থিওরি অফ স্পেশাল রিলেটিভিটির গোঁড়ার কথা………

‘আচ্ছা, আমি যদি একটা আয়না নিয়ে আলোর গতিতে সা সা করে ছুটতে থাকি, তবে কি আয়নায় আমার কোন ছায়া পড়বে?’

আপেক্ষিকতার তত্ত্ব উদ্ভাবনের
পেছনে রয়েছে আইনস্টাইনের অসাধারণ কিছু মানসপরীক্ষা (Thought Experiment) । ‘অসাধারণ’ শব্দটি লিখলাম বটে, কিন্তু বর্ণনা শুনলে মনে হবে এ তো খুবই সাধারণ। এতোই সাধারণ, যে কারো মাথায়ই হয়ত আসবে না যে,
এগুলো কোন চিন্তার বিষয় হতে পারে।
আইনস্টাইনের অসাধারণত্ব ওখানেই। সাধারণ আর হাল্কা বিষয় নিয়ে চিন্তা করতে করতে অসাধারণ
সমস্ত জটিল সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারতেন। সেই
সতের বছর বয়সে হঠাৎ করেই একদিন আইনস্টাইনের
মাথায় এসেছিলো উপরের অদ্ভুতুরে প্রশ্নটি ……


‘আচ্ছা, আমি যদি একটা আয়না নিয়ে আলোর গতিতে সা সা করে ছুটতে থাকি, তবে কি আয়নায় আমার কোন ছায়া পড়বে?’

আপেক্ষিকতার তত্ত্ব উদ্ভাবনের
পেছনে রয়েছে আইনস্টাইনের অসাধারণ কিছু মানসপরীক্ষা (Thought Experiment) । ‘অসাধারণ’ শব্দটি লিখলাম বটে, কিন্তু বর্ণনা শুনলে মনে হবে এ তো খুবই সাধারণ। এতোই সাধারণ, যে কারো মাথায়ই হয়ত আসবে না যে,
এগুলো কোন চিন্তার বিষয় হতে পারে।
আইনস্টাইনের অসাধারণত্ব ওখানেই। সাধারণ আর হাল্কা বিষয় নিয়ে চিন্তা করতে করতে অসাধারণ
সমস্ত জটিল সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারতেন। সেই
সতের বছর বয়সে হঠাৎ করেই একদিন আইনস্টাইনের
মাথায় এসেছিলো উপরের অদ্ভুতুরে প্রশ্নটি ……

প্রশ্নটা শুনতে সাধারণ মনে হলেও এর আবেদন কিন্তু সুদূরপ্রসারী। এই প্রশ্নটি সমাধানের মধ্যেই আসলে লুকিয়ে ছিল আপেক্ষিকতার বিশেষতত্ত্ব (Special Theory of Relativity) সমাধানের বীজ। আলোর গতিতে চললে আয়নায় কি ছায়া পড়ার কথা? আমাদের প্রাত্যহিক যে অভিজ্ঞতা, তার নিরিখে বলতে গেলে বলতে হয় পড়বে না। কেন?

কারণটা সোজা। গ্যালিলিও-নিউটনেরা বস্তুর
মধ্যকার আপেক্ষিক গতির যে নিয়মকানুন
শিখিয়ে দিয়েছিলেন, তা থেকে বুঝতে পারি আলোর
সমান সমান বেগে পাল্লা দিয়ে চলতে থাকলে আইনস্টাইনের
সাপেক্ষে আলোকে তো এক্কেবারে গতিহীন
মনে হবার কথা। ফলে আলোর
তো আইনস্টাইনকে ডিঙ্গিয়ে আয়নায়
ঠিকরে পড়ে আবার আইনস্টাইনের চোখে পড়বার
কথা নয়। তাহলে ওই পরিস্থিতিতে আইনস্টাইন
কিন্তু নিজের ছায়া আয়নায় দেখতে পাবেন না।
আরো সোজাসুজি বললে বলা যায়, আয়না মুখের
সামনে ধরে যদি আলোর বেগের সমান
বেগে দৌড়ুতে থাকেন, তবে আইনস্টাইন দেখবেন
যে আয়না থেকে আইনস্টানের প্রতিবিম্ব রীতিমত
‘ভ্যানিশ’ হয়ে গেছে। কিন্তু তাই যদি হয় এই
ব্যাপারটা জন্ম দিবে আরেক সমস্যার। এতোদিন
ধরে গ্যালিলিও যে ‘প্রিন্সিপাল অব রিলেটিভিটি’
নামের সার্বজনীন এক নিয়ম আমাদের
শিখিয়েছিলেন, সেটা তো আর কাজ করবে না।
গ্যালিলিওর এই আপেক্ষিকতার নিয়মটা আগে একটু
একটু বোঝার চেষ্টা করা যাক। এই
যে আমরা পৃথিবী নামের গ্রহের কাঁধে সওয়ার
হয়ে সূর্যের চারিদিকে সেকেন্ডে ১৬ মাইল
বেগে অবিরাম ঘুরে চলেছি, তা আমরা কখনো টের
পাই না কেন? কারণ আমাদের অবস্থান তো পৃথিবীর
বাইরে নয়। পৃথিবী আমাদেরকে সাথে নিয়েই
প্রতিনিয়ত লাট্টুর মত ঘুরে চলেছে। কাজেই
আমাদের সাপেক্ষে পৃথিবীর আপেক্ষিক
গতি তো সবসময়ই স্রেফ শূন্যই থাকে। সেজন্যই
আমরা পৃথিবীর গতিকে কখনো উপলব্ধি করি না।
ঠিক একই ধরনের অভিজ্ঞতা হয় আমাদের যখন
আমরা স্টিমারে, লঞ্চে কিংবা জাহাজে করে নদী কিংবা সমুদ্র
পাড়ি দেই। অনেক সময় আমরা ডেকের
ভিতরে থেকে বুঝতেই পারি না লঞ্চ
বা জাহাজটা চলছে কিনা। কেবল মাত্র বাইরের
দিকে তাকিয়ে যখন দেখি তীরের
গাছপালা বাড়িঘরগুলো সব পেছনের
দিকে চলে যাচ্ছে, তখনই কেবল বুঝি যে আমাদের
জাহাজটা আসলে সামনের দিকে এগুচ্ছে। পৃথিবীর
ঘূর্ণনের ক্ষেত্রেও ঠিক তাই। কেবল আকাশের
দিকে তাকিয়ে আমরা যখন সূয্যি মামাকে পূব
থেকে পশ্চিমে চলে যেতে দেখি, তখনই
আমরা কেবল বুঝি যে আমাদের পৃথিবীটা হয়ত
আমাদেরকে সাথে নিয়ে পশ্চিম থেকে পূবে পাক
খেয়ে চলেছে। এই বিভ্রান্তিটাই কিন্তু
গ্যালিলিওর ‘প্রিন্সিপাল অব রিলেটিভিটি’র
মূলকথা। গ্যালিলিও বলেছিলেন যে, কেউ
যদি সমবেগে ভ্রমণ করতে থাকে (ধরুণ
জাহাজে করে) তবে তার (জাহাজের ডেকের
ভিতরে বসে) কোন ভাবেই বুঝবার বা বলবার উপায়
নেই যে সে এগুচ্ছে, পিছাচ্ছে নাকি স্থির
হয়ে দাড়িয়ে আছে। কিন্তু তাই যদি হয়,
তবে জাহাজটি যদি আলোর বেগে চলে তবে তো এই
সার্বজনীন ব্যাপারটি খাটবে না। জাহাজের
ডেকে বসে স্রেফ আয়নার দিকে তাকিয়েই কিন্তু
জাহাজযাত্রীবুঝে যাবেন যে তার জাহাজটি চলছে,
কারণ তিনি তার
প্রতিবিম্বকে আয়না থেকে ‘ভ্যানিশ’
হয়ে যেতে দেখবেন।

তাহলে? তাহলে আর কিছুই নয় – আইনস্টাইন বুঝলেন,
হয় গ্যালিলিওর প্রিন্সিপাল অব রিলেটিভিটি ভুল,
আর নয়ত আইনস্টাইনের মানসপরীক্ষার মধ্যেই
কোথাও গলদ রয়ে গেছে। অবশ্যই সতেরো বছর
বয়সে এই ধাঁধার কোন সমাধান পাননি আইনস্টাইন,
কিন্তু এ নিয়ে অনবরত চিন্তা করেই গেছেন।

সমাধান পেয়েছেন শেষ পর্যন্ত সুইস পেটেন্ট
অফিসে চাকরী শুরু করার মাস খানেকের মধ্যে।
আইনস্টাইন বুঝলেন যে, গ্যালিলিওর প্রিন্সিপাল
অব রিলেটিভিটির মধ্যে কোন ভুল নেই।
আয়না থেকে ছায়া ভ্যানিশ
হওয়া ঠেকাতে হলে আলোর গতির ব্যাপারটিকে একটু
ভিন্নরকম ভাবে ভাবতে হবে; আর দশটা সাধারণ
বস্তু কণার বেগের মত করে ভাবলে চলবে না।
আইনস্টাইন বললেন, ‘আলোর বেগ তার উৎস
বা পর্যবেক্ষকের গতির উপর কখনই নির্ভর করে না;
এটি সব সময়ই ধ্রুবক।’ ব্যাপারটা খুবই অদ্ভুত। মন
মানতে চায় না; কারণ এই ব্যাপারটি বস্তুর বেগ
সংক্রান্ত আমাদের সাধারণ পর্যবেক্ষণের
একেবারেই বিরোধী। যেমন ধরা যাক,
আপনি একটি রাস্তায় ৪০ কি.মি বেগে গাড়ী চালাচ্ছেন। আপনার বন্ধু ঠিক বিপরীত দিক থেকে আরেকটি গাড়ী নিয়ে ৪০ কি.মি বেগে আপনার দিকে ধেয়ে এল। আপনার
কাছে কিন্তু মনে হবে আপনার বন্ধু আপনার
দিকে ছুটে আসছে দ্বিগুন (৪০ + ৪০ = ৮০ কি.মি)
বেগে। আলোর ক্ষেত্রে ব্যাপারটা অন্যরকম।
ধরা যাক, একজন পর্যবেক্ষক সেকেন্ডে ১ লক্ষ ৫০
হাজার কিলোমিটার বেগে আলোর উৎসের
দিকে ছুটে চলেছে। আর উৎস
থেকে আলো ছড়াচ্ছে তার নিজস্ব বেগে – অর্থাৎ
সেকেন্ডে প্রায় ৩ লক্ষ কিলোমিটারে। এখন
কথা হচ্ছে পর্যবেক্ষকের কাছে আলোর বেগ কত
বলে মনে হওয়া উচিৎ? আগের উদাহরণ
থেকে পাওয়া অভিজ্ঞতা বলে – সেকেন্ডে (১ লক্ষ
৫০ হাজার + ৩ লক্ষ =) ৪ লক্ষ ৫০ হাজার
কিলোমিটার। আসলে কিন্তু তা হবে না। পর্যবেক্ষক
আলোকে সেকেন্ডে ৩ লক্ষ কিলোমিটার বেগেই তার
দিকে আসতে দেখবে।
ব্যাপারটা ব্যতিক্রমী সন্দেহ নেই, কিন্তু এ
ব্যাপারটা না মানলে গ্যালিলিওর ‘প্রিন্সিপাল
অব রিলেটিভিটি’র কোন অর্থ থাকে না।
আইনস্টাইন তার তত্ত্বের সাহায্যে আরো দেখালেন,
যদি কোন বস্তু কণার বেগ বাড়তে বাড়তে আলোর
গতিবেগের কাছাকাছি চলে আসে, বস্তুটির ভর
বেড়ে যাবে (mass increase) নাটকীয় ভাবে,
দৈর্ঘ্য সঙ্কুচিত হয়ে যাবে (length contraction)
এবং সময় ধীরে চলবে (time dialation)। সময়ের
ব্যাপারটা সত্যই অদ্ভুত। বিজ্ঞানী-
অবিজ্ঞানী বির্বিশেষে সবাই সময়
ব্যাপারটিকে এতদিন একটা ‘পরম’ (absolute) কোন
ধারণা হিসেবে মেনে নিয়েছিলেন; সময়
ব্যাপারটা রাম-শ্যাম-যদু-মধু সবার জন্যই
ছিলো সমান, যেন মহাবিশ্বের কোথাও
লুকিয়ে থাকা একটি পরম ঘড়ি অবিরাম মহাজাগতিক
হৃৎস্পন্দনের তালে তালে স্পন্দিত হয়ে চলছে, টিক্,
টিক্, টিক্, টিক্… … যার
সাথে তুলনা করে পার্থিব ঘড়িগুলোর সময় নির্ধারণ
করা হয়। কাজেই সময়ের ব্যাপারটা আক্ষরিক
আর্থেই ছিল পরম, কোন ব্যক্তিবিশেষের উপর
কোনভাবেই নির্ভরশীল নয়। কিন্তু আইনস্টাইন
রঙ্গমঞ্চে হাজির হয়ে বললেন, সময়
ব্যাপারটা কোন ভাবেই ‘পরম’ নয়, বরং আপেক্ষিক।
আর সময়ের দৈর্ঘ্য মাপার আইনস্টাইনীয়
স্কেলটা লোহার নয়, যেন রাবারের – ইচ্ছে করলেই
টেনে লম্বা কিংবা খাটো করে ফেলা যায়! রামের
কাছে সময়ের যে দৈর্ঘ্য তা রহিমের কাছে সমান
মনে নাও হতে পারে। বিশেষতঃ রাম
যদি দ্রুতগতিতে চলতে থাকে, রহিমের তুলনায়
রামের ঘড়ি কিন্তু আস্তে চলবে! আরেকটা জিনিস
বেরিয়ে আসল আইনস্টাইনের তত্ত্ব থেকে। শূন্য
পথে আলোর যা গতিবেগ, কোন বস্তুর গতিবেগ
যদি তার সমান বা বেশী হয়,
তবে সমীকরণগুলো নিরর্থক হয়ে পড়ে। এ
থেকে একটা সিদ্ধান্ত করা হয়েছে – কোন পদার্থই
আলোর সমান গতিবেগ অর্জন করতে পারবে না। সেই
থেকে মহাবিশ্বের গতির সীমা নির্ধারিত হয় আলোর বেগ দিয়ে।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

৪ thoughts on “থিওরি অফ স্পেশাল রিলেটিভিটির গোঁড়ার কথা………

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

− 1 = 1