জামায়াতের ধারাবাহিক সাম্প্রদায়িক সহিংসতা এবং স্বমূর্তিতে খালেদা জিয়া

১৯৭১ সালের গণহত্যা প্রথম পর্যায়ে ছিল নির্বিচারে, কিন্তু দ্বিতীয় পর্যায়ে ছিল নির্বাচিত। ২৫ মার্চের কালরাত্রিতে পাকিস্তানের সামরিক জান্তার অপারেশন সার্চলাইটের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল সর্বাত্মক হত্যা,ধর্ষণ, ও ধ্বংসযজ্ঞের মাধ্যমে স্বাধীনতাকামী বাঙ্গালিকে আতঙ্কগ্রস্ত করা। ২৫ মার্চের রাতে তারা ধর্ম, বর্ণ, বিত্ত, ও রাজনৈতিক পরিচয় নির্বিশেষে গোটা জাতির উপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। এক রাতেই তারা সারাদেশে লক্ষাধিক নিরস্ত্র, নিরীহ মানুষকে হত্যা করেছিল।

দ্বিতীয় পর্যায়ে বাঙালিদের একটি অংশ- যারা জামায়তে ইসলামী, মুসলিম লীগ, নেজামে ইসলাম, পিডিপি প্রভৃতি মৌলবাদী সাম্প্রদায়িক দল করত, তারা যখন জেনারেল ইয়াহিয়ার সামরিক জান্তার নৃশংস গণহত্যাকে আরও নৃশংস ও পরিকল্পিত রুপ প্রদানের উদ্দেশ্যে ‘শান্তি কমিটি’, ‘রাজাকার’, ‘আলবদর’, ‘আলশামস’ প্রভৃতি ঘাতক বাহিনী গঠন করে তখন তাদের প্রধান লক্ষ্য ছিল মুক্তিযোদ্ধারা সহ আওয়ামী লীগ,ন্যাপ ও কমিউনিস্ট পার্টির নেতা-কর্মী-সমর্থকবৃন্দ এবং দলমত নির্বিশেষে হিন্দু সম্প্রদায়। চূড়ান্ত পর্যায়ে পরাজয় নিশ্চিত জেনে তারা তালিকা তৈরী করে হত্যা করেছিল হত্যা করেছিল দেশের শ্রেষ্ঠ বুদ্ধিজীবী ও পেশাজীবীদের, যাতে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে না পারে। ’৭১-এর গণহত্যা সম্পর্কে বলা হয় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর মানবজাতির ইতিহাসে এত অধিক সংখ্যক হত্যা,ধর্ষণ,নির্যাতনের নৃশংস ঘটনা কখনও কোথাও ঘটেনি। প্রধানতঃ পরিকল্পিত হিন্দুনিধনের জন্য গণহত্যা বিশেষজ্ঞরা একে ‘জেনোসাইড’ বলেন।

’৭১ এর পাকিস্তানি সামরিক জান্তা এবং তাদের প্রধান দোসর জামায়াতে ইসলামী মুক্তিযোদ্ধাদের এবং মুক্তিকামী বাঙালিদের বলত ‘দুষ্কৃতকারী’, ‘ইসলামের দুশমন’ ও ‘ভারতের চর’। শাহবাগের প্রজন্ম চত্বরে মহাজাগরণের তরুণ নায়কদের বিরুদ্ধে জামায়াত ও বিএনপি একই ভাষায় বিষোদগার করেছে। বিএনপির মুখপত্র ‘আমার দেশ’ বলছে এই মহাজাগরণ ঘটেছে ভারতের মদদে। বিএনপি ও জামায়াতের সকল গণমাধ্যমে মহাজাগরনের নায়কদের বলা হচ্ছে ‘ইসলামের দুশমন’, ‘নাস্তিক’, ‘মুরতাদ’, ‘কাফের’ ইত্যাদি।

শাহবাগের গণজাগরন মঞ্চের অন্যতম ব্লগার রাজীব হায়দারকে হত্যা করেই তারা ক্ষান্ত হয়নি, তাকে নাস্তিক বানাবার জন্য তার ব্লগে আল্লাহ, রসুল ও ইসলামবিরোধী কিছু কথা সেঁটে দিয়েছে। প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার জন্য এটি জামায়াতের বহুল ব্যবহৃত একটি কদর্য সাম্প্রদায়িক হাতিয়ার। গত বছর পাকিস্তানে জামায়াতের এক লোক কোরান শরীফে আগুন ধরিয়ে দিয়ে এর জন্য এক খৃস্টান বালিকার ব্লাশফেমির মামলা দায়ের করেছিল। মামলার তদন্তে বেরিয়ে এসেছে- কোরান শরীফ পোড়ানোর ঘটনার সঙ্গে কোনও খৃস্টান নয়, জামায়াতের হুজুর জড়িত। একইভাবে রাজীবের ব্লগ তদন্ত করে পত্রিকায় বেরিয়েছে কীভাবে তার মৃত্যুর পর জামায়াতিরা এই দুষ্কর্ম করেছে। ঠিক যেভাবে গত বছর সেপ্টেম্বরে কক্সবাজারের বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের উপর নজিরবিহীন নৃশংস হামলা চালানোর আগে বৌদ্ধ যুবক উত্তম বড়ুয়াক্র ফেসবুকে তারা কোরান অবমাননার ছবি সেঁটে দিয়েছিল।

শাহবাগ প্রজন্ম চত্বরের মহাজাগরন ভারতের মদদে হয়েছে- এই কথা বলে তারা বাংলাদেশে হিন্দু সম্প্রদায়ের উপর হামলার ক্ষেত্র তৈরী করেছে এবং সাঈদীর মামলার রায় ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে কয়েকটি জেলায় হিন্দু ও বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের উপর ঝাঁপিয়ে পড়েছে। ২৮ ফেব্রুয়ারী ও ১ মার্চ জামায়াতের সন্ত্রাসীরা হিন্দুদের দেড় হাজার ঘরবাড়ি,মন্দির ও উপাসনাস্থল ধ্বংস করেছে, একজন পুরোহিত সহ সংখ্যালঘু ধর্মীয় সম্প্রদায়ের ৫ জনকে হত্যা করেছে বলে জানিয়েছে ‘বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খৃস্টান ঐক্য পরিষদ’।

সাঈদীর মামলার রায় বাতিলের দাবীতে জামায়াত ও বিএনপি ৩,৪,৫ মার্চ হরতাল ডেকেছে, যে সময় ভারতের রাষ্ট্রপতি শ্রী প্রণব মুখোপাধ্যায় সস্ত্রীক রাষ্ট্রীয় সফরে বাংলাদেশে অবস্থান করছেন। জামায়াতের সঙ্গে বিএনপির সম্পর্ক পাকিস্তানপ্রেমের গাঁটছড়ায় বাঁধা। জামায়াত ও পাকিস্তানকে সন্তুষ্ট করার জন্য খালেদা জিয়া ভারতের মাননীয় রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে তার নির্ধারিত বৈঠকও বাতিল করেছেন। তিনি জামায়াতের ডাকা হরতালের দিন ভারতের রাষ্ট্রপতির সঙ্গে বৈঠকে গিয়ে হরতালের পবিত্রতা নষ্ট করতে চান নি।

ভারতের রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখোপাধ্যায়ের বাংলাদেশ সফরের অন্যতম উপলক্ষ্য- মুক্তিযুদ্ধে তার অসামান্য অবদানের জন্য আমাদের রাষ্ট্রীয় সম্মাননা গ্রহণ। জামায়াত ও পাকিস্তানের জন্মশত্রু ভারত। এই শত্রুতার কারণেই আমাদের মুক্তিযুদ্ধ সব সময় জামায়াতের বিবেচনায় ভারতের চক্রান্ত। খালেদা জিয়া বাংলাদেশে দুবার প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। ওয়েস্টমিন্সটার গণতন্ত্রে বিরোধী দলের নেতা ছায়া সরকারের প্রধানমন্ত্রী। বন্ধুপ্রতীম দেশের সফররত রাষ্ট্রপ্রধানের সঙ্গে বিরোধী দলের নেতা বা ছায়া সরকারের প্রধানমন্ত্রীর সাক্ষাৎকার কূটনৈতিক শিষ্টাচার ও রাষ্ট্রীয় মর্যাদার অন্তর্গত। জামায়াত ও পাকিস্তানকে তুষ্ট করতে গিয়ে খালেদা জিয়া আবারও প্রমান করেছেন তিনি বাংলাদেশের নয়, পাকিস্তানের একজন সুযোগ্য নেত্রী। বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌম মর্যাদার প্রতি প্রতি তার কোন দায়বদ্ধতা নেই। অথচ এই খালেদা জিয়াই গতবছর ভারতে গিয়ে বলে এসেছিলেন তারা এখন থেকে ভারতের বিরুদ্ধে বৈরি কোনও আচরন করবেন না,সন্ত্রাসবাদকে মদদ দেবেন না ইত্যাদি। অবশ্য খালেদা জিয়ার ভারত সফর এবং তার এসব কথার তাৎক্ষণিক প্রতিবাদ করেছিল জামায়াত। জামায়াত ও পাকিস্তানের সঙ্গে খালেদা জিয়ার প্রগাঢ় প্রেম ইতিহাসের কষ্টিপাথরে পরীক্ষিত।

’৭১-এ পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী এবং জামায়াতে ইসলামীর গণহত্যার প্রধান লক্ষ্য ছিল হিন্দু সম্প্রদায়। এই গণহত্যা সম্পর্কে ইউরোপ ও আমেরিকার বিভিন্ন দৈনিক ও সাময়িকীতে তখন যেসব প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছিল সেখানেও হিন্দু নিধনের বিষয়টি গুরুত্বলাভ করে।

১৯৯২ সালের ডিসেম্বরে ভারতে হিন্দু সাম্প্রদায়িক দলগুলো অযোধ্যায় একটি মসজিদ ভেঙ্গেছিল। সেই অজুহাতে বাংলাদেশে জামায়াতে ইসলামী এবং তাদের সহযোগী মুসলিম মৌলবাদী ও সাম্প্রদায়িক দলগুলো সারা দেশে ৩৬০০ মন্দির ভেঙ্গেছিল। জাতীয় সংসদের ধারা বিবরণীতে এ পরিসংখ্যান পাওয়া যাবে। যারা এক দেশের মসজিদ ভাঙ্গার জন্য আরেক দেশের মন্দির ভাঙ্গে তারা কখনও প্রকৃত মুসলিম হতে পারে না।

বাংলাদেশের হিন্দুরা যেমন বাবরি মসজিদ ভাঙ্গেনি তেমনি গুজরাটের মুসলমানেরাও বাংলাদেশ বা পাকিস্তানে হিন্দু নির্যাতনের জন্য দায়ী হতে পারে না। ২০০২ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারী মধ্য থেকে জুন পর্যন্ত গুজরাটে মুসলিম নিধনের আগে ২০০১ সালের ১ অক্টোবর জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে জামায়াত ও বিএনপির জোট সাম্প্রদায়কি সহিংসতার যে হাজার হাজার ঘটনা সংঘটিত করেছিল মুক্তিযুদ্ধোত্তর বাংলাদেশে তার দ্বিতীয় নজির নেই। এই ঘটনার প্রতিবাদ করার জন্য জামায়াত-বিএনপির জোট সরকার আমাকে ও অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন সহ বহু সাংবাদিককে গ্রেফতার করে নির্যাতন করেছিল,কয়েক জনকে হত্যাও করেছিল। জামায়াত-বিএনপি জোটের জমানায় হিন্দু,বৌদ্ধ অ খৃস্টানদের পাশাপাশি মুক্তচিন্তার বুদ্ধিজীবী, পেশাজীবী,সংস্কৃতিকর্মী ধর্মনিরপেক্ষ গণতন্ত্রে বিশ্বাসী রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মী,আহমদীয়া মুসলিম সম্প্রদায়- কেউই তাদের হত্যা,নির্যাতন,লুন্ঠন,অগ্নিসংযোগ এবং দেশান্তরিতকরণ থেকে রক্ষা পায়নি।

জামায়াতের হিসেব খুবই সহজ। বাংলাদেশকে মওদুদীবাদী ইসলামী রাষ্ট্রে পরিণত করতে হলে অমুসলিম বা ভিন্নমতের মুসলিম কিনবা ধর্মনিরপেক্ষতায় বিশ্বাসী সবাইকে নিশ্চিহ্ন করতে হবে। এ দেশকে মোল্লা উমর ও ওসামা বিন লাদেনের আফগানিস্তানের মতো মনোলিথিক মুসলিম রাষ্ট্র বানাতে হবে, মানবরচিত সংবিধান ফেলে দিয়ে আল্লাহর আইন প্রতিষ্ঠার নামে মৌদুদীবাদ প্রতিষ্ঠা করতে হবে। এ কারণেই যখনই সুযোগ পেয়েছে তখনই তারা অসহায় ধর্মীয় সংখ্যালঘু এবং আহমদীয়া মুসলিমদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়েছে।

এবারও জামায়াতের হত্যা,ধর্ষণ,লুন্ঠন ও অগ্নিসংযোগের অন্যতম শিকার হিন্দুরা। এর কারণ হচ্ছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বাচ্চু রাজাকার ও দেইল্ল্যা রাজাকারের মামলায় কয়েকজন হিন্দু সাক্ষ্য দিয়েছেন। ২ মার্চ (২০১৩) ডেইলি স্টার-এ বেরিয়েছে, নোয়াখালির বেগমগঞ্জে জামায়াত-শিবিরের ২৫০-৩০০ সন্ত্রাসী হিন্দুদের ঘরবাড়িতে হামলার সময় বলেছে- হিন্দুদের স্বাক্ষ্য দেয়ার কারণে নাকি সাঈদীর ফাঁসির আদেশ দিয়েছে আদালত। প্রকৃত তথ্য হচ্ছে সাঈদীর বিরুদ্ধে উত্থাপিত ২০টি অভিযোগের ভেতর মাত্র দুটি অভিযোগে সাঈদীকে মৃত্যুদন্ড দেয়া হয়েছে। এ দুটি অভিযোগে স্বাক্ষ্য দেয়ার জন্য কোনও হিন্দু ট্রাইব্যুনালে আসেনি। বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খৃস্টান ঐক্য পরিষদের ২ মার্চ-এর মানববন্ধন কর্মসূচী থেকে বলা হয়েছে-“দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর মামলার রায়ের পর থেকে ১ মার্চ রাত আটটা পর্যন্ত চট্টগ্রামের বাশখালীতে ১২টি হিন্দু বাড়ি ও তিনটি মন্দিরে হামলা ও ভাংচুর করা হয়।হত্যা করা হয় একটি মন্দিরের পুরোহিতকে। সাতকানিয়ায় আটটি বাড়ি ও একটি বৌদ্ধ মন্দির ভাঙচুর এবং চট্টগ্রাম শহরের চট্টেশ্বরী সড়কে কয়েকটি দোকানে হামলা হয়েছে। এ ছাড়া কক্সবাজারের কুতুবদিয়া ও মহেশখালীতে মন্দিরে আগুন দেওয়া হয়েছে।

‘নোয়াখালীর বেগমগঞ্জের রাজগঞ্জে গ্রামে ৪৫ টি আগুন দেওয়া ছাড়াও নয়টি বাড়ি ও পাঁচটি মন্দিরে হামলা ও লুটপাট করা হয়। লক্ষীপুরের চন্দ্রগঞ্জ বাজারে হিন্দুদের পাঁচটি সোনার দোকান লুট, একটি মন্দিরে হামলা ও লুটপাট হয়েছে। রায়পুরের গাইয়ারচরে একটি মন্দির ও দুটি আশ্রমে আগুন লাগানো হয়েছে।

‘গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জে বেলকা গ্রামে ৩৫টি বাড়িতে আগুন দেওয়া হয়েছে,ভাঙচুর করা হয়েছে ব্রাহ্মণডাঙ্গা গ্রামে ছয়টি বাড়ি ও দোকান। সিলেটের কানাইঘাটের গাছবাড়ি বাজারে হিন্দুদের দোকান লুট হয়েছে। এছাড়া মৌলভীবাজারের বড়লেখার জুড়িবাজারে,ঠাকুরগাঁওয়ের গড়েয়া গ্রামে,চাঁপাইনবাবগঞ্জের কানসাটে, সাতক্ষীরার শ্যামবাজারে, বাগেরহাটের মোড়েলগঞ্জে, কুমিল্লা শহরের ব্রাহ্মণপাড়ায়, রংপুরের মিঠাপুকুরে, কুমিল্লার কসবায় সাম্প্রদায়িক হামলার ঘটনা ঘটেছে বলে উল্লেখ করা হয়।’ (প্রথম আলো, ২ মার্চ ২০১৩)

জামায়াত বাংলাদেশকে হিন্দু শুণ্য করতে চায় তাদের রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়নের জন্য। জামায়াত মনে করে আওয়ামীর একটি বড় ভোট ব্যাংক হচ্ছে সংখ্যালঘু ধর্মীয় সম্প্রদায়। সমস্যা হচ্ছে আওয়ামীলীগ যখন ক্ষমতায় থাকে তখন সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে যে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ প্রয়োজন তা তারা করে না। বঙ্গবন্ধু এবং তার সহযোগীরা ১৯৭২-এর সংবিধানে ধর্মের নামে রাজনীতি নিষিদ্ধ করেছিলেন। জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় এসে এই নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের পাশাপাশি সংবিধানের মাথার উপর ‘বিসমিল্লাহ…’ লাগিয়ে ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’, ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদ’, ও ‘সমাজতন্ত্র’ বাতিল করে বাংলাদেশের সমাজ ও রাজনীতির পাকিস্তানিকরণ প্রক্রিয়া আরম্ভ করেছিলেন। ২০০৮ সালে জাতীয় সংসদে তিন চতুর্থাংশ আসনে জয়ী হয়ে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর সুপ্রিম কোর্টের রায় পাওয়া সত্ত্বেও ’৭২-এর সংবিধান পুনঃপ্রবর্তন করেনি। বরং এ রায় উপেক্ষা করে সংবিধানে ‘রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম’, ও ‘বিসমিল্লা…’ রেখে দিয়েছে যা, সংবিধানের ১২ অনুচ্ছেদে বর্ণিত ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’র পরিপন্থী এবং একই সঙ্গে সংখ্যালঘু ধর্মীয় সম্প্রদায়ের সমান অধিকার,মর্যাদা ও ধর্মবিশ্বাসের পরিপন্থী।

শাহবাগ প্রজন্ম চত্বরে প্রথম যে ছয় দফা ঘোষণা দেয়া হয়েছিল,যা স্পীকারের মাধ্যমে জাতীয় সংসদে প্রদান করা হয়েছে, সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী যা সমর্থন করেছেন সেখানে জামায়াতের পাশাপাশি ধর্মভিত্তিক রাজনীতি নিষিদ্ধকরনের কথা বলা হয়েছিল। পরে আওয়ামী লীগের চাপের কারণে শাহবাগের গণজাগরন মঞ্চকে ধর্মভিত্তিক রাজনীতি নিষিদ্ধকরনের কথা বাদ দিয়ে শুধু জামায়াত নিষিদ্ধ করার দাবির ভেতরে আন্দোলন সীমাবদ্ধ রাখতে হয়েছে। এতে মৌলবাদীরা আওয়ামী লীগের ওপর সন্তুষ্ট হয়েছে এমন প্রমাণ এখনও দৃশ্যমান নয়। বরং গণজাগরণ মঞ্চের নায়কদের ‘নাস্তিক’, ‘মুরতাদ’, ‘কাফের’ আখ্যা দিয়ে তাদের চরিত্র হননের প্রক্রিয়ায় জামায়াত এবং তথাকথিত জামায়াতবিরোধী মৌলবাদীরা কোরাসে কন্ঠ মেলাচ্ছেন। জামায়াত-শিবিরের খুনিদের হাতে নিহত ব্লগার রাজিবের পরিবারকে সান্ত্বনা দিতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছিলেন, জামায়াতে ইসলামী কোনও রাজনৈতিক দল নয়,সন্ত্রাসী সংগঠন। মন্ত্রীরাও দাবী জানাচ্ছেন জামায়াত নিষিদ্ধ করতে হবে। তারা নাকি নিষিদ্ধকরনের আইন খুঁজে বেড়াচ্ছেন।

আমরা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছি- জামায়াত নিষিদ্ধকরনের জন্য নতুন আইন প্রয়োজন হবে না। সরকার চাইলে সংবিধানের ৩৮ ধারা,কিনবা বিশেষ ক্ষমতা আইনের ২০ অনুচ্ছেদে, কিনবা সন্ত্রাসবিরোধী আইনের ১৮ ধারা প্রয়োগ করে জামায়াত নিষিদ্ধ করতে পারে। এর জন্য কোনও আদালতে যেতে হবে না,প্রশাসনিক নির্দেশেই তা সম্ভব। গত ২ মার্চ জাতীয় সংসদে দফতরবিহীন মন্ত্রী এডভোকেট সুরঞ্জিত সেনগুপ্তও তাই বলেছেন।
ধর্মীয় সংখ্যালঘুর জীবন ও জীবিকা নিরাপদ করতে হলে, বাংলাদেশ থেকে জঙ্গীবাদ সন্ত্রাস নির্মূল করতে হলে এবং আর্থ সামাজিক অগ্রগতি নিশ্চিত করতে হলে এই মুহুর্তে জামায়াত নিষিদ্ধ করা ছাড়া দ্বিতীয় কোন পথ মহাজোট সরকারের সামনে খোলা নেই।

৪ মার্চ ২০১৩
ঢাকা

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

৯ thoughts on “জামায়াতের ধারাবাহিক সাম্প্রদায়িক সহিংসতা এবং স্বমূর্তিতে খালেদা জিয়া

  1. আরো একটি সময়পোযোগী পোস্ট
    আরো একটি সময়পোযোগী পোস্ট পেলাম,এইজন্যে ধন্যবাদ জানাই স্যারকে।
    দারুন তথ্যবহুল পোস্ট,ইস্টিশন মাষ্টারের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি স্টিকি করা যায় কিনা ভেবে দেখার।
    :bow: :bow: :bow:

  2. হাসব, নাকি কাঁদব বুঝতে পারছি
    হাসব, নাকি কাঁদব বুঝতে পারছি না। মন্দির ও হিন্দুদের বাড়িঘরে হামলা ও অগ্নিসংযোগের ঘটনার নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে জামায়াত। একই সঙ্গে এসব ঘটনায় বিচারবিভাগীয় তদন্তের মাধ্যমে দোষীদের শনাক্ত করে শাস্তি দেওয়ার আহ্বান জানান। সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতনকারীদের প্রতিহত করতে দেশের সর্বস্তরের মানুষের প্রতি আহ্বান জানানো হয়। আগে চোরের মা’র গলা বড় হইত, এখন চোরেরই বড় গলা……

    দারুন গোছান ও তথ্যসমৃদ্ধ এই লেখাটার জন্য শাহরিয়ার কবির স্যারের প্রতি কৃতজ্ঞতা।

  3. পাকিস্তানে বৃষ্টি হলে ঢাকায়
    পাকিস্তানে বৃষ্টি হলে ঢাকায় ছাতা ধরতে মরিয়া জামায়াত-শিবির। তারা আদতে বাংলাদেশে বসবাসরত পরিত্যক্ত পাকিস্তানি। তাদেরকে নিষিদ্ধ করে পাকিস্তানের টিকেট ধরিয়ে দেয়া উচিত।

    ধর্মে ধর্মে সৌহাদ্য সব ধর্মের নীতির মধ্যেই। কিন্তু জামায়াত-শিবির সে পথে হাঁটে না। কারণ তারা ধর্মের বেশধারী একেকটা কপট অধার্মিক! তাদেরকে রুখতে হবে।

  4. দেশের পরিস্থিতির কোন আগা মাথা
    দেশের পরিস্থিতির কোন আগা মাথা বুঝতাছিনা। :কনফিউজড: :কনফিউজড: তয় এইডা বুঝতাছি ক্ষমতা একটা খারাপ জিনিস বিশেষ করে আমাদের বাঙালিদের জন্য। :ভাবতেছি: :ভাবতেছি:

  5. ’৭১ এর পাকিস্তানি সামরিক

    ’৭১ এর পাকিস্তানি সামরিক জান্তা এবং তাদের প্রধান দোসর জামায়াতে ইসলামী মুক্তিযোদ্ধাদের এবং মুক্তিকামী বাঙালিদের বলত ‘দুষ্কৃতকারী’, ‘ইসলামের দুশমন’ ও ‘ভারতের চর’। শাহবাগের প্রজন্ম চত্বরে মহাজাগরণের তরুণ নায়কদের বিরুদ্ধে জামায়াত ও বিএনপি একই ভাষায় বিষোদগার করেছে। বিএনপির মুখপত্র ‘আমার দেশ’ বলছে এই মহাজাগরণ ঘটেছে ভারতের মদদে। বিএনপি ও জামায়াতের সকল গণমাধ্যমে মহাজাগরনের নায়কদের বলা হচ্ছে ‘ইসলামের দুশমন’, ‘নাস্তিক’, ‘মুরতাদ’, ‘কাফের’ ইত্যাদি।

    ১৯৭১ আর ২০১৩-এর রাজনৈতিক পরিস্থিতির কোন পার্থক্য নাই।

  6. সময় উপযোগী তথ্যবহুল লেখার
    সময় উপযোগী তথ্যবহুল লেখার জন্য শাহরিয়ার কবির স্যারকে অসংখ্য ধন্যবাদ। এরূপ তথ্য বহুল আরও লেখার আহবান জানাচ্ছি।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

− 5 = 2