বিবর্তনে বাঙালি

আমাদের পূর্বপুরুষরা কোনকালে হিন্দু নমশূদ্র জাতের ছিল। ব্রাহ্মন বা উঁচুজাতের নির্যাতনে নিপীড়নে ঘর-বাড়ি ভিটে-মাটি হারিয়ে আমাদের সে পূর্বপুরুষরা প্রাণ বাঁচাতে ছুটে গেলে বন্য জানোয়ারের বাসস্হল জঙ্গলে। বনের মাঝে মাংসাশী আর বাইরে রক্তচোষা হায়েনার দল॥ এমন সময়ে এলেন কিছু ভিনদেশি(অলি-আওলিয়া)। শুনালেন শান্তির বাণী। জঙ্গলে হিংস্র মাংসাশীদের ভয়ে সেসব ভিনদেশিদের পতাকাতলে জড়ো হতে লাগলেন আমাদের পূর্বপুরুষরা। শুনলেন নতুন ‘ধর্ম’ ইসলাম এর কথা। ভগবান আর তার দূতদের(ব্রাহ্মন) হাতে নির্যাতিত আমাদের সে কুলিন নমশূদ্র জাতের পূর্বপুরুষরা হয়ে গেলেন আল্লাহর গোলাম ‘মুসলমান’॥ কিন্তু সুখ কপালে সইল না, ধর্মের নাম করে আমরা বিভক্ত হলাম(১৯৪৭)। যদিও সে বিভক্তির মূল কারন ছিল ‘মুক্তি’। কিন্তু আমরা মুক্তি পেলাম না। আমাদেরকে আবার নির্যাতিত হতে হল আমাদের নতুন স্বজাতির(মুসলমান) হাতে।আবার দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেল আমাদের, নড়ে-চড়ে মরার আশা অথবা মুক্তির অদম্য সাহস জেগে উঠল আমাদের প্রাণে।আমরা গর্জে উঠলাম(১৯৭১) যার যা কিছু আছে তাই নিয়ে। মুক্তির অদম্য বাসনা আমাদের যতবার পেয়ে বসেছে, আমরা খালি হাতে ফিরিনি কখনো। জয় আমাদের রক্তে মিশে ছিল, আছে, থাকবে। তবু মাঝখানে ৪২ টা বছর ধর্ষণ-বুলেট-বেয়নেটের ক্ষত বয়ে বেড়িয়েছি আমরা॥ জঙ্গলের সে হিংস্র মাংসাশী হায়েনারা মরে গেছে , কমে গেছে, আমাদেরই অত্যাচারে কিন্তু জঙ্গলের বাইরে মানুষের বনে বেঁচে বেড়ে উঠেছে সে রক্তচোষা হায়েনারা॥

আর কত ? আবারো সেই পুরানা দুশমনের মাথাচাড়া দিয়ে জেগে উঠা। আমারো আমরা নির্যতিত হতে চলেছি। বেয়নেটের খুঁচাগুলো জেগে উঠছে। বেয়নেটের খোঁচায় উঠে যাওয়া আমাদের চোখগুলো রক্তরঙে রাঙিয়ে যাচ্ছে, আমাদের পঁচে গলে যাওয়া মাংসের মুখগুলো আবারো গর্জে উঠছে স্লোগানে স্লোগানে, কামানের গোলায় ছিঁড়ে যাওয়া আমাদের শরীরগুলো আবারো এক হচ্ছে, বোমায় উড়ে যাওয়া পা-গুলো আজ আবার হাঁটছে রাজপথে, আমাদের ভেঙে যাওয়া হাতগুলো আবারো তর্জনী উঁচিয়ে শাসিয়ে দিচ্ছে, আমাদের নিরব নিথর দেহে আমাদেরই অতৃপ্ত বিদেহী আত্মা ফিরে আসছে। এই ৪২ টা বছর ধরে আমাদের প্রতিবাদগুলো
অন্তরের অন্তস্হলে লুকিয়ে একটু হাঁপিয়ে নিচ্ছিল॥
সেখানটা ঠাসা হয়ে আছে আজ শত সহস্র প্রতিবাদের বড্ড ভিড়॥
সে ভিড়ে দমবন্ধ কিছু প্রতিবাদ
আমাদের অন্তর থেকে ভিড়
পেরিয়ে কী-বোর্ড হয়ে উন্মাদ-
উন্মত্ততায় মেতেছে আজ
রাজপথে॥ছাড়িয়ে গিয়েছে দেশের
সীমানা, ছড়িয়ে গিয়েছে লাখ
প্রাণে॥ আমাদের এই চেতনা আর
প্রতিবাদ যেন হারিয়ে না যায়। যত
যাই হোক আমাদের তবু
ধরে রাখতে হবে এগুলোকে পরম
যতনে বুকের ভেতর।
গড়ে তুলতে হবে দুর্বার
প্রতিরোধ। একটাই হোক
আমাদের নেশা…”প্রতিশোধ”। কিন্তু প্রতিশোধের আগুন বড় বেহায়া॥ যেমন করে দাউদাউ করে জ্বলে উঠে অমনি করেই দপ করে নিভে যায়। সে আগুনের জ্বালানি দরকার খুব বেশি পরিমাণে আর সে জ্বালানি হল প্রেম। যে দেশে আজন্ম চিত্‍কার করে জন্মাচ্ছি সে দেশের প্রতি প্রেম। যতটুকু অপারগ হলে নিজ মেয়ের ধর্ষক দলকে অসহায় মা বলেন, “বাবারা আমার মেয়েটা ছোট, তোমরা একজন একজন করে যাও” সেই মা আর ধর্ষিতা আমাদের সেই বোনের প্রতি প্রেম। গোপনে দেশ মাতার টানে গর্ভধারিনী মাকে ছেড়ে যুদ্ধে যাওয়া আমাদের সেই বেয়াড়া ভাইটির প্রতি প্রেম।কলম-কাগজ-রেডিও স্টেশনে আমাদের পক্ষে কাজ করা সেই বয়ষ্ক বাবার প্রতি প্রেম। আজো আমাদের মাঝে জেগে উঠতে চায় হাজারো নজরুল,সুকান্ত,ক্ষুদিরামেরা। তবু কিসের যেন প্রতিবন্ধকতায় আটকে যাই বার বার। আমাদের প্রতিশোধের আগুন জ্বালাতেই নিভে যায় কারণ আমদের মাঝে আছে নিখুত ভেজাল। আমাদের সবকিছুতে ভেজাল, আমাদের জ্বালানিতে ভেজাল, আমাদের আগুনে ভেজাল, আমাদের প্রেমে ভেজাল। অথচ এই ভেজাল প্রেমের জীবন বাঁচাতে আমরা খুঁজে যাই প্রতিনিয়ত ভেজালমুক্ত পানি, খাবার, বাতাস,,,,,,,,

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

২ thoughts on “বিবর্তনে বাঙালি

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

9 + 1 =