রাজনীতি আটকে আছে সংলাপে অথবা সংঘাতে

বাংলাদেশের প্রধান দুইটি রাজনৈতিক দলের নেতা শেখ হাসিনা এবং খালেদা জিয়া। তারা সাধারণত একে অপরের সাথে সরাসরি কথা বলেন না। একে অপরকে তৃতীয় পুরুষে উল্লেখ করে নানা কথা বলেন যা পত্রিকায় ছাপা হয়। তা পাঠ করে একে অপরের বক্তব্য জানতে পারেন। জানার পরে প্রতিউত্তর দেন। এভাবে চলতে থাকে। এইসব কথোপকথন অধিকাংশ সময়েই কুৎসিত ব্যক্তি আক্রমন ও পারস্পরিক কুৎসা রটনার বেশি কিছু হয়ে উঠতে না পারলেও বাংলাদেশের রাজনীতিতে প্রায় সবসময়ই প্রধান খবরের বিষয়। বড় খবর হয় যখন তারা একে অপরের সঙ্গে সরাসরি সংলাপে বসেন অথবা বসার তোরজোর করেন। তাদের সংলাপের দাবিতে সুশিল সমাজের অনেকে বক্তব্য দেন। ব্লগারদেরকেও অনশন করতে দেখা গেছে। এই মুহুর্তে অবশ্য সংলাপের দাবি তুলছেন খালেদা জিয়া ও তার দল বিএনপি, দ্রুত ও নির্দলিয় নির্বাচনের জন্যে। তবে শেখ হাসিনা সংলাপের সম্ভাবনা উড়িয়ে দিয়েছেন। সংলাপ না হলে খালেদা জিয়া ঈদের পরে আন্দোলনে যাবেন বলছেন। এর আগে ২০১২ সালেও ঈদের পরে খালেদা জিয়া আন্দোলন করবেন ঘোষনা দিয়েছিলেন। সেবার সরকার পতনের আন্দোলন করার কথা ছিল। ঈদের পরে তিনি ভারত গমন করেন। ভারত থেকে ফিরে কঠোর আন্দোলনের রাস্তা থেকে সরে আসেন।

সরকার পতনের আন্দোলনে বিএনপি নামলো ২০১৩ সালে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশে এসেও তখন খালেদা জিয়ার দেখা পেলেন না। তবে সেই আন্দোলন বিএনপির জন্যে ফলপ্রসূ হয় নাই। জনগণকে সাথে নিয়ে সরকারবিরোধী আন্দোলন দাঁড় করাতে তারা ব্যর্থ হয়েছিল। আন্দোলনের নামে সহিংসতা এবং ভারত বাদে অন্যান্য বিদেশী শক্তির আনুগ্রহের উপর নির্ভর করে আওয়ামী লীগকে ক্ষমতাচ্যুত করা যায় নাই। বিএনপি বরং প্রধান বিরোধী দলের অবস্থান হাড়িয়েছে। ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের কয়েক মাস আগে থেকে আজ অবধি ঘোষনা মোতাবেক কোন আন্দোলনের কর্মসূচী বাস্তবায়নে দলটি ক্রমাগত ব্যর্থ হয়ে আসছে। এই পরিস্থিতিতে বিএনপি ঈদের পরে সরকার পতনের আন্দোলন ঘোষনা করার অবস্থায় নাই, যদিও তাদের মতে সরকারটি অবৈধ। তাদের ভাষায় এই অবৈধ সরকারের কাছেই তারা এখন নির্বাচন চাইছে, সংলাপ চাইছে। সংলাপ না পেলে নির্বাচনের জন্যে আন্দোলনের কথা বলছে। ঈদের পরে তারা আদৌ কোন আন্দোলন করতে পারবে কি না সেই সন্দেহ আমার মতো অনেকেই করবেন। আবার ঈদের পর খালেদা জিয়া ভারত অথবা চীন সফর করে এসে কঠোর আন্দোলনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগকে ক্ষমতাচ্যুত করে ফেলবেন না সেই কথাও শতভাগ নিশ্চিত করে বলার উপায় নাই।

বাংলাদেশের মসনদের পট পরিবর্তনে জনগণের গুরুত্ব এই মুহুর্তে বাংলাদেশে নাই বলতে গেলেই চলে। ক্ষমতার পট যে কোথা থেকে কিভাবে পরিবর্তন হবে জনগণের কাতারে থেকে তা নিশ্চিত করে বলা তাই সহজ নয়। শেখ হাসিনা নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আছে জনগণের ভোটের উপর ভর করে নয়, বরং বিএনপির জামাত ঘনিষ্ঠ ভুল রাজনীতির সুযোগ নিয়ে প্রথমত ভারত এবং তারপরে বিশ্বের অন্যান্য আন্তর্জাতিক শক্তির আনুগ্রহে। বিএনপি অবৈধ বললেও আন্তর্জাতিক শক্তিগুলো আওয়ামী লীগ সরকারকে বৈধতা দিয়ে দিয়েছে। নির্বাচনের সমালোচনা করলেও আওয়ামী লীগের শাসনকেই তারা স্বিকৃতী দিয়েছে। আর এই বৈধতার জোরেই শেখ হাসিনা এখন সংলাপ ও নির্বাচনের সম্ভাবনা উড়িয়ে দিচ্ছেন।

শেখ হাসিনা সংলাপে যাবেন না। খালেদা জিয়াকে তিনি এখন আর সংলাপের উপযুক্তই ভাবছেন না। স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন যে তিনি এখন আর বাংলদেশের প্রধান বিরোধী দলীয় নেতা নন। খালেদা জিয়া তার বদলে বলছেন যে তিনিই ৯৫ শতাংস জনগণের নেতা, তাই তার সাথেই সংলাপ করতে হবে। তিনি দাবি করেছেন ৫ জানুয়ারীর নির্বাচনে তার আহবানে দেশের ৯৫ শতাংস মানুষ নির্বাচন বর্জন করেছে। সরকারী মতে ৫ জানুয়ারীর নির্বাচনে ৫০ শতাংস ভোটার অংশ নিয়েছে। নির্বাচনে বাংলাদেশের কত শতাংস মানুষ অংশ নিয়েছে সেই বিষয়ে শেখ হাসিনা অথবা খালেদা জিয়ার সাথে তর্কে যাওয়া বিভিন্ন কারণে অনর্থক হবে। তবে খালেদা জিয়ার যা মনে রাখতে হবে তা হলো দেশের ৯৫ শতাংস হউক অথবা ৫০ কিংবা ৭৫ শতাংস, যারা নির্বাচন বর্জন করেছে তারা কিন্তু বিএনপির সরকার হটানোর আন্দোলনে সামিল হয় নাই। আওয়ামী লীগের দমন নিপিড়ন, গুম খুনের শাসনে জনগণ অতিষ্ট হতে পারে, কিন্তু আওয়ামী লীগকে ক্ষমতাচ্যুত করে বিএনপিকে ক্ষমতায় বসানোর জন্যে তারা রাস্তায় নেমে আন্দোলনের নামে সংঘাত করবে না, পুলিশের লাঠি গুলি টিয়ারগ্যাসের সামনেও পরবে না। পচানব্বই শতাংস জনগণ অনেক দূরের বিষয়, এই মুহুর্তে নিজ দলের নেতা কর্মীদের মাঠে নামানোও বিএনপির জন্যে একটি বড় চ্যালেঞ্জ হবে।

এই চ্যালেঞ্জের বিষয়ে খালেদা জিয়া একেবারেই অবগত নাই তা মনে হয় না। এবং মুখে জনগণের নেতা হওয়ার দাবি করলেও তিনি বিদেশী শক্তিগুলোর আনুগ্রহ পেতেই অধিক সচেষ্ট হবেন বলে মনে হয়। তাই এবারো ঈদের পরে তিনি আন্দোলনের বদলে বিদেশ সফরে গেলে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না।
২০১৩তে কংগ্রেস সরকারের সাথে বেজার মুখ করে থাকলেও বিজেপির মোদিকে তুষ্ট করতে খালেদা জিয়া ও বিএনপির প্রচেষ্টা সাম্প্রতিক সময়ে চোখে পরার মতোই ছিল। কংগ্রেসের বন্ধু আওয়ামী লীগকে মোদি বন্দনায় পরাজিত করতে পারলেই ক্ষমতার দৌড়ে এগিয়ে যাওয়া যাবে এই ভাবনার কারণেই হয়তো ইসলামপন্থীদের বন্ধু থেকে তারা কট্টর হিন্দুত্ববাদীদের তোষামোদকারীতে পরিণত হতে পিছপা হয় নাই। কিন্তু শুধু ভারতের আনুগত্য করেই ক্ষমতায় যাওয়া যাবে কি? কয়েক বছর আগেও যখন দক্ষিন এশিয়ায় দিল্লী এবং ওয়াশিংটনের রাজনীতি এক ও অভিন্ন ছিল, এবং দিল্লীর রাজনীতিই ওয়াশিংটনের রাজনীতি ছিল তখনকার কথা ভিন্ন ছিল। এখন পরিস্থিতি ভিন্ন। এখন দিল্লী, ওয়াশিংটন, পিকিং, মস্কো সবাইকে আলাদা আলদাভাবে খুশি করেই ক্ষমতায় টিকে থাকতে হবে অথবা ক্ষমতায় যেতে হবে। জাতীয় স্বার্থ জলাঞ্জলি দিয়ে বিদেশী পরাশক্তিগুলোর স্বার্থ রক্ষা করে ক্ষমতায় টিকে থাকার দৌড়ে আপাতত আওয়ামী লীগই এগিয়ে আছে। এই দৌড়ে বিএনপি আওয়ামী লীগকে অতিক্রম করে যেতে পারবে কি না তা হলো প্রশ্ন। বিএনপির ইচ্ছার কোন কমতি নাই।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এখন আর দুনিয়ার একক পরাশক্তি নাই এই বিষয়ে অনেকেই অবগত আছেন। বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থের হিসাবে এটা খুবি গুরুত্বপূর্ণ একটা খবর। দুনিয়ার উঠতি দুই পরাশক্তি ভারত এবং চীন বাংলাদেশের প্রতিবেশী এবং পরস্পরের প্রতিদ্বন্দী। গ্লোবাল পুঁজির স্বার্থে এই দুই বৃহত অর্থনৈতিক পরাশক্তির কারো সাথেই একক গাটছাড়া বাধা এখন আর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে সম্ভব নয়। বাংলাদেশ বিষয়ে তাই ভারতের পলিসিই এখন আর যুক্তরাষ্ট্রের পলিসি নয়। ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের ভিন্ন ভিন্ন অবস্থানে তা আরো পরিস্কার হয়েছিল। দক্ষিন এশিয়া ও বঙ্গপোসাগর যা যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান রাজনৈতিক হিসাব নিকাশে এশিয়া পেসিফিকের অংশ তাতে যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি নিজের পলিসি অনুযায়ী হাজির থাকতে আগ্রহি, সেই সুবাদে ভারত এবং চীনের বাইরে অন্যান্য ছোট রাষ্ট্রগুলোর সাথে সরাসরি সম্পর্ক তৈরিতেও তারা উদ্যোগী। বাংলাদেশের ভূ রাজনৈতিক অবস্থানের কারনে যুক্তরাষ্ট্রের এই আলাদা আগ্রহ এবং উত্তর পূর্ব ভারতবর্ষে চীন বনাম ভারত ইউনিয়নের প্রতিদ্বন্দী অবস্থানের শতভাগ সুবিধা বাংলাদেশ আদায় করে নিতে পারতো যদি আমাদের প্রধান দুইটি রাজনৈতিক দল দলীয় স্বার্থের উপরে জাতীয় স্বার্থকে অবস্থান দিতো। বিদেশী শক্তির আনুগত্য নয় বরং তাদের সাথে পারস্পরিক স্বার্থ রক্ষার সম্পর্ক গড়ে তুলেই বাংলাদেশ মাথা তুলে দাঁড়াতে পারতো। কিন্তু তার বদলে আমাদের রাজনীতি আটকে আছে সংলাপে অথবা সংঘাতে। সেই সুযোগে বিদেশী শক্তিগুলোর নিয়ন্ত্রন বাংলাদেশের উপর ক্রমেই বাড়ছে। বদলে বাংলাদেশ তেমন কিছু পাচ্ছে তা বলার উপায় নাই। কে ক্ষমতায় থাকবে আর কে থাকবেনা তা নির্ধারিত হচ্ছে মাত্র।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

৫ thoughts on “রাজনীতি আটকে আছে সংলাপে অথবা সংঘাতে

  1. সেই সুযোগে বিদেশী শক্তিগুলোর

    সেই সুযোগে বিদেশী শক্তিগুলোর নিয়ন্ত্রন বাংলাদেশের উপর ক্রমেই বাড়ছে। বদলে বাংলাদেশ তেমন কিছু পাচ্ছে তা বলার উপায় নাই।

    ক্ষমতায় থাকতে হলে তো বিদেশী প্রভুদের খুশি রাখতেই হবে! ণিজের দেশকে জিম্মি রেখে হলেও!

  2. ২০১৩তে কংগ্রেস সরকারের সাথে

    ২০১৩তে কংগ্রেস সরকারের সাথে বেজার মুখ করে থাকলেও বিজেপির মোদিকে তুষ্ট করতে খালেদা জিয়া ও বিএনপির প্রচেষ্টা সাম্প্রতিক সময়ে চোখে পরার মতোই ছিল। কংগ্রেসের বন্ধু আওয়ামী লীগকে মোদি বন্দনায় পরাজিত করতে পারলেই ক্ষমতার দৌড়ে এগিয়ে যাওয়া যাবে এই ভাবনার কারণেই হয়তো ইসলামপন্থীদের বন্ধু থেকে তারা কট্টর হিন্দুত্ববাদীদের তোষামোদকারীতে পরিণত হতে পিছপা হয় নাই। কিন্তু শুধু ভারতের আনুগত্য করেই ক্ষমতায় যাওয়া যাবে কি? কয়েক বছর আগেও যখন দক্ষিন এশিয়ায় দিল্লী এবং ওয়াশিংটনের রাজনীতি এক ও অভিন্ন ছিল, এবং দিল্লীর রাজনীতিই ওয়াশিংটনের রাজনীতি ছিল তখনকার কথা ভিন্ন ছিল। এখন পরিস্থিতি ভিন্ন। এখন দিল্লী, ওয়াশিংটন, পিকিং, মস্কো সবাইকে আলাদা আলদাভাবে খুশি করেই ক্ষমতায় টিকে থাকতে হবে অথবা ক্ষমতায় যেতে হবে। জাতীয় স্বার্থ জলাঞ্জলি দিয়ে বিদেশী পরাশক্তিগুলোর স্বার্থ রক্ষা করে ক্ষমতায় টিকে থাকার দৌড়ে আপাতত আওয়ামী লীগই এগিয়ে আছে। এই দৌড়ে বিএনপি আওয়ামী লীগকে অতিক্রম করে যেতে পারবে কি না তা হলো প্রশ্ন। বিএনপির ইচ্ছার কোন কমতি নাই।

    এই নোংরা প্রতিযোগীতা আমাদেরকে কতটুকু নিচে নামাচ্ছে সেটা একবার ভেবেছেন? এই দুই দল বিশ্বের কাছে আমাদেরকে বিঁচিহীন নপুংসক জাতিতে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছে। যদিও দেশ স্বাধীনের পর থেকে এই অসুস্থ প্রতিযোগীতা সব সময়ই ছিল।

  3. বিম্পি আম্লীগ ছাড়া দেশের
    বিম্পি আম্লীগ ছাড়া দেশের জনগণের আর বিকল্প কোনো রাস্তা নেই। তৃতীয় শক্তি, বিকল্প ধারা, অমুক তমুক… ইত্যাকার বুলি কপচিয়ে কোনো লাভ হয়নি, হবেও না। এই দু’টো দল এবং ১৬ কোটি দলকানা মানুষের কারনেই আমাদের অবস্থার কোনো পরিবর্তন হবে না। লাউয়ের অপর নাম কদু, এটা মেনে নেয়াই যেন আমাদের নিয়তি হয়ে গেছে।

    1. এই দু’টো দল এবং ১৬ কোটি

      এই দু’টো দল এবং ১৬ কোটি দলকানা মানুষের কারনেই আমাদের অবস্থার কোনো পরিবর্তন হবে না। লাউয়ের অপর নাম কদু, এটা মেনে নেয়াই যেন আমাদের নিয়তি হয়ে গেছে।

      আগে নিজে দলকানাগিরিমুক্ত হ্ননা কেন রে ভাই? নষ্ট আর অসভ্য রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি অন্তত নিজের অনাস্থা প্রকাশ করুন না আগে!

      1. দলকানার সংজ্ঞাটা একটু বলেন।
        দলকানার সংজ্ঞাটা একটু বলেন। মুখস্ত করা বুলি দিয়া ক’দিন চলবেন?
        ১৬ কোটি মানুষ যদি সমর্থন না দেয়, তাহলে ঘুরেফিরে এই ক’টা দলই বারবার আসবে কেনো? নিজেকে কি ঝাঁকের বাইরের কই মনে করেন নাকি?

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

83 + = 89