“মো: উট” সমাচার ও ভাষা-সংস্কৃতির উপনিবেশন…

এক সময় একটা চায়ের দোকানে বসে আড্ডা মারতাম। দোকানদারের নাম মো: জামাল। সে কয়েক বছর সৌদি আরব ছিল। সে একদিন কথা প্রসঙ্গে বলল, মামা, সৌদি যাবার পর জানলাম আমার নামের অর্থ উট! এমুন দুঃখ পাইছি। বাপ-মায় আমারে উট নাম রাখলো কোন আক্কেলে কন তো?…

মো: জামাল এর বাংলা করলে দাঁড়ায় “মো: উট”!

প্রথম আলোর ফান ম্যাগাজিনের সেই কার্টুনটির কথা সবার মনে আছে নিশ্চয়? শিক্ষক বলছে ছাত্রকে, নাম বলার আগে সব সময় মো: বলবা। ছাত্রর হাতে ছিল একটা বিড়াল, শিক্ষক জানতে চায় , এটা কি? বোকা ছাত্রর উত্তর: মো: বিলাই!…

ব্যস্, মামুলি এক জোকস নিয়ে শুরু হয়ে গেলো দেশজুড়ে বিড়াট আন্দোলন! মুহাম্মদকে বিড়ালের সঙ্গে তুলনা করে নবী অবমাণা করেছে প্রথম আলো! পুরো দেশের মানুষ একাট্টা হয়ে গেলো। সবাই প্রথম আলোর বিচার চায়। কতবড় সাহস, মো: বিলাই বলে নবীকে অপমান! প্রথম আলো ফতোয়ার বিরুদ্ধে আর জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে তখন রিপোর্টিং করে মৌলবাদীদের গোপন ক্ষোভের কারণ ছিল। এই সুযোগে হুজুররা বুঝ বুঝে কোপ মারে। যে কার্টুন ইনকিলাব ছাপে সেই কাটুন প্রথম আলো ছাপলে নবী অবমাননা হয়ে যায়। অবস্থা বেগতি দেখে প্রথম আলোর সম্পাদক চতুর মতিউর রহমান বাইতুল মোকারম গিয়ে খতিবের পা ধরে বসে থাকে। খতিব মতিউরের পা টেপাটেপিতে খুশি হয়ে ফতোয়া দেয় মতি মিয়া যদি তাওবা করে ফের কলেমা পড়ে মুসলমান হয় তবেই তার পাপের ক্ষমা হবে। মতি মিয়া তাতেই রাজি…। এসব পুরোনো খবর। আরো পুরোনো খবর হলো হাজার হাজার মো: উট, মো: বিলাই, মো: গাথা, মো:ছাগল (যেহেতু আরবী অর্থ না জেনেই নাম রাখা হয় ইসলামী নাম এই বিশ্বাসে) নাম নিয়ে, সঙ্গে মুহাম্মদ জুড়ে মূর্তিমান নবী অবমাননা তো ঘটেই চলেছে!

মুসলমানদের নাম আরবীতে রাখায় হয় কেন? এর যৌক্তিক কারণ কেউ দেখাতে পারবে না।ধর্ম থেকে কেউ প্রমাণ দেখাতে পারবে না ইসলাম গ্রহণের পর নাম পাল্টে রাখার নিয়ম আছে।চার খলিফা থেকে শুরু করে প্রথম সারির খলিফারা তাদের পৌত্তলিক নামই ইসলাম গ্রহণ করার পরও বাজায় রাখেছেন।এটাই স্বাভাবিক। কারণ আরবী ভাষাভাষি মানুষ ধর্ম পরিবর্তন করার সঙ্গে নাম পরিবর্তনের কোন কারণ খুঁজে পাননি। যে মুহাম্মদের নাম কোরআনে আছে সেটাও একটা পৌক্তিলিক নামই।কেউ নিশ্চয় দাবী করবেন না যে এটা ইসলামী নাম? এমন কি তাদের পোশাকআশাক পর্যন্ত একইরকম। আবু লাহাব বা আবু জাহেলের পোশাক আর নবীর পোশাক, আবু বকর, ওমরের পোশাকে কোন তফাত নাই।কাজেই তাদের পরিধানের পোশাক কিছুতেই ইসলামী পোশাক হতেই পারে না।“ইসলামী পোশাক” নিশ্চিতভাবেই আরবদের পোশাক।“ইসলামী নাম” বলতেও কোন কিছুর অস্তিত্ব যে নেই তার প্রমাণ একজন আরব খ্রিস্টানের নাম আর একজন আরব মুসলিমের নাম শুনে আপনি বুঝতে পারবেন না তাদের ধর্ম ইসলাম না খ্রিস্টান।ইসলামী পোশাক, ইসলামী নাম, ইসলামী সংস্কৃতি তাই নিশ্চিত করেই আরবী সংস্কৃতি। ভারতবর্ষে মুসলিম হানাদার শাসকদের হাত ধরে যে সুফিরা এখানে ইসলাম প্রচার করতে আসে তারা আসলে কোরআনের সঙ্গে আরবী উপনিবেশও নিয়ে আসে।আরবী ভাষা, আরবী সংস্কৃতিকে ইসলামী বলে দাবী করে স্থানীয়দের উপর চাপিয়ে দেয়া হয়।ইসলাম গ্রহণকারী স্থানীয়দের শিকড়কেও অস্বীকার করার মন্ত্র দিয়ে দেয়া হয় যা শত শত বছর ধরে লালন করে আসছেস ভারতবর্ষীয় মুসলিমরা। এটা যে ভারতবর্ষীয় মুসলিমদের কপালে ঘটেছে তা নয়, আফ্রিকা, ইউরোপের ইসলাম গ্রহণকারীর বেলায়ও সত্য।একজন ইউরোপীয়ান ইসলাম গ্রহণ করলে তারা নিজের ভাষায় রাখা নামকে পাল্টে জামাল, কামাল নামের একটা আরবী নাম রেখে দেয়া হয়। খবরের কাগজে অনেক আগে চাইনিজ মুসলিম এক নেত্রীর নাম পড়ে্ছিলাম “রাবেয়া খাতুন”! বলুন, এই নাম শুনে কে বলবে এই মহিলা চাইনিজ? নিশ্চিতভাবে কি মনে হবে না একজন এ্যারাবিয়ান? যে চাইনিজরা সাংঘাতিকভাবে জাতীয়তাবাদী হয়, নিজেদের ভাষা ও কালচারকে ভিষণভাবে লালন করে সেই চাইনিজ যখন মুসলিম হচ্ছে কি সহজে নিজের কালচার ও ভাষাকে পরিত্যাগ করে ফেলছে।ভিএস নাইপল একবার বলেছিলেন, ইসলাম তার উপনিবেশন চালায় আরবী ভাষা ও সংস্কৃতি দ্বারা।অনেকেই তার সমালোচনা করেছিলেন। আমি বহুদিন ভেবে দেখেছি বিষয়টা নিয়ে। নাহ্, নাইপলকে আমার অভ্রান্তই মনে হয়েছে…।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

৬ thoughts on ““মো: উট” সমাচার ও ভাষা-সংস্কৃতির উপনিবেশন…

  1. ধর্ম থেকে কেউ প্রমাণ দেখাতে

    ধর্ম থেকে কেউ প্রমাণ দেখাতে পারবে না ইসলাম গ্রহণের পর নাম পাল্টে রাখার নিয়ম আছে।

    ঠিক!

    আর প্রথম আলোর ঐ কার্টুন নিয়ে অনেক বেশিই বাড়াবাড়ি করেছিল মৌলবাদী গোষ্ঠী।

  2. মুসলমানদের নাম আরবীতে রাখায়
    মুসলমানদের নাম আরবীতে রাখায় হয় কেন? এর যৌক্তিক কারণ কেউ দেখাতে পারবে না।ধর্ম থেকে কেউ প্রমাণ দেখাতে পারবে না ইসলাম গ্রহণের পর নাম পাল্টে রাখার নিয়ম আছে।———– নামের অর্থ ঠিক থাকলে কোন সমস্যা নেই।

  3. শুনেছি আল কুরয়ানের থেকে শব্দ
    শুনেছি আল কুরয়ানের থেকে শব্দ বাছাই করে নাম রাখার রীতি আছে। সেখান থেকেই হয়ত অনেক উট, বিলাই এইসব নাম চলে এসেছে। তবে বাঙ্গালীর নাম বাংগালীর মতই হওয়া চাই। পোস্টের বক্তব্যের সাথে সহমত।
    ===================================================================

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

9 + 1 =