ক্ষীর উপদেশ, ‘একদম হেলা ফেলা করবে না। আমার এক চাচার এমন মাঝে মাঝে বুকে ব্যথা করত। গ্যাস গ্যাস বলে পাত্তা দেয় নি। একদিন…।‘
একটি মোবাইল ফোন নষ্ট হলে প্রথমে আমরা খোঁজ নিই, কে ভালো মোবাইল ফোন রিপেয়ার করতে পারে। অযথা পয়সা খরচ করাবে না অথচ ঠিক করে দিতে পারবে। পয়সা বেশি নিলেও ঠিকঠাক রিপেয়ার করে দিবে। কখনই নিজে সিদ্ধান্ত নিই না, কোন আই সি নষ্ট হয়েছে না মাদার বোর্ড এর সমস্যা। কারণ আমরা মেনে নিই, এব্যাপারে আমরা কিছু বুঝি না। শুধু নিজের ব্যাপারে এমনটা করি না। কার্পণ্য একটি কারণ হতে পারে। ‘ব্যথাটা গ্যাসের’ এই ভেবে গ্যাসের ওষুধ খেয়ে অনেকে ভালো হয়েছেন। অনেকে ভয়ঙ্কর বিপদ ডেকে এনেছেন।
চিকিৎসা বিজ্ঞানের ‘ডায়াগনোসিস’ অংশ টা অনেকটা গোয়েন্দাগিরির মত। একরাশ সম্ভাবনা থেকে ডাক্তার সাহেবকে খুজে বের করতে হয়, ঠিক কি কারণে ব্যথা হচ্ছে। কিংবা জ্বরটা কেন হচ্ছে। এবং বলাই বাহুল্য, কাজটা খুব সোজা না। এক্ষেত্রে ডাক্তারের সঙ্গী তাঁর জ্ঞান আর অভিজ্ঞতা। যার জন্য তাঁকে প্রতিনিয়ত পড়াশোনা করতে হচ্ছে। একজন চিকিৎসকের দক্ষতা সম্পর্কে যদি সন্দেহ জাগে, তবে ডাক্তারের জ্ঞান আর অভিজ্ঞতা সম্পর্কে খোঁজ নেয়া যেতে পারে। তবে, একজন মোবাইল ফোন এর রিপেয়ার কারীকে যেমন কখনই বলি না, ‘এটার অমুক আইসি নষ্ট হয়ে গেছে’ তবে ডাক্তারকে ‘আমার মনে হয় কিডনি তে সমস্যা, একটু চেক করে দেখতে চাই’ বলে ডাক্তারি শেখানোর চেষ্টা কেন করি?

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

৮ thoughts on “‘আমার ধারণা আমার আসলে…’

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

3 + 6 =