আইসিটি আইনের ৫৭ ধারা, ফারাবী ও দুই কিশোর ব্লগার…

আমি আপনাদের কাছে প্রশ্ন রাখতে চাই, “ইহুদী-খ্রিস্টানরা তাদের ধর্মগ্রন্থ বিকৃত করে ফেলেছে” এই উক্তির মধ্যে ইহুদী ও খ্রিস্টান ধর্মে বিশ্বাসীদের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত লাগার মত কিছু আছে কিনা? “কোরআন বিকৃত হয়ে গেছে” -এই উক্তি কি কোন বিশ্বাসী মুসলিমের ভাল লাগবে? লাগবে না। কাজেই কোন ইহুদী-খিস্টানের এই উস্কানিমূলক বক্তব্য প্রচার অনুচিৎ কাজ হবে। কেউ করলে সে সাম্প্রদায়িক সম্প্রতির পরিবেশ বিঘœ ঘটার জন্য দায়ী থাকবে। এই দুটি ধর্ম যেহেতু ইসলামের আগে এসেছে কাজেই ইসলাম তাদের প্রসঙ্গিক নয়। তাদের ধর্মগ্রন্থে ইসলাম বিষয়ে সংগত কারণেই কোন উল্লেখ নাই। কিন্তু ইসলাম ইহুদী-খ্রিস্টানদের নিয়ে মাথা ঘামায় নিজের সত্যতা প্রতিষ্ঠা করার জন্য। এ জন্য “ইহুদী-খ্রিস্টানরা তাদের ধর্মগ্রন্থ বিকৃত করে ফেলেছে” -এই উক্তি বর্জন করলে ইসলামের প্রচার ও ভিত্তিই নড়বড়ে হয়ে যাবে! এই কথা না বললে ইহুদী-খ্রিস্টান ধর্মকে স্বীকার করে তাদের গ্রহণযোগ্যতাকে অস্বীকার করা যাবে না! কাজেই অন্যের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত লাগলেও মুসলিমদের কিছু করার নেই!

এত কথা বললাম চট্টগ্রামে অনলাইনে “ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেয়ার” অভিযোগে তৌহদী জনতা দুজন ব্লগারকে পিটিয়ে আধমরা করে পুলিশের হাতে তুলে দেয়া প্রসঙ্গে। তথ্য ও প্রযুক্তি আইন নামে ২০০৬ সনের অক্টোবরে তৎকালীন বিএনপি সরকার ‘তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইন ২০০৬’ নামে একটি আইন করে যেখানে ৫৭ ধারা নামের একটা বিতর্কিত, বাক স্বাধীনতার প্রতি হুমকি স্বরূপ ধারা সংযোজিত করা হয় যা আবার আওয়ামী লীগ সরকার এসে আরো ভয়ংকর রূপে সেটাকে শান দেয়। এই আইনে কোন লেখককের লেখা কোন ধার্মীক ধর্মানুভূতিতে আঘাতের অভিযোগ আনলেই লেখককে আসামী করা যাবে এবং বিচারের নিস্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত এটা জামিন অযোগ্য অপরাধ! এর মাধ্যমে শুধুমাত্র স্বাধীন মত প্রকাশের কারণে একজন লেখককে ভয়ংকর অপরাধীদের কাতারে এনে ফেলা হয়েছে। বস্তুত এটাকে ব্লাসফেমি বা শরীয়ার মত করে যে কেউ ব্যবহার করতে পারবে অনলাইন লেখকদের বিরুদ্ধে। সম্প্রতি দুই ব্লগারের বিরুদ্ধে ঠিক এটাই ঘটেছে। আইনটি যখন পাস করা হয় তখন মানবাধিকার সংগঠন ও মুক্তচিন্তার অনলাইন লেখকবৃন্দ এরকমই আশংকার করেছিলেন যে এটাকে এমনভাবে ব্যবহার করা হবে যাতে দেশের মুক্তবুদ্ধির চর্চার ধারা ব্যহত হয়। অনলাইনে যে কারুর লেখা পছন্দ না হলেই এই আইনের আওতায় আনা যাবে লেখককে। যেখানে একজন লেখককে সর্বনিম্ন সাত বছর থেকে সর্বচ্চ চৌদ্দর বছর পর্যন্ত জেল খাটতে হতে পারে! এই আইনটি মৌলবাদীদের হাতে মূলত একটা অস্ত্র তুলে দেয়া হয়েছে। তারা এখন মুক্তচিন্তার লেখকদের সঙ্গে যুক্তিতে পেরে উঠতে না পারলে, চাপাতি-কুড়ালে না গিয়ে ৫৭ ধারাকে লেলিয়ে দিবে কন্ঠ রোধ করতে। মৌলবাদীরা রাফি ও উল্লাস নামি দুই ব্লগারকে ৫৭ ধারায় মামলা করতে পুলিশকে বাধ্য করেছে বলে বিভিন্ন মাধ্যম থেকে জানা গেছে। ব্লগার দুজনের বয়েস মাত্র ১৭ ও তাদের আসন্ন এইচএসসি পরীক্ষা কথা বিবেচনা না করে মহামান্য আদালত ব্লগার দুজনকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন জামিন আবেদন প্রত্যাখ্যান করে…।

এই ঘটনার মূলে রয়েছে ফারাবীর মত একটা ঘৃণ্য ধর্মান্ধ অন্ধকারের জীব যে অহরহ অন্য ধর্মকে হেয়, কুৎসা, বিদ্বেষ প্রসন করে ফেইসবুকে পোস্ট দেয়। সে কিছুদিন আগে অভিজিৎ রায়ের সদ্য প্রকাশিত আলোচিত বই “বিশ্বাসের ভাইরাস” যাতে অনলাইনে বিক্রয়ের জন্য শো করা না হয় সে জন্য রকমারী নামের একটি অনলাইন বই ওয়েবসাইটের মালিককে প্রাণনাশের হুমকি দিয়েছিল। তার ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হামলার জন্য মানুষকে প্ররচিত করেছে প্রকাশ্যে। অহরহ সে হিন্দুদের “মালাউন” বলে চরম বিদ্বেষ প্রসন করে। কিন্তু তথ্য প্রযুক্তি আইনে তার টিকিও ছোঁয়া যায় না। অথচ জামাত-শিবিরের বিরুদ্ধে লিখে মাত্র ১৭ বছরের দুই অনলাইন লেখককে জেলে যেতে হয়। তাদের ভবিষ্যতকে চরম অন্ধকারে ঠেলে দেয় রাষ্ট্র। আর ফারাবীর মত একটা উগ্র মৌলবাদী বহাল তবিয়তে প্রতিনিয়ত অন্যের ধর্মকে আঘাত করে, ব্যক্তিকে হত্যার হুমকি দিয়ে যায় অবলীলায়। এমনকি এই দুই কিশোর ব্লগারের গ্রেফতারের ব্যাপারে সে নিজে স্বীকারক্তি দিয়েছে তার পোস্টে …।

ফারাবী উত্থান কোন ব্যক্তি উম্মাদের উত্থান নয়। এই নিকের আড়ালে অনলাইনে হিংস্র মৌলবাদের উত্থান যা অনলাইনে কথিত “নাস্তিক” লেখকদেরই শুধু কন্ঠ রোধ করবে না সমস্ত মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের লেখকদের কন্ঠ রোধ করবে।

বারবার অভিযোগ করা হয় আক্রান্ত লেখকরা মুসলমানদের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করেছে। এটা যদি আমলে নেয়ার মত অভিযোগ মনে করে প্রচলিত আইন তাহলে অনলাইনে ফারাবীর মত আরো যারা মুমিন প্রতিনিয়ত ইসলাম প্রচার করছেন তাদের সকলকেই আইনের আওয়াত আনতে হয়! সেসব পোস্টে অন্য ধর্মের অনুভূতিতে আঘাতসহ ভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায়কে উদ্দেশ্য করে অশ্রাব্য গালাগালি করলেও তাদের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নেয়া হয় না। ধর্মানুভূতিতে আঘাত কি কেবল মুসলিম মৌলবাদীদের একচেটিয়া অধিকারের বিষয়?

ধর্মানুভূতিতে আঘাতের অভিযোগে যদি কোন কিছুর উপর প্রথম হস্তক্ষেপ করতে হয় তাহলে ওয়াজ মাহফিলের উপর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। আলেম সমাজের ওয়াজে হিন্দু-ইহুদী-খ্রিস্টান ধর্মের সমালোচনা, ইসলামের সঙ্গে তুলনা করতে গিয়ে অন্য ধর্মকে হেয়, তুচ্ছ করার মত বিষয়গুলোকে আমলে নিতে হয়। ফারাবীর মত হারামীকে যে মানুষকে হত্যা করার প্ররচণা জোগায় তাকে কোন সভ্য সমাজ এভাবে একের পর এক আশকারা দিয়ে রেহাই দিতে পারে না।

এদেশে জামাত শিবিরের বিরুদ্ধে লিখেও অনলাইন লেখকরা “নাস্তিক” ট্যাগ খেয়েছে। আল্লামা আহমদ শফির সমালোচনা করলেই ”নাস্তিক” তকমা এটে দেয়া হয়েছে। পাবলিক এতই ধর্মান্ধ যে শুধুমাত্র “নাস্তিক” শুনেই দুটো কিশোরকে নিমর্মভাবে পিটাতে তাদের মনে এতটুকু বাধেনি। নাস্তিকের নাম শুনে তাদের ঈমানের দান্ডা এমনই খাড়া হয়েছে যে পুলিশ এসেও সেটাকে নামাতে পারেনি। পাবলিক ৭৫ ধারায় মামলা করতে পুলিশকে বাধ্য করেছে। মুমিন এত উত্তেজিত যে ৭২ হুর না পাওয়া পর্যন্ত তার ঈমানী দান্ডা ঠান্ডা হবে না। তাই চোখে-মুখে কৌশরের সরলতা লেগে থাকা দুটো বাচ্চা ছেলেকে “নাস্তিক” শুনেই প্রায় মেরে ফেলেছিল!

এ দেশে মুক্তবুদ্ধির চর্চা আজ হুমকির সম্মুখিন। আমরা এমন এক সমাজে বাস করছি যেখানে আমাদের স্বাধীন মত প্রকাশের জন্য বিপদে পড়তে হতে পারে। প্রতি নিয়ত জামাত অনলাইনে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের বিকৃতি সাধন করছে তা নিয়ে কারুর মাথাব্যথা নেই। যেন ৫৭ ধারা শুধু “নাস্তিক” ব্লগারদের জন্য তৈরি করা হয়েছে! আপাতত “নাস্তিক” ব্লগারদের শায়েস্তা করার খবরে যারা উল্লাস করছেন তারা মনে রাখবেন, ফারাবীরা সময় ও সুযোগে তাদেরকেও মুক্তিযুদ্ধের কথা বলাকেও নাস্তিকতার ট্যাগ দিয়ে বিচার করবে। সরকারের কাছে মোল্লাদের ৮২ জন ব্লগারের লিস্টের নামগুলোর কথা বিবেচণা করলেই সেটা আন্দাজ করা যাবে। কাজেই সব মত ও পথের ব্লগাদের প্রতি আহ্বান, এই অন্যায়ের, এই দুই কিশোর ব্লগারের গ্রেফতারের প্রতিবাদ করুন। সবাই এক হন…।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

৫ thoughts on “আইসিটি আইনের ৫৭ ধারা, ফারাবী ও দুই কিশোর ব্লগার…

  1. কাদের আহবান জানাচ্ছেন,
    কাদের আহবান জানাচ্ছেন, আমাদেরকে?
    লাভ নাই! পুরো বাংলাদেশের ব্লগার/ফেসবুকার এক হলেও হবে না ।এই আইন শফি/ফারাবিদের খুশি করতে করা হয়েছে এবং ধর্মান্ধ ঐ মৌলবাদীদের কাছে সরকার কেন, পুরো রাষ্ট্রই অসহায় ।

    1. ভাই, খালি ব্লগে থেকে
      ভাই, খালি ব্লগে থেকে হাতি-ঘোড়া মারলে চলবেনা। আমাদের এখন রাজপথে নামতে হবে। নইলে ভবিষ্যতে আমরা যে কেউ এই ন্যাক্কারজনক কালাকানুনের স্বীকার হতে পারি…

  2. আমাদের লড়তে হবে সকল অন্যায়ের
    আমাদের লড়তে হবে সকল অন্যায়ের বিরুদ্ধে । যা ঠিক তা সব সময়ই ঠিক;যা ভুল তা সব সময়ই ভুল । ফলাফল কি তা জানার দরকার নেই । নৈতিকতার বিরুদ্ধে অবস্থান যেকোন কিছুই অন্যায় । আর অন্যায় প্রতিকারের উপায় একটাই আন্দোলন । আর কিছু না হোক কমসেকম নিজেদের নিরাপত্তার কথা ভেবে হলেও লড়তে হবে ……

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

6 + 2 =