মার্ক্সবাদী হওনের উপায়

মার্ক্সবাদী কারা? কিভাবে মার্ক্সবাদী হওয়া যায়। এই বিষয়ে বাঙলার মার্ক্সবাদীরা কখনোই একমত হন নাই। বাঙলার বাইরের মার্ক্সবাদীরাও সকলে এই বিষয়ে একমত তা বলার উপায় নাই। তবে বাঙলার মার্ক্সবাদীদের মধ্যে ঐতিহাসিক একটা মিল ছিল যে তারা নিজের পার্টির বাইরে অন্য কোন পার্টির অনুসারীদেরকেই সাচ্চা মার্ক্সবাদী বিবেচনা করতেন না। এইক্ষেত্রে তুলনামুলক বড় অথবা ছোট মার্ক্সবাদী এইরকম বিবেচনার পক্ষপাতিও তারা ছিলেন না। অধিকাংশক্ষেত্রেই ভিন্নমতাবলম্বিদের পুরোদোস্তুর অমার্ক্সবাদী, সংশোধনবাদী, ছদ্ম মার্ক্সবাদী ইত্যাদি বলে খারিজ করার ক্ষেত্রেই তাদের আগ্রহ ছিল। বাংলাদেশের বামপন্থীদের মধ্যে সোভিয়েত বনাম পিকিংপন্থার বিরোধ যখন তুঙ্গে তখন একে অপরকে একেবারে মার্ক্সবাদের শত্রু ও শ্রেণীশত্রু বানিয়ে দিয়েছেন। এই প্রবনতা এখন কমে গেলেও শেষ হয়ে যায় নাই। অনেক সমসাময়িক চিন্তাশীল বামপন্থী তরুনদের মাঝে তত্ত্ব চর্চায় এইরকম শরিয়তি তাত্ত্বিকতার প্রভাব এখনো চোখে পড়ার মতো।

বাঙলার মার্ক্সবাদীরা অনেকেই নিজ নিজ পার্টিকে শ্রমিক শ্রেণীর তথা প্রলেতারিয়েত শ্রেণীর পার্টি বলে দাবি করতে ভালোবাসেন। পাশাপাশি অন্য পার্টিগুলিকে বুর্জোয়া হওয়ার অভিযোগ করে থাকেন। তাদের এই অভিযোগ অনেকাংশেই সত্য। তবে শ্রমিকশ্রেনীর পার্টি হওয়র দাবিখানা সর্বৈব সত্য তা বলা যায় না। বাঙলার মার্ক্সবাদীরা সামাজিক অবস্থান এবং শ্রেণী চরিত্রের দিক থেকে অধিকাংশই বুর্জোয়া। তাদের বড় অংশই মধ্যবিত্ত্ব বিধায় তাদের মধ্যে বুর্জোয়া, পাতি বুর্জোয়া এবং লুটেরা বুর্জোয়া চরিত্র লক্ষ্য করা যায়। পড়ালেখা করা মার্ক্সবাদীদের কেউই শ্রমিক শ্রেণী থেকে উঠে আসেন নাই, মধ্যবিত্ত্বের তাবৎ শ্রেণীচরিত্র সহকারেই তারা মার্ক্সবাদী। বুর্জোয়া হওয়ার অভিযোগে সবচেয়ে বেশি অভিযুক্ত সিপিবি-বাসদ থেকে শুরু করে ছবির হাটে বসে যারা সিপিবি-বাসদের বিরুদ্ধে এই অভিযোগ আনেন, তাদের প্রত্যেকের ক্ষেত্রেই এই কথা সত্য। পাশাপাশি বাংলাদেশে শিল্প বিপ্লবের অভাবহেতু শ্রেণী সচেতন শ্রমিক শ্রেণীর বিকাশ না হওয়ায় শ্রমিক শ্রেণীর পার্টিতে পরিণত হওয়াও তাদের পক্ষে কঠিন হয়েছে। বাংলাদেশে ‘ওয়ার্কিং ক্লাস’ কারা, অথবা প্রলেতারিয়েত কিংবা সর্বহারা কারা সেই প্রশ্নেও তারা মিমাংসা করতে পারে নাই, কারন তেমন কারখানার শ্রমিক অথবা গ্রামের কৃষক এই দুই শ্রেণীর কেউই এখন পর্যন্ত তেমন কোন বিপ্লবের শক্তি হিসাবে আবির্ভুত হওয়ার সম্ভাবনা জাগায় নাই। বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত্ব মার্ক্সবাদীরা মনে করেন প্রলেতারিয়েত শেণীই বিপ্লবে নেতৃত্ব দেবে, কিন্তু বাংলাদেশে মধ্যবিত্ত্বের বাইরে এখনো কোন বিপ্লবী তৈরি হয় নাই, আফসোস।

মার্ক্সবাদীরা মনে করেন যে শ্রেণী সচেতন প্রলেতারিয়েত না থাকলে বিপ্লব সম্ভব না। সাম্যবাদে উত্তরণের আগে প্রলেতারিয়েত একনায়কত্ব কায়েম করতে হবে। বুর্জোয়া শ্রেণীর উপরে প্রলেতারিয়েতের কর্তৃত্ব কায়েম না করা গেলে কমিউনিজম কায়েম করা যাবে না। বুর্জোয়া স্টেট থেকে কমিউনিজমে উত্তরণের মাঝখানে থাকবে এই প্রলেতারিয়েত একনায়কত্ব। প্রলেতারিয়েত স্টেটে শ্রেণীহিন সমাজ কায়েম করে কমিউনজমের রাস্তা পরিস্কার হবে। বাঙলার মার্ক্সবাদীরা প্রায় সকলেই এই বিষয়ে একমত। অবশ্য ‘প্রলেতারিয়েত একনায়কত্ব’ জিনিসটা কেমন হবে, তা নিয়া মার্ক্স বিস্তারিত কিছু বলেন নাই। তার লেখালেখিতে এর আলোচনা যৎসামান্য। কিন্তু রাজনৈতিক প্রয়োজনেই মার্ক্সবাদে এর গুরুত্ব বেড়েছে, কমে নাই। ‘প্রলেতারিয়েত একনায়কত্ব’ কথাটিও মার্ক্সের সৃষ্টি নয়, বরং প্রথম ব্যাবহার করেন মার্ক্সের রাজনৈতিক ও তাত্ত্বিক কলিগ জোসেফ ওয়েইডেমেয়ার। তথাপি প্রলেতারিয়েত একনায়কত্ব মার্ক্সবাদের বিষয়, ওয়েইডেমেয়ারবাদ নামক কোন কিছুর নয়। একিভাবে প্রলেতারিয়েত একনায়কত্ব নামে লেলিন যেমন সোভিয়েত রাশিয়ায় নিজ পার্টির একনায়কত্ব কায়েম করেছিলেন তাকেও খাটি মার্ক্সবাদ বলা যায়। কিন্তু তাতে সমাজের সংখ্যাগরিষ্ঠ শ্রমিক শ্রেণীর ক্ষমতায়ন হয়েছিল কি? পারি কমিউনের ধাচে শ্রমিক শ্রেণীর গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার চেষ্টা হয়েছিল বটে। কিন্তু স্টালিনের আমলে প্রলেতারিয়েত একনায়কত্ব আর স্টালিনের একনায়কত্বে বিশেষ ফারাক করার উপায় ছিল কি না সেই প্রশ্ন তোলা যায়। তবে গণতান্ত্রিক কেন্দ্রীকতার নামে শ্রমিক শ্রেণীর প্রতিনিধিত্বের সুযোগ যে খর্ব হয়েছিল এবং শ্রমিক শ্রেণীর স্বার্থ রক্ষায় তথাকথিত প্রলেতারিয়েত একনায়কত্ব ব্যর্থ হয়েছিল তা একটি ঐতিহাসিক সত্য। ক্রুশ্চেভ ক্ষমতায় এসে খাতা কলমে প্রলেতারিয়েত একনায়কত্ব খতম করেছিলেন। লেলিন কিংবা স্টালিনের প্রলেতারিয়েত একনায়কত্ব সম্বন্ধে এখনকার মার্ক্সবাদীরা অনেক কথা বলতে পারেন বটে, কিন্তু সয়ং কার্ল মার্ক্স কি বলতেন তা সহজে বলার উপায় নাই। কার্ল মার্ক্স প্রলেতারিয়েত একনায়কত্বের রূপ ও চরিত্র নিয়া বিশেষ কিছু লেখেন নাই বটে। তবে উদাহরণ হিসাবে তিনি পারি কমিউনের নাম নিয়ে ছিলেন। প্যারিসে ১৮৭১ সালে পারি কমিউনের শাসন কায়েম হয়। মার্ক্স স্বিকৃত এই প্রলেতারিয়েত একনায়কত্ব টিকে ছিল মাত্র দুই মাস। তারপরই ফরাসি সরকারের হাতে এর পতন হয়।

পারি কমিউনের বছর চল্লিশেক পূর্বে বাঙলার উত্তর ময়মনসিংহ ও শেরপুর অঞ্চলে টিপু পাগলার নেতৃত্বে পাগলপন্থীরা জমিদার ও ব্রিটীশদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে একটি স্বাধীন স্টেট কায়েম করেছিল। টিপুর পিতা ছিলেন করিম শাহ নামের একজন দরবেশ, যিনি চান্দি বিবি নামে একজন ব্রাহ্মন কন্যাকে বিবাহ করেন। করিম শাহের ভক্তদের মধ্যে হিন্দু, মুসলিম, আদিবাসীসহ সমাজের প্রান্তিক শ্রেনীর মানুষেরা ছিলেন যারা মিলেমিশে এক নতুন ধর্ম ও সমাজের পত্তন করেন। এদেরকেই পাগলপন্থী বলা হতো। টিপু পাগলা ও চান্দি বিবির নেতৃত্বে যে স্বাধীন সমাজ তারা গড়ে তোলে তাতে জাত পাতের বালাই ছিল না। আল্লাহর দুনিয়ায় সবাইকে সমান গন্য করা হতো। আল্লাহর জমির উপর সকল মানুষের সমান অধিকার গণ্য করে জমির উপর ব্যক্তিগত অধিকার বাতিল করা হয়। জমিদার ও ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে লড়াই করে পাগলপন্থীদের এই স্বাধীন স্টেট প্রায় দুই বছর টিকে ছিল।

কার্ল মার্ক্স একজন ঐতিহাসিক বস্তুবাদী ছিলেন। তিনি ইউরোপের মানুষ ছিলেন। ইউরোপের ইতিহাসকে, শ্রেণী সংগ্রামকে বস্তুবাদী কায়দায় ব্যাখ্যা করেছেন। আমাদের মার্ক্সবাদী হতে হলে বাঙলার জমিনের উপর দাঁড়িয়েই হতে হবে। এই ভুখন্ডের গণমানুষের সংগ্রামের ইতিহাস না বুঝলে ফায়দা নাই। মার্ক্সবাদী হইতে গেলে মার্ক্সের ভক্তি করতে হবে। কার্ল মার্ক্সের পুরোত হওয়া অথবা হওনের চেষ্টা করা আর মার্ক্সবাদী হওয়া এক কথা নয়। কার্ল মার্ক্স কোন পুরোততন্ত্র তৈরি করে যান নাই। সোভিয়েত রাশিয়ায় তা রাজনৈতিক কারণে তৈরি হয়েছিল। বাঙলায় অরাজনৈতিক কারনে টিকে আছে।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

৮ thoughts on “মার্ক্সবাদী হওনের উপায়

  1. আমাদের মার্ক্সবাদী হতে হলে
    আমাদের মার্ক্সবাদী হতে হলে বাঙলার জমিনের উপর দাঁড়িয়েই হতে হবে।

    কিন্তু পারভেজ ভাই, আপনি যে টিপু পাগলার উদাহরণ দিয়েছিলেন সে সময় তো এ দেশে কোন ক্যাপিটালিজম ছিলো না। মার্কস বলেছেন পুজিবাদে বিকশিত প্রলেতারিয়াত শ্রেণী বিপ্লবের মাধ্যমে সমাজতন্রত আনবে। আমাদের দেশে তো ক্যাপিটালিজনমই এখনো সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌছে নাই। টিপু পাগলারাও আবার ঠিক মার্কসের প্রলেতারিয়েত শ্রেনীতে পড়ে না। তাহলে কি ধরে নেবো আমাদের দেশে মার্কসবাদী হবার সময়ই এখনো আসে নাই?

  2. শিরোনাম হওয়া উচিত ছিল
    শিরোনাম হওয়া উচিত ছিল মার্ক্সবাদি হওনের ১০টা উপায়! এরপর পর পর দশটি উপায় লিখে দিলেই হইত। কালকে বাকি আলোচনা করব।

  3. কতিপয় মার্ক্সবাদীদের হাতে পরে
    কতিপয় মার্ক্সবাদীদের হাতে পরে মার্ক্সবাদ এখন মৌলবাদ হয়ে গেছে। বস্তুবাদী মার্ক্স হয়ে গেছেন আল্লাহ-খোদা, আর তার লেখাগুলো কোরান-হাদিস। ।
    অতএব তার লেখার এক চুলও এদিকসেদিক হতে পারবে না …

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

52 + = 55