বাঙালী, হুমায়ুন আজাদ ও প্রথাগত শ্রেণীদৃষ্টিভঙ্গি

আমাদের অতীত ইসিহাস ঘাঁটলে দেখা যাবে, আমরা পরিশ্রমী ছিলাম। অন্যের সম্পত্তি দখল করার মানসিকতা আমাদের মধ্যে ছিল না। তাই আমরা অস্ত্র তৈরি করিনি। যুদ্ধবিদ্যা আয়ত্ত্ব করিনি। অন্যদিকে আর্যরা ছিল লুটেরা জাতি। অন্যের সম্পত্তি দখল করাই ছিল তাদের কাজ। তাই তারা অস্ত্র ও যুদ্ধবিদ্যার বিকাশ ঘটিয়েছিল। স্বাভাবিকভাবেই আর্যদের সঙ্গে লড়াইয়ে আমরা হেরেছি।

আমাদের ইতিহাস অধীনস্ততার ইতিহাস। এবং লড়াইয়েরও বটে। আমাদের ওপর যে শাসকগোষ্ঠীগুলো লুটপাট চালিয়েছিল, তারা নিজেদের টিকিয়ে রাখতে জনগণকেও কিছু মাত্রায় লুটপাটের সুযোগ করে দিয়েছিল। দুর্নীতিবাজ শাসকরা এটা সব সময় করে। তারা জনতাকে কিছু দুর্নীতির সুযোগ করে দেয়, নইলে তো জনতা তাদের উৎখাত করবে। আমাদের সক্রিয়তাকেও দখলদাররা ধ্বংস করেছে। এটা জানতে বাঙালীর ইতিহাস পড়তে হবে না। কম বেশি আমরা সবাই জানি, কিভাবে ব্রিটিশ আমাদের মসলিনের মতো শিল্পকে ধ্বংস করে দিয়েছিল। আরো খুঁজলে দেখবেন, আমাদের সমস্ত সক্রিয়তাকে ধ্বংস করেছে এই সাম্রাজ্যবাদী দখলদারেরা। তখন ব্রিটিশ করেছে, আজ মার্কিন করছে।

বাঙালী খারাপ, এরা কিছু পারবে না, এটা আমাদের ভিনদেশী শাসকদের বক্তব্য। এটা একটা জাতির মেরুদন্ড ভেঙে দেয়ার প্রোপাগান্ডা। শাসন, শোষণ টিকিয়ে রাখতে গেলে বড় করে প্রচার করতে হয় যে, তোমরা চুপ থাকো। তোমরা অধম। তোমাদের দ্বারা সম্ভব না। এই প্রচার না দেয়া গেলে তো বারে বারে বিদ্রোহ হবে। তাই বিদেশী দখলদাররা বাঙালীর মনোবল ভেঙে দিতে চেয়েছিল। তাদের পক্ষের লোকেরা এটা নানাভাবে প্রচার করেছে। মিলটনের প্যারাডাইজ লস্ট মহাকাব্যে স্বর্গ থেকে বহিস্কৃত শয়তান বঙ্গোপসাগর এলাকা দিয়েই পৃথিবীতে নেমেছিলো। মলার্মে তার একটি কবিতায় এমন একটি পাখির কথা বলেছেন, যার বিলুপ্তি আসন্ন। ওই পাখিকে তিনি তুলনা করেছেন বাঙালীর সাথে।

বিদেশীদের এই প্রচারণা যুগ যুগ ধরে চলে আসছে। যে জায়গা তারা দখল করে সেখানকার মানুষ সম্পর্কে এ ধরণের প্রচারণা তারা চালিয়েই থাকে। মার্কিনিরা যখন মঞ্চে এলো তারা বললো, বাংলাদেশ তলাবিহীন ঝুঁড়ি। এ প্রচারণা আজো চলছে। আর এগুলো আমরা গিলছি। গিলছি কারণ বিদেশীরা কিছু গোলাম সৃষ্টি করতে পেরেছিল। গোলামেরাই এখানকার শাসন ক্ষমতার কেন্দ্রে থেকেছে। তারা মানুষকে বুঝিয়েছে, আমরা গরিব দেশ। আমাদের ভিক্ষা করে চলতে হবে। বিদেশীদের সঙ্গে তাল না মেলালে না খেয়ে মরব। তারা যা বলে শুনতে হবে। নইলে বিপদ। আমাদের দেশের অধিকাংশ শিক্ষিত মানুষও এমনটা মনে করেন। কারণ শিক্ষা ব্যবস্থায়ও রয়েছে এই শিক্ষারই ছাপ। বিদেশীরা সযতনে সব ধরণের কৌশল প্রয়োগ করে এই শিক্ষার প্রচার ও প্রসার ঘটিয়েছে। রবীন্দ্রনাথ থেকে শুরু করে আজকের হুমায়ুন আজাদ পর্যন্ত আমাদের মহান পন্ডিতেরা অধিকাংশই এই ‘বিদেশী সত্য’র প্রচারক।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৯০৪ সালে লিখিত ‘স্বদেশী সমাজ’ প্রবন্ধে বলেছিলেন, ‘গৌরব হারাইয়া আমরা যখন পুঁটলিপাঁটলা লইয়া ভীতচিত্তে কোনে বসিয়া আছি, এমন সময়ই ইংরেজ আসিবার প্রয়োজন ছিল।’ এভাবে শুধু ব্রিটিশের ভারত দখলকে বৈধতা দেয়া নয়, এমনকি তিনি ইংরেজ শাসকদের বিরুদ্ধে সামান্য প্রতিবাদী তৎপরতাকেও নিরুৎসাহিত করেন- ‘আমরা ইংরেজদের পাঠশালায় পড়িয়া স্থির করিয়াছি, অবস্থা নির্বিচারে গবর্মেন্টকে খোঁচা মারিয়া মনোযোগী করাই জনসাধারণের সর্বপ্রধান কর্তব্য । ইহা বুঝিলাম না যে, পরের শরীরে নিয়ত বেলেস্ত্রা লাগাইতে থাকিলে নিজের ব্যাধির চিকিৎসা হয় না।’ প্রায় একই সময়ে অর্থাৎ ১৯০৪-এ লেখা ‘সফলতার সদুপায়’ প্রবন্ধেও তিনি লিখেছেন, ‘এক পক্ষে কেবলই চাওয়া, আর এক পক্ষে কেবলই দেওয়া ইহার অন্ত কোথায়।’ শেষ পর্যন্ত তার অবস্থান গিয়ে দাঁড়িয়েছিল নিজ জাতির বিরুদ্ধে। শেষ জীবনে লিখেছিলেন, ‘সপ্তকোটি সন্তানেরে হে মুগ্ধ জননী, রেখেছ বাঙালী করে মানুষ করোনি।’

বিদেশীদের স্বার্থ রক্ষা, তাদের মত প্রচার করার দায়িত্ব ব্রিটিশের শাসনকালে রবীন্দ্রনাথ কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন। যদিও তিনি মহান বাঙালী। তবু তার রাজনৈতিক অবস্থান ছিল এমনই দেশবিরোধী ও জাতিবিরোধী। কোনো যুক্তি দিয়েই দখলদার শক্তিকে সমর্থন দেয়া যায় না। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ তার আমলে দিয়েছিলেন। কারণ চিন্তার কাঠামোর ক্ষেত্রে ব্রিটিশ শাসকগোষ্ঠী ও রবীন্দ্রনাথের অবস্থান ছিল অভিন্ন। আজ ব্রিটিশ নেই। দুনিয়াজোড়া মার্কিনের শাসন। প্রত্যক্ষ নয়, পরোক্ষ। অবস্থা বদলেছে কিছুটা। কিন্তু আগের সেই শোষণ, লুটপাটের নীতি দুনিয়ায় এখনো রাজত্ব করছে। তাই তাদের মত প্রচার করার মতো লোকের অভাব এ যুগেও নেই।

হুমায়ুন আজাদ বহুমাত্রিক, প্রথাবিরোধী। কিন্তু এই প্রথাটি তিনি ভাঙতে পারেননি। শক্তিমানের ভাষায় কথা বলেছেন, প্রথা মেনেই। দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে বাঙালীদের গালি দিয়ে গেছেন ঠিক লুটেরা পশ্চিমাদের ভাষায়। তার মূল সমস্যা ছিল, তিনি কাউকে সম্মান জানাতে পারতেন না। মানুষকে তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করাটা তার স্বভাবের মধ্যে ছিল। জাতিকেও তাই তিনি নানাভাবে কটাক্ষ করেছেন। কিন্তু তার কোনো লেখায় এই অনুসন্ধান পাওয়া যায় না, কিভাবে এ পরিস্থিতি কাটিয়ে ওঠা যেতে পারে। তিনি যুক্তিহীনভাবে বাঙালীর কুৎসা গেয়েছেন। অথচ বিবেচনা করেননি সরোজ দত্ত, হুমায়ুন আজাদদের বাংলাই জন্ম দেয়। কেউ মানুষের জন্য জীবন দেয়, কেউ গায় পশ্চিমের জয়গান।

আজাদের একটি লেখায় এসেছে, ‘বাঙালী বলতে বোঝায় সামান্যতা, হীনতা, তুচ্ছতা।’ তার মতে, ‘বাঙালী প্রতারক। প্রতারণা করতে পারলে বাঙালী বিশেষ তৃপ্তি পায়।’ শেষ পর্যন্ত তার অবস্থান হচ্ছে, ‘বাঙালী স্বৈরাচারী ও ক্রীতদাস।’ তার ও এর আগেকার বাঙালী বুদ্ধিজীবীদের এসব কটাক্ষের যে কোনো ভিত্তি নেই, তা দাবি করছি না। কিন্তু এটা স্পষ্ট যে, মুদ্রার আরেকটা পিঠের অস্তিত্ত্ব তারা চেপে গেছেন। বাঙালির সংস্কৃতির দিকটাই কেবল তারা দেখেছেন, অথচ এর জন্য যে দালাল ও দখলদার শাসকরা, তাদের প্রচলিত সংস্কৃতি ও শিক্ষা ব্যবস্থাই দায়ী, তা বলেননি। অশিক্ষিত জনগণকে কুশিক্ষায় যারা শিক্ষিত করেছেন, তাদের দোষ কেউ চোখে দেখেননি। এত বড় মহা মনীষীরা এটা ভুল করে করেছেন বললেও মেনে নেয়া যায় না।

আমরা আমাদের গণমানুষের ইতিহাসের দিকে তাকাতে পারি। প্রচুর লড়াই আছে। প্রচুর ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা আছে। আমাদের পূর্বমানুষেরা সব শাসকদেরই প্রতিহত করার চেষ্টা করেছে। কিন্তু কাঙ্খিত মুক্তি আসেনি। তাই মানুষ আরো বেশি পিছিয়ে পড়েছে। সংগ্রাম পরাজিত হলে একটি জাতি শত বছর পিছিয়ে যায়। এরকম অসংখ্য উদাহরণ মানুষের ইতিহাসে আছে। আমরা অসংখ্য লড়াই হেরেছি। একাত্তরের মতো বিরাট লড়াইও আমাদের স্বপ্নভঙ্গ করেছে। তেভাগার মতো গৌরবোজ্জ্বল সংগ্রামের কথা আজ আমরা ভুলতে বসেছি। উদ্যম কমেছে তাই। কিন্তু লড়াইটা আমরা ভুলিনি। লড়াই তাই এখনো চলছে। কিন্তু এই দিকটা আমাদের বুদ্ধিজীবীরা দেখলেন না।

এই বুদ্ধিজীবীরা এভাবে দফায় দফায় জাতিকে গালি দিয়েছেন, দিচ্ছেন। এবং তা পুরোটাই একতরফাভাবে। এই অঞ্চলের জনগণের কোনো অগ্রসরতা তাদের চোখে পড়েনি। তারা শুধু আমাদের ভুলই দেখেছেন। কিন্তু জাতি হিসেবে আমরা যতদূর এসেছি তা কি শুধু ভুল করেই? হুমায়ুন আজাদের লেখা থেকে কি কেউ দেখাতে পারবে এখানকার মানুষের কোন্‌ কোন্‌ ইতিবাচকতাকে তিনি সমর্থন করেছেন, ঊর্ধ্বে তুলে ধরেছেন? পুরো জাতির আত্মবিশ্বাস তৈরি করার ক্ষেত্রে তিনি নেতিবাচক ভূমিকা পালন করেছেন।

অনেকেই তেড়ে আসবেন এই বলে যে, তিনি কি মুক্তচিন্তার প্রসার ঘটাননি? অবশ্যই ঘটিয়েছেন। জ্ঞানচর্চ্চার বিকাশের প্রশ্নেও তার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আছে। কিন্তু তিনি স্বজাতির প্রতি ভয়ানক বিদ্বেষ পোষণ করতেন। পাশাপাশি এই হুমায়ুন আজাদই আবার প্রচার করতেন ভয়ঙ্কর উগ্র জাতীয়তাবাদ। তিনি পাকিস্তানিদের হাতে গোলাপ দেখলেও তাদের বিশ্বাস করতে মানা করেছেন। অথচ এটা বুঝতেন না যে, পাকিস্তানের গরিব, নিপীড়িত জনগণ আর বাংলাদেশের গরিব, নিপীড়িত জনগণের মধ্যে কোনো বিশেষ তফাত নেই। উভয়েই নিজ নিজ স্বৈরাচারি শাসকদের হাতে বন্দি এবং থেমে থেমে এ থেকে মুক্তির জন্য লড়াই চালাচ্ছেন। জানি না কেউ মানবে কিনা, এটা বোঝার মতো জ্ঞান তার ছিল না!

প্রশ্ন উঠতে পারে, তিনি তো অনেক ক্ষেত্রেই সৎ ছিলেন। অন্যায়ের বিরোধিতা করেছেন। এরকম একটা ক্ষেত্রে মিথ্যাচার না করে, বিদেশীদের সঙ্গে গলা না মিলিয়ে, নিজ জাতির পক্ষে দাঁড়ালে তো তার কোনো ক্ষতি হত না। তাহলে তিনি এমনটা করলেন কেন? এমন প্রশ্ন ওঠাটা স্বাভাবিক। তবে এর জবাবটা তার চেয়েও বেশি সরল। হুমায়ুন আজাদ তার অভিজ্ঞতা থেকে কথা বলেছেন। আমরা প্রত্যেকেই কথা বলছি আমাদের অতীত অভিজ্ঞতা থেকে । ভবিষ্যৎ থেকে আমরা কিছু পাই না। তাই অতীত অভিজ্ঞতাই আমাদের জ্ঞান। অভিজ্ঞতা তৈরি হয় জানা ও দেখা থেকে। যা জানছেন, দেখছেন তার মধ্যে কিছু আমরা গ্রহণ করি। কিছু বর্জন করি। কিছু নিয়ে থাকি সংশয়ে।

কে কী গ্রহণ করবে আর করবে না, তা নির্ভর করে ওই ব্যক্তির ‘দৃষ্টিভঙ্গি’র ওপর। দৃষ্টিভঙ্গিটা যদি মধ্যবিত্তসুলভ হয় তাহলে একজন দুনিয়াকে একভাবে দেখবে। যদি বিত্তবানের দৃষ্টিভঙ্গি হয় তবে দেখবে আরেকভাবে। আরো একটা চোখ আছে সবকিছুকে দেখার। শ্রমজীবী মানুষেরা তাদের শ্রমের পর্যাপ্ত মূল্য পাচ্ছে না। একদল মানুষের আরো সুযোগ সুবিধার লোভ তাদেরকে নির্মম এক জীবনের বৃত্তে আটকে রেখেছে। তাদের চোখে জগতটা দেখলে ন্যায্যতা অন্যায্যতার মাপকাঠিটাই বদলে যাবে। এই তৃতীয় চোখে জগতটাকে দেখতে গেলেই হুমায়ুন আজাদের গালি দেয়াটাকে ‘প্রথাগত একটা শ্রেণীদায়িত্ব পালন’ ছাড়া অন্য কিছু মনে হবে না।

সাহিত্যে তো বটেই, সাধারণ আলাপেও ছড়িয়ে থাকে মতাদর্শের প্রভাব। পশ্চিমা পুঁজিবাদী বিশ্বব্যবস্থার এক অতিপ্রাকৃত সন্তানের নাম ব্যক্তিস্বাতন্ত্রবাদ। হুমায়ুন আজাদ তার পূজারী ছিলেন। রবীন্দ্রনাথের দর্শন ছিল শ্রেণীসমন্বয়বাদ। পুঁজিবাদি ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখতে যার জুড়ি মেলা ভার। দৃষ্টিভঙ্গির এই সীমাবদ্ধতাই তাদেরকে বিদেশী লুটেরাদের পক্ষ নিতে বাধ্য করেছে। দলিত নিজ জাতির বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়েছে।

রবীন্দ্রনাথের রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি আজ মুখে বলা হয় না। তার রাজনৈতিক ভূমিকা তথা দেশবিরোধী অবস্থানের কথা আজ কোথাও আলোচিত হয় না। কিন্তু তার সাহিত্যের মধ্য দিয়ে এই প্রচারণা আজো চলছে। সারা ভারতে যখন বিপ্লবীরা ব্রিটিশকে তাড়াতে সংগ্রাম করছেন, জীবন দিচ্ছেন, রবীন্দ্রনাথ তখন লিখেছিলেন তার সুবিখ্যাত ঘরে বাইরে উপন্যাসটি। আজো যা বহুল পঠিত ও সমাদৃত। সেই উপন্যাসে তিনি ব্রিটিশের পক্ষ নেয়া জমিদার নিখিলিশকে মহান করেছেন। যে ছিল তার চেতনা ও চরিত্রের আদলে গড়া। আর বিপ্লবী সন্দীপকে করেছিলেন লোভী ও কাপুরুষ। এই শ্রেণীঘৃণা, বিদেশ বন্দনা, গরিবকে জোর করে উষ্ঠা মারার চেতনা আজো প্রচার করে চলেছে রবীন্দ্র সাহিত্য। আজাদের লেখাও সেই ভূমিকা রাখছে। শিক্ষার্থীরা পড়ছে আমরা পারব না, আমাদের হবে না। সুতরাং যা চলছে তাই চলতে থাকুক। এভাবেই খুব সূক্ষ্ম এক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে শাসকদের বিরুদ্ধে জনগণের মধ্যে দানা বাঁধা ক্ষোভটাকে হতাশার বৃত্তে চালিত করা হয়। নিজে একমত না হলেও হুমায়ুন আজাদের মতো শিল্পী-সাহিত্যিকরা দৃষ্টিভঙ্গির সীমাবদ্ধতার কারণে যেঁচে পড়েই এই কাজটা করে দেন। শোষণ, নিপীড়ন, লুণ্ঠনের চাকাকে গতিশীল করেন।

বস্তূত, জাতিগত নানা সমস্যার মূলে আছে অশিক্ষা ও অসচেতনতা। উগ্র জাতীয়তাবাদও সেই একই জিনিস। কিন্তু উভয়ই শাসকদের সৃষ্ট। তারা চায় এমনটা চলতে থাকুক। মানুষ হাল ছেড়ে দিক। এতে তাদের অন্যায় চালিয়ে যেতে সুবিধা। তাই তারা জ্ঞানচর্চ্চার পথকে রুদ্ধ করে। নিজেদের লাভালাভের কুশিক্ষায় জনগণকে শিক্ষিত করে।

বাঙালী মহান নয়। কোনো জাতি আজো তা হতে পারেনি। জাপানি শিশুরা খুব নম্র প্রকৃতির। এটা আমাদের প্রাথমিক শিক্ষার বইয়ে পড়ানো হয়। কিন্তু এই ভদ্র-নম্র শিশুরাই বড় হয়ে চীনের নানকিংয়ে গিয়ে গণহত্যা চালায়। জার্মানরা জ্ঞানে-বিজ্ঞানে অনেক অগ্রসর জাতি। তারা গ্যাস চেম্বারে মানুষ মারে। ব্রিটিশদের ইতিহাস নাই বললাম! সব জাতিরই চরিত্রের এরকম নানা দিক আছে। আজ যাদের উন্নত জাতি জ্ঞান করা হয় তারা অধিকাংশই নৃশংস ও লুটেরা! এই ইতিহাসের দায় কি আমরা ওই জাতির ওপরে বর্তাব? না। বরং এর দায় ওখানকার শাসকদের। বাঙালীর অপসংস্কৃতির দায় যেমনটা তার শাসকদের!

শাসকদের কল্যাণে বাঙালীর আজ এমন অনেক বৈশিষ্ট্য বিকশিত হয়েছে যা তার বিকাশকেই রুদ্ধ করছে। এ অবস্থার অবসান ঘটাতে হলে প্রথমেই প্রয়োজন চিন্তার কাঠামোকে পরিবর্তন করা। কারণ চিন্তাই কর্মকে নিয়ন্ত্রণ করে। তাই চিন্তার কাঠামোতে শাসকের চিন্তার বীজ থেকে গেলে শত আন্তরিকতা থাকলেও জনগণের পক্ষে ভূমিকা রাখা সম্ভব হবে না। প্রয়োজন তাই চিন্তার কাঠামোর পুনর্গঠন তথা দৃষ্টিভঙ্গির আমূল পরিবর্তন।

মানুষের অর্থনৈতিক সামাজিক মুক্তিই কেবল পারে সাংস্কৃতিক মানোন্নয়নের পথ তৈরি করে দিতে। সমানাধিকার, গণমুক্তি, গণক্ষমতাই কেবল পারে মানুষের চিন্তার কাঠামো থেকে অধীনস্ততার ভূত সরাতে। এজন্য মানুষকে সংগঠিত করতে হবে। নতুন দিনের স্বপ্ন দেখাতে হবে। এই কাজটা কঠিন। এটা না করে গালি দেয়াটা অনেক সহজ। সেই সহজ কাজটা অনেকেই করে গেছেন। এখন দায়বদ্ধতা স্বীকার করার সময় এসেছে। কঠিন কাজটা সম্পন্ন করার দায়িত্ব নিতে হবে।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

৮ thoughts on “বাঙালী, হুমায়ুন আজাদ ও প্রথাগত শ্রেণীদৃষ্টিভঙ্গি

  1. আপনার এই লেখায় বেশ কয়েকটি অংশ
    আপনার এই লেখায় বেশ কয়েকটি অংশ আছে। প্রথমত বৃটিশ আমলে রবীন্দ্রনাথের রাজনৈতিক অবস্থান ছিল বৃটিশদের পক্ষে। কোনভাবেই দ্বিমত নাই।

    দ্বিতীয় অংশে হুমায়ুন আজাদকে ধুঁয়ে দিয়েছেন ইচ্ছে মত। হুমায়ুন আজাদ বাঙালীর ভুলগুলো চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছেন। ভুল দেখিয়ে দিতে গিয়ে বাঙালীকে ছোট করেছেন বলে আপনি মনে করছেন। আপনার অভিযোগ তিনি কোন সমাধান দিতে পারেননি, শুধু সমালোচনা করেছেন। কঠিন সমালোচনার মধ্যেই সমাধানের পথ থাকে। সেটা খুঁজে নিতে হলে যে দিব্যদৃষ্টির প্রয়োজন, সেটা বাঙালীর এখনো হয়নি, অন্যদের মত আপনারও হয়নি বলে মনে করছি। তবে একসময় হবে।

    আপনি আপনার এই প্রবন্ধে কি উত্তরণের কোন পথ দেখাতে পেরেছেন? যদি না পেরে থাকেন, তাহলে হুমায়ুন আজাদ’র মত একই ভুল কি আপনি করছেন না? উত্তরের আশা রইলাম।

    1. আমি বলেছি, হুমায়ুন আজাদ
      আমি বলেছি, হুমায়ুন আজাদ বাঙালীকে গালি দিয়েছেন প্রথাগতভাবেই। এক্ষেত্রে তিনি প্রথার উর্ধ্বে উঠতে পারেননি। সমাধান তিনি দেখাননি, কারণ সেই দায়িত্বটা নিতে তিনি অপারগ ছিলেন। সমাধানের প্রশ্নে আমি বলেছি-

      ”বাঙালী মহান নয়। কোনো জাতি আজো তা হতে পারেনি। জাপানি শিশুরা খুব নম্র প্রকৃতির। এটা আমাদের প্রাথমিক শিক্ষার বইয়ে পড়ানো হয়। কিন্তু এই ভদ্র-নম্র শিশুরাই বড় হয়ে চীনের নানকিংয়ে গিয়ে গণহত্যা চালায়। জার্মানরা জ্ঞানে-বিজ্ঞানে অনেক অগ্রসর জাতি। তারা গ্যাস চেম্বারে মানুষ মারে। ব্রিটিশদের ইতিহাস নাই বললাম! সব জাতিরই চরিত্রের এরকম নানা দিক আছে। আজ যাদের উন্নত জাতি জ্ঞান করা হয় তারা অধিকাংশই নৃশংস ও লুটেরা! এই ইতিহাসের দায় কি আমরা ওই জাতির ওপরে বর্তাব? না। বরং এর দায় ওখানকার শাসকদের। বাঙালীর অপসংস্কৃতির দায় যেমনটা তার শাসকদের!

      শাসকদের কল্যাণে বাঙালীর আজ এমন অনেক বৈশিষ্ট্য বিকশিত হয়েছে যা তার বিকাশকেই রুদ্ধ করছে। এ অবস্থার অবসান ঘটাতে হলে প্রথমেই প্রয়োজন চিন্তার কাঠামোকে পরিবর্তন করা। কারণ চিন্তাই কর্মকে নিয়ন্ত্রণ করে। তাই চিন্তার কাঠামোতে শাসকের চিন্তার বীজ থেকে গেলে শত আন্তরিকতা থাকলেও জনগণের পক্ষে ভূমিকা রাখা সম্ভব হবে না। প্রয়োজন তাই চিন্তার কাঠামোর পুনর্গঠন তথা দৃষ্টিভঙ্গির আমূল পরিবর্তন।

      মানুষের অর্থনৈতিক সামাজিক মুক্তিই কেবল পারে সাংস্কৃতিক মানোন্নয়নের পথ তৈরি করে দিতে। সমানাধিকার, গণমুক্তি, গণক্ষমতাই কেবল পারে মানুষের চিন্তার কাঠামো থেকে অধীনস্ততার ভূত সরাতে। এজন্য মানুষকে সংগঠিত করতে হবে। নতুন দিনের স্বপ্ন দেখাতে হবে। এই কাজটা কঠিন। এটা না করে গালি দেয়াটা অনেক সহজ। সেই সহজ কাজটা অনেকেই করে গেছেন। এখন দায়বদ্ধতা স্বীকার করার সময় এসেছে। কঠিন কাজটা সম্পন্ন করার দায়িত্ব নিতে হবে।”

      আপনি সম্ভবত পুরো লেখাটি পড়েননি। আর যদি পড়ে থাকেন, তাহলে এই বিষয়গুলো কেন আপনার চোখ এড়িয়ে গেল, বুঝতে পারছি না।

      এই লেখার মূল বিষয় হচ্ছে, শ্রেণীদৃষ্টিভঙ্গী পরিষ্কার না হলে একজন নানাভাবে যেঁচে পড়ে শাসকশ্রেণীরই সেবা করে দেবে অধিকাংশক্ষেত্রে। কারণ তার সামাজিক শিক্ষাটা সম্পন্ন হয়েছে শাসকদের স্কুলেই। আজাদ অনেক কিছু পেরিয়েছেন। কিন্তু এখানে ব্যর্থ হয়েছেন। সেক্ষেত্রে তিনি কিভাবে কার পথ অবলম্বন করেছেন, তার সূত্র ধরে অনেকের নামই এসেছে। স্বাভাবিকভাবেই বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছেন রবীন্দ্রনাথ।

      1. আরেকটু খেয়াল করুন-
        আমরা

        আরেকটু খেয়াল করুন-

        আমরা আমাদের গণমানুষের ইতিহাসের দিকে তাকাতে পারি। প্রচুর লড়াই আছে। প্রচুর ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা আছে। আমাদের পূর্বমানুষেরা সব শাসকদেরই প্রতিহত করার চেষ্টা করেছে। কিন্তু কাঙ্খিত মুক্তি আসেনি। তাই মানুষ আরো বেশি পিছিয়ে পড়েছে। সংগ্রাম পরাজিত হলে একটি জাতি শত বছর পিছিয়ে যায়। এরকম অসংখ্য উদাহরণ মানুষের ইতিহাসে আছে। আমরা অসংখ্য লড়াই হেরেছি। একাত্তরের মতো বিরাট লড়াইও আমাদের স্বপ্নভঙ্গ করেছে। তেভাগার মতো গৌরবোজ্জ্বল সংগ্রামের কথা আজ আমরা ভুলতে বসেছি। উদ্যম কমেছে তাই। কিন্তু লড়াইটা আমরা ভুলিনি। লড়াই তাই এখনো চলছে। কিন্তু এই দিকটা আমাদের বুদ্ধিজীবীরা দেখলেন না।

        এই বুদ্ধিজীবীরা এভাবে দফায় দফায় জাতিকে গালি দিয়েছেন, দিচ্ছেন। এবং তা পুরোটাই একতরফাভাবে। এই অঞ্চলের জনগণের কোনো অগ্রসরতা তাদের চোখে পড়েনি। তারা শুধু আমাদের ভুলই দেখেছেন। কিন্তু জাতি হিসেবে আমরা যতদূর এসেছি তা কি শুধু ভুল করেই? হুমায়ুন আজাদের লেখা থেকে কি কেউ দেখাতে পারবে এখানকার মানুষের কোন্‌ কোন্‌ ইতিবাচকতাকে তিনি সমর্থন করেছেন, ঊর্ধ্বে তুলে ধরেছেন? পুরো জাতির আত্মবিশ্বাস তৈরি করার ক্ষেত্রে তিনি নেতিবাচক ভূমিকা পালন করেছেন।

  2. পাশাপাশি এই হুমায়ুন আজাদই

    পাশাপাশি এই হুমায়ুন আজাদই আবার প্রচার করতেন ভয়ঙ্কর উগ্র জাতীয়তাবাদ। তিনি পাকিস্তানিদের হাতে গোলাপ দেখলেও তাদের বিশ্বাস করতে মানা করেছেন। অথচ এটা বুঝতেন না যে, পাকিস্তানের গরিব, নিপীড়িত জনগণ আর বাংলাদেশের গরিব, নিপীড়িত জনগণের মধ্যে কোনো বিশেষ তফাত নেই। উভয়েই নিজ নিজ স্বৈরাচারি শাসকদের হাতে বন্দি এবং থেমে থেমে এ থেকে মুক্তির জন্য লড়াই চালাচ্ছেন। জানি না কেউ মানবে কিনা, এটা বোঝার মতো জ্ঞান তার ছিল না!

    একমত!

    হুমায়ুন আযাদ সমালোচনার উর্ধে নয়। তার ‘১০০০ ও আরেকটি ধর্ষণ, বইটি পড়লেই বঝা যায় যে তিনি অনেক ছাই-পাশ লিখেছেন, অনেক ফালতু কথাও বলেছেন। কিছু ক্ষেত্রে ‘প্রথাগত প্রথাবিরোধী’ ছিলেন। তবে, অনেক ক্ষেত্রেই তিনি অকপটভাবে অনেক সত্য কথা বলেছেন, যেটার জন্য তিনি আমাদের শ্রদ্ধা পেতেই পারেন।

    1. তিনি অনেক ক্ষেত্রেই মহান।
      তিনি অনেক ক্ষেত্রেই মহান। মূলসূত্রটা হচ্ছে, তিনি কিন্তু প্রতিষ্ঠাবিরোধী ছিলেন। কখনোই রাষ্ট্রের দালাল হয়ে যাননি। অর্থের পেছনে ছুটে বেড়াননি। মানুষ হওয়ার চেষ্টা করেছেন। আমাদেরঅ মানুষ করার চেষ্টা করেছেন। এখানে কোনো দ্বিমত নেই। তবে দৃষ্টিভঙ্গীর শ্রেণীকরণটা তার একেবারে মালিকানার বিরুদ্ধে ছিল না। ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদী দর্শনের সূত্র ধরেই তার মধ্যে কিছু অস্বস্তিকর বিষয়ের বিকাশ ঘটেছে। যদিও এ থেকে অনেকেই বিকৃত আনন্দ লাভ করেন।

      হুমায়ুন আজাদের শিক্ষা হারিয়ে যাবে! তার দেয়া গালিগুলো চর্চ্চা হবে! শেষ পর্যন্ত এভাবেই সমীকরণটা ঝুলিয়ে দেবে শাসকরা। আমি সেখান থেকে চোখ ফেরাতে বলছি।

      1. কিন্তু তিনি কামুকতা পক্ষে আর
        কিন্তু তিনি কামুকতা পক্ষে আর বন্ধনের বিরুদ্ধে এমন সব লিখেছেন বিরক্ত লাগে এই ভেবে, এই লোক মনে হয় এই ছাড়া কিছুই বঝে না।

      2. অনেক বড় বড় মানুষের মত তার
        অনেক বড় বড় মানুষের মত তার মধ্যেও নেতিবাচক বেশ কিছু জিনিস ছিল। তবে, যা কিছু ভাল তিনি প্রচার করেছেন, তা আমাদের স্মরনে রাখতে হবে।

        আর শাসকেরা হুমায়ুন আযাদকে স্মরণে রাখানোর বা ডিফাইন করার কেউ না। সুশিক্ষিত মানুষেরাই তাকে দিফাইন করবে। শাসক শ্রেণী নিয়ে এখানে ভয়টা আমি অমূলক মনে করি।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

13 − 3 =