উন্মাদ লেখক -প্রকাশক : ফেব্রুয়ারি -ই কি উন্মাদ নৃত্যের একমাত্র সময়?

আমাদের কি কাউকে ধ্রুব ভাববার প্রয়োজন আছে? বোধ করি না। বিশেষ মতবাদ কিংবা প্রতিষ্ঠান তো তালিকার বাইরে। তাইতো সুবিধাবাদীদের ভীড়েও মাঝে মধ্যে দু একটি হক কথা স্পর্ধার সাথে বলার সাহস রাখি। একে ঔদ্ধত্য ভাবলে করার কিছুই নেই। কপট বিনয় অপেক্ষা সরল ঔদ্ধত্য শ্রেয়।
এখন কথা হল বই নিয়ে, বইমেলা নিয়ে। আমার মত পুস্তকপ্রেমী এবং বই নিয়ে যাদের কারবার তারা নিশ্চয়ই সারা বছর অপেক্ষা করে থাকেন এই বইমেলার জন্য। কেন থাকবো না? যন্ত্রচালিত এ যুগে ছাপাখানায় ছাপানো বইয়ের আবেদন আরও প্রবল এদেশে। নিঃসন্দেহে আশার কথা। আমাদের জাতিস্বত্তার স্বাতন্ত্রের পরিচায়ক এই মেলা। যাই হোক, প্রতি বছর নবীন প্রবীণ সকল লেখক বিপুল উৎসাহ নিয়ে নতুন নতুন বই প্রকাশ করেন। নতুন বইয়ের প্রকাশ অবশ্যই আমি স্বাগত জানাই। তবে বই প্রকাশের নামে প্রতি বছর কত আবর্জনা সৃষ্টি করছেন আমাদের প্রকাশকরা তা কি একবার ভেবে দেখেছেন? গত বছর মানে ২০১২ সালে কেবল ফেব্রুয়ারির বই মেলায়ই নতুন বেরিয়েছে ৫০০০ বই। এবারের পরিসংখ্যান সঠিক জানা নেই। তবে এর মতোই হবে সংখ্যাটি। কথা হচ্ছে, কারা লিখল এত বই? যদি ধরে নেই দেশে লেখার মত মানুষ চক্রবৃদ্ধি হারে বেড়ে চলেছে তাহলে প্রশ্ন থাকে এই লেখকদের ৯০ ভাগই কেন বছরের অন্যান্য সময় শীতনিদ্রায় চলে যান? কেন ফেব্রুয়ারি আসলেই তাদের লেখক হওয়ার খায়েশ জাগে?
আরেকটি উল্লেখযোগ্য ব্যাপার হল প্রতি বছর বই প্রকাশের দিক দিয়ে অনেক অনেক এগিয়ে থাকেন কবিকুল। অথচ আশির দশকের পর থেকে বাংলা কবিতার কি উল্লেখযোগ্য কোন পরিবর্তন ঘটেছে? অন্তত চিন্তা ভাবনার দিক দিয়ে? সম্ভবত না। বরং এক সময়, পাঠকদের একটা বড় অংশ ছিল কাব্যপ্রেমী। আর এখন? যে কবিতা লেখে, সে -ই কেবল কবিতা পড়ে। কবিতা পাঠকের চেয়ে কবি বেশী। আর এ অবস্থার জন্য আধুনিক কবিদের কম দায় নেই। ব্যক্তিগত কথাকাব্য, ইচ্ছাকৃত অস্পষ্টতা কবিতাকে করে তুলেছে একঘেয়েমি। কবিতা হারিয়েছে তার বহু পাঠক। তবুও বিপুল উৎসাহে প্রতি বছর কবিরা বের করছেন অজস্র কাব্যগ্রন্থ যার বেশীরভাগই হাতে নেওয়ার মত না। মূলত কবিতাকে এখন বিবেচনা করা হয় অলস মস্তিষ্কের সাজানো শব্দ হিসেবে। সস্তায় কবি উপাধি ধারনের জন্য তাড়াহুড়ো করে তরুনরা রচনা করে চলেছে একের পর এক অখাদ্য।
গল্পগ্রন্থের বেলায়ও অনেকটা এই কথা খাটে। নিরীক্ষার নামে উৎপাদিত হয়ে চলছে অসংলগ্ন শব্দগুচ্ছ। যদিও এই নিরীক্ষা বাংলা ছোটগল্পকে দিয়েছে নতুন মাত্রা। নিরীক্ষার সংজ্ঞা অজানা থাকায় কিংবা বিকৃতভাবে জানার কারনে রচিত হয় গল্পগ্রন্থ নামের আবর্জনা।
গবেষণা গ্রন্থের বড় অভাব। যদিও ‘অস্তিত্ব ও আত্নহত্যা ‘ধরনের বই মাঝে মাঝে আমাদের আশা জাগায়। গবেষণা গ্রন্থ লিখতে যে পরিমাণ পরিশ্রম, সময় দিতে হয় তা দিতে নারাজ অনেকেই। আবার অনেক ক্ষেত্রে গবেষণা গ্রন্থ পরিণত হয় পাদটীকায় জর্জরিত পুস্তকে। যার আট দশ পৃষ্ঠা পর এগোনো যায় না কোন মতেই।
একমাত্র উপন্যাস ই টিকিয়ে রেখেছে বাংলা সাহিত্যকে পাঠকের কাছে। নতুন চিন্তা, নতুন তত্ত্ব, নতুন বিনির্মান উপন্যাসকে দিনে দিনে করে তুলেছে সমৃদ্ধ।
ফিদেল ক্যাস্ত্রো সাংবাদিক গিয়ান্নি মিনাকে এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘কাগজ, কালি খরচ করে অজস্র বই ছাপানোর বিলাসিতা কিউবায় সাজে না। তাই দেখবেন আমাদের দেশে বই নামক কোন অখাদ্য জন্মাতে দিই না। একমাত্র মানসম্পন্ন বই -ই শেষ পর্যন্ত প্রকাশের মুখ দেখে। ‘
শেষে প্রশ্ন রেখে যাচ্ছি, আমাদের মত নিম্ন আয়ের একটি দেশে প্রতি বছর হাজার হাজার পুস্তক নামের অচল দ্রব্য উৎপাদন কতটা যৌক্তিক?

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

২ thoughts on “উন্মাদ লেখক -প্রকাশক : ফেব্রুয়ারি -ই কি উন্মাদ নৃত্যের একমাত্র সময়?

  1. শেষে প্রশ্ন রেখে যাচ্ছি,

    শেষে প্রশ্ন রেখে যাচ্ছি, আমাদের মত নিম্ন আয়ের একটি দেশে প্রতি বছর হাজার হাজার পুস্তক নামের অচল দ্রব্য উৎপাদন কতটা যৌক্তিক?

    :ভাবতেছি: :ভাবতেছি: :ভাবতেছি:

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

+ 60 = 68