বই ও বাঙালী সমাচার

“পৃথিবীর আর সব সভ্য জাত যতই চোখের সংখ্যা বাড়াতে ব্যাস্ত, আমরা ততই আরব্য-উপন্যাসের এক-চোখা দৈত্যের মতো ঘোঁৎ ঘোঁৎ করি আর চোখ বাড়াবার কথা তুললেই চোখ রাঙাই ।”

কথাটা আমার নয়, তবে দুটি চোখ আমাদের প্রত্যেকেরই আছে । তাই দিয়ে আমরা দুনিয়া দেখি বটে, কিন্তু মাছির মতো দুনিয়ার চারপাশ দেখতে পাওয়া হাজারটি চোখ বাঙালীর নেই । মাছির চোখ জন্মগত হলেও মানুষের শারীরিক দুটি চোখের সাথে সাথে মনেরও চোখ থাকে । আর সেই চোখ বাড়ানোর ঔষুধ “বই” বাঙালীর ঘরে – কাল ছিল না, আজও নেই । ফুটপাতে-দোকানে-মেলায় দুটো বই আমরা কিনি বটে, কিন্তু সেটিও বেশীরভাগ ড্রয়িং রুমের শোভা বৃদ্ধির জন্য । দুটিকে দশটি চোখে পরিণত করার নিমিত্তে, কাভি নেহি ।

বাবা-মায়ের কিনে দেয়া অ-আ-ক-খ দিয়ে বাঙালীর ৫-৬ বছরের সন্তানটির হাতে বই যে ওঠে না, তা নয় । সরকারও ফি-বছর শুরুতেই কচি-কাঁচার হাতে নতুন বই তুলে দেয় বিস্তর । কিন্ত দু দিন যেতে না যেতেই সে বই চোখ বাড়ানোর বদলে হয়ে ওঠে ক্লাসে ফার্স্ট হওয়ার একমাত্র হাতিয়ার । তার দুদিন পর থেকে সে বইয়ের যায়গা হয় কাঁধের ঝোলায় । আর হাতে ওঠে বাড়ীর শিক্ষক, কোচিং সেন্টার আর স্কুল-কলেজের স্যারদের নোট । সেই বই একবার ঝোলায় ঢোকার পর আর হাতে ওঠে না । এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়ে উঠেও বাঙালীর সন্তানটি আর বইমুখো হয় না । খুঁজে ফেরে বড়ভাই-স্যারদের নোট । যেগুলো পড়ে মনের চোখ বাড়ার বদলে জন্মগতভাবে পাওয়া দুটি চোখ হয়ে যায় মোটেই একটি !

বাঙালী গতকাল শুধুই বাঙালী ছিল । ভিনদেশী শাসক, সূফী আর মিশনারিদের ভূ-ভারতে আগমনের কল্যাণে বাঙালী আজ “বাঙালী” শব্দের আগে হিন্দু, খ্রিষ্টান, বৌদ্ধ ও মুসলমান লাগিয়ে নিয়ে হিন্দু বাঙালী, খ্রিষ্টান বাঙালী, বৌদ্ধ বাঙালী বা মুসলমান বাঙালী হয়ে উঠেছে । কিন্তু বাঙালীর চোখ দুটি থেকে ক্রমেই একটিতে পরিণত হয়েছে । ক্ষেত্রবিশেষে সেই একটি চোখও হারিয়ে ফেলে অন্ধে পরিণত হয়েছে । বড় অর্থে এই চার প্রকার বাঙালীর মধ্যে বাংলাদেশে আবার মুসলমান বাঙালীরা সংখ্যায় অধিক । তারা নিজেদের যতোটা না বাঙালী/বাংলাদেশী মনে করে, তার চেয়ে শুধু মুসলমান মনে করে হাজারগুণ বেশী ।

শুধু বাঙালী থেকে হিন্দু, খ্রিষ্টান, বৌদ্ধ বা মুসলমান বাঙালী হয়ে ওঠার পর ইংরেজি, আরবি, উর্দু, ফার্সি বা ফরাসীতে তারা মেতেছে বটে; কিন্তু দুটি চোখকে হাজার চোখে পরিণত করতে পারে নি । বরং বাঙালীর যেখানে দুটি শারীরিক চোখ ছিল, সেখানে হিন্দু বা মুসলমান বাঙালী, সেখান থেকে কালক্রমে শুধু হিন্দু বা মুসলমান হয়ে সেই শারীরিক দুটি চোখই হারিয়ে ক্রমশ হয়ে উঠেছে এক একটি অন্ধ দৈত্যে । মুসলমান বাঙালী আবার আরো এককাঠি বাড়া । তারা নিজেদের একমাত্র বই, যেটার প্রথম শিক্ষা হল “পড়” – সেই বইটাও না পড়েই হয়ে যায় বাঙালীত্ব ত্যাগ করা ভিনদেশী আরব মরুভূমির গর্বিত মুসলমান !

মুসলমান বাঙালী পাঠক অবশ্য এসব ছাই-পাশ পড়ে হামেশায় বলে থাকেন, নিজের জ্ঞান জাহির করতে হলে বিস্তর পড়তে হয়; আগে পড়ে এসো, তারপর যতোপারো তত্ত্বকথা ঝেড়ো । যদিও জানি অতি মূল্যবান এই বানী প্রদানকারীরা তাদের নিজেদের পবিত্র বইখানিও কখনো পড়ে দেখেন না । দু একজন পড়লেও জানেন না তাতে কি লেখা, শুধু স্কুল-কলেজে ফার্স্ট হওয়ার মতো শারীরিক চোখদুটি বন্ধ করে মুখস্ত করে যান । ফলে বাঙালীর সন্তানের হাজার চোখ হওয়ার রাস্তাটা শিশুকালেই বন্ধ হয়ে যায় ।

শেষে মুজতবা আলীর মুখেই বলি আরব্য-উপন্যাসের সেই গল্প – যেখানে জ্ঞানঅন্বেষণকারী রাজা, হেকিমের জ্ঞানে ভরপুর বই খানা পাওয়ার জন্য শেষপর্যন্ত তাকে হত্যা করেছিল । আর বইয়ের পাতায় পাতায় লেগে থাকা হেকিমের বিষ আঙুলের সাথে মুখে যাওয়ার দরুন রাজারও মারা যাওয়ার গল্পটি সম্ভবত সব বাঙালীই জানে । আর তাই বাঙালী বই কেনেও না, পড়েও না ।

~সৈয়দ মুজতবা আলীর – “বই কেনা” অবলম্বনে~

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

৩ thoughts on “বই ও বাঙালী সমাচার

  1. চমৎকার। এতো সুখপাঠ্য গদ্য
    চমৎকার। এতো সুখপাঠ্য গদ্য অনেকদিন পড়িনি। :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ:

    আগে বাঙালি টুকটাক যাও বা বই পড়ত, এখন মোবাইল আর কম্প্যুর যুগে তাও শেষ। আজকাল বাঙালির বই প্রীতি শুধুমাত্র একুশের একমাসের মেলার ফ্যাশনে গিয়ে ঠেকেছে।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

93 − 86 =