বদরুদ্দীন উমর-এর ‘পরিবর্তনের ধারা’ ও আমার কিছু কথা

কমরেড বদরুদ্দীন উমর বাংলাদেশের কমিউনিস্ট আন্দোলনে অতি গুরুত্বপূর্ণ ও শ্রদ্ধেয় একটি নাম। চিন্তাকাঠামোর জায়গা থেকে দেখতে গেলে তিনি তার সাহিত্য দ্বারা বাংলাদেশে সমাজ পরিবর্তনের আন্দোলনে এত বড় ও তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছেন যে, তার সমকক্ষ কাউকে খুঁজে পাওয়া মুশকিল হবে। শুধু নিজে লিখে চলেছেন তা নয়, লেখক গড়ে তোলার ক্ষেত্রেও তার অপরিসীম ভূমিকা রয়েছে।

তবে শ্রেণীসংগ্রাম, যা গতিশীল করাটাই কমিউনিস্টদের কাজ, সেখান থেকে দেখতে গেলে কমরেড উমর এর বেশ কিছু দুর্বলতা খোলা চোখেই ধরা পড়বে। বিরাট ঐতিহ্যবাহী পরিবারের সদস্য হয়ে জন্মেছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হয়েছেন। প্রগতিশীল মধ্যবিত্তদের বিবেক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। বুদ্ধিজীবী হিসেবে বিকশিত হয়েছেন। ফলত আইনি মার্কসবাদের গণ্ডি পেরোতে পারেননি শেষ পর্যন্ত! জীবন যাপনের ক্ষেত্রে, ব্যক্তিগত মালিকানার ক্ষেত্রে তার বর্তমান অবস্থা কি তা আমাদের জানা নেই। তবে যেটুকু বোঝা যায়, তা পুরোপুরি কমিউনিস্টসুলভ নয়। যাই হোক, সেটা আমাদের আলোচনার বিষয়বস্তু না।

বলতে চাই কমরেড উমর এর একটি লেখা প্রসঙ্গে। ১৮ মার্চ, দৈনিক সমকালে তার একটি লেখা প্রকাশিত হয়েছে ‘বাংলাদেশের গ্রাম ও শহরাঞ্চলে সমাজ পরিবর্তনের ধারা’ শিরোনামে। কমরেড উমর তাতে এমন কিছু অবস্থান নিয়েছেন, যা তার এতদিনকার আলাপ আলোচনার সঙ্গে পুরোপুরি খাপ খায় না। এমনিতে তিনি মাওপন্থীদের সঙ্গে জোট করে আন্দোলনে যান। কথাও বলেন ‘প্রায়’ মাওপন্থার আলোকেই। তবে মাওবাদীদের সঙ্গে তার ফারাকটাও স্পষ্ট। অনেকক্ষেত্রেই মাওবাদিদের তিনি বিরোধিতা করেন। তার এই লেখাটাও সেই সূত্রেই। আর এখানে এসেই তিনি নিজের সঙ্গে দ্বন্দ্বে জড়ায় এমন কিছু অবস্থান নিয়েছেন। হতে পারে শেষ বয়সে এসে এটা তার ডানবিচ্যুতি। যা আমরা হায়দার আকবর খান রনো, সরদার ফজলুল করিমের ক্ষেত্রে ইতোপূর্বে ঘটতে দেখেছি। শেষ জীবনে তারা সিপিবিতে যোগ দিয়ে প্রমাণ করেছেন, বিপ্লবের আশা তারা ত্যাগ করেছেন। কমরেড উমরের লেখায় বিপ্লবের স্বপ্ন ত্যাগের কোনো বিষয় নেই। তবে স্পষ্ট কিছু ডানবিচ্যুতি ঘটেছে। যা হতে পারে মাওপন্থীদের ওপর তার কোনো একটা গোপন বিদ্বেষের বহির্প্রকাশ। মাওপন্থীদের বিরোধিতা করতে গিয়ে বিরোধিতার খাতিরেই হয়তো তাকে এই অবস্থান নিতে হয়েছে। আবার বিচ্যুতি ও বিদ্বেষ- দুটো একসাথেও হতে পারে।

লেখাটিতে শুরুতেই কমরেড উমর বাংলাদেশকে ‘শ্রেণীবিভক্ত নির্দয় সমাজ’ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছেন। কিন্তু লেখার ভেতরে গিয়ে একপর্যায়ে তিনি দাবি করেছেন, আগের মতো অবস্থা এখন আর নেই। গার্মেন্ট নারী শ্রমিকেরা নির্যাতন, নিপীড়নের হাত থেকে মুক্তি পেতে চলেছেন। আমি জানি না, কমরেড উমর কোন দর্পণে এ চিত্র দেখতে পেয়েছেন! তিনি গার্মেন্টে নারী শ্রমিকের সংখ্যা বৃদ্ধিতেও সন্তোষ প্রকাশ করেছেন। তিনি লিখেছেন, ‘গার্মেন্টশিল্পের মতো শিল্প এলাকায় নারী শ্রমিকের সংখ্যা বিরাটভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। যদিও গার্মেন্ট শিল্পে শোষণের মাত্রা অন্য শিল্প থেকে বেশি, তবু আগের মতো অবস্থা আর নেই। নারী নির্যাতন প্রায় শেষ হয়েছে।’

গার্মেন্ট শিল্প সম্পর্কে যারা কমবেশি ধারণা রাখেন, তারা প্রত্যেকেই জানেন যে, এই শিল্পে নারীদের নেয়াই হয় অধিক শোষণের সুযোগ নেয়ার জন্য। নারীশ্রমিকরা অতি মাত্রায় খাটতে পারেন। তাদের মারধর করলে বা গালাগাল করলে তারা রুখে দাঁড়ান বা ঘোঁট পাকান খুব কমই। নারীশ্রমিকের আধিক্য যেসব প্রতিষ্ঠানে সেখানে আন্দোলনের সম্ভাবনা কম। তাদের মজুরিও পুরুষের তুলনায় কম দেয়া যায়। মালিকরা এসব সূচক মাথায় রেখেই গার্মেন্টে নারীশ্রমিকের সংখ্যা বৃদ্ধি করেছেন। এটাকে বুর্জোয়া শাসকেরা নারী উন্নয়ন হিসেবে প্রচার করে থাকে। কমরেড উমরও এক্ষেত্রে একমত প্রকাশ করেছেন বলেই দেখা যাচ্ছে! ঠিক বুর্জোয়াদের মতো করে না হলেও প্রায় গর্ব করেই বলেছেন, ‘গার্মেন্টশিল্পের মতো শিল্প এলাকায়’ পিছিয়ে পড়া নারীরা আজ নারী শ্রমিক হয়ে ঢুকে পড়েছেন বিরাটাকারে।

কমরেড উমরকে শোষণ, পুঁজির কারসাজি ও বুর্জোয়া ফাঁকাবুলি বুঝানোর ঔদ্ধত্য দেখানোর ইচ্ছা আমার নেই। কিন্তু আমি যারপরনাই অবাক হয়েছি, তার মতো মার্কসবাদি তাত্ত্বিক পণ্ডিত কিভাবে এরকম সিদ্ধান্তে পৌঁছান। নিজেই যে সমাজকে আখ্যা দেন নির্দয় শ্রেণীবিভক্ত বলে, সেখানে গ্রাম থেকে উচ্ছেদ হয়ে শহরে এসে শ্রমিক হওয়া নারীদের দুঃখ দুর্দশাকে আড়াল করে, কৃষক থেকে শ্রমিক হওয়াটাই তাদের উন্নতি বলে কিভাবে প্রচার করেন! তার দাবি, গার্মেন্ট থেকে ‘নারী নির্যাতন প্রায় শেষ হয়েছে।’ বোঝাই যাচ্ছে, খুব জোর করে ‘প্রায়’ শব্দটা ঢুকিয়েছেন। তার অবস্থান মূলত নতুন বাংলাদেশের পক্ষে। শেখ হাসিনা সকাল বিকাল যার গল্প শোনাচ্ছেন। গার্মেন্টে নারী নির্যাতনের অবসান ঘটার দাবি সম্ভবত হাসিনাও করতে সাহস করবে না। কিন্তু কমরেড উমর এটা কোথায় পেলেন? এমন সর্বৈব অসত্য একটা কথা!

বাংলাদেশের কোনো গার্মেন্টের খোঁজ কি আমরা পেয়েছি, যেখানে নারীদের মাতৃত্বকালীন ছুটি আছে? এমন কোনো গার্মেন্ট কি আছে যেখানে নারী শ্রমিকদের আনা নেয়ার ব্যবস্থা আছে? গার্মেন্টে কর্মরত নারী শ্রমিকরা কি তাদের দুধের সন্তানকে নিয়ে সবাই কাজে যেতে পারে? কোন গার্মেন্টস আছে, যেখানে নারীদের গালাগাল বা মারধর করা হয় না, যেন তেন অজুহাত দেখিয়ে বেতন কেটে রাখা হয় না? গত বছরের জুলাইয়ে গাজীপুরে কাটিং এজ লিমিটেড নামক গার্মেন্টে গর্ভবতী এক নারী শ্রমিকের পেটে লাথি মেরে আহত করা হয়। ঘটনাটা জানাজানি হলে এর প্রতিবাদ হয়। কিন্তু এরকম ঘটনা কি এখনো ঘটছে না? কী সেই যাদুর চেরাগ, যার স্পর্শে আমাদের জানাশোনা বর্বর শিল্পক্ষেত্রটা মহান হয়ে গেল? যেখানে শ্রমিকের শ্রমঘন্টা ওভারটাইমের নামে প্রতিদিন বেড়েই চলেছে! যেখানে মজুরির হার এই আধুনিক কালে, ২০১৪ সালেও ১৯৬৯ সালের চেয়েও কম! ১৯৬৯ সালে ইয়াহিয়া সামরিক জান্তার শ্রমমন্ত্রী নুর খানের কমিশন, আট ঘণ্টা শ্রমদিবসের জন্য একজন শ্রমিকের নিম্নতম মূল মাসিক মজুরি ১২৫ টাকা নির্ধারণ করেছিল, যা ছিল সমসাময়িক বাজারদরে প্রায় পাঁচ মণ চালের (২০০ কেজি) মূল্যের সমান। আজ বাংলাদেশে শ্রমিকের ন্যূনতম মজুরি মাত্র পাঁচ হাজার টাকা, যা দিয়ে মাত্র ১২৫ কেজি চাল পাওয়া যায়। এই ক’দিন আগেও এটা ছিল তিন হাজার টাকা বা ৭৫ কেজি চালের সমান।

বাংলাদেশের শাসকশ্রেণী গার্মেন্ট শ্রমিকদের দমন করার জন্যই তৈরি করেছে ইন্ডাস্ট্রিয়াল পুলিশ। কমরেড উমর কি মনে করেন, তারা কি গার্মেন্টের নারী শ্রমিকদের আদর আপ্যায়ন করার জন্য বেতন পায়? বাংলাদেশে গার্মেন্টে লক্ষ লক্ষ অসহায় শিশু-কিশোর মেয়েদের ১২/১৪ ঘণ্টা খাটিয়ে সমস্ত শক্তিসামর্থ্য নিংড়ে নেয় মালিকেরা। এরপর রাতের আঁধারে চরম অনিরাপত্তায় রাস্তায় ছেড়ে দেওয়া হয় তাদের। কাজ শেষে রাতের আঁধারে ক্ষুধা ও আতঙ্কে কাতর হাজার হাজার নারী ঘরের উদ্দেশ্যে ছুটতে থাকেন। তারা যে গভীর রাতে গুণ্ডা ও পুরুষতন্ত্রের আক্রমণের শিকার হয়- এটা কি গার্মেন্টের নারী শ্রমিকদের ওপর নির্যাতন শেষ হয়ে যাওয়ার প্রমাণ? বাঁচার দাবীতে এবং অন্যায়ের প্রতিবাদে আন্দোলনকারী এইসব অপুষ্টি-আক্রান্ত শীর্ণকায় মেয়েদের পুলিশ দিয়ে নির্মমভাবে পেটানো হয়। তাদেরকে লক্ষ্য করে টিয়ার গ্যাস-রাবার বুলেট ছোঁড়া হয়। এ পরিস্থিতি কি বিদায় নেয়েছে বাংলাদেশ থেকে?

কমরেড উমর আরও লিখেছেন, ‘শ্রমিকদের ট্রেড ইউনিয়ন অধিকারসহ অনেক অধিকার এখনও নেই; কিন্তু অন্যভাবে নিজেদের শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে তারা মজুরি আগের তুলনায় বৃদ্ধি করেছেন। অদূর ভবিষ্যতেই গার্মেন্টশিল্প শ্রমিকরা ট্রেড ইউনিয়ন অধিকার লাভ করে অন্যভাবে শক্তি সঞ্চয় করে যে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হবেন, এতে সন্দেহ নেই।’ কমরেড উমর শ্রমিকদের মজুরির আন্দোলন দেখে উৎসাহিত হয়েছেন। তিনি আশা প্রকাশ করেছেন, অচিরেই শ্রমিকরা ট্রেড ইউনিয়নের অধিকার আদায় করবে; গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হবে। এই আশাবাদের ক্ষেত্রে মজুরির আন্দোলনের রাজনীতিকরণ কতটা তা হয়তো তিনি অসাবধানতাবশত লক্ষ্য করেননি! করলে তিনি দেখতে পেতেন, ট্রেড ইউনিয়নের অধিকারের প্রশ্নটা আমাদের দেশে ইউরোপের মতো করে অর্থনীতিবাদি আন্দোলনের বৃত্তে আটকা পড়ে নেই। বরং এখানে এটা শ্রমিকদের রাজনৈতিক আন্দোলন, রাজনৈতিক অধিকার- এক কথায় রাজনীতিকরণের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। এই রাজনীতিকরণটা এখনো বেশ দুর্বল। তাই ‘অদূর ভবিষ্যতে’ গার্মেন্টের বা সব ধরনের শ্রমিকদের ট্রেড ইউনিয়নের অধিকার লাভ করাটা বেশ দুরূহই বলা চলে।

কমরেড উমর নিজেও এই আশঙ্কা করেন যে, ‘বাংলাদেশের শ্রমজীবী জনগণ গ্রাম ও শহরাঞ্চলে স্বাধীন বাংলাদেশের নব্য শাসকশ্রেণীর ও তাদের সরকার ও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের দ্বারা শোষিত-নির্যাতিত হচ্ছেন এবং এ মুহূর্তে তাদের উঠে দাঁড়াবার কোনো লক্ষণ আপাতদৃষ্টিতে দেখা যাচ্ছে না।’ বোঝাই যাচ্ছে, ট্রেড ইউনিয়নের অধিকারকে তিনি শ্রমিকদের মুক্তি আন্দোলন থেকে বিচ্ছিন্ন করে অর্থনীতিবাদি আন্দোলন হিসেবে দেখেছেন। একারণেই ভেবেছেন যে, এটা অচিরেই পাওয়া যাবে। তবে শাসকরা যে, এই অধিকার দিতে রাজী নয় এটা খুব স্পষ্ট। নতুন শ্রম আইনে (সংশোধিত শ্রম আইন ২০১৩) শ্রমিকদের শৃঙ্খলাভঙ্গের অপরাধে বহিষ্কার করার বিধান যোগ করা হয়েছে। এতে শৃঙ্খলার কোনো সংজ্ঞা ঠিক করে দেয়া হয়নি। পুরনো শ্রম আইনেও এত বড় কালো বিধান ছিল না। অর্থাৎ মালিক শাসকরা শ্রমিকদের ট্রেড ইউনিয়নের অধিকারকে আর আগের মতো দেখছে না। এমনকি তারা শ্রম আইনে স্থায়ী শ্রমিকের বদলে ঠিকা শ্রমিকের নিয়োগের বিধান জুড়ে দিয়েছে। যাতে করে মালিকরা ঠিকা শ্রমিক হিসেবে নিয়োগ দিয়ে সারা বছর কম বেতন দিয়ে কাজ চালিয়ে নিতে পারে। অর্থাৎ বুর্জোয়া আদালতে তাদের কোনোভাবে চ্যালেঞ্জ করা যাবে না। সেই রাস্তাটাও তারা বন্ধ করে রেখেছে। বোঝাই যাচ্ছে, কমরেড উমর এটা চিহ্নিত করতে পারেননি যে, বাংলাদেশে ট্রেড ইউনিয়নের আন্দোলনটা শ্রমিকের মুক্তি আন্দোলনের গোড়ার দিকের একটা ধাপ হিসেবে যুক্ত হয়ে গেছে।

কমরেড উমর লিখেছেন, ‘কিছু বামপন্থি বিশেষত এককালীন চীনাপন্থিদের আধ-সেঁকা তত্ত্ব অনুযায়ী বাংলাদেশের সমাজে একটা স্থিতাবস্থা বিরাজ করছে।’ যদিও তিনি খুব ভালো করেই জানেন, বাংলাদেশের মাওপন্থীরা নানা ভাগে বিভক্ত। তাদের একেক দলের অবস্থানও ভিন্ন ধরেনের। কিন্তু তবুও তিনি ‘এককালীন চীনাপন্থিদের’ সবার ওপর চাপিয়ে দিয়েছেন একই গড়পড়তা ভাবনা। চীনপন্থিরা কি সবাই এমনটা মনে করে যে, সমাজে স্থিতাবস্থা চলছে? এটা স্পষ্ট মিথ্যাচার! এটা হলে তো তারা সবাই কমিউনিজমের খাতা থেকে বাদ পড়ে যান। সমাজকে স্থির জ্ঞান করার অর্থ হচ্ছে, কমিউনিজমের প্রধান স্তম্ভ- দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদ তথা বস্তুজগতের পরিবর্তনশীলতা, দ্বন্দ্ব ও বিকাশের নিয়মকে বাতিল করে দেয়া। এই অভিযোগের মাধ্যমে মাওবাদিদের অকমিউনিস্ট প্রতিপন্ন করার চেষ্টা করা হয়েছে। যা একেবারেই মিথ্যা।

কমরেড উমরের দাবি, মাওবাদিরা সমাজে ‘স্থিতাবস্থা’ চলছে মনে করায় মূল্যায়ন করে যে, ‘বাংলাদেশের সমাজে এখনও সামন্তবাদের প্রবল আধিপত্য! সে অনুযায়ী এখানকার সমাজে বিদ্যমান দ্বন্দ্বের মধ্যে সামন্তবাদের সঙ্গে জনগণের দ্বন্দ্বই প্রধান!’ কমরেড উমরের মতো বিদ্বান লোকের কাছে এহেন গড় অঙ্ক কেউ প্রত্যাশা করে বলে মনে হয় না। বাংলাদেশের মাওপন্থিরা সবাই এটা মনে করেন না যে, ‘সামন্তবাদের সঙ্গে জনগণের দ্বন্দ্বই প্রধান’। বরং অনেকেই মনে করেন, সাম্রাজ্যবাদের সঙ্গে জনগণের দ্বন্দ্ব প্রধান। কেউ বলেন, আধা সামন্তবাদ জারি আছে। কেউ বলে ক্ষয়িষ্ণু সামন্তবাদ, কেউ বলে সামন্তবাদের অবশেষ! কেউ বলেন নয়া উপনিবেশ! আরও অনেক মূল্যায়ন মাওবাদিদের বিভিন্ন অংশের রয়েছে। তবে হ্যাঁ, দু একটা ধারা, যেমন পূর্ব বাংলার কমিউনিস্ট পার্টি (এম এল), ননী দত্তদের সাম্যবাদি দল (বর্তমানে নিষ্ক্রিয়) এবং পূর্ব বাংলার সর্বহারা পার্টি (এমবিআরএম) এমনটা মনে করে যে, সামন্তবাদের সঙ্গে জনগণের দ্বন্দ্বটা প্রধান। তবে তারা এটা মনে করে না যে, বাংলাদেশে ‘স্থিতাবস্থা’ বিরাজমান। যা কমরেড উমর চাপিয়ে দিয়েছেন জোর করেই।

কমরেড উমর যে সামন্তবাদ খুঁজেই পাচ্ছেন না- এটা ঠিক তাদের মতোই বাড়াবাড়ি, যারা মনে করেন যে, সামন্তবাদের সঙ্গে দ্বন্দ্বই প্রধান! বাস্তবতা হচ্ছে, এখানে সামন্তবাদ আগের অবস্থায় নেই। তবে কী কৃষিতে পুজির বিকাশ ঘটেছে? অর্থ্যাৎ কৃষি কি একটা শিল্প আকারে বিকাশ লাভ করেছে? এ প্রশ্নের উত্তরে যে কেউই ‘না’ বলবেন। তাহলে কোনটি কৃষিশিল্প? যেখানে উৎপাদন মুনাফার উদ্দেশ্য করা হয়। অথচ বাংলাদেশে কৃষিতে যে ধান উৎপাদন হয় তার সব থেকে বড় অংশ করা হয় ঘরের খাবার বা বছরের খোরাকির জন্য। অর্থাৎ নিজের জন্য উৎপাদন। আর কৃষিতে ধনতন্ত্রের বিকাশের পরিবর্তে অর্থ্যাৎ বৃহৎ আকারে ফার্মিং কৃষির পরিবর্তে কৃষিতে এনজিও ঋণ বা সাম্রাজ্যবাদী অর্থের অনুপ্রবেশ ঘটেছে। ফলে কৃষিতে যে উদ্বৃত্ত তৈরি হচ্ছে তা চলে যাচ্ছে সাম্রাজ্যবাদের বীজ, উৎপাদনের উপকরণ (পানি, হাতিয়ার, সার, ঔষধ, আরও অনেক কিছু) কিনতে গিয়ে। আর বিপণনে লুটেরা মধ্যসত্ত্বভোগী থাকায় বিক্রির বাজারও তাদের নিয়ন্ত্রণে। কৃষক এখানে তার উৎপাদিত ফসল বা পণ্যের দাম ঠিক করতে পারে না, যা ইউরোপ আমেরিকা জাপানে পারে। অথচ শিল্প উৎপাদনে মালিক তার মুনাফা ধরেই পণ্যের দাম ঠিক করে। ফলে কৃষিতে যে পুঁজি বিনিয়োগ হয়েছে তা শিল্প পুঁজি না। সাম্রাজ্যবাদী পুঁজি। এ কারণে উৎপাদন ব্যবস্থা ও মালিকানার আমূল কোন পরিবর্তন ঘটেছে, এটা দাবি করা যায় না। এই উৎপাদন পদ্ধতির কারণেই কৃষিতে সামন্তীয় চিন্তা থেকে গেছে।

উদাহরণ হিসেবে বলা যায় যে, এনজিও থেকে পাঁচ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে কোনো গ্রামের জমিরন বিপাকে পড়লেন। কিছু টাকা দিলেন মেয়ের পড়ালেখা, কিছু টাকা ঔষধে। আর বাকি টাকা দিয়ে অতিথীর জন্য মুরগি, কোকাকোলা কিনলেন। ঋণের কিস্তির জন্য তিনি বাড়ির কদুটি হাঁটে বিক্রি করলেন। এই কদুকে কি বলবো পণ্য? মোটেও না। আর জমিরন যে সংস্কৃতি চর্চ্চা করছে- আগে বাড়িতে কেউ এলে ডাব কেটে পানি দিতোম, এখন কোক দিচ্ছে- তা কিন্তু সাম্রাজ্যবাদের অভিঘাত। অর্থাৎ কোক খেতে দিলে বেশি আপ্যায়ন করা হয়। সাম্রাজ্যবাদী পুঁজি, পণ্য-সংস্কৃতি মিলেমিশে জমিরন কিন্তু রীতি নীতি, ধর্মীয় বিশ্বাস, মূল্যবোধ, নারী পুরুষের সম্পর্ক সব কিছুতেই সামন্তীয় কায়দা কানুনেই থেকে গেলা। সুতরাং সামন্তবাদ কোথাও দেখাই যায় না- এমনটা ভাবারও কোনো জায়গা নেই। তবে এটা ঠিক যে, যাই ছিল তা নেই। অনেক কিছুই পরিবর্তিত হয়েছে।

সেক্ষেত্রেও কিছুকাল আগে রাষ্ট্রের খুনি বাহিনীর হাতে নির্বিচারে খুন হওয়া পূর্ব বাংলার কমিউনিস্ট পার্টির (এম এল) নেতা কমরেড রাকেশ কামাল তার পার্টির এই ধারণার পরিবর্তন আনতে সংগ্রাম শুরু করেছিলেন। কমরেড উমরের সঙ্গে জোটে থাকা নয়া গণতান্ত্রিক গণমোর্চা ও আরও অনেকেই মনে করে না যে, সামন্তবাদের সঙ্গে দ্বন্দ্বটা প্রধান। এটা ঠিক যে, অধিকাংশ মাওবাদি দলই (পার্টি বা গ্রুপ বা পাঠচক্র) মনে করে যে, এদেশে এখনো সামন্তবাদের জের আছে, তা যে পরিমাণেই হোক। কিন্তু কমরেড উমর সেদিকে না গিয়ে যথাযথ সমালোচনায় না গিয়ে একে ‘চিকিৎসার বাইরে’র এক ‘চিন্তাধারাপ্রসূত ধ্যান’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। অর্থাৎ বাস্তব জ্ঞান বিবর্জিত বলে আখ্যা দিয়েছেন।

কমরেড উমর বলেছেন, ‘ধারণা যাই হোক, বাস্তব অবস্থা হচ্ছে এই যে, বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি এখন যে জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে তাতে পঞ্চাশ-ষাট দশক তো বটেই, এমনকি ১৯৭২ সালের দিকে তাকালেও সামান্য বাস্তব জ্ঞান ও দেশের প্রকৃত অবস্থার সঙ্গে কিছুটা পরিচিত লোকের কাছেও এ পরিবর্তন চোখে পড়ার মতো। এর জন্য কোনো গবেষণার প্রয়োজন হয় না।’ আমি কমরেড উমর এর কাছে প্রশ্ন রাখছি, বাংলাদেশের কোন মাওপন্থি দল দাবি করেছে যে, এই দীর্ঘসময়ে বাংলাদেশ অচল বসে আছে? যারা মনে করে যে সামন্তবাদের সঙ্গে দ্বন্দ্ব প্রধান, তারাও কি স্বীকার করে না যে, পরিবর্তন হয়েছে, হচ্ছে? সামন্তবাদকে প্রধান বলার ক্ষেত্রে তারা নির্দিষ্ট কিছু সূচককে গুরুত্ব দেয়, যেগুলোর সঙ্গে অনেকেই একমত নয়। এমনকি তাদের পার্টিতেও এর বিরুদ্ধে মতামত আছে। তা সত্ত্বেও এমন একটা বিষয় তাদের নাম করে বাকি সব মাওপন্থীদের ওপর চাপিয়ে দেয়ার অর্থ কি? এটা কি সমালোচনা নাকি বিষোদগার? এভাবে মিথ্যাচার করে কি ভুল পথে হেঁটে চলা কমরেডকে সঠিকের দিকে টেনে আনা যায়?

আমি অবশ্যই কমরেড উমরের সঙ্গে একমত যে, ‘বাংলাদেশের গ্রাম ও শহরাঞ্চলের সর্বত্র যে নিঃশব্দ পরিবর্তন ঘটে চলেছে, কৃষক-শ্রমিকসহ সব ধরনের শ্রমজীবীদের জীবনে শাসকশ্রেণীর ইচ্ছাবহির্ভূতভাবে শক্তির যে সঞ্চয় হচ্ছে, তাকে ঐতিহাসিকভাবে উপেক্ষার কোনো উপায় নেই। এই শক্তির খবর রেখে এবং এই শক্তির ওপর ভরসা ও ভিত্তি করেই সমাজ পরিবর্তনের রাজনৈতিক সংগ্রাম সংগঠিত ও পরিচালনা করতে হবে।’ তবে আমি তার শাসকশ্রেণীর ভাষায় বলা উন্নয়নের গাল গল্পের সঙ্গে মোটেই একমত নই। বাস্তবতা হচ্ছে এই যে, শ্রমিকরা আগের চেয়ে বেশি শোষণের শিকার হচ্ছে আজকাল। আমরা এটা মনে করি না যে, পরিবর্তন হচ্ছে না! মোবাইল-টিভি আমরাও শ্রমিকদের ঘরে দেখতে পাই। বিদ্যুৎও যাচ্ছে ঘরে ঘরে। কিন্তু দারিদ্র্য টের পাওয়া যায় গ্রামের যে কোনো মুদি দোকানে বসলেই।

গরিবেরা এখনও এতই গরিব যে, লেবেল আঁটা বিস্কুটের প্যাকেট, যার মূল্য নির্ধারিত, তা কিনতে এসেও তারা দর-দাম করেন। তারা অনেকক্ষণ দোকানে অপেক্ষা করেন দাম কমার আশায়। সরকার দেশে দারিদ্র্য কমার কথা বলছে। কিন্তু শহরমুখী, ঢাকামুখী মানুষের সংখ্যাবৃদ্ধির হারটাই বলে দেয় দারিদ্র্য আসলে বাড়ছে না কমছে! এই দারিদ্র্য বৃদ্ধির কারণেই কিছু লোক আঙুল ফুলে কলা গাছ হচ্ছে। আর এটাকেই তারা ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে ‘অর্থনীতির নবযাত্রা’র গল্প বলে প্রচার করছে। বিশাল বিশাল বিলবোর্ডে তাদের দেয়া তথ্যের সমাহার, বিশিষ্ট পণ্ডিতদের প্রচারণা এখন আমাদের কমিউনিস্ট পণ্ডিতদেরও আক্রান্ত করছে! কিন্তু তারা কেউ বলছে না, কেন শহুরে শ্রমিকদের খাদ্য তালিকায় পঁচা ফল থাকে! যার একাংশ কেটে তাকে বের করতে হয় উচ্ছিষ্ঠাংশ? কেন শ্রমিকদের দাম্পত্যজীবন নেই? কেন তারা স্বামী-স্ত্রী-বাবা-মা-সন্তান নিয়ে একই ঘরে কাপড় টানিয়ে বাস করেন? কেন গ্রামের গরীব কৃষকরা উচ্ছেদ হয়ে শহরে পাড়ি জমাচ্ছেন? এটা অবশ্যই উন্নতির ফল। সেই উন্নতিটা যারা করেছেন, কমরেড উমর তাদের ভাল করেই চেনার কথা!

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

১৭ thoughts on “বদরুদ্দীন উমর-এর ‘পরিবর্তনের ধারা’ ও আমার কিছু কথা

      1. ডানরাই ডানবিচ্যুতি দেখে অবাক
        ডানরাই ডানবিচ্যুতি দেখে অবাক হবে, ভালো মানুষেরা ভন্ডদের ভালো কথা দেখে অবাক হবে, নাস্তিকেরা ধার্মিকদের অবিশ্বাসপূর্ণ কথায় অবাক হবে ; এটাই স্বাভাবিক ।

  1. বদর উদ্দিন উমর বরাবরই আমার
    বদর উদ্দিন উমর বরাবরই আমার শ্রদ্ধার ব্যক্তি ছিল। নৈতিকতা বিসর্জন দেওয়া পুরানো বামদের এখন একধরনের ফ্যাশন হয়ে দাঁড়িয়েছে। বদরউদ্দিন উমর পরিবর্তনের ধারায় যাওয়ার আগে তার পুরানো লিখাগুলোতে তাঁর কতটুকু আস্থা আছে এখন সেটা জানতে চাই।

  2. বাংলাদেশের বাম রাজনীতির এইটা
    বাংলাদেশের বাম রাজনীতির এইটা একটা বিবর্তনের ধারা মনে হয়। বয়স হইলে সবার মাঝে একটু ডানে হেলে পড়ার প্রবণতা তৈরি হয়। আনিস ভাইয়ের পাল্টা যুক্তিগুলো ভালো হইছে।

  3. বদরুদ্দীন উমর যার সম্পর্ক ছিল
    বদরুদ্দীন উমর যার সম্পর্ক ছিল তমুদ্দিন মজলিশ সাথে এবং ঘনিষ্ঠ ওঠা বসা ছিল মুসলিম ব্রাদারহুডের সাথে। তিনি সময়ের প্রয়োজনে ডান-বাম হবেন এতে অবাক হওয়ার কিছু নাই। তবে আপনি তার সমালোচনা করে বেশ একটা দুঃসাহসিক কাজ করেছেন এবং সাড়া ফেলে দিয়েছেন এটা বিলক্ষণ বুঝতে পারছি। গুরুপরম্পরায় আপনি এগিয়ে জান এই কামনা রইল।

  4. এদেশে আদর্শ নয়, আপন
    এদেশে আদর্শ নয়, আপন স্বার্থপন্থির নামই হয় বাম কিংবা ডান।
    যে পন্থে নিজ স্বার্থ জড়িত প্রত্যেকে সে পন্থাই অবলম্বন করতে আগ্রহবোধ করে ।তাইতো একবার বামে, একবার ডানে, একবার মাঝামাঝি আর একবার চামে হেলে পড়তে চায় ।

    বদরুদ্দীন, ফরহাদ মজহারদের নির্দিষ্ট কোন পন্থা নেই ।এরা সময়ের সুবিধাপন্থি ।

    শিল্পি নচিকেতা তার একটি গানে বলেছিলো…

    আজকে যিনি দক্ষিনেতে কালকে তিনি বামের,
    আজকে যিনি তেরোঙ্গাতে কাল ভক্ত রামের!
    কে যে কখন কার পেছনে বুঝিনা কে খাঁটি,
    গোলক ধাঁধায় পড়িয়া আমার হারিয়ে গেছে ঘটি!

    আমাদের অবস্থাও ঠিক তাই ।

  5. কমিউনিস্ট আন্দোলনের কোনো একটা
    কমিউনিস্ট আন্দোলনের কোনো একটা বিষয়ে আলাপ আলোচনা শুরু হলেই কমিউনিজমের শত্রুরা তাদের চেহারাটা দেখিয়ে দেয়। কিছুতেই তারা নিজেদের আটকে রাখতে পারে না। উমর ভাইকে হেয় করার কোন ইচ্ছা এই লেখায় আমি দেখাইনি। আমি তার কিছু বক্তব্যের বিরোধিতা করেছিমাত্র।

    1. সমস্যাটা কি জানেন? কমিউনিষ্ট
      সমস্যাটা কি জানেন? কমিউনিষ্ট বিদ্বেষীরা এখনো এই আদর্শকে ভয় পায়। তাই সুযোগ পাইলেই একহাত দেখিয়ে নেয়। পুঁজিবাদের শেষ পরিনতির পর মানুষ মুক্তির পথ খুঁজতে বাধ্য হবে। খুঁজতে খুঁজতে সাম্যবাদকে মুক্তির পথ হিসাবে বাধ্য হয়ে মেনে নেবে। প্রলেয়তারিয়েতের সংখ্যা আনুপাতিক হারে বাড়ছে। মানুষ তার অস্তিত্বকে টিকিয়ে রাখার জন্য সংগ্রাম করে আসছে সেই আদিকাল থেকে। মুক্তিরপথ মানুষ খুঁজে নেবেই।

  6. কমিউনিষ্ট বলেন আর পুজিপতি
    কমিউনিষ্ট বলেন আর পুজিপতি সমাজ বলেন, কেও মানুষের ঠিক দিক নির্দেশন দিতে পারেনি ও পারবে না।শ্রেণী শোষণ কমাতে পারেনি কেও

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

− 1 = 1