‘এদেশের কমিউনিস্ট আন্দোলনে সুবিধাবাদ একটা বড় সমস্যা’ – আনু মুহাম্মদ [এক্সক্লুসিভ সাক্ষাৎকার]

আনু মুহাম্মদ। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি বিভাগের ছাত্রদের প্রিয় অধ্যাপক তিনি। তার শিক্ষা অন্যদের মতো শুধু নিজ অর্থনীতি বিভাগের চৌকাঠের মধ্যে আবদ্ধ থাকেনি। তার ব্যতিক্রমী তথ্য উপস্থাপনা, ধীর স্থিরভাবে সামগ্রীক আলোচনাকে এক বিন্দুতে টেনে আনা, হাসিমুখে তিক্ত বিতর্ককে সুষ্ঠু সমাধানের দিকে এগিয়ে নেয়ার প্রবণতা তাকে সর্বমহলে জনপ্রিয়তা এনে দিয়েছে। অর্থনীতির খটোমটো অনেক বিষয়কে তিনি সাবলীল ভঙ্গিতে বর্ণনা করেছেন অনেক গ্রন্থে। কঠিন তাত্ত্বিক বিষয়কে জনপ্রিয় করে তোলার ক্ষেত্রে তার বিশেষ অবদান রয়েছে। ইতোমধ্যে বিভিন্ন প্রকাশনা থেকে তার প্রায় ৩৩টি বই প্রকাশিত হয়েছে।

গণমানুষের অর্থনীতিবিদ হিসেবে, জাতীয় স্বার্থ রক্ষা আন্দোলনের নেতা হিসেবে, ইতোমধ্যে দেশবাসীর ভালোবাসা অর্জন করেছেন। তেল গ্যাস খনিজ সম্পদ বিদ্যুৎ বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির সদস্য সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন অনেকদিন। সবকিছু মিলিয়ে তার গণমুখীতাই বিশেষ আলোচ্য বিষয়। তিনি জনগণের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়াদিতে কঠোর অবস্থান ব্যক্ত করেন। এসবের কারণে রাষ্ট্রীয় বাহিনী কর্তৃক নির্যাতন নিপীড়নের শিকারও হয়েছেন।

জনমানসে তার বামপন্থীসুলভ একটা পরিচয় আছে। ইতোপূর্বে একটি কমিউনিস্ট রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তিনি। কিন্তু এখন কমিউনিজম সম্পর্কে তিনি কী ভাবেন? কেন তিনি কমিউনিস্ট আন্দোলন থেকে সরে এলেন? বিপ্লব-সমাজ পরিবর্তন সম্পর্কে এখনও স্বপ্ন দেখেন কি? এসব বিষয়ে তরুণদের জানার আকাঙ্খাটা ব্যাপক। এই সাক্ষাৎকারে আমরা সেই প্রশ্নগুলোই তুলেছি। গুরুত্বপূর্ণ অনেকগুলো বিষয়ের ওপর জোরারোপ করে সুচিন্তিত মতামত দিয়েছেন সেসব বিষয়ে।

 

আনিস রায়হান : আমরা জানি, আপনি এক সময় লেখক শিবির, সংস্কৃতি পত্রিকা ও কমরেড বদরুদ্দীন উমরের নেতৃত্বাধীন পার্টি ও সংগঠনাদির সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন। সেখান থেকে সরে আসার কারণ কী?
আনু মুহাম্মদ : এই বিষয়ে বিস্তারিত কথা বলার নানা সমস্যা আছে। আগে অনেকেই আমাকে বলেছেন এ বিষয়ে লেখার জন্য। কেউ কেউ হয়তো চেয়েছেন, আমি যেন উমর ভাই বা তাঁদের সংগঠনের নিন্দা করি। কিন্তু আমি এসবের মধ্যে যেতে আগ্রহী নই। এখানকার বামমহলে এরকম চর্চা আছে যে, মতপার্থক্য হলে বা সংগঠন থেকে বের হয়ে গেলে পরস্পরের প্রতি কুৎসা, নিন্দা শুরু হয়। এগুলো আরও জটিলতা তৈরি করে। রাজনৈতিক বিতর্ক পথ হারিয়ে ফেলে। জনগণের সাথে বিচ্ছিন্নতা বাড়ায়, কর্মীদের মধ্যেও বিরক্তি হতাশা সৃষ্টি করে। উমর ভাই আমার কাছে আজো আগের মতোই শ্রদ্ধাভাজন। তাঁর কিছু সিদ্ধান্ত ও কর্মপদ্ধতির সঙ্গে আমার দ্বিমত হয়েছে। কিন্তু তাঁর অঙ্গীকার, দৃঢ়তা ও সততার জন্য তার প্রতি শ্রদ্ধার কোনো ঘাটতি হওয়ার মতো কারণ ঘটেনি। মতবিরোধ হলেও এই ধারার অন্য নেতৃবৃন্দকেও আমি সম্মান করি। তোমাদের এবং তোমাদের মতো আরও অনেকের আগ্রহ বিবেচনা করে আমি এখানে মোটা দাগে মূল বিষয়টা তুলে ধরছি।

বদরুদ্দীন উমর সম্পাদিত সংস্কৃতি পত্রিকা প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯৭৪ সালে। প্রকাশের কিছুদিনের মধ্যেই এ পত্রিকার সঙ্গে আমার পরিচয় হয়। সেই পত্রিকার নিয়মিত প্রধান লেখক ছিলেন বদরুদ্দীন উমর ও সইফ-উদ-দাহার। অনেক গুরুত্বপূর্ণ লেখা সে সময় তাতে প্রকাশিত হচ্ছিল। কয়েক সংখ্যা প্রকাশের পরই জরুরি অবস্থা ও সব পত্রপত্রিকা নিষিদ্ধ করার সরকারি সিদ্ধান্তের কারণে সংস্কৃতি বন্ধ হয়ে যায় ১৯৭৪ সালের ডিসেম্বরে।

উমর ভাইয়ের সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় হয় ১৯৭৮ সালে, তখন তিনি বিপ্লবী রাজনীতিতে নতুন ধারা তৈরিতে সর্বশক্তি নিয়োগ করেছেন। ততদিনে আমি লেখক শিবিরে যোগদান করেছি। শাহরিয়ার কবির ছিলেন আমাদের যোগাযোগ সূত্র। এরপর দ্রুত আমি সাংগঠনিক মতাদর্শিকভাবে যুক্ত হই। লেখক শিবির, কৃষক ফেডারেশন, ট্রেড ইউনিয়ন ফেডারেশন, গণতান্ত্রিক বিপ্লবী জোটসহ বিভিন্ন ব্যানারে সক্রিয় হই। ১৯৮১ সালে সংস্কৃতি আবারও প্রকাশ শুরু হয়। এবার বদরুদ্দীন উমর সম্পাদক এবং আমি নির্বাহী সম্পাদকের দায়িত্ব গ্রহণ করি। সংস্কৃতির এ দায়িত্ব ১৯৯৯ সাল পর্যন্ত আমার ওপর ন্যস্ত ছিল।

যাই হোক, ৯০ দশকে গণতান্ত্রিক বিপ্লবী জোটের নেতৃত্বে ভালো কাজ হচ্ছিলো। তৎকালীন বামফ্রন্টের বাইরে এই জোট তখন দ্রুত বিকশিত হচ্ছিল। বিপ্লবী চিন্তা ও আন্দোলনের প্লাটফর্ম হিসেবে গণতান্ত্রিক বিপ্লবী জোটের মধ্যকার সংগঠনগুলোর গ্রহণযোগ্যতাও বাড়ছিলো। নিপীড়ন ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে অনেকগুলো যৌথ মঞ্চ সেসময় আমাদের কার্যালয়েই তৈরি হয়, আমাদের কেন্দ্রীয় ভূমিকা ছিলো এগুলোতে।

এভাবে গণবিস্তারে আমাদের সংগঠনের কেউ কেউ অস্বস্তিবোধ করছিলেন। অনেকের মনে হয়েছিলো এভাবে অগ্রসর হওয়ায় মূল রাজনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এর সাথেই গণসংগঠনগুলো কিভাবে চলবে, তারা কি শুধু কাগজে কলমে স্বাধীন থাকবে নাকি স্বাধীনভাবে বিকশিত হবে, এই প্রশ্নটা গুরুতর আকার ধারণ করল। কয়েকজন তরুণ নেতার বিরুদ্ধে উপদল তৈরীর অভিযোগ উঠল। সংগঠন থেকে তাদের বহিষ্কার করার প্রশ্ন যখন উঠলো তখন আমি এর বিরোধিতা করলাম। এর আগেও এরকম ঘটনা বেশ কয়েকবার ঘটায় এবারে আমি কোনোভাবেই মেনে নিতে পারিনি।

আমার মনে হয়েছে, বললামও যে, এভাবে আমরা হাতে ধরে সংগঠক তৈরী করব, আর দু’দিন পর পর কিছু বিষয় নিয়ে দ্বিমত হলেই তাদের বহিষ্কার করবো এটা কীভাবে হয়? বরং ভিন্নমত বা সমালোচনার সাহস তো পরিপক্কতার লক্ষণ।

শ্রেণী ও গণসংগঠনের কার্যক্রমে প্রত্যক্ষ হস্তক্ষেপ আমি ঠিক মনে করি না। আমি মনে করি সেখানে প্রভাব থাকতে হবে মতাদর্শিক-রাজনৈতিক, জোর করে আরোপ করার চর্চ্চা এসব সংগঠনকে বিকশিত হতে দেয় না। এদেশে এই চর্চ্চাই আগে অনেক হয়েছে। তার ফলাফল সারসংক্ষেপ করে বদরুদ্দীন উমরই গণসংগঠন ও শ্রেণীসংগঠন স্বাধীন ও বিস্তৃতভাবে বিকশিত হতে দেয়ার তত্ত্ব সূত্রায়ন করেছিলেন। আমি এই অবস্থানের পক্ষেই দাঁড়িয়েছিলাম।

আমার মত ছিলো, কারো সঙ্গে দ্বিমত হলে ধৈর্য্য ধরে বিতর্ক চালাতে হবে। ভুল-সঠিক চিহ্নিত করতে হবে। বারংবার আলাপ-আলোচনার মধ্য দিয়ে সমস্যাটা মোকাবেলা করতে হবে। সংগঠনের সকল পর্যায়ে পরিষ্কার করতে হবে, কোথায় সমস্যা হচ্ছে। সমস্যা মোকাবেলা না করে বহিষ্কার বা এমন অন্য কোনো অস্ত্র প্রয়োগ করলে সংগঠন গতি হারায়, অনেকক্ষেত্রে মুখ থুবড়ে পড়ে। এর প্রমাণ আমাদের মধ্যেই ছিলো। যারা বহিষ্কার করবার পক্ষে ছিলেন তাদের কারও কারও এরকম অভিযোগও ছিলো যে, অভিযুক্তরা ‘সাম্রাজ্যবাদের দালাল’, ‘প্রতিবিপ্লবী’। দ্বিমত হলেই তথ্যপ্রমাণ ছাড়া কাউকে এভাবে অভিহিত করায় আমি কখনোই একমত ছিলাম না, কখনোই নই। এধরনের চর্চ্চা খুবই ক্ষতিকর, আমি খুব বিরক্ত বোধ করি।

বহিষ্কার হয়তো দরকার হয় অনেক সময়েই। তবে দ্বিমতের ফয়সালা যৌক্তিকভাবে না হলে, সকলের মধ্যে এই বিতর্ক স্বচ্ছভাবে অগ্রসর না হলে বহিষ্কার করাটা খুবই নেতিবাচক ফল দেয়। এটা সংগঠনের গতিকে রূদ্ধ করে। কর্মীদের মধ্যে পারস্পরিক অবিশ্বাস বাড়ায়। গোপনে মতামত দেয়ার প্রবণতা বাড়ায়। বহিষ্কারের ফলে উপদলীয় চক্রান্ত অনেক বেড়ে যায়। এর ভয়ে অনেকেই প্রকাশ্যে মত দিতে ভয় পায়!

আমি বার বার একই রকম ভুল ও আত্মঘাতী সিদ্ধান্তের দায় নিতে চাইনি। প্রতিবাদ যখন কাজে এলো না, তখন আমি পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নেই। আমি পদত্যাগ করি, তবে তারা এরপর চলতি প্রথা অনুযায়ী আমাকে বহিষ্কার করেন। আমার ইচ্ছা ছিল, গণ ও শ্রেণী সংগঠনগুলোর সঙ্গে যুক্ত থাকব। তারা সেই সুযোগ দেননি।

তবে আমি খুশি যে, যারা বহিষ্কার করেছেন এবং যারা একসময় বহিষ্কৃত হয়েছেন, দুই ধারাই নিজ নিজ বুঝ অনুযায়ী বিপ্লবী রাজনীতিতে সক্রিয় আছেন।

আনিস রায়হান : একটা কমিউনিস্ট পার্টি তো গণসংগঠন তৈরী করে তার উদ্দেশ্যকে সামনে রেখেই। যদি সংগঠন সেই উদ্দেশ্য থেকে দূরে সরে যায়, বা পার্টি যদি মনে করে গণসংগঠনে তার নির্দেশিত লাইন প্রয়োগ হচ্ছে না, বা কেউ বাধা দিচ্ছে, কিংবা সংগঠনের আত্মগত অবস্থা এমন একটা জায়গায় চলে গেছে যে, পার্টির লাইন তার দ্বারা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, তাহলে কি পার্টি সেখানে হস্তক্ষেপ করবে না?
আনু মুহাম্মদ : এই বিষয়গুলো চিহ্নিত করতে গিয়েই সমস্যা তৈরি হয়। কোনো তৎপরতাকে কেউ বলতে পারেন ‘পার্টি বিরোধী’, আবার কেউ বলতে পারেন ‘পার্টির বিকাশের জন্য প্রয়োজনীয় বিতর্ক’। কে এটা নির্ধারণ করবে? এখানে কে সীমারেখা টানবে? পূর্ব সিদ্ধান্ত, বা ব্যক্তিগত পছন্দ অপছন্দ প্রাধান্য বিস্তার করলেই সমস্যা। উদ্ভুত পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে যদি নীতি বানানো হয়, তাহলে নেতৃত্বের ব্যক্তিগত পছন্দ অপছন্দ দিয়ে চালিত হবার সম্ভাবনা থাকে।

সাধারণ নিয়মটা কী? গণসংগঠনের ভেতরে পার্টির সদস্যরা থাকেন। তারা সেখানে সৃজনশীলভাবে পার্টির মত গণসংগঠনের ক্ষেত্রে যতখানি প্রাসঙ্গিক সেইভাবে কাজ করেন। পার্টির অবস্থান, পরিচিতি, এর যৌক্তিকতা ও অপরিহার্যতা প্রতিষ্ঠা করেন। জোর জবরদস্তি দিয়ে তো বেশিদূর অগ্রসর হওয়া যায় না। গণতান্ত্রিক কেন্দ্রীকতার নীতির প্রশ্নও আছে। ‘গণতান্ত্রিক কেন্দ্রীকতা’র নামে ‘কেন্দ্রীকতা’ দ্বারা চালিত হলেই সমস্যা। ইচ্ছামতো নিজের পছন্দের লোককে নেতা বানানো, বা অপছন্দের লোককে সরিয়ে দেয়াটা তো চাপিয়ে দেয়া। চাপিয়ে দিয়ে কিভাবে বিপ্লবী রাজনীতি এগুবে? পারবে না। স্বচ্ছতা, অংশগ্রহণ এবং সকলের মতামত শোনার বিতর্কের পরিবেশ নিশ্চিত করা খুব জরুরী। যথার্থ গণতান্ত্রিক কেন্দ্রীকতার সঠিক চর্চ্চার মাধ্যমে তা খুবই সম্ভব।

আনিস রায়হান : বাংলাদেশে বিদ্যমান পার্টিগুলোর মধ্যে কোনো পার্টিকে কি আপনার কাছে তুলনামূলক অগ্রসর বিধায় গ্রহণযোগ্য, বা সঠিক লাইনের কমিউনিস্ট পার্টি মনে হয়?
আনু মুহাম্মদ : এভাবে বলা কঠিন, অনেক পার্টি কাজ করছে। যারা চেষ্টা করছে, তাদের মধ্যে নানা ধরনের ভুলত্রুটি থাকবে এটাই স্বাভাবিক। তাত্ত্বিক, প্রায়োগিক সমস্যা সবার মধ্যেই কম বেশী আছে। নইলে তো দেশের বিপ্লবী রাজনীতি আরও অনেক শক্তিশালী থাকতো। কিন্তু তাই বলে বিশুদ্ধ কোনো পার্টি খুঁজে পেলাম না বলে হাহাকার করার তো কোনো অর্থ থাকতে পারে না। আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে লেনিন বা মাও এর পার্টিকে তো আদর্শ বিবেচনা করা হয়, সেই পার্টিগুলোকেও তো আমরা পতিত হতে দেখেছি।

পার্টি অনেকগুলোই একক বা যৌথভাবে কাজ করছে। এখান থেকেই একক বা যৌথ উদ্যোগে বড় ধরনের উল্লম্ফন হতে পারে। আবার নতুন কাঠামোও বিকশিত হতে পারে। কোনোদিন ছিল না, নাই, এমনটা কেউ কেউ বলেন। কিন্তু এটা তো হতে পারে না। বিশুদ্ধ পার্টি বিশুদ্ধ শ্রমিক শ্রেণী বলে কিছু হতে পারে না। চিন্তার দ্বান্দ্বিকতা থাকলে এভাবে কেউ চিন্তা করবে না।

জাতীয় কমিটির মধ্যে আমি অনেকগুলো পার্টি ও গ্রুপের সাথে একসাথে কাজ করবার সুযোগ পাচ্ছি। নিজেদের অনেক পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও যে একসাথে নির্দিষ্ট কর্মসূচি নিয়ে একসাথে কাজ করা যায়, বিতর্ক নিয়েই দীর্ঘদিন ঐক্যবদ্ধ ভূমিকা পালন করা যায়, তা কিন্তু জাতীয় কমিটির মাধ্যমে প্রমাণিত হয়েছে। এই অভিজ্ঞতা খুবই ইতিবাচক। এর বাইরেও যারা আছেন তাদেরও অনেকের সাথে আমার যোগাযোগ আছে। সদস্য সচিবের দায়িত্ব নেবার পর গণতান্ত্রিক বিপ্লবী জোট ও জাতীয় গণতান্ত্রিক ফ্রন্টকে আনুষ্ঠানিকভাবে জাতীয় কমিটির সীমিত পরিসরে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজের জন্য আহবান জানিয়েছিলাম। এখনও আমার সেই আহবান অটুট আছে।

আনিস রায়হান : পার্টির অবিপ্লবী লাইনে অধঃপতিত হওয়াটা তো কেবল আন্তর্জাতিক না, আমাদের এখানকারও সমস্যা। এর কারণ কী বলে মনে করেন? আমাদের সমস্যা কোথায়?
আনু মুহাম্মদ : এগুলো এভাবে সরল সূত্রায়ন করা কঠিন। বিভিন্ন কারণে হতে পারে অধঃপতন। এদেশের কমিউনিস্ট আন্দোলনে সুবিধাবাদ একটা বড় সমস্যা। ব্যক্তিগত সুবিধাবাদ যখন পার্টিকে গ্রাস করে তখন কর্মীদের সকল শ্রম নেতার সুবিধাবাদের কাছে হারিয়ে যায়। আরেকটা সমস্যা আছে, গোঁড়ামি। মার্কসের কথা লেনিনের কথা মুখস্ত আমরা অনেক শুনি। কিন্তু যে বিশ্লেষণ পদ্ধতির জন্য তাদেরকে আমরা স্মরণ করি, তার প্রতিফলন খুব কমই দেখা যায়। সেটা থাকলে মুখস্ত উদ্ধৃতির আড়ালে গোঁড়ামি বা সুবিধাবাদ জায়গা করে নিতে পারতো না।

আমাদের সমাজে বাম বা বিপ্লবী সংগঠনকে গালি দেয়া এখন একটা ফ্যাশন হয়ে দাঁড়িয়েছে। ভুল বা ব্যর্থতার জন্য অন্যদের দায়ী করা সহজ। কিন্তু এই ব্যর্থতার দায় শুধু কিছু নেতার নয়, সকলেরই। সমাজতন্ত্র হয়নি, পার্টি হয়নি, এটা বললে কি নিজের দায়মুক্তি হবে? আগের যা ভুল হয়েছে, তা এড়িয়ে তো এগুনো যাবে না। আর আগে তো শুধু ভুল হয়নি, অর্জনও আছে। আজ যারা পুরনো নেতা কর্মী তাদের জীবন দেখতে হবে। কিছু পতিত হলেও বহুজনের জীবনে কত ত্যাগ, কতো নিষ্ঠা, কতো অবদান। এই বিপ্লবীদের উজ্জল ভূমিকা ছাড়া দেশ আরও ভয়াবহ অবস্থায় থাকতো। এগুলোও হিসাবের মধ্যে আনতে হবে। কিছুই হয় নাই, সবাই খালি ভুল করেছে, এরকম পাইকারী অভিযোগ, সবাইকে নাকচ করা, তুচ্ছতাচ্ছিল্য করা কোনো দায়িত্বশীলতার পরিচয় নয়, তথ্যনিষ্ঠও নয়।

এখন যদি কেউ মনে করে, আদর্শ শ্রমিক তো পেলাম না! আদর্শ পার্টি তো পেলাম না! তাহলে কী হবে? এটা নিষ্ক্রিয়তাকেই সমর্থন করে, উষ্কানি দেয়। এ ধরণের মনোভাব অলীক কিছুকে পাবার জন্য বাস্তব তাগিদকে অস্বীকার করে। যারা বিপ্লবে সাফল্য লাভ করেছেন তারা কি আদর্শ শ্রমিক পেয়েছিলেন? লেনিনের সময়ও আদর্শ শ্রমিক ছিল না। সমাজের যা বৈশিষ্ট্য তার ছাপ পার্টি কর্মী বা শ্রমিকশ্রেণী, সবার মধ্যেই থাকবে। এজন্যই মতাদর্শিক ও সাংস্কৃতিক অব্যাহত লড়াইয়ের প্রশ্ন- নিজের সাথে তো বটেই, সংগঠনের ভেতরেও।

আমাদের বিরাট দুর্বলতা আছে তাত্ত্বিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক ক্ষেত্রে, শিল্প সাহিত্যের ক্ষেত্রে। বিপ্লব মানে তো কেবল ক্ষমতা দখলের ব্যাপার নয়। কেন ক্ষমতা কাদের ক্ষমতা, কী পরিবর্তনের জন্য ক্ষমতা এসব প্রশ্ন তো গুরুত্বপূর্ণ। উন্নয়ন দর্শন, পরিবার-সমাজ কাঠামো, জাতিগত প্রশ্ন, আন্তর্জাতিক বিষয় ইত্যাদি সব বিষয়ে যদি পাল্টা দৃষ্টি-কর্মসূচি সমাজে শক্তিশালী না হয়, যদি তার আধিপত্য তৈরী না হয় তাহলে বিপ্লবের নামে কী হবে?

সমাজ পরিবর্তনের ডাক দিতে হলে নতুন সমাজের রূপরেখা রক্তমাংসে নিজেদের কাছে পরিষ্কার করতে হবে প্রথম, সমাজের কাছে তারপর তা হাজির করতে হবে। এই ক্ষেত্রে বড় দুর্বলতা আছে। বিপ্লবী তত্ত্বের বিকাশের প্রশ্নটি এদেশে বরাবরই দুর্বল।

প্রকৃতপক্ষে বিপ্লবী রাজনীতি মানে হলো সেটাই, যে তার নিজের মধ্যে একটি নতুন সমাজ নির্মাণ করে। মানুষের সাথে মানুষের সম্পর্ক, নারী পুরুষ সম্পর্ক, জাতি-ধর্ম-বর্ণ সম্পর্ক, নেতা-কর্মী সম্পর্ক ও সংস্কৃতি যদি নতুন সমাজের ভাব বহন করতে না পারে তাহলে কীভাবে হবে? বিদ্যমান সমাজের ক্ষমতা কাঠামো, শ্রেণী ক্ষমতা, পুরুষতন্ত্র, স্বয়ংক্রিয়ভাবে চলে যায় না। এই সবকিছুর সাথেই মোকাবিলা করতে হয়। যে সংগঠন সমাজ পাল্টাবে তার মধ্যে যদি সমাজের বিদ্যমান চর্চ্চাগুলোই আধিপত্য বিস্তার করে থাকতে পারে, তাহলে তো হবে না।

আনিস রায়হান : পার্টিগুলোর বর্তমান কর্মপ্রক্রিয়া সম্পর্কে কিছু বলুন?
আনু মুহাম্মদ : বুদ্ধিবৃত্তিক, তাত্ত্বিক ও মতাদর্শগত দুর্বলতার কথা তো আগেই বললাম। জনগণের যত কাছে একজন সংগঠক যাবেন, যত জনগণের কথা, জীবন, তার প্রাণ, বুঝতে চেষ্টা করবেন ততো সমৃদ্ধ হবেন। নিজেদের কাজের সমস্যাও তখন আরও পরিষ্কার হবে। যেমন ধরেন, ‘আমরা সমাজতন্ত্র চাই’, এটা দিয়ে কি এখন স্পষ্ট কোনো আশাবাদী জায়গা তৈরী করা যায়? সমাজতন্ত্র বলতে এখন আর আগের মতো করে কোনো উজ্জল ও নির্দিষ্ট ভবিষ্যৎ চোখের সামনে আসে না। সোভিয়েত ইউনিয়ন, চীন যখন ছিল তখন মানুষ সমাজতন্ত্রের কথা বললেই মানসলোকে একটা ছবি দেখে নিতো, বিষয়টা বুঝতে পারত। কিন্তু এখন সোভিয়েত ইউনিয়ন বলে কিছু নেই, চীনে যা চলছে তাকে কি সমাজতন্ত্র বলা যাবে?

মানুষকে এখন সমাজতন্ত্র বললে তাহলে সে কী বুঝবে? সে নিজের মধ্যে অনুসন্ধান করবে, দিয়ে পাবে যে, সমাজতন্ত্র মানে চীন, রাশিয়া, যারা হেরে গেছে। শেষ পর্যন্ত সমাজতন্ত্র শব্দটার অর্থ দাঁড়াবে তার কাছে, পরাজিত মতবাদ বা ব্যর্থ ব্যবস্থা। এরকম অনেক বিষয় আছে। এগুলো সম্পর্কে সৃজনশীল হতে হবে। নামের দিকে জোর না দিয়ে বরং কী ধরনের সমাজ চাই তা জনগণের কাছে মূর্ত করাটা বেশী দরকারি। নতুন সমাজ যে প্রতিষ্ঠা করা গেছে, এখনো যে করা যাবে, এটা যে মানুষের শত শত বছরের লড়াইয়ের একটা পর্ব, এটা সুনির্দিষ্টভাবে মানুষের জীবনের সাথে মিলিয়ে মূর্ত করতে হবে। আর এজন্য অনেক ছোট ছোট লড়াই, ছোট ছোট বিজয়, নিজেদের স্থানীয় ও জাতীয় ভিন্ন জগতের রূপরেখা মানুষের সামনে উপস্থিত করা দরকার। আর বৈশ্বিক লড়াই এখন আগের চাইতে অনেক গুরুত্বপূর্ণ। দেশের অনেক মানুষ শ্রমিক হিসেবে এখন বিশ্বের নানাপ্রান্তে ছড়িয়ে আছেন। এই পরিস্থিতি নতুন লড়াই ও যোগাযোগের ক্ষেত্র তৈরি করছে।

আনিস রায়হান : অনেকেই মনে করেন আপনি কোনো না কোনোভাবে দীর্ঘদিনের মিত্র জোনায়েদ সাকির গড়া সংগঠন গণসংহতি আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত। এদিকে আমরা তো মনে করি, তারা মার্কসবাদ থেকে বিচ্যুত। মার্কসকে তারা ত্যাগ করেছে। এই সংগঠনের সঙ্গে কি আপনি আসলেই কোনোভাবে যুক্ত? এদের রাজনৈতিক লাইনকে আপনি কিভাবে দেখেন? তারা জাতীয়তাবাদের মোড়কে যেভাবে মার্কসবাদের অভ্যন্তরীণ চর্চ্চা অনুশীলন করছে, নিজেদের মধ্যে মার্কসের কথা বলে, কিন্তু দলিলে বা জনগণের কাছে বলে জাতীয়তাবাদ, এটা কি তাদেরকে ক্রমশ আরো ডান ধারায় ঠেলে দিবে না?
আনু মুহাম্মদ : না, আমি গণসংহতি বা অন্য কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত নই। আমার ধারণা, তারাও আন্তরিকতা ও নিষ্ঠা নিয়ে বিপ্লবী রাজনীতিতে ভূমিকা রাখতে চেষ্টা করছে। মার্কস ত্যাগ করবার কোনো ঘোষণা বা লক্ষণ তো ওদের কথা বা কাজে দেখি নাই। তবে এসব প্রশ্নের জবাব ওরা দিলেই ভালো হবে।

আনিস রায়হান : একটি কমিউনিস্ট পার্টি গড়ে তোলার প্রয়োজন অনুভব করেন কি? বা ভবিষ্যতে কখনো গড়ার আকাঙ্খা পোষণ করেন?
আনু মুহাম্মদ : আমি তো দুই দশকেরও বেশি সময় কাজ করেছি। আমার মনে হয় না আমি একটা পার্টি তৈরি করলেই কোনো বড় পরিবর্তন আনা সম্ভব। অনেকগুলো পার্টি আছে, তারা কাজ করছেন। নতুন আরেকটির দরকার দেখি না। তবে অনেক কাজ দরকার। আমার সাধ্যমতো বুদ্ধিবৃত্তিক, তাত্ত্বিক ক্ষেত্রে কাজ করতে চেষ্টা করছি, চেষ্টা করছি সমাজে বিভিন্ন লড়াইয়ে সাধ্যমতো ভূমিকা পালনের।

একদিকে মনে হচ্ছে বটে বিশ্বে বর্ণবাদী সাম্প্রদায়িক পুঁজি আগ্রাসী যুদ্ধবাদীদের জয়জয়কার, বিপ্লবী শক্তি তো বটেই গণতান্ত্রিক বোধ ও সাম্যের চিন্তা পরাজিতের দিকে। কিন্তু দেশে দেশে চিন্তা ও লড়াইয়ের জায়গাগুলো দেখলে দেখবো, বহুভাবে জগত পরিবর্তনের লড়াই সংগঠিত হচ্ছে। উঠানামা হচ্ছে। শুণ্য অথবা একশো এই দৃষ্টিভঙ্গী নয়, মনে রাখতে হবে এর মধ্যে আরও সংখ্যা আছে। সংগঠন ও তত্ত্বের ক্ষেত্রে সৃজনশীল অনেক কাজের পর্ব এখন। সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বব্যবস্থার মধ্যেও নানা পুনর্গঠন হয়েছে, বিশ্ব প্রতিষ্ঠান নীতি ও চুক্তির মধ্যে দিয়ে দেশে দেশে উন্নয়নের নামে যে পুঁজি আগ্রাসন তা কিছু মুখস্ত কথায় বললে হবে না। তার স্বরূপ মানুষের জীবনের অভিজ্ঞতার সাথে মিলিয়ে পরিষ্কার করতে হবে। আমি পার্টিগুলোকে উপদেশ দেবার ঔদ্ধত্ব দেখাতে চাই না। তারা কাজ করছেন। এক্ষেত্রে আমারও দায়িত্ব আছে। আমিও আমার দায়িত্ব সাধ্যমতো পালনের চেষ্টা করছি।

আনিস রায়হান : আপনি কি নিজেকে কমিউনিস্ট দাবি করেন?
আনু মুহাম্মদ : আমি এভাবে কোনো দাবি করি না। চট করে কোনো বিশেষণ ধারণ করতে অস্বস্তি বোধ করি, আর কমিউনিস্ট হওয়া তো অনেক বড় ব্যাপার। ব্যক্তিগত সম্পত্তির বা কর্তৃত্বের আকাঙ্খাতাড়িত, বৈষম্য ও নিপীড়নের সুবিধার আকাঙ্খী, প্রকৃতিবিনাশী, সৃজনশীলতা বিরোধী মানুষ নিজে যতই কমিউনিস্ট পার্টি নামের কিছু করেন, বা নিজেকে কমিউনিস্ট বলে ঘোষণা করেন আসলে তিনি এই সমাজ টিকিয়ে রাখার পক্ষেই কাজ করবেন।

আমি মনে করি, কমিউনিজম বা সাম্যবাদ, অর্থাৎ বৈষম্য ও নিপীড়নমুক্ত সমাজ ও বিশ্ব একটা স্বাভাবিক কান্ডজ্ঞানের বিষয়। এটাকে কঠিন অচেনা সুদূর কিছু ভাবার দরকার নাই। আমরা এখন যে সমাজ ও বিশ্বে বাস করছি তা বরং খুবই অযৌক্তিক ও অস্বাভাবিক। এর পরিবর্তনই আমাদের কাজ। কেউ যদি নিজেকে মুক্ত মানুষ হিসেবে বিবেচনা করে, অন্য সকল মানুষকে, প্রকৃতিকে সেভাবে মর্যাদা দিয়ে দেখার শক্তি অর্জন করে তাহলে তার মধ্যে যে জীবনযাপন আশা-আকাঙ্খা তৈরী হয় তাই একজন কমিউনিস্টকে তৈরী করে।

আমি বাংলাদেশে ও সারা বিশ্বে মানুষের সেই স্বাভাবিক সমাজ প্রতিষ্ঠার সবরকম চিন্তা ও লড়াইয়ের সঙ্গে নিজেকে যুক্ত বোধ করি। সেজন্য কমিউনিস্ট বিপ্লবে আমার ‘হারানোর কিছু নেই, পাবার আছে সারাবিশ্ব’, আছে আনন্দময় জগত। কোনো পার্টি না করলেও নিজেকে আমার সমাজের বিপ্লবী রূপান্তরের বা সমাজের মানবিক রূপান্তরের সার্বক্ষণিক কর্মী বলেই মনে হয়। আমার শিক্ষকতা, লেখালেখি, গবেষণা, আন্দোলন-সংগ্রাম সবই এই লক্ষ্যেই।

আনিস রায়হান : পার্টির সঙ্গে বুদ্ধিজীবীদের সম্পর্ক নিয়ে কিছু বলুন। বুদ্ধিজীবী হিসেবে নিজে কেমন সমস্যার মুখে পড়েন?
আনু মুহাম্মদ : নিজেকে আমি বুদ্ধিজীবী বলা পছন্দ করি না। আসলে বর্তমান যে অমানবিক বৈষম্যমূলক ব্যবস্থার মধ্যে আমরা বাস করি তা শুধু অস্ত্র আর পুঁজির শক্তিতে চলছে তা নয়। এটা চলতে পারছে সমাজের মধ্যে এই ব্যবস্থাকে বৈধতা দেবার মতো বিশ্বাসকাঠামো, চিন্তা, রুচি, বুদ্ধিবৃত্তিক আধিপত্য, শিক্ষা ও সংস্কৃতিচর্চ্চার কারণে। এই সমাজ পাল্টাতে গেলে তাই এক্ষেত্রে পাল্টা আধিপত্য ছাড়া অগ্রসর হবার উপায় নেই। সেজন্যই আমরা দেখি যে কোনো বড় পরিবর্তনের পেছনে শিক্ষা সংস্কৃতি বুদ্ধিবৃত্তিক কাজের মাধ্যমে তার ভিত্তি তৈরি হয়। আখতারুজ্জামান ইলিয়াস খুবই সঠিকভাবে বলেছিলেন, ‘নির্বাচনের জন্য পোষ্টারই যথেষ্ট, কিন্তু বিপ্লবের জন্য চাই শিল্প সাহিত্য।’

তাত্ত্বিকভাবে সবাই স্বীকার করলেও পার্টির বাইরে নানা গুরুত্বপূর্ণ কাজকে যথাযথ স্বীকৃতি দিতে পার্টিকেন্দ্রীক মানুষেরা অনেক সময় কুন্ঠিত থাকেন। কিন্তু বিপ্লবী পরিবর্তনে পার্টির বাইরে অসংখ্য উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ। এগুলোর প্রতি সম্মান জানাতে হবে। এরকম যদি হয় কেউ যদি প্রকাশ্যে মার্কসবাদী হিসেবে ঘোষণা না দেন, কোনো পার্টির প্রতি আনুগত্য প্রকাশ না করেন তাহলে তার শিল্পকাজ, গবেষণা, শিক্ষা ও সংস্কৃতির তৎপরতা গুরুত্বপূর্ণ নয়, তিনি কিছু বোঝেন না, এটা খুবই ভুল ও বিপজ্জনক। এই দৃষ্টিভঙ্গী ক্ষতিকর যে, যিনি পার্টির কমরেড তিনি অবশ্যই মার্কসবাদী, তাই তিনি বেশী জ্ঞানী, তিনিই সব প্রশ্নে সঠিক। আরেকজন মার্কসবাদী বলে নিজেকে ঘোষণা করেননি, সুতরাং তিনি ভুল বা পরিত্যাজ্য। ঘোষণা দিয়ে নয়, বিভিন্ন সময়ে কে কী অবস্থান নিচ্ছেন, কে কী কাজ করছেন সেগুলোই গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় আনতে হবে। সেগুলোর পর্যালোচনা করবার মধ্য দিয়েই বন্ধু শত্রু সনাক্ত করতে হবে।

বিপ্লব অসংখ্য মানুষের- তাদের শরীর ও মনের, মেধা মননের, হৃদয়ের বিষয়। জোড়াতালি, জবরদস্তি, আত্মপ্রতারণা, আত্মসন্তুষ্টি দিয়ে এটা হয় না। সবাইকে খারিজ করে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টার সংস্কৃতি খুবই পরিচিত, কিন্তু খুবই ক্ষতিকর। মতভেদ না থাকলে এতোগুলো পার্টি কেন আছে? কিন্তু অন্যদের ছোট না করেও নিজেদের বড়ত্ব প্রমাণ করা যায়। আমি মনে করি, পরিষ্কার ধান্ধাবাজদের বাদ দিয়ে, মতভেদ যাই হোক পরস্পরকে বোঝার চেষ্টা, পরস্পরের প্রতি সম্মানবোধ, ঐক্যের জায়গাটুকুতে একসাথে কাজ করবার চেষ্টা এবং একই সঙ্গে বিতর্ক অব্যাহত রাখার সংস্কৃতি শক্তিশালী হলে পরিস্থিতির মধ্যে দ্রুত গুণগত উত্তরণ ঘটবে। তাহলে সমাজের আপাত বিচ্ছিন্ন বিভিন্ন ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর কাজ, বিশেষত তরুণদের অসংখ্য উদ্যোগ এই প্রক্রিয়ায় অনেক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারবে।

আনিস রায়হান : আপনি বিষয়গুলো নিয়ে কথা বলতে চাননি, আমাদের জোরাজুরিতে রাজী হলেন। এই সাক্ষাৎকারের ফলে অনেকেই আপনাকে আক্রমণ করতে পারেন। সমস্যায় পড়বেন জেনেও সাহসী হয়ে অনেক কথা বললেন শুধু আমাদের জানার আকাঙ্খাকে গুরুত্ব দিয়েই। এজন্য আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ।
আনু মুহাম্মদ : তোমাকেও ধন্যবাদ।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

১৬ thoughts on “‘এদেশের কমিউনিস্ট আন্দোলনে সুবিধাবাদ একটা বড় সমস্যা’ – আনু মুহাম্মদ [এক্সক্লুসিভ সাক্ষাৎকার]

  1. চমৎকার সাক্ষাৎকারটির জন্য
    চমৎকার সাক্ষাৎকারটির জন্য আনিস ভাইকে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা। স্যারের কথাগুলো শুধু কমিউনিস্ট আন্দোলন নয়, যে কোন আন্দোলনের জন্য গুরুত্বপুর্ন।

    1. কমিউনিস্ট আন্দোলন তথা সাম্যের
      কমিউনিস্ট আন্দোলন তথা সাম্যের লড়াই বিকশিত না হলে মানুষ বিকশিত হতে পারবে না। তারা এক দল আরেক দলের মাংস খেতেই থাকবে। আমাদের দেশের মতো কোথাও রাস্তায় নগ্নভাবে খুবলে খাবে। বা উন্নত দেশগুলোর মতো ভালো করে প্যাকেট করে রঙ মাখিয়ে একটু আড়াল করে খাবে। কেবল কমিউনিজমই সব ধরণের শোষণ, বৈষম্যের বিলুপ্তি চায়। তাই আমাদের সব আন্দোলনের কেন্দ্রে রাখতে হবে সাম্য প্রতিষ্ঠার আন্দোলনকে।

      পড়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ। 🙂

  2. অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ সম্পর্কে
    অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ সম্পর্কে যাদের মধ্যে বিভ্রান্তি ছিল, এই একটি সাক্ষাতকার সেই বিভ্রান্ত দুর করবে বলে মনে করছি। চমৎকার এই সাক্ষাৎকারটির নেওয়ার জন্য আনিস ভাইকে ধন্যবাদ। আনু স্যারকেও ধন্যবাদ ইস্টিশনের জন্য এই সাক্ষাৎকারটি দেওয়ার জন্য।

  3. আনিস ভাই, আনু স্যারের
    আনিস ভাই, আনু স্যারের উত্তরগুলো আমার ভাল লেগেছে। উনি একটা দল থেকে বের হবার পরেও সেই দলের নামে কুৎসা রটনা না করে গঠনমূলক সমালোচনা করেছেন, এই সংস্কৃতি নিঃসন্দেহে প্রসংশার দাবিদার। তবে উনি গড়পরতা উত্তর দিয়েছেন, আলোচনার গভীরে ঢোকেননি।
    যেমন- বিপ্লবী পার্টিটি আসলেই যথার্থ বিপ্লবী পার্টি কিনা, তা বুঝবার জন্য তার রাজনৈতিক তত্ব ঠিক আছে কিনা, দলটির আন্তর্জাতিক বিশ্লেষণ ঠিক আছে কিনা, রণনীতি-রণকৌশল মার্কসবাদী বিচারধারায় সম্পন্ন কিনা এবং নেতা-কর্মীদের সাংস্কৃতিক মান যথার্থ কিনা- এই প্রশ্নগুলোর ভিত্তিতে বিচার করা জরুরি ছিল। আলোচনা সেদিকে না গিয়ে শুধু বহিষ্কারের বিষয়টিকেই উনি পাধান্য দিলেন। গণ সংগঠন ও পার্টির সম্পর্ক অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু এই সম্পর্ক বা বহিষ্কার করার ঘটনাগুলো সবই বাইপ্রডাক্ট। মূল প্রশগুলো মিমাংসা না করে বাইপ্রডাক্ট দিয়ে পার্টিটি বিপ্লবী কিনা তা বোঝা অসম্ভব।
    দীর্ঘদিন ওনার অধিকাংশ বামদলের সাথে সম্পর্ক আছে। কোন পার্টি কি ধরণের সুবিধাবাদে আক্রান্ত তা স্পষ্ট করে বলা প্রয়োজন। কোনো পার্টির কাজ-কর্ম দেখে ওনার যদি মনে হয় তারা আওয়ামীঘেষা বা ক্ষমতালোভী বা জোটের সুবিধা নিচ্ছে, তাহলে স্পষ্টভাবে কারণসহ বলা প্রয়োজন। তার বিশ্লেষণ বামপন্থীদেরও সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহযোগিতা করতে পারে।
    উনি কোন দলটির মধ্যে স্মভাবনা দেখেছেন এটা স্পষ্ট করে বলেননি বা সবার সুনির্দিষ্ট সমালোচনা করলেন না, তাতে শেখার সুযোগটি বন্ধ হয়ে গেল। প্রত্যেকটি পার্টিরই পৃথক পৃথক রাজনৈতিক লাইন, রণ্নীতি-রণকৌশল, বাংলাদেশের রাষ্ট্রচরিত্র বিশ্লেষণ রয়েছে। সেগুলোর ঘাটতি-ত্রুটি ধরে বললে ভাল হতো।
    আনু স্যারের লেখাটি পড়ে মনে হলো উনি সাম্রাজ্যবাদকে প্রধান সমস্যা বলতে চেয়েছেন। কিন্তু জাতীয় কমিটির প্রত্যেকটি আন্দোলনে দেশের ক্ষমতাসীন সরকারের বিরুদ্ধেই প্রধান্ত বলতে হয়েছে। আন্দোলনটা সরকারের বিরুদ্ধেই করতে হয়েছে। আবার সমস্যা সমাধানে দেশের মানুষকেই গর্জে ওঠার আহ্ববান উনি বার বার করেছেন। তার তত্বে ও আন্দোলনের কর্মসূচীর মধ্যে একটি বিরোধ আছে বলে মনে হয়েছে।
    ধন্যবাদ এমন অসাধারণ একটা পোস্ট প্রকাশ করার জন্যে।

  4. একটু খেয়াল করুন, তিনি নিজেকে
    একটু খেয়াল করুন, তিনি নিজেকে কমিউনিস্ট দাবী করতে অস্বীকার করেছেন। কিন্তু কমিউনিস্ট পার্টি ও তাদের কর্মসূচী সম্পর্কে আলাপ করেছেন, মতামত দিয়েছেন। ওখানে বসেই এই আলোচনাকে পরিণতির দিকে, সিদ্ধান্ত গ্রহণের দিকে এগিয়ে নেয়ার চেষ্টা করাটা ছিল অসম্ভব। আর তা অবশ্যই তাকে বিরক্ত করত। কারণ অবস্থানের দিক থেকে আমাদের অনেকগুলো জায়গায় মৌলিক পার্থক্য আছে। এর বাইরে আরেকটা বিষয় হচ্ছে, কোন পার্টি সরকারের দালাল বা স্পষ্ট সংশোধনবাদী সেই আলাপ যত এগুবে ততো তিনি একটা সঙ্কটের দিকে আগাবেন। আপনি এই ব্লগে সশস্ত্র বিপ্লবের কলাকৌশল, রণনীতি নিয়ে আলাপ দুই এক কদমের বেশি আআতে পারবেন না। এটা অসম্ভব।

    আমরা এখানে তার মতটাই শুধু নিয়েছি। এখন এই আলাপের দ্বিতীয় পর্বের সূচনা ঘটোতে পারে। তার বক্তব্যের বিপরীতে আমরা যে কেউ যে কোনো মত দেই না কেন, তিনি অবশ্যই জবাব দিবেন। সব স্ময়ই আমাদের যে বিষয়টা খেয়াল রাখতে হয়, তা হচ্ছে ঐক্য-সংগ্রাম-ঐক্য! আনু স্যার নিজেকে বুদ্ধিজীবী বলতে রাজী হননি, কিন্তু দেশের অধিকাংশ মানুষ তাকে সে হিসেবেই চিনে। আমরা এখানে তাকে আক্রমণ করা বা সঠিক বা ভুল প্রমাণ করার জন্য আলাপ করিনি। আমরা কমিউনিজম, পার্টি, বিপ্লব এরকম কিছু বিষয়ে তার মতামত চেয়েছি মাত্র। এখান থেকে অনেক কিছু শেখার আছে। দ্বিতীয় দফার বিতর্ক শুরু হওয়া, গঠনমূলক সিদ্ধান্তের দিকে এগুনোর সুযোগটাও থাকছে। বিপ্লবী মাত্রই এই সুযোগটা কাজে লাগাবেন।

    আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ।

  5. প্রচলিত রাজনীতি যে ভালো না
    প্রচলিত রাজনীতি যে ভালো না সেটা সকলেই বুঝি । কিন্তু এই রাজনিতির যখন বিলুপ্তি চাই তখন বলা হয় তুই বামপন্থী । অথচ আমি বামপন্থি ডানপন্থী কোনটাই না । আশ্চর্য একটা সমাজ যেখানে বৈষম্যের প্রতিবাদ করে সাম্যের কথা বললেই বামপন্থী বলা হয় ।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

15 − 5 =