প্রসঙ্গ বিদ্যুৎঃ ব্যবসায়ীরা আর কত লুটে খাবে দেশের সম্পদ?

বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) এখন স্থাপিত বিদ্যুতের ক্ষমতা ১০ হাজার ৪১৬ মেগাওয়াট। কিন্তু পূর্ণক্ষমতায় বিদ্যুৎকেন্দ্র চালানো সম্ভব নয়। ৮০ শতাংশ প্লান্ট ফ্যাক্টরে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো সচল রাখলেও ১০ হাজার ৪১৬ মেগাওয়াটের স্থাপিত ক্ষমতা থেকে ৭ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করাও সম্ভব নয়। কারণ বাই রোটেশনে কেন্দ্রগুলো বন্ধ রাখতে হয়, না হলে বিদ্যুৎকেন্দ্রের অতিরিক্ত হিট থেকে অনেক সময় কেন্দ্রে আগুন ধরে যায়। এরকমই একটি দূর্ঘটনায় পড়েছে সাড়ে ৩’শ মেগাওয়াটের মেঘনাঘাট পাওয়ার প্লান্টটি। কিন্তু চলতি রমজান ও বিশ্বকাপে সন্ধ্যা ছয়টা থেকে রাত ১১ টায় বিদ্যুতের চাহিদা ধরা হয়েছে সাড়ে সাত হাজার মেগাওয়াট। কিন্তু এই পরিমান বিদ্যুৎ উৎপাদন করা পিডিবির দ্বারা সম্ভব নয়। ফলে এ সময় বিদ্যুতের লোডশেডিং অবধারিত। এর সুযোগ নিচ্ছে বিদ্যুৎ ব্যবসায়ীরা।

জানা গেছে, মেয়াদ উত্তীর্ণ হয়ে যাওয়া মেঘনাঘাটের ১১০ মেগাওয়াটের নিউ ইংল্যান্ড পাওয়ার কোম্পানির একটি স্বতন্ত্র বিদ্যুৎকেন্দ্রকে (ইন্ডিপেডেন্ট পাউয়ার প্রডিউসার-আইপিপি) রেন্টালের আদলে বিভিন্ন সুযোগ দেওয়ার বায়না করেছে। পিডিবি এ শর্তে রাজি না হওয়ায় মেঘনাঘাটে এনইপিসির ১১০ মেগাওয়াট কেন্দ্রটি থেকে আর বিদ্যুৎ না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে তারা। গতকাল মন্ত্রণালয় এনইপিসির পাঠানো এক চিঠি থেকে এ তথ্য জানা গেছে।

জানা গেছে, ১৯৯৯ সালে ৩০ জুন এনইপিসি পিডিবিকে ১৫ বছর বিদ্যুৎ দেওয়ার শর্তে একটি বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি করে। নিয়ম অনুযায়ী এ কেন্দ্রের মেয়াদ আজ ৩০ জুন দুপুর একটায় শেষ হয়েছে। এরপর কেন্দ্রটি নামমাত্র মূল্যে পিডিবির কাছে হস্তান্তর করার কথা। কিন্তু মেয়াদ শেষ হলেও এ কেন্দ্রের মেয়াদ বাড়ানোর তাগিদ দিয়েছিলো সরকার। কারণ বিদ্যুৎ সংকটের সময় ১১০ মেগাওয়াটের একটি কেন্দ্র যদি বন্ধ হয়ে যায় তাহলে সরকার আরো বেকায়দায় পড়বে। কিন্তু এনইপিসি নতুন করে আরো বছর মেয়াদ বাড়ানোর প্রক্রিয়া নেওয়ার তোড়জোর শুরু করলে নতুন কিছু শর্ত জুড়ে দেয়। এসবের মধ্যে রয়েছে, রেন্টাল কেন্দ্রের মত আইপিপির এ কেন্দ্রটিকে উচ্চ হারে কেন্দ্র ভাড়া। ফলে এ কেন্দ্রটি থেকে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম তারা ধরেছে ১৫ টাকা ৮৬ পয়সা। অন্যদিকে পিডিবি প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম ধরেছিলো ১৫ টাকা ১৫ পয়সা। প্রতি ইউনিটে ৭১ পয়সা না দিতে চাওয়ায় এনইপিসি নতুন করে চুক্তি করতে রাজি হয়নি।


বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয়ের সচিব মহোদয়ের কাছে NEPC এর চিঠি

পাঠকের জানা থাকা দরকার, একটি রেন্টাল কেন্দ্র করা হলে তার জায়গা দেয় সরকার। এরপর সেখানে তেল বা গ্যাস দেয় সরকার। আবার সেখান থেকে উৎপডাদিত বিদ্যুৎও বেশি দামে কেনে সরকার। এরপরও বাসা ভাড়ার মত কেন্দ্রেরও একটি ভাড়া দেয় সরকার। একেই বলে রেন্টাল। যদি ওই রেন্টাল কেন্দ্র এক মেগাওয়াটও বিদ্যুৎ না দেয় তাহলেও কেন্দ্র ভাড়া বাবদ প্রতি মাসে কোটি কোটি টাকা দিতে হয় রেন্টাল মালিকদের। এরকমই শর্ত জুড়ে দিয়েছে এনইপিসি। তবে কোন আইপিপিকে রেন্টাল করার কোন নজির নেই বাংলাদেশে। যদি এনইপিসি এ সুযোগ পায় তাহলে দেশের সব পুরোনো আইপিপি আবার রেন্টাল করার সুযোগ খুজবে।

বিদ্যুৎ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ইউনাইটেড পাওয়ার কোম্পানির ৩ বছর মেয়াদি ৫৩ মেগাওয়াটের একটি কেন্দ্রের মেয়াদ গত ২১ জুন শেষ হয়েছে। এ কেন্দ্রটিকেও আগামি ৫ বছরের জন্য মেয়াদ বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। অথচ সরকারের একাধিক নীতিনির্ধারকেরা বলেছিলেন, ২০১৩ সালের পর আর কোন রেন্টাল কেন্দ্র করা হবে না। এই কেন্দ্রটির মেয়াদ বাড়ানোর কারণ হলো, কেন্দ্রের মালিক হাসান মেহমুদ রাজা। এছাড়াও এই বিদ্যুৎকেন্দ্রে বড় শেয়ার রয়েছে তারিক আহমেদ সিদ্দিকির। তিনি হলেন, শেখ হাসিনার নিরাপত্তা উপদেষ্টা। এরপর আর কি মেয়াদ না বাড়িয়ে উপায় আছে? অথচ ইস্টিশন ব্লগে এর আগে ইউনাইটেডের দেশের বাইরে ব্রিটেনে টাকা পাচারের ওপর দারুন একটি প্রতিবেদনও করেছে।

বিদ্যুৎ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, আওয়ামী লীগ সরকার এর আগেরবার ক্ষমতায় থাকার শেষ সময় ১১টি রেন্টাল ও একটি আইপিপি কেন্দ্রের মেয়াদ বাড়িয়েছে। আর এ মেয়াদে আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী ফারুক খানের পারিবারিক ব্যবসা সামিট পাওয়ার ও হাসান মেহমুদ রাজার ইউনাইটেড পাওয়ারের যৌথ মালিকানাধীন খুলনা পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেডের (কেপিসিএল) ১১০ মেগাওয়াটের আইপিপি কেন্দ্রের মেয়াদ বেড়েছে। ১১টি রেন্টাল কেন্দ্রের মধ্যে রয়েছে, রেন্টাল নিয়ে যিনি ভ্যাপক চাপাবাজি করেন, বিশিষ্ট গার্মেন্ট ব্যাবসায়ী নেতা আনিসুল হকের দেশ এনার্জির ১০০ মেগাওয়াট, আরজে পাওয়ারের ৫০ মেগাওয়াট, এগ্রিকোর ৫৫ মেগাওয়াট, আওয়ামী লীগের আবাসন ব্যবসায়ী ও সংসদ সদস্য ইঞ্জিনিয়ার এনামুল হকের এনার্জি প্রিমার ৫০ মেগাওয়াটের দুটি, কোয়ান্টামের ১১০ মেগাওয়াট, ভেঞ্চুরা এনার্জি রিসোর্সের ৩৪ দশমিক ৫ মেগাওয়াট, ম্যাক্স পাওয়ারের ৭৮ দশমিক ৫ মেগাওয়াট, এনার্জিস পাওয়ারের ৫৫ মেগাওয়াট, প্রিসিশন এনার্জির ৫৫ ও আওয়ামী লীগ ব্যবসায়ী সিকদার গ্রুপের ডিপিএ ৫০ মেগাওয়াট।

আর এ মেয়াদে আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী ফারুক খানের পারিবারিক ব্যবসা সামিট পাওয়ার ও হাসান মেহমুদ রাজার ইউনাইটেড পাওয়ারের যৌথ মালিকানাধীন খুলনা পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেডের (কেপিসিএল) ১১০ মেগাওয়াটের আইপিপি কেন্দ্রের মেয়াদ বেড়েছে। বিদ্যুৎ খাতে সরকারের ভুল নীতির কারণে এসব করার সাহস দেখাচ্ছে ব্যবসায়ীরা। কারণ সরকার মধ্যমেয়াদি একটি কেন্দ্রও আনতে পারেনি। আর দীর্ঘমেয়াদি বিদ্যুৎকেন্দ্রর কথা না হয় বাদই দিলাম। সরকার বিদ্যুতের বহু গল্পই আমাদের শোনাচ্ছে, কিন্তু সেখানে অর্জন কি? অজর্ন হলো বিদ্যুৎখাতে টেকসই উন্নয়ন বলে কিছু নেই। যা আছে তা হলো রেন্টালের ওপর ভরসা রেখে ব্যবসায়ীদের মুনাফ লুটে নেওয়ার সুযোগ করে দেওয়া।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

১৩ thoughts on “প্রসঙ্গ বিদ্যুৎঃ ব্যবসায়ীরা আর কত লুটে খাবে দেশের সম্পদ?

  1. আমলা নির্ভর রাজনীতি যেকোন
    আমলা নির্ভর রাজনীতি যেকোন দেশের জন্য অভিশাপ।আর তার জ্বলন্ত উদাহরণ হচ্ছে, আমাদের এই প্রিয় বাংলাদেশ।শুধু বিদ্যুৎ নয় সব ক্ষেত্রে সরকারকে ব্রেনওয়াশ করে দেশকে ক্রমাগত পঙ্গু করে গুটি কয়েক গোষ্টির স্বার্থ রক্ষা করছে এই বদ আমলারা।

    1. এখানে আমলাদের গনহারে দোষ দিয়ে
      এখানে আমলাদের গনহারে দোষ দিয়ে কি লাভ? বিদ্যুৎকেন্দ্রের দুর্নীতির সাথে জড়িত যাদের নাম এসেছে সবাইতো সরকারের আত্মীয়স্বজন। সবাই আওয়ামি রাজনীতির সাথে জড়িত।

      1. আমলারা রাজনৈতিক নেতৃত্বের কথা
        আমলারা রাজনৈতিক নেতৃত্বের কথা শুনতে বাধ্য। এখানে আপনি রাজনীতির শীর্ষে থাকা নীতি নির্ধারকদের দোষ দিতে পারেন।

  2. দেশ সম্পুর্ণ দুর্নীতিমুক্ত।
    দেশ সম্পুর্ণ দুর্নীতিমুক্ত। আওয়ামীলীগের নেতাকর্মীরা কিছু করলে দুর্নীতি বলে বিবেচিত হবে না। এটাই বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের বাংলাদেশ।

  3. আসেন এই আনন্দে হাতির ঝিলে
    আসেন এই আনন্দে হাতির ঝিলে আরেকখান লেসার শো হয়ে যাক। দেশের পু মারার এই উপলক্ষ্যে একটা শো ডাউন না হইলে কেম্নে কি?

  4. আপনারা আওয়ামীলীগের বিরুদ্ধে
    আপনারা আওয়ামীলীগের বিরুদ্ধে লিখবেন না । আওয়ামীলীগ একটি স্বচ্চ, নিরপেক্ষ ও আন্তর্জাতিক মানের গণতান্ত্রীক দল ! শিক্ষামন্ত্রী নাহিদ চাচা বলেছেন গত মেয়াদে ও এই মেয়াদে আওয়ামীলীগের কোন আত্মীয়স্বজন পাবলিক পরীক্ষা দেয় নাই, সুতরাং দূর্নিতি হয় নাই !

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

+ 49 = 57