তিস্তা পাড়ের অর্থনীতি

দেশের বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর এবং নিঃসন্দেহে সরকারের নীতি নির্ধারকদের একজন, ড. আতিউর রহমান লিখিত একটি প্রবন্ধ গত ৩১ মে, ২০১৩ দৈনিক সমকালে ছাপা হয়েছে। ‘অর্থনীতির নবযাত্রা’ শীর্ষক প্রবন্ধটিতে লেখক দাবি করেছেন-
‘বাংলাদেশ এখন খাদ্য উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ। একাত্তরের তুলনায় খাদ্য উৎপাদন বেড়েছে সাড়ে তিন গুণেরও বেশি। সরকারি হিসাবে দেশে চাল ভোগের পরিমাণ বছরে দুই কোটি ২০ লাখ টন। আর উৎপাদন তিন কোটি ৫৭ লাখ টন। অর্থাৎ দেশে চাল উদ্বৃত্ত রয়েছে। গত দু’বছর ধরে বাংলাদেশ চাল আমদানির ইতি টেনেছে। উপরন্তু, উদ্বৃত্ত চাল রপ্তানি করা যায় কিনা তা নীতি-নির্ধারণী মহলে ভাবা হচ্ছে। …অল্প সময়ে এত বড় সাফল্য কৃষকরাই এনেছেন। মুক্তিযুদ্ধের মতোই কৃষি উৎপাদন বাড়ানোর সংগ্রামে কৃষকরা বিজয় ছিনিয়ে এনেছেন। তারাই আমাদের প্রকৃত বীর। কৃষি উন্নয়নে পুরুষের পাশাপাশি এগিয়েছেন নারীরাও।’

একই প্রবন্ধে ড. আতিউর রহমান আরও দাবি করেছেন-
‘সত্তরের দশকে জিডিপির গড় প্রবৃদ্ধি ছিল মাত্র এক শতাংশ। বর্তমানে ৬ শতাংশেরও বেশি হারে প্রবৃদ্ধি অর্জন করে চলেছে বাংলাদেশ। গত তিন অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৬ দশমিক ৪ শতাংশ হারে। …চার দশক আগে দারিদ্র্যের হার ছিল ৭০ শতাংশেরও বেশি। ২০১০ সালে দারিদ্র্য ৩১ দশমিক ৫ শতাংশে নেমে এসেছে। বর্তমানে তা ২৯ শতাংশের নিচে। সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা বা এমডিজির অন্যতম লক্ষ্য হচ্ছে দারিদ্র্যের হার ২০১৫ সালের মধ্যে ২৫ শতাংশে নামিয়ে আনা। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ যে সাফল্য অর্জন করেছে, তাতে মনে হচ্ছে, নির্ধারিত সময়ের আগেই এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হবে। …স্বাধীনতার আগে মাথাপিছু আয় ছিল ১০০ ডলারের মতো। বর্তমানে তা দাঁড়িয়েছে ৮৫০ ডলার। দুই দশক আগেও যেসব শ্রমিকের দৈনিক আয় একশ’ টাকার নিচে ছিল, তাদের দৈনিক আয় এখন প্রায় ৪০০ টাকা। …ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল লিখেছে, বাংলাদেশ এখন অনেক দেশের জন্য ‘অনুকরণীয়’ একটি দেশ। সম্প্রতি প্রকাশিত জাতিসংঘের বিশ্ব অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ও পূর্বাভাস-২০১৩ শীর্ষক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, বিগত সালে দক্ষিণ এশিয়ায় ধীর গতির অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মধ্যেও বাংলাদেশের অর্থনৈতিক চিত্র ‘অনুকূল’ ছিল।’

ইদানীং বিভিন্ন সভা সেমিনারেই বাংলাদেশের উন্নয়নের এরকম অনেক তথ্য প্রচার করা হচ্ছে সরকারের পক্ষ থেকে। তারই ধারাবাহিকতায় উঠে আসা বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ও একজন অর্থনীতিবিদ হিসেবে ড. আতিউর রহমানের এই বক্তব্য আমরা গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছি। দেশের উন্নয়নের বেশ কিছু নজির সাদা চোখে দেখাই যায়। কিন্তু গভর্নর ড. আতিউর রহমান যাদের ‘প্রকৃত বীর’ উপাধি দিয়েছেন, বাস্তবে দেশের সেই সাধারণ মানুষের অবস্থা কি? প্রান্তিক জনগণের বাস্তব অবস্থা কি সরকারি কর্মকর্তাদের দেয়া এসব প্রবন্ধ-প্রতিবেদনে ঠিকঠাক প্রতিফলিত হচ্ছে? উৎপাদন বাড়ছে বটে! কিন্তু উৎপাদন করেন যে কৃষক-শ্রমিকরা তাদের উন্নতি কি সেই তুলনায় এগোচ্ছে? নাকি তার গতি খুবই শ্লথ? নাকি তারা বরং পিছিয়ে পড়ছে?

এ প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে আমরা পাঠচক্র সংগঠন ‘কমিউনিজম অধ্যয়ন কেন্দ্র’ এর পক্ষ থেকে নিয়মিত অনুসন্ধান চালাচ্ছি। যার নাম দেয়া হয়েছে ‘অর্থনীতির নবযাত্রা ও গ্রামের গরিব কৃষক’। গ্রাম বিবর্তন অনুসন্ধান কার্যক্রমের আওতায় এ অনুসন্ধান এখনো চলমান। অনুসন্ধানের প্রথম পর্বটি ছিল খুলনার দাকোপ উপজেলা। দ্বিতীয়টি ছিল সাতক্ষীরা সদর, তালা ও কালিগঞ্জ উপজেলা। তিস্তা পাড়ের অর্থনীতি একই অনুসন্ধান কার্যক্রমের তৃতীয় পর্ব। প্রতিটি অনুসন্ধানেই আমরা তথ্যসূত্র হিসেবে পত্রিকার খবর, স্থানীয় অধিবাসী তথা কৃষক, কৃষি মজুর, নারী কৃষক, জেলে, শ্রমিক, নারী শ্রমিক, গৃহিণী, শিক্ষক, শিক্ষার্থী, ব্যবসায়ী, পরিবহন চালক, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, সরকারের কর্মকর্তা, উন্নয়ন কর্মী ও রাজনৈতিক কর্মীদের মতামত গ্রহণ করছি। এর বাইরে জাতীয় পর্যায়ের বিশেষজ্ঞ, সরকারের নীতি নির্ধারকসহ আরও অনেকের মন্তব্য সহকারে এই অনুসন্ধানগুলোকে পূর্ণাঙ্গরূপে প্রকাশনার উদ্যোগ নেয়ার ইচ্ছা আছে আমাদের। আমরা আশা করি, এই অনুসন্ধান সমাজব্যবস্থার মূল্যায়ন ও গণকর্মসূচী তৈরীতে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে।

————–

ভূমিকা
তিস্তা যখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে, ক্ষমতাসীনরা বাদে প্রায় বাকি সব রাজনৈতিক পক্ষই এ প্রশ্নে তাদের উদ্বেগ প্রকাশ করেছিল। তিস্তায় পানি নেই, কেন নেই, এতে কী হচ্ছে, তা নিয়ে নানা ধরনের আলাপ আলোচনা চলছে দেশের সর্বত্র। যারা রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত এবং সচেতন নাগরিক, এক্ষেত্রে তাদের সবার আলাপ-আলোচনার প্রধান প্রসঙ্গ ছিল ভারত। বিশেষজ্ঞদের আলাপে প্রাধান্য পায় তিস্তা নদীর ইতিহাস, পানির হিসাব-নিকাশ, বাঁধ, ড্যাম, ব্যারেজের প্রভাবের কথা। কিন্তু সাধারণ জনগণের কাছে, বিশেষ করে যারা তিস্তা পাড়ে থাকেন, সেখানে বেড়ে উঠেছেন, তিস্তার অববাহিকাই যাদের জীবিকা, তাদের কাছে বিষয়গুলো যেন কিছুটা ভিন্ন।

তিস্তায় পানি নেই জানতে পেরে আমরা ছুটে গিয়েছিলাম সেখানকার মানুষগুলোর কাছে। আমরা গিয়ে দেখি, বাংলাদেশ অংশে নদীতে কোনো পানি নেই। তিস্তা ব্যারেজের পেছনে নদীর অংশ দেখলে মনে হবে খোলা মাঠ। ধূ ধূ বালুচর। দেখলেই বোঝা যায়, নদীটি খননের (ড্রেজিং) কোনো চেষ্টা নেই অনেক দিন। নদীর গভীরতা বলে কিছু নেই। পাড় থেকে কয়েক ফুট নিচে নদীর বদলে একটা সমতল বালুর মাঠ দেখা যায় শুধু। এখন মৌসুমের পরিবর্তনের আভাসের সঙ্গে সঙ্গে সেখানে পানি আসছে! কিন্তু তিস্তা সমস্যার কোনো সমাধান হয়নি। নদীর সঙ্গে তীরবর্তী মানুষের জীবনের রয়েছে গভীর সংযোগ। তবে আমরা শুধু পানি সমস্যার ভেতরে থাকিনি। দেশের প্রান্তিক মানুষগুলো কিভাবে জীবন কাটায় আমরা সেই চিত্রটা তুলে আনার চেষ্টা করেছি।

‘অর্থনীতির নবযাত্রা’র এ যুগে, যে ঢোল বাজিয়ে বেড়াচ্ছে সরকার, শিক্ষিতশ্রেণী ও নগরের নিরাপদ জীবন যাপনে অভ্যস্তরা- আমরা অন্বেষণ করেছি গ্রামের গরিব মানুষগুলোর কী কী উন্নতি হলো! এ লেখাটি তাই তিস্তা নদীর সঙ্গে যতটা না সংশ্লিষ্ট, তার চেয়ে বাংলাদেশের অর্থনীতি, তিস্তা পাড়ের মানুষদের অর্থনীতি, উন্নয়নের বুলি ও প্রচারের বিপরীতে জনতার বাস্তব উন্নয়নের সঙ্গে অনেক বেশি সংশ্লিষ্ট। যেখানে শুধু একা ভারত নয়, তার প্রভুদের অস্তিত্বও বিরাজমান। তিস্তা পাড়ের জীর্ণ-শীর্ণ, গরিব মানুষগুলোর বেঁচে থাকা মানেই বাংলাদেশের সরকারগুলোর উন্নয়ন মডেল ও তাদের লুটপাটের বিরুদ্ধে লড়া, সাম্রাজ্যবাদের আগ্রাসন, সম্প্রসারণবাদের দখলদারিত্ব ও দুনিয়াজোড়া পুঁজিবাদীদের মুনাফার জন্য পাতা নানা ধরনের ফাঁদের বিরুদ্ধে অবিরাম লড়ে চলা! সেই সচেতনতা ও লড়াইটাকে মূর্ত করতেই আমাদের এ আয়োজন!

কৃষকের জমি
নীলফামারি জেলার জলঢাকা থেকে শুরু করে লালমনিরহাট জেলার দোয়ানি বাজার পর্যন্ত আমরা কৃষকদের সঙ্গে কথা বলেছি। নীলফামারির কিশোরগঞ্জ থানার বড়ভিটা ইউনিয়নের কৃষিজমির মালিকানার যে অবস্থা তাতে করে বোঝা যায় যে, এ অঞ্চলের গরিব মানুষগুলো দিনকে দিন তাদের জমি খোয়াচ্ছে!

চাষী গণেশচন্দ্র সেনের আবাস কিশোরগঞ্জ জেলার বড়ভিটা ইউনিয়নের মেলাবর গ্রামে। বয়স প্রায় পঞ্চাশের কাছাকাছি। নিজে বলতে পারেন না। বলেন, ‘অমনই হইব।’ এটা লক্ষ্যণীয় যে, গ্রামের কোনো কৃষকই তাদের সঠিক বয়স বা জন্ম তারিখ বলতে পারেনি। চাষবাসের পাশাপাশি জলঢাকা বাজারের একটি দোকানে কাজ করেন। ঘর সংসার একেবাড়ে ছোট না। স্ত্রীসহ দুই ছেলে। এক ছেলে বিয়ে করেছে। সেই ঘরে একটা নাতিও আছে। পুত্রবধুই পরিবারের সবকিছু দেখভাল করেন।

গণেশচন্দ্র সেনের নিজের জমির পরিমাণ ৩ বিঘা (স্থানীয় হিসেবে ২৭ শতকে এক বিঘা, সেই হিসেব অনুযায়ী)। আগে ছয় বিঘার চেয়ে একটু বেশি ছিল। বাপ-দাদার রেখে যাওয়া জমি। বছর পাঁচেক আগে ছেলের বিয়ের সময় অর্ধেকটাই বিক্রি করে দিয়েছেন। গণেশ জানান যে, এখানকার লোকজন প্রায়ই জমি বিক্রি করতে বাধ্য হয়। কারণ এ অঞ্চলের মানুষের আয় তুলনামূলক কম। বিদেশ যাওয়া (অন্য কোনো শহরে কাজ করতে যাওয়া) লোকজন যখন ফেরত আসে, তারা মাসখানেক চলতে পারে। এরপর আবার যা তাই।

তাহলে এ জমি যাচ্ছে কোথায়? এমন প্রশ্ন করা হলে গণেশ হাসতে থাকেন। জমি আবার কোথায় যাবে! বড়লোকেরা কিনে নেয়! গণেশ হিসাব দেন, তার এলাকার অজিনি বাবু, ভবেশ বাবু, পরেশ বাবু, কুলো বাবু, দীনেশ বাবুর মতো লোকেরা প্রত্যেকে কম করে হলেও ৫০ বিঘা জমির মালিক। দীনেশ বাবুর তো ১০০ বিঘার কাছাকাছি হবে। গণেশ আরো জানান যে, এ এলাকাটা হিন্দু অধ্যুষিত। মুসলিমরা সংখ্যায় কম।

শুধু গণেশ নন, একই এলাকার আরো অনেক কৃষকের সঙ্গে আমরা কথা বলেছি। জমির মালিকানা সম্পর্কে দেওয়া তথ্যগুলো এরকমই। আমরা দোয়ানি বাজারের দিকে যতো এগিয়ছি, বড় জমির মালিকের সংখ্যা ও তাদের মালিকানায় থাকা জমির পরিমাণ ততো বেড়েছে। বড়ভিটা ইউনিয়নের মেলাবর গ্রামে গণেশচন্দ্র সেনের আবাস থেকে একটু দূরেই ওমনাথ বসুর আবাস। অর্থনৈতিক দিক থেকে বিচার করলে গণেশ নিম্নমধ্যবিত্ত। আর ওমনাথ একেবারেই নিম্নবিত্ত কিংবা বলা চলে বিত্তহীন। তার বয়সও প্রায় পঞ্চাশের কাছাকাছি।

ওমনাথ আগে কৃষিকাজ করতেন। কিন্তু এখন পুরোদস্তুর ভ্যানচালক। তার নিজের চাষের কোনো জমি নেই। দুই ছেলে ও দুই মেয়ের জনক তিনি। এক মেয়ে বাদে বাকি সবারই বিয়ে হয়েছে। এক ছেলে দোকানে চাকরি করে। আরেক ছেলে ক্যাবল লাইনের কাজ করে। স্ত্রী, ছোট মেয়ে ও ছোট ছেলের পরিবার নিয়ে একত্রে বাস করেন। তার ভাষায়, ‘বড় সংসার ছিল, এক পোলা আলাদা হওনে একটু ছোট হইছে।’

ওমনাথ জানান, ভ্যান চালিয়ে দৈনিক ২০০ টাকার বেশি রোজগার করা যায় না। ছোট ছেলেটা কিছু আয় করে। তারও কোনো ঠিক ঠিকানা নেই। জমি তার পরিবারের কোনো আমলেই ছিল না। আগে এর ওর জমিতে মজুর দিতেন। কোনো কোনো সময় দুই এক বিঘা বর্গা নিয়ে চাষও করেছেন। কিন্তু এখন আর জমি পাওয়া যায় না। তিনি আরো জানান যে, তাদের এলাকায় প্রায় পঞ্চাশ ভাগেরও বেশি মানুষের চাষের কোনো জমি নেই।

কৃষকরা জানিয়েছেন, তিস্তা পাড়ের জমি বেশ উর্বরা। অধিকাংশই তিন ফসলী জমি। শুধু বর্ষার সময় তিস্তার পানি বাড়লে নদীর আশেপাশের জমিগুলো অকেজো হয়ে যায়। যেসব জমিতে অনেক পানি ওঠে বা যে জমি খালের মুখে, সেগুলোতে ফসল কিছুটা কম হয়। তামাক, পাট, আলু, ভুট্টা, আদা, সরিষা ও ধান হচ্ছে এ এলাকার প্রধান ফসল। এগুলোই বেশি চাষ হয়। এর বাইরে শাক, সব্জিও হয় প্রচুর। বালুজমিতে যেসব ফসল ভালো হয়, সেগুলো এ অঞ্চলে ভালো হলেও তরমুজের আবাদের প্রচলন এদিকে কম।

এ থেকে বোঝা যায় যে, সরকারের কৃষি দপ্তর এ অঞ্চলের কৃষকদের তেমন কোনো সহযোগীতা দেন না। কৃষকরাও তাই জানিয়েছেন। সবাই একই কথা বলেছেন- আমরা তো কোনো কৃষি কর্মকর্তার দেখাই পাই না। কী চাষ করলে ভালো হবে বা কিভাবে কি করা দরকার সে সম্পর্কে কৃষক রাষ্ট্রীয় কোনো সেবা পায় না! কৃষকরা মনে করেন, তাদের এলাকাটা দেশের এক মাথায় হওয়ার কারণেই বোধহয় তারা কিছু পান না। তিস্তা মরে গেলেও সরকার দেখে না। ঢাকার কাছে হলে বা বড় শহরের আশেপাশে হলে হয়তো তাদের এতো সমস্যা থাকতো না! এ যেন নদীর এপার কহে ছাড়িয়া নিঃশ্বাস, ওপারেতে স্বর্গসুখ আমার বিশ্বাস!

প্রভাষ পাল জলঢাকা পৌরসভার দক্ষিণ কাজীর হাট এলাকার বাসিন্দা। নিজের নামের বাকি অংশ ঠিক করে বলতে পারেন না। বারবার বলেও পদবি কি তা বুঝানো গেল না। কিন্তু পিতার নাম জিজ্ঞেস করতেই বললেন শুক্কুর পাল। বংশের বিষয়টা তারপরও পরিষ্কার হওয়া গেল না। কারণ সেখানেও তার আপত্তি, ‘ইডা তো নাম!’ প্রায় চল্লিশের কোঠা ছুঁতে চলা এ কৃষক প্রাতিষ্ঠানিক কোনো শিক্ষার সুযোগ পাননি।

ভিটার পাশে ৫ শতক জমির বাইরে চাষের কোনো জমি নেই প্রভাষ পালের। তবে একজনের কাছ থেকে বিঘাখানেক জমি নিয়ে তাতে কিছু চাষবাস করেন। মাঝেমাঝে ভ্যান চালান। দূর দূরান্তে যান। লম্বা ট্রিপ মারেন। সেই আয়ের সবটাই এখন পানি করে ঢেলে দিতে হচ্ছে জমিতে। কিন্তু জমি থেকে কিছু পাওয়া যাবে কিনা তা নিয়ে তিনি সন্দিহান! কারণ তিস্তায় পানি নেই। প্রভাষ জানিয়েছেন, তার এলাকায় লুৎফর সাহেবের ১০০ বিঘারও বেশি জমি আছে।

মোখলেসুর রহমানের বয়স পঞ্চান্ন। ছোটখাটো আকৃতির হলেও পাঠান বংশের মানুষ। চার ছেলে ও এক মেয়ের জনক। মেয়েটি ও দুই ছেলের বিয়ে দিয়েছেন। উত্তর সোনাকুলি গ্রামের বাসিন্দা। পুরোপুরি তিস্তার ওপর তার পরিবারের জীবন নির্ভরশীল। নদী পাড়ের চরেই তার ১০ বিঘা জমি। বালু জমি। পুরোটাতেই এবার ভুট্টা লাগিয়েছেন। শুধু গ্রীষ্ম আর শীতে তিনি চাষবাস করেন। গ্রামের অন্যান্য জমির চেয়ে তার জমি আলাদা। বর্ষায় পুরোটাই ডুবে থাকে। নদীতে যখন পানি বাড়ে তখন আর জমি কোনো কাজে লাগানো যায় না। তিনি জানান, সোনাকুলির আফতাব হাজির অন্তত ৪০০ বিঘা জমি আছে। মোশাররফ সাহেবের আছে ২০০ বিঘা। ৫০ বিঘার ওপরে জমি আছে, এমন লোকের সংখ্যা কিছুতেই সাতের কম হবে না বলে তিনি নিশ্চিত করেছেন। তার হিসেবে গ্রামের অধিকাংশ মানুষেরই চাষের জমি নেই!

বীরেন্দ্র দত্তের বয়স চল্লিশের কিছু বেশি। নিজের কোনো জমি নেই তাই মানুষের জমি চাষ করে বেঁচে থাকেন। খালিশিয়া গ্রামে তার বাড়ি। তিনি জানিয়েছেন, তার গ্রামের জগদীশ বাবুর অন্তত ২০০ বিঘা জমি আছে। সত্য মাস্টার ও দিলীপ মাস্টার, এ দুই সহোদরের আছে প্রায় ১০০ বিঘার মতো!

নিজসেখসুন্দর গ্রামের আশরাফ মন্ডলের বয়স প্রায় ৫৩। পিতা মৃত মজিদ মন্ডল। দুই মেয়ে ও চার ছেলে তার। বড় পরিবার। সামলাতে পারেন না। আগে নদীতে মাছ ধরতেন এবং জমিতে কিছু কাজ করতেন। নিজের কোনো চাষের জমি নেই। তবে নদীর অববাহিকায় বালুর চরে ৭ বিঘার মতো জমি আছে। তাতে কোনো ফসল হয় না।

জমির মালিকানা সম্পর্কে বলতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘আমার যা চাষের জমি ছিল তা সরকার ব্যারেজের জন্য নিয়ে গেছে। এখন তা খাসজমি। এ গ্রামে গরিব মানুষদের জমি খাসজমি হয়েছে। কিন্তু খাসজমি যারা দখল করে আছে, তাদের জমি কেউ নেয়নি। আমাদের শান্যাজান ইউনিয়ন এলাকার গণি হাজিদের জমি আছে ৪০০ বিঘা। সবুর হাজিদের আছে ২০০ বিঘা। গফুর মেম্বারদের আছে ২০০ বিঘা। সরকারের যা খাসজমি সব এদের কাছেই। কিন্তু এ জমি সরকার উদ্ধার করে না। আমাদের জমি নিয়েছিল জিয়ার আমলে। এরশাদের আমলে জমি দিয়ে ব্যারেজ হয়েছে, অফিস হয়েছে। আর আজ আমরা ভিক্ষুক!

জমির এ হিসাবগুলো দেখিয়ে দেয় যে, এ অঞ্চলে বড় জোতদারশ্রেণীর অস্তিত্ব এখনো বিরাজমান। কৃষকরা জানিয়েছেন, জমির মালিকরা কিছু কিছু কিনে সম্পত্তি বাড়িয়েছেন। কেউ কেউ কিছু বেঁচেও দিয়েছেন। কিন্তু মূলত বড় মাপের জমিগুলো তারা পেয়েছেন বাপ-দাদার কাছ থেকে। আর কেউ কেউ পেয়েছেন ১৯৪৭ পর্বের দেশভাগ ও ১৯৭১ পর্বের মুক্তিযুদ্ধের পর। হিন্দুদের কাছ থেকে তারা জমি কিনে নেওয়ার কথা বললেও গ্রামবাসীর ধারণা, এগুলো আসলে দখল করেই নেওয়া হয়েছে।

জোতদারদের অস্তিত্বই আবার নির্দেশ করে যে, এ অঞ্চলে অনেক মানুষেরই চাষের কোনো জমি নেই। একটা ইউনিয়নের আয়তন সাধারণত কত? যদি তিনটি পরিবার ৮০০ বিঘা জমির মালিক হয় তাহলে অধিকাংশ কৃষকের ভূমিহীন হওয়াটাই স্বাভাবিক। প্রশ্নটা হচ্ছে, কিভাবে জীবন কাটে এ দিনহীন সাধারণ মানুষগুলোর!

কৃষকের জীবন
এ অঞ্চলের কৃষকরা আমাদের নতুন একটি তথ্য দিয়েছেন। আগে আমাদের ধারণা ছিল, সব জায়গাতেই ধনী কৃষক ও বড় জমির মালিকেরা তাদের জমি বর্গা দেয়। বর্গা চাষীদের তারা নানাভাবে জম্মি করে রাখে। কিন্তু এ এলাকার কৃষকরা জানালেন যে, এখানে জমি বর্গা পাওয়া যায় না বললেই চলে। জমির মালিকরা যেভাবে বর্গা দিতে চায় সেভাবে বর্গা নিয়ে ক্ষতি ছাড়া কোনো লাভ নেই। আর তারা বর্গা তেমন দেয়ও না। সাধারণত বড় জমির মালিকেরা দু’চারজন বিশ্বস্ত লোক রাখে। পাওয়ারটিলার থাকে নিজেদেরই। জমি চষা হলে মাঝে মাঝে ঠিকা মজুর দিয়ে কাজ করালেই হয়ে যায়। যাদের অনেক জমি, তাদের কারো কারো নিজেদেরই চাতাল আছে। ধান প্রক্রিয়াজাতের ব্যবস্থা আছে। গরিব কৃষকদের এখানে রোজকার মজুর দেওয়া ছাড়া আর তেমন কোনো আয়ের ব্যবস্থা নেই।

ভ্যানচালক ওমনাথ বসুর কথা আগেই এসেছে। তিনি জানান যে, এই অঞ্চলে জমিতে মজুর দিলে দিনে ২০০ টাকা পাওয়া যায়। একবেলা খাওয়ায়। আবার আয়ও পাক্কা। কিন্তু ভ্যানে তো একেক দিন একেক রকম। এখন নদীতে পানি নাই। সবার খরচাখরচ বেড়ে গেছে। জমিতে কেউ লোক লাগাতে চায় না। আবার কারো কাছে এখন ধার কর্জও পাওয়া যায় না। নদীর পানি না থাকায় মানুষ সব আগের থেকে অনেক বেশি গরিব হয়ে গেছে। আগে যারা ভালো ছিল, তারা এখন দুশ্চিন্তায় আছে। আর আগে যারা খারাপ ছিল তারা তো নাই হয়ে যাওয়ার অপেক্ষায়।

বীরেন্দ্র দত্তের আরো কিছু কথা আছে। নিজের কোনো জমি নেই তাই মানুষের জমি চাষ করে বেঁচে থাকেন। খালিশিয়া গ্রামে তার বাড়ি। চারটি মেয়ে ও একটি ছেলে আছে তার। এখনো দুই মেয়ে অবিবাহিত। তাদের কিভাবে ভালো ঘরে বিয়ে দেওয়া যায় সেই চিন্তায় এ কৃষকের ঘুম হারাম। মাঝে মাঝেই বড় শহরে কাজের খোঁজে যান। মাস দুয়েক থাকলে হাজার পাঁচেক টাকা নিয়ে বাড়ি ফেরা যায়। কিন্তু শরীরে সয় না।

তিনি বলেন, ভালো না খেতে পারলে কি বেশি কাজ করা যায়? ভালো খাব কোত্থেকে? মাংসের কেজি ৪০০ টাকা। ও আমাদের কপালে নাই। মেয়েদের কত কী লাগে। কিছু দেওয়া যায় না। পড়ালেখা বন্ধ করে দিয়েছে ফাইভ পাশ করার পরই। বাড়িতে শালা-শমন্দিরা কেউ আসলে মাংস রান্না হয়। এর বাইরে পালা পার্বণ ছাড়া ভালো খাবার কারো কপালে জোটে না। চাল না থাকলে খুদ খাই। মিছে কথা বলে কী লাভ? সত্যিটাই বলছি। আমরা এ দেশের সবচেয়ে গরিব মানুষ। এখানে অনেক মানুষ আছে, যাদের ভিটার জমিও নাই। বড় রাস্তা, নইলে বেড়িবাঁধের পাশে ঘর করে থাকে। শীতে বাড়ির বুড়োরা মারা পড়ে।

গণেশচন্দ্রের বিবরণ একবার দেয়া হয়েছে। তিনি এখন কৃষির পাশাপাশি বাজারের একটি দোকানে বসেন। এখান থেকে কিছু রোজগার হয়। তিনি জানান, এ তল্লাটের প্রায় সব কৃষকই চাষবাসের পাশাপাশি অন্য কোনো না কোনো কাজ করেন। অধিকাংশই মজুর বেচতে আশেপাশের শহরগুলোতে চলে যায়। আগে অনেকে নদীতে মাছ ধরতো। এখন সেই সুযোগও নেই। গ্রাম সংলগ্ন বাজারগুলোতে বয়ষ্করা কোনো না কোনো কাজ খুঁজে নিচ্ছেন। যারা একেবারেই কিছু পারছেন না, তারা বাড়িতে বিক্রিযোগ্য কিছু থাকলে তা নিয়ে বাজারে এসে বসে থাকছেন ঘণ্টার পর ঘণ্টা।

আবুল হোসেনের বয়স প্রায় ৫৩। পিতা মৃত গেদু মোহাম্মদ। গ্রামের নাম ঝুনাগাছ। তার নিজের কোনো চাষের জমি নাই। অন্যের জমিতে মজুর দিয়ে জীবিকা নির্বাহ করেন তিনি। গরু বেচাকেনার হাটে জোগালির কাজ করেন। তা থেকে কিছু আসে। হাটের গরুর খাবার থেকে কিছু এনে নিজের একটা গরু আছে, তাকে পেলে-পুষে রাখছেন। নিজের গরুটির দুধ কখনো খাওয়া হয় না। বিক্রি করে কিছু আয় হয়। বুড়ো বুড়ির সংসার চালাতে তা কিছু সাহায্য করে। দুই ছেলেকেই বিয়ে দিয়েছেন। তারাও কৃষক। মজুর দেয়, কারো কোনো জমি নেই।

মাজেম আলীর বয়স ৩৫। গ্রাম নিজসেখসুন্দর। ছেলে মেয়ে তিনজন। দুই ছেলে ও এক মেয়ে। বড় ছেলেটা কৃষিজমিতে মজুর দেয়। বয়স ১২/১৩ হবে। এ বয়সে কত টাকা মজুরি পায় জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, ১৫০ টাকা পায়। কি করব? সবাই মিলে রোজগার না করলে তো টিকতে পারব না।

নূর ইসলামের গ্রামের নাম উত্তর ঝুনাগাছ। বয়স পঁয়তাল্লিশের মতো। তিন ছেলে ও দুই মেয়ের মধ্যে এক মেয়ে ও এক ছেলের বিয়ে দিয়েছেন। ছেলেরা কৃষিকাজের সঙ্গে যুক্ত। নিজের এক বিঘার চেয়ে কিছু কম জমি আছে। এবার তাতে ভুট্টার চাষ করেছেন। নূর ইসলামের মতে, ‘কৃষিকাজের চেয়ে এখন বিদেশ (নিজ অঞ্চলের বাইরে) গিয়ে মজুর দেওয়া ভালো। মজুর দিলে কিছু থোক টাকা পাওয়া যায়। কিন্তু কৃষিকাজ করে তেমন কিছু পাওয়া যায় না।

শামসুল ইসলামের বয়স পঞ্চাশ। গ্রাম দোয়ানি। ছেলে মেয়ে পাঁচজন। চাষের দুই বিঘা জমি আছে। এক বিঘায় ভুট্টা চাষ করেছেন। অন্য বিঘায় ধান। তিনি বলেন, ‘আবাদ করা যাচ্ছে না। পানি ছাড়া কোনো আবাদ হয় নাকি? টিউবয়েলেও তো পানি নাই। এভাবে বাঁচাই তো মুশকিল। আর চাষবাস! এবার আমাদের এলাকায় ধান কম হবে। চালের দাম বাড়তিতে যাবে। আমরা কৃষকরা আছি এই এক জ্বালায় গো ভাই, চাষ করলে দাম পাওয়া যায় না। আবার চাষ করারও বিরাট ঝক্কি। আর কোনো কাজ জানি না বলে আমাদের খুব কষ্ট হয়। এখন তো ছেলে মেয়েরা ঢাকায় গিয়ে গার্মেন্টে কাজ ধরছে। এখন আর ধান চাষ করারও জো নেই। পানি নেই। কিভাবে কি হবে কে জানে।

এতই যদি সমস্যা হয় তাহলে কৃষকরা চাষ করে কেন? এমন প্রশ্নের জবাবে এ কৃষক বলেন, চাষ করলে ভাঙা ভাঙা টাকা খরচ হয়। ফসল উঠলে একসাথে টাকাগুলা পাওয়া যায়। কোনো একটা কাজে লাগে। নইলে লাভ তেমন নেই। সবকিছুই তো কিনে খাওয়া লাগে। কঠিন অবস্থা! কোন জিনিসটার দাম কম বলেন!

আমির হোসেন নিজসেখসুন্দর গ্রামের বাসিন্দা। পিতা মৃত মজিবর সর্দার। তিন ছেলে ও তিন মেয়ে। মেয়েদের সবার এবং এক ছেলের বিয়ে দিয়েছেন। বয়স প্রায় ৬০। আর সব কৃষকের মতোই নিজের জীবন নিয়ে তিনিও হতাশ। দু’বিঘা জমি আছে। তাতে এবার ভুট্টা লাগিয়েছেন। কিন্তু চাষের খরচ যোগাতে পারছেন না। তিনি বলেন, কি করব বলেন, এতগুলো মানুষ। আমরা তো আর জমাতেও পারি না। যে সময় দাম কম থাকে তখন কিছু কিনে জমানো গেলে ভালো হয়। কিন্তু সেই টাকা তো আমাদের নেই। সব কিছুই কিনে খাওয়া লাগে। আর সবকিছুর যেই দাম! যা ফসল করি, তা বিক্রি করে তেল নুন কিনি। পরে ক’দিন না যেতে ঘরে আর চাল থাকে না। তখন ৩৫ টাকা কেজিতে চাল কিনে খেতে হয়। গ্রামের মানুষ তো ভাত বেশি খায় জানেনই। কুলিয়ে ওঠা যায় না।

আবদুস সালামের গ্রামের নাম নিজসেখসুন্দর। নিজের চাষের কোনো জমি নেই। পাঁচ ছেলে ও দুই মেয়ের জনক। বয়স ৫৫। ছেলেরা সব কৃষি কাজ করে। কারোরই চাষের কোনো জমি নেই। এমনকি ভিটারও কোনো জমি নেই। সালাম জানান, এ গ্রামে এরকম অনেককে পাবেন, যাদের ভিটার জমিও নেই। আগে থেকেই ছিল না এমন না। কারো ব্যারেজের সময় গেছে। কারোটা বেচে দিয়েছে। আমাদেরও কোনো জমি নেই। ছেলেরা সব কিষান দেয়। আমি বাজারের দোকানে চাল বেচি। পুঁজি বলতে কিছু নেই। আত্মীয় স্বজনের কাছ থেকে ধার কর্জ করে চলি। ফসল উঠলে তার শোধ দেই। মরার আগ পর্যন্ত এমনই চলবে, মুক্তি নাই কোনো। এ অপেক্ষাতেই আছি।

জয়নাল আবেদিনের বয়স প্রায় পঞ্চান্নের কাছাকাছি। দোয়ানি বাজারে যখন তার সঙ্গে কথা হয় তখন তিনি বাজারে লাউ বিক্রি করছিলেন। জানালেন, গ্রামের নাম নিজসেখসুন্দর। বিঘাতিনেক জমি আছে তার। তাতে কীবা হয়! তিন ছেলে ও তিন মেয়ে। এক ছেলে ড্রাইভার। বাকিরা গ্রামেই কাজ করে খায়। মজুর দেয়। নিজের বাড়ির ধারের লাউ গাছের কিছু লাউ নিয়ে এসেছি বিক্রি করার জন্য। ৫ টাকা করে একেকটা। এ করে আর কী হয়। কোনো রকমে টেনে টুনে চলছি। অবস্থা যা, তাতে মনে হয় গ্রামে আর চাষের জন্য কোনো লোকই থাকবে না। বাধ্য হয়ে সবই গার্মেন্টে চলে যাবে।

দুলাল মিঞা মোটামুটি স্বচ্ছল। সন্তান বলতে দুই ছেলে, দুই মেয়ে। মেয়েদের বিয়ে দিয়েছেন। বয়স প্রায় চল্লিশের কাছাকাছি। নিজের ৭ বিঘা জমি আছে। পুরোটাতেই এবার ভুট্টার চাষ করেছেন। গ্রাম নিজসেখসুন্দর। তিনি জানান, তিস্তায় পানি না থাকায় তারা খুব সঙ্কটে পড়েছেন। যাদের কিছু জমা নেই, তারা ঋণ করছে। যাদের জমা আছে, তারা সেগুলো ভেঙে খাচ্ছে। এ অবস্থায় টিকে থাকা মুশকিল।

আমরা এখানে যে নতুন বিষয়টি দেখতে পেয়েছি তা হচ্ছে, একেবারেই ভূমিহীন বা উদ্বাস্তুদের বিরাট সংখ্যা। সাধারণত আমরা মনে করি, শহরেই কেবল কোনো স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তি নেই এমন মানুষ থাকে। গ্রামে যারা থাকে, তাদের একটা ছোট ভিটা হলেও আছে। কিন্তু তিস্তা পাড়ের অর্থনীতির হিসাব নিতে গিয়ে আমরা দেখলাম, এখানে অনেক উদ্বাস্তু মানুষ। বেড়িবাঁধ বা এখানে সেখানে রাস্তার ধারে তাদের আবাস। সরকারি প্রকল্পই তাদের সর্বস্বান্ত করেছে। সরকারি প্রকল্পে জমি নেওয়ার পর যে টাকা তার পান, তা দিয়ে বিশেষ কিছু করার থাকে না। ঋণদাতারা তখন চেপে ধরেন, আত্মীয়দের দাবি-দাওয়া থাকে, সব মিলিয়ে দরিদ্র্য পরিবারগুলো ওই টাকা আর ভালো কোনো কাজে লাগাতে পারে না। কিছুদিনের ভেতর ওই টাকা শেষ হয়ে যায়। আর তারা নাম লেখান সর্বস্বান্তের দলে! বাংলাদেশের গ্রামে গ্রামে সরকারি প্রকল্পের দরুন এ ধরনের দরিদ্র মানুষের সংখ্যা ক্রমাগত বাড়ছে।

শিল্প, বিদ্যুৎ, শিক্ষা, নারী
এ অঞ্চলে শিল্প বলতে কিছু চাতাল আর মসলা ভাঙানোর কারখানা। চাতালগুলো অটো রাইসমিল হয়ে উঠতে পারেনি বিদ্যুৎ সমস্যার কারণে। বিদ্যুৎ ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে শুধু বড় বড় বাজার এলাকাগুলোতেই। পল্লী বিদ্যুতের কোনো কার্যক্রমই নেই অধিকাংশ স্থানে। মন্ত্রী, এমপিদের বাড়ির আশেপাশে কিছু মেলে। যেমন, সাবেক গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী গায়ের জোরে বাঁশের খুঁটি লাগিয়ে দুই তারের মাধ্যমে পিডিবির বিদ্যুৎ এনেছেন। যা বেশ কিছুদূর পর্যন্ত গেলেও দোয়ানি বাজার এলাকার ৪৫ বছর বয়ষ্ক কৃষক আজহারুল, পিতা আবেদ আলী, জানান যে, এ বিদ্যুৎ যারা পেয়েছে, তারা কোনো বিল দিচ্ছে না আট মাস ধরে। যে কোনো সময় লাইন কেটে দিতে পারে। এ যেন মগের মুল্লুক! যা বিদ্যুৎ কিছু এলাকায় আছে, তাও থাকে না বললেই চলে। দুই ঘণ্টা পর আধ ঘণ্টার জন্য আসে, জানান আজহারুল।

শিক্ষার হার এ অঞ্চলে খুবই কম। স্বচ্ছল পরিবারগুলো থেকে যারা পড়ালেখার সুযোগ পান, তাদের মধ্যে উচ্চশিক্ষা গ্রহণের হার আবার ভালো। যারা পড়ার সুযোগ পাচ্ছেন, তারা কমবেশি উচ্চশিক্ষার দিকে অগ্রসর হচ্ছেন। কিন্তু গরিব কৃষকের সন্তানদের পড়ালেখা বলতে তেমন কিছুই নেই। ইদানীং ছেলেমেয়েরা স্কুলে যাচ্ছে বটে, তবে তাও পঞ্চম শ্রেণীর গণ্ডিতেই আবদ্ধ। শিক্ষার হার ও দারিদ্র্যের এ দশার ফলে, বাল্যবিবাহ এ অঞ্চলে প্রকট। নারীর ক্ষমতায়ন শব্দবন্ধটি এ অঞ্চলের নারীরা শুনলে আঁচলে মুখ ঢাকেন। তবে নারীরা কৃষিকাজসহ নানা ধরনের শ্রমে পুরুষের সঙ্গে সমানতালে খাটেন। এ অঞ্চল এখন ভুট্টা চাষের স্বর্গ। সারা দেশের মোট চাহিদার প্রায় ৪০ ভাগের জোগানই আসে এখান থেকে। আর ভুট্টা তোলার ক্ষেত্রে বাড়ির কাজ খুব গুরুত্বপূর্ণ। ক্ষেত থেকে শুরু করে ভুট্টা তোলা ও পরে রোদে শুকিয়ে বিক্রয়যোগ্য করার ক্ষেত্রে নারীর শ্রমই তুলনামূলক বেশি। কিন্তু ঘরে ঘরে এখানে দেখা যাবে, নারী মানে অল্পবয়ষ্ক কিশোরী। তার কোলে একটি শিশু, আরো একজন দাঁড়িয়ে আছে তার গা ঘেষে। সরকারের নানা প্রকল্প সারা দেশে কী করে না করে, তা এ এলাকার মানুষ জানেন না। আমরাও এখানে গিয়ে কিছু দেখতে পাইনি।

এ এলাকায় প্রচুর এনজিও আছে। কৃষকরা জানান যে, সব এলাকাতেই কম করে হলেও ২৫ থেকে ৩০টির মতো এনজিও আছে। এগুলো প্রায় সবই ক্ষুদ্রঋণ বিতরণ করে। ব্র্যাক, গ্রামীণ ব্যাংক, আশা, আরভিএস, এনডিবি এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য। যে বিরাট পরিমাণ টাকা নিয়ে তারা ঘুরছে, তা যদি পরিকল্পনামাফিক কাজে লাগানো যেতো, তাহলে এ অঞ্চলের সব দরিদ্র্য মানুষের মুখে হাসি ফোটানো সম্ভব ছিল। কিন্তু তাহলে যে লাভের গোলা খালি পড়ে থাকবে। শহরের মানুষগুলো গ্রামে তাদের প্রতিষ্ঠানের শাখা তৈরি করে সেখান থেকে কিছু নিয়ে আসার জন্যই। গ্রামের দরিদ্র্য মানুষগুলোর এমনিতেই পুঁজির বড্ড অভাব। তাদের কাছ থেকেই পুঁজি শোষণ করে মুনাফা করে এনজিওরা! দরিদ্র্য জনগণের টাকা জমা হয় শহরের ব্যাংকে, আর গ্রামে চলে হাহাকার! এ অঞ্চলের মানুষের সুপেয় পানির বিরাট সমস্যা রয়েছে। কোনো পুকুরেই গ্রীষ্মকালে পানি থাকে না। চাপকলের পানি নিচে নেমে যায়। খুব গভীর কল না হলে পানি মেলে না। এতো এনজিওর কোনোটি আজ পর্যন্ত এ সংক্রান্ত সমস্যা সমাধানে উদ্যোগ নেয়নি। এমনকি সরকার বাহাদুরেরও এ নিয়ে কোনো মাথাব্যথা নেই।

তিস্তার প্রভাব
তিস্তায় পানি নেই, বাইরের মানুষ শুধু এই একটা দিকই দেখে। এটা কৃষকদের অভিযোগ। তারা যে কেবল পানি চাইছেন, তা নয়। তারা পানির এবং নদীর বিরোধিতাও করছেন। আমরা কথা বলে বুঝেছি, এ নদী নিয়ে অধিকাংশ কৃষকই আসলে দ্বিধাগ্রস্ত। কারণ, নদীতে যখন পানি ছিল না তখন তাদের কষ্ট হয়েছে বটে, কিন্তু বর্ষা এলে এ পানিই হবে তাদের দুর্ভাগ্যের কারণ! এটাই তাদের কপালে ভাঁজ ফেলেছে বেশি।

সরকারি দপ্তরে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, তিস্তা নদীটি ব্যারেজ করার পর থেকে আর কখনোই খনন করা হয়নি। ফলে নদী শুকানোর পর দেখা যায়, সমতল এক খোলা মাঠ। নদীর গভীরতা বলে কিছু নেই। ভারত যখন বর্ষার সময় পানি ছাড়ে, তখন নদী পানি ধরে রাখতে পারে না। তার গভীরতা নেই। নদীর পানি তখন কৃষকের জমি ভাসিয়ে দেয়। এ নিয়ে সরকারের কোনো কাজ নেই, কোনো চিন্তাও নেই। কৃষকরা তাই নদীর পক্ষে দাঁড়াবেন কিনা তা নিয়ে দ্বিধাগ্রস্ত!

তিস্তা পাড়ের অর্থনীতি নিয়ে এই আমাদের জানাশোনা। এ সবকিছুকে একটা প্রতিপাদ্যে তুলে ধরা যায়- শহুরে সরকারের উন্নতির গল্প আসলে বাস্তবের সঙ্গে সম্পর্কহীন। যে কেউ ঘুরে আসতে পারেন, আসমানী, জমিরন, রহিম আলী, কাদের আলীদের সর্বজনীন গ্রামগুলো থেকে। একটাই দৃশ্য সবখানে, গরিব আরো গরিব হচ্ছে! কার্ল মার্কসের একটা বাণী আমরা স্মরণ করতে পারলেই এ বিষয়টা সহজে অনুধাবন করতে পারব। মার্কস বলেছেন, “পুঁজিবাদী ধনতান্ত্রিক যুগে ও সমাজে দেশের উন্নতি বলতেই বোঝায় ধনীক মালিক শ্রেণীর উন্নতি।”

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

১৪ thoughts on “তিস্তা পাড়ের অর্থনীতি

  1. শুভঙ্করের ফাঁকিটা
    শুভঙ্করের ফাঁকিটা দেখেন………………………
    অমুক ক্ষেত্রে সূচক এত বেড়েছে, তমুক সূচক যা আশা করা হয়েছিল তার চেয়ে কয়েকগুণ বেড়েছে।
    সূচক দিয়ে জনগণের প্রকৃত ধারনা করা মুর্খামি এবং তা সরকার গুলির একটা ফাঁকিবাজি ও মিথ্যাচার ছাড়া কিছু না। কারণ আসে পাশে দেখছি সাধারণ মানুষ দু মঠু খাদ্যের জন্য সংগ্রাম করছে।
    সাধারণ মানুষের কোন পরিবর্তন না আসলে , তাদের জীবন মানের উন্নয়ন না হলে খালি সূচক বাড়িয়ে মিথ্যাচার কেন??????????????????

    1. রাষ্ট্র এখানে কেবল ধনীদের
      রাষ্ট্র এখানে কেবল ধনীদের স্বার্থই রক্ষা করে। বিপরীতে গরিবকে মিথ্যা বলে। এই রাষ্ট্রটা কি আমাদের আদৌ কোনো দরকার আছে? আমাদের একটা নতুন রাষ্ট্র দরকার।

      1. পুঁজিবাদী রাষ্ট্র ব্যবস্থা
        পুঁজিবাদী রাষ্ট্র ব্যবস্থা টিকে থাকতে হলে ধনিকশ্রণীর স্বার্থ দেখতেই হবে। কৃষক, শ্রমিক, মধ্যবিত্ত, নিম্নমধ্যবিত্তদের চিন্তা না করলে রাষ্ট্রের কিছু যায় আসে না। কিন্তু অর্থনীতি বলে অন্য কথা। রাষ্ট্র জনগনের না হলে সরকার এসব সুত্রকে থোরাই কেয়ার করে। বিদেশি প্রভুদের পদলেহন করে কয়দিন টিকা যায়?

        নদীমাতৃক দেশে নদীর এই বেহাল দশা নিয়ে রাষ্ট্র কোন কালেই মাথা ঘামায়নি। জনগনকে এগিয়ে এসে রাষ্ট্রকে নদী সংকট নিয়ে ভাবতে বাধ্য করা উচিত।

        1. রাষ্ট্র কখনোই পুরো জনগণের হয়
          রাষ্ট্র কখনোই পুরো জনগণের হয় না। এটা সব সময়ই শাসকশ্রেণীর সেবা করে। রাষ্ট্র হচ্ছে দমনের হাতিয়ার। যে শ্রেণী ক্ষমতায় থাকে সে তার পরিকল্পনা ও নীতির বাইরে যারা যায় রাষ্ট্র দিয়ে তাদের দমন করে। সুতরাং রাষ্ট্রক্ষমতা বিপুল জনগণের, মেহনতিশ্রেণীর হাতে না আসলে এটা তার বিরুদ্ধেই ব্যবহৃত হবে!

  2. অনেক সুন্দর ও তথ্যবহুল
    অনেক সুন্দর ও তথ্যবহুল লেখা।তীস্তাপারের এই অর্থনীতির চিত্র যেন পুরো বাংলার গ্রামীন অর্থনীতিরই চিত্র।এ লেখায় এ থেকে উত্তরনের সুপারিশ থাকলে লেখাটা আরও অর্থবহ হয়ে উঠত।ধন্যবাদ লেখক।

    1. আপনাকে ধন্যবাদ। আসলে এটা একটা
      আপনাকে ধন্যবাদ। আসলে এটা একটা কর্মসূচীর অংশ। এ কারণে এখানে সব কর্মসূচীকে এক করা হয়নি। তবে উত্তরণের পথ সম্পর্কে আমরা আলাদাভাবে লিখছি, বলছি, কাজও করছি। আপনাকে ধন্যবাদ দায়টা মনে করিয়ে দেয়ার জন্য।

  3. প্রতিদিন প্রমাণ হচ্ছে
    প্রতিদিন প্রমাণ হচ্ছে মার্কসের কথাটা-

    পুঁজিবাদী ধনতান্ত্রিক যুগে ও সমাজে দেশের উন্নতি বলতেই বোঝায় ধনীক মালিক শ্রেণীর উন্নতি।

    1. ইংরেজ আমলে ভয় ছিল ইংরেজ শাসন,
      ইংরেজ আমলে ভয় ছিল ইংরেজ শাসন, পাকী আমলে ভয় ছিল পাকী বাহিনী। তখন শাসন নির্যাতন হয়েছে তা মানা যায়। আজ স্বাধীনতার ৪৩ বছর পরে কেন এমন শাসন ও শোষণ চলছে?

      এখন আমাদের কেন আগের চেয়ে মণে ভয়?
      কেন এখন অনেকের মণে আফছোশ, কেন এখন শুনতে হয় পাকী আমলই ভাল ছিল?
      স্বাধীন দেশে বসবাস করেও কেন এমন শাসন ও শোষণের স্বীকার একটা শ্রেণী?
      আর কেনই বা এক জন(১০% লোক) আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ হচ্ছে। আর বাকী সব দিন দিন গরিব হচ্ছে।
      অথচ হওয়ার কথা ছিল সমান বণ্ঠণ।

  4. চমৎকার তথ্যমূলক লেখাটার জন্য
    চমৎকার তথ্যমূলক লেখাটার জন্য আনিস ভাইকে ধন্যবাদ। অর্থনীতির সূচক টূচক বুঝিনা, প্রায় তিন বছর গ্রামের কাছকাছি থেকে এসে যা বুঝেছি কৃষিতে যা উন্নয়ন হয়েছে তা মূলত মধ্যসত্ত্ব ভোগীদের উদর পূর্তিতেই কাজে লাগে। কৃষক কিছুই পায়না। কোন রকমে দুইবেলা খাওয়াটা জোটে। এক মন ধান বিক্রি করে এক কেজি মাছ বা এক কেজি মাংস কেনার সামর্থও হয় না।
    আপনাদের কাজটা খুব ভালো লাগলো। আশা করি এর থেকে উত্তরণের পন্থা নিয়েও কাজ করবেন।

    1. রায় তিন বছর গ্রামের কাছকাছি

      রায় তিন বছর গ্রামের কাছকাছি থেকে এসে যা বুঝেছি কৃষিতে যা উন্নয়ন হয়েছে তা মূলত মধ্যসত্ত্ব ভোগীদের উদর পূর্তিতেই কাজে লাগে।

      অরথনীতিকে এমন করা দরকার যাতে করে মধ্যস্বতভোগীদের ভূমিকা অনেক কমে যায়, কৃষকের সরাসরি ভূমিকা বেড়ে যায়।

  5. চমৎকার পোস্ট। তিস্তা নিয়ে
    :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ:
    চমৎকার পোস্ট। তিস্তা নিয়ে অনেক কিছু জানলাম। স্বাধীণতার পর থেকে আমাদের দেশে যতগুলো সরকার ক্ষমতায় এসেছে, কেউই আমাদের নদীগুলো নিয়ে বিন্দু পরিমাণও ভাবেনি। কৃষির উন্নয়নে নদীর প্রয়োজনীয়তা বলে শেষ করা যাবেনা। আমাদের নদীগুলোকে শাসকগোষ্টি গলা চেপে মেরে ফেলেছে। তিস্তাও শাসকগোষ্টির অবহেলার শিকার।

  6. “পুঁজিবাদী ধনতান্ত্রিক যুগে ও

    “পুঁজিবাদী ধনতান্ত্রিক যুগে ও সমাজে দেশের উন্নতি বলতেই বোঝায় ধনীক মালিক শ্রেণীর উন্নতি।”

    একটা চরম সত্য।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

88 − = 78