অবশেষে

(১)
জীবনটা কখনই খুব সরল রেখায় এগোয়নিl থমকে গিয়েছি বারবার ,তবুও আবার চলতে চেষ্টা করেছি স্মৃতি হয়ে যাওয়া কিছু মানুষের দোয়া ,কিছু মানুষের ভালবাসা, আর ভাগ্য l

তখন কেবল 4th year শুরু ,নিজেকে আবার গুছিয়ে নিতে শুরু করেছি যদিও এই কাজটি মোটেও সহজ ছিল না l সকালে মন ঠিক থাকে তো বিকালেই আবার মন খারাপ ,বিকেলে ভালো তো পরক্ষনেই আবার মন খারাপ ,তবুও ঠিক যে আমাকে হতেই হবে ,তাই শেষ পর্যন্ত হয়ত হয়েছিলাম ,আর এর পেছনে বিশাল অবদান ছিল যাদের তাদের একাংশ হলো আমার অনেক ভালো কিছু ফ্রেন্ড l

তবে মানুষ তো ,কিছু আবেগ তো থাকবেই মনে l এর মধ্যে কিছু বিয়ের proposal ও না করতে হয়েছে ,সম্পূর্নই নিজ দায়িত্বে ,নিজ দক্ষতায় l যখনি কেউ আমার প্রতি তাদের এই ভালোলাগার বহিঃ প্রকাশ ঘটাত তখনি সবার আগে মনে হত কি এর কারণ হতে পারে ? যতোই আবেগপ্রবণ হইনা কেন ,একটা কথা খুব বিশ্বাস করি আর তা হলো “কারণ বিনা কার্য হয়না ” l ভালোলাগার ক্ষেত্রে আপাত দৃষ্টিতে মানুষ যেটা প্রথম দেখার কথা তা হয়ত সৌন্দর্য ,যেটা আমার ছিলনা ,তারপর হয়ত দেখার কথা অর্থ সম্পদ ,সেটাও আমার ছিলনা ,নিতান্তই মধ্যবিত্ত পরিবারের একমাত্র সন্তান ছিলাম আমি ,তাও আবার মেয়ে ,আর যে সময়ের কথা লিখছি তখন তো পরিবারই আর নেই ,নানুর বাসার দোতলায় আমি থাকি ,বিশাল দায়িত্ব আম্মু’র দিয়ে যাওয়া furniture দেখে রাখা ,সাথে নিজেকেও l তো যায় হোক ,আমার প্রতি ভালোলাগার কোনো যুক্তি সঙ্গত কারণ আমি খুঁজে পেতাম না ,কাজেই strictly সেসব proposal না করে দিতাম l তবে আমারও যে কাউকে ভালো লাগেনি তা কিন্তু না ,কখনো কখনো অনেক দুর্বল কিছু সময় পার করেছি ,কিন্তু নিজেকে ঠিকই সামলে নিয়েছি,আগে career l

যাদের জন্য আজকের এই আমি তাদের স্বপ্ন তো ভুলে যাওয়া যায়না l

এই অত্যাধুনিক যুগে আমার জীবনও যদিও বেশ Digital ছিল ,তবে মনে মনে আমি ছিলাম অতি বাঙালি স্বভাবের ,কিছুটা সাংসারিক l তবে আমার brown colour 3 step চুল আর আমার lifestyle দেখলে সহজে কারো ধরতে পারার কথা না l এই অতি বাঙালি স্বভাবটা শিখেছি আমার আম্মুর কাছ থেকে l তিনি বলতেন যত বড় engineer হইনা কেন আগে আমি একটা মেয়ে ,কখনো বা কারো বাড়ির বউ ,adjust করে চলতে পারাটাই বড় কথা ,চিত্কার চেঁচামেচি করে নিজের জিদ টিকিয়ে রাখাটাই বড় কথা নয় , sacrifice করতে জানতে হবে ,কেউ যেন বলতে না পারে একমাত্র মেয়েতো, কিছুই শিখেনি l কারণ আমাদের সমাজে একমাত্র মেয়ে যারা তাদের দোষ গুলো চোখে পড়ে বেশি l কাজেই চেষ্টা করেছি একজন ভালো মেয়ে হতে ,সাথে ভালো career ….

অনেক early রান্না টা শিখে নেই ,আম্মুর কাছেই l তারপর একটু আধটু বউ সাজানো ,মেহেদী পরানো ,কিছু হাতের কাজ ,এমনকি চুল কাটাও ,না,কোনো প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে নয় ,নিজের ঘরে বসে,বই পড়ে,ইন্টারনেট থেকে ,কখনো বা কারো দেখে l একসময় driving টাও শিখে নিলাম ,যদিও তখনও আমার গাড়ি নেই l

দেখতে দেখতে শেষ হলো BSc Engineering l Result তেমন কারো পছন্দ হলনা ,কেউ আমার কাছে এমনটা আশা করেনি l কিন্তু তারপরেও আমি চেষ্টা চালিয়েই গিয়েছি ,দেখি কি হয় ?যদি পারি ….

ইচ্ছা ছিল দেশের বাইরে যাওয়ার ,প্রথমত higher study ,এবং পরবর্তিতে settle হবার l শুরু হলো দেশের বাইরে যাওয়ার যুদ্ধ ,একসময় এই যুদ্ধে জয়ী হলাম l সবাইকে অবাক করে দিয়ে এবার আমি আমার flight এর অপেক্ষায় ,airport এ ,পিছনে দাড়িয়ে থাকা মুখ গুলোকে দেখে কান্না আড়াল করে সামনে এগিয়ে গেলাম ,খুব কষ্ট হচ্ছিল সামনে এগোতে l
অবশেষে আমি বিদেশের মাটিতে , USA ,যদিও বাইরে আসার ক্ষেত্রে সবসময় ইচ্ছা ছিল মুসলিম country কিন্তু কি আর করা ,উপায় ছিল না l শুরু হলো নতুন জীবন l দেখতে দেখতে মাস্টার্স complete করলাম l এখানে একটা job ও হলো l নিজেকে কিছুটা সফল মনে হয় l প্রবাস জীবন খুব আরামের ছিলনা l 24 hr busy থাকতে হত,পুরোপুরি routined life l
তারমধ্যে facebook কিন্তু ঠিকই use করতাম l এখানে কিছু friend ছিল ,তার মধ্যেই সে ছিল একজন ,নীল l পরিচয় দেশ থেকেই ,তবে এখন দুজন একই দেশেই ,সে এখন Ph D করছে l তার প্রতি আমার feelings বলতে গেলে বলতে হবে “খারাপ লাগেনি কখনো” l

অনেকদিন হলো দেশ ছেড়ে আসা ,একটা সুযোগ পেয়ে গেলাম দেশে যাওয়ার l শুনলাম সেও যাচ্ছে ,কিছুটা আশ্চর্যজনক জনক ভাবেই একই flight এই দেশে আসলাম দুজনই ,তারপর যে যার বাসায় ,একেবারেই formally l বাসায় ফিরে যা পেলাম,এ যাবৎ পাওয়া জীবনের সবচেয়ে সুখের মুহূর্ত l সবাই এত ভালবাসে আমাকে ……..আবার আমার অতি বাঙালি জীবন শুরু হলো ,তবে সময়কাল বেশি না……হঠাত একদিন তার phone l তার নাম ডাকনাম ছিল নীল l সে জানালো তার মা কে নিয়ে কি যেন কাজে তাকে রাজশাহী আসতে হবে ,কিন্তু তাদের রাজশাহীতে কোনো relative ছিলনা l তো আমি এই কথা বাসায় বলতেই মামা বলল আমাদের বাসায় আসতে বলতে ,এবং মামার কথা শুনে মনে হলো সে আগে থেকেই জানে যে তারা আসবেন l কিন্তু কিভাবে তা সম্ভব ???
তো পরদিন সকালে উনারা আসলেন আমাদের বাসায় ,এবং তার আম্মুর আচরণ দেখে মনে হলো উনি আমকে আগে থেকেই দেখেছেন l বিকালে ছাদে উঠেছি ,সাথে আছে কফি আর আমার camera ,কফি শেষ করেই কিছু natural ছবি তুলব এটা ছিল plan l হঠাত আমাকে নেমে আসতে বলা হলো ,এবং নিচে এসে যা হলো তা আমাকে পুরাই চমকে দিল l drawing room এ সবাই একসাথে বসে ,সাথে নীল এবং aunty ।আমাকে aunty উনার পাশে বসালেন,এবং উনার অপর পাশে তার ছেলে ,কিছুক্ষণ পর আমার অনামিকা আর ফাঁকা ছিলনা ……..

পরে জানলাম নীল Aunty আমাকে প্রথম দেখেছিলেন fb তে আমার ছবিতে ,তারপর আমার বাসায় যোগাযোগ ,উভয় পক্ষের মত বিনিময় এবং সম্মতি ……
নাহ ..শুধু অনামিকা পূর্ণ করেই তারা থেমে থাকেননি l
আসলে রাজশাহীতে এটাই ছিল তাদের কাজ,সেটা সেরেই তারা সন্ধ্যায় ফিরে গেলেন l বুঝলাম পরের সপ্তাহে বিয়ে …….জীবনে এতবার ornaments পরেছি কখনো এমন লাগেনি,এই আংটিটা পড়ার পর থেকে কমন যেন লাগে ,বলে বুঝাতে পারবনা l

তখনও আমি তাকে আপনি করে এবং নীল ভাইয়া বলেই ডাকি ,উনিও কখনো বলেনি তুমি করে ডাকতে ,কেউ কখনো কাউকে স্পর্শও করিনি l একবার জানতে চেয়েছিলাম ,আমার মধ্যে তো এই যুগে ভালোলাগার মত কিছু নেই ,আপনার আপত্তি নেই কেন?

এরপর হলো বিয়ে ,সবকিছু কেমন স্বপ্নের মত l

কি যে লজ্জায় পড়েছিলাম সবার সামনে ….বিয়ের গাড়িতে যখন আমি তার পাশে ,অনেকক্ষণ পুতুলের মত বসে থেকে বেশ ক্লান্ত ছিলাম ,কখন যে তন্দ্রা এসে যায় ,আর আমি ঢলেপড়ি তার কাঁধে ,গাড়ি ভর্তি মানুষের সামনে l সবার হাসিতে যখন বুঝলাম এই ঘটনা তখন লজ্জায় আমার তন্দ্রা আর নেই …..
শুরু হলো সংসার জীবন ,তবে ওদের বাসায় ছিলাম মাত্র ১৭ দিন ,তারপর আবার দুজনেই USA ফিরে গেলাম l

জীবনটা অনেক সুন্দর l New York এর ১৩ তলা একটা buildingএর ৬ তলায় আমাদের এপার্টমেন্ট ,ওর PhD complete ,এরমধ্যেই ওদের পুরো family USA তে ,কি যে সুখী family আমার …

ওর বোন তো না যেন আমারি আপন ছোট বোন,সে সবসময় আমার পক্ষে support দিয়ে থাকে ,এবং তার ভাইয়ার বিরুদ্ধে যত অভিযোগ ,আর তার ভাইয়ার অভিযোগ হলো আমি বাসার বাকি তিন জন মানুষকে আমার করে নিয়েছি l এর চেয়ে বড় পাওয়া আমার মত অতি বাঙালি মনের মানুষের জন্য আর কি হতে পারে……..
এভাবেই চলছিল আমার জীবন ,সাথে চাকরিটাও l কখনো কোনো কারণে মন খারাপ হলে আমার গাড়ি নিয়ে চলে যেতাম driving এ l তবে যখন আমার খুব সিরিয়াস কষ্ট হত আমি কাউকে কিছু বলতাম না ,তখন ও গাড়ি নিয়েই বের হতাম ,অনেক rough driving করতাম l তখন ও ওর গাড়ি নিয়ে ঠিক আমার পিছন পিছন আসতো,একসময় আমার গাড়ি না থামিয়ে পারতাম না।

(২)
সেদিন একটু তাড়াতাড়ি office থেকে ফিরেছিলাম l নীল তখন ও বাসায় ফেরেনি ,আমি shower নিয়ে আমার খুব প্রিয় একটা শাড়ি পরেছি ,কপালে একটা লাল টিপ দিয়েছি ,কপালে টিপ পরতাম শুধুই নীল কে দেখাতে l ভিজা চুল আর হাতে এক মগ কফি নিয়ে আমার apartment এর বারান্দায় দাড়িয়ে নীলের কোথায় ভাবছি l ৩ বছর আগে নীল আমাকে এই শাড়িটা gift করেছিল,আমাদের প্রথম anniversary তে ,এক রঙা লাল শাড়ি ,তার পাড় ছিল কালো রঙের ,চার আঙ্গুল প্রশস্ত হবে ,তার শেষে খুব চিকন করে সোনালী জরি সুতার বর্ডার দেয়া ,আমার অনেক পছন্দের ছিল ,ও নিজেই পছন্দ করে কিনেছিল ,সম্পূর্ণ শাড়িটাতে লাল অংশ জুড়ে লাল সুতার এবং কালো অংশ জুড়ে কালো সুতার হাতের কাজ করা ছিল l New York কোনো এক বারান্দায় দাড়িয়ে নিজেকে আজ অনেক সুখী মনে হয় l অপেক্ষা করছি কখন নীল আসবে l
সে আমার নীল ,আমার আকাশ রঙিন করে দিল যে সে আমার নীল ….আমার জীবনের সবগুলো রংধনুর বাকি ছয়টি রং এই নীলের সাথে মিলে মিশে হয়েছে একাকার ………

রোজ সকালে ও ঘুম থেকে উঠার আগে আমি উঠে যায় ,বসে বসে ওকে দেখি ,কিভাবে ও ঘুমিয়ে আছে ,কখনো কখনো ও আমার উঠে যাওয়া টের পেয়ে যায় ,তখন আমার কলে মাথা রেখে ও ঘুমায় ,আমি চুপ করে ওকে দেখি অ ক প্রিয় মুহূর্ত আমার …….

বেল বেজে উঠল,ও এসেছে l সাধারণত আমি দরজা খুলতে গেলে আর আসে পাশে কেউ না থাকলে সে কিছুটা দুষ্টুমি করে ,I enjoy this sweet moment ……

তবে আজ নীল কে কিছুটা অন্যরকম লাগছে ,কিছুটা অচেনা l আমার শশুর শাশুড়ি গিয়েছেন দেশে ,বেড়াতে ,তবে ফুল যায়নি,আগেই বলেছি নীলের একটা ছোট বোন আছে ,ওর নামই ফুল l তবে এখন ফুল ও বাসায় নেই ,হয়ত ইচ্ছা করেই আমাদের একা থাকার সুযোগ করে দিয়েছে দুষ্টুটা l

কিন্তু আজ নীলের হলো কি ???৫ বছরের বিবাহিত জীবনে আজ আমার নীলকে সবচেয়ে অন্যরকম লাগছে ,ও আমার সাথে কথাও বলছেনা ,কিছুই জানতে চাইলাম না তবুও l ও shower নিল ,কফি দিলাম ,কিন্তু আজ প্রথম কফিটা পড়ে রইলো ,নীল বসলো ওর laptop নিয়ে l আজ আর ও আমার লাল টিপ দেখলনা ,নাম ধরে একবার ডাকলো ও না ,জানতেও চাইলনা আমি lunch করেছি কিনা l

প্রবাস জীবনে আজ প্রথম নিজেকে খুব একা লাগছে l আজ সে dinner করল একা l

ওর dinner শেষে ওকে কফি দিতে গিয়ে বললাম “Is there anything wrong with me ?”সে বলল nothing ,its ok

কিছু ভালো লাগছেনা ,কাউকে বলতেও পারছিনা ,এমনিতেও আমি sharing তেমন করতে পারিনা ,আর এটাত কেবলই আমাদের দুজনার বিষয় l
চুপ করে এবার আমি বারান্দায় দাড়িয়ে এই শহরের lighting দেখছি ,একসময় ফুল এসে পাশে দাড়ালো ,তাকে বললাম চল তোমাকে খাইয়ে দেই ,ও বলল পড়ে খাব ,তোমার সাথে কিছু কোথা ছিল ,আমি মৃদু হেসে বললাম ক্রেডিট কার্ড ফাঁকা ?ও বলল নাহ l তারপর ও নিজেই বলল ,ভাবি তোমার laptop এ আজ সকালে তুমি অফিসে যাওয়ার পড়ে একটা ছেলের ছবি দেখেছে ভাইয়া l এবার আর আমার কারণ বুঝতে বাকি নেই l আমি তখন চুপ l ফুল বলল আমি জানি তুমি কতটা শুভ্র ,হয়তবা ভাইয়া তোমাকে ভুল বুঝেছে ,আর এই জন্যই আমি আজ ভাইয়ার ফেরার সময় বাইরে ছিলাম যেন আমার সামনে তুমি বিব্রত না হও,কিন্তু আমি sorry যে আমি তোমাকে না বলে আর পারলাম না l Please ভাবি ,তুমি সব আবার আগের মত করে দাও l
রুম এ যেতেই ও বলল “তুমি অনেক ভালো অভিনয় জানো”l আমি থমকে গেলাম l এই ছিল তার বিশ্বাস আমার প্রতি ???যা কিনা একটা ছবি ভেঙ্গে দিতে পারে ???এমন ছবি তো থাকতেই পারে ,আমি প্রায় ই friend দের ছবি edit করে নিতাম l

পরিচয়ের শুরু ছিল facebook এ ,এবার facebook এ login করলাম ,তাকে লিখলাম “যার ছবি তুমি দেখেছ সে আমার একসময়ের friend ছিল ,তাকে আমার ভালো লাগত কিন্তু এর চেয়ে বেশি কিছু ছিলনা ,এই ধরনের তোমার কোনো দুর্বলতা ছিল কিনা সেই প্রসঙ্গ আর তুললাম না l যতই কষ্ট হোক হাসি মুখে মানিয়ে নেওয়া যদি অভিনয় হয় তবে তুমি ঠিকই বলেছ ,একটা degree তোমার আমার চেয়ে বেশি আছে ,একজন PhD holder তো ভুল করতে পারেনা,তবে আমাকে এতটা ছোট না করলেও হত l অন্য কেউ যদি থাকতই আমার তাহলে অন্তত কখনো না কখনো আমার behaviour এ তুমি ঠিকই বুঝতে l ”

বের হলাম আমার গাড়ি নিয়ে ,এই গাড়িই আমার প্রবাস জীবনের সর্বশেষ আশ্রয় ,কাকে আর বলব আমার কষ্টের কথা,মামা শুনলে খুবই কষ্ট পাবে ,আমার কষ্টে তারা আমার চেয়েও বেশি কষ্ট পাই ,আর অন্য কারো কাছে ওর সম্পর্কে কিছু বলার প্রশ্নই আসেনা l নিষিদ্ধ গতিতে USA র রাস্তায় আমার গাড়ি আজ চলছে ,হতেই পারে accident ………..

না,আজ আর আমার গাড়ির পেছনে সেই গাড়িটি নেই ,ফোনে নেই সেই sms “please বিপাশা speed কমাও”।

(৩ )
যখন আমার অবস্থা কিছুটা স্বাভাবিক তখন দেখি আমার এক পাশে মামনি বসে আছেন ,আমার মাথায় তার হাত ,আরেক পাশে কিছু রজনীগন্ধা ফুল ,তার পাশে আমার সেই আদরের ননদ ফুল ,ফুলের মুখটা কেমন ছোট্ট হয়ে আছে ,মনে হচ্ছে অনেকদিন ওকে দেখিনি ,কথা বলিনি l মনে হচ্ছিল ওর মুখটা একটু ছুয়ে দেখি আর বলি “আমি ভালো আছি তো, আমার কিছু হয়নি “,কিন্তু শক্তি হল না l মামনি বললেন এখন আমার কেমন লাগছে ,ব্যথা কমেছে কিনা ,আমি কথা বলতে পারিনি l

এতদিন তাকে কখনো শাশুড়ি ভাবিনি ,কিন্তু আজ ভাবছি l 4th year এ পড়ার সময় আমার এক classmate বলেছিল যেন এমন ছেলে বিয়ে করি যার বাবা মা নেই !!!আমি কথাটা মন থেকে পছন্দ করতে পারিনি l তবে সেতো ছাত্রী খারাপ ছিলনা ,তাই একটা যুক্তিও দিয়েছিল তার কথার পেছনে ,সেটা ছিল এমন -যদি এমন ছেলে বিয়ে করি যার বাবা মা নেই তাহলে সেই ছেলেই নাকি শুধুমাত্র আমার কষ্ট বুঝবে,শুধু আমাকেই ভালবাসবে l কি অসাধারণ যুক্তিটাই না ছিল ,তবে আমার ক্ষেত্রে গ্রহণযোগ্য মনে হয়নি ,কি জানি ….হয়ত ছাত্রী খারাপ তাই……

কিন্তু আজ আমি ভাবলাম ,চোখ খুলে যাকে দেখছি সে তো আমার শাশুড়ি ,কিন্তু একি …?এত আমার মায়ের ভূমিকায়…..আর যার আমাকে সবচেয়ে বেশি ভালবাসার কথা ,দেখি সে কিছুটা দুরে জানালার বাইরে তাকিয়ে আছে …..ভালো হয়ত বাসে আমাকে ……

মামনি আর ফুল চলে গেল ঘন্টা খানেক পরে,সে তখনও দাঁড়িয়ে l ওরা চলে যেতেই সে নিতান্ত অপরাধীর মত ধীর পায়ে আমার পাশে এসে আমার হাত ধরে কিছু একটা বলতে যাবে তখনি তাকে কিভাবে যেন বলেছিলাম “Its ok ……”

আসতে আসতে সেরে উঠলাম ,জানলাম আমি seriously injured ছিলাম ,৪৮ ঘণ্টা ICU তে ছিলাম ,আমাকে চার ব্যাগ রক্ত দিয়েছে ফুল আর মামনি lতবে বাসায় নীল আর ফুল ছাড়া আর কেউ জানেনা কেন আমি সেদিন ওভাবে বেরিয়েছিলাম l আরো আশ্চর্য হলাম যখন জানলাম মামনি একাই বাংলাদেশ থেকে আমার অসুস্থতার খবর পেয়ে জরুরিভাবে USA ফিরে এসেছেন ,বাবা একটা কাজের জন্য আসতে পারেননি ,তবে মামনি কে আসতে দিয়েছেন এটাও কম অবাক করা বিষয় নয় lকে বলে শশুর শাশুড়ি ভাল হয়না ???এই যে আমি কত সুখী ……

বাসায় ফিরলাম টানা এক সপ্তাহ হাসপাতালে থাকার পর l Shower নিলাম,ঘরে আসতেই নীল আমার কপালে টিপ পরিয়ে দিল,না,এ টিপ আমার সেই লাল টিপ না ,এ টিপ দেখা যায়না ,ছোঁয়াও যায়না ,শুধু অনুভব করা যায় ,চোখ বন্ধ করে,এ টিপ আমার কপালে শুধু নীল দিতে পারে ,শুধু ওর আর আমার অনুভব করার ……আজ ও আমাকে শাড়ি পরিয়ে দিল ,সারা শরীর জুড়ে আমার একরঙা নীল শাড়ি ,সঙ্গে ওর বানানো কফি …….এত ভালবাসে ও আমাকে ?

সন্ধায় দেখি মামার ফোন ,রিসিভ করতেই মামা বললেন “কিরে আম্মু এক সপ্তাহ তর কোনো ফোন নাই কেন ?”বুঝলাম তাদের জানান হয়নি ,খুশি হলাম ,আমি চাইনা আমার কষ্টের কথা তাদের জানান হোক ,আর এই জন্যই নীল নাকি জানাতে চাইনি l মামাকে বললাম ভালো আছি মামা,,কিছুদিন অসুস্থ ছিলাম,তাই ফোন দেওয়া হয়নি l মামা জানালেন পরের সপ্তাহে তিনি USA আসছেন ,আরো খুশি হয়ে গেলাম l

নীল যে আমার নানুর বাসায় কিছু জানায়নি তাতে ওর প্রতি আমার সম্মান আরো বেড়ে গেল ,সেতো মনে রেখেছে ঠিকই আমাদের বিয়ের দিনের কথা গুলো ……..
আমি তাকে বলেছিলাম “তোমার আমার প্রতি যা কিছু অভিযোগ আর যতই সমস্যা হোক না কেন ,অন্য কারো কাছে তুমি আমাকে ছোট করোনা ,যা শাস্তি দেওয়ার আমাকে দিও কিন্তু তুমি ছাড়া আর কেউ যেন না জানে”l

এইতো আমার সেই নীল ,হ্যা ,সে এখনো আমার আকাশের রং হয়েই আছে l

ওর সাথে যখন আমার প্রথম প্রথম পরিচয় ,তখন ও online দেখলেই আমার কেমন যেন লাগত ,খুশি হতাম ,তবে নিজে থেকে নক করতাম না ,ও নক করলে শুধু কথা বলতাম ,আবার ও চলে গেলে মনে হত আর কিছুক্ষণ থাকলে কি এমন হয় ?কিন্তু ভুলেও কখনো বলিনি l

সেদিন যখন গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে যায় তার পূর্ব মুহুর্তে আমার প্রতি ওর বিশ্বাস দেখে মনে হয়েছিল ,নীল আর আমার নেই ,নীল মনেহয় আমার আকাশের সবটুকু রং কেড়ে নিয়ে কেবল শূণ্যতায় আমাকে এবার nil করে দিল l তবে না, শেষ পর্যন্ত আমি শূণ্য হয়নি ,সে আমারই আছে …………..আমার হিয়ার মাঝে …..

এরমধ্যে আমার PhD র কাজে কিছুটা ঢিল পড়েছে ,সামান্য কিএছু কাজ বাকি আছে ,এবার সেদিকে মনোযোগ দিতে হবে l জীবনে তো কত কিছুরই সম্মুখীন হতে হবে ,তাই বলে তো থেমে যাওয়া যাবেনা ,সামনে এগিয়ে যেতেই হবে l

I need the best ending ….

(৪)
কাল ঈদ l আমি এখন New York এ,আমার সেই এপার্টমেন্ট এ ,নীল আর আমার এক ছাদের নিচে থাকার শুরু যেখানে ,সেই balcony টাতেই দাঁড়িয়ে আছি l এখানে দাঁড়িয়ে আমি প্রতিদিনই New York এর আকাশে সন্ধ্যা নেমে উপভোগ আসা করি l শহরটাকে দেখি l এখান থেকে যখন আমি চারপাশটাকে দেখি ,না,দেখি বললে ভুল হবে ,observe করি ,আমার ভাবতে ইচ্ছে করে ,পৃথিবীর সবাই অনেক সুখী ,কারো কোনো কষ্ট নেই ,কোথাও কোন গরিব মানুষ নেই ,বেকারত্বের কোন ছাপ মাত্র নেই কোথাও l হ্যা ,আজ এই অবস্থানে থেকে যে কোন মানুষেরই এগুলো ভাবা সহজ l কিন্তু আমার মনেহয় দিবা স্বপ্ন মানুষ তখনি দেখে যখন সে কাজহীন অলস সময় পার করে,আর কাজহীন অলস সময় বেকারত্বের অপর নাম l তাহলে বেকারত্ব আছে বৈকি l এবার যদি একটু কষ্ট করে আমেরিকা র পাশে ,বাংলাদেশ ,সোমালিয়া ,এসব জায়গার কথা ভাবি তাহলে কিছুটা আঁচ করা যাবে দারিদ্রতা,বেকারত্বের “dual song ” .

আমার পরিবার ,a couple of Engineer ‘s family .সারাজীবন চেষ্টা করেছি আমার যতই কষ্ট হোক ,তার প্রভাব যেন আমার পরিবারের ওপর না পড়ে,পড়তে দেইনি l I’ve a happy family . Family তো সুখী ,আমি সুখী তো ???

আজ ঈদের আগের দিন বাংলাদেশের এক ঈদের আগের দিনের কথা খুব মনে পড়ছে l ঈদের আগের রাত কে ওখানে বলে চাঁদ রাত ,আমার জীবনের সব চেয়ে অনাকাঙ্খিত ঈদ ছিল সেটা l শেষ রোযার দিন দুপুর ৩ টার পর আমার ঘুম ভাঙ্গে l কোন কারণে খুব বেশি কষ্ট পেয়েছিলাম ,মানতে পারিনি কিছুতেই ,কিছুক্ষণ পরপরই কেঁদেছিলাম l রাগ আর জিদ আমার কখনই কম ছিলনা ,কিন্তু প্রকাশভঙ্গিটা অনেক সুক্ষ্ম ,এবং জটিল,খুব সহজে সবার চোখে পড়ার কথা নয় l বরাবরের মত কারো হাতে আর সেবার মেহেদী পরাতে হয়নি ,সেদিন আমার অবস্থান ছিল নিতান্তই ইচ্ছার বিরুদ্ধে ,সাথে কিছুটা অভিমানও ছিল ,সেই কারণেই হয়ত দেশের বাইরে ঈদ করতে আর কষ্ট লাগছেনা এবার l সেই ঈদের কান্না হয়ত এই ঈদে নিজেকে সুখী ভাবার কারণ l সেবার চাঁদ রাত আর ঈদের কোন অনুভূতিই আমার ছিলনা,অনেক বিরক্তিকর ছিল সেই দুটো দিন ,ইন্টারনেট নিয়েই নিজেকে ব্যস্ত রাখা ছাড়া আর কোন উপায় ছিলনা l friend দের দেওয়া “Eid mubarak ” আমার অস্বস্তির কারণ ছিল ,উত্তর দিয়েছিলাম Thanking জানিয়ে ,সেটা তাদের ভালোলাগেনি ,অনেকেই অবাক হয়েছিল আমার কাছে এই অনাকাঙ্খিত উত্তর পেয়ে l

কি করব ,ঈদ ছিল অস্বস্তির বিষয় তখন ,তাহলে “Eid mubarak ” কথাটির এর চেয়ে ভালো কোন উত্তর আমি শিখব কিভাবে ???ঈদের দিন ঘুম ভাঙ্গে বেলা এগারটার পরে,হ্যা,খেয়েছিলাম একবার ,তারপর সারাদিন পার করেছিলাম ইন্টারনেটের সাথে ,ফোনে কিছু wish ছিল ,তবে অন্যান্য দিনের মত সেদিন আর আমার চ্যাট করতে ভালোলাগেনি l খুব ইচ্ছা ছিল বিকালে আব্বু আম্মু’র কাছে যাবো গোরস্থানে ,সেটাও হয়নি l ঈদের দিনও বার বার কেঁদেছিলাম ,নিজের অজান্তেই বার বার মন ভারী হয়ে উঠেছিল l ৫৫ দিনের ছুটিতে কিছু মানুষকে নতুন করে চিনেছিলাম ,বুঝেছিলাম ,মনে মনে কিছু সিদ্ধান্ত ও নিয়েছিলাম l আমাকে আরো বেশি কঠিন হতে শিখিয়েছিল সেই ৫৫ দিনের ছুটি l আর জীবনেও আমি ইমোশনের কাছে হারতে দেইনি বিবেক কে l

সেদিন থেকে আমার মন থেকে আত্মীয় আর অনাত্মীয়ের পৃথকীকরণ রেখাটা মুছে যায় ,দৃঢ় হয়ে উঠেছিল আমার নিজের অস্তিত্বের সংজ্ঞা l

আমার প্রায় প্রতিটা লেখায় আমি যাদের কথা অন্তত একবার হলেও বলতে চেষ্টা করি তা হলো আমার অনেক ভালো কিছু friend দের কথা ,হ্যা ,সেদিনও তারা চেষ্টা করেছিল আমাকে কিছুটা হলেও স্বাভাবিক করতে l এই ছিল সেবারের ঈদ l

আজ যখন দেশ মহাদেশ ছাড়িয়ে আমি New York এর এই আলো ঝলমলে সন্ধ্যায় দাঁড়িয়ে,দেখি একটুও ভুলিনি সেই দুটো দিনের কথা l নীল আর ফুল গিয়েছে শপিংএ ,আমার family ‘র সবচেয়ে আদরের মানুষ হচ্ছে এই ফুল,তার শখ হচ্ছে সে ঈদের ঠিক আগের দিন শপিং করবে ,তাই তারা শপিং করতে গিয়েছে ,ওরা অবশ্য আমাকেও সঙ্গে নিতে চেয়েছিল ,আমি যেতে চায়নি ,কারণ আমি সবসময় ই আমার জন্য নীলের পছন্দ দেখতে ভালবাসি ,ওর পছন্দেই বিভিন্ন অকেশনে নিজেকে সাজাতে ভালোলাগে l তবে বাংলাদেশের মত এখানেও যে আমি ঈদের মার্কেটের চেহারা দেখিনা তা নয় কিন্তু,শপিং আমিও কিছু করেছি ,মামনি ,বাবা ,নীল আর ফুল এর জন্য,অন্তত শপিং মল গুলোকে observe করা উচিত নয় কি?

নীল কে আমার জিন্স আর পোলো শার্ট এ অনেক সুন্দর লাগে l অবশ্য ওর জন্য আরো একটা গিফট আছে ,সেটা সিক্রেট থাক আপাতত l

মোটামোটি সব কাজ শেষ ,নীল আর আমি আমাদের রুমে ,নীলকে ওর জন্য কেনা গিফট গুলো দিলাম ,ও অনেক বেশি সারপ্রাইজড,ওর জন্য আমার সেই সিক্রেট গিফট টা ছিল একটা বই,বই সে খুব ভালবাসে । খুব খুশি হলে আসেপাশে কেউ না থাকলে ও যা করে সেটাই করল,আমার জীবনের সবচেয়ে আনন্দের মুহূর্ত সেটা ,নাহ, সেটা বলা যাবেনা …….

তারপর যা করল সেটা ছিল আরো মজার ,এই Ph .D ডিগ্রীধারী প্রকৌশলী নীল আহমেদ আমার সাদা হাত মেহেদিতে রাঙিয়ে দিচ্ছে,আমি আশ্চর্য হয়ে ওকে দেখছি ,ও মেহেদির টিউব ধরতে জানে ???আর ও যে কি ব্যস্ত হয়ে আমাকে রাঙাচ্ছে ! ও যতটা ব্যস্ত হয়ে আমাকে মেহেদীতে রাঙাচ্ছে আমি ঠিক ততটাই নিবিড়ভাবে ওকে দেখছি l …..ওর ব্যস্ততাটাও একটা আর্ট l

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

− 1 = 5