নিরীশ্বরবাদ এবং ধর্মানুভুতি (১ম খণ্ড)

মানুষ সব সময়ই আবেগপ্রবণ। এটা মানুষের জন্মগত, আজীবনের পৈত্রিক সম্পত্তি সম্ভত। মানুষ আবেগের বশে ভালবাসা থেকে শুরু করে খুন পর্যন্ত করে। আজকাল তো আবেগের বশে কুকুরের লিঙ্গ লেহনও মানুষের প্রিয় কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আবেগ না থাকলে সে মানুষ না- মানুষের জাত না।

এতক্ষণে পাঠক আমার চৌদ্দ গুষ্টি উদ্ধার করে ফেলেছেন মনে মনে। ভাবছেন শালা নির্ঘাত গাঁতা খেয়ে লিখতে বসেছে নইলে এইসব নিরীশ্বরবাদের সাথে আবেগের সম্পর্ক কোন জায়গায়। কিন্তু ব্যাপার হলো আপনি এই চৌদ্দ গুষ্টি উদ্ধারের কাজটাও আবেগের বশেই করছেন।

সাম্প্রতিক সময়ে বাজারের সবচেয়ে বহুল প্রচারিত গালি হল “শালা নাস্তিক”,আবার বাজারের সবচেয়ে আকর্ষণীয় পোশাকও নাস্তিকতা। মাস দুয়েক আগেও আমার যেসব বন্ধু বান্ধবরা (বান্ধবী নাই থাকলে বলতাম ভাই) আমাকে নাস্তিক বলে গালি দিতেন আজ তারা নিজেদের কঠোর নাস্তিক এবং যুক্তিবাদী এবং মুক্তমনা বলে দাবি করছেন। এমনকি তাদের মুখবই (ফেসবুক) এও তাদের ধর্ম দিয়ে রাখছেন Atheism। পারলে অবশ্যই Bio-data তে দিতেন ( কিন্তু ওইখানে দিলে বিবাহ কিংবা চাকুরী জোটার সম্ভাবনা কম তাই হয়ত… )আপনি নাস্তিক না আস্তিক না ভণ্ড সেই ঝুট ঝামেলায় যাওয়ার বিন্দুমাত্র ইচ্ছা আমার নেই। তার চেয়ে বরং নাস্তিকতা জিনিসটা (খায় না মাথায় দেয়?) কি সেতাই বোঝাতে চেষ্টা করব।

আসলে নাস্তিকতা হল একটা অবস্থান। সেই অবস্থানটা হল ঈশ্বরের অস্তিত্বের ব্যাপারে। আপনি যখন ঈশ্বরের অস্তিত্বের বিপরীতে অবস্থান করবেন মানে ঈশ্বরের অস্তিত্বে অবিশ্বাস করবেন তখন তাকে নাস্তিকতা বলা হবে। আপনার এই অবিশ্বাস যে কোনোভাবে আস্তে পারে বা তৈরি হতে পারে ( আমি এক লোককে চিনি যিনি তার বালিকা বন্ধুকে না পেয়ে নিজেকে নাস্তিক দাবি করা শুরু করেছিলেন), হতে পারে আপনার বিচার বিবেচনায় ঈশ্বর গোবেচারা অস্তিত্ব খুঁজে পান নাই। অথবা আপনার আসলে ধর্মীয় শিক্ষা মাথায় নেয়ার যোগ্যতা নাই ( কথাটা আমি বলিনা ভাই কসম খোদার ঃপি। এটা জামাত শিবিরের কথা), যদিও এই ধর্মীয় কাহিনী বারবার আপনার আক্ষরিক অর্থেই অবিশ্বাস্য মনে হয়েছে ( গাঁজা খাইলে অবিশ্বাস্য মনে না হওয়ার কোনও কারণ নাই- এটাও আমার কথা না, কাদের কথা বুঝে নেন), কিন্তু এটা মনে রাখবেন নাস্তিকতা কখনই ধর্মীয় শিক্ষার প্রতি অবহেলার মাধ্যমে জন্ম নেয়া “বিশ্বাসের অভাব” (ধর্মের প্রতি) নয়।

আরও সহজভাবে বলতে গেলে, নাস্তিকতা হল একটা শক্ত অবস্থান যেখানে ঈশ্বর বলে কিছু নাই। কখনই এমন না যে কেউ না কেউ আছেন। Atheism শব্দটাই আসছে গ্রীক শব্দ Atheos থেকে। যার মানে হল “ without god(s)”, মুক্তচিন্তা (free thought), সন্দেহবাদী অনুসন্ধান (skeptical inquiry) আর ধর্মীয় সমালোচনা- এই কয়টা গাঁজাখুরি ব্যাপার সেপার যখন আপনার মধ্যে কাজ করবে এবং আপনি এগুল বুঝে না বুঝে (কিছু আসে ভাই যারা বঝার দরকার মনে করেন, খোদার কসম।পি) ঈশ্বরের অস্তিত্বে সন্দিহান হয়ে পড়বেন তখন আপনি নাস্তিকতা পথে, তবে নাস্তিক হন নাই। তারপরও বহু দূরের পথ বাকি আছে। বহু তাত্ত্বিক জ্ঞান কপচানোর পর অবশেষে আপনি সিদ্ধান্তে উপনীত হবেন যে ঈশ্বর টিশ্বর ভুয়া জিনিস পুরাই গাঁজাখুরি ব্যাপার ( না করে উপায় নাই ঐ বেটার অস্তিত্ব থাকলে তো পাইবেন), সামঞ্জস্যহীন ব্যাপার স্যাপারে বাধ সাধবেন (নে সেধে উপায় নাই, যৌনলীলা সাঙ্গ না কইরা বাচ্চা হওয়া, লাঠি থেকে সাপ হওয়া, আলোর দ্বিগুণ গতিতে আকাশে উঠে যাওয়া পাগলেও বিশ্বাস করবেনা)।

এখন চলুন একটু পেছন ফিরে তাকাই। আপনি বুঝতে পারছেন যে আপনি ধীরে ধীরে যুক্তিবাদী মানুষ হওয়া শুরু করছেন? আপনার প্রত্যেকটা সিদ্ধান্ত একটা যুক্তিতর্কের মাধ্যমে আসছে? আর এই যুক্তিতর্কে রাজকীয় প্রমাণ। ঐতিহাসিক প্রমাণ এমনকি বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা পর্যন্ত ঈশ্বরের অস্তিত্বের পক্ষে কিছু দেখাতে পারে নাই।
কিন্তু ব্যাপার হল এই নাস্তিকদের মধ্যেও কিছু ঝামেলা আছে। কিছু নাস্তিক ঈশ্বরের অস্তিত্বের সম্ভাবনাকেও পেরিয়ে যায়। তারা মনে প্রাণে বিশ্বাস করে যে কোনও সুনির্দিষ্ট ঈশ্বর বা সব ঈশ্বর বা যে কোনও ঈশ্বর কোনটারই অস্তিত্ব নেই এবং থাকতে পারেনা। শুধুমাত্র ঈশ্বরে অবিশ্বাস আসলে দুর্বল নাস্তিকতার পর্যায়ে পড়ে, যেখানে ঈশ্বরের অস্তিত্বে পুরোপুরি অবিশ্বাস শক্তিশালী নাস্তিকতা।

তাই যারা আসলে ঈশ্বরের অস্তিত্ব খুলেই দেখেনি তাদের নাস্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন আছে। আমি এমন অনেক নাস্তিককে চিনি যারা কোনদিন ধর্মকে এনকাউন্টার করেনি (এনকাউন্টারের আক্ষরিক বাংলা এখানে কি হবে ভেবে পাইনি বলে মূল শব্দটাই ব্যবহার করলাম)। যাইহোক এটা তেমন প্রয়োজনীয় মনে করছিনা আপাতত…
যেটা প্রয়োজনীয় সেটা হল দুর্বল আর শক্তিশালী নাস্তিকতার পার্থক্য। সবল আর দুর্বল গুবলেট হয়ে গেলে সমস্যা। যদিও কেউই নিজেকে দুর্বল দাবি করতে চায় না। যাইহোক দুর্বল নাস্তিকতা হল একদম সাধারণ সন্দেহবাদিতা বা সংশয়বাদিতা। মানে ঈশ্বরের অস্তিত্বে বিশ্বাস না করা। আর শক্তিশালী নাস্তিকতা হল সুস্পষ্ট বিশ্বাস যেখানে ঈশ্বর বলে কিছু থাকতে পারেনা। তাই কেউ যদি ভাবে যে নাস্তিক মানেই শক্তিশালী নাস্তিক তাহলে ব্যাপারটা ভুল হবে। দুইটি অবস্থানের ভিতর যথেষ্ট গুণগত পার্থক্য আছে। এটা শুধুই মাপকাঠি না। ব্যাপারটা আরও সহজ ভাবে বোঝার চেষ্টা করা যায়। ধরুন একটা বাচ্চা আজ জন্ম নিল এবং তাকে ধর্ম বা ঈশ্বর সম্পর্কিত কোনও ধরণের ধারণা দেয়া হল না। সেক্ষেত্রে সেই শিশুটি ঈশ্বরের ব্যাপারে জানেই না, বিশ্বাস করাতো অনেক দূরের বিষয়। সুতরাং এই শিশুটি নাস্তিক। অর্থাৎ প্রত্যেক শিশুই জন্মগতভাবে নাস্তিক। এবার আরেকটি শিশুর কথা আমরা ভাবি যাকে জন্মের পর ধর্মীয় জ্ঞান, শিক্ষা, ঈশ্বর ধারণা সব দেয়া হয়েছে। কিন্তু পরবর্তীতে সেই শিক্ষা মেনে নিতে পারেনি( অবশ্যই যৌক্তিক কারণে), এক্ষেত্রে শিশুটি নাস্তিক হয়ে জন্ম নিল তারপর আস্তিক হল তারপর আবার নাস্তিক। অর্থাৎ দুর্বল বা অস্পষ্ট নাস্তিকতা হল অসচেতন বা অজ্ঞভাবে ঈশ্বরের অস্তিত্বে অবিশ্বাস করা অপরদিকে সুস্পষ্ট নাস্তিকতা হল খুবই সচেতন এবং তীক্ষ্ণ বিচার বিবেচনার মাধ্যমে ঈশ্বরের অস্তিত্বে অবিশ্বাস করা। এইখানে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হল এটা যে এই সুস্পষ্ট নাস্তিকতাই হল মূলত “নাস্তিকতা”।
এই দুর্বল বা অস্পষ্ট, সবল বা স্পষ্ট এই ধারণাটা প্রথম পরিষ্কার করে তুলে ধরেন জর্জ এইচ স্মিথ। তিনি বলছেন এই দুর্বল বা অস্পষ্ট নাস্তিকতাকে বলছেন,“The absence of theistic belief without a conscious rejection of it.”
আর সবল বা স্পষ্ট নাস্তিকতাকে সংজ্ঞায়িত করছেন এভাবে,“The absence of theistic belief due to a conscious rejection of it.”

এখন কথা হচ্ছে এই , “ absence of theistic belief” জিনিসটা কি? Absence of theistic belief সব ধরণের ঈশ্বরে অবিশ্বাসীদেরকেই বোঝায় (ব্যাপারটা ল.সা.গু এর মত, কাউকে বাদ দেয়া যাবেনা)। আক্ষরিক অর্থে এই দুর্বল/ অস্পষ্ট নাস্তিকরা হল ঐ সবাল প্রাপ্তবয়স্ক লোক(আবাল সব সময়ই বাদ) যারা কোনোদিন ঈশ্বরের ব্যাপারে শুনেই নাই এবং যাদের এটা সম্পর্কে কোনও ধারণা নাই এবং অবশ্যই অবশ্যই অবশ্যই (এক হাজার অবশ্যই হওয়া দরকার) যারা কোনও ঈশ্বরে বিশ্বাস করেনা (যদিও তারা নিজেদের নাস্তিক বলেনা), যেই মানুষটা ঈশ্বর ধারণার ব্যাপারে কিছুই জানেনা সেই অবশ্যই নাস্তিক কারণ সে ঈশ্বরে বিশ্বাস করেনা।

অন্যদিকে Ernest Nagel স্মিথের এই “absence of theism” কে ধুলোয় উড়িয়ে দিয়ে বলছেন স্পষ্ট বা শক্তিশালী নাস্তিকতাই প্রকৃত নাস্তিকতা। তার আগে আমরা বরং শুক্তিশালি বা স্পষ্ট নাস্তিকতার ব্যাপারটা আরও পরিষ্কার হয়ে নেই। স্মিথ খেয়াল করেছিলেন যে শক্তিমান নাস্তিক হওয়ার জন্য এক ধরণের প্রেষণার দরকার হয়। এই প্রেষণার কিছু অংশ যুক্তিবাদের মাধ্যমে আসে (rational) । তিনি বলছেন,

“ The most significant variety of atheism is explicit atheism of a philosophical nature. This atheism contends that the belief in god is irrational and should therefore be rejected. Since this version of explicit atheism nests on a criticism of theistic beliefs, it is best described as critical atheism.”

“নাস্তিকতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈচিত্র্য হল দার্শনিক প্রকৃতির স্পষ্ট নাস্তিকতা। এই নাস্তিকতা দাম্ভিকতার সাথে দেখায় যে ঈশ্বরে বিশ্বাস পুরোপুরি অযৌক্তিক এবং অবশ্যই পরিত্যাজ্য। যেহেতু স্পষ্ট নাস্তিকতা এখানে পুরোপুরি ধর্মীয় বিশ্বাসের সমালোচনা বা প্রতিদ্বন্দ্বী তাই এটাকে সমালোচনামূলক নাস্তিকতা বলাই শ্রেয়”।
এক্ষেত্রে স্পষ্ট নাস্তিকদের তিনটি ভাগে ভাগ করা হয়েছে-
ক)এরা বলে, ঈশ্বরের অস্তিত্ব বা অতিপ্রাকৃত শক্তিতে বিশ্বাসী নয়।
খ) এরা বলে, ঈশ্বরের অস্তিত্ব নাই এবং তার অস্তিত্ব থাকা অসম্ভব।
গ) এই ভাগের লোকজন ঐশ্বরিক অস্তিত্বের কোনও আলোচনাতেই যেতে চায়না বা বারণ করেন, তারা বলে এটা গ্রহণযোগ্য কোনও বিষয়ই না- তাই সমালোচনার নামে সময় নষ্ট করার কোনও মানে হয়না।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

২ thoughts on “নিরীশ্বরবাদ এবং ধর্মানুভুতি (১ম খণ্ড)

  1. হায় হায়… কি নিয়ে লিখলেন?
    হায় হায়… কি নিয়ে লিখলেন? দেশটা রসাতলে গেল। জামায়াতের হিট লিস্টে আপনার নাম যোগ করা হবে। এটা আপনি নিশ্চিত থাকেন।

  2. হাহাহা…কুকুরের জলাতঙ্ক রোগ
    হাহাহা…কুকুরের জলাতঙ্ক রোগ হলে তাকে মেরে ফেলতে হয়, তার ভয়ে রাস্তায় যাওয়া বন্ধ করলে কি হয়? ভাই?

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

+ 24 = 32