১৯৭১ থেকে ২০১৩ – ইতিহাস কথা বলে

আমি ৭১ দেখিনি । দেখবো কিভাবে, শুনেছি সেসময় আমার বাবা ছিলেন ৮/১০ বছরের বালক । আসলে বর্তমান বাংলাদেশের ১৬ কোটি জনগণের বেশীর ভাগ মানুষই ৭১ দেখেনি । আমরা শুধু বড়দের মুখে শুনেছি, ইতিহাসের বই আর গল্প-উপন্যাসে পড়েছি । এই শুনে বা পড়েই আমরা অনুভব করার চেষ্টা করেছি ইতিহাসের এক কালো অধ্যায়, যেটি চাপা পড়েছে ৩০ লক্ষ্য প্রাণ আর ২ লক্ষ মা-বোনের সম্ভ্রমের নিচে ।

ইতিহাস বলে, ১৯৪৭ সালে ভারতীয় উপমহাদেশ ভেঙে পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রটি তৈরি হয়েছিলো, হিন্দু-মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে ধর্মীয় দ্বি-জাতি তত্ত্ব নামক পৃথিবীর সবচেয়ে অদ্ভুত এবং বিরল এক তত্ত্বের উপর ভর করে । কিন্তু পাকিস্তানের দুই অংশ, পূর্ব আর পশ্চিমের মধ্যে দৈনন্দিন জীবন-যাপন থেকে শুরু করে সব দিক থেকেই ছিল বিস্তর ফারাক । সময়ের সাথে ধীরে ধীরে এই পার্থক্য আরও স্পষ্ট হতে থাকে এবং পূর্ব পাকিস্তানের অধিবাসীদের প্রতি পশ্চিম পাকিস্তানী শাসক গোষ্ঠীর নতুন উপনিবেশিক আচরণ প্রকাশ পেতে থাকে । এই নতুন উপনিবেশিক আচরণের প্রথম ধাপ শুরু হয় ১৯৫২ সালে পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ভাষা বাংলাকে উপেক্ষা করে, শাসক গোষ্ঠীর ভাষা উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে চাপিয়ে দেয়ার মাধ্যমে । বাংলাভাষী পূর্ব পাকিস্তানী সাধারণ জনগণ ইংরেজদের ২০০ বছরের উপনিবেশ থেকে মুক্ত হওয়ার পর আবার নতুন করে কারো উপনিবেশে পরিণত হতে চায় নি । ফলশ্রুতিতে তারা অকাতরে নিজের জীবন বিলিয়ে দিয়ে মায়ের ভাষা রক্ষা করে এবং একই সাথে নতুন করে মুক্তির বীজ বোনে । এরপর নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে ইতিহাসের পথ পরিক্রমায় ৬৬, ৬৯ পার করে আসে, চরম মুহূর্ত ১৯৭১; যখন রাতের আঁধারে পশ্চিম পাকিস্তানী সেনাবাহিনী ঘোষণা ছাড়াই নিরস্ত্র-নিরীহ বাঙ্গালীদের উপর অস্ত্র নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে ।

শুরু হয় ইতিহাসের জঘন্যতম এক অধ্যায়, যেখানে পুরো একটি জাতিকে নিশ্চিহ্ন করে দেয়ার বাসনা নিয়ে ঠাণ্ডা মাথায় শুরু হয় নিষ্ঠুরতম গণহত্যা, গণ-ধর্ষণ ও লুটপাট । ঠিক সেসময়, এদেশেরই কিছু মানুষ (জামায়াতে ইসলাম পাকিস্তান) ৪৭ সালের সেই ভ্রান্ত ও উদ্ভট ধর্মীয় ইউটোপিয়ার দোহায় দিয়ে পাকিস্তানী সেনাবাহিনীকে সহায়তা শুরু করে । নিজেদেরকে এরা রাজাকার, আল বদর, আল শামস, ছাত্র সংঘ ইত্যাদি বিভিন্ন নামে সংগঠিত করে, ধর্মের নামে হত্যা-ধর্ষণ-লুটপাট-অগ্নিসংযোগ থেকে শুরু করে মানবতার বিরুদ্ধে সকল অপরাধে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে পাকিস্তানী সেনাবাহিনীকে সহযোগিতা করে । এরা প্রচার করতে থাকে যে, সেনাবাহিনী যা করছে তা ঠিক, আর পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা হবে নিজ ধর্মের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা । কিন্তু বাংলার আবাল-বৃদ্ধা-বণিতা তাদের মিথ্যা প্রচারনায় বিভ্রান্ত না হয়ে, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে সকল বাঁধা বিপত্তি উপেক্ষা করে নিজেদের অস্তিত্ব, মা ও মাটিকে বাঁচাতে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে । হাসিমুখে নিজেদের জীবন বিলিয়ে দিয়ে সৃষ্টি করে লাল-সবুজের এক টুকরো স্বাধীন বাংলাদেশ ।

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর নানা রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে স্বাধীনতার বিরোধীতাকারী, খুন-ধর্ষণ-লুটপাটকারী সেই সব ঘৃণ্য নরপশুরা এদেশেই প্রতিষ্ঠিত হতে শুরু করে । লেবাস পাল্টে, ধার্মিক সেজে নতুন করে “জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশ” ও তাদের ছাত্র সংঘ “ইসলামী ছাত্র শিবির” নাম নিয়ে ধীরে ধীরে নিজেদের শক্তি বাড়িয়ে, এদেশের আর্থ-সামাজিক ব্যাবস্থায় শিকড় গেড়ে বসে । এমনকি ৭১ য়ে যেই দেশটির বিরোধিতা করেছিলো, রাজনৈতিক আঁতাতের মাধ্যমে সেই স্বাধীন দেশটির শাসন ক্ষমতায় পর্যন্ত বসতে সক্ষম হয় । কিন্তু সাধারণ মানুষের মন থেকে ৭১ এর বিভীষিকাময় দগদগে ঘায়ের স্মৃতি মুছে যায় নি, তাই রাষ্ট্র ক্ষমতায় বসলেও এদেশের মানুষ সবসময়য় তাদেরকে ঘৃণা করেছে মনে প্রাণে । এমনকি তারা ক্ষমতায় থাকাকালীন সময়েও শহীদ জননী জাহানারা ইমামের ডাকে ১৯৯২ সালে যুদ্ধাপরাধী রাজাকার-আল বদরদের বিচারের দাবীতে রাস্তায় নেমে আসতে দ্বিধা করেনি এদেশের সাধারণ জনগণ ।

দীর্ঘ অপেক্ষার পর অবশেষে জনগণের বহুল কাঙ্ক্ষিত সেই দিনটি এসেছে আজ । কিন্তু ইংরেজিতে একটি কথা চালু আছে – History Repeats Itself – যার প্রমাণ আমরা পাচ্ছি এই ২০১৩ সালে এসে, যখন ৪২ বছর পর সেই উদ্ভট ধর্মীয় ইউটোপিয়ার ধ্বজাধারী, পাকিস্তানী সেনাবাহিনীকে সহায়তাকারী রাজাকার, আলবদর, আল শামস ও তাদের দোসরদের বিচার শুরু হয় । ঘটনার শুরু ৫ই ফেব্রুয়ারি, ২০১৩; যখন ১৯৭১ সালের মানবতা বিরোধী অপরাধী রাজাকারদের একজন কাদের মোল্লা কর্তৃক সংগঠিত মানবতার বিরুদ্ধে ঘৃণ্য অপরাধসমূহ প্রমাণ হওয়ার পরও সর্বোচ্চ শাস্তি ফাঁসী না দিয়ে দেয়া হয় যাবত-জীবন জেল ।

বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে তরুণ প্রজন্ম এমন অবিচার মেনে নিতে না পেরে রাস্তায় নেমে আসে । ঠিক যেমন করে তাদের পূর্বপুরুষরা রাস্তায় নেমেছিল পাকিস্তানী শাসক গোষ্ঠীর প্রতিটি অন্যায়ের প্রতিবাদে । তরুণ প্রজন্ম টেকনোলজির আশীর্বাদপুষ্ট সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যাবহার করে যে প্রতিবাদের ডাক দেয়, তাতে মানুষ স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে শামিল হয়ে তাদের দাবী জানায় । স্বাধীনতা বিরোধীতাকারী, পাকিস্তানী সেনাবাহিনীকে সহায়তাকারী দোসর খুনি-ধর্ষক রাজাকার-আলবদরদের ফাঁসীর দাবীতে রাজধানী ঢাকার শাহবাগে তরুণ প্রজন্মের যে প্রতীবাদ শুরু হয়, নিমেষেই তা ছড়িয়ে পড়ে সারা দেশে । দেশ জুড়ে নতুন প্রজন্ম যখন ৭১ এর দায় মেটাতে যুদ্ধাপরাধী রাজাকারের ফাঁসীর দাবীতে রাস্তায় নেমে আসে, ঠিক তখনই মুক্তিযুদ্ধের বিরোধীতাকারী জামাত-শিবির ও তাদের দোসররা সেই পুরানো অস্ত্র ধর্মকেই নোংরাভাবে ব্যাবহার করে । ৭১ এর মতোই তারা বলতে শুরু করে তরুণ প্রজন্মের এই আন্দোলন ধর্ম বিরোধী আন্দোলন । আবারো ৭১ এর কুচক্রী প্রেতাত্মারা ধর্ম বাঁচানোর ডাক দিয়ে নিজেদের অপকর্ম জায়েজ করার চেষ্টা চালায় । সাধারণ ধর্মপ্রাণ মানুষকে বিভ্রান্ত করে তরুণদের প্রতিবাদের বিরুদ্ধে ঘৃণ্য চাল দিতে থাকে । প্রতিবাদে অংশ নেয়া তরুণ কে নেশাখোর আর তরুণীদের পতিতা বলতেও দ্বিধা করে না ।

এরপর তাদের আরেক সহযোগী যুদ্ধাপরাধী রাজাকার দেলোয়ার হোসেইন সাইদীর ফাঁসীর রায় হওয়ার পর তারা তাদের স্বরূপে ফিরে আসে । এমন নোংরা ও মিথ্যা প্রচারণায় সীমাবদ্ধ না থেকে, নিজেদের পীঠ বাঁচাতে সারা দেশে ভাঙচুর-অগ্নিসংযোগ, এমনকি হত্যা পর্যন্ত শুরু করে । সাইদীর ফাঁসীর প্রতিবাদে দেশ জুড়ে সহিংস আক্রমণ চালায় । যায়গায় যায়গায় তারা শহীদ মিনার ভাঙচুর করে, স্বাধীন দেশের পতাকা ছিঁড়ে ফেলে । লাগাতার হরতাল দিয়ে ব্রিজ ভেঙে দেয়, রেললাইন উপড়ে ফেলে, মসজিদে আগুন দেয়, মন্দির ভাঙ্গে; আর সেই সাথে শুরু করে মানুষ হত্যা । দেশ জুড়ে বিভিন্ন যায়গায় হাত বোমা-কক্টেল ফাটিয়ে আতঙ্ক সৃষ্টি করে । ঠিক যেমনটি তারা করেছিলো মুক্তিযুদ্ধের সময় । ধর্মের দোহায় দিয়ে সাধারণ মানুষকে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে দ্বার করিয়ে দেয়ার প্রচেষ্টা চালায় । এমনকি জুম্মার নামাজ পুরোপুরি শেষ না করেই তারা মিছিল করতে শুরু করে । একাত্তরে যেমন করে তারা ধর্মকে ঢাল হিসেবে ব্যাবহার করেছিল, ঠিক তেমনি করে এখনও সেই একই ঢাল ব্যাবহার করে দেশে অরাজকতা তৈরি করে ।

হরাতলের সময় সংঘর্ষে ৭০/৮০ জনের উপরে মানুষ নিহত হয় । এমনকি তারা দেশের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী পুলিশকেও নির্মম ভাবে হত্যা করা শুরু করে । ব্যাক্তিগত থেকে শুরু করে রাষ্ট্রীয় সম্পদ ধ্বংস করা শুরু করে । রাজশাহী রেলষ্টেশনে যাত্রী নামার আগেই ট্রেনে আগুন দিয়ে ৩ টি বগি পুড়িয়ে দেয় । ঢাকার কমলাপুর রেলষ্টেশনে ট্রেনে আগুন দেয়া হয় । চাপাইনবাবগঞ্জে পল্লীবিদ্যুৎ উপকেন্দ্রে আগুন দেয় । আগুন দেয়ার সময় ৪৮ টি পরিবার বাড়ীতেই ছিল । তারা কোনরকমে প্রাণে বাচলেও নিঃস্ব হয়ে যায় । আগুন নেভার পর বাবা তার সন্তানের খেলনা পর্যন্ত খুঁজে পায় নি । বিদ্যুৎ উপকেন্দ্রটির প্রায় ২০০ কোটি টাকার সম্পদ স্রেফ আগুনে পুড়ে ধ্বংস হয়ে যায় । যার ফলে এলাকার ১৫ টি ইউনিয়ন বিদ্যুৎ শূন্য হয়ে পড়ে এবং সেচের অভাবে পুরো এলাকার বোরো আবাদ হুমকির মুখে পড়ে ।

এরপর তারা নতুন করে ধর্মীয় উগ্রবাদ ছড়িয়ে দিতে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের উপর আক্রমণ শুরু করে । বিভিন্ন যায়গায় ধর্মাবলম্বীদের উপাসনালয়য় ভাঙচুর করে । নারীদের হাতের শাঁখা ভেঙে ফেলতে বাধ্য করা হয় । তারপরও তাদেরকে মুক্তি দেয়া হয় না, বরং মারধোর করে ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেয়া হয় । বয়স্কও নিরীহ মানুষ পুকুরে ডুবে প্রাণ বাঁচাতে গেলে সেখান থেকে তুলে এনে নির্মমভাবে পিটিয়ে হত্যা করা হয় । এমনকি কোথাও কোথাও ধর্ষণও করা হয় ।

গত এক মাস ধরে ঘটনাসমূহের পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, মুক্তিযুদ্ধের ৯ মাস ধরে স্বাধীনতা বিরোধীরা যা যা করেছে, ৪২ বছর পর আজকেও ঠিক একইভাবে নিজেদের পীঠ বাঁচাতে সকল কু-কর্মের পুনরাবৃত্তির মাধ্যমে স্বাধীন এই দেশটির বিরোধিতা করে যাচ্ছে । এতো কিছুর পরও যারা মনে করেন – ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বরে যুদ্ধ শেষ হয়ে গেছে; তারা হয় নিজের স্বার্থ সিদ্ধির জন্য সচেতনে সবকিছু এড়িয়ে যায়, অথবা নিজেরা একচোখা দৈত্যে পরিণত হয়ে আছে । তবে বাস্তবতা বলে – যুদ্ধ কখনো নিজ থেকে শেষ হয় না, একে শেষ করতে হয় । যেভাবে করেছিলো আমাদের পূর্বপুরুষরা, নিজেদের বুকের রক্ত দিয়ে ।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

১ thought on “১৯৭১ থেকে ২০১৩ – ইতিহাস কথা বলে

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

− 1 = 2