ফ্লাইট ২২৭ এবং পাবলিক ট্রাষ্ট

সকাল ৯ টা । থেকে থেকে বিদ্যুৎ চমক সহ মাঝারি বৃষ্টি হচ্ছে । এমন দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার মধ্যে ক্যাপ্টেন হুইপ হুইটেকার তার সহকর্মী ও কেবিন ক্রু সহ ১০২ জন যাত্রী নিয়ে ওরল্যান্ডো থেকে আটলান্টার উদ্দেশে পূর্বনির্ধারিত সাউথজেট এয়ারলাইন্সের ফ্লাইট ২২৭ আকাশে উড়াল দেয় । ৯ হাজার ফুট উঁচুতে ওঠার পর বৃষ্টি ও তীব্র বাতাসের খারাপ আবহাওয়া পার হওয়ার জন্য নির্ধারিত কোর্স থেকে ৩০ ডিগ্রী সরে গতি বাড়িয়ে আরও উঁচুতে উঠতে উঠতে সুদীর্ঘ অভিজ্ঞতার দক্ষ হাতে বিমান সামলিয়ে সূর্যের আলোকপূর্ণ ভালো আবহাওয়ার দেখা মিললে, সবাই সস্তির নিঃশ্বাস ফেলে । যাত্রীরা হাততালি দিয়ে ক্যাপ্টেন হুইপ হুইটেকারের দক্ষতার জবাব দেয় ।

সব ঠিকমতো চললে ক্যাপ্টেন তার কো-পাইলটের উপর দায়িত্ব দিয়ে হালকা ঘুমিয়ে রেস্ট নিতে থাকে । ২৬ মিনিট পর হঠাৎ বড় একটা ধাক্কা খায় সবাই । পাইলট ও কো-পাইলট বিমানের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে । ৩১ হাজার ফুট উঁচু থেকে বিমান সোজা নিচের দিকে নামতে থাকে । আতঙ্ক আর মৃত্যুভয়ে সবাই চিৎকার চেঁচামেচি করতে থাকে । কন্ট্রোল টাওয়ারে যোগাযোগ করে ইমারজেন্সি ঘোষণা করে নিকটস্থ এয়ারপোর্টে ল্যান্ডিং অনুমতি চাওয়া হয় । নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাওয়ার জন্য ল্যান্ডিং গিয়ার খুলে দেয়া হয়, ফুয়েল ডাম্প করা হয় । বিমান খাড়াভাবে নিচের দিকে নামতে নামতে মাটি থেকে ১০ হাজার ফুটে; এরপর ৯, ৮ এমন করে নামতেই থাকে ।

ক্যাপ্টেন হুইটেকার ঠাণ্ডা মাথায় বিমানের পতন ঠেকিয়ে কন্ট্রোল ফিরে পাওয়ার জন্য কেবিন ক্রু ও কো-পাইলটের সহায়তায় ম্যানুয়াল কন্ট্রোল ব্যাবহার করে বিমানটিকে ৩০ ডিগ্রী ঘুরিয়ে উল্টো করে ফেলেন । এতে কাজ হয়, পতন ঠেকানো যায় । কিন্তু সবাই উল্টো হয়ে ঝুলে থাকে বিমানের মধ্যে । কন্ট্রোল পেয়ে উল্টো করেই বিমানটিকে উড়াতে থাকেন ক্যাপ্টেন হুইটেকার । আগুন ধরে যাওয়ায় চারটে ইঞ্জিনই বন্ধ করে দিতে হয় । মাটির আরও কাছে আসতে থাকে বিমানটি । এভাবেই মাটিতে ল্যান্ড করাতে হবে তাই ক্যাপ্টেন আবারো বিমানটি ঘুরিয়ে সোজা করে সামনের ঘেসো জমির দিকে তাকান । একটি পাখা উঁচু গির্জার বিল্ডিংয়ের মাথায় লেগে ভেঙে যাওয়ার কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই বিমানটি ল্যান্ড-ক্র্যাশ করে মাটিতে । এবং ১০২ জন মানুষের মধ্যে ৪ জন যাত্রী ও ২ জন কেবিন ক্রু সহ মারা যায় মাত্র ৬ জন । বাকী ৯৬ জনের হালকা ও মাঝারি ক্ষতি হলেও বেঁচে যায় । হিরো বনে যায় ক্যাপ্টেন হুইপ হুইটেকার । কেননা এমন দুর্ঘটনায় পড়ার পরও দক্ষতার সাথে বিমান নিয়ন্ত্রণ ও প্রাণহানি সংখ্যা খুবই নগণ্য ।

বলছিলাম ২০১২ সালের “ফ্লাইট” নামক ছবির কথা । ক্যাপ্টেন হুইপ হুইটেকারের ভুমিকায় অভিনয় করেন ড্যানজেল ওয়াশিংটন । ছবিতে তিনি একজন দক্ষ ও অভিজ্ঞ পাইলট, যে কিনা বিমান চালানো শিখেছে তার বাবার ব্যাক্তিগত পুরানো সেসনা বিমানে । কিন্তু সে ছিল অ্যালকোহোলিক, মদ-বিয়ার-কোকেন ছাড়া তার চলত না । সে মাদকের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছিল এবং এ কারনে তার পরিবারও তাকে ছেড়ে চলে যায় ।

সে যাই হোক, দুর্ঘটনার তদন্ত শুরু করে এনটিএসবি, ন্যাশনাল ট্রান্সপোর্টেশন সেফটি বোর্ড । পাইলট সহ কেবিন ক্রুদের ইনটক্সিকেশন রিপোর্টে শুধুমাত্র ক্যাপ্টেন হুইটেকার পজেটিভ হন । অ্যামেরিকার আইনে যেখানে দশমিক শূন্য ৮ (0.08) মাত্রায় পজেটিভ হলেই যে কোন ধরনের ড্রাইভিং দণ্ডনীয় অপরাধ, সেখানে তার নমুনায় পাওয়া যায় দশমিক ৩২ (0.32) এর বেশী । এদিকে পাইলট এ্যাসোসিয়েশনের তার পুরানো বন্ধু তার পক্ষে আইনজীবী নিয়োগ করে । তারা ক্যাপ্টেনের ইনটক্সিকেশন রিপোর্ট নষ্ট করে ফেলে । কারন হুইটেকার দক্ষতার সাথে এতোগুলো জীবন বাঁচালেও মাদকে আসক্তির কারনে তার জেল হবে । এনটিএসবির তদন্তে বেরিয়ে আসে, বিমানের টেল ফিনের একটি স্ক্রু ক্ষয়ে যায়, যেটি ঠিক করার কথা ছিল ১৮ মাস আগে । সেই স্ক্রু ভেঙে যাওয়ার কারনে টেল ফিন ভেঙে দুর্ঘটনার সুত্রপাত হয় । দুর্ঘটনার সময়কার বিমানটির অবস্থা ১০ বারের বেশী পর্যবেক্ষণ করে দেখতে পায় যে, এমন দুর্ঘটনায় অন্য পাইলটরা একবারও এমন সেফ ল্যান্ডিং করতে পারে না এবং সেখানে টোটাল ড্যামেজ হয় । খোলা শুনানিতে বোর্ড বিমানের ত্রুটি থাকার কথা ঘোষণা করে, এবং ক্যাপ্টেন হুইটেকারের এমন বিরল দক্ষতার ভূয়সী প্রশংসা করে । সেই সাথে বিমানের ট্র্যাস ক্যানে পাওয়া ভদকার খালি দুইটা শিশির কথা তুলে ধরে ক্যাপ্টেনের মতামত জানতে চায় । হুইটেকারের আইনজীবী তার ইনটক্সিকেশন রিপোর্ট নষ্ট করে ফেলার দরুন, ক্যাপ্টেন এর মতামতের ভিত্তিতে এর দায় গিয়ে পড়বে মূলত দুর্ঘটনায় নিহত এক কেবিন ক্রুর উপরে, যার সাথে ক্যাপ্টেন হুইটেকার ফ্লাইটের ঠিক আগের রাতটি কাটায় এক বিছানায় ।

কিন্তু শেষপর্যন্ত বিবেকের তাড়নায় ক্যাপ্টেন হুইপ তার নিজের অ্যালকোহল আসক্তির কথা স্বীকার করে । আর “পাবলিক ট্রাষ্ট” অর্থাৎ বিমান, ট্রেন, বাস ইত্যাদি সকল পাবলিক ট্রান্সপোর্টের চালকরা মদ্যপান করে না, সাধারণ মানুষের এই বিশ্বাস ভাঙার দায়ে যান্ত্রিক ত্রুটির কারনে দুর্ঘটনা কবলিতি বিমানটিকে দীর্ঘ অভিজ্ঞতার আলোকে দক্ষতার সাথে নিয়ন্ত্রণ করে এতোগুলো মানুষের জীবন বাঁচানোর পরও জেলে যেতে হল ।

এবার ফিরে আসি আমার সোনার বাংলাদেশে । এদেশেও প্রতিদিন নিয়ম করে গাড়ী দুর্ঘটনায় মানুষ মারা যাচ্ছে । যদিও আমাদের ড্রাইভাররা তেমন মদ্যপ না, কিন্তু পাবলিক ট্রাষ্ট ভাঙার দায়ে বিচার তো দূরের কথা, দুর্ঘটনার কারন অনুসন্ধান ও মানুষ হত্যার জন্যও তাদের কোন বিচার হয় না । শুধু সড়ক দুর্ঘটনা কেন, নিয়মিত বিরতিতে গার্মেন্টস কারখানাগুলোতে দুর্ঘটনায় মানুষ মারা যাচ্ছে এতে করে গার্মেন্টসে কাজ করে খাওয়া সাধারণ মানুষগুলো গার্মেন্টসের উপর থেকে আস্থা হারাচ্ছে, কিন্তু আস্থা হারানোর বিচার তো দূরে থাক, মানুষ যে মারা যাচ্ছে তারই কোন বিচার হয় না । শেয়ার বাজারে সাধারণ জনগণ আস্থা নিয়ে ব্যাবসা করার জন্য বিনিয়োগ করে । কিন্তু ম্যাকানিজম করে শেয়ার বাজার থেকে সাধারণ জনগণের টাকা চুরি করে যারা নিজেদের পকেট ভারী করেছে তাদের কিছুই হয় না । জনগণের আস্থা ভাঙার দায়ে বিচার তো দূরের কথা, চুরি করার দায়ে চোরের বিচারই তো হয় না । আবার ব্যাংকগুলোর যে ঋণ কেলেঙ্কারি, সেই কেলেঙ্কারির মাধ্যমে তারা প্রতিনিয়ত জনগণের আস্থা ভঙ্গ করছে । কিন্তু সেই কেলেঙ্কারির বিচারই তো হয় না, দূরে থাকল পাবলিক ট্রাষ্ট ভাঙার দায়ে বিচার ।

সবচেয়ে বেশী পাবলিক ট্রাষ্ট ভাঙছে রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানসমূহ, যা পুরো দেশেরই দায়িত্ব আছে । এই রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলো প্রতিদিন এদেশের ১৬ কোটি সাধারণ জনগণের আস্থা ভাঙছে । জনগণ এদেরকে বিশ্বাস করে ভোট দেয় দুর্নীতি কমানোর জন্য, কিন্তু এরা উল্টা দুর্নীতির রেকর্ড করে জনগণের বিশ্বাস ভঙ্গ করে । সেই জনগণের বিশ্বাস ভাঙার বিচার তো দূরে থাকল, দুর্নীতিরই কোন বিচার হয় না । জনগণ এদেরকে বিশ্বাস করে ভোট দেয় জান-মালের নিরাপত্তার জন্য । কিন্তু এরা প্রতিনিয়ত জনগণের বিশ্বাস ভঙ্গ করে জনগণের জান-মালের ক্ষতি করে । জনগণের জান-মালের ক্ষতির বিচারই তো এদেশে হয় না, জনগণের বিশ্বাস ভাঙার বিচার হবে কিভাবে ? জনগণ বিশ্বাস করে তাদেরকে ভোট দেয় জনগণের মৌলিক অধিকার রক্ষার জন্য । কৃষক বিশ্বাস করে তাদের ভোট দেয় ফসলের ন্যায্য মূল্য পাবার জন্য । বেকাররা বিশ্বাস করে তাদেরকে ভোট দেয় কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য । কিন্তু তারা উল্টো কাজ করে প্রতিদিন জনসাধারণের আস্থা ভাঙছে ।

ছবিতে “পাবলিক ট্রাষ্ট” ভাঙার দায়ে একজন ব্যাক্তি ক্যাপ্টেন হুইপ হুইটেকারকে বিচারের মুখোমুখি হতে হয় । কিন্তু এদেশের শুধু ব্যাক্তি নয়, সরকারী-বেসরকারি প্রতিটা প্রতিষ্ঠান, এমনকি সরকার নিজেও ১৬ কোটি “সাধারণ জনগণের আস্থা” ভাঙার দায়ে দায়ী, কিন্তু তার কোন বিচার নেই, নেই কোন প্রতিকার ।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

১৫ thoughts on “ফ্লাইট ২২৭ এবং পাবলিক ট্রাষ্ট

  1. আমি প্রথম মনে করছিলাম মুভি
    :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ:
    আমি প্রথম মনে করছিলাম মুভি রিভিউ লিখছেন। পুরা পোস্ট পড়ে মাথা ঘুইরা গেছে। আসল কথা এত সুন্দরভাবে উপস্থাপন করছেন, না পড়লে বুঝতে পারতাম না। ভাল লিখেছেন ভাই। শেয়ার দিলাম।

    আর হ্যাঁ, ইস্টিশনে আপনাকে স্বাগতম। :ফুল:

    1. মুভির থিমের সাথে আমাদের
      মুভির থিমের সাথে আমাদের সমাজের অবস্থার তুলনা করার চেষ্টা করেছি মাত্র । ধন্যবাদ দুলাল ভাই ।

  2. অসম্ভব ভালো লেগেছে ভাই।
    অসম্ভব ভালো লেগেছে ভাই। ইস্টিশনে আপনাকে স্বাগতম। এই লেখাটা যদি প্রতিটা পাবলিককে ধরে ধরে পড়াতে পারতাম তাহলে মনে হয় ভালো হত। :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ:

  3. মুভির সাথে আমাদের দেশের দারুন
    মুভির সাথে আমাদের দেশের দারুন একটা তুলনামূলক রিভিউ তুলে ধরেছেন। আপনার লেখার হাত অসাধারণ। লেখার মধ্যে টানটান একটা ভাব আছে, যা পাঠককে শেষ পর্যন্ত ধরে রাখতে পারে। :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ:
    নিয়মিত লেখা চাই ইস্টিশনে। স্বাগতম :ফুল:

  4. ল্যাখা ভালা পাইছি। গো এহেড।
    ল্যাখা ভালা পাইছি। গো এহেড। :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ:
    এই দেশের কথ কইয়া আর কি হইব। আমগো পাড়ার এক দোকানদার একবার কইছিল, রুটি বেলার সময় দুমড়ায়া গেলে আবার মুঠের মধ্যে নিয়া সাইজ কইরা বেলা শুরু করতে হয়। দেশটা ঠিক করতে হইলে এই স্ট্রাকচারে আর হইব না। পুরাটা ভাইঙ্গা নতুন কইরা বানান লাগব।

    1. ধন্যবাদ আনিস ভাই । একমত আপনার
      ধন্যবাদ আনিস ভাই । একমত আপনার সাথে, নতুন করে শুরু করতে হবে । কারন আমাদের এই সিস্টেম অলরেডি ভেঙে পড়েছে ।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

48 + = 52