উপনিবেশ নিপাত যাক। মাতৃভাষা মুক্তি পাক।

এক
বাঙলা ভাষার আধুনিকায়ন ও বিকাশের সাথে সাম্প্রদায়িকতা ও উপনিবেশের সম্পর্ক কি? ভাষা, সাম্প্রদায়িকতা, উপনিবেশ আপাত সম্পর্কহীন এই তিনটা বস্তুর মাঝে সম্পর্ক খুজতে গেলে সেইটা আর যাই হউক বাঙালির কাছে দোষের মনে হওয়ার কথা না। বিশেষ করে একবিংশ শতকে ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসকে ৩০ মিনিটের কর্পোরেট বন্দিত্বের বাইরে নিয়া এর ধারাবাহিক সংগ্রামের ইতিহাসকে বিবেচনা করলে ভাষা বনাম ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতার ইতিহাসটা আমাদের সবারি কম বেশি জানা। ধর্মের মুলা ঝুলিয়ে একটা জাতির ভাষা ও ঐতিহ্য নাই করে দেয়ার ষড়যন্ত্র বাংলাদেশের জনগণ মেনে নেয় নাই। সতর্ক ব্যক্তি মাত্র ভাষা আন্দোলনের এই ইতিহাসের ভেতরে শুধুমাত্র সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে লড়াইই না, বরং ঔপনিবেশকতার বিরুদ্ধে বি-উপনিবেশায়নের সংগ্রামী পথ চলা খুঁজে পাবেন। একবিংশ শতকের দুনিয়ায় সাম্রাজ্যবাদের সামরিক ও অর্থনৈতিক রূপের পেছনের ঐতিহ্যটাই উপনিবেশের। ভিন জাতির ভাষা আর ঐতিহ্যকে ধ্বংস করে সামরিক ও অর্থনৈতিক সাম্রাজ্য সুসংহত করা এই উপনিবেশের সংস্কৃতি। বাঙালির ৫২এর ভাষা আন্দোলনকে তাই সাম্প্রদায়িকতা এবং উপনিবেশ এই দুইয়ের বিরুদ্ধেই সংগ্রাম বলা যায়।

কিন্তু বাঙলা ভাষার উপর ঔপনিবেশিক আগ্রাসনের ইতিহাসটা যদি পাকিস্তান আমলের চেয়ে আরেকটু পেছনে টানি তাইলে কি হয়? পাকিস্তান রাষ্ট্রটাতো ব্রিটিশ রাজের নিল নকশা আর মার্কিন সাম্রাজ্যের আঞ্চলিক প্রতিনিধি ছাড়া ভিন্ন কিছু ছিলনা সেইসময়। বাঙলা ভাষার উপর উপনিবেশ আর সাম্প্রদায়িকতার আগ্রাসনটা কি হঠাৎ করে পাকিস্তান আমলেই উদ্ভব হয়েছে? ১৮০১ থেকে ১৮৭০ সাল পর্যন্ত ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক কর্তৃত্ত্বে চলে বাঙলা ভাষার আধুনিকায়ন ও শুদ্ধিকরণের কাজ, আর এই কাজে নেতৃত্ব দেয় এমন এক শ্রেণী যারা দীর্ঘকাল বাঙলা ভাষাকে অবজ্ঞা করে এসেছে। এরা বাঙলার ব্রাহ্মণ্যবাদী শ্রেণী। যে ব্রাক্ষ্মন শ্রেনী ঔপনিবেশিক শাসনামলের কিছুদিন আগেও নির্ভুল বাঙলা লিখতে পারাকে লজ্জ্বা ও অগৌরবের ব্যাপার বলে চিহ্নিত করতো, যারা এক কালে বাঙলা ভাষায় ধর্মচর্চাই নিষিদ্ধ দাবি করতো, তারাই হাতে তুলে নেয় বাঙলা ভাষার শুদ্ধিকরণ!এর কাজ। আর এই শুদ্ধিকরণ প্রবল সাম্প্রদায়িক অবস্থান থেকে করা হয়েছিল জবন, ম্লেচ্ছদের হাত থেকে বাঙলা ভাষাকে রক্ষার মিশনে নামা হয়েছিল। বাঙলা ভাষার শুদ্ধিকরণের নামে অতি সংস্কৃত নির্ভর যেই ভাষাকে তারা বাঙলা ভাষা বলে হাজির করেছেন তার সাথে এই দেশের গণমানুষের সম্পর্কযে কত ক্ষীণ তা ভাষার ব্যবহার, উনবিংশ শতকের এবং বিংশ শতকের বরেণ্য সাহিত্যিকদের সংস্কৃত নির্ভর সাহিত্যের দুর্বোধ্যতা থেকে সহজেই ধারণা পাওয়া যায়। সেইসাথে আজো মধ্যবিত্ত্ব শিক্ষিত বাঙালির সাহিত্য চর্চা কেনো আপামর বাঙালির সাহিত্য হয়ে ওঠে নাই সেই প্রশ্নের জবাবও কম বেশি পাওয়া যায়। যে সংস্কৃত পন্ডিত মৃত্যঞ্জয় বিদ্যালঙ্কার বাঙলা ভাষায় কোনদিন সাহিত্য রচনা করেন নাই, ফোর্ট উইলিয়াম কলেজে তার উপরি দায়িত্ব পরে বাঙলা গদ্যের নমুনা তৈরির।

বাঙলা ভাষার একেবারে আদিপর্বে তথাকথিত অনুন্নত বাঙলা ভাষায় রচিত চর্যাপদে বিভিন্ন চর্যায় যেখানে ৭০% এর বেশি বাঙলা শব্দের ব্যবহার পাওয়া যায় সেইখানে আধুনিক যুগের সংস্কৃত বহুল বাঙলা ভাষার কোন গদ্যে ৭০% বাঙলা শব্দ খুঁজে পাওয়া দুরূহ হবে। আর বাঙলা ভাষার উপর এই প্রবল ঔপনিবেশিক এবং সাম্প্রদায়িক আগ্রাসনটা ঘটে গেছে উনবিংশ শতকের ৭০ বছরের সময়কালে। আমাদের ভাষা আন্দোলনের চেতনার জায়গা থেকে এই আগ্রাসনকে চিহ্নিত করা ও তার বিরুদ্ধে লড়াই গড়ে তোলা জরুরি।

দুই
ভাষাতাত্মিকরা হিন্দী আর উর্দুকে একই ভাষার দুই ডায়ালেক্ট বলে স্বিকার করেন। দুটি ভাষাই উত্তর ভারতীয় প্রাকৃত ডায়ালেক্ট খাড়ি-বলীর সাথে ফারসী ভাষার প্রভাবে সৃষ্ট ভাষা। হিন্দি আর উর্দুর মূল পার্থক্য হলো হিন্দির চেয়ে উর্দুতে ফারসী ভাষার প্রভাব বেশি। ভারতীয় উপমহাদেশ যেহেতু ইউরোপিয় জ্ঞানে একটা মাত্র দেশ, যে দেশের নাম “ইন্ডিয়া”, তাই সেই বিশাল দেশকে ইংরেজি ভাষার মাধ্যমে একদেশে পরিণত করার চেষ্টা চালায় ইংরেজরা। তবে নিজেরা ইংরেজি শিক্ষিত হলেও ব্রিটিশদের কড়ি-বর্গারা এই কাজে ব্যাবহার করার চেষ্টা করেছে হিন্দি/উর্দু ভাষাকে। সেই ১৯১৮ সালেই মহাত্মা গান্ধি প্রতিষ্ঠা করেন “দক্ষিন ভারত হিন্দি প্রচার সভা”, উদ্দেশ্য ছিলো দক্ষিন ভারতের মানুষকে হিন্দুস্তানী ভাষায় শিক্ষিত হতে প্ররোচিত করা, ভারতিয় উপমহাদেশে অন্য সব ভাষা, অন্য সব সংস্কৃতি ধ্বংস করে এক ভাষার এক জাতি প্রতিষ্ঠা করা। মহাত্মা গান্ধি আর জওহরলাল নেহেরু দুজনেই চাইতেন এক ভাষার এক জাতির হিন্দুস্তান প্রতিষ্ঠা করতে। ১৯২৫ সালে ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল কংগ্রেসে ইংরেজির বদলে হিন্দি ভাষার প্রচলন শুরু করা হয়। তবে এধরণের আগ্রাসী প্রচেষ্টার প্রতিবাদ হয় করা হয় একেবারে প্রথম থেকেই। তামিল ভাষী রাজনীতিক পেরিয়ার রামাসামি এর প্রতিবাদ করেন সেই শুরুর দিকেই।

তিন
শুধু বাঙালির বাঙলা ভাষার অধিকারএর জন্যে ভাষা আন্দোলন সংগঠিত হয় নাই, গোটা পাকিস্তানের সকল জাতির ভাষার অধিকারএর জন্যে ভাষা আন্দোলন হয়েছে, একাধিক ভাষা সৈনিক তাদের লেখা ও বক্তব্যে এই বিষয়টি জানিয়েছেন। ভাষা আন্দোলনের চেতনা আসলে কি জিনিস সেটা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে এই কথাটি এসেছে। একাত্ত্বরের মুক্তিযুদ্ধও কেবল বাঙালির একলার মুক্তি সংগ্রাম ছিলনা। ভারতিয় উপমহাদেশের তাবৎ জাতির, তাবৎ মানুষএর উপর ঔপনিবেশিক শোষন বঞ্চনার বিরুদ্ধে বাঙালি ছিল ভ্যানগার্ড, অগ্রসৈনিক। বাঙালির মুক্তি সংগ্রাম ভারতিও উপমহাদেশের ঔপনিবেশিক শোষক এবং তাদের দালাল সাম্প্রদায়িক রাজনীতির ধ্বজাধারীদের বিরুদ্ধে যে যুদ্ধ ঘোষনা করে, যেই স্বাধীনতা ও অধিকারএর স্বপ্ন বাঙালি ফেরি করে বেরায় সেই স্বপ্ন কিনে সংগ্রামে সামিল হতে পারতো আসাম, নাগাল্যান্ড, বালুচ, ভারতবর্ষের তাবৎ বঞ্চিত জাতি গোষ্ঠি। বাঙালি একজাতি তত্ত্ব অস্বিকার করেছে, বাঙালি দ্বিজাতিতত্ত্বও অস্বিকার করেছে। এই কারনে আমরা বাংলাদেশ পেয়েছি। এই দুইটার একটাও যদি স্বিকার করতাম তাইলে আমরা বাংলাদেশ পাইতাম না। সুতরাং মুসলমানী ব্রাদারহুডএর ধুয়া তুলে যারা একাত্ত্বরে পাকিস্তানের সাপোর্ট করেছে এবং এখনো রাজনীতি এবং খেলা থেকে শুরু করে নানান ইস্যুতে পাকিস্তানএর প্রতি ব্রাদারহুড অনুভব করেন তারা বাঙালির মুক্তিসংগ্রামএর চেতনার ধারক হতে পারেন না, এরা রাজাকার। এরা পেছনে হেটে গিয়ে একাত্ত্বর আর বায়ান্ন অস্বিকার করে দ্বিজাতিতত্ত্বের জয়গান গাইতে চান। এরা আমাদের অবশ্য পরিত্যাজ্য। একিসাথে প্রগতিশীলতার ধুয়া তুলে যারা এখনো সাম্প্রদায়িক হিন্দুদের কল্পিত আর্য ভারত তথা অখন্ড ভারত ভাগের দুঃখে কান্নাকাটি করেন, নিজেদের বাঙালির চেয়ে বেশি ভারতিয় ভাবতে ভালোবাসেন, আসামের মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয় না দিয়ে ভারতের হানাদার বাহিনীর হাতে তুলে দেন, সিমান্তে বাঙালি হত্যাকান্ডের প্রতিশোধ গ্রহণ করার বদলে ভারতকে খুশি করতে ইলিশ মাছ উপহার পাঠান, এরাও পেছনে ফিরে যেতে চান, ব্রিটিশ কলোনিয়াল মানচিত্রের ইন্ডিয়া আর গান্ধির সাম্প্রদায়িক একজাতি তত্ত্ব এখনো এদের মাথা থেকে নামে নাই। এদেরকেও পরিত্যাগ করতে হবে, প্রতিহত করতে হবে। বাঙালির মুক্তিসংগ্রাম বিরোধী এইসব তাবৎ রাজাকার, তাবৎ মিরজাফরকে চিনে নিতে হবে। এদের চেনার অন্যতম উপায় হচ্ছে এরা বাঙালির মুক্তি সংগ্রামকে কেটেছেটে ছোট করে ফেলতে চায়। এরা কেউ ৭৫এর পেছনে যেতে চায়না, কেউ একাত্ত্বরের পেছনে যেতে চায়না, আবার কেউ কেউ টেনে হিচরে সর্বোচ্চ ৫২ পর্যন্ত বাংলাদেশের ইতিহাস লম্বা করবে, এর বেশি না। অথচ বাঙলার মানুষএর হাজার বছরএর সাংস্কৃতিক, বুদ্ধিবৃত্তিক ও রাজনৈতিক সংগ্রামের ইতিহাস আছে, দুইশ বছরএর বেশি উপনিবেশ বিরোধী সংগ্রামএর ইতিহাস আছে। এইসব ইতিহাস বাদ দিয়ে বাঙালির মুক্তি সংগ্রাম বুঝা যাবেনা। এটা যে বুঝাতে চায়, সে রাজাকারদের মতোই পেছনের ইতিহাস মানুষকে ভুলিয়ে দিতে চায় মাত্র। এই ইতিহাস ভুলিয়ে দেয়ায় লাভ কি? এতে লাভ হচ্ছে যে ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদ’ জিনিসটা কোনদিন এতো বড় হবেনা যে তা পশ্চিম বাঙলার উপর বাংলাদেশ রাষ্ট্রের অধিকার দাবি করতে পারবে। এতে লাভ এই যে ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদ’ কখনো আদিবাসীর ভাষা ও রাজনীতির অধিকারএর পক্ষে কথা বলবেনা, ভারতবর্ষের অন্যান্য জাতিগোষ্ঠির জন্যে বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটি কোন উদাহরণ বা মডেল হতে পারবেনা। বাঙালি, এই বাঙলার তাবৎ জনগোষ্ঠি কখনো মাথা তুলে দাঁড়াতে পারবেনা।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

৩ thoughts on “উপনিবেশ নিপাত যাক। মাতৃভাষা মুক্তি পাক।

  1. “বাঙলা ভাষার একেবারে আদিপর্বে
    “বাঙলা ভাষার একেবারে আদিপর্বে তথাকথিত অনুন্নত বাঙলা ভাষায় রচিত চর্যাপদে বিভিন্ন চর্যায় যেখানে ৭০% এর বেশি বাঙলা শব্দের ব্যবহার পাওয়া যায় সেইখানে আধুনিক যুগের সংস্কৃত বহুল বাঙলা ভাষার কোন গদ্যে ৭০% বাঙলা শব্দ খুঁজে পাওয়া দুরূহ হবে। আর বাঙলা ভাষার উপর এই প্রবল ঔপনিবেশিক এবং সাম্প্রদায়িক আগ্রাসনটা ঘটে গেছে উনবিংশ শতকের ৭০ বছরের সময়কালে। আমাদের ভাষা আন্দোলনের চেতনার জায়গা থেকে এই আগ্রাসনকে চিহ্নিত করা ও তার বিরুদ্ধে লড়াই গড়ে তোলা জরুরি।”

    এই প্যারাটা নিয়া আরো বিশদ কোনো বর্ননা দিলে ভালো হয় । বিশেষ করে ‘এক’ নিয়ে যদি একটা ব্লগপোস্ট করতে পারেন, তাইলে তো আরো ভালো

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

+ 77 = 80