ব্যান্ডউইথ যায় ভারতে, ভিওআইপিতে

বাংলাদেশে ব্যবহারকারীরা দিনরাত নিম্ন গতির ইন্টারনেটের চৌদ্দ গুষ্ঠি উদ্ধার করছেন। আর সরকার ভারতে ব্যান্ডউইথ রপ্তানি করছে। আবার অবৈধ ভিওআইপি ব্যবসাতেও যাচ্ছে ব্যান্ডউইথ। বর্তমানে বাংলাদেশের ব্যান্ডউইথ সামর্থ্য ২৫০ জিবিপিএস। এর মধ্যে বাংলাদেশ সাবমেরিন ক্যাবলসের রয়েছে ২০০ জিবি। দেশে বর্তমানে মাত্র ৪২ জিবি ব্যান্ডউইথ ব্যবহৃত হয়। বাকি ২০৮ জিবি ব্যান্ডউইথই অব্যবহৃত থেকে যাচ্ছে। এ থেকেই অবৈধভাবে কিছু ব্যান্ডউইথ ভিওআইপিতে ব্যবহার হয়।

সম্প্রতি সরকার ভারতের সঙ্গে চুক্তি করেছে মজুদ ২০৮ জিবি থেকে সাতকণ্যার দেশে ৫০ জিবি ব্যান্ডউইথ রপ্তানী করা হবে। এই মর্মে সরকারের সঙ্গে ভারতের চুক্তিও হয়ে গেছে। ভারতকে কিছু দেয়ার বেলায় এই সরকারের কাজের গতি অসামান্য। বলতে না বলতেই প্রাথমিক চুক্তি সম্পন্ন। অব্যবহৃত ব্যান্ডউইথ বিক্রি হবে বাংলাদেশ সাবমেরিন ক্যাবলস কোম্পানি লিমিটেডের (বিএসসিসিএল) মাধ্যমে। এজন্য গত ১২ মে ভারতের ‘ভারত সঞ্চার নিগাম লিমিটেড (বিএসএনএল) এর সঙ্গে একটি সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষর (এমওইউ) করছে দুই পক্ষ। টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয় সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।

সমঝোতা চুক্তি অনুযায়ী, প্রাথমিকভাবে প্রতি সেকেন্ডে ১০ জিবিপিএস ডাটা ট্রান্সফার সম্বলিত ব্যান্ডউইথ রপ্তানি করা হবে। পর্যায়ক্রমে ৫০ জিবি ব্যান্ডউইথ রপ্তানির পরিকল্পনা আছে সরকারের। ভারতের চাহিদা আরো বেশি। এ ব্যাপারে সকল বাণিজ্যিক দেন দরবার সম্পন্ন হলে দ্রুত চূড়ান্ত চুক্তি করা হবে বলে বিএসসিসিএলের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। ব্যান্ডউইথ রপ্তানির সংযোগ লাইন বাংলাদেশের আখাউড়া থেকে ভারতের ত্রিপুরা পর্যন্ত বিস্তৃত থাকবে।

এছাড়া ব্যান্ডউইথের একটি অংশ ব্যবহৃত হয় অবৈধভাবে ভিওআইপিতে। একটি সিন্ডিকেট অবশিষ্ট ২০৮ জিবি থেকে প্রয়োজনীয় ব্যান্ডউইথ নিয়ে তা অবৈধ ভিওআইপি কলে গোপনে ডাইভার্ট করে প্রতিদিন প্রায় ১০ কোটি মিনিট আন্তর্জাতিক কল আনছে। যার দ্বারা মুষ্টিমেয় কিছু লোক আঙুল ফুলে কলাগাছ হয়ে যাচ্ছে। অভিযোগ আছে, এর সঙ্গে জড়িত প্রভাবশালী মহলের কারণেই বিটিআরসির কোনো উদ্যোগই ভিওআইপি বন্ধে কোনো ভূমিকা রাখতে পারছে না। অভিযোগ আছে, ইতোপূর্বে এর নেতৃত্ব দিতেন সদ্য সাবেক স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী অ্যাডভোকেট শামসুল হক টুকুর বড় ছেলে আসিফ শামস। টুকুপুত্র আসিফ শামস ভিশন টেল কোম্পানির চেয়ারম্যান ও পরিচালক। এটি একটি ভিওআইপি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। অভিযোগ আছে, পিতা শামসুল হক টুকুর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ক্ষমতার অপব্যবহার করে তিনি জোরপূর্বক ভিওআইপি ব্যবসা চালিয়েছেন।

বিটিআরসি থেকে প্রাপ্ত তথ্যমতে, রাজস্ব ও নিবন্ধন নবায়ন বাবদ প্রতিষ্ঠানটির কাছে তাদের পাওনা ১৪৬ কোটি ৪৩ লাখ টাকা। যা এখনও অপরিশোধিত। ভিওআইপি ব্যবসা সম্পর্কে যারা খোঁজখবর রাখেন তারা জানেন যে, প্রতিদিন কি পরিমাণ টাকা এই খাতে লেনদেন হয়। গত বছর ভিওআইপি খাত থেকে সরকারের আয় একেবারে তলানিতে এসে ঠেকেছিল। প্রতিদিন প্রায় ১০০ কোটি টাকা লেনদেনের মধ্যে সরকার পাঁচ কোটি টাকাও পায় না। এই বিরাট অবৈধ অর্থের লেনদেনে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীর ছেলে হিসেবে আসিফ শামস আগাগোড়া যুক্ত ছিলেন। যার মাধ্যমে বিপুল অর্থ আয় করেছেন। এসব অর্থ বিদেশের বিভিন্ন ব্যাংকে রাখা আছে। তার ও তার পিতার বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনে একটি মামলা তদন্তাধীন আছে।

বর্তমানে বাংলাদেশে প্রতি এমবিপিএস ব্যান্ডউইথের দাম ২,৮০০ টাকা। যুক্তরাষ্ট্রে মাত্র ৫ ডলার বা ৪০০ টাকা। গ্রাহক পর্যায়ে এখানে ১ মেগাবাইট ডাউনলোড স্পিডের প্যাকেজ ২ হাজার টাকার ওপরে। যুক্তরাষ্ট্রে তা মাত্র ৪ ডলার বা ৩২০ টাকা। আবার বাংলাদেশে ডাউনলোডের সীমা দেয়া থাকে। ১ মেগাবাইটের গ্রাহককে সাবধান করে দেয়া হয় ৬০ গিগাবাইটের বেশি ডাউনলোড না করার জন্য। বেশি ডাউনলোড করলে এ ক্ষেত্রে গ্রাহকের লাইন স্পিড কমিয়ে দেয়া হয়। যুক্তরাষ্ট্রে এ ধরনের কোনো বিধিনিষেধ নেই। ইন্টারনেট ব্যবহারে সারা বিশ্বে সবচেয়ে এগিয়ে দক্ষিণ কোরিয়া। সে দেশে নতুন কোনো স্থাপনা নির্মাণ হলে সরকার নিজে সেখানে একটি অপটিক কেবলের লাইন দিয়ে আসে। এ ক্ষেত্রে তাদের সরকারের নীতি হলো, মানুষ যদি ঘরে বসেই উচ্চগতির ইন্টারনেট সেবা পায় তাহলে সে বাইরে কম বেরোবে। বাইরে যত কম যাবে তত তার সময় বাঁচবে এবং ব্যয় কমবে। রাস্তায় জ্যাম কম হবে, জ্বালানি কম ব্যয় হবে। বাংলাদেশের অর্ধেক জনগণ নিয়েও এই মুহূর্তে ১১টি কেবলে দক্ষিণ কোরিয়া ২৫ টেরাবাইট বা ২৫ হাজার গিগাবাইট ব্যান্ডউইথ ব্যবহার করছে।

আজকের দিনে ১ মেগাবাইটের নিচের গতিকে ইন্টারনেট বলা হয় না। ব্রডব্যান্ডের সংজ্ঞা ৫ মেগাবাইট করার দাবি উঠছে আজকাল। সেখানে বাংলাদেশের টেলি আইনে ২৫৬ কেবিপিএস ও এর অধিক গতিকে ব্রডব্যান্ড বলা হয়। ন্যাশনাল ব্রডব্যান্ড নেটওয়ার্কে ইন্টারনেটে অস্ট্রেলিয়া ২৪তম অবস্থানে রয়েছে। অস্ট্রেলিয়ায় ইন্টারনেটের গড় গতি ৪.৯ এমবিপিএস। আর আমাদের গড় গতি সেখানে ২৫৬ কেবিপিএস মাত্র। অথচ সরকারি ভাষ্যমতে আমরা ফেলে রেখেছি ২০৮ গিগাবাইট ব্যান্ডউইথ। তা দিয়ে ভিওআইপি করছে সরকারের স্বজনেরা! বাদ বাকিটা রপ্তানি করা হচ্ছে শেখ হাসিনা সরকারের প্রধান খুঁটি ভারতকে তুষ্ট রাখার জন্য। ব্যান্ডউইথের দাম গত মাসেই প্রতি এমবিপিএস ৪,৮০০ টাকা থেকে কমিয়ে ২,৮০০ টাকা করা হয়! কে জানে তা? ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলো কেউ বিল কমায়নি। তাদের নিয়ন্ত্রণের কোনো উদ্যোগ নেয় না সরকার। দেখা যাচ্ছে, সব পক্ষই সুবিধা হাতিয়ে নিচ্ছে! শুধু গলা কাটা যাচ্ছে আম জনতার! আমাদের এসব নিয়ে পথে নামতে হবে।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

১৩ thoughts on “ব্যান্ডউইথ যায় ভারতে, ভিওআইপিতে

  1. ভারতে ব্যান্ডুইথ না দিলে তো
    ভারতে ব্যান্ডুইথ না দিলে তো ভারত ক্ষেপে গিয়ে বাংলাদেশ দখল করে ফেলতে পারে। মোদি কিন্তু হেভি ক্ষেপচুরিয়াস! খালি আওয়ামী লীগরে দোষ না দিয়া ভালো করে ভেবে দেখেন।

  2. নে বাবা সব ভারত মাতার চরণতলে
    নে বাবা সব ভারত মাতার চরণতলে ঢেলে দে… আমরা নেটের গতির সাথে(ধীরে সাইকেল চালানোর মতো) তাল মিলাইতে হিমশিম খাই, আর অতিরিক্ত ব্যান্ডউইথ ভারতে যায় নাইওর করতে…

  3. ধন্যবাদ তথ্যপুর্ন পোস্টটির
    ধন্যবাদ তথ্যপুর্ন পোস্টটির জন্যে। আসলেই মাঠে নামা উচিৎ। আর কত জনগনের টাকায় কিছু মহল টাকার পাহাড় করবে।

  4. আমাদের মন্ত্রী মহাদয়
    আমাদের মন্ত্রী মহাদয় চু-রঞ্ছিত ছ্যান কাল বলেছিলেন”সরকারের উচিত্‍ মোদীর সাথে সম্পর্ক ভাল রাখা”উনি যে কেন বল্লনা”সরকারের উচিত্‍ মোদীর সাথে ব্যান্ডুইথ পাঁচার কৈরা সম্পর্ক ভাল রাখা”আপচুচ!

  5. ভাবতেই অবাক লাগে দেশ এগিয়ে
    ভাবতেই অবাক লাগে দেশ এগিয়ে যাচ্ছে!! আমরা এখন বহির্বিশ্বে ইন্টারনেট রপ্তানী করছি। এমন ডিজিটালই তো আমরা চেয়েছিলাম। :bum:

  6. সঠিকভাবে দেশের চাহিদাই মেটানো
    সঠিকভাবে দেশের চাহিদাই মেটানো যাচ্ছে না, সেখানে ইন্টারনেট কি এ দেশে এতই বেশি পরিমানে হয়ে গেছে যে, সেখান থেকে ভারতে রপ্তানির চিন্তা ছাড়া চলছে না, বৈদেশিক মুদ্রার কি অভাব পরছে নাকি ? উল্টো দিকে আবার ভিওয়াইপিতে পাঁচার, দারুনতো এই সরকার !!!!!!!!

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

33 − 29 =