একনজরে বিপ্লবী হুগো শ্যাভেজ

মার্কিন সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন যখন পুরো বিশ্বকে চোখ রাঙিয়েছে তখন কিউবা, ইরান, লিবিয়া কিংবা ভেনিজুয়েলার মতো আগ্রাসনবিরোধী দেশগুলো মার্কিন শাসকদের বরাবরই বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়েছে। স্বদেশের অর্থনীতিকে গড়ে তুলেছে স্বয়ং-সম্পূর্ণরূপে।

আরেকটি সার্বভৌম দেশ থেকে তেল, গ্যাস লুটপাটের ঘটনা মার্কিন কর্তৃপক্ষের কাছে পান্তা ভাতের মতো হলেও এসব বিপ্লবী রাষ্ট্রের নাম নিতেই হাঁটু কাঁপে মার্কিন কর্তাদের। আর নিজ দেশকে এমন প্রতিবাদী ও বিপ্লবী অবস্থানে যারা নিয়ে গেছেন তাঁরা চিরভাস্মর হয়ে থাকেন মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ, যুদ্ধ ও লুটপাটতন্ত্র-বিরোধী বিপ্লবীদের হৃদয়ে।

ভেনিজুয়েলার প্রয়াত প্রেসিডেন্ট হুগো চাভেজ সেই চিরভাস্মর বিপ্লবীদের একজন। ল্যাটিন আমেরিকার জুনিয়র ফিদেল কাস্ত্রো বলা হতো তাঁকে। বিশ্বজয়ী আরেক বি‌প্লবী চে’ গুয়েভারার প্রতিকৃতি ভাসতো চাভেজের অগ্নিমূর্তিমান চেহারায়।

২০০৫ সালে জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে মার্কিন যুদ্ধবাজ প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশকে সরাসরি ‘শয়তান’ সম্বোধন করে বিশ্বের সাহসী ও বিপ্লবী তরুণদের শিখিয়ে গেছেন- “মৃত্যু হাতছানি দেবে, তবু বিপ্লবীদের ভয় পেতে নেই। সুযোগ পেলে সাম্রাজ্যবাদীরা বিশ্বকে গোগ্রাসে গিলে নেবে। তখন বিড়ালের মতো হাজার বছর বেঁচে লাভ নেই। সিংহের মতো একদিন বাঁচো বিপ্লবী হয়ে।”

ভেনিজুয়েলার সমাজবাদী আন্দোলনের এই বিপ্লবী নেতা জন্ম নিয়েছেন এক স্কুল শিক্ষকের ঘরে। শৈশব থেকেই তিনি বুঝতে শুরু করেন-“বিশ্ব কতো নিষ্ঠুর, মানুষে মানুষে কতো পার্থক্য। একই আকাশের নিচে বাস করে কেউ পাতিলভর্তি খাবার অপচয় করে, আর কেউ একমুঠো খাবার না পেয়ে মারা যায়!”

শৈশবের সেই অগ্নিচোখা চাভেজ সিদ্ধান্ত নেন এই বৈষম্য দূর করতে হবে। চে’ গুয়েভারা’র প্রতিবেশি দেশের সন্তান চাভেজ বুঝতে পারেন-মানুষে মানুষে এই বৈষম্য কেবল সমাজবাদ-ই দূর করতে পারে। যেখানে ব্যক্তির সম্পদ বলে কিছু থাকবে না। রাষ্ট্র সকল সম্পদ ও ক্ষমতার মালিক। রাষ্ট্রই সমবণ্টন করবে ভুক্ত-অভুক্ত সব মানুষের মাঝে। ভ্রাতৃত্ব প্রতিষ্ঠিত করবে সম্পদশালী ও সম্পদহীনের আকাশসম দূরত্বের মাঝে।

সময়ের কাছ থেকে সাম্রাজ্যবাদ, আগ্রাসনবাদ, লুটপাটতন্ত্র, যুদ্ধবাজ এবং এসবের প্রতিরোধের উপায় শিখতে শিখতে বেড়ে ওঠেন বিপ্লবী চাভেজ। কালের সাক্ষী হয়ে কখনো গোপনে কখনো প্রকাশ্যে চলতে থাকে চাভেজের সামাজিক বৈষম্য দূর করার আন্দোলন। এরই মধ্যে মার্কিন মদদপুষ্ট সরকারকে হটিয়ে দেওয়ার চেষ্টায় অভিযুক্ত হয়ে দু’বছর কারাভোগ করেন তিনি। কিন্তু সামরিক একাডেমি থেকে শিক্ষালাভ করা এবং সামরিক একাডেমিতেই শিক্ষাদান করা চাভেজ বিপ্লবের পথ ছাড়েননি কখনো। তিনি জানতেন “পিছু হটা মানেই ব্যর্থতাকে আলিঙ্গন করা।”

তাই কারামুক্তির পর ফের সমাজবাদী আন্দোলনের লড়াইয়ে নেমে পড়েন। এরই মধ্যে বিশ্ব সমাজবাদী আন্দোলনের পুরোধা বিপ্লবী ফিদেল কাস্ত্রোর স্নেহ-ধন্য হয়ে সাম্রাজ্যবাদ ও ফ্যাসিবাদ প্রতিরোধের দীক্ষা নিতে থাকেন। বন্ধুত্ব গড়ে তোলেন বিশ্বের অন্য বিপ্লবী নেতাদের সঙ্গে। মার্কিন কর্তাদের গায়ে জ্বালা ধরিয়ে সখ্য গড়ে তোলেন লিবিয়ার মোয়াম্মার গাদ্দাফি (প্রয়াত), ইরানের মাহমুদ আহমাদিনেজাদ, উত্তর কোরিয়ার কিম জং-ইল (প্রয়াত), সিরিয়‍ার বাশার আল-আসাদসহ অন্যান্য মার্কিন আগ্রাসনবিরোধী বিপ্লবী নেতাদের সঙ্গে।

তাঁর দলের বৈশিষ্ট্য ও লক্ষ্য-উদ্দেশ্য সম্পর্কে জানতে পারেন ভেনিজুয়েলার দিশেহারা অথচ বিপ্লবী তরুণরা। শুধু তরুণরাই নন, চাভেজের দেশ ও মানবতা রক্ষার আন্দোলনে যোগ দিতে থাকেন দেশটির লাখো-কোটি জনতা। বিপ্লবী-জনতার রায়ে ক্ষমতার সর্বোচ্চ শিখরে আসন গ্রহণ করেন এই বিপ্লবী নেতা।

এরপর ক্ষমতার সর্বোচ্চ আসনে বসে বিশ্বের অন্য নেতারা তাদের অতীত উদ্দেশ্য ভুলে বসলেও চাভেজ যেন সে উদ্দেশ্যগুলোকে হাজার গুণে শাণিত করে তা বাস্তবায়নে নেমে পড়েন।

ভেনেজুয়েলাকে গড়ে তোলেন বিশ্বের অন্যতম প্রধান তেল উৎপাদনকারী দেশ হিসেবে। চাভেজের শাসনামলে গত দশকে আন্তর্জাতিক বাজারে ভেনিজুয়েলার তেলের মূল্য অনেকগুণ বেড়ে যায়। অর্থনীতির এই সক্ষমতাকে পুঁজি করে চাভেজ ভেনিজুয়েলার স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা ও সামাজিক আবাসন খাতে ঈর্ষণীয় সাফল্য লাভ করেন। দেশের নিজস্ব কারিগরি প্রক্রিয়ায় উত্তোলিত তেলের অর্থে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য সমান স্বাস্থ্য ও শিক্ষাসুবিধা নিশ্চিত করেন। দেশের মানুষের মধ্যে সামাজিক বৈষম্য দূর করতে তাঁর ঐকান্তিক প্রচেষ্টার কারণে ভেনিজুয়েলার সাধারণ জনগণের হৃদয়ে অবিসংবাদিত নেতা হিসেবে স্থান করে নেন চাভেজ। এজন্য চতুর্থ বারের মতোও তাঁর ব্যালটে ভোট দিতে দ্বিধায় ভোগেননি ভেনিজুয়েলার বিপ্লবী জনগণ।

শুধু ভেনিজুয়েলাই নয়- চাভেজের এই বিপ্লবী অবস্থান, দেশ ও বিশ্বমানবতার জন্য অবদান তাঁকে বিশ্বজয়ী বিপ্লবী হিসেবে বিপ্লবীদের হৃদয়ে স্থান করে দেয়। লাটিন আমেরিকাসহ বিশ্বের বিপ্লবী জনগণ তাঁকে এ কালের চে’দা হিসেবে সম্মান করে।

সামাজিক সাম্যবাদ আন্দোলন ও মার্কিন সাম্রাজ্যবাদবিরোধী এই বিপ্লবী নেতা সদর্পে দেশে গড়ার কাজে মগ্ন থাকলেও শারীরিকভাবে ভেতরে ভেতরে ক্লান্ত হতে থাকেন। দেশের মানুষকে বুঝতে দেননি দীর্ঘ বিপ্লবের বর্ণিল সময়ে কতোটা ক্ষত পড়ে গেছে তাঁর শরীরে। কিন্তু প্রিয় জনগণের কাছে বেশিদিন গোপন রাখতে পারেননি নিজের অসুস্থতার কথা। ফুসফুসের ক্যান্সার ধরা পড়ে তাঁর। জনগণের ভালোবাসায় আপ্লুত চাভেজ নিজ বাসস্থান কারাকাসে চিকিৎসা করাতে চাইলেও জনগণ তাঁকে আরেক বিপ্লবী দেশ কিউবায় পাঠান। তিন দফায় সফল অস্ত্রোপচার শেষে কিউবায় এসে দেশের হাল ধরেছেন ঠিকই। কিন্তু চতুর্থ বারে চিকিৎসা করাতে গিয়ে আর সুস্থ হয়ে ফিরতে পারেননি।

চাভেজ বুঝতে পেরেছিলেন তাঁর বিপ্লবী জীবনকে বিদায় জানাতে হবে। তাইতো হাভানার হাসপাতাল থেকে স্বদেশের মাটিতে ফিরে আসেন তিনি। তিনি চাইছিলেন প্রিয় মাটির বুকে প্রিয় জনগণের কাছেই মৃত্যুকে আলিঙ্গন করতে। প্রকৃতিও তাঁর চাওয়াকে ফেরানোর সাহস করেনি। স্বদেশে ফেরার কয়েকদিনের মাথায় গতরাতে বিদায় জানালেন বৈষম্যের পৃথিবীর বুকে সাম্যবাদী স্বর্গখণ্ড ভেনিজুয়েলা ও তার বিপ্লবী জনগণকে।

চাভেজের মৃত্যুর সংবাদে প্রিয় জনগণের কান্না দেখে মনে হয়নি কোনো রাজনৈতিক নেতার জন্য কাঁদছিলেন তারা। মনে হচ্ছিল, কতো জনমের প্রিয় স্বজনকে বিদায় জানাচ্ছেন তারা।

স্বজনইতো। যিনি দেশের জন্য, দেশের মানুষের জন্য সাক্ষাৎ মৃত্যুকে সামনে রেখে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়েছেন মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ ও ফ্যাসিবাদকে। দেশের জনগণের সুখের জন্য দমিয়ে দিয়েছেন মার্কিন হাজারো ষড়যন্ত্রকে। সেই দেশপ্রেমী, মানুষপ্রেমী নেতাতো স্বজনই। এই মানের স্বজন বিশ্বে আবার কবে আসবে। কবে আসবে এমন নেতা, যিনি মনে করবেন-“সবার ওপরে মানুষ সত্য, তার ওপরে নাই।” যিনি মনে করবেন, -“মানুষ মানুষের জন্য, জীবন জীবনের জন্য।” যিনি বিপ্লবী কণ্ঠে ঘোষণা দেবেন- “বিড়ালের মতো হাজার বছর বাঁচার চাইতে, সিংহের মতো একঘণ্টা বেঁচে থাকাই শ্রেষ্ঠ।”

এক নজরে হুগো চাভেজের বর্ণিল জীবনপঞ্জি

পুরো নাম : হুগো রাফায়েল চাভেজ ফ্রায়াস
ডাকনাম : কমান্ডার হুগো চাভেজ
মাতা : অ্যালেনা ফ্রায়াস দ্য চাভেজ (শিক্ষিকা)
পিতা : হুগো দ্য ল্য রয়েস চাভেজ (শিক্ষক)
জন্মগ্রহণ : ২৮ জুলাই, ১৯৫৪।
জন্মস্থান : বারিনাস রাজ্যের সাবানেতার গ্রাম্য অঞ্চলের নানাবাড়ী।
পারিবারিক অবস্থান : নিম্ন-মধ্যবিত্ত
ব্যক্তিগত জীবন : দুই স্ত্রী। ন্যান্সি কোলমেনার্স (তালাকপ্রাপ্তা) ও মারিসাবেল রদ্রিগুয়েজ। দুই মেয়ে।
ধর্ম : রোমান ক্যাথলিক
১৯৭৫: ভেনিজুয়েলা সামরিক বিজ্ঞান একাডেমি থেকে স্নাতক।
১৯৭৭: সেনাবাহিনীর বৈপ্লবিক আন্দোলনে সক্রিয় যোগদান।
১৯৮১: সামরিক বিজ্ঞান একাডেমিতে শিক্ষক হিসাবে যোগদান।
১৯৯২: এক সামরিক অভ্যুত্থানে সাবেক প্রেসিডেন্ট কার্লোকে ক্ষমতাচ্যুত করার চেষ্টা, দু’বছরের কারাদণ্ড।
১৯৯৭: ‘ফিফথ রিপাবলিক মুভমেন্ট’ নামে দলের আত্মপ্রকাশ। এই দলের অধীনে নির্বাচন করে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত।
১৯৯৮: ১৯৯৮’র প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে অংশ গ্রহণ।
১৯৯৯ : জয়লাভের পর সর্বোচ্চ ক্ষমতা গ্রহণ।
২০০২: এক ব্যর্থ সামরিক অভ্যুত্থানে দু’দিনের ক্ষমতাচ্যুতি, দু’দিন পর ফের ক্ষমতা গ্রহণ।
২০০৭ : সমাজবাদী ‘ইউনাইটেড সোশালিস্ট পার্টি’ গঠন।
২০১১: জুন মাসে ফুসফুসে ক্যান্সার ধরা পড়ে। কিউবা রাজধানী হাভানায় চিকিৎসা নিতে যান।
২০১২: অক্টোবরের নির্বাচনে ছ’বছরের ফের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত।
২০১২: ডিসেম্বর। হাভানায় ক্যান্সারের অস্ত্রোপচার।
২০১৩: ফেব্রুয়ারিতে স্বদেশের মাটিতে ফিরে সামরিক হাসপাতালে ভর্তি হন।
২০১৩: ৫ মার্চ, ভেনিজুয়েলার কারাকাসে ৫৮ বছর বয়সে দীর্ঘ বিপ্লবী জীবনের পরিসমাপ্তি।

সুত্রঃ বাংলানিউজটয়েন্টিফোর ডট কম

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

৩ thoughts on “একনজরে বিপ্লবী হুগো শ্যাভেজ

  1. চাভেজের মৃত্যুর সংবাদে প্রিয়

    চাভেজের মৃত্যুর সংবাদে প্রিয় জনগণের কান্না দেখে মনে হয়নি কোনো রাজনৈতিক নেতার জন্য কাঁদছিলেন তারা। মনে হচ্ছিল, কতো জনমের প্রিয় স্বজনকে বিদায় জানাচ্ছেন তারা।

    এতেই প্রমাণিত হয় তিনি ছিলেন একজন সফল নেতা এবং দেশনায়ক। অনেক আগে ছোটবেলায় বড় ভাই আমাকে একটা ডায়রি উপহার দিয়েছিলেন। সেই ডায়রিতে একটা সংজ্ঞা ছিল- কে সফল নেতা। সংজ্ঞাটি প্রাচীন চৈনিক একটা সংজ্ঞা। সেটা ছিল- “তিনিই সফল নেতা, যিনি একটা কাজ সফলভাবে সম্পন্ন করার পর তার সহকর্মীরা বলে থাকেন- আমরাই কাজটি করেছি।”

    পোস্টের জন্য বাবু ভাইকে ধন্যবাদ। আজকের দিনে এই পোস্টটার দরকার ছিল।

  2. ২০০৫ সালে জাতিসংঘের অধিবেশনে
    ২০০৫ সালে জাতিসংঘের অধিবেশনে বুশ কে যখন শয়তান বলেছিলেন তখন পেপার পড়ে ব্যাপারটি জেনেছিলাম, তখনই বুঝেছিলাম উনি কতটা সাহসী ছিলেন। আর আজ যখন তার মৃত্যুর পর ভেনিজুয়েলার মানুষের কান্না দেখছি এখন বুঝতে পারছি মানুষ তাকে কতটা ভালোবাসতো। নিঃসন্দেহে তিনি একজন শ্রেষ্ঠ নেতা ছিলেন । তার প্রতি শ্রদ্ধা জানাই।

    বাবু ভাইকে ধন্যবাদ তার সম্পর্কে অনেক কিছু জানানোর জন্য।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

37 + = 45