দেলু দালাল সাঈদীর ফাঁসি

দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে আনা ২০টি অভিযোগের মধ্যে ৮টি অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে। ৫টি অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি। ২টি অভিযোগের বিষয়ে ট্রাইব্যুনাল কোনো মন্তব্য করেনি।
১, ২, ৩, ৪, ১৩, ১৪, ১৫, ১৬ ও ১৯নং অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে গণহত্যা, হত্যা, গণধর্ষণ, ধর্ষণ, অপহরণ, লুটপাট ভাংচুর ও অগ্নিসংযোগ।
৫, ৯, ১২, ১৭ ও ১৮ নং অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি। এর মধ্যে রয়েছে লেখক সাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের পিতা ফয়জুর রহমান ও ভাগিরথী সাহা হত্যাসহ অপহরণ ও ধর্ষণের অভিযোগ।
প্রমাণিত ১নং অভিযোগ হচ্ছে- ১৯৭১ সালের ৪ মে দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর নেতৃত্বাধীন দলের সদস্যরা পাকিস্তানি সেনাদের খবর দিয়ে পিরোজপুর সদর এলাকার মধ্য মাসিমপুর বাসস্ট্যান্ডের পেছনে নিয়ে যান। সেখানে পরিকল্পিতভাবে আগে থেকে জড়ো করা ২০ জন নিরস্ত্র মানুষকে গুলি করে হত্যা করা হয়।

২ নং অভিযোগ হচ্ছে- ৪ মে সাঈদী ও তার দল পাকিস্তানি সেনাদের সঙ্গে নিয়ে মাসিমপুর হিন্দুপাড়ায় যান। সেখানে হিন্দু বাড়িগুলোতে লুট করেন এবং আগুন ধরিয়ে দেন। মানুষ পালাতে শুরু করলে সাঈদী ও তার দলের সদস্যরা এলোপাতাড়ি গুলিবর্ষণ করলে ১৩ জন শহীদ হন।

অভিযোগ-৩ হচ্ছে ৪ মে সাঈদী পাকিস্তানি সেনাদের নিয়ে মাসিমপুর হিন্দুপাড়ায় মনীন্দ্রনাথ মিস্ত্রী ও সুরেশ চন্দ্র মণ্ডলের বাড়ি লুট এবং আগুন ধরিয়ে দেন। সাঈদী নিজে বিভিন্ন গ্রামের রাস্তার পাশের অসংখ্য বাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেন।

অভিযোগ-৪ এ বলা হয়, ৪ মে সাঈদী তার রাজাকার বাহিনী ও পাকিস্তানি সেনাদের নিয়ে ধোপাবাড়ির সামনে এবং পিরোজপুর সদর পুলিশ স্টেশনের এলজিইডি ভবনের পেছনের হিন্দুপাড়া ঘিরে ফেলেন। এ সময় গুলি চালানো হলে দেবেন্দ্রনাথ মণ্ডল, জগেন্দ্রনাথ মণ্ডল, পুলিন বিহারী ও মুকুন্দ বালা মারা যান।

অভিযোগ-১৩ এ বলা হয়, মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার দুই-তিন মাস পর সাঈদীর নেতৃত্বে পাকিস্তানি সেনারা নলবুনিয়া গ্রামের আজহার আলীর বাড়িতে যায়। সেখানে আজহার আলী ও তার ছেলে সাহেব আলীকে ধরে নির্যাতন করা হয়। সাহেব আলীকে পিরোজপুরে নিয়ে গিয়ে হত্যা করে নদীতে ফেলে দেওয়া হয়।

অভিযোগ-১৪: মুক্তিযুদ্ধের শেষ দিকে সাঈদীর নেতৃত্বে ৫০-৬০ জনের একটি রাজাকার বাহিনী হোগলাবুনিয়ার হিন্দুপাড়ায় যায়। রাজাকারদের আগমন দেখে গ্রামের অধিকাংশ হিন্দু নারী পালিয়ে যান। কিন্তু মধুসূদন ঘরামীর স্ত্রী শেফালী ঘরামী ঘর থেকে বের হতে পারেননি। তখন সাঈদীর নেতৃত্বে রাজাকাররা তাকে ধর্ষণ করেন। এর ফলে স্বাধীনতার পর তিনি একটি কন্যা সন্তান প্রসব করেন। এ নিয়ে গ্রামে বিভিন্ন কথা ওঠায় শেফালী ঘরামী দেশ ছেড়ে ভারতে চলে যেতে বাধ্য হন। পরে এই হিন্দুপাড়ার ঘরে আগুন দেওয়া হয়।
অভিযোগ-১৫: মুক্তিযুদ্ধের শেষ দিকে সাঈদীর নেতৃত্বে ১৫-২০ জনের রাজাকার দল হোগলাবুনিয়া গ্রামের ১০ জন হিন্দু নাগরিককে ধরে। পাকিস্তানি সেনারা তাদের সবাইকে হত্যা করে লাশ নদীতে ফেলে দেয়।
অভিযোগ-১৬: সাঈদীর নেতৃত্বে ১০-১২ জনের রাজাকার দল পারেরহাট বন্দরের গৌরাঙ্গ সাহার বাড়ি থেকে তার তিন বোন মহামায়া, অন্ন রানী ও কমলা রানীকে ধরে পাকিস্তানি সেনা ক্যাম্পে নিয়ে যায়। সেখানে তিন দিন ধরে ধর্ষণ করে পরে তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়।
অভিযোগ-১৯: সাঈদী প্রভাব খাটিয়ে পারেরহাটসহ অন্য গ্রামের ১০০-১৫০ জন হিন্দুকে ইসলাম ধর্মে রূপান্তর করে। তাদের মসজিদে গিয়ে নামাজ পড়তে বাধ্য করা হতো।
ট্রাইব্যুনালের রায়ে বলা হয়েছে, অভিযোগ আনলেও রাষ্ট্রপক্ষ সাঈদীর বিরুদ্ধে ৫, ৯, ১২, ১৭ ও ১৮ নং অভিযোগ সংশ্লিষ্টতার অভিযোগটি প্রমাণ করতে পারেননি।

লেখক হুমায়ূন আহমেদ ও মুহম্মদ জাফর ইকবালের বাবা পুলিশ কর্মকর্তা ফয়জুর রহমান আহমেদকে হত্যার সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ করা হয় সাঈদীর বিরুদ্ধে আনা ৫ নম্বর অভিযোগে। এতে বলা হয়, তৎকালীন পিরোজপুরের ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট সাইফ মিজানুর রহমান সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদ গঠন করেন। সাঈদী ও তার সহযোগী শান্তি কমিটির সদস্য মন্নাফ কয়েকজন পাকিস্তানি সেনাসদস্যকে নিয়ে ৫ মে পিরোজপুর হাসপাতাল থেকে তাকে ধরে বলেশ্বর নদের তীরে নিয়ে যান। একই দিনে পুলিশ কর্মকর্তা ফয়জুর রহমান আহমেদ (লেখক হুমায়ূন আহমেদ ও মুহম্মদ জাফর ইকবালের বাবা) এবং ভারপ্রাপ্ত এসডিও আবদুর রাজ্জাককেও কর্মস্থল থেকে ধরা হয়। সাঈদীর উপস্থিতিতে এ তিন সরকারি কর্মকর্তাকে গুলি করে লাশ বলেশ্বর নদে ফেলে দেওয়া হয়।

প্রমাণিত না হওয়া ৯নং অভিযোগে বলা হয়েছে, ২ জুন সকাল নয়টার দিকে সাঈদী ও তার সশস্ত্র সহযোগীরা ইন্দুরকানি পুলিশ স্টেশনের নলবুনিয়া গ্রামের আবদুল হালিম বাবুলের বাড়িতে লুটপাট করে মূল্যবান জিনিসপত্র লুট এবং আগুন ধরিয়ে দেন।

আর ১২নং অভিযোগে বলা হয়েছে, স্বাধীনতা যুদ্ধকালে সাঈদীর নেতৃত্বে ১৫-২০ জনের একটি সশস্ত্র দল পারেরহাট বাজারের ১৪ জন হিন্দুকে ধরে দড়ি দিয়ে বেঁধে পাকিস্তানি সেনাদের কাছে নিয়ে যায়। পরে তাদের গুলি করে লাশ নদীতে ফেলে দেওয়া হয়।
অভিযোগ-১৭: সাঈদী ও তার নেতৃত্বের রাজাকার বাহিনীর সদস্যরা পারেরহাটের বিপদ সাহার সাহার মেয়ে ভানু সাহাকে তার বাড়িতে আটকে নিয়মিত ধর্ষণ করেন। এক সময় ভানু সাহা দেশ ত্যাগে বাধ্য হন। বর্তমানে তিনি ভারতে অবস্থান করছেন।
অভিযোগ-১৮: ভাগীরথী পাকিস্তানি সেনাদের ক্যাম্পে কাজ করতেন। সাঈদী এক দিন খবর দেন, ভাগীরথী মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়মিত নানা খবরা-খবর দেন। পাকিস্তানি সেনারা তাকে হত্যা করে লাশ বলেশ্বর নদে ফেলে দেয়।

মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্ত জামায়াতের নায়েবে আমির দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ডের রায় দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১।

বৃহস্পতিবার সাঈদীর বিরুদ্ধে ২০টি অভিযোগের মধ্যে ৮টিই সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হওয়ায় এ রায় ঘোষণা করেন ট্রাইব্যুনাল।

বেলা ১১টা ১৯ মিনিট থেকে শুরু করে ১টা ৪০ মিনিট পর্যন্ত রায় পড়া শেষ হয়। ১২০ পৃষ্ঠার রায়ের প্রথম অংশ সূচনা বক্তব্য পাঠ করেন বিচারক প্যানেলের সদস্য আনোয়ারুল হক। পরবর্তী অংশ পাঠ করেন বিচারক প্যানেলের অন্য সদস্য বিচারপতি জাহাঙ্গীর হোসেন এবং রায়ের মূল অংশ পাঠ করেন চেয়ারম্যান বিচারপতি এটিএম ফজলে কবীর।

একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে মানবতাবিরোধী অপরাধে জড়িত যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের লক্ষ্যে ২০১০ সালের ২৫ মার্চ গঠিত হয় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। গঠনের পর প্রায় ৩ বছরের কাছাকাছি সময়ে এসে তৃতীয় কোনো অভিযুক্তের বিরুদ্ধে রায় ঘোষিত হলো।

তবে সাঈদীর মামলার মধ্য দিয়ে প্রথম কোনো মামলার রায় দিলেন প্রথম ট্রাইব্যুনাল। সাঈদীর মামলাটি ট্রাইব্যুনাল-১ এর ১ নম্বর মামলা।

(পুরাই কপি পেস্ট)

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

৪ thoughts on “দেলু দালাল সাঈদীর ফাঁসি

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

82 + = 85