ওসমান পরিবার গুম, খুঁজে পাচ্ছে না বিটিআরসি!

সারা দেশে যে হারে গুম নিখোঁজ হচ্ছে, তার মধ্যে ওসমান পরিবারের কাউকে খুঁজে পাওয়া না গেলে আতংকিত হতেই হয়। নারায়নগঞ্জের গডফাদার ওসমান পরিবারের কাউকেই খুঁজে পাচ্ছে না বিটিআরসি। অথচ প্রায় শামীম ওসমানকে দেখা যায় টিভি-টকশোতে বড় বড় কথা বলছেন। জাতিকে সকাল বিকাল শোনাচ্ছেন নীতিকথা। কেনইবা শোনাবেন না, স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী ওসমান পরিবারের জিম্মাদার। শামীম ওসমান যে ১৬ কোটি মানুষের ওপর ওসমান পরিবারের জন্য বিশেষ সারচার্জ আরোপ করেননি, এটাই আমাদের জন্য সুসংবাদ। এর মধ্যে যদি ওসমান পরিবারের কাউকে খুঁজে না পাওয়া গেলে সেটা হয়ে যায় বিশেষ সংবাদ। সেই বিশেষ সংবাদটা হলো, শামীম ওসমান পরিবারের প্রতিষ্ঠান ‘কে’ টেলিকম’কে (Kay Telecommunication Ltd.) খুঁজে পাচ্ছে না বিটিআরসি। তাদের কাছে সরকারের পাওনা ১’শ কোটি টাকা।

টাকা পরিশোধে শামীম ওসমান অনিহা প্রকাশ করায় এবং তার পরিবারের সদস্যদের খুজে না পাওয়ায় বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) বিজ্ঞপ্তি দিয়েছে, যে ‘কে’ টেলিকমকে খুজে পাওয়া যাচ্ছে না।

বিটিআরসির ১’শ কোটি টাকা গায়েব করে দিয়ে শূন্যে মিলিয়ে গেছে নারায়ণগঞ্জের গড ফাদার ওসমান পরিবারের মালিকানাধীন একটি ইন্টারন্যাশনাল গেটওয়ে (আইজিডব্লিউ) অপারেটর ‘কে টেলিকমিউনিকেশন লিমিটেড’। শুধু বিটিআরসিরই নয় গ্রামীণ ফোনের প্রায় ৯৫ কোটি টাকাও গায়েব করে দিয়েছে মহাশক্তিধর ওসমান পরিবারের ‘কে টেলিকমিউনিকেশন লিঃ’। এ প্রতিষ্ঠানটি যে ঠিকানায় বিটিআরসির কাছ থেকে লাইসেন্স নিয়েছিলো সেই মহাখালির ঠিকানায় গিয়ে কোন কিছু পাওয়া যায়নি। গরু খোঁজা খুঁজে বিটিআরসি যখন ব্যর্থ হয়েছে তখন তাদের ওয়েব সাইটে একটি গণবিজ্ঞপ্তি লটকিয়ে দিয়েছে গত ২০ মে। বিজ্ঞপ্তিখানা এখনো ঝুলসে সেখানে। বিজ্ঞপ্তি ওয়েব সাইটে লটকানোর পর বিটিআরসি ওইদিনই বনানী থানায় একখানা ফৌজদারী মামলাও দায়ের করেছেন চিটিং করার জন্য ৪২০ ও ৪০৬ ধারায়।


‘কে টেলিকমিউনিকেশন লিমিটেড’কে BTRC এর নোটিশ

অপারেশন ‘কে টেলিকমিউনিকেশন’ :
শামীম ওসমান কামেল লোক, তিনি জানেন কিভাবে সব কিছু গায়েব করে দিতে হয়। সে কারণে সরকারের কাছ থেকে তিনি একটি আইজিডব্লিউ লাইসেন্স নেন ফাওয়ের ওপরে। তবে নিজের নামে না নিয়ে তিনি এই লিমিটেড কোম্পানিটির পরিচালক বানান তার স্ত্রী সেলিমা ওসমান, ছেলে ইমতিয়ান ওসমান, শ্যালক তানভির আহমেদ ও শামীম ওসমানের ঘনিষ্ঠ বন্ধু কিথ কনসার্নের মালিক জয়নাল আবেদীন মোল্লাকে।

পাঠকের সুবিধার্থে একটু বলে রাখি, বিদেশ থেকে যত কল আসবে এবং বিদেশে যত কল যাবে তার ভাগ পায় টেলিফোন অপারেটর প্রতিষ্ঠান, এরপর বিটিআরসি, আছে আইসিএক্স ও একভাগ পাবে আইজিডব্লিউ। এখন ওসমান পরিবারের কে টেলিকমিউনিকেশন নামের আইজিডব্লিউ কোম্পানিটি বিটিআরসির ভাগের ৯৩ কোটি ২৮ লাখ টাকা না দিয়ে গায়েব করে দিয়েছে। এ টাকার মধ্যে রয়েছে বৈদেশিক কল আদান প্রদান থেকে রাজস্ব বাবদ ৮৫ কোটি ৭৮ লাখ এবং নিবন্ধন নবায়ন বাবদ আরও সাড়ে সাত কোটি টাকা। এই বিপুল পরিমান টাকা গায়েব করে সহীহভাবে হজম করার সুবিধার্থে একজন অচেনা মানুষের নামে জয়েন্ট স্টক এক্সচেঞ্জে কোম্পানির সকল শেয়ার ট্রান্সফার করে দিয়েছে। এখন সকল পাওনাদার এসে যদি শামীম ওসমানের কাছে দাবী করেন ১০০ কোটি টাকা পাওনা হিসাবে; তিনি বলবেন, ঐ প্রতিষ্ঠান এখন আর আমার নেই। আমি বেঁচে দিয়েছি। ট্যাকা টুকা যদি পান তাইলে তারে ধরেন!

বিটিআরসি সূত্র নিশ্চিত করেছে যে, নিয়ম অনুযায়ী এক মিনিট আন্তর্জাতিক কল আসার সঙ্গে তিন সেন্ট করে দেশে আসে। তার মানে হলো এক মিনিট কল যদি কেউ আমেরিকা, ইউরোপ কিংবা সৌদি আরব থেকে বাংলাদেশে করে তাহলে ৩ সেন্ট পরিমান অর্থ (১০০ সেন্ট সমান ১ ডলার, ১ ডলার সমান ৮০ টাকা) বাংলাদেশে আসে। ৩ সেন্ট থেকে নিয়ম অনুযায়ী ৫১.৭৫ শতাংশ অর্থ দিতে হবে সরকারকে। এরপর থাকে ৪৮.২৫ শতাংশ। এ থেকে টেলিফোন অপারেটররা ২০ শতাংশ, আইসিএক্স বা ইন্টার কানেকশন এক্সচেঞ্জ ১৫ শতাংশ এবং ১৩.২৫ শতাংশ পাওনা হয় আইজিডাব্লিউ অপারেটরদের। ‘কে টেলিকমিউনিকেশন’ শুধু বিটিআরসিরই নয়, টেলিফোন অপারেটর কোম্পানির টাকাও মেরে দিয়েছে। ওসমান পরিবারের এ প্রতিষ্ঠানটির কাছে শুধু গ্রামীণ ফোনই পাবে প্রায় ৯৫ কোটি টাকা।

বিটিআরসির এখন আর কি করবে? ওসমান পরিবারের এই দেনা থেকে রক্ষা করার জন্য তাদের ওয়বসাইটে একটি বিজ্ঞপ্তি দিয়েছে। বিজ্ঞপ্তিতে তারা বলছেন, বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রন কমিশন হতে আইজিডব্লিউ লাইসেন্সপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান ‘কে টেলিকমিউনিকেশন লিমিটেড’, রেজিষ্ট্রার্ড ঠিকানা- ৬২, ওয়াটার ওয়ার্ক্স রোড, গোদনাইল নারায়ণগঞ্জ এবং অপারেশনাল ঠিকানা ১৭ মহাখালী ( ১৬ তম ফ্লোর), আরসিসি টাওয়ার, ঢাকা-কে আইজিডবিউ লাইসেন্সের শর্ত ভঙ্গ করে বকেয়া রাজস্ব পরিশোধ না করায় আইজিডব্লিউ লাইসেন্স কেন বাতিল করা হবে না -এই মর্মে ৩০ দিনের সময় দিয়ে গত ৬ জানুয়ারি কমিশন হতে একটি কারণ দর্শানো নোটিশ জারি করা হয়েছে। বিটিআরসির কাছ থেকে লাইসেন্স নেওয়ার সময় ওসমান পরিবার যে ঠিকানা দিয়েছিলেন সেই ঠিকানায় বিটিআরসির লোকজন গিয়ে এরকম কোন প্রতিষ্ঠানের টিকিটিও খুঁজে পান নি।

সার্কাসের নাম মামলা :
সার্কাসে সব শেষে হাতির খেলা দেখানো হয়। কারণ এ দেশের সার্কাসে মরাহাতি দেখে খানিকটা আনন্দ পায় মানুষ এবং সেটাই সার্কাসের মুল বিনোদন । সার্কাসের বাকি অংশে আসলেই কিছু হয় না। এ কারণে গ্রামগঞ্জে এখনো মানুষ বলে, সব শেষে হাতির খেলা! এ কথার অর্থ হলো সব শেষে যদি কিছু একটা থাকে।

বিটিআরসিরও হাতির খেলার নাম বনানী থানায় একটি মামলা। যে মামলা করা হয়েছে কে টেলিকমিউনিকেশন লিমিটেডের বিরুদ্ধে। কিন্তু মামলায় প্রতিষ্ঠানের কারোর নাম উল্লেখ করা হয়নি। ভাবটা এমন যে, প্রতিষ্ঠানটি জ্বীন ভুতে চালাতো। তবে এতো কিছুর পরও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রাণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী লতিফ সিদ্দিকীর অধিনে থাকা টেলিকমিউনিকেশন মন্ত্রণালয় ‘কে টেলিকমিউনিকেশন লিমিটেড’র লাইসেন্স বাতিলের অনুমতি দেয়নি বিটিআরসিকে। কারণ, যদি কোন ফুটো ভবিষ্যতে পায়, তাহলে সেই ফুটো গলে আবার যদি ১’শ কোটি গায়েব করে দেওয়া যায়, তাতে মন্দ কি? এ কারণেই এই সুব্যবস্থা।

ডিজিটাল সরকারের ডিজটাল চোর :
সরকারের সব গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী এমপি ভিওআইপি ব্যবসা করছেন। অনেকে মনে করেন, ভিওআইপি ব্যবসার সাথে খোদ প্রধানমন্ত্রীর পুত্র ও প্রধানমন্ত্রীর আইসিটি উপদেষ্টা সজিব ওয়াজেদ জয় যুক্ত রয়েছেন। ভিওআইপি ব্যবসার সঙ্গে কে যুক্ত নাই? আগে বিটিআরসির মাঝে আইজিডব্লিউ, আইজিএক্স এসব ইতং বিতং কিছুই ছিলো না। বিদেশি কল সোজা বিটিআরসিতে আসতো, তারা কল অপারেটর প্রতিষ্ঠানকে দিয়ে দিতো। কিন্তু এই চাল্লু সরকার এইসব নাম দিয়ে গাঁজাখোর কম্পানির মাধ্যমে কলের ভাগ ওসমান পরিবারের মত হোমরা চোমরাদের দিতে বাধ্য করলো।

শুধু ওসমান পরিবারই নয়, বিটিআরসির টাকা গায়েব করে দেওয়ার তালিকায় আছে জাহাঙ্গীর কবির নানকের প্রতিষ্ঠান। আছে এই মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী লতিফ সিদ্দিকীর প্রতিষ্ঠান, মিস্টার ক্লিন ইমেজের ব্যারিস্টার তাপস এমপির প্রতিষ্ঠান, রেলের কালো বিড়াল সুরঞ্জিত সেনের পুত্রের প্রতিষ্ঠান সহ আরো বহু হোমড়া-চোমড়া। এভাবেই সর্বক্ষেত্রে দূর্নীতির মহা উৎসব চলছে রাষ্ট্রীয় সম্পদের শ্রাদ্ধ করে। সাধারণ জনগণের শুধু তাকিয়ে দেখা ছাড়া কি আর কিছুই করার নেই?

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

৯ thoughts on “ওসমান পরিবার গুম, খুঁজে পাচ্ছে না বিটিআরসি!

  1. একটা শ্লোগান কিছু দিন আগে খুব
    একটা শ্লোগান কিছু দিন আগে খুব জনপ্রিয় হয়েছিল- “দুই নাগিণীর এক বিষ, নৌকা আর ধানের শীষ” অতীতের বিএনপি আর বর্তমানের আওয়ামিলীগের মধ্যে কোন পার্থক্য কেউ দেখাতে পারবেন? বিএনপি থেকে আমরা নাক ছিটকিয়ে আওয়ামিলিগকে কেন সমর্থন করেছিলাম? বিএনপি দুর্ণীতি পরায়ন, আওয়ামিলিগ এক্ষেত্রে কি পিছিয়ে আছে? বরং অনেকক্ষেত্রে এগিয়ে আছে। বিএনপি জামায়াতের সাথে উঠে বসে, আওয়ামিলিগের জামাত সংশ্লিষ্টতা কি এখন প্রমানিত নয়?

    বর্তমানের চুরিগুলি হচ্ছে ডিজিটালি। রাষ্টৈর টাকা সুকৌশলে ভাগবাটোয়ারা হচ্ছে আওয়ামি নেতাকর্মীদের মাঝে।

    শামীম ওসমানদের মত গড ফাদারের পেছনে আছে রাষ্টৈর নির্বাহী প্রধান। এদের চুরি চামারীর পৃষ্টপোষকতা করছে রাষ্ট্র।

  2. শামীম ওসমানের পাশে যখন
    শামীম ওসমানের পাশে যখন প্রধানমন্ত্রী আছেন তখন বিটিআরসির মাত্র ১’শ কোটি টাকা কেন বিটিআরসির সারা দেশের টাওয়ারগুলোই যে সে বেচে দেইনি এটাই তাদের ভাগ্য। আর গ্রামীণফোনের লাইসেন্স এখনো যে টেলনরের আছে সেটাও তাদের সাত জনমের কপাল।
    সবই প্রধানমন্ত্রীর কৃপা।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

16 − = 13