লালন জীবনীঃ লালন কি জাত সংসারে?? – পর্বঃ১

লালন শাহ ভারতীয় উপমহাদেশের প্রভাবশালী আধ্যাত্মিক সাধকদের মধ্যে একজন। তিনি ফকির লালন, লালন সাঁই, লালন শাহ ইত্যাদি নামে পরিচিত। লালন শাহ একাধারে একজন সাধক, দার্শনিক, মানবতাবাদী, গীতিকার ও সুরকার। বিংশ শতাব্দীর শেষভাগে তাকে ‘বাউল সম্রাট’ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়।

আমি লালনের গানের ভক্ত । অনেক দিন থেকে লালনের গান শুনার সাথে সাথে লালনের জীবনী সম্পর্কে যেখানে যা পাচ্ছি তা গিলে গিলে খাচ্ছি। সেই ধারায় বছর খানেক ধরে লালনের বইপত্র হাতাচ্ছি। বই পত্র + নেট গেটে লালন সম্পর্কে যা কিছু জানি তা আপনাদের মাঝে ছড়িয়ে দেওয়ার ইচ্ছে নিয়েই এই ধারাবাহিক হরতালের অবসরে বসে পড়লাম!

এখনও পর্যন্ত লালনকে নিয়ে একটি বিষয় অমীমাংসিত থেকে গেল। তা হলো তিনি জন্মসূত্রে কী ছিলেন, হিন্দু না মুসলমান? এ ব্যাপারে নানা রকম তর্ক-বিতর্ক ও মতভেদ রয়েছে। আমিও অনেক কনফিউসানে আছি বিষয়টা নিয়ে!!

লালনের জীবন সম্পর্কে বিশদ বিবরণ পাওয়া যায় না। তবে তাঁর গানগুলোতে তাঁর সম্পর্কে সম্যক ধারণা লাভ করা যায়। কিন্তু লালনের কোনো গানে তাঁর জীবন সম্পর্কে তিনি কোনো তথ্য রেখে যাননি। কয়েকটি গানে তিনি নিজেকে ‘লালন ফকির’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।

তাঁর মৃত্যুর পর কুষ্টিয়া থেকে প্রকাশিত ‘হিতকরী’ পত্রিকার সম্পাদকীয় নিবন্ধে বলা হয়, “ইহার জীবনী লিখিবার কোনো উপকরণ পাওয়া কঠিন। নিজে কিছু বলিতেন না। শিষ্যরা তাহার নিষেধক্রমে বা অজ্ঞতাবশত কিছুই বলিতে পারে না।”

লালনের জাত পরিচয় বিষয়ক গানগুলো বিশ্লেষণ করলে যে জিনিষটা ভালো ভাবে অনুমান করা যায়, সেটা হল, লালন সচেতনভাবেই তাঁর পরিচয় গোপন করে রেখেছিলেন যাতে তাঁকে কোন ধর্মে বা জাতে বেধে রাখা না যায়। লালন বারবার এটাই চেয়ে আসছিলেন যাতে তাঁর পরিচয় একজন মানুষ হিসেবে পরিচিতি পায়। তাই, লালনের পরিচয় সঠিকভাবে বলতে গেলে ‘হয়তো’ শব্দটি যোগ করতেই হয়।

জন্মস্থানঃ
কথিত আছে, ১১৭৯ (১৭৭২ খ্রিস্টাব্দ) বঙ্গাব্দের ১ কার্তিক ঝিনাইদহ জেলার হরিশপুর গ্রামে তাঁর জন্ম। আবার বলা হয়, কুষ্টিয়া জেলার কুমারখালীর ভাঁড়রা গ্রামে তাঁর জন্ম।

লালনের জাতসম্পর্কে প্রচলিত ধারনাঃ

কিশোর লালন ছিলেন উড়নচণ্ডী স্বভাবের। ঘুরে বেড়াতেন মাঠে-ঘাটে। গানও গাইতেন গলা ছেড়ে। লালনকে নিয়ে প্রচলিত কাহিনীটি এমন গল্পেরই মতো। হয়তো সেটাই সত্য। নইলে লালন কেন লিখলেন, জাত গেল জাত গেল বলে …, যুবক লালন একবার গঙ্গাস্নানে গিয়েছিলেন। সঙ্গে ছিলেন অনেকেই। কিন্তু স্নান থেকে ফেরার পথেই ঘটল অঘটন। প্রথমে তাঁর জ্বর দেখা দিল। পরে দেখা গেল বসন্ত। তখন পর্যন্ত এই রোগের কোনো চিকিৎসা-পদ্ধতি বের হয়নি। তাই সঙ্গীরা তাঁকে ভাসিয়ে দিলেন গঙ্গায়। ভাসতে ভাসতে চললেন।

এক মুসলিম নারী নদী থেকে কুড়িয়ে নেন লালনকে। অনেক সেবা-শুশ্রূষার পর সেরে ওঠেন লালন। দেখা করেন গুরু সিরাজ সাঁইয়ের সঙ্গে। চলতে থাকে গান-বন্দনা। কিন্তু বাড়ি তাঁর মনকে ডাকে। সেই ডাক শুনেই হয়তো একদিন ফিরে যান নিজ গ্রামে। কিন্তু মুসলিম ঘরে খেয়ে লালনের জাত গেছে- এই বলে তারা আর লালনকে ঘরে নেয় না। নিজের বাড়ি থাকতে বাড়িহীন হয়ে পড়েন লালন। নিজের পরিবার-স্বজন থাকতেও তাঁর আর কেউ থাকে না। অবশ্য তাঁর সহধর্মিণী সঙ্গী হতে চেয়েছিলেন; কিন্তু পারেননি সমাজের কারণেই। লালনহীন সংসারে কয়েক বছর পর তাঁর মৃত্যু হয়।

আসুন এবার লালনের গানের মধ্যে থেকে লালনের জাতের সম্পৃক্ততা খুঁজি………

সব লোকে কয়

লালন কি জাত সংসারে।

লালন বলে জাতের কি রূপ

দেখলাম না এই নজরে।।

ছোন্নত দিলে হয় মুসলমান,

নারীর তবে কি হয় বিধান?

বামন চিনি পৈতে প্রমাণ,

বামনী চিনি- কিসে রে।।

কেউ মালায় কেউ তসবি গলায়,

তাইতে যে জাত ভিন্ন বলায়।

যাওয়া কিম্বা আসার বেলায়,

জাতের চিহ্ন রয় কার রে।।

জগৎ বেড়ে জাতের কথা,

লোকে গৌরব করে যথা তথা।

লালন সে জেতের “ফাতা”

ঘুচিয়াছে “সাধ বাজারে”

উপরের উল্লেখিত গানে লালন শাহ্‌ হিন্দু মুসলমানের স্বাতন্ত্যমূলক আচার অনুষ্ঠানের অসারতার প্রতি আঙ্গুলি নির্দেশ করেছেন। তিনি স্বীয় জাতির “ফাতা” ( পতাহ/ঠিকানা ) “সাধু বাজারে” অর্থাৎ সাধু সমাজে লুপ্ত করে দিয়েছেন বলেও এই গানে ঘোষণা দেন।

কিন্তু লালন শাহ্‌ নিজ ধর্ম-বর্ন-গোত্র ও আচার অনুষ্ঠানের প্রতি আস্থাশীল না হলেও , এইসবে যারা আস্থাবান, তাদের কোন এক বংশেই তার জন্ম,এমন নিশ্চয়ই হতে পারে। সে বিচারে লালন শাহের জন্মগত উত্তরাধিকার কোন জাতীয় তা নির্ণয় করা সম্ভব। এই দিক থেকে লালনের বক্তব্য কি, তাও জানা অবশ্যক।

লালন বলেছেন…

সবাই শুধায় লালন ফকির

কোন জাতের ছেলে।।

কারো বা কি বলবো আমি

দিশা না মেলে।।

হয় কেমনে জাতির প্রমান

হিন্দু বৌদ্ধ খৃষ্ট যবন?

“জাত” বলিতে কি হয় বিধান

শাস্ত্রে খুঁজিলে?।।

স্বেদ অশু জরায়ু ধরে

একে-একেশ্বর সৃষ্টি করে

আগাম-নিগম চরাচরে

তারেই ভিন্ন জাত বলে?।।

মানুষের কি হয় জাতির বিচারে?

এক এক দেশে এক এক আচার

লালন কয় জাতির ব্যাবহার

গিয়াছি ভুলে।।

 

 

 

 

গানে লালন শাহ্‌ তার জাতি বিশ্বাস সম্পর্কীয় পুর্ব ধারনাটাকেই অটুট রেখেছেন। কারন পিতা মাতার জাতি পরিচয় প্রদান ও এক একদিক থেকে জাতি ধর্মে আস্থা স্থাপনের পরিচয়। কিন্তু যিনি মানব ধর্মে বিশ্বাসী, মানুষের জাতি বিচার কখনো সম্বব নয় বলে যার ধারনা- তিনি এই প্রশ্নের জবাব দিতে পারেন না।

এ গানে লালন প্রজনন বিজ্ঞানের যুক্তির অবতারনা করে বলেছেন, রমণীর জরায়ুতে যখন একই উপায়ে শুক্রানু ও ডিম্বাণুর মিলনে মানব শিশুর জন্ম হয়, তখন সে মানুষের গোত্র বিচার নিরর্থক।



লালন শাহ্‌ এর জাতি বর্ন সম্প্রদায় নির্বাচন তাই সেকালের ন্যায় একালেও অনেক অত্যন্ত দুরহ।তবু অনুসন্ধান করা আবশ্যক। তাই এই একটি পোষ্টে লালনের জাত পরিচয় পেয়ে যাবেন, এটা ভাবার কোন কারন নেই!!

ইনশাল্লাহ পরের পর্বে আরও বিভিন্ন ধরনের যুক্তিসহ লালন সম্পর্কে যাকিছু জানি তা নিয়ে হাজির হব।ততক্ষন পর্যন্ত ভালো থাকুন!

………..মেহেদী৪৪

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

১ thought on “লালন জীবনীঃ লালন কি জাত সংসারে?? – পর্বঃ১

  1. এখনও পর্যন্ত লালনকে নিয়ে

    এখনও পর্যন্ত লালনকে নিয়ে একটি বিষয় অমীমাংসিত থেকে গেল। তা হলো তিনি জন্মসূত্রে কী ছিলেন, হিন্দু না মুসলমান? এ ব্যাপারে নানা রকম তর্ক-বিতর্ক ও মতভেদ রয়েছে।

    গুরুকে বিতর্কিত করতে চাই না তাই এসব নিয়ে কথাও বলি না,কোথাও কথা হলে সেখানে মাথাও দেই না।
    উনি মনে আছেন,মন ভালো-খারাপ যাই থাকুক না কেন ইচ্ছে হলেই ভাঙ্গা গলায় তার গান ধরে গাইতে থাকি,জানি অনেকেই বিরক্ত হয় তাতে কিন্তু আমি আমার মতই থাকি।

    তবে আশা মনে বড় একদিন সব ছেড়ে চলে যাবো আরশীনগরে।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

− 1 = 4