আকাশে উড়ানো চিঠি

শোন, তোমাকেই বলছি। হ্যাঁ তুমি, চিঠিটা তোমারই জন্য। তোমার গল্প অনেক শুনেছি দাদুর কাছে। অনেক কথা জানার আছে আমার। আবার অনেক কিছু বলারও আছে।


শোন, তোমাকেই বলছি। হ্যাঁ তুমি, চিঠিটা তোমারই জন্য। তোমার গল্প অনেক শুনেছি দাদুর কাছে। অনেক কথা জানার আছে আমার। আবার অনেক কিছু বলারও আছে।

আচ্ছা, তোমার প্রিয়সীকে ছেড়ে যখন বাংলার মাঠ-ঘাট চষে বেরিয়েছিলে তখন কি একটি বারের জন্যেও মনে হয় নি বাড়িতে দুবেলা ভাত জুটছে কিনা! তোমার বাবুটা কি মায়ের কোলে খেলা করছে!! তোমার বাবার যে ঔষধ ফুরিয়ে গেছে সে কথা কি মনে ছিল? অনেক কষ্টে জোগাড় করা জর্জকোর্টে পেশকারের চাকরিটা চলে গেছে এতদিনে। যখন টিপু রাজাকার টেনে হেঁচড়ে বুড়িগঙ্গার পশ্চিম পাড়ে তোমাকে দাঁড় করিয়ে দিল, যখন তোমার আকাশ সমান বুকে বেয়োনেট দিয়ে খোঁচানো হল, যখন মেজর সরফরাজ “ফায়ার” বলে চিৎকার করে উঠল, তখন কি মনে হয়নি………!! থাক। জানি তখন কিছুই মনে হওয়া সম্ভব নয়। কারণ তখন তোমার ভুবন জুড়েই ছিল তোমার “মা”।

কথা ছিল তোমার মায়ের বিবস্ত্র শরীরে একপ্রস্থ কাপড় পরানো হবে। কথা ছিল তোমার ছোট্ট ভাই গভীর রাতে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠবেনা। তোমার বোনকে আর কোন লোভী শয়তানের কাছে বেঁচে দিতে হবে না। কথা ছিল তোমার প্রিয়সী লাল কাতান গায়ে জড়িয়ে লম্বা ঘোমটা টেনে তোমার সামনে দাড়িয়ে বলবে, “বাবু ঘুমিয়ে পরেছে, চলো মেলায় যাই।” তোমার বাবা হয়তো দাওয়ায় বসে আর একটু দামি তামুক ফুঁকবে। তিন বেলা শুধু ডাল-ভাত নয়, সপ্তাহে তিনদিন গরুর গোশত খাওয়ানেরও প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলে তুমি।

তোমার বাংলা মা যেমন তোমাকে গর্ভে ধরেছে তেমনই মীরজাফরদের মত শয়তানদেরও জন্ম দিয়েছে। সবাইকে বুকে আগলে রেখেছে পরম মমতায়। সকল বিপদ থেকে রক্ষা করেছে নিজে আঘাত পেয়ে। নিজের ভাইয়ের হাতে মার খেয়ে যখন মায়ের কোলে লুটিয়ে পড়লে তখন মা নিশ্চয় বলেছিল, “রাগ করিস না রে মানিক! তোরই তো ভাই। আয় তোকে ঘুম পাড়িয়ে দেই।” বাধ্য ছেলের মত ঘুমিয়ে পড়লে তুমি। মায়ের শরীরের গন্ধ নিজের শরীরে মেখে নিয়ে চিরনিদ্রায় গেলে। ঠিক তোমারই মত এক এক করে ঘুমিয়ে পড়লো তোমার ভাই বোনেরা। তোমার মায়ের কুলাঙ্গার সন্তানেরা এক এক করে পান করল নিজের ভাইয়ের রক্ত, নিজের বোনের রক্ত। মায়ের কষ্টটা যদি তখন দেখতে একবার!! ডুকরে ডুকরে কাঁদছিল ঘোমটায় মুখ লুকিয়ে। কাউকেই কিছু বলতে পারেনি সে। কিই বা বলবে? কাকেই বা বলবে? সে কি বলবে আমার এক মানিককে মেরে ফেলেছে আর এক মানিক!! কখনই না! সে যে তোমার মা, তাদের মা, সকলের মা। মা দের তো কষ্ট সহ্য করতেই হয়।

তুমি ঘুমিয়ে আছ সে অনেক দিন হলো। এর পরের ঘটনা কি জানো তুমি? দেখেছ কি উপর থেকে? এরপরের ঘটনাগুলো খুব একটা সুখের নয়। কষ্ট পাবে তুমি। কাঁদতে কাঁদতে বুক ভাসিয়ে দেবে। শুনতে চাও? তোমার শোনা উচিৎ। তোমার যাওয়ার পর কত কিছুই না ঘটে গেল! সব জানতে হবে তোমাকে…

তোমরা সবাই চলে গেলে এক এক করে। তোমার ভাই বোনেরা যারা বেঁচে ছিল তাদেরকেও এক এক করে পাঠিয়ে দেয়া হলো অন্ধকার কুঠুরিতে। তারপর চললো এক নষ্ট, এক অশ্লীল খেলা। যে স্বপ্ন বুকে নিয়ে আগুনে লাফ দিয়েছিলে, সেই স্বপ্নকে গলা টিপে হত্যা করা হল। আজো তোমার বাবার ঔষধ কেনা হয়নি। কেনার দরকারও পরেনি। তোমাদের বাড়ির পেছনে আমবাগানের সব চেয়ে বড় যে গাছটা ছিল, তার নিচে তাকে কবর দেয়া হয়েছে। তোমার ভাই টাকার জন্য স্কুলে যেতে পারেনি। তার চোখ দুটোতে যেন প্রাণ নেই, নেই কোন স্বপ্ন। কোন আখাঙ্খা নেই, নেই কোন চাহিদা। তোমার বোনের বিয়ের যৌতুকের টাকা মেটাতে গিয়ে ভিটে মাটি বেঁচে সে এখন নিঃস্ব। এক রাতে পাকসেনারা তোমার বাড়িতে এলো। তোমার প্রিয়সীকে দেখে হয়তো চকচক করে উঠেছিল তাদের চোখ। তোমার বাবুকে কোল থেকে কেড়ে নিয়ে বুটের তলে ফেলে তার ছোট্ট মাথাটুকু পিষে দিল হায়নার দল। তারপর…………তোমার সোনা বউকে একদিন বিবস্ত্র অবস্থায় পরে থাকতে দেখা গেল ঘোষদের পুকুর পাড়ে।

আর তোমার মা?! তার যে অনেক কষ্ট। কিছুই বলতে পারেনা সে। শুধুই কেঁদে যায় রাতদিন। যে বেঈমানের হাত ধরে পাকি’রা তোমার বাড়িতে এসেছিল সেও তো তোমার মায়েরই সন্তান। কিন্তু মায়ের ভালবাসা তারা বুঝল কই? স্বাধীনতার পর তাদের নষ্টামি, তাদের অশ্লীলতা আরও বেড়ে গেলো। স্নেহময়ী মায়ের ওপর চড়ে বসল তারা। অত্যাচার করতে থাকল। বিভিন্ন নামে, বিভিন্ন রূপে ফিরে এসে পালাক্রমে ধর্ষণ করতে থাকল মাকে। তার পরনের শাড়িখানি ছিড়ে ফেলা হলো বারবার। তার চিরসবুজ বুকটাকে ক্ষত-বিক্ষত করে দেয়া হলো। তার পরনের গয়না চুরি করে তুলে দেয়া হলো বিদেশিদের হাতে। কুকুরের মতো, শকুনের মতো কাড়াকাড়ি করতে থাকলো মায়ের জমানো টাকা ভাগাভাগি করতে গিয়ে। কখনো মিথ্যা ইতিহাসের দোহাই দিয়ে, কখনো ধর্মের দোহাই দিয়ে তোমাদের লাশের ওপরে পা রেখে চলল সংসদে যাওয়া আসা। নিজের ভাইদের রক্ত চুষে খেয়ে মোটাতাজা করতে থাকলো নিজেদের। ক্রমেই তারা যেতে থাকলো ধরাছোঁয়ার বাইরে।……কান্না পাচ্ছে তোমার তাই না? দেখেছো কত্তো কষ্টে আছে তোমার মা!! তার লাবণ্যময়ী, স্নিগ্ধ মুখখানিতে এখন শুধু চোখের পানির দাগটুকুই খুঁজে পাবে।

জানো, তোমার কথা খুব বেশি করে মনে পরছে আজ। কানে বাজছে তোমার দীপ্র কণ্ঠস্বর। মৃত্যুর হিম শীতল শেকল যখন তোমার হাতে পায়ে পড়ানো হল তখন তুমি গর্জে উঠলে, “আমার রক্তের সবকটি লোহিত কণিকা, সবকটি শ্বেতকণিকা-অণুচক্রিকা থাকে জন্ম নেবে এক নতুন আমি।”……হ্যাঁ। একদম ঠিক বলেছিলে। আজ আবার একজন দুইজন করে জন্ম নিচ্ছে তোমার রক্তকণিকা থেকে। তোমারই পুনর্জন্ম হচ্ছে বাংলা মায়ের বুকে, প্রতিদিন, প্রতি ঘণ্টায়, প্রতি সেকেন্ডে। সংখ্যায় তারা শতশত, হাজার হাজার। চোখে ঠিক তোমারই স্বপ্ন। বাংলা মায়ের নগ্ন বুকে কাপড় জড়ানোর প্রত্যয়। মায়ের কলঙ্কের শিকল ভেঙ্গে তাকে মুক্ত করার প্রত্যয়। মায়ের ভালবাসার ক্ষুদ্র প্রতিদান দেয়ার প্রত্যয়। আর…। আর মাকে যারা লুটেপুটে খেয়েছে এতদিন, মাকে যারা নিঃস্ব করেছে, মায়ের অপার স্নেহকে যারা পা দিয়ে লাথি মেরেছে, মায়ের মুখে যারা কালিমা লেপ্টে দিয়েছে, তাদের মুখোশ খোলার প্রত্যয়। জানো, আজ বাংলার গ্রামে, শহরে, পাড়ায় মহল্লায়, স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে তোমার পুনর্জন্ম ঘটছে, প্রতিদিন, প্রতি ঘণ্টায়, প্রতি সেকেন্ডে। সংখ্যায় তারা শতশত, হাজার হাজার। কত যে আঘাত আসছে তাদের ওপর ভাবতেও পারবে না, ঠিক যেমনটা তোমার ওপর নেমে এসেছিল, তোমার মার ওপর নেমে এসেছিল। সেই পুরনো পাপীরা আবার ইতিহাসের দোহাই দিয়ে, ধর্মের দোহাই দিয়ে, ভাল মানুষের মুখোশ পরে ঝাঁপিয়ে পরছে চরম আক্রোশে। নিজেদের নষ্ট অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে মায়ের বুকে বসাচ্ছে মরণ কামড়। কিন্তু তোমার অস্তিত্বকে দমাবে এমন সাধ্য কার? তোমার রক্ত থেকে যারা জন্ম নিচ্ছে, তারাও তোমারই মতো বাংলা মায়ের লক্ষ্মী সন্তান। মায়ের অপমান তারা সহ্য করবে কেন, সে যত আঘাতই নেমে আসুক! বরং তাদের কণ্ঠে আওয়াজ ওঠে-

“যে যাবেনা সে থাকুক, চলো, আমরা এগিয়ে যাই।
যে-সত্য জেনেছি পুড়ে, রক্ত দিয়ে যে-মন্ত্র শিখেছি,
আজ সেই মন্ত্রের সপক্ষে নেবো দীপ্র হাতিয়ার।
স্লোগানে কাঁপুক বিশ্ব, চলো, আমরা এগিয়ে যাই।”

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
২৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৩

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

২ thoughts on “আকাশে উড়ানো চিঠি

  1. সেই পুরনো পাপীরা আবার

    সেই পুরনো পাপীরা আবার ইতিহাসের দোহাই দিয়ে, ধর্মের দোহাই দিয়ে, ভাল মানুষের মুখোশ পরে ঝাঁপিয়ে পরছে চরম আক্রোশে। নিজেদের নষ্ট অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে মায়ের বুকে বসাচ্ছে মরণ কামড়। কিন্তু তোমার অস্তিত্বকে দমাবে এমন সাধ্য কার?

    :থাম্বসআপ:

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

− 8 = 2