বিশ্বের ইহুদি জাতির ৩০০০ বছরের ইতিহাস : ভেতর-বাহির [পর্ব-৬]

রাজনৈতিক শক্তিতে এত দুর্বল আর কোনো জনগোষ্ঠী পৃথিবীর ইতিহাসকে এতটা গভীরভাবে প্রভাবিত করেনি, যতটা করেছিল হিব্রু বা ইহুদিগণ। বিশ্বের বহু দেশে ছড়িয়ে পড়লেও, ইহুদি সম্প্রদায়ের সব সময় স্বপ্ন ছিল তারা তাদের নিজ দেশ ইসরাইলে ফিরে যাবে। ইসরাইল তাদের মাতৃভূমি ও ধর্মভূমিই শুধু নয়, তাদের স্বপ্ন ভূমিও বটে। প্রজন্মের পর প্রজন্ম স্বপ্ন দেখেছে ইসরাইল নামের দেশের। “নেক্সট ইয়ার ইন জেরুজালেম” এই শ্লোগান মাথায় রেখে বহু ইহুদি মারা গিয়েছে। ইসরাইলের জন্য তারা সাধ্য মতো দান করেছে, ধর্ম ও বিশ্বাস দিয়ে নিজেদের এক করে রেখেছে। সংখ্যায় অত্যন্ত কম হওয়ার পরও ক্ষুরধার বুদ্ধি, কৌশল ও মেধার বিকাশ ঘটিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ জায়গাগুলোতে নিজেদের বসিয়েছে।

ইহুদিরা নানান দেবতা ছাড়াও ‘এপিস’ নামে এক ষাড়ের পূজো, পাথর, আগুন, এক শিশু ও কুমারি মায়ের পূজো করতো। ব্যবিলনে বন্দিদশা থেকে মুক্তির পর রচিত পুস্তকে ইহুদিরা শয়তান, স্বর্গদূত মিকাইল, উরিয়েল, ইয়ার, নিসান, আত্মার অমরতা, পুনরুত্থান ইত্যাদি মতবাদ প্রচার শুরু করে। যিশুর জন্মের সময় ইহুদিরা ৩-ভাগে বিভক্ত ছিলো যথা ‘ফারিসিজ’, ‘এসেনিজ’ ও ‘সাদুনিজ’, সাদুজিনরা মোজেসের এবং এসেনিজরা বুদ্ধের অনুসারী ছিলো। এসেনিজরা অধিকাংশ মঠে বসবাস ও কুমার জীবনযাপন করতো। সে হিসেবে যিশু নিজে বুদ্ধের অহিংস মতবাদের অনুসারি এসেনিজ ছিলেন। গ্রীকরা এসেনিজদের সুন্দর জীবনাচারের কারণে তাদেরকে থেরাপিউটা বলে মনে করতো। এসেনিজরা বলিদান প্রথা তথা প্রাণিহত্যার ঘোর বিরোধী ছিলো। যিশুর আগমনের আগেই এসেনিজরা যে শুদ্ধ জীবনাচার পালন করতো, তাই মূলত যিশু প্রচার করেছিলেন। এসেনিজ ছাড়া সাধারণ ইহুদিদের বহুবিবাহে উৎসাহ তথা স্বর্গপ্রাপ্তির দ্বার বলে ঘোষণা করা হতো। এসিনিজরা পর্যায়ক্রমে যেশাই ও পরবর্তীতে খ্রিস্টান হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছিল, যাদের পবিত্র পুস্তক রচিত হয়েছিল কলদীয় ভাষায়। কিছু এসিনিজ মিসরের মারিয়া হ্রদের তীরে মঠে বসবাস করতো। যিশুর মতবাদের অনুরূপ মতবাদি এসেনিজ ইহুদিরা মিশনারী প্রতিষ্ঠা করেছিল রোমে, করিন্থে, গ্যালাসিয়ায়, ইফেসাসে, ফিলিপোতে, কলোসে ও থেসালোটিকায়।

_gen/derivatives/landscape_640/1381391866.jpg” width=”400″ />

তোরাহ শরিয়ত অনুসারে ইহুদিরা বৎসরে একদিন একরাত অর্থাৎ ২৪ ঘন্টা রোজা রাখে। এ ছাড়াও অনেকে বৎসরের বিভিন্ন দিনে রোজা রাখে। বিপদের সময় স্রষ্টার সাহায্য চেয়ে বা অন্য কোন কারণেও রোজা রাখে। রোজার সঙ্গে প্রার্থনাও জড়িত। সাধারণত এক নাগাড়ে একদিনের বেশী তারা রোজা রাখে না। শনিবার ইহুদিদের বিশ্রাম ও এবাদতের দিন। শুক্রবার সন্ধ্যে ৬টা হতে শনিবার সন্ধ্যে ৬টা পর্যন্ত সময়টাকে এই বিশ্রামবার বলে ধরা হয়। এদিন তারা সিনাগগে একসঙ্গে মিলিত হয়ে তাদের ধর্মগ্রন্থ (Torah) পাঠ করে এবং এবাদতে মশগুল থাকে। বৎসরের মধ্যে ইহুদিরা বেশ কয়েকটি ঈদ উৎসব (Festivals) পালন করে। তারমধ্যে তিনটি বিশেষ ঈদ পালন করার জন্যে দেশের সকল ইহুদি জেরুজালেমে উপস্থিত হয় সেখানকার প্রধান এবাদতখানায় এবাদত ও ঈদের অন্যান্য আচার-অনুষ্ঠানাদি সম্পন্ন করার জন্যে। ইহুদিরা বৎসরে নিম্নের ঈদগুলি পালন করে-

ক) ঈদুল ফেসাখ (Passover or Pesach)- মিসরের শাসক ফেরাউনের হাত থেকে ইহুদিরা যেদিন উদ্ধার পেয়েছিল, সেদিনটিকে স্মরণ করে তারা এই ঈদ পালন করে;

খ) ঈদুল মাত‘ছ (Matzah)- ইব্রানি মাত‘ছ শব্দের অর্থ খামিহীন রুটি। ঈদুল ফেসাখের পরের সাত দিন ধরে এই ঈদ পালন করা হয়, খামি দিয়ে রুটি না খাওয়া এই ঈদের একটি বিশেষ দিক;

গ) ঈদুল খেমীশশীম (Khemishim)- ইব্রানি খেমীশশীম অর্থ ৫০তম। ঈদুল ফেসাখের পরে পঞ্চাশ দিনের দিন এই ঈদটি পালন করা হয়;

ঘ) ঈদুল সুক্ক (Sukkos)- ইব্রানি সুক্ক অর্থ কুঁড়েঘর। ইহুদিরা মরু এলাকায় ৪০ বৎসর পথ হারিয়ে তাবুতে বাস করেছিল। সেকথা মনে করার জন্যে বৎসরের এক বিশেষ সময়ে আট দিন ধরে তারা গাছের ডাল-পালায় তৈরী কুঁড়েঘরে বাস করে, এর নাম ঈদুল সুক্ক;

ঙ) ঈদুল হানাকা (Hanukkah)- ইব্রানি হানাকা শব্দের অর্থ উৎসর্গ। সিরিয়ার সম্রাট এন্টিওকাস এপিফ্যানিস জেরুজালেমের এবাদতখানার বেদীটি অপবিত্র করেছিল, বেদীর উপর শুকর উৎসর্গ করে। ১৬৪ খ্রীঃপূঃ এহুদা ম্যাক্কাবিয়াস নামে এক ইহুদি সেই বেদীটি বদলিয়ে নতুন বেদী দান করেছিলেন। এই বেদীটি যেদিন স্রষ্টার উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করা হয়েছিল, সেই দিনটি স্মরণ করে আট দিন ধরে এই ঈদটি পালন করা হয়;

চ) ঈদুল ইয়োম কিপ্পুর (Yom Kippur)- এই দিনে ইহুদিরা রোজা রাখে এবং মহা-ঈমাম তার নিজের এবং সমগ্র ইহুদি জাতির পাপ মোচনের জন্যে কোরবানি করা পশুর রক্ত নিয়ে মহাপবিত্র স্থানে প্রবেশ করেন এবং সেখানে পবিত্র সাক্ষ্য সিন্দুকের (ব্যবস্থার বাক্সের) উপর হিস্যোপ গাছের ডালের সাহায্যে এই রক্ত ছিঁটান।

এছাড়া সম্রাট অহশ্বেরশ এর এক উচ্চ পদস্থ কর্মচারী হামান কর্তৃক ইহুদি জাতিকে ধ্বংস করার এক দুষ্ট পরিকল্পনা থেকে মুক্তিলাভ করেছিল ইহুদিরা রাণী ইষ্টেরের সহায়তায়। ঐ উদ্ধার স্মরণ করার জন্যে প্রতি বৎসর মার্চ মাসের মাঝামাঝি সময়ে ইহুদিরা ‘পুরীম’(Purim) নামে একটি ভোজের উৎসব পালন করে থাকে।

এরপর পর্ব – ৭ [সিরিজটি মোট ১৮ পর্বে সমাপ্ত হবে]

ইতোপূর্বেকার পোস্টসমূহের লিংক :
http://www.istishon.com/node/6503#sthash.QPjpEpOB.dpbs (Part 1)
https://istishon.blog/node/6532#sthash.rFf73XX7.dpbs (Part 2)
http://www.istishon.com/node/6546#sthash.uK8UMiUo.dpbs (Part 3)
http://www.istishon.com/node/6587#sthash.DF0y7UrP.dpbs (Part 4)
http://www.istishon.com/node/6637#sthash.jXFqvLNX.dpbs (Part 5)

লেখকের ফেসবুক ঠিকানা [ধর্মান্ধতামুক্ত যুক্তিবাদিদের ফ্রেন্ডভুক্ত হওয়ার আমন্ত্রণ জানাই ] : https://www.facebook.com/logicalbengali

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

২৩ thoughts on “বিশ্বের ইহুদি জাতির ৩০০০ বছরের ইতিহাস : ভেতর-বাহির [পর্ব-৬]

    1. কিন্তু আপনাকে দেখছি না কেন?
      কিন্তু আপনাকে দেখছি না কেন? তারিক লিংকনের পোস্টটির ব্যাপারে আপনি আমায় সচেতন না করলে ওটা দেখতে হয়তো আমার আরো সময় ক্ষেপণ হতো। এ জন্য আপনাকে ধন্যবাদ জানাতে পারিনি। ইহুদি পর্ব সব পড়েছেন কি?

    1. নতুন ব্লগার (অনেকটা আমার মত)
      নতুন ব্লগার (অনেকটা আমার মত) দীপাকে অভিনন্দন এবং ধন্যবাদ আমার লেখার ব্যাপারে আগ্রহ প্রকাশের জন্যে।

    1. আন্তরিক শুভেচ্ছা মূর্খ
      আন্তরিক শুভেচ্ছা মূর্খ চাষাকে। কিন্তু ভাই আপনার মতো আমিও মূর্খ মানুষ বুঝিনা যে আপনারা আমার লেখা প্রিয়তে নিলেও কেন এক্সপ্রেসে আমার কোন লেখা দেখিনা! এ জন্য দাওয়াই কি ভাইয়া?

      1. ভাই রে, এত অধৈর্য হলে চলবে???
        ভাই রে, এত অধৈর্য হলে চলবে??? আমি গত বছরের মে মাস থেকে লিখছি। নয় মাস (স্পিশাল নাম্বার) ব্লগিংয়ের পর এই প্রথম আমার একটা পোস্ট স্টিকি হল…

        1. কালবৈশাখিকে ধন্যবাদ অসুখবরটি
          কালবৈশাখিকে ধন্যবাদ অসুখবরটি জানানোর জন্যে, সে হিসেবে আমাকে অপেক্ষা করতে হবে আরো কমপক্ষে ৮-মাস? এতো মঙ্গলে অভিযানে যাওয়ার মত কঠোর সাধনা! ওহ গড, ঈশ্বর, ভগবান, জিউস, যিশু, যিহোভা, ইয়ারব রক্ষা কর এ বিপদ থেকে!

          আপনাকে অভিনন্দন এ পুরস্কার প্রাপ্তির জন্যে, অভিনন্দন গ্রহণ করুন

          :

  1. চমৎকার, নিরাশ হই নি! শেষের
    চমৎকার, নিরাশ হই নি! শেষের অপেক্ষায় থাকলাম…
    :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :অপেক্ষায়আছি: :অপেক্ষায়আছি: :অপেক্ষায়আছি: :অপেক্ষায়আছি:

  2. ফেব্রুয়ারি থেকে ভাষা বিষয়ক
    ফেব্রুয়ারি থেকে ভাষা বিষয়ক পোস্ট দিতে চাই, বাংলা ভাষার শ্রেষ্ঠত্ব, ধার করা মাতৃভাষা আমাদের, এর সমস্যা, সংস্কার, আধুনিকায়ন প্রসঙ্গে! কি বলেন? ফেবুকে দেখা দিয়ে চলে গেলেন আর পাচ্ছি না!!

    1. হালকা দৌড়ের উপ্রে আছি দাদা!!
      হালকা দৌড়ের উপ্রে আছি দাদা!! পড়ে কথা বলব…
      আপাতত এই সিরিজ শেষ করেন! ভাষার মাসে আমাদের ভাসায় দেয়ার দুরাশা কইরেন না। কেউ ছেড়ে কথা কইব না… 😉
      :মুগ্ধৈছি: :মুগ্ধৈছি: :মুগ্ধৈছি: :ফেরেশতা: :ফেরেশতা: :ফেরেশতা: :ফেরেশতা: :ফেরেশতা: :ভেংচি: :ভেংচি: :ভেংচি: :ভেংচি: :ভেংচি: :চিন্তায়আছি: :চিন্তায়আছি: :চিন্তায়আছি: :চিন্তায়আছি:

      1. আমিতো সবার মুখ ও ব্রেন খুলতে
        আমিতো সবার মুখ ও ব্রেন খুলতে চাই। ব্লগে আর করণীয় কি? আমার করণীয় বিষয়টি সবার চিন্তনকে জাগ্রত করা, মননশীল চিন্তন বিতর্ক জাগিয়ে তোলা, একদিন হয়তো বাস্তবায়ন শুরু হবে।

    1. আপনি কি ঈদ বলতে চাইছেন না
      আপনি কি ঈদ বলতে চাইছেন না ঈদুর? আমি হিব্রু ভাষা জানিনা, তবে আরবি ঈদ মানে উৎসব। প্রাচীন হিব্রু থেকে আরবীকে অনেক শব্দ এসেছে। যেমন হিব্রু ইলা=পুজনীয়, লায়ল=রাত, ইয়াওম=দিন, নবী=প্রতিনিধি ইত্যাদি। অনেকটা বাংলা ভাষায় যেমন সংস্কৃত শব্দমালায় ভরপুর!

      1. ধুরু!!! ওটা ঈদুল হবে। আমার
        ধুরু!!! ওটা ঈদুল হবে। আমার জানামতে মুসলিমদের ঈদ মদীনাতে গিয়েই শুরু হয়েছিল (Not sure) আর মদীনায় গিয়েই তারা ইহুদিদের সংস্পর্শে আসে। তাই মাথায় এলো, ঈদ জিনিসটা ইহুদিদের অনুকরণ না’কি?

        1. আমি ইহুদি ধর্ম যেটুকু জানলাম,
          আমি ইহুদি ধর্ম যেটুকু জানলাম, তাতে তাদের ৮০-৯০% কাজকর্মই মুসলমানরা অন্য নামে বা অন্যভাবে সম্পাদন করছে।

      2. আর মুসলিমদের ঈদের কোন
        আর মুসলিমদের ঈদের কোন যৌক্তিকতা তেমন খুঁজে পাইনি আমি। কোরবানী নামক ঈদ মুসলমানরা পালন করে “পশু হত্যার উৎসব” হিসেব নবী ইব্রাহিম-ইসমাইল স্মরণে! ইহুল ফেতরের কোন ঐতিহাসিক ঘটনা পাইনি। তবে জনৈক ইহুদি বলেছিলেন, (হাদিস মতে) “আজ তোমাদের ধর্মকে পূর্ণতা দিলাম” এমন আয়াত আমাদের উপর নাজিল হলে ঐ দিনকে আমরা ঈদ হিসেবে পালন করতাম। তা ছাড়া ইসলামের নবীর জন্মদিনকে, মক্কা বিজয়ের দিনকে, হিজরতের দিনকে, বদরের যুদ্ধ জয়ের দিনকে, কোরান নাযিল হওয়ার দিনকে মুসলিমরা ঈদ হিসেবে পালন করলে যৌক্তিকতা পেতাম কিনতু আমি মুসলিম ঈদের প্রেক্ষাপট খুজে পাইনি, যেমন পাইনি “বঙ্গাব্দের” প্রেক্ষাপট!!

        কুরবানীর ঈদ ইহুদিদের ঈদ অনুকরণ বলা যেতে পারে। মুসলিমদের অনেক কাজই ইহুদিদের অনুসরণ : যেমন উপরে ইহুদি কবরের যে ছবি দেয়া হলো মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম কবরস্থান ঠিক এমনটিই। তবে ইহুদিরা কোরবানীর পর “কোরবানগাহ” থেকে পশুর রক্ত নিয়ে বেদিতে ছিটায়, আর মুসলমানরা ছিটায় না। তারা যিহোবার নামে কোরবানি করে, মুসলমানরা আল্লাহর নামে!

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

10 + = 13