ফুটা কাহিনী

আমার গর্ভে তাহাদের অবস্থান তখন অত্যাচারের পর্যায়ে পৌঁছিয়া যাইতেছিল। চিন্তা করিয়া দেখিলাম, কিছু একটা করিবার চেষ্টা একবার করিয়া দেখিনা কেন? উপরিভাগ এইভাবে জ্বলিয়া জ্বলিয়া অঙ্গার হওয়া- কাঁহাতক আর সহ্য করা যায়? রবি’র অসহ্য দহন হইতে নিস্তার পাইতে সমগ্র বৃক্ষরাজি, তরুকুল, গুল্মলতা আমার পৃষ্ঠদেশের উল্টাদিকে অর্থাৎ ভূগর্ভের নিকটাভ্যন্তরে তাহাদের শাখা প্রশাখা বিস্তার করিতে আরম্ভ করিল। প্রাণীকুলও পলায়নপর ভূগর্ভে আশ্রয় লইল। উহাদের দেখাদেখি জলবাসীগণও একই পদাঙ্ক অনুসরণ করিবার কারণে জলরাশিকেও ভূগর্ভে চলিয়া যাইতে হইল।

এইভাবে সকলে আমার আব্রু ভেদ করিয়া ভিতরে প্রবেশ করিতে থাকিলে, আমার ‘গোপনীয়তা’য় দারুন ব্যাঘাত ঘটিতে আরম্ভ করিল। বাহিরের আমি একটি গোলাকার শুষ্ক বৃহদাকার কালচে গোবরের মণ্ডের রূপ ধারণ করিলাম। অবশেষে মনস্থির করিলাম, রবিকে অনুরোধ জানাইয়া হেলিওগ্রাফের মাধ্যমে একটি বার্তা প্রেরণ করিয়া দেখিলে কেমন হয়? কিন্তু ক্ষনিকের তরে সন্দিহানও হইলাম এই ভাবিয়া যে, রবি সর্বদা জলন্ত ডাগর চক্ষু হানিয়া চারিপাশ ভষ্ম করিতে ব্যস্ত, আমার অনুরোধ রাখিবার মত সময় কি সে বাহির করিতে পারিবে? অথবা সময় বাহির করিবার কোন তাড়না কি সে অনুভব করিবে?

অবাক হইয়া লক্ষ্য করিলাম, রবি আমার অনুরোধ রাখিয়াছে। মনে হইল অন্যকে জ্বালাইতে গিয়া সে নিজেও বুঝি ভিতরে ভিতরে জ্বলিতেছিল। ইহাতে অনুরোধে অনুরোধও রাখিতে পারিল আবার নিজেকেও বেশ কৌশলে রক্ষা করিতে পারা গেল। রবি তাহার নিজের জ্বালা জুড়াইবার কারণেই হউক কিংবা আমার অনুরোধ রাখিবার কারণেই হউক, সুখকর বিষয় এই, আমার মনোবাঞ্চা শেষ পর্যন্ত পূরণ হইয়াছে।

লক্ষ্য করিয়া দেখিলাম, আমার অনুরোধ রাখিতে গিয়া কিংবা তাহার জ্বালা জুড়াইতে গিয়া, তাহাকে একটি পরিপূর্ণ ডিগবাজি খাইতে হইয়াছিল। আগে তাহার সম্মুখভাগ ছিল বাহিরমুখী। আর এখন তেজ কমাইবার নিমিত্তে সম্মুখভাগ ভিতরের দিকে গুটাইয়া লওয়াতে তাহার পশ্চাতভাগ বাহিরের দিকে আসিয়া উপস্থিত হইয়াছে। সেইখান হইতেও ক্রমাগত অনুরূপ গরম ভাপ নির্গত হইতেছে, তবে তাহা পূর্বাপেক্ষা নিতান্তই নগণ্য।

রবি তাহার ক্রুর দৃষ্টি ভিতরমুখী করিয়া লওয়াতে, ধীরে ধীরে আমার বায়ুমন্ডলের প্রখর তেজ কমিয়া শীতল হইতে আরম্ভ করিল। গর্ভ হইতে একে একে আমার গোপনীয়তার হন্তারকেরা বাহির হইয়া আসিতে লাগিল। ক্রমশঃ আমি যুবতী হইয়া উঠিতে লাগিলাম। আমার বহিরাংশ সবুজ লতা-গুল্ম-বৃক্ষে ভরিয়া উঠিয়া সবুজাভ কুন্তলের ন্যায় শোভা বর্ধন করিতে লাগিল। বক্ষ স্ফীত হইয়া পর্বত শৃঙ্গ সৃষ্টি হইতে লাগিল। ঝরনা, নদী, সাগর আমাকে ভালবাসায় সিক্ত করিতে পারিয়া আনন্দে কলকল ছলছল করিতে লাগিল। প্রাণীকুল অতি আবেগে উদ্বেলিত হইয়া আরাম আয়েশে বংশ বিস্তার করিয়া চলিল।

সমগ্র বিভাগের নবজাতকদিগের আগমনে আমি বড়ই আনন্দ উপভোগ করিতে লাগিলাম। আমিই যেন বিশাল বিশ্ব ভ্রহ্মান্ডের একমাত্র উর্বর মাতা। দূর হইতে যৌবনপ্রাপ্ত আমাকে দেখিয়া, মহাজগতের দূর দূরান্তের অনেক গ্রহ উপগ্রহ ছায়াপথেরা মুগ্ধ হইয়া আমার দিকে তাকাইয়া থাকিত। আবার অনেকে মুখ টিপিয়া হাসিয়া নিন্দায় মাতিয়া উঠিত এই ভাবিয়া যে, কোথা হইতে আমার এত এত সন্তান সন্তুতির সৃষ্টি হইয়াছে? কোন সে গুপ্ত প্রেমিক, গোপনে আসিয়া আমার গর্ভে অচ্ছুত প্রবেশ করাইয়া দিয়া, সরিয়া পড়িয়াছে?

তবে নিন্দুকেরা যত যাহাই বলুক না কেন, অতীব সত্য কথা এই যে, প্রকৃতির পরিবর্তিত রূপ হইতে পরবর্তীকালে সকলেই তাহাদের প্রয়োজনানুযায়ী উত্তাপ আর আলোক পাইয়া লাভবান হইতে পারিয়াছিল।

কিন্তু সুখ বুঝি কাহারো কপালে বেশীদিন অবস্থান করিতে চাহে না। সুখ সাগরে অবগাহন করিতে করিতে বেশ কিছুকাল অতিবাহিত হইয়া গেল। তারপর এমন একটি সময় আসিয়া উপস্থিত হইল, যখন গ্রীন হাউস ইফেক্টের প্রভাবে তাপমাত্রা আবার বাড়িয়া যাইতে আরম্ভ করিল।

ভাবিলাম, রবি বুঝি আবার উল্টি খাইয়াছে। কিন্তু গোপন পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে জানিতে পারিলাম, এহেন পরিস্থিতিতে তাহাকে দোষারোপ করিবার কোন অবকাশ নাই। সমস্ত দোষ আমার কতিপয় সন্তানদিগের। তাহারাই নাকি যত্রতত্র বনাঞ্চল ধ্বংস করিয়া, পারষ্পরিক শক্তিমত্তা জাহির করিবার নিমিত্তে যুদ্ধ বিগ্রহে লিপ্ত হইয়া, নানান ধরনের অস্ত্রের অনু পরমানুর নিরীক্ষা ঘটাইতে ঘটাইতে আবহাওয়া আর জলবায়ুর সর্বনাশ করিয়া, সর্বোপরি বিজ্ঞানের চমকপ্রদ আবিষ্কারগুলিকে কুপথে পরিচালনা করিয়া (সময়ে সময়ে সুপথে চালনা করিয়াও। যথা; এয়ারকন্ডিশনার-ফ্রিজ প্রভৃতির আবিষ্কারে প্রভূত হিতসাধন হইলেও, ওইসকল উপকারী বস্তু হইতে নির্গত সি, এফ সি গ্যাস ঘন্টার কাঁটাকে সর্বসময়ে বারটায় স্থির রাখিয়াছে) বায়ুমন্ডলের যাবতীয় ভারসাম্য নষ্ট করিয়া ফেলিতেছে। ফলশ্রুতিতে, আমার বায়ুমণ্ডলের কোথায় যেন কেমন এক প্রকার ফুটা সৃষ্টি হইয়াছে। এবং ওই ফুটার ভিতর দিয়া রবি রশ্মি প্রচন্ড প্রতাপে প্রবেশ করিয়া, আমার উপর আছড়াইয়া আছড়াইয়া দাবড়াইয়া বেড়াইতেছে।

নাড়ী ছেঁড়া ধন বলিয়া কথা। যত কেহ যত যাহাই বলুক না কেন, আমি কিন্তু বরাবরই আমার অবুঝ সন্তানদিগের পক্ষই অবলম্বন করিব। কে বলিল আমার সন্তানেরা নাদান, কে বলিল আমার সন্তানেরা কুকর্ম করিতেছে, কে বলিল আমার বায়ুমন্ডলে ফুটা সৃষ্টি হইয়াছে? রবি ডিগবাজি খাইবার পর তাহার যে পশ্চাদাংশ বাহিরমুখী করিয়া রাখিয়াছিল- প্রাকৃতিক নিয়মানুযায়ী তাহাতেওতো একটি ফুটা থাকিবার কথা। সেই ফুটা দিয়াওতো গ্রীন হাউস ইফেক্ট হইতে পারে। পারে না কি?

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

১৪ thoughts on “ফুটা কাহিনী

  1. ভাই আমিও আপনাকে হেলিওগ্রাফের
    ভাই আমিও আপনাকে হেলিওগ্রাফের মাধ্যমে একটি বার্তা দিতে চাই- আমার মস্তিষ্কের উপর এহেন অত্যাচারের হেতু কি?

  2. নাসির ভাই চমৎকার।
    চোখ ধাঁধালো

    নাসির ভাই চমৎকার।
    চোখ ধাঁধালো আলোর মতো শুরু হয়ে ধীরে ধীরে চোখে সয়ে যাওয়ার মতো যেন অনেক ক্ষিপ্র গতিতে উড্ডায়মান কোন রকেট বা ভিন গ্রহের যান। ভিন্ন একটা স্টাইল। উপভোগ করলাম। তবু আমার মনে হয় আপনি একটু সময় দিলে লেখাটি শেষ দিকে আরও দারুণ করা সম্ভব। আপনার কাছে সব সময় ভিন্ন আশা করি এবং আপনি সে তৃষ্ণা সব সময়ই পূরণ করেন তাই ধন্যবাদ। জানেন তো “পানে তৃষ্ণা বেড়ে যায় ” 😉 :থাম্বসআপ: :ফুল:

  3. লেখাটি শেষ করিলাম… অতঃপর
    লেখাটি শেষ করিলাম… অতঃপর বুঝিতে পারিলাম রবিটি আর কেহ নয়, স্বয়ং আপনি। ভাষার তাপে ফুটিফাটা হইয়া গেলাম। ইহাকেই অধিবিদ্যা বলে হয়তো। হেলিওগ্রাফের শরণ লইবার চিন্তা করিতেছি।

  4. একটা প্রাকৃতিক বিষয় কে নিয়া
    একটা প্রাকৃতিক বিষয় কে নিয়া এখনকার যুগের কোনো সাহিত্য পন্ডিত নিজের মনের ভাব অত্যান্ত সুন্দর শব্দ সমষ্টি দিয়া এমন ভাবে প্রফুস্টিত করিতে পারে,ইহা আমার জ্ঞানের বাহিরে ছিল।
    আজ বুঝিলাম প্রকৃতি ঘুরিয়া ফিরিয়া পূর্বেকার জ্ঞানপন্ডিত দিগকে আবার আর্বিভাব করিয়া চলিতেছে।
    সাধু হে সাধু সাধু …..

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

6 + 1 =