রাজাকাররা ও তাদের সন্তানেরা

ক্লাশ এইটে পড়ার সময় আমি প্রথম রাজাকার দেখি। মোটামুটি বড় ধরনের রাজাকার।ইয়াহিয়ার সঙ্গে একদল লোকের মাঝে একজন জিন্না টুপি পরা লোককে আমার বন্ধু আঙ্গুল দিয়ে দেখালো, এইটা আমার দাদা! সে চাপা গলায় বিব্রতভাবে বলল, আমার দাদা, বাবা দুজনেই রাজাকার ছিলেন…।

একদিন টিফিনের সময় স্কুল থেকে রাতুলদের (ইচেছ করেই নামটা পাল্টে দিলাম) বাসায় গিয়েছিলাম ভাত খেতে। রাতুলই খুব পিড়াপিড়ি করে আমাদের কয়েকজনকে ডেকে নিয়ে যায়। ফটোগ্রাফটা অবশ্য সে আমাকে একা ডেকে নিয়ে গিয়ে দেখায়।যেন গোপন একটা পাপকে সে আমার কাছে প্রকাশ করছে এমনভাবে দেয়ালের ফটোটাকে দেখালো। আমাকে বলল, কাউকে বলবি না কিন্তু…।

একটু পরে ফটোগ্রাফি থেকে বাস্তবে দেখলাম রাতুলের দাদাকে। ড্রয়িংরুমে বসে কাগজ পড়ছেন। এর আগে বিটিভির নাটক আর আমাদের পাড়ার বিজয় দিবসের অনুষ্ঠানে পাড়ার বড়ভাইরা মুক্তিযোদ্ধা আর রাজাকার সাজতেন, সেই রাজাকার ছিল একটা গ্রাম্য কমেডি চরিত্র, টেলিভিশনের রাজাকাররাও একটা টাইপে ধরা দিতো, বাস্তবের রাজাকাররা কেমন সেটা দেখলাম। আমাদের সঙ্গে কথা বললেন তিনি। কে কোথায় থাকি, বাবা কি করেন এই সব জিজ্ঞেস করলেন। কয়েকটা মার্কেট, একাধিক পেট্রল পাম্প, গার্মেন্টস প্রতিষ্ঠানের মালিক যিনি তার নাতি কাদের সঙ্গে চলছে সে খবর তো নিবেনই।

রাতুলকে এরপর থেকে আমার কেমন জানি একটু ঘেন্না লাগতো! সেই ছোট বয়েসেই “রাজাকারের বাচ্চা” গালিটা পৃথিবীর কুৎসিততম গালি বলে মনে হতো।কিন্তু কারুর বাবা রাজাকার হলেই তাকে ঘৃণা করতে হবে? এই পৃথিবীতে তার কি সম্মান নিয়ে, মানুষের ভালবাসা নিয়ে বাঁচার অধিকার নেই? রাতুল আমার এমন ভক্ত, এমনই বংশবদ যে আমাকে সে ছায়ার মত অনুসরণ করে। সে প্রায় সময়ই বলতো, তোর মত বন্ধু পেয়ে নিজেকে আমি ভাগ্যবান মনে করি জানিস?

আমার শুধু সেই ছবিটার কথা মনে পড়ে যায়।ওর দাদা আর বাবা কতটা নৃসংস ছিল জানি না।তবে একাত্তর ওদের ধনী করেছিল।আমি পরে শুনেছিলাম, ওর বাপ-দাদার কারণে ইন্ডিয়া থেকে ট্রেনিং করে আসা কয়েকটা ছেলেকে পাকিস্তানী মেলেটারির হাতে ধরা খেতে হয়।তারা কেউ আর জীবন্ত ফিরে আসেনি…।

রাতুল ছোটবেলায় ওর বাবা আর দাদার রাজাকার পরিচয়কে লুকোতে চেয়েছে। কিন্তু এই ২০১৩ সালে ওকে নাকি বলতে শোনা গেছে, তারা পাকিস্তানের পক্ষে ছিল, অন্যরা বাংলাদেশের পক্ষে ছিল, তার জন্য আবার বিচার কি? আমরা মানুষ মারলে তারাও তো মারছে! কেউ অন্যায়ভাবে দেশের বিপক্ষে গেলে রিএ্যাকশন তো হবেই।পাকিস্তান বৈধ্য রাষ্ট্র, যারা তখন বাংলাদেশ আন্দোলন করছিল তারাই তো অবৈধ্ ছিল… ।

কয়েকজন বন্ধুর মুখে শুনেছি এসব গল্প। রাতুলের সঙ্গে এখন আর কথা হয় না। যোগোযোগ নেই। মাঝে মাঝে হঠাৎ রাস্তায় ব্রেক কষে গাড়ি থামায় শিল্পপতি রাতুল! আমাকে দেখে বলে, আয় তোকে নামিয়ে দিবো…। আমি রাজি হই না।নানা রকম অজুহাত দেখাই।হ্যাঁ, ওকে একটু ঘৃণাই করি। আমি এখনো হয়ত মুক্তমনের হতে পারিনি। রাজাকারদের সন্তানদের প্রতি খোলা মন আমার আসে না।আমি জানি, রাতুল ওর বাপ-দাদার জন্য এখন গর্বই করে…।

আমাদের বাসায় যে প্রাইভেট মাস্টার এসে আমাদের অংক করাতো সেই স্যারের সঙ্গে আমার তর্ক লেগে যেতো রোজ। তখন গণআদালতে গোলাম আযমের বিচার হবে।জাহানারা ইমাম আমাদের চেতনা জাগনিয়া জননী।বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ, সেই যুদ্ধের চেতনা দিয়ে তিনি একটা প্রজন্মকে জাগিয়েছিলেন। বাড়িতে তখন ভোরের কাগজ রাখা হতো। রোজ সেখানে একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির কর্মসুচী মনোযোগ দিয়ে পড়তাম।স্যারকে দেখি এই আদালতকে সমালোচনা করতে। এটা নাকি প্রচলিত আদালতকে অবজ্ঞা। তাছাড়া একজন বৈধ নাগরিকের (গোলাম আযম) নাগরিত্ব বাতিলের দাবী নাকি অযৌক্তিক! জীবনের প্রথম সুশীল বাক্য শোনার অভিজ্ঞতা হয় আমার তখনই। ছোটবেলার এই অভিজ্ঞতার পর থেকেই যখন মুক্তিযুদ্ধ প্রশ্নে কেউ সুশীল সুলভ মন্তব্য করে আমার মন কৌতুহলী হয়ে উঠে।মনে মনে প্রশ্ন করি, বাপে কি করতো একাত্তরে?… বাবা একদিন বাসায় বললেন, মনসুরের (স্যারের নাম) বাবা তো রাজাকার ছিল! আড়াইহাজারে ওর বাবাকে মনা রাজাকার নামে সবাই চিনে!…

নাটক-সিনেমায় দেখায় রাজাকারের সন্তানরা বাবার কুর্কীতিতে ক্ষুব্ধ মনোভাব প্রকাশ করে।নিজের বাবার রাজাকার পরিচয়কে নিজের জীবনের জন্য গ্লাণিকর মনে করে। বাস্তবের রাজাকারের সন্তানদের দেখেছি সামাজিকভাবে এখনো তাদের বাবাদের রাজাকার পরিচয় নিয়ে প্রকাশ্যে গর্ব করতে পারে না ঠিকই তবে নিজেদের মধ্যে তাদের অনেক গর্ব। স্বয়ং রাজাকাররাও যে তাদের অবস্থানে ঠিক আগের মতই আছে, এখনো তারা মনে করে তারাই সঠিক ছিল এবং বাংলাদেশ একটা ভুল সৃষ্টি, তা জানলাম কয়েক বছর আগে আরো একবার।

সুন্দরবন যাবো বেড়াতে। খুলনার বাগেরহাটে এক সদ্য পরিচয়ের বন্ধুর বাড়ি। ঠিক হলো ওর বাড়িতে গিয়ে উঠা হবে প্রথমে, সেখান থেকে সুন্দরবন যাবো। বিঘে বিঘে জমির উপর চিংড়ির ঘের বন্ধুদের। এদের বংশীয় পদবী হাওলাদার, আমরা হলাম হাওলাদার বাড়ির অতিথি। এরা এখানে খুবই প্রভাবশালী। সন্ধ্যের মধ্যে জানলাম হাওলাদাররা একটা রাজাকার পরিবার। বন্ধুর বাবা প্রথমদিনেই সন্ধ্যার পর যখন আমাদের সঙ্গে পরিচয় হতে এলেন তখন ঢাকার রাজনীতির খবর কি জানতে চেয়ে অকপটে তার রাজনৈতিক বিশ্বাসকে আমাদের কাছে প্রকাশ করলেন। আমি বিস্ময়ে বিমূঢ হয়ে গেলাম। তিনি বললেন, আমরা মুসলিম লীগ করতাম। আমি নিজে রাজাকার ছিলাম। আমরা বাংলাদেশের পক্ষে ছিলাম না। এখন আমরা বিএনপি করি।আমার বড় ভাই উপজেলা চেয়ারম্যান।আমরা সবাই রাজনীতির লগে জড়িত…।

বন্ধু পরে বলল, আব্বা সেরকম রাজাকার ছিল না। তখন তো তার অল্প বয়েস, না বুঝে যোগ দিয়েছিল।… কিন্তু পুরো ঘটনা শোনার পর মনে হয়নি সে ছোটখাট রাজাকার ছিল। ওর কাছ থেকেই জানলাম, মুক্তিযোদ্ধারা ওর বাবাকে পিটিয়ে মেরে মৃত মনে করে খালে ফেলে দেয়।ওদের বাড়ি-ঘর জ্বালিযে দেয়।ওর বাবা ভাসতে ভাসতে ভিন্ন গ্রামে গিয়ে ঠেকলে ভাগ্যক্রমে এক করিবাজ ভদ্রলোক তাকে দেখতে পায়। তিনিই উদ্ধার করে সুস্থ করে তোলেন। এই কবিরাজ ভদ্রলোকই পরবর্তীকালে বন্ধুর নানা হন। ৭৫ সালের আগে বন্ধুর বাবা গ্রামে প্রবেশ করতে পারেননি গ্রামের মুক্তিযোদ্ধাদের একটা গ্রুপের কারণে। কতটা জ্বালাতন করলে কোন রাজাকারের প্রতি এতটা কঠর হতে পারে মানুষ? বাড়ি-ঘর জ্বালিয়ে দেয় কতটা ক্ষোভ থেকে? নৃসংশ এই রাজাকারদের কপাল খুলে যায় ৭৫ সালের রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের কল্যাণে। সেই মুক্তিযোদ্ধাদের গ্রুপ আজ আর নেই। তাদের ভয়ে আজ আর কোন রাজাকার ভয়ও পায় না। মাইলকে মাইল, বিঘের পর বিঘে জমির উপর আজ রাজাকারদের চিংড়ি ঘের! গ্রামে এখন তারা সবচেয়ে প্রভাবশালী ক্ষমতাধর! ধনে, মানে তৃপ্ত একটা বৃদ্ধ গর্বভরে বলে, একাত্তরে আমরা রাজাকার ছিলাম!…

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

৩ thoughts on “রাজাকাররা ও তাদের সন্তানেরা

  1. আমার একটা ফ্রেন্ড ছিল, যার
    আমার একটা ফ্রেন্ড ছিল, যার দাদা বিখ্যাত রাজাকার (নাম বলছিনা)। তো স্কুল পর্যন্ত তার এ নিয়ে একটা লুকোচুরি কাজ করতো, কলেজে উঠে সে বালাই আর ছিলনা, গর্ব ভরেই বলত আমার দাদা অমুক!
    এখন একটা রাজাকারও বুক চিতিয়ে বলতে পারে আমি রাজাকার।
    এর থেকে লজ্জার আর কিছু হতে পারে কি?

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

4 + 1 =