৭১ এ চীনপন্থীদের তৎপরতার একটি পাকিস্তানি দলিল

১৯৭১ সালের জুন মাসের শেষার্ধ্বের পরিস্থিতি জানিয়ে পাকিস্তানি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় একটি রিপোর্ট তৈরী করে পাঠায় ইয়াহইয়াকে। সেই রিপোর্টে পূর্ব বাংলার রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক অবস্থা, পাকিস্তানপন্থী এবং পাকিস্তান বিরোধীদের কর্মকান্ড সম্পর্কে বিস্তারিত বর্ণনা দেয়া হয়।

আমাদের দেশে প্রচলিত ধারণা হচ্ছে, চীনপন্থী কমিউনিস্টরা একাত্তরে যুদ্ধে যাননি। তারা মুক্তিযুদ্ধকে দুই কুকুরের কামড় কামড়ি বলে বসে ছিলেন। কেউ কেউ চীনপন্থীদের বিরুদ্ধে পাকিস্তান বাহিনীকে সমর্থনের অভিযোগও আনেন। মুক্তিযুদ্ধের দলিলপত্র থেকে জুন শেষার্ধ্বের রিপোর্টে এ বিষয়ক গুরুত্বপূর্ণ কিছু তথ্য আছে। তা নিচে হুবহু তুলে ধরা হলো। তবে তার আগে দুটো কথা বলে নেয়া দরকার। চীনপন্থীরা তখন ছিলেন নানা কেন্দ্রে বিভক্ত। কোনো কোনো পার্টি সরাসরি যুদ্ধ করেছে। কোনো কোনো পক্ষ যুদ্ধে পার্টির অমতে নিজেরাই নেমে গেছে। তাই চীনপন্থীরা যুদ্ধ করেছে, বা করেনি এই সরল সমীকরণ দিয়ে বিষয়টাকে ব্যাখ্যা করা যায় না।

যাই হোক, আমরা রিপোর্টে ফিরে যাই। বড় বিধায় রিপোর্টের পুরো অংশটি এখানে দেয়া হলো না। শুধু চীনপন্থীদের ভূমিকা সংশ্লিষ্ট অংশটুকু তুলে ধরা হলো। আগ্রহীরা চাইলে মুক্তিযুদ্ধের দলিলপত্রের সংকলন অনুসরণ করতে পারেন। রিপোর্ট বুঝতে হলে মনে রাখতে হবে যে, আওয়ামী লীগ ও রুশপন্থী কমিউনিস্টরা যুদ্ধ শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ভারতে পাড়ি জমালেও চীনপন্থীরা সব দেশেই ছিলেন। তারা ভারতকে শত্রু ভাবতেন বিধায় ভারতে যেতে রাজী ছিলেন না। যুদ্ধে আওয়ামী ও রুশপন্থী কমিউনিস্টদের বাহিনীগুলো আসতে শুরু করে আগস্ট থেকে। তার আগ পর্যন্ত স্থানীয় প্রতিরোধটাই ছিল প্রধান। আগস্টের অনেক আগে, জুনের শেষে পাকি বাহিনীর এই রিপোর্টে সেই দিনগুলোতে নকশালদের তৎপরতার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

 

৬. যশোর জেলার লোহাগড়া থানার লোহাগড়া বাজারের বিভিন্ন স্পটে পূর্ব পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টির (মাক্সিস্ট-লেনিনিস্ট) নামে লাগানো বাংলা ভাষায় লিখিত পোস্টার নজরে আসে ১৮ জুন ’৭১ সকালে। এসব পোস্টারের লেখা রয়েছে :
ক. ‘পুলিশ-মিলিটারি খতম করুন।’
খ. ‘সুদখোর ও বাংলার শত্রুদের খতম করা হচ্ছে ও হবে।’

৭. খুলনা জেলার দৌলতপুর শাখা পূর্ব পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টি (মাক্সিস্ট-লেনিনিস্ট) সম্প্রতি কিছু লিফলেট বিলি করেছে। এসব লিফলেটে জোতদার, মহাজন ও ধনীদের শ্রেণিশত্রু হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এতে বলা হয়, একমাত্র সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে গরিবদের অবস্থার উন্নতি সম্ভব। এই ধরনের সরকার প্রতিষ্ঠা করতে লাগবে সশস্ত্র বিপ্লব। সমাজতান্ত্রিক সরকার গঠনের লক্ষ্যে গরিবদের ঐকবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়ে দলীয় কর্মীদের গেরিলা যুদ্ধ তীব্র করার আহ্বান জনানো হয়।

৮. খুলনার দৌলতপুরের মল্লিকপাড়ার দুটো বাড়ির দেয়ালে ‘নকশাল’ ও ‘মুক্তি ফৌজের’ নামে বাংলায় লেখা কয়েকটি পোস্টার সাঁটানো হয়। পোস্টারে কয়েকজন ব্যক্তির বিরুদ্ধে মৃত্যুদ-ের হুমকি দেওয়ার পাশাপাশি মুসলিম লীগের টাউটদের খতম করতে গ্রামে গ্রামে সশস্ত্র নকশাল ইউনিট গঠনের জন্য জনগণের প্রতি আহ্বান জানানো হয়।

৯. ‘পূর্ব বাংলা শ্রমিক আন্দোলন’-এর নামে ‘প্রচারপত্র’ শিরোনামের একটি বাংলা পোস্টার সম্প্রতি বরিশাল জেলার স্বরূপকাঠী স্কুলের দেয়ালে সাঁটানো অবস্থায় পাওয়া যায়। পোস্টারের ভাষা হচ্ছে : ‘স্বাধীনতার বিপক্ষে কোনো বাঙালি পুলিশ তৎপরতা চালালে তার শাস্তি হবে মৃত্যুদন্ড। যেসব পুলিশ আমাদের দলে যোগ দেবেন তাদের সবধরনের সহায়তা দেওয়া হবে।’
‘পশ্চিমা কুত্তারা এজেন্টদের মাঝে টাকা ছড়িয়েও কোনো বাঙালিকে হত্যা করতে পারবে না। কারণ এসব কুকুর পথঘাট যেমন চিনে না, তেমনি জনগণকেও জানে না।’

১৬. প্রদেশে শ্রম পরিস্থিতি মোটের ওপর সন্তোষজনক। শ্রমিক উপস্থিতির হার বেশ ধীরগতিতে বৃদ্ধির একটা কারণ হচ্ছে গন্ডগোলের জন্য কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রবীণ শ্রমিকরা অনুপস্থিত রয়ে গেছেন। তাদের শূন্যস্থান পূরণে কর্তৃপক্ষ উদাসীন। আরেকটি কারণ হচ্ছে কারখানা চালু করা ঠেকাতে দুর্বৃত্তরাও শ্রমিকদের হুমকি দিচ্ছে।

১৭. জানা গেছে, সম্প্রতি খুলনার দৌলতপুরের বেশকিছু পাটকল ও বেইলিং সেন্টারের মালিককে নকশালীরা চিঠির মাধ্যমে কারখানা দ্রুত বন্ধের নির্দেশ দিয়েছে। শিগগির এ নির্দেশ পালিত না হলে এসব কারখানায় আগুন লাগিয়ে দেওয়ার হুমকি দেয় তারা।

২৩. সম্প্রতি কুষ্টিয়া জেলার কুমারখালী থানার পান্তি বাজারে ‘স্বাধীন বাংলার শত্রুদের প্রতি হুশিয়ার’ শিরোনামের একটি হাতে লেখা লিফলেট নজরে এসেছে। এটি ‘স্বাধীন বাংলা গণমুক্তি সেনা’র নামে প্রচারিত হয়েছে। জনগণের মাঝে প্রচারিত হয়েছে। জনগণের মাঝে ভীতি সৃষ্টি ও স্বাধীনতার মূলে আঘাত হানার অভিযোগে লিফলেটে মুসলিম লীগ ও জামায়াতে ইসলামীর ডাকাত, টাউট ও চ্যালাদের হুঁশিয়ার করা হয়।

২৪. সম্প্রতি কুষ্টিয়া জেলার কুমারখালী থানার বাগবাড়িয়া গ্রামে সাইকেলযোগে এসে একজন অচেনা ব্যক্তি হাতে লেখা কিছু লিফলেট ছিটিয়ে সটকে পড়ে। এসব লিফলেটে লেখা ছিল :
ক. ‘সারা দুনিয়ার গরিব এক হও। অস্ত্র ধরো, রুখে দাঁড়াও।’
খ. ‘পশ্চিমা কুকুরদের খতম কর, বাংলাদেশ মুক্ত কর।’
গ. জালিম সরকারকে খতম কর, বাংলার দালালদের খতম কর।’
ঘ. ইসলামের দোহাই দিয়ে যারা বাংলার স্বাধীনতায় বাধা দেয় তাদের ক্ষমা করা চলবে না।’

এম এম কাজিম
সচিব, পাকিস্তান সরকার

১৪ জুলাই, ১৯৭১
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়
ঢাকা

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

২৫ thoughts on “৭১ এ চীনপন্থীদের তৎপরতার একটি পাকিস্তানি দলিল

  1. অসাধারন পোস্ট,প্রিয়ত্‌। ৭১
    অসাধারন পোস্ট,প্রিয়ত্‌। ৭১ সালে কুষ্টিয়া জেলার কুমারখালী সহ খোকসা,সদর্‌ থানায় ‘স্বাধীন বাংলা গণমুক্তি সেনার নামে আরো অনেক লিফলেট প্রচার হয়েছিলো (আমার প্রয়াত দাদু একদিন কথাপ্রসঙ্গে আমাকে বলেছিলো, খোকসাতে বাড়ি দাদুর)

  2. ইতিহাস কখনো ভুল হতে পারে না।
    :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ:
    ইতিহাস কখনো ভুল হতে পারে না। এই মুহুর্তে এই ধরনের পোস্ট অত্যাবশ্যক ছিল। অসাধারণ একটা কাজ করেছেন।

  3. এই ধরনের ইতিহাস ভিত্তিক পোস্ট
    :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ:
    এই ধরনের ইতিহাস ভিত্তিক পোস্ট দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।

  4. লেখাটা অল্প একটু পড়েই ভালো
    লেখাটা অল্প একটু পড়েই ভালো লাগলো তাই প্রথমেই ভালোলাগাটা জানালাম।পুরোটা পড়ে মন্তব্য দিচ্ছি।

  5. আমাদের তরুণ প্রজন্মের সামনে
    আমাদের তরুণ প্রজন্মের সামনে সঠিক ইতিহাস তুলে ধরা উচিৎ। অন্যতায় ভুল ইতিহাস জেনে ভুল পথে চলতে পারে।

  6. ইদানিং সব বাম কমিউনিস্টদের
    ইদানিং সব বাম কমিউনিস্টদের ঢালাও ভাবে চিন্কু চিনাবাদাম বলে গাল দেয়া হচ্ছে… বড় বিব্রতকর…!!

    1. যারা গাল দেয়ার তারা তো দিবেই।
      যারা গাল দেয়ার তারা তো দিবেই। ক’দিন বাদে গুলি করতে আসবে। এদের চিহ্নিত করে এদের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো দরকার।

    1. না। ওই সময়ের প্রেক্ষাপটে
      না। ওই সময়ের প্রেক্ষাপটে চীনপন্থী পার্টিগুলোই এই নাম ধারণ করতো। চারু মজুমদারের পার্টির নাম ছিল ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসিস্ট-লেনিনিস্ট)। আমাদের এখানেও চীনপন্থীরাই এই নামটা ধারণ করতো।

    1. এভাবেই যদি বলতে চান, তাহলে
      এভাবেই যদি বলতে চান, তাহলে ক্ষুদিরাম, সূর্য সেনের প্রসঙ্গ এলে আপনি কি বলবেন? তারাও তো আপনার ভাষায় (যা শাসকদেরই প্রচার করা) ‘উগ্রপন্থী’ই ছিল। সুতরাং এই একই কারণে ভগৎ সিংও সফল হতে পারেনি। সফল হয়েছেন গান্ধী। যিনি ভগৎ সিং এর মুক্তির দাবী জানাতে অস্বীকার করেছিলেন। আর এখানে সফল হয়েছেন মুজিব। যিনি নিজে সিরাজ সিকদারকে খুন করেছিলেন। তাহলে আমরা হুমায়ুন আজাদকে এখানে একটু স্মরণ করতে পারি, এদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেছিলেন, সফলেরা শয়তান, ব্যররথরাই প্রকৃত মানুষ! এখানে তো ভাসানি উগ্রপন্থী ছিলেন না। তিনি কেন ব্যর্থ হলেন? উগ্রপন্থাকে ব্যররথতা বা সফলতার নিয়াওক হিসেবে ঠিক করে দেয়া যায় কি? আজ আপনি কোনো ধর্ষককে পেটালে আপনাকেও উগ্রপন্থী বলা হবে। রাষ্ট্রের দেয়া সংজ্ঞায়ন কি আমাদের প্রচার করা উচিত। আশা করি ভাববেন।

      এভাবে আপনি কাউকে উগ্রপন্থী বলতে পারেন না। সেটা ছিল যুদ্ধের কাল। এমনকি এটাও। যেখানে সব সমস্যার ফয়সালাটা শেষ পর্যন্ত কেন্দ্রীভূত হয় রাষ্ট্রের বাহিনীগুলোর থাকা না থাকার প্রশ্নে, সেখানে লড়াইয়ের পথ না দেখানোটা হচ্ছে বিশ্বাসঘাতকতা। কিছু সূর্য সন্তান নিজের স্বার্থকে ত্যাগ করে, জীবন উৎসর্গ করে মানুষকে সেই পথটা দেখিয়ে গেছেন। তাদেরই একজন সিরাজ সিকদার। তার জন্য ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা, অপরিসীম।

  7. চমৎকার। দারুণ একটা পোস্ট।
    চমৎকার। দারুণ একটা পোস্ট। ইতিহাসের টেন্ডার নেওয়া পার্টি দাবী করে যে ৭৫ পরবর্তি সময়ে বিম্পি-জাপার হাতে ইতিহাস বিকৃত হয়েছে। তাই তারা প্রজন্মকে ইতিহাস শেখানোর টেন্ডার নিয়েছে। কিন্তু নিজেরাও যে একই কাজ কিছুটা হলেও করে যাচ্ছে সেই খবর নাই।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

− 2 = 8