পবিত্র রমজান ও সহজ ইসলাম


বাঙালি মুসলমান সাধারণত রমজান মাসে অধিক মুসলমান হয়ে যায়। এই মাসিক মুসলমানিত্ব তাদের সাপ্তাহিক মুসলমানিত্বের মতোই। যেমন, যে বাঙালি মুসলমান সারা সপ্তাহ এক ওয়াক্ত ফরজ নামাজ পড়েনা সেও শুক্র বার জুময়ার নামাজ পড়তে মসজিদে যায়। যারা জুময়ার নামাজে নিয়মিত না, তারাও অন্তত বৎসরে একবার শবেবরাতে নফল নামাজ পড়তে যায়। এইরকম সাপ্তাহিক, মাসিক এবং বাৎসরিক মুসলমানিত্বের বহুমাত্রিক ফযিলত রয়েছে। দৈনিক পাঁচবার নামাজ পড়া একটি অত্যন্ত কঠিন কাজ। বাঙালি কৃষক, শ্রমিক থেকে শুরু করে কর্পোরেট বাবু প্রত্যেকের জন্যেই কঠিন। অন্যদিকে বিখ্যাত হাদিস বর্ণনাকারী আবু হুরাইরা বর্ণিত একটি হাদিস মতে, জুময়ার দিন ফেরেশতারা মসজিদের গেটে দাঁড়িয়ে নামাজে আগত মুসলমানদের লিস্টি বানান। কে কখন মসজিদে ঢোকে সেই ক্রমানুসারে লিস্টি বানানো হয়। সপ্তাহের অন্য কোন দিনে অথবা ওয়াক্তে যেহেতু ফেরেশতাদের লিস্টি বানানের কোন হাদিস নাই, তাই ঐদিন গুলোতে মসজিদে না গেলে নামাজি মুসলমানের লিস্টি থেকে নাম কাটা যাওয়ার কথা না। অন্যদিকে শুক্রবারে একটি মাত্র দিনে একটি মাত্র ওয়াক্তে মসজিদে গেলেই ফেরেশতাদের নামাজি মুসলমানের লিস্টে নিজের নামটা রাখা যায়। আবার সালমান ফারসি বর্ণিত ভিন্ন একটি হাদিস মোতাবেক শুক্রবার জুময়ার নামাজ আদায় করলে বিগত জুময়ার পর থেকে পুরা এক সপ্তাহে করা সকল গুনাহ আল্লাহ মাফ করে দেন। রমজান মাস এবং শবেবরাতেরও এই ধরণের ফযিলত রয়েছে। সুতরাং, আপনি শবেবরাতে সারা রাত নফল নামাজ পড়ে পরদিন সকল ওয়াক্তের ফরজ নামাজের সময় আরামে ঘুমিয়ে কাটিয়ে দিতে পারবেন। আপনি রোজার মাসে খেজুর এবং ঈদের দিন পেট ভরে মদ খেয়ে আরামে মুসলমান থাকতে পারবেন। বাঙালি মুসলমান এই কারণে রোজার মাসে মাক্কি ও ঈদের দিনে বলিউডি হয়ে যেতে পারে। নেকাব থেকে শুরু করে সানি লিওন কামিজ, সবকিছুতেই তার অবাধ প্রেম ও স্বাধীনতা। ইসলাম খুব কঠিন ধর্ম নয়, পালন করার অনেক সহজ তরিকা আছে। এইক্ষেত্রে বাঙালি মুসলমান যে বিশেষজ্ঞ দক্ষতা অর্জন করেছে তাতে আমি দুঃখি নই, সুখি।


আমি দুঃখিত হই বাঙালি মুসলমানের সাপ্তাহিক, বার্ষিক ও মাসিক মুসলমানিত্ব নিয়া আস্ফালন এবং অনধিকার চর্চায়। প্রত্যেকেরই নিজের মতো করে ধর্ম পালনের অধিকার আছে। যে সপ্তাহে একদিন নামাজ পড়ে তাকে আমি দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত নামাজির চেয়ে ছোট অথবা বড় কোন মুসলমানই বলার অধিকার রাখি না। সে কতো বড় মুসলমান তা নির্ণয় করার অধিকার একান্তই তার। পাশপাশি অন্যে কতো বড় মুসলমান অথবা একান্তই মুসলমান কিনা তা নির্ণয় করার অধিকারও তার নাই। বাংলাদেশ রাষ্ট্র তারে সেই অধিকার দেয় না। রোজা না রাখা অথবা নামাজ না পড়া বাংলাদেশের আইনে কোন অপরাধ নয়। কেউ রোজা না রাখলে অথবা নামাজ না পড়লে তা নিয়া কারো কিছু বলার নাই। অথচ বাংলাদেশের অমুসলিম, নাস্তিকসহ বেরোজদার মুসলমানদের রমজান মাসে বিশেষ অসুবিধা ও বৈষম্যের শিকার হতে হয়। রাস্তায় হাটতে হাটতে কিছু খাওয়া অথবা পান করা যায় না। অনেক অফিসে দিনের বেলা রান্না করা বন্ধ থাকে, তাতে অমুসলিম ও বেরোজদারদের বাধ্য হয়ে অভুক্ত থাকতে হয়। রেস্টুরেন্টে খাবার পাওয়া কঠিন হয়। রাস্তায় জানযট বাড়ে, বাজারে দ্রব্যমূল্য বাড়ে। বাঙালি মুসলমানের সংযোমের চোটে অমুসলিমদেরকেও বেশি দামে পিয়াজ কিনতে হয়। বেরোজদারদের উপর অন্যায় সামাজিক ও মানসিক চাপ তৈড়ি করা হয়। কিন্তু খাবারের দোকানগুলো কাপড় দিয়ে ঢেকে দিলে নিজের মনের পর্দা হয় কি? সারাদিন সংযম করে ইফতার থেকে বেসামাল হয়ে উঠলে সংযমের প্রেকটিস হয় কি? সংযমের মাসে অসংযম আর দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধগতি নিয়া বাঙালি মুসলমানের দুশ্চিন্তা নাই, তার চিন্তা অন্যের রোজা নিয়া। নিজের রোজা আল্লাহর কাছে কবুল হয় কি না তা নিয়া অধিক চিন্তিত না হয়ে অন্যের রোজার খবর নিয়া লাভ আছে কি? এইভাবে সারা বছরের গুনাহ মাফ হবে কি?


গত বছর রমজান মাসে পুলিশে-শিবিরে ব্যাপক যুদ্ধ চলছিল। তাতে অনেক শিবির কর্মী ও কয়েকজন পুলিশ নিহত হলেন। একাত্তরেও একটি রমজান মাস ছিল, পাকিস্তান সেনাবাহিনী এবং তাদের এদেশীয় ইসলামিস্ট সাপোর্টাররা এই মাসে হত্যাকান্ড অথবা ধর্ষন বন্ধ করে নাই, বরং মুক্তিযুদ্ধের শেষ সময় হওয়ায় আরো বৃদ্ধি করেছিল। মুক্তিযোদ্ধারাও এইসময় পালটা আক্রমন জোরদার করেছিল। রাজাকাররা তখন পবিত্র রমজান মাসে পাকিস্তান সরকারের বিরুদ্ধে মুসলিম নিধনের অভিযোগ আনে নাই। বরং জিহাদী জোশে হিন্দু নিধনের নামে হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে পাকিস্তান বিরোধী সকল বাঙালি নিধনে সাপোর্ট দিয়েছে, অংশ নিয়েছে। বাংলাদেশে একাত্তরের রমজান ছিল রক্ত লাল। গত বছর দুই হাজার তেরোর রমজানটিতেও প্রচুর রক্তপাত হয়েছে। সেই তুলনায় এই বছরের রমজান বাংলাদেশের জন্যে বিশেষভাবে শান্তিপূর্ণ ও বিশ্বকাপ ফুটবলের রহমতময় হয়ে উঠেছে। ইরাক ও সিরিয়ার মুসলমানদের সেই ভাগ্য হয় নাই। রমজান মাসে মধ্যপ্রাচ্যের এই দেশগুলোতে জিহাদী কর্মকান্ড বৃদ্ধি পায়, রক্তপাতও বাড়ে। এই অঞ্চলে এখন একটি নয়া খেলাফত কায়েম হয়েছে। প্রথম রোজার দিন খলিফা আবু বকর আল বাগদাদী মুসলিম উম্মাহর উদ্দেশ্যে ভাসন দিয়ে রোজার মাসে বিগত বছরের সকল গুনাহ মাফ হওয়ার ফজিলত বর্ণনা করেছেন। পাশাপাশি এই মাসে বেশি বেশি জিহাদ করার তাগিদ দিয়েছেন। ইসলাম ধর্ম পালনের ক্ষেত্রে ইরাকের আইসিস বাঙালি মুসলমানের চাইতে অধিক বিশেষজ্ঞ দক্ষতা অর্জন করেছে দেখা যাচ্ছে। হাদিস মোতাবেক জিহাদ করার সময় রোজা রাখা ফরজ নয়। আল্লাহর রাস্তায় যুদ্ধের ময়দানের যোদ্ধা যদি না খাইয়া দুর্বল হয় তাহলে কাফিরদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে কিভাবে? রোজার মাসে জিহাদ করলে না খাইয়া থাকার কস্ট ইরাকী জিহাদী মুসলমানদের না করলেও চলবে। পাশাপাশি যৌন জিহাদের ফতোয়া প্রচার করে আইসিস গত মাসেই ইরাকের পিতা মাতাদের তাগিদ দিয়েছে জিহাদী সেনাদের হাতে তাদের মেয়েদের তুলে দিয়ে আল্লাহর রাস্তায় জিহাদে সামিল হওয়ার। না মানলে ব্যাপক মাইর দেয়ার হুমকি দেয়া হয়েছে। পবিত্র রমজান মাসে খাওয়া যাবে, সেক্স করা যাবে, শত্রুও মারা যাবে। পাশাপাশি মরলে বেহেশতে যাওয়া যাবে। হলিউডের জেমস বন্ডের কপালেও এতো সুখ কোনদিন জোটে নাই।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

৯ thoughts on “পবিত্র রমজান ও সহজ ইসলাম

  1. ভাই, আফনে যে লেখা লিখছেন,
    ভাই, আফনে যে লেখা লিখছেন, আনসার আল ইসলাম আপনেরে পাইলে তো…! :চিন্তায়আছি: :চিন্তায়আছি: :চিন্তায়আছি:

  2. রমযানে আমাদের সংযমের মাত্রা
    রমযানে আমাদের সংযমের মাত্রা দেখে ভিনদেশি মুসলিমরাও হাসাহাসি করে। প্রথমদিকে তারা ব্যাপারটা বুঝে উঠতে পারতো না। এখন তারা স্যাটায়ার হিসেবেই দেখে।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

21 − = 14