শিল্পের সাতকাহন- মূকাভিনয় এবং একজন বীরের গল্প ………

মূকাভিনয় কি ??


মূকাভিনয় কি ??

মূকাভিনয় একটি সতন্ত্র শিল্প মাধ্যম। মূকাভিনয় অর্থ হচ্ছে মুখে শব্দ না করে বা সংলাপ ব্যবহার না করে শারীরিক বিভিন্ন অঙ্গভঙ্গির মাধ্যমে মনের ভাব প্রকাশ করা ।। নাট্যশিল্পের এক বিশেষ দিক হচ্ছে এই মূকাভিনয় ।। এই পদ্ধতিতে জড়িত কোন অভিনেতাই কোন সংলাপ ব্যবহার না করে কেবল দেহ ভঙ্গিমা অথবা মুখের অভিব্যক্তির উপর নির্ভর করে অভিনয় করে ।। অনেক ক্ষেত্রে মূকাভিনয় থিয়েটারের রস বিতরণের একটি ম্যধ্যম হয়ে থাকে ।। বর্তমান সময়ে আমাদের দেশে মূকাভিনয়ের খুব একটা প্রচলন বা প্রসার চোখে না পড়লেও অনেক প্রাচীন কাল থেকে প্রাচ্যর বিভিন্ন দেশে মূকাভিনয়ের চর্চা এবং এর অভিনয় শৈলী চোখে পড়ার মত ।। এক কথায় বলতে গেলে যে রীতি অবলম্বন করে এক বা একাধিক অভিনেতা কিংবা অভিনেত্রী নির্দিষ্ট মঞ্চে দর্শকের সম্মুখে বাচিক অর্থাৎ সংলাপ ব্যতিরেকে আঙ্গিক, আহার্য ও সাত্ত্বিক ভাষা ব্যবহার করে মোহ সৃষ্টির মাধ্যমে গতিশীল জীবনের কোনো চিত্র শিল্পসম্মতরূপে অর্থপূর্ণ বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়ে বিশ্বাসযোগ্য করে তোলেন, তখনই তাকে মূকাভিনয় বলা হয়।

মূকাভিনয়ের উৎপত্তি ??

মূকাভিনয় ইতিহাস সম্পর্কে তেমন কোন সুস্পষ্ট ধারণা পাওয়া কঠিন তারপরও অনেক খোঁজাখুঁজির পর একটা ধারণা মূটামুটি পাওয়া গেলো ।। Pantomime বা বিশুদ্ধ অনুকৃতি শব্দটি প্রাচীন গ্রীক শব্দ থেকে এসেছে ।। আদি রোমান যুগে বিভিন্ন অনুষ্টানে Pantomime নামে এক ধরনের লোক তাদের নিজস্ব শারীরিক ভঙ্গীতে এক ধরেনের কলাকৌশল ব্যবহার করে মানূষকে আনন্দ দিত ।। পরবর্তীতে সেই বিশেষ অঙ্গভঙ্গির জনপ্রিয়তার এবং বিকাশের মাধ্যমে আধুনিক এই মূকাভিনয় বা Mime এর প্রচলন শুরু হয় ।। সভ্যতাৰ আদি যুগে প্ৰত্যেক দেশের জীৱজন্তুর অনুকরণ, বলিদান আদি অনুষ্ঠানরত Pantomime এর অস্তিত্ব পাওয়া যায়।

মূকাভিনয়ের সূত্ৰাবলীঃ

মূকাভিনয় কলার কিছু আভ্যন্তরীন সূত্ৰ রয়েছে । এই সূত্ৰ সমুহর সহায়তার মাধ্যমে একজন মূকাভিনেতাই তার অভিনয়ের পূর্ণ বিকাশ করতে পারে ।। আর দর্শক সকলেও বিষয় বস্তু সঠিক ভাবে পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে সঠিক মর্মার্থ অনুধাবন করতে পারে ।। সুত্র সমুহ হলঃ ক) গতির সূত্রাবলি(Principles of motion) :-গতির তিনটা ধারা রয়েছেঃ ১। কেন্দ্ৰত্যাগী গতি (Eccentric), ২। কেন্দ্ৰাভিমুখী গতি (Concentric), ৩। স্বাভাবিক গতি (Normal)।
)গতিবেগের সূত্ৰ (Velocity) :- কোনো একটা গোষ্ঠী বা সমষ্টি অথবা শক্তি যেটার লয় বা ছন্দ চলমান হয় তার হারকে গতিবেগ বা Velocity বলা হয় ।
খ) মনোভাৱ (Attitude):- সক্ৰিয় আবেগর উত্থান পতনের ভাবের মাধ্যমে যে ক্রিয়া অথবা শিল্পের প্রকাশ পায় তাকে মনোভাব সূত্র বলে ।।

মূকাভিনয়ের চর্চারত দেশসমূহঃ

পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে মূকাভিনয় যথেষ্ট সমাদৃত সাধারণত রোমানরা এই মূকাভিনয় বা Mime এর প্রচলন শুরু করেন পরবর্তীতে বিশ্বজুড়ে এর ব্যাপক জনপ্রিয়তা লক্ষ্য করা যায় ।। ইংল্যান্ড, আমেরিকা, চায়না সহ বিশ্বের অনেক দেশেই মূকাভিনয়ের চর্চা এবং এর জনপ্রিয়তা পরিলক্ষিত ।। এছাড়া লন্ডনে প্রতি বছর International Mime Festival নামে এক ধরনের উৎসব অনুষ্টিত হয় যেখানে দেশের বিভিন্ন দেশ হতে আগত মূকাভিনয় শিল্পীরা তাদের মূকাভিনয় প্রদর্শন কর থাকেন ।। এছাড়া প্রতিবছর বিশ্বখ্যাত মূকাভিনয় অভিনেতা মার্সেল মার্সো স্মরণে ২২ মার্চ বিশ্ব Mime Day পালন করা হয় ।।

মূকাভিনয় ফাউন্ডেশনঃ

বিশ্বে মূকাভিনয়ের উন্নতির জন্য বিভিন্ন আর্থিক এবং স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা এবং থিয়েটার কাজ করে যাচ্ছে এর মধ্য উল্লেখযোগ্য হল Goldston Mime Foundation, MUMBAI MIME FOUNDATION, American Mime Theatre, Meloche International Medical Education Foundation ইত্যাদি ।।

মূকাভিনয়ের ধারা বিকাশের কয়েকজন বিশ্বখ্যাত ব্যাক্তিঃ

যুগে যুগে বিভিন্ন ব্যাক্তি মূকাভিনয় নিয়ে কাজ করে গেছেন এবং অভিনয় করে দর্শকের মনে জায়গা করে নিয়েছেন ।। যাদের অসীম সাহস এবং দৃষ্টিনন্দন কর্মশৈলী তাদেরকে নিয়ে গেছে অনন্য এক উচ্চতায় ।। বিশ্বে বর্তমানে তিনটি স্কুল অব মাইম চালু আছে। এই সকল স্কুলের ধারাকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক মূকাভিনেতারা বিভিন্ন ধরণের পারফরমেন্স করেন এবং ডেভেলপ বা সৃষ্টি করছেন। এগুলোর মধ্যে রয়েছে- ট্রেডিশনাল মাইম : যা সাদা মুখে গল্প বা নাটকীয়তার মাধ্যমে অভিনীত হয়। ট্রেডিশনাল মাইমের জনক মার্সেল মারসু । (অনেকে আজকাল সাদা মুখে বা রঙ চঙ না মেখেই থিয়েটারের পরিচ্ছদে মূকাভিনয় করেন)

মডার্ন মাইম : এর জনক বলা হয় এতিয়েন দেক্রু কে । তিনি ট্রেডিশনাল মাইম থেকে মাইমকে নতুন দিকের প্রবর্তন করেন। মাইমের গ্রামেটিক মুভমেন্ট নির্মান করেন তিনি । উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, ন্যাচারাল পেইন্টিংস এবং অ্যাবস্ট্রাক্ট পেইন্টিংস । মডার্ন মাইম ইজ দ্যা বর্ডার লাইন অব দ্যা থিয়েটার এন্ড দ্যা ডান্স । এতিয়েন দেক্রু ছিলেন মার্সেল মারসু’র মাইমের গুরু ।

প্রেসেন্ট মাইমঃ তৃতীয় স্কুলটির প্রবর্তক জাকুলিন লিকক । তিনি থিয়েটারের শিক্ষক । মুখোশ ও দেহের সমগ্র অবয়বকে মুখোশের আবরণে মুভমেন্ট নির্মান করেছেন তিনি । মুমেন্চেজ থিয়েটার গ্রুপ হচ্ছে লিককয়ের ছাত্রবৃন্দ। সংক্ষেপে বর্তমান মাইমের স্বরূপ উৎপত্তি হয়েছে ইতালিয়ান কমেডিয়া ডেল আর্টে থেকে । মার্সেল মারসু কমেডিয়া ডেল আর্টে ও চার্লি চ্যাপলিন এক্টয়ের সমন্বয়ে নিজেস্ব ধারায় মাইমকে থিয়েটারে রূপ দিয়েছেন।


মূকাভিনয়ের কিছু অদ্ভুত ব্যবহারঃ

প্রাচীন যুগে মূকাভিনয় বা Mime এর ব্যবহার ছিল কিছুটা ভিন্ন ।। সুপ্রাচীনকাল থেকেই মূকাভিনয়ের পোশাক হিসেবে কালো, নীল, ধূসর বা এই জাতীয় রঙের পোশাক বেশি প্রাধান্য পেয়েছে । প্রথম দিকে এই পোশাকগুলো ছিল আলখাল্লার মতোই । গলা থেকে পা পর্যন্ত একটি কাপড়ের পোশাক হতো এটি, তবে লক্ষণীয় বিষয় হলো, তখন নাটকে নারীদের অংশগ্রহণ না থাকলেও মূকাভিনয়ে তাদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত ছিল । কোনো কোনো সাহসী নারী মূকাভিনয়শিল্পী চরিত্রের প্রয়োজনে নগ্নভাবেই মঞ্চে উপস্হিত হতেন । তবে সেই সময় কাহিনীর বিশ্বাসযোগ্যতা প্রমাণের জন্য হত্যাদৃশ্যে সত্যিকার কয়েদি বা মৃত্যুদণ্ডিত আসামিকে মঞ্চে এনে হত্যা করা হতো । প্রাচীন গ্রিসে মূকাভিনেতাদের মুখোশ ছিল নিচের দিকে খোলা, যাতে কথা বলা যায় । পুরো অভিনয়ে একটি মুখোশই ব্যবহার করা হতো । কিন্তু প্রাচীন রোমে একজন মূকাভিনেতা পাঁচ ধরনের ভিন্ন ভিন্ন অভিব্যক্তির মুখোশ পরিধান করতেন এবং তাতে মুখ ঢাকা পড়ে যেতো । অভিনআঠারো শতকের গোড়ার দিকে মূকাভিনয়ের একটি ধারা সার্কাসের ক্লাউনের সঙ্গে মিশে যায় এবং অপর ধারা থিয়েটারের সঙ্গে যুক্ত হয়ে প্রতিনিয়ত নতুন সম্ভাবনার দিকে এগিয়ে চলেছে ।

বাংলাদেশে মূকাভিনয়ের উৎপত্তিঃ

আমাদের দেশে মূকাভিনয় শব্দটির ব্যবহার সাম্প্রতিককালে হলেও পূর্বে এর পরিচিতি ছিল আঙ্গিক অভিনয় শিরোনামে। অঙ্গ সম্বধীয় সঞ্চালনই কেবল নয় এখানে রয়েছে ভাব, অভিব্যক্তি, রস ও অনুভূতির এক মিশ্রণ। স্বাধীনতাপূর্ব সময়ে মাইম, প্যান্টোমাইম কিংবা মূকাভিনয় শব্দটির সঙ্গে এদেশের সাধারণ দর্শকের পরিচিতি ছিল না বললেই চলে। তখনকার সময়ে গ্রামাঞ্চলে বিভিন্ন পালা-পার্বণ, ধর্মীয় উৎসব, লোকাচার, ও মেলাগুলোতে সম্পূর্ণ অপরিশীলিত অবস্থায় অঙ্গভঙ্গির মাধ্যমে আনন্দদানের বিষয়টি প্রচলিত ছিল, যা হালের মূকাভিনয়ের পর্যায়ে না পড়লেও অঙ্গভঙ্গির সাহায্যে অভিনয় করার রীতিকে প্রদেশে মাইমের অস্পষ্ট উৎস হিসেবে চিহ্নিত করলে ভুল হবে না।

বাংলাদেশে মূকাভিনয় শিল্পের বিকাশঃ

মুক্তিযুদ্ধের পর একদল খ্যাপা তারুণ্যের হাত ধরে যে নব উদ্দীপনা নিয়ে এদেশে নাট্যচর্চা শুরু হয় তার প্রভাবে শিল্পের এই মাধ্যমটি সম্পর্কে শিল্পানুরাগীদের মাঝে আগ্রহ জাগে । তবে দু’একজন শিল্পী নিজস্ব তাগিদ থেকে ব্যক্তিগত পর্যায়ে মূকাভিনয়কে পরিচয় করলেও দলগতভাবে এর কার্যক্রম শুরু হতে লেগে যায় আরো বেশকিছু দিন । বাংলাদেশের মঞ্চে স্বতন্ত্র শিল্পমাধ্যম হিসেবে মূকাভিনয় পরিচিতি লাভ করে ১৯৭৫ সালে আমেরিকার শিল্পী অ্যাডাম ডেরিয়াসের অভিনয়ের মাধ্যমে। এরপর অবশ্য বেশকিছু বিদেশি মূকাভিনেতা শিল্পকলা একাডেমী, ব্রিটিশ কাউন্সিল, ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউট, মহিলা সমিতি ও গাইড হাউজ মঞ্চে মূকাভিনয় প্রদর্শন করেন। যাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছেন ইংল্যান্ডের নোলারে ও জার্মানির মিলান পাদেক । ১৯৮৯ সালে জিল্লুর রহমান জনের পরিচালনায় ‘ঢাকা প্যান্টোমাইম’ দলটি আত্মপ্রকাশ করে । আত্মপ্রকাশের পর বেশ অল্প সময়ের মধ্যেই দল বেশ ঈর্ষাণীয় সাফল্য করতলগত করে । প্রথম দলগত মূকাভিনয় প্রদর্শনীই নয়, ১৯৯১ সালে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমীর সাথে যৌথভাবে প্রথম মূকাভিনয় উৎসবের আয়োজনও করে তারা, যাতে অন্তর্ভূক্ত ছিল মূকাভিনয় বিষয়ে একটি সেমিনারও । ১৯৯২’র মে মাসে কলকাতায় অনুষ্ঠিত প্রথম বাংলাদেশ-ভারত মূকাভিনয় উৎসবে অংশগ্রহণ ছাড়াও ১৯৯৩’-এর জানুয়ারিতে কলকাতায় প্রথম ‘ইন্টারন্যাশনাল ফেস্টিভল অব নন-ভারবাল আর্টস’ শীর্ষক উৎসবে ঢাকা প্যান্টোমাইম শ্রেষ্ঠ দলগত পরিবেশনার গৌরব অর্জন করে । এছাড়া বঙ্গাব্দ ১৪০০ সালকে স্মরণীয় করে রাখার প্রত্যয়ে ভারত-বাংলাদেশ মূকাভিনয় উৎসব, যা কলকাতা ও শ্রীরামপুরে অনুষ্ঠিত হয় সেখানে অংশগ্রহণ, নৈহাটিকে ১৪০১’-এর উৎসবে অংশগ্রহণ ছাড়াও দলটি দিল্লিসহ ভারতের বিভিন্ন প্রদেশে পারফর্ম করার গৌরব অর্জন করে । তবে দলটির কর্ণধার জিল্লুর রহমান জনের উদ্যোগ ও পরিচালনায় শিল্পকলা একাডেমীতে ক’বার কর্মশালা হয়, যা অনেককেই ভীষণ অনুপ্রাণিত করে তোলে এই মাধ্যমটি সম্পর্কে ।

একজন বাংলাদেশী বীরের গল্পঃ

বিশ্বখ্যাত মূকাভিনেতা মার্সেল মার্সোর স্কুলে নতুন এক শিক্ষার্থী এসেছে । মার্সো জানলেন, এ নতুন ছাত্র এসেছে বাংলাদেশ থেকে । নতুন ছাত্রটি ঘন্টাদেড়েক ধরে বাংলাদেশের পরিচয় দিয়ে গেলেও তার কাছে বাংলাদেশ মানে ভারতের কোনো এক অঙ্গরাজ্য । নতুন ছাত্র তখন ঠিক করলেন, মুকাভিনয়ের মাধ্যমেই বাংলাদেশকে তুলে ধরবেন । হলও তাই, দুদিন যেতেই নতুন ছাত্রের প্রতিভায় মুগ্ধ হয়ে বাংলাদেশ নিয়ে পড়াশোনা শুরু করলেন মার্সো । তাকে মুগ্ধ করল বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস । একপর্যায়ে সেই ছাত্র মার্সোর ভীষণ প্রিয় হয়ে উঠলেন । যেখানেই যান, প্রিয় ছাত্রটি তার সঙ্গী হন। মার্সো গোটা বিশ্বকে জানালেন, এ শুধু তার ছাত্র নয়, ছেলেও বটে। এ ছেলেটির দেশ বাংলাদেশ । মার্সোর স্কুলের সেই ছাত্রের নাম পার্থপ্রতিম মজুমদার । মূকাভিনয়ের এই জীবন্ত কিংবদন্তি প্রতিনিয়ত বাংলাদেশকে চিনিয়ে যাচ্ছেন নতুন করে । শুধু তাই নয়, মূকাভিনয় শিল্পে নতুন মাত্রা যোগ করেছেন তিনি ১৯৫৪ সালের ১৮ জানুয়ারি পাবনার কালাচাঁদপাড়ায় জন্মগ্রহণ করেন পার্থপ্রতিম মজুমদার । বাবা হিমাংশু কুমার বিশ্বাস ও মা সুশ্রিকা বিশ্বাসের দ্বিতীয় সন্তান তিনি। হিমাংশু কুমারের পেশা ফটোসাংবাদিকতা । ছোটবেলায় পার্থর নাম রাখা হয় প্রেমাংশু কুমার বিশ্বাস । ডাকনাম ভীম । সবে প্রাইমারি স্কুলের গন্ডি পেরিয়েছেন পার্থ। একদিন বাড়ি ফিরে দেখেন, কলকাতা থেকে সুধাংশু কাকু বাড়িতে এসেছেন ( সুধাংশু কুমার নব)। তিনি হিমাংশুকে প্রস্তাব দিলেন- “ভীমকে কলকাতায় নিয়ে যাব। সেখানেই পড়াশোনা করবে ও।” বাবা-মা রাজি হয়ে গেলেন। পরিবার ও স্বদেশ ছেড়ে ভীম চললেন বিদেশ-বিভুঁই। গাড়িতে চড়ার আগে দেখেন, বন্ধুরা সব চোখের জলে ভাসছে।

কলকাতায় গিয়ে ভর্তি হলেন ড.শীতলকুমার ঘোষ আদর্শ বিদ্যালয়ে। চন্দননগরে কাকুর বাসায় নিয়মিত আসতেন মূকাভিনেতা যোগেশ দত্ত। তার সঙ্গে আলাপচারিতায় মুগ্ধ হয়ে ভীমকুমার ঠিক করেন, তিনি মূকাভিনয় শিখবেন। তার আবদারে প্রথমে সায় না দিলেও যোগেশ দত্ত তাকে ভর্তি করিয়ে নেন নিজের মাইম একাডেমিতে। ১৯৬৬ সাল থেকে ১৯৭২ সাল অবধি যোগেশ দত্তের মাইম একাডেমিতে প্রশিক্ষণ নেন তিনি।

/ALTERNATES/w620/partho-1.jpg” width=”400″ />

স্বাধীনতাযুদ্ধের পর দেশে ফিরে আসেন ভীম। একদিন বাড়িতে আসেন সংগীতজ্ঞ বারীণ মজুমদার। তিনি ভীমকে নিয়ে এলেন ঢাকায়। ভর্তি করিয়ে দিলেন তার প্রতিষ্ঠিত ঢাকা মিউজিক ইনস্টিটিউটে। বারীণ মজুমদার তার নতুন নাম দিলেন–পার্থপ্রতিম মজুমদার।
কলেজেই পরিচয় হল নৃত্য পরিচালক আমানুল হকের সঙ্গে। বন্ধুত্ব হয়ে গেল অঞ্জনা, তিথি খন্দকার, নিলুফার, ফ্যান্সি, কচি, মাহফুজ, নিরঞ্জন আর মুনিরের সঙ্গে। তাদের নিয়ে ‘ব্যালে অব বাংলাদেশ’ নামের একটি সাংস্কৃতিক দল গড়ে তুললেন বারীণ মজুমদার। এ দলটি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সব ভাষণের আগে সংগীত পরিবেশন করত।

গানের আড়ালে চলছিল পার্থর মূকাভিনয় চর্চা। তার এই চর্চার খবর জেনে গেলেন বিটিভির প্রযোজক আলিমুজ্জামান দুলু। তিনি পার্থকে জানালেন, বিটিভিতে মূকাভিনয় প্রচার হওয়া আবশ্যক। ১৯৭৫ সালে হেদায়েত হোসেন মোরশেদের ‘রঙধনু’ নামের একটি অনুষ্ঠানে মাইম দেখাতে শুরু করেন পার্থ। তার মূকাভিনয়ের গল্পে ফুটে ওঠে রাজধানীর জনজীবনের প্রতিচ্ছবি। এরপর তিনি নাসিরউদ্দিন ইউসুফ বাচ্চুর ‘আপনপ্রিয়’, শফিক রেহমানের ‘বলা বাহুল্য’ এবং ফজলে লোহানীর ‘যদি কিছু মনে না করেন’ অনুষ্ঠানেও পারফর্ম করেন।

অনুষ্ঠানগুলোতে পার্থর মূকাভিনয়ে মুগ্ধ হল বাংলাদেশের ফ্রান্স দূতাবাস। তাদের আমন্ত্রণে ফরাসি সংস্কৃতিকেন্দ্র আঁলিয়স ফ্রঁসেজে তিনি দুটি অনুষ্ঠানও করলেন। পার্থকে তারা অনুরোধ করে ফ্রান্সে আসতে, কারণ সেখানে এ শিল্পের চর্চা ও প্রসার ব্যাপক। পার্থকে একটি বৃত্তিও দিয়ে দিল তারা। ১৯৮১ সালে পার্থ উড়াল দিলেন ফ্রান্সে। ফ্রান্সে গিয়ে পার্থ ভর্তি হলেন এতিয়েন দু ক্রুর স্কুলে। তার মৃত্যুর পর মার্সেল মার্সোর ‘ইকোল ইন্টারন্যাশনাল দ্য মাইমোড্রামা’ স্কুলে। পার্থ জানান, মার্সোর সেই স্কুলে সুযোগ পাওয়া ‘রীতিমতো সৌভাগ্যের’ ব্যাপার। সারা বিশ্ব থেকে মাত্র ৮জন জন মূকাভিনেতা মার্সোর স্কুলে সুযোগ পেতেন। পার্থ সেই ভাগ্যবানদের একজন। স্কুলে ভর্তির পর ‘নিজগুণে’ গুরুর প্রিয়তম শিষ্য হয়ে উঠলেন পার্থ। গুরুর সঙ্গে দৈনিক ১৬ঘণ্টা প্রশিক্ষণ নিতেন তিনি।

গুরুর সঙ্গে তার অনেক স্মৃতি। দুজনে মিলে বেশক’টি শো করেছেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল ‘ইকোল ইন্টারন্যাশনাল ডি মাইমোড্রামা ডি প্যারিস-মারসেল মার্সো’ (আমেরিকা-১৯৮৪), ‘লে কারগো দ্য ক্রেপুসকুল’ ও ‘আবিম (ইতালি, ১৯৮৫), ‘ইয়ার অব ইন্ডিয়া’ (ফ্রান্স-১৯৮৬), ‘শ থিয়েটার’ এবং ‘ওয়েস্টমিনিস্টার স্টুডিও থিয়েটার শো’ ( লন্ডন-১৯৮৬), ‘কুয়ালালামপুর ফেস্টিভ্যাল’ (মালয়েশিয়া- ১৯৮৭), ‘লিডডেন মিউজিয়াম শো’ ( স্টুটগার্ট, জার্মানি-১৯৮৮)। ১৯৯০ সালে মার্সেল মার্সোর সঙ্গে মিলে প্রতিষ্ঠা করেন ‘মাইমোড্রামা স্কুল’। সে বছরই ওরিয়েন্টাল ও ওয়ের্স্টান মাইমের উপর একটি গবেষণা কাজ সম্পাদন করেন তারা।

ঘুরে বেড়ানোর পাশাপাশি বেশকটি টিভি প্রোগ্রামেও অংশগ্রহণ করেন তিনি। পার্থ বেশ কটি আমেরিকান, কানাডিয়ান ও ফরাসি চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন। তার অভিনীত চলচ্চিত্রগুলো হচ্ছে ‘ওয়ান ডলার কারি’, ‘জনিস এ্যান্ড জন’,‘ফার্মাসি দ্য গার্ড’, ‘দ্য মর দ্য বেলভিল’, ‘বাই বাই’। ‘বাই বাই’ জিতে নিয়েছে ২৬টি আন্তর্জাতিক পুরস্কার পেয়েছে। শুধু তাই নয়, সারাবিশ্বের ৫টি উৎসবেও প্রদর্শিত হয়েছে সিনেমাটি।
মূকাভিনয়ে বিশেষ কৃতিত্বের জন্য পার্থ ১৯৮৭ সালে তিনি কলকাতা যোগেশ মাইম একাডেমি থেকে ‘মাস্টার অব মাইম’ উপাধি অর্জন করেন। ১৯৮৮ সালে তিনি একক মূকাভিনেতা হিসেবে এথেন্স, নিউইয়র্ক, ডেনমার্ক, সুইডেনসহ বিভিন্ন দেশের পক্ষ থেকে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি লাভ করেন। মালয়েশিয়া থেকে মিলেছে ‘মাস্টার অব ওয়ার্ল্ড’ সম্মাননা। ২০১০ সালে বাংলাদেশ সরকারের একুশে পদক দেওয়া হয় তাকে। ২০১১ সালে ফ্রান্স সরকারের নাইট উপাধিতে ভূষিত হন তিনি।
সারা বিশ্ব মাতিয়ে পার্থ এবার বাংলাদেশেও মূকাভিনয় চর্চা ছড়িয়ে দিতে চান। তার মতে, বাংলাদেশে এ শিল্পের চর্চা সঠিকভাবে হচ্ছে না। এর কারণ হিসেবে, শিল্পীদের অনীহা ও পৃষ্ঠপোষকতার অভাবকে দায়ী করেন তিনি। তবে এতে হতাশ নন তিনি।

/ALTERNATES/w620/partho-2.jpg” width=”400″ />

কিছুদিন আগে বাংলাদেশ ঘুরে গেছেন এই মহান শিল্পী এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, “আমার বহুদিনের ইচ্ছা একটি মাইম ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা করব। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে কিছু মানুষ মূকাভিনয় চর্চা করছে। তাদের সবাইকে একত্র করে প্রশিক্ষণ দেব। তারাই নতুন শিল্পী তৈরি করবেন। এতে শিল্পটির বিকাশ হবে।” এ বিষয়ে ইতোমধ্যেই সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ে আবেদন জানিয়েছেন। সংস্কৃতিমন্ত্রীরও সাড়া মিলেছে। এই মাইম ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠার জন্য তিনি সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি বেসরকারি উদ্যোক্তাদেরও এগিয়ে আসার আহ্বান জানান।

তার আহ্বানে সারা দিয়ে যদি সরকার এবং বেসরকারি প্রতিষ্টানগুলো এগিয়ে আসে তাহলে বলা যায় অচিরেই আমাদের দেশে মূকাভিনয়ের জনপ্রিয়তা যেমন বাড়বে তেমনি একটি শিল্পের বিকাশ তথা কর্মসংস্থানের ও সৃষ্টি হতে পারে ।।

সুত্রসমুহঃ
http://bangla.bdnews24.com/glitz/article741591.bdnews

http://bn.wikipedia.org/wiki/%E0%A6%AA%E0%A6%BE%E0%A6%B0%E0%A7%8D%E0%A6%A5_%E0%A6%AA%E0%A7%8D%E0%A6%B0%E0%A6%A4%E0%A7%80%E0%A6%AE_%E0%A6%AE%E0%A6%9C%E0%A7%81%E0%A6%AE%E0%A6%A6%E0%A6%BE%E0%A6%B0

http://as.wikipedia.org/wiki/%E0%A6%AE%E0%A7%82%E0%A6%95%E0%A6%BE%E0%A6%AD%E0%A6%BF%E0%A6%A8%E0%A6%AF%E0%A6%BC#.E0.A6.AE.E0.A7.82.E0.A6.95.E0.A6.BE.E0.A6.AD.E0.A6.BF.E0.A6.A8.E0.A6.AF.E0.A6.BC.E0.A7.B0_.E0.A6.87.E0.A6.A4.E0.A6.BF.E0.A6.B9.E0.A6.BE.E0.A6.B8

http://prokasik.wordpress.com/2010/05/12/%E0%A6%AE%E0%A7%82%E0%A6%95%E0%A6%BE%E0%A6%AD%E0%A6%BF%E0%A6%A8%E0%A7%9F/

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

১০ thoughts on “শিল্পের সাতকাহন- মূকাভিনয় এবং একজন বীরের গল্প ………

  1. পার্থ প্রতিম কি বাংলাদেশে
    পার্থ প্রতিম কি বাংলাদেশে বর্তমানে একমাত্র মুকভিনেতা ।আর কেউ কি আছে?এ ব্যাপারে কিছু জানেন?

    1. না বাংলাদেশে অনেক থিয়েটার
      না বাংলাদেশে অনেক থিয়েটার বর্তমানে এই শিল্প নিয়ে কাজ করে এছাড়া মাগুরায় মূকাভিনেতা রণেন চক্রবর্তী অনেক প্রখ্যাত একজন মানুষ http://www.prothom-alo.com/bangladesh/article/5873/%E0%A6%AE%E0%A6%BE%E0%A6%97%E0%A7%81%E0%A6%B0%E0%A6%BE%E0%A6%AF%E0%A6%BC_%E0%A6%AE%E0%A7%82%E0%A6%95%E0%A6%BE%E0%A6%AD%E0%A6%BF%E0%A6%A8%E0%A7%87%E0%A6%A4%E0%A6%BE_%E0%A6%B0%E0%A6%A3%E0%A7%87%E0%A6%A8_%E0%A6%9A%E0%A6%95%E0%A7%8D%E0%A6%B0%E0%A6%AC%E0%A6%B0%E0%A7%8D%E0%A6%A4%E0%A7%80 -পড়ে দেখতে পারেন ।।

  2. দারুন পোষ্ট। চুয়েটেও একবার এই
    দারুন পোষ্ট। চুয়েটেও একবার এই মুকাভিনয় দেখেছিলাম। যারা পারফর্ম করেছিল, আমি জানতাম ওরা আমাদের জুনিয়র। দারুন লেগেছিল ওদের প্রেজেন্টেশনটা। ওদের পারফরমেন্স দেখার আগে এই সম্পর্কে আমার কোন ধারনাই ছিল না। না দেখলে আসলে এটার ব্যাপারে বলে বোঝানো যাবে না। পোষ্ট প্রিয়তে নিলাম।

  3. অসাধারণ একটা পোস্ট!! মাইমকে
    অসাধারণ একটা পোস্ট!! মাইমকে শ্রদ্ধা জানায়, শ্রদ্ধা প্রিয় পার্থ প্রতিমকে :salute: :salute: :salute: :salute: :salute: :salute: :salute: :salute: :salute: :salute: :salute:

    আপনাকে এমন একটি কাজ করার জন্যে প্রণাম!! দুর্দান্ত একটা কাজ করেছেন!! :বুখেআয়বাবুল: :বুখেআয়বাবুল: :গোলাপ: :গোলাপ: :গোলাপ: :ফুল: :ফুল: :ফুল: :রকঅন: :রকঅন: :রকঅন: :রকঅন: :salute:

    এমন দুর্দান্ত একটা পোস্টকে মাইমকে উৎসর্গ করেই স্টিকি করা উচিৎ…
    প্রিয় মাস্টার সাব বিবেচনায় নিবেন!!

  4. চমৎকার একটি পোস্ট দিয়েছেন
    চমৎকার একটি পোস্ট দিয়েছেন পথিক ভাই। অনেক অজানা বিষয় জানতে পারলাম… :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :তালিয়া: :তালিয়া: :তালিয়া: :তালিয়া: :তালিয়া: :তালিয়া: :তালিয়া: :ফুল: :ফুল: :ফুল: :ফুল: :ফুল: :ফুল: :ফুল:

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

− 3 = 5