ভেঙে তোর ঘরের তালা, মুক্তি এনে কেউ দিবে না!

শক্তিমানের অত্যাচার, ঘৃণা, বিদ্বেষ সব সময় এক রূপে আসে না। যুগে যুগে সে তার রূপ বদলায়। এক দেশের হয়ে অন্য দেশে সে থাবা বসায়। দাপিয়ে বেড়ায় নিজের দেশের মধ্যেও। কিন্তু ঘরের দিকে, শেকড়ের দিকে তার নজরটা একটু বেশিই থাকে। কারণ সেটা তার ভিত্তিমূল।

আমাদের সমাজব্যবস্থা পুরুষতান্ত্রিক। পুরুষ এখানে কর্তা। পুরুষই প্রভু- সবকিছুর নির্ধারক। নারী তার ঘরের মানুষ- সেবাদাসী। তাই নারীর প্রতি তার আর যাই থাকুক কোনো শ্রদ্ধাবোধ নেই। কিন্তু সমাজ পাল্টে যাচ্ছে দ্রুত। নারীরা তাদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন হচ্ছে। শিখছে লেখাপড়া, হচ্ছে স্বাবলম্বী, রাখছে প্রতিভার স্বাক্ষর। এতে শঙ্কিত হয়ে পড়ছে পুরুষপ্রধান সমাজ। নারীকে এখন আর তার কাছে সহজলভ্য মনে হচ্ছে না। তাই নারীকে আবার সমাজের পুরনো বৃত্তের মধ্যে ফিরিয়ে নিতে তার উদ্যোগের অভাব নেই। অভিনব পদ্ধতিতে চালানো হচ্ছে নারীবিরোধী প্রচারণা ও কর্মকাণ্ড।

ফলাফল হচ্ছে, এই আধুনিককালে ২০১৩ সালে আমাদের দেশে ৪ হাজার ৭৭৭ জন নারী নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে এক হাজার ৩৮৭ জন আত্মহত্যা বা রহস্যজনক মৃত্যুর শিকার হয়েছেন। মোট ৮১২ জন নারী ধর্ষণ ও গণধর্ষণের শিকার হন। এর মধ্যে ধর্ষণ পরবর্তী সময়ে ৮৭ জনকে হত্যা করা হয় এবং আত্মহত্যা করেন ১৪ জন। ৭০৩ জন যৌতুক ও পারিবারিক সহিংসতার শিকার হয়েছেন। পাশাপাশি ৪৪ জন এসিডদগ্ধ এবং ৭৮ জন গৃহকর্মী নির্যাতনের শিকার হয়েছেন।

কেন এমন হচ্ছে? ছেলেবেলা থেকেই পরিবার, সমাজ থেকে ছেলেরা নারীকে ছোট করে দেখা ও তাদের প্রতি সহিংস মনোভাব নিয়ে বেড়ে উঠছে। যার প্রকাশ ঘটতে দেখা যাচ্ছে এ ঘটনাগুলোতে। দেশ এগুচ্ছে ঠিকই। সাথে সাথে প্রলম্বিত হচ্ছে নারীর দুর্ভাগ্য। আধুনিকতার রেশ নারীকে অনেক ক্ষেত্রে মুক্তি যেমন দিয়েছে, তেমনি নতুন শেকলও পরিয়েছে।

ইন্টারনেট প্রযুক্তি হলো বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে দ্রুততম ও অত্যাধুনিক একটি যোগাযোগ মাধ্যম। আজকের বিশ্বটা তথ্যপ্রযুক্তির জোয়ারে ভাসছে। ই-মেইল, ইন্টারনেট, মেসেঞ্জার, স্কাইপ, ৪র্থ প্রজন্মের প্রযুক্তি- এসব আজ পৌঁছে গেছে সারাবিশ্বের দুয়ারে দুয়ারে। বাঁধ ভাঙ্গা জোয়ারের মতোই আমাদের জীবনের প্রতিটি অংশে আমরা পাচ্ছি এসব প্রযুক্তির ছোঁয়া।

পুঁজি বিকাশের ধারায় বর্তমানে পাশ্চাত্যপন্থী বিকৃত মন-মানসিকতাসম্পন্ন একশ্রেণীর মানুষ অভিনব পদ্ধতিতে নারীকে জঘন্যতম ব্যবসায়িক ভোগ্যপণ্যে অর্থাৎ যৌনযন্ত্রে পরিণত করছে। এর অংশ হিসেবে ইন্টারনেটে খোলা হচ্ছে অসংখ্য ওয়েবসাইট। নারীর জীবনকে অসহনীয় করে তুলতে বহুমুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করছে এই বিকৃত মানসিকতাসম্পন্ন শ্রেণীটি। আরো অনেক নারীবিরোধী কাজের পাশাপাশি তারা করছে জঘন্য একটি কাজ। বিভিন্ন সাইটে তারা টুকে দিচ্ছে মেয়েদের সেল ফোন নম্বর। নাম ও সেল ফোন নম্বরের পাশাপাশি তারা জুড়ে দিচ্ছে সংশ্লিষ্ট মেয়েটির চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য। এমনকি পরামর্শও দেয়া হচ্ছে কীভাবে তাকে ঘায়েল করা যাবে। এর ফলে শিক্ষিত নারীরা আগে যেখানে তুলনামূলক বেশি সুযোগ সুবিধা ভোগ করতেন, এখন তাদের অনেককেই আরো নিয়ন্ত্রিত ও কঠোর জীবন যাপনের মধ্য দিয়ে যেতে হচ্ছে। পরিবারে সইতে হচ্ছে গঞ্জনা।

পশ্চিমা অ্যাডভেঞ্চারিস্ট মনোভাব এবং এক্সট্রিমিটি তথা কল্পনায় সবকিছু ভেঙে ফেলার এক নির্বোধ ভাবধারার বিকাশ আমাদের সমাজেও ঘটেছে। ফলে বাস্তব জগতে না পেরে ইন্টারনেটে এসে অনেকে নিজের জগত গড়ছেন। সেখানেই বুনে দিচ্ছেন তার নষ্ট চিন্তা চেতনার বীজ। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে ব্যবসা। নামি দামি সাইটগুলোও সাইটের আনাচে কানাচে নারীর ছবি জুড়ে দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে, সুন্দরীতমার কোন অংশটা বেশি কমনীয়, মোহনীয়। ইন্টারনেটে নারীবিরোধী তৎপরতা তাই দিনকে দিন বাড়ছে।

ভারতীয় সমাজবিজ্ঞানী প্রশান্ত রায় বলেছেন, ‘বুদ্ধি, প্রযুক্তি, ক্ষমতায় যারা দাপিয়ে বেড়ায় তাদের সংস্কৃতিই বিশ্ব সংস্কৃতি।’ পশ্চিমা বিশ্ব, বিশেষ করে আমেরিকা আজ সারা বিশ্বের একক পরাশক্তি হবার ফলে তাদের সংস্কৃতি অবাধে ছড়িয়ে পড়ছে পৃথিবীর আনাচে কানাচে। পুঁজির চরম বিকাশের যুগে মার্কিন সমাজে দেখা দেয় এক ধরনের অস্থিরতা। এর মধ্য দিয়ে পারিবারিক বন্ধন ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়ে । ফলে ব্যাহত হয় স্বাভাবিক বিকাশ। মার্কিন সমাজে এখন ঘুরে বেড়াচ্ছে এক ঝাক অপ্রকৃতিস্থ মানুষ। যেহেতু মার্কিনিরাই এখন সারা দুনিয়ার হর্তাকর্তা, তাই এই মানুষগুলোর কর্মকাণ্ড ছড়িয়ে পড়ছে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে। আর পশ্চাৎপদ সমাজের মানুষেরা ওই সমাজকে ‘অগ্রসর’ জ্ঞান করে চর্চা করছে তাদের এসব বিকৃত সংস্কৃতি। আমাদের দেশেও এ ধরনের প্রবণতা বেশ প্রকট আকার ধারণ করেছে। তবে আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতিও মিশেছে এর সঙ্গে।

একটা সময় ছিল যখন আমরা দেখতে পেতাম, টাকার ওপরে মেয়েদের নাম, পরিচয়, ঠিকানা এবং ওই মেয়েদের সম্পর্কে অনেক অশ্লীল উক্তি লিখে দেয়া হতো। এরপর বাড়তে লাগল সেল ফোনের ব্যবহার। তখন দেখা গেল শুধু টাকায় নয়, বাসস্টপে, ট্রেনের কামরায়, বিদ্যালয়ের টয়লেটের দেয়ালে, পাবলিক লাইব্রেরির বইয়ের পাতায় লিখে রাখা হচ্ছে মেয়েদের সেল ফোন নম্বর, নাম ও ঠিকানা। এখন যুগ আরো আধুনিক হয়েছে। সারা বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগুচ্ছে আমাদের দেশও। কিন্তু কোন পথে এগুচ্ছে তার প্রমাণ তো নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতার হিসাব হেকেই মিলছে। এখন নারীবিরোধী তৎপরতা ইন্টারনেট অবধি গিয়ে ঠেকেছে।

যদি আমরা সমাজে নারীর মুক্তি ঘটাতে না পারি, তাহলে ইন্টারনেট ব্যবহার করে নারীর ওপর নিপীড়নও রোধ করা যাবে না। কারণ ইন্টারনেটের সবকিছুই আসছে সমাজ থেকে। আমাদের সমাজে আবার অনেক কিছু আসছে পুঁজিবাদ নিয়ন্ত্রক রাষ্ট্রগুলো থেকে। নারীকে তাই এখন অনেকগুলো ফ্রন্টে লড়াই চালাতে হবে। পরিবার, গ্রাম, শহর, দেশ, কাল সীমানার গন্ডি নারী অনেক আগেই পেরিয়ে গেছে। তবু তার মুক্তি আসেনি। অনেক নারী মহান হয়েছেন। আলো ছড়িয়েছেন। কিন্তু নারীরা এখনো অন্ধকার ঘরের কোণে মুখ গুঁজে কাঁদছেন। এর বিরুদ্ধে তাদের মুখ খুলতে হবে। মাঠে ঘাটে সোচ্চার হতেই হবে। ছড়িয়ে দিতে হবে মুক্তির ইশতেহার। লড়াই ছাড়া, ঘরে বসে কল্পনার জাল বুনে মুক্তির কোনো উপায় নেই। আর যে পুরুষেরা পুরুষতন্ত্রের দায় থেকে মুক্তি চাইছেন তাদের হতে হবে আরো বেশি সক্রিয়। প্রত্যেকে এগিয়ে আসুন। নারী নিপীড়নের বিরুদ্ধে সোচ্চার হোন।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

৮ thoughts on “ভেঙে তোর ঘরের তালা, মুক্তি এনে কেউ দিবে না!

  1. ফলাফল হচ্ছে, এই আধুনিককালে

    ফলাফল হচ্ছে, এই আধুনিককালে ২০১৩ সালে আমাদের দেশে ৪ হাজার ৭৭৭ জন নারী নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে এক হাজার ৩৮৭ জন আত্মহত্যা বা রহস্যজনক মৃত্যুর শিকার হয়েছেন। মোট ৮১২ জন নারী ধর্ষণ ও গণধর্ষণের শিকার হন। এর মধ্যে ধর্ষণ পরবর্তী সময়ে ৮৭ জনকে হত্যা করা হয় এবং আত্মহত্যা করেন ১৪ জন। ৭০৩ জন যৌতুক ও পারিবারিক সহিংসতার শিকার হয়েছেন। পাশাপাশি ৪৪ জন এসিডদগ্ধ এবং ৭৮ জন গৃহকর্মী নির্যাতনের শিকার হয়েছেন।

    যদি আমরা সমাজে নারীর মুক্তি ঘটাতে না পারি, তাহলে ইন্টারনেট ব্যবহার করে নারীর ওপর নিপীড়নও রোধ করা যাবে না। কারণ ইন্টারনেটের সবকিছুই আসছে সমাজ থেকে। আমাদের সমাজে আবার অনেক কিছু আসছে পুঁজিবাদ নিয়ন্ত্রক রাষ্ট্রগুলো থেকে। নারীকে তাই এখন অনেকগুলো ফ্রন্টে লড়াই চালাতে হবে। পরিবার, গ্রাম, শহর, দেশ, কাল সীমানার গন্ডি নারী অনেক আগেই পেরিয়ে গেছে। তবু তার মুক্তি আসেনি। অনেক নারী মহান হয়েছেন। আলো ছড়িয়েছেন। কিন্তু নারীরা এখনো অন্ধকার ঘরের কোণে মুখ গুঁজে কাঁদছেন। এর বিরুদ্ধে তাদের মুখ খুলতে হবে। মাঠে ঘাটে সোচ্চার হতেই হবে। ছড়িয়ে দিতে হবে মুক্তির ইশতেহার। লড়াই ছাড়া, ঘরে বসে কল্পনার জাল বুনে মুক্তির কোনো উপায় নেই। আর যে পুরুষেরা পুরুষতন্ত্রের দায় থেকে মুক্তি চাইছেন তাদের হতে হবে আরো বেশি সক্রিয়। প্রত্যেকে এগিয়ে আসুন। নারী নিপীড়নের বিরুদ্ধে সোচ্চার হোন।

    সমসাময়িক সমস্যার চমৎকার অনুরণন পেলাম লেখায়। লেখককে সাধুবাদ। এ ধরণের আরো লেখার প্রত্যাশা থাকলো লেখকের প্রতি। ধন্যবাদ

  2. সমসাময়িক প্রেক্ষাপট বিবেচনায়
    সমসাময়িক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় গুরুত্বপুর্ন লেখা। আনিস ভাইকে ধন্যবাদ। আমাদের চারপাশেই আছে কিছু অনলাইন ধর্ষক। এদের সম্মিলিতভাবে প্রতিহত করতে হবে।

  3. আনিস, ভালো লেখা হয়েছে ।
    আনিস, ভালো লেখা হয়েছে । সমস্যা টির একটি ছবি পাওয়া গেলো । একটা বিষয় সত্যি তা হচ্ছে, নারী র উপরে এই সমস্ত অন্যায় আচরনের সংখ্যার সাথে নারীর প্রতি রাস্ট্রের দৃষ্টিভঙ্গির একটা সম্পর্ক আছে । যে দেশ গুলো তে নারীর প্রতি সহিংসতা ও অন্যায় আচরনের নজির খুব ই কম, নারীর প্রতি সেই দেশ গুলোর রাষ্ট্রীয় দৃষ্টিভঙ্গি হচ্ছে extreme care আর নারীর প্রতি সহিংসতার বিরুদ্ধে zero tolerance ……. ! আমাদের দেশে এই দুইটি বিশয়ের অভাব । এখানে রাষ্ট্রের দায়িত্ব হচ্ছে আইন প্রনয়ন পর্যন্ত, যে আইন অপরাধির শরীর স্পর্শ করতে পারে না । আর রাজনৈতিক – সাংস্কৃতিক অবক্ষয় তো আছেই …… ধন্যবাদ একটি ভালো লেখার জন্যে ।

  4. আধুনিকতার রেশ নারীকে অনেক

    আধুনিকতার রেশ নারীকে অনেক ক্ষেত্রে মুক্তি যেমন দিয়েছে, তেমনি নতুন শেকলও পরিয়েছে।

    সমসাময়িকতার প্রেক্ষিতে চমৎকার একটি লেখা… :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ:

  5. এই সময়ের জন্য গুরুত্বপুর্ণ ও
    :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ:
    এই সময়ের জন্য গুরুত্বপুর্ণ ও চমৎকার একটি পোস্ট। বিষয়টা নিয়ে কথা কিছু কথা বলার ইচ্ছে থাকলেও সময়াভাবে এই মহুর্তে বলা হল না। সময় করে আলোচনায় আসার আশা রাখি।

  6. ডিজিটাল যুগ! তাই ডিজিটাল
    ডিজিটাল যুগ! তাই ডিজিটাল পদ্ধতিতে চলে নারীর উপর আক্রমণ। উপার্জনকারী নারীরাও শিকার হয় নিরজানতের , অফিসে বা বাসায়।
    যুগ পালটায়, মানসিকতা পালটায় না।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

+ 45 = 50