জীবনানন্দের শ্রুতিকল্প : একটি মূল্যায়ন

শ্রুতিকল্প-প্রথমে সংজ্ঞা দেওয়া যাক। অনুপ্রাস, অন্ত্যমিল, মধ্যমিল, পর পর শব্দের অর্ন্তগত স্বরবর্ণের মিল ধ্বনি-ব্যঞ্জনার জন্য অন্য যা কিছু সম্ভব, যেমন ধ্বনিস্পন্দ, তা গদ্যের থেকে ধার করা হোক, কথ্য ভাষা থেকে আহরিত হোক, সংলাপ থেকে স্পন্দিত হোক-এসব মিলেই শ্রুতিমাণে ধ্বনির মূর্ত-বিমূর্ত রূপ, এই হচ্ছে শ্রুতিকল্প। তাই চিত্রকল্প, যা চিত্রে কল্পনা জাগিয়ে তুলতে সক্ষম; তেমনি যা কিছু ধ্বনিরূপের বৈচিত্র্য, ব্যাপকতা, গভীরতা সৃষ্টি করতে সক্ষম তাই শ্রুতিকল্প। চিত্রকল্প যেমন শুধু রূপক থেকে গভীরতর, মহত্তর, বৃহত্তর ব্যঞ্জনার অধিকারী, তেমনি শ্রুতিকল্প নেহাৎ অন্ত্যমিলের অধিক; বিষয় ও কল্পনাকে ধ্বনিবাহিত করে শ্রেষ্ঠ অনুষঙ্গ যাতে কবিতার আরাধ্য গভীরতরভাবে পাঠকের বোধির সঙ্গে মিশতে পারে, মিলতে পারে, অবলোকিত হতে পারে। এ প্রবন্ধের উদ্দেশ্য: জীবনানন্দের কবিতার ধ্বনি-বিচিত্রতার, শ্রুতিকল্পের অনুসন্ধান, অবলোকন, শ্রবণ এবং অবশেষে সকল কবিতাপ্রেমীর সঙ্গে অর্ন্তদীপ্ত হয়ে ওঠা:

লক্ষ কোটি মুমূর্ষুর এই কারাগার,
এই ধূলি,-ধূম্রগর্ভ বিস্তৃত আঁধার
ডুবে যায় নীলিমায়,-স্বপ্নায়ত মুগ্ধ আঁখিপাতে,
-শঙ্খশুভ্র মেঘপুঞ্জে, শুক্লাকাশে, নক্ষত্রের রাতে;
ভেঙে যায় কীটপ্রায় ধরণীর বিশীর্ণ নির্মোক,
তোমার চকিতস্পর্শে হে অতন্দ্র দূর কল্পলোক!
[নীলিমা (ঝরা পালক)]

-কল্লোল, ফেব্রুয়ারি, ১৯২৬-এ প্রকাশিত এই কবিতা, যা অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্তকে মুগ্ধ করেছিলো; আজ কি মনে হয় জীবনানন্দের কলম থেকে বেরিয়েছিলো? তৎসম যুগ্মধ্বনিতে আন্দোলিত, বিষয়ে প্রায় মালার্মের নীলিমার রাবীন্দ্রিক বঙ্গজ সংস্করণের মতো, এ কবিতা কি বরং সুধীন্দ্রনাথ দত্তের কৈশোরিক তন্বীর অর্ন্তগত হওয়াই সঙ্গততর মনে হয় না? কিন্তু অক্ষরবৃত্তের এ ধ্বনি উচ্চাবচতার এক প্রান্ত থেকে একই ছন্দের সম্পূর্ণ বিপরীত প্রান্তের বিলম্বিত, অতিবিলম্বিত ধ্বনির অনুচ্চ সমতলে ঘুরে গেলেন জীবনানন্দ ঝরা পালক (১৯২৭)-এর ৯ বছর পর ধূসর পাণ্ডুলিপি (১৯৩৬)-এর কবিতাবলিতে। সুরের প্রগাঢ়তা তো শূন্যের থেকে আসে না। জাতীয় গ্রন্থাগারে রক্ষিত ৪০টি খাতার খণ্ডিত কোনো অংশে এই শ্রুতির সাধনার ইতিহাস নিশ্চয়ই লুকিয়ে আছে। এ পরিশ্রমের কথা অবশ্য জীবনানন্দ ধূসর পাণ্ডুলিপি’র ভূমিকায় তাঁর স্বাভাবিক মৃদুকণ্ঠের ইশারায় জানিয়ে গেছেন। এগার বছরের নিভৃত কল্পনা-প্রতিভার পরিশ্রমের পর জীবনানন্দের স্বতন্ত্র কণ্ঠস্বর স্পষ্ট করে শোনা গেলো ধূসর পাণ্ডুলিপি (১৯৩৬)-এর সতেরটি কবিতায়। এ পরিণত কণ্ঠস্বরের অস্ফুট আওয়াজ অবশ্য নজরুল-মোহিতলাল রূপধ্বনি অনুসৃত কৈশোরিক এবং ঝংকারপ্রধান ঝরা পালক’ও একেবারে দুর্নিরীক্ষ্য নয়; যেমন:

সাপিনীর মত বাঁকা আঙুলে ফুটেছে তার কঙ্কালের রূপ,
ভেঙেছে নাকের ডাঁশা,-হিম স্তন,-হিম রোমকূপ!
[ডাকিয়া কহিল মোরে রাজার দুলাল (ঝরা পালক)]

উদ্ধৃত ক’লাইনেই জীবনানন্দের কবিতাধ্বনির মূলসূত্র নিবদ্ধ রয়েছে: লম্বা লয়, ড্যাশ, শান্ত দু মাত্রার অন্ত্যমিল, ঝংকারহীনতা, ধ্বনি-অধ্বনির প্রলম্বিত বুনোট।

কুড়ি দশকের কবিতার চলনের পটভূমিতে মাত্রাবৃত্তের কিছু কৈশোরিক চর্চা করলেও উল্লিখিত ঐ এগার বছরের অনুশীলন ও রচনার মধ্যে জীবনানন্দ বুঝতে পেরেছিলেন যে তাঁর মনের স্বাভাবিক সুর বিলম্বিত অক্ষরবৃত্তের উত্থান-পতনে নয় বরং ধীরে নুয়ে পড়ে পাথর এড়িয়ে জলের মতো ঘুরে ঘুরে। কেউ কেউ ইশারা দিয়েছেন যে এই ধ্বনির পূর্বসূত্র রবীন্দ্রনাথের কৈশোরিক রচনা তারকার আত্মহত্যা (সন্ধ্যাসঙ্গীত) কবিতায় নিহিত।
এ পুনরুদ্ধারের সায় আমার কানে বাজে না বরং এটাই বোধহয় অধিকতর সত্য যে, জীবনানন্দের মনের স্বাভাবিক মন্থরতার সুর যৌবনের ইয়েটসের কবিতার মেজাজ ও শ্রুতির সঙ্গে মিল খুঁজে পেয়েছিলো। The Falling of the leaves, Ephemera, Down by the Salley Gardens (Crossways, 1889); The White Birds,(The Rose, 1893); The Lover Tells of the Rose in His Heart, He Reproves the Curlew, The Valley of the Blank Pig (The Wind Among the Reeds)-ইয়েটসের এই কবিতাগুলোয় জীবননান্দীয় বিলম্বিত সুরের ইংরেজি রূপ শোনা যায়। ইংরেজি উচ্চারণ অবশ্য ফরাসি বা ফারসি ভাষার স্বরবর্ণবাহিত টানা সুর মেনে চলে না বরং স্বর প্রক্ষেপনের ধাক্কায় গড়িয়ে চলে। এই ‘স্টোকাটো’ প্রক্ষেপের চলন এবং বৈচিত্র্য পাওয়া যাবে এলিয়টের কবিতায়।
তুলনামূলকভাবে উনিশ শতকের শেষ দশকের ইয়েটসের কবিতার (অন্তত উল্লিখিতগুলোর) ধ্বনি অনেক ঢিলে। জীবনানন্দ কি মনে মনে আরো ঢিলে করে পড়েছিলেন এ কবিতাগুলো; এই কবিতার বাক্যগুলোর ভিতরে ড্যাশ ভরে ভরে? বুঝেছিলেন বাঙলা কবিতায় এই সুর, আরো বিলম্বিত সুর ব্যবহারের সম্ভাবনা এবং প্রতিশ্রুতি? ইঁদুর, চাঁদ, হেমন্ত, ঘোড়া, চিল, শিশির, বুনোহাঁস, ঝরাপাতা-জীবনানন্দের বহুল ব্যবহৃত এইসব উপকরণও লক্ষ করা যাবে ইয়েটসের কবিতায়। অবশ্য এ তাঁর নিতান্ত পাঠজনিত উপলব্ধি নয়।
বরিশালের শহরপ্রান্তের বাইরে কুড়ি দশকে তিনি এইসব দেখেছিলেন, শুনেছিলেন, ছুঁয়েছিলেন, ঘ্রাণ নিয়েছিলেন। জীবনানন্দ অনুভব করেছিলেন, আবিষ্কার করের্ছিলেন কথ্য ভাষাকে কীভাবে ব্যবহার করলে, তৎসম শব্দের উচ্চারণ কীভাবে বিশ্লিষ্ট করলে বাঙলা উচ্চারণে ইয়েটসীয় আইরিশ কবিতা-সুর মেকন করে আরো গভীর, প্রগাঢ় ও মর্মভেদী হয়ে ওঠে। হৃদয়স্পর্শী হয়ে ওঠে স্মৃতি এবং প্রকৃতিসম্পৃক্ত বিষয় কবিতায় উদ্ভাসিত করতে গেলে। কোন সম্ভাবনাকে লক্ষ্য করে কী কী উপকরণের সাহায্যে জীবনানন্দ তাঁর ধ্বনি-চারিত্র্য তৈরি করলেন, বিষয় এবং ধ্বনির আবেগকে অঙ্গাঙ্গি পরিপূরক হিসেবে মিলিয়ে দিলেন-এইসব পর্যবেক্ষণে আমরা হাত দেবো। তার পূর্বে শুধু কবিতার ধ্বনি বিষয়ে অল্প ঐতিহাসিক তথ্য স্মরণ করা যাক:

১.১
ক্লেদজ কুসুম-এর দ্বিতীয় ভূমিকায়, ১৮৬১ সালে, বোঁদলেয়ার সঙ্গীতের সঙ্গে কবিতার ছন্দের, বড় অর্থে শ্রুতিকল্পের আত্মীয়তার কথা বললেন। এবং উল্লেখ করলেন এ নিবিড় বন্ধনের যোগ্য ব্যবহার পাঠকের জন্য ক্লাসিক্যাল কবিতা যতোটা সংবেদন জাগাতে পারে তার চেয়ে অনেক বেশি হৃদয়ের গভীরে প্রবেশ করাতে সক্ষম। ‘কবিতার চরণ একটি সমান্তরাল রেখার মতো, একটি ঊর্ধ্বমুখী কিংবা নিম্নগামী রেখার সমধর্মী হতে পারে (এই ব্যাপারগুলো সঙ্গত কিংবা গণিত বিজ্ঞানের মতো); নিশ্বাস না নিয়ে স্বর্গে উঠতে পারে অথবা যেকোনো ভাব অবলম্বন করে নরকে নামতে পারে; একটি স্পাইর‌্যালের অনুগামী হতে পারে, প্যারাবোলা হতে পারে অথবা আঁকাবাঁকা কতোগুলো কৌণিক খণ্ডনের মতো হতে পারে।এখানে বোঁদলেয়ার আমাদের জানাচ্ছেন কবিতার ধ্বনির প্রবাহ ও বিচিত্রতা কবিতার বিষয়ভাবকে কী ভাবে প্রগাঢ় করতে পারে, কতো বিশদভাবে প্রকাশ করতে পারে।

স্তেফান মালার্মে বোঁদলেয়ারের ধারণাকে এগিয়ে নিয়ে কবিতায় ধ্বনিকে সঙ্গীতের মর্যাদা দিতে উদ্যত হলেন। কবিতার শব্দকে সম্পৃক্ত করতে চাইলেন সাঙ্গীতিক ‘শ্রুতি’র মতো চরিত্রের সঙ্গে যার গুণে শব্দের অর্থকে উত্তরণ করে ধ্বনি-ব্যঞ্জনাতেই পাঠক গভীরতর ইঙ্গিত ও দ্যোতনায় পৌঁছতে সক্ষম। তিনি ‘ফুল’ উচ্চারণ করে ফুলের বাস্তবিক রূপেই পৌঁছাতে চান না, এমন ধ্বনিবিশিষ্ট শব্দ পেতে চান যার স্বরগুণ স্বাভাবিক ফুলের চেয়ে স্বতন্ত্র একটা কিছু-একটা সঙ্গীত, স্বপ্ন, সারৎসার, নমনীয়তা-এমন কোনো ফুল যা সব তোড়ার ঊর্ধ্বে। মালার্মের এই ভাবনা নিয়ে তর্ক হতে পারে। তবু এই আদর্শের সম্ভাবনাকে একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। শব্দ, শব্দ থেকেও, অর্থভার বহন করেও ধ্বনি-চারিত্র্যের গুণে কবিতার সারবত্তাকে আরো সম্মোহনশালী করতে পারে। ছন্দশাস্ত্রের তাল-তান্ত্রিক নিয়মকানুন বাঁধাধরা। সেইখানেই তার একগুঁয়েমি। মালার্মে মাত্রার মেকানিজমে ধ্রুবপদী কাব্যের ফলপ্রসূতা স্বীকার করে নিয়েছেন। স্বীকার করে নিয়ে তিনি `secret and unfailing charm of defective verse’-এ পৌঁছানোর সাধনা করেছেন, পরিশ্রম করার জন্য অন্যদের অনুপ্রাণিত করেছেন। তিনি:

ক. গতানুগতিক মেট্টোনোমিক পুনরাবৃত্তি, বাঁধাধরা পর্ব-পর্বাঙ্গ পুনরুক্তির থেকে মুক্তি চান এবং এক সুরের (melody) পরিবর্তে বহুব্রীহি সুরের (polymorphic) কবিতা নির্মাণ করতে চেয়েছেন।
খ. সাঙ্গীতিক বর্ণ (স্বর) তা কণ্ঠ অথবা যন্ত্রপ্রসূত হোক যতোটা ভাবব্যঞ্জক অর্থ-তীব্রতা প্রকাশ করতে পারে অর্থভারবহ শব্দ ব্যতিরেকে, মালার্মে কবিতার শব্দ এবং ভাষাকে তেমনি এক স্তরে উত্তীর্ণ করতে চেয়েছেন যাতে কবিতা শুধু কর্তব্যকেই ব্যক্ত করে না বরং বাণীর বহু বেশি ব্যঞ্জনা দ্যোতিত করে। এ হচ্ছে মর্ত্যবাসীর ব্যবহৃত ভাষা থেকে কাব্যলক্ষ্মীর অমর্ত্যবাণীর দিকে অভিগমন। ফরাসি ভাষা না জেনে মালার্মে, লাফর্গ এবং ভ্যালেরির এইসব কারিগরি এবং কৃতিত্বের সফলতা বোঝা মুশকিল। তবে বাঙলা কবিতাধ্বনির আওতায় বনলতা সেন বা মৃত্যুর আগের মতো কবিতার আবেগ-তীব্রতা যে বিশ্লিষ্ট শব্দ, ধ্বনি এবং স্বরবর্ণ-সমাহারের উপর একান্তই নির্ভরশীল, সেটা বুঝতে কাব্যতত্ত্ব পুঁথি পাঠের প্রয়োজন হয় না।
উনিশ শতকী ফরাসি পথপ্রদর্শকদের অনুসরণ করে ১৯৪২ সালে কবিতার সঙ্গীত (Music of Poetry) নামে এক সুবিদিত প্রবন্ধে টি.এস. এলিয়ট যা লিখলেন তার সারমর্ম মোটামুটি এ রকমের:
* অর্থ বিনা সঙ্গীতের কবিতা বলে কিছু নেই। তবে কবিতার সংগতিশীল ধ্বনি অর্থকে বহন করে এবং তীব্রতরভাবে পাঠকের কাছে পৌঁছাতে সক্ষম।
* কথ্যভাষার মধ্যে লুকোনো ধ্বনিরূপ থেকেই কবিতাকে সঙ্গীত নিঙড়ে নিতে হবে।
* সুরেলা হলেই কবিতা ভালো হয় না; কর্কশ স্বরের প্রতিপাদ্য স্থানও কবিতায় আছে। যতোক্ষণ না কবি গদ্য কঠোরতার স্বয়ম্ভূ হচ্ছেন ততোক্ষণ সংঘাততীব্র কবিতা রচনা সম্ভব নয়।
* স্বরগুচ্ছের পৌনঃপুনিকতা সঙ্গীত এবং কবিতা উভয় রচনায়ই স্বাভাবিকভাবে প্রযোজ্য।
* সিম্ফনী সঙ্গীতের লয়ের বিভিন্ন ও বিচিত্র উত্থান-পতনের প্রতিশ্রুতি নিয়ে ঐ ধরনের কবিতা সৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে।
ধ্বনিচারিত্র্য বিষয়ে ইউরোপীয় কবিদের কী কী রচনা জীবনানন্দ পড়েছিলেন তা নিরূপণ করা কঠিন। তবে এ বিষয়ে যে তিনি বিশদ ভেবেছিলেন, কবিতার কথা’য় তার স্বাক্ষর আছে। সর্বোপরি তাঁর কবিতাই প্রমাণ যে, বাঙলা কবিতায় তিনি একটি সম্পূর্ণ নতুন ধ্বনির জনয়িতা।

২. প্রবহমানতা
অন্ত্যজ ঝোঁক নিয়ে আট-ছয়-এর চাকার বারবার ঘুরে ঘুরে কথা বলার সনাতন ইতিহাস কবিতাকর্মীদের সুবিদিত। পৌনঃপুনিকতার এই আবর্ত ভেঙে প্রবহমানতার প্রথম দরজা খুলেছিলেন মাইকেল মধুসূদন দত্ত; রেলিংঅলা বনেদি বারান্দাসমেত দ্বিতীয়তলায় উঠেছিলেন রবীন্দ্রনাথ; অবশেষে ছাদে চড়ে আকাশের মতো অসীম, বিস্তীর্ণ প্রবহমানতায় ব্যাপ্ত, বিলীন এবং স্তিমিত নক্ষত্রের মুখোমুখি ব্যঞ্জনাবিধূর হতে শেখালেন জীবনানন্দ:

১. একদিন জলসিড়ি// নদীটির তীরে এই // বাংলার মাঠে//
বিশীর্ণ বটের নিচে// শুয়ে র’ব; //-পশমের মত লাল ফল//
ঝরিবে বিজন ঘাসে//

২. একদিন জলসিড়ি নদীটির পারে// এই বাংলার মাঠে//
বিশীর্ণ বটের নিচে শুয়ে র’ব; //-পশমের মত লাল ফল//
ঝরিবে বিজন ঘাসে//

৩. একদিন জলসিড়ি নদীটির পারে// এই বাংলার মাঠে//
বিশীর্ণ বটের নিচে শুয়ে র’ব; //-পশ// মের// মত// লাল// ফল//
ঝরিবে বিজন ঘাসে//
[একদিন জলসিড়ি (রূপসী বাংলা)]

উদ্ধৃত শুধু তিন ধরনের বাঁটেই (পর্বাঙ্গ বিন্যাসে) নয়, কতো ভিন্ন ভঙ্গিতে উচ্চারণ করা যায় এই একদিন জলসিড়ি কবিতাটির পঙ্ক্তিমালা। এ এক বড় বৃত্তের মধ্যে ছোট ছোট বৃত্তের সঞ্চালন ৪, ৬, ৮, ১০, ১২ মাত্রার পর্বাঙ্গ। মৌলিকভাবে ২ এবং ৩-এর মাত্রা চোখে পড়ে ঠিকই কিন্তু লয় এমন যে আদি পয়ারের পুনরাবৃত্তি নেই, চৌদ্দ মাত্রার পরপর টেনে শ্বাসও নিতে হচ্ছে না। সন্ধ্যাসঙ্গীত-এর ঢিলে সুর এ নয়, বলাকার মুক্ত ধ্বনিও এ নয়; এটা জীবনানন্দের একান্ত নিজস্ব জিনিস। এই ধ্বনি সম্ভব হলো এইসব কারণে:

১. বিলম্বিত লয়, মানে ঢিলে উচ্চারণের সুযোগে।
২. মাত্রার মধ্যে থেকেও ড্যাশ-সেমিকোলনের যতি-স্থিতি-নীরবতার অনীরব ব্যবহারে। আকস্মিক বা হয়তো স্বাভাবিক বাকস্পন্দের বিস্ময় ও বিমূঢ়তাব্যঞ্জক ধ্বনি-ঘূর্ণিতে। ফলাফল যা হয়েছে তা যেনো দুই-তিন-চার মৌলিক মাত্রার নৌকোর সারি তাদের নিজস্ব অস্তিত্ব প্রায় বিলোপ করে, মন্থর অথচ অরুদ্ধ নদীর প্রলম্বিত রেখা-ধ্বনি-গতিকে বেড়-বাঁকসমেত পাঠকের শ্রুতিপটে গুঞ্জরিত করে তুলেছে।

জীবনানন্দীয় লয় ও প্রবাহমানতার একটি কৌশল অবলম্বন অথবা তাঁর প্রাতিস্বিক মেজাজ হচ্ছে যুগ্মধ্বনির উত্থান-পতনের প্রায় নিরসন। যখন কবিতাকে দ্রুততর পড়তে হবে স্বাভাবিকভাবেই যুগ্মসুর ঝংকারে দুলে উঠবে, যেমন, সুধীন্দ্রনাথ দত্ত অথবা বিষ্ণু দে’র কবিতায় গতি শ্লথ হলেই ধ্বনির তরঙ্গ ওঠার সুযোগ কমে আসবে।
কৈশোরিক রাবীন্দ্রিক সন্ধ্যাসঙ্গীত-এ বিলম্বিত সুরের ক্ষীণ আভাস কোথাও মিললেও পর্বাঙ্গের বিন্যাসে চার ছয় মাত্রার মিলের ঝোঁক ঘুরে ঘুরে আসে। কৈশোরিক রচনা, তাই শিথিল, তবুও ঘুরে ঘুরে আসে:

জ্যেতির্ময় তীর হতে আধাঁরসাগরে
ঝাঁপায়ে পড়িলো এক তারা
একেবারে উন্মাদের পারা।
… … …
যে সমুদ্রতলে
মনোদুঃখে আত্মঘাতী
চির-নির্বাপিত বাতি
শত মৃত তারকার
মৃতদেহ রয়েছে শয়ান
[তারকার আত্মহত্যা (সন্ধ্যাসঙ্গীত)]

‘জ্যোতির্ময় তীর হতে আঁধারসাগরে; এই ১৪ মাত্রাকে একসঙ্গে পড়ে বেগ তৈরি করা যায়। কিন্তু স্তবকের গঠন সেই ঢেউকে জিইয়ে রাখে না। কিছুক্ষণ পরেই ছোট ছোট একই মাপের বাঁধনে রুদ্ধ হয়ে পড়ে-মনোদুঃখে আত্মঘাতী, চিরনির্বাপিত বাতি শত মৃত তারকার-এই অভিরুচি বাঙলা কবিতার সঙ্গে বাঙলা গানের আদি আত্মীয়তা-সূত্রের প্রচ্ছন্ন প্রকাশ। এই কবিতার উচ্চারণে যা ঘটলো, ধ্রুবপদের অস্থায়ী অন্তরাতে একই ব্যাপার:

যোই যোই ধাবত// ইঞ্ছা ফল পাবত//
সাঁচি বিধাত করুণা সমাহার//
লাজ কি জাহাজ। শিরতাজ// গরীব নওয়াজ
গরিবন কি ইঞ্ছা ফল// পূরী হোত ইয়ে দরবার//
[মালকোষ ধ্রুপদ (তানসেন)]

এইসব পদের খেয়াল অস্থায়ী অন্তরার কাব্যোচ্চারণে মাত্রার বাঁধন প্রায়ই ঢিলে। যদিও গাইবার সময় গায়ককে লয় রাখতেই হবে। প্রথাসিদ্ধ উপায়ে স্বরবর্ণ টেনে রাগ ঠিক রেখে, অলঙ্করণ প্রয়োগ করে পাখোয়াজ তবলার সঙ্গে গায়ককে সমে ফিরতে হয়। উনিশ শতকের বাঙলা কবিতার টেকনিকের ইতিহাস প্রায় সমস্তটাই পদ-পর্ব-পর্বাঙ্গের উচ্চারণে কবিতার মাত্রার পেশিকে শক্ত করার ইতিহাস। সন্ধ্যাসঙ্গীত থেকে মানসী, চিত্রা, ক্ষণিকা কবিতার ধ্বনিবিচারে মাত্রার সঙ্গে অক্ষর এবং শব্দের অভঙ্গুর পায়ে চলবার কাহিনী। রবীন্দ্রপূর্ব কবিদের সঙ্গে তরজাওয়ালাদের সম্পর্ক আরো নিবিড়তর। এবার আবার পড়া যাক, একদিন জলসিড়ি…। লক্ষ করেছি ‘একদিন জলসিড়ি নদীটির পারে এই বাংলার মাঠে’ এই পঙ্ক্তিকেই কতো বাঁটে, ভিন্ন ভিন্ন যতি টেনে পড়া যায়। এবার আমার ইচ্ছেমতো সাজাই:

একদিন জলসিড়ি নদীটির পারে
এই বাংলার মাঠে
বি-শী-র্ণ বটের নিচে শুয়ে র’ব;
পশ-মের মত লাল ফল’
ঝরিবে বিজন ঘাসে।

আমরা জানি জীবনানন্দ যুক্তাক্ষরকে উচ্চারণে অনুচ্চ করে দিতেন। কিন্তু এখানে বি-শী-র্ণ’র অনুচ্চ অথচ বিলম্বিত স্টোকাটোই ‘এই বাংলার মাঠে’ থামিয়ে দেয় নি বরং পর্বাঙ্গগুলোকে মসৃণ প্রবাহমানতায় ভাসিয়ে নিয়েছে। পাখি নীড় থেকে বেরিয়েই ত্বরিত ঘরে ফেরে নি। এই হচ্ছে জীবনানন্দীয় ধ্বনির বুনোহংসীর অনব্যাহত সঞ্চালন।

জীবনানন্দীয় প্রবাহমানতার আরো কিছু নমুনা:

পুরোনো ক্ষেতের গন্ধে এইখানে ভরেছে ভাঁড়ার;
পৃথিবীর পথে গিয়ে কাজ নাই-কোন কৃষকের মত দরকার নাই দূরে
মাঠে গিয়ে আর!
রোধ-অবরোধ-ক্লেশ-কোলাহল শুনিবার নাহিকো সময়,
[অবসরের গান (ধূসর পাণ্ডুলিপি)]

বনের আড়াল থেকে তাহাদের ডাকিতেছে জ্যোৎস্নায়
পিপাসার সান্তনায়-আঘ্রাণে-আস্বাদে!
কোথাও বাঘের পাড়া বনে আজ নাই আর যেন!
মৃগদের বুকে আজ কোন স্পষ্ট ভয় নাই,
সন্দেহের আবছায়া নাই কিছু;
কেবল পিপাসা আছে,
রোমহর্ষ আছে।
মৃগীর মুখের রূপে হয়তো চিতারও বুকে জেগেছে বিস্ময়!
লালসা-আকাক্সক্ষা-সাধ-প্রেম-স্বপ্ন স্ফুট হয়ে উঠিতেছে সব দিকে
আজ এই বসন্তের রাতে;
এইখানে আমার নক্টার্ন-।
[ক্যাম্পে (ধূসর পাণ্ডুলিপি)]

তারি পাশে তোমারো রুধির কোন বই-কোন প্রদীপের মত আর নয়,
হয়তো শঙ্খের মত সমুদ্রের পিতা হ’য়ে সৈকতের প’রে
সে-ও সুর আপনার প্রতিভায়-নিসর্গের মত:
রূঢ়-প্রিয়-প্রিয়তম চেতনার মত তারপরে
তাই আমি ভীষণ ভিড়ের ক্ষোভে বিস্তীর্ণ হাওয়ার স্বাদ পাই;
না হলে মনের বনে হরিণীকে জড়ায় ময়াল:
[তার স্থির প্রেমিকের নিকট (বেলা অবেলা কালবেলা)]

২.১ বাকস্পন্দ ও পুনরাবৃত্তি
ধ্রুপদী কবিরা জনপদের কথ্য ভাষা থেকে যতোটা সম্ভব দূরে গিয়ে সংস্কৃত কবিতার দেব ভাষা তৈরি করেছিলেন। অতঃপর রোমান্টিকদের উদ্দেশ্য হলো, কবিতার ভাষাকে কথ্য ভাষার সক্রিয়তা এবং সজীবতা প্রদান করা। মধুসূদনী মহাকাব্য থেকে রাবীন্দ্রিক ক্ষণিকা, এই অগ্রসরের বাস্তবিক দলিল। কিন্তু নেহাতই লোকায়ত ভাষা, এমনকি গদ্য কবিতাতেও আধুনিকতার পূর্ণাঙ্গতা আসতে নাও পারে। বরঞ্চ কবিতা তখনই যুগোপযোগী, হয়তো যুগোত্তীর্ণ বক্তব্য ও পেশি ধারণ করতে পারে যখন কবিতা তার যুগবাহিত সুরের মধ্যে বাকস্পন্দ ধারণ করতে পারে। ‘প্রাত্যহিক বাচনের শব্দভঙ্গি, স্বরভঙ্গি আর শ্বাসক্ষেপণ ভঙ্গিই’ কবিতাকে দিতে পারে নাট্যপ্রাণ বেগ আরূঢ় নিয়মানুবর্তিতা ভেঙে-ভাবনাতেও এবং সুরে-শ্রুতিকল্পে। হয়তো আমাদের অতি-পরিচিত, তবুও পুনরুদ্ধার করা যাক সেইসব বাকস্পন্দ:

হাতে তুলে দেখিনি কি চাষার লাঙল?
বাল্টিতে টানিনি কি জল?

কাস্তে হাতে কতবার যাইনি কি মাঠে?
মেছোদের মত আমি কত নদী ঘাটে
ঘুরিয়াছি;
[বোধ (ধূসর পাণ্ডুলিপি)]

অশ্বত্থের শাখা
করেনি কি প্রতিবাদ? জোনাকির ভিড় এসে সোনালী ফুলের স্নিগ্ধ ঝাঁকে
করেনি কি মাখামাখি?
থুরথুরে অন্ধ প্যাঁচা এসে
বলেনি কি : ‘বুড়ি চাঁদ গেছে বুঝি বেনোজলে ভেসে?
চমৎকার!-
ধরা যাক দু-একটা ইঁদুর এবার।’
[আট বছর আগের একদিন (মহাপৃথিবী)]

উদ্ধৃত পঙ্ক্তিগুলোর মধ্যে প্রশ্নের ছড়াছড়ি আর সেগুলোতে কথ্য সংলাপের সান্নিধ্য। এবং ঐসব সম্ভাষণের মধ্যেই ধ্বনির বিশিষ্টতা যা বড় একটা স্তবকের বুনোটের মধ্যে শ্রুতির বিভিন্ন আঙ্গিকে বিকশিত হয়ে উঠছে।
শব্দ অথবা শব্দগুচ্ছের পুনশ্চতাও তেমনি নতুন ধ্বনি এবং সঙ্গে সঙ্গে ধ্বনির তীব্রতাকে তুঙ্গ করে তুলতে সক্ষম। এলিয়ট লক্ষ্য করেছিলেন এই ধ্বনির পুনরাবৃত্তির ব্যবহারের বিষয়-সঙ্গীতে এবং কবিতায়। জীবনানন্দের কবিতা স্বরণ করা যাক:

কাল কারা অতিদূর আকাশের সীমানার কুয়াশায় কুয়াশায় দীর্ঘ বর্শা হাতে করে
কাতারে কাতারে দাঁড়িয়ে গেছে যেন-
মৃত্যুকে দলিত করবার জন্য?
জীবনের গভীর জয় প্রকাশ করবার জন্য?
প্রেমের ভয়াবহ গম্ভীর স্তম্ভ তুলবার জন্য?
[হাওয়ার রাত (বনলতা সেন)]

সিংহ হুংকার করে উঠছে:
সার্কাসের ব্যথিত সিংহ,
স্থবির সিংহ এক-আফিমের সিংহ-অন্ধ-অন্ধকার।
… … …
সিংহ অরণ্যকে পাবে না আর
পাবে না আর
পাবে না আর
কোকিলের গান
বিবর্ণ এঞ্জিনের মত খ’সে-খ’সে
চুম্বক পাহাড়ে নিস্তব্ধ।
[শীত রাত (মহাপৃথিবী)]

অবাক হ’য়ে ভাবি, আজ রাতে কোথায় তুমি?
রূপ কেন নির্জন দেবদারু-দ্বীপের নক্ষত্রের ছায়া চেনে না-
পৃথিবীর সেই মানুষীর রূপ?
স্থুল হাতে ব্যবহৃত হ’য়ে-ব্যবহৃত-ব্যবহৃত-ব্যবহৃত হ’য়ে
ব্যবহৃত-ব্যবহৃত-
আগুন বাতাস জল: আদিম দেবতারা হো-হো ক’রে হেসে উঠলো:
‘ব্যবহৃত-ব্যবহৃত-হ’য়ে শুয়ারের মাংস হ’য়ে যায়?’
হো-হো ক’রে হেসে উঠলাম আমি!’
[আদিম দেবতারা (মহাপৃথিবী)]

হাওয়ার রাত এবং শীতরাত, দুটোই গদ্য কবিতা। প্রথমটিতে ‘করবার জন্য’, ‘তুলবার জন্য’ পুর্নব্যবহৃত হয়ে জীবনের জয়কে আবেগতীব্র করে তুলেছে ধ্বনি-প্রতিধ্বনির সহায়তায়। শীতরাত-এর স্তবকটিতে শ্রুতিকল্পের সংবদ্ধতা আরো গাঢ়। ‘ব্যথিত সিংহ’ ‘স্থবির সিংহ’, ‘আফিমের সিংহ’-এই পুনশ্চতার পরে ‘অন্ধকার’, ‘পাবে না আর’, ‘পাবে না আর’, ‘পাবে না আর’, ব্যবহারের বেগ এবং স্রোত সমন্বিত হয়ে কতোগুলো যুগ্ম শব্দের ধাক্কা পেরিয়ে ‘চুম্বক পাহাড়ে নিস্তব্ধ’, এই স্টোকাটোতে এসে স্তব্ধ হচ্ছে। স্তবকটির ধ্বনির প্রবাহ সেকেলে স্তবকের আদলের মোটেই নয়। গদ্য কবিতা, তবুও তা বিলম্বিত খেয়ালের (বিস্তারের) মতো ধ্বনির বিচিত্রতা, স্বরের উত্থান-পতনের পর অত্যন্ত আনোখাভাবে সমে ফিরেছে।
আদিম দেবতারা কবিতাটিতে ‘ব্যবহৃত’ শব্দের অব্যর্থ অলৌকিক ব্যবহার একমাত্র রাজা কবিদের হাতেই সম্ভব। ‘ব্যবহৃত’ শব্দের পৌনঃপুনিক এবং বিচিত্র সন্নিবেশে জীবনানন্দ এই শব্দটির মধ্যে এর নিজস্ব অর্থের বহুগুণ অর্থ নিবিষ্ট করতে সক্ষম হয়েছেন। ‘কোথায় তুমি’র বাকস্পন্দ, ‘ব্যবহৃত’র পুনরাবৃত্তি, ‘হ’-ধ্বনির অনুপ্রাস-এসব মিলে শ্রুতিকল্প; ‘দেবদারু-দ্বীপের নক্ষত্রের ছায়া’র চিত্রকল্প; ‘আগুন বাতাস জল: আদিম দেবতাদের অতীতমুখী অনুষঙ্গ; দেবতাদের এবং উত্তম পুরুষের হো-হো করে হেসে উঠবার ধ্বনি-প্রতিধ্বনিবিজড়িত দৃশ্য-এসব মিলে এই স্তবকটি রাজা কবিদেরও ঈর্ষণীয়রূপে চূড়ান্ত সার্থকতা লাভ করেছে। কোনো ছন্দোবদ্ধ কবিতায় এই সার্থকতা আনা প্রায় দুরূহ। জীবনানন্দীয় শ্রুতিকল্প ব্যবহার বিনা এ ধরনের ব্যঞ্জনা সৃষ্টি প্রায় অসাধ্য।

২.২ ক্রিয়াপদ ও বেগ
ভাবনাকে বেগ দেবার জন্য, বেগকে সংবেদনতর করবার জন্য ক্রিয়াপদের পুনরাবৃত্তির ধ্বনিকে ব্যবহার করেছেন জীবনানন্দ অত্যন্ত কুশলতার সঙ্গে। দুটো উদাহরণ দেওয়া যাক:

জলপাইয়ের পল্লবে ঘুম ভেঙে গেল ব’লে কোন ঘুঘু তার,
কোমল নীলাভ ভাঙা ঘুমের আস্বাদ তোমাকে জানাতে আসবে না।
হলুদ পেঁপের পাতাকে একটা আচমকা পাখি ব’লে ভুল হবে না তোমার,
সৃষ্টিকে গহন কুয়াশা ব’লে বুঝতে পেরে চোখ নিবিড় হ’য়ে
উঠবে না তোমার!
প্যাঁচা তার ধূসর পাখা আমলকীর ডালে ঘষবে না এখানে,
আমলকীর শাখা থেকে নীল শিশির ঝ’রে পড়বে না,
তার সুর নক্ষত্রের লঘু জোনাকির মত খসিয়ে আনবে না এখানে,
রাত্রিকে নীলাভতম ক’রে তুলবে না!
সবুজ ঘাসের ভিতর অসংখ্য দেয়ালি পোকা ম’রে রয়েছে
দেখতে পাবে না তুমি এখানে,
পৃথিবীকে মৃত সবুজ সুন্দর কোমল একটি দেয়ালি পোকার মত
মনে হবে না;

প্যাঁচার সুর নক্ষত্রকে লঘু জোনাকির মত খসিয়ে আনবে এখানে,
শিশিরের সুর নক্ষত্রকে লঘু জোনাকির মত খসিয়ে আনবে না,
সৃষ্টিকে গহন কুয়াশা ব’লে বুঝতে পেরে চোখ
নিবিড় হ’য়ে উঠবে না তোমার।
[ফুটপাথে (মহাপৃথিবী)]

নদীর তীক্ষ্ণ শীতল ঢেউয়ে সে নামল-
ঘুমহীন ক্লান্ত বিহ্বল শরীরটাকে স্রোতের রাতের মত একটা আবেগ দেওয়ার জন্য
অন্ধকারের হিম কুঞ্চিত জরায়ু ছিঁড়ে ভোরের রৌদ্রের মত
একটা বিস্তীর্ণ উল্লাস পাবার জন্য;
এই নীল আকাশের নিচে সূর্যের সোনার বর্শার মত জেগে উঠে
সাহসে সাধে সৌন্দর্যে হরিণীর পর হরিণীকে চমক লাগিয়ে দেবার জন্য।
[শিকার (বনলতা সেন)]

গদ্য কবিতা তারই মধ্যে কোথাও কোথাও লুকোনো লয়, হয়তো স্পন্দন। বিশেষ্য-ক্রিয়াপদের পুনরুক্তি অথবা অসমাপিকা ক্রিয়ার পুনরুক্তি বিরল স্থিতি সমন্বিত গতিকে প্রবহমান করে রেখেছে। ধ্বনির প্রবাহ ‘অন্ধকারের হিম কুঞ্চিত জরায়ু ছিঁড়ে ভোরের রৌদ্রের মত বিস্তীর্ণ উল্লাস পাবার জন্য’-এর মতো পঙ্ক্তিতে সূক্ষ্ম যুগ্মশব্দের বিন্যাসে জলের ঘূর্ণির মতো ঘুরপাকে চলিষ্ণু হয়ে উঠেছে।
‘গভীর হাওয়ার রাত ছিল কাল-অসংখ্য নক্ষত্রের রাত’-এই দিয়ে হাওয়ার রাত কবিতাটির শুরু। প্রথম দুই মুভমেন্টে (স্তবকের বদলে মুভমেন্ট বলছি) স্বরের উচ্চাবচতা খুব নেই। প্রথম মুভমেন্ট শেষ হয়েছে, ‘কাল এমন চমৎকার রাত ছিল’ দিয়ে। দ্বিতীয়টির শেষ ‘কাল এমন আশ্চর্য রাত ছিল’। তৃতীয় মুভমেন্টে ‘বিদিশার,’ ‘কুয়াশায়-কুয়াশায়’ স্বরবর্ণ বিলম্বিত অর্ন্তমিলের ধ্বনি বিস্তৃত হয়ে ‘কাতারে-কাতারে দাঁড়িয়ে গেছে যেন-মৃত্যুকে দলিত করবার জন্য? জীবনের গভীর জয় প্রকাশ করবার জন্য প্রেমের ভয়াবহ গম্ভীর স্তম্ভ তুলবার জন্য?’ এই প্রশ্নের পুনশ্চ ধাক্কা ‘জন্য’, ‘জন্য’, ‘জন্য’র প্রক্ষেপে আটকে গেছে। তারপরের মুভমেন্ট একটা বিশাল ঢেউয়ের মতো দ্রুতবেগে আছড়ে পড়েছে:

আকাশের বিরামহীন বিস্তীর্ণ ডানার ভিতর
পৃথিবী কীটের মত মুছে গিয়েছে কাল!
আর উত্তুঙ্গ বাতাস এসেছে আকাশের বুক থেকে নেমে
আমার জানালার ভিতর দিয়ে’ শাঁই শাঁই করে,
সিংহের হুংকারে উৎক্ষিপ্ত হরিৎ প্রান্তরের অজস্র জেব্রার মত!

হৃদয় ভরে গিয়েছে আমার বিস্তীর্ণ ফেল্টের সবুজ ঘাসের গন্ধে
দিগন্ত-প্লাবিত বলীয়ান রৌদ্রের আঘ্রাণে,
[হাওয়ার রাত (বনলতা সেন)]

তিমির হননের গান, এটিও গদ্য কবিতা। ‘কোন হ্রদে’, ‘কোথাও নদীর ঢেউয়ে’, ‘কোন এক সমুদ্রের জলে’-ছোট ছোট তিন লাইনে শুরু। মাঝামাঝি অংশে, ক্রিয়াপদের ধ্বনি এবং ক্রিয়া পেঁচিয়ে উঠেছে ঘোরানো সিঁড়ির মতো:

স্বতই বিমর্ষ হয়ে ভদ্র সাধারণ
চেয়ে দ্যাখে তবু সেই বিষাদের চেয়ে
আরো বেশি কালো কালো ছায়া
লঙ্গরখানার অন্ন খেয়ে
মধ্যবিত্ত মানুষের বেদনার নিরাশার হিসেব ডিঙিয়ে
নর্দমার থেকে শূন্য ওভারব্রিজে উঠে
নর্দমায় নেমে-
ফুটপাথ থেকে দূর নিরুত্তর ফুটপাথে গিয়ে
নক্ষত্রের জ্যোৎস্নায় ঘুমাতে বা ম’রে যেতে জানে
[তিমির হননের গান (সাতটি তারা তিমির]

মন্বন্তরের এই ছবি ক্রিয়াপদের ক্রমপারস্পর্য এবং পারস্পর্যের ধ্বনি হ’য়ে, চেয়ে, খেয়ে, ডিঙিয়ে, উঠে, নেমে, গিয়ে, ম’রে, যেতে, জানে-বিনা কি এটা মর্মস্পর্শী হতে পারতো?
‘উড়ে যাওয়া পদধূলি’-অসমাপিকা ক্রিয়ার ঢুলে পড়া ধ্বনি অপছন্দ করে, সুধীন্দ্রনাথ দত্ত সারাটা দিন কাটিয়ে দিয়েছিলেন ‘উড্ডীন’ শব্দের পুনরাবিষ্কারে। জীবনানন্দ তাঁর সমগ্র কবিতা রচনায় বিস্তর অসমাপিকা ক্রিয়াপদকে, ক্রিয়ার পৌনঃপুনিকতা ব্যবহার করে এক অদ্ভূত লয়ের বাচন সৃষ্টি করেছিলেন। সেই ভাষা ভঙ্গিতে যেমন চিত্রগুণ ক্ষমতা প্রকাশ পেয়েছে তেমনি সম্ভব হয়েছে ধ্বনি সম্পূরকতার, যা বক্তব্যকে, ব্যঞ্জনাকে সমূহ বিস্তৃত করেছে। জীবনানন্দ দাশ তাঁর কবিতায় যে বহুব্রীহি দূরত্ব-বিস্তৃতি প্রকাশ করেছেন-মানসিক দূরত্ব ও বিস্তৃতি এবং প্রবাহমানতা, ব্যক্তি সম্পর্কের দূরত্ব ও বিস্তৃতি এবং প্রবাহমানতা, বাঙলার ইতিহাসের দূরত্ব ও বিস্তৃতি এবং প্রবাহমানতা, সেই সাথে ভৌগোলিক অবস্থানের দূরত্ব ও বিস্তৃতি এবং বিচিত্রতা:

মাঠ থেকে মাঠে মাঠে-সমস্ত দুপুর ভ’রে এশিয়ার আকাশে আকাশে
শকুনেরা চরিতেছে; মানুষ দেখেছে হাট ঘাঁটি বস্তি,-নিস্তব্ধপ্রান্তর
[শকুন (ধূসর পাণ্ডুলিপি)]
সবুজ ধানের নিচে-মাটির ভিতরে
ইঁদুরেরা চ’লে গেছে আঁটির ভিতর থেকে চ’লে গেছে চাষা;
[অবসরের গান (ধূসর পাণ্ডুলিপি)]

আবার কুড়ি বছর পরে তার সাথে দেখা হয় যদি!
[কুড়ি বছর পরে (বনলতা সেন)]

যে নক্ষত্রেরা আকাশের বুকে হাজার-হাজার বছর আগে ম’রে গিয়েছে
তারাও কাল জানালার ভিতর দিয়ে অসংখ্য মৃত আকাশ সঙ্গে ক’রে এনেছে;
[হাওয়ার রাত (বনলতা সেন)]

এইখানে সময়কে যতদূর দেখা যায় চোখে
নির্জন ক্ষেতের দিকে চেয়ে দেখি দাঁড়ায়েছে অভিভূত চাষা;
এখনো চালাতে আছে পৃথিবীর প্রথম তামাশা
সকল সময় পান করে ফেলে জলের মতন এক ঢোঁকে;
[আবহমান (শ্রেষ্ঠ কবিতা)]

সান্তাক্রুজ থেকে নেমে অপরাহ্নে জুহুর সমুদ্রপারে গিয়ে
কিছুটা স্তব্ধতা ভিক্ষা করেছিল সূর্যের নিকটে থেমে সোমেন পালিত;
বাংলার থেকে এত দূরে এসে-সমাজ, দর্শন, তত্ত্ব, বিজ্ঞান হারিয়ে,
প্রেমকেও যৌবনের কামাখ্যার দিকে ফেলে পশ্চিমের সমুদ্র তীরে
ভেবেছিল বালির উপর দিয়ে সাগরের লঘুচোখ কাঁকড়ার মতন শরীরে
ধবল বাতাস খাবে সারাদিন।
[জুহু (সাতটি তারার তিমির )]

সিন্ধুশব্দ বায়ুশব্দ রৌদ্রশব্দ রক্তশব্দ মৃত্যুশব্দ এসে
ভয়াবহ ডাইনীর মত নাচে-ভয় পাই-গুহায় লুকাই;
লীন হতে চাই-লীন-ব্রহ্মশব্দে লীন হয়ে যেতে
চাই। আমাদের দু’হাজার বছরের জ্ঞান এ-রকম।
[ইতিহাসযান (বেলা অবেলা কালবেলা)]

নিচে হতাহত সৈন্যদের ভিড় পেরিয়ে,
মাথার ওপর অগণন নক্ষত্রের আকাশের দিকে তাকিয়ে
কোন দূর সমুদ্রের বাতাসের স্পর্শ মুখে রেখে,
আমাদের শরীরের ভিতর অনাদি সৃষ্টির রক্তের গুঞ্জরণ শুনে
কোথায় শিবিরে গিয়ে পৌঁছলাম আমি।
[সময়ের তীর (বেলা অবেলা কালবেলা)]

ক্রিয়াপদের পৌনঃপুনিকতা, পুনশ্চতার ধ্বনি ব্যতিরেকে কি সম্ভবপর ছিলো? তিনি যে সারপদার্থ ভেবেছিলেন তাকে বহন করবার মতো লয় এবং ধ্বনিকেও আবিষ্কার করেছিলেন ক্রিয়াপদের সমূহ ব্যবহারে (সঙ্গে সঙ্গে অব্যয় এবং বিশেষণকেও প্রচুর প্রয়োগ করে):

“মানুষ হিসেবে অনুদার আমি হতে পারি, কিন্তু সময়-ও-সীমা-প্রসূতির ভিতর সাহিত্যের পটভূমি বিমুক্ত দেখতে আমি ভালোবাসি। তবু এটা স্বীকার করবো না যে, ‘মেমোরেবল স্পীচ’ মাত্রই কবিতা। কবির পক্ষে সমাজকে বোঝা দরকার, কবিতার অস্থি’র ভিতরে থাকবে ইতিহাসচেতনা ও মর্মে থাকবে পরিচ্ছন্ন কালজ্ঞান। …এই সমস্ত চেতনা নিয়েই মানবতার কবিমানের ঐতিহ্য। কিন্তু এই ঐতিহ্যকে সাহিত্যে বা কবিতায় রূপায়িত করতে হলে ভাব-প্রতিভার প্রয়োজন-যা প্রজ্ঞাকে স্বীকার করে নিয়ে নানারকম ছন্দে অভিব্যক্ত হয়। ছন্দের অনেকরকম বৈচিত্র্য রয়েছে; গদ্যও তো একরকম ছন্দ।”
[উত্তররৈবিক বাংলা কাব্য (কবিতার কথা)]

৩. সূক্ষ্ম সুর, স্থুল সুর ও গদ্য কবিতা

উল্লিখিত প্রবন্ধে জীবনানন্দ আরো নির্দেশ করেছিলেন যে:

“অনেকের ধারণা বর্তমান বাংলা কবিতা মোটা চালে ও গদ্য ছন্দেই চলে ভালো । কিন্তু সে ধারণা ঠিক নয়। যেখানে আধুনিক কবিতা সূক্ষ্ম সুর বজায় রেখে চলছে সেখানে স্বয়ং স্বাতন্ত্র্যও আয়ত্তে রাখবার জন্য রবীন্দ্রকাব্যের সঙ্গে অজ্ঞাতসারে, এবং কোন কোন ক্ষেত্রে অল্পবিস্তর চেতনায়, তাকে স্বভাবতই গভীর সংঘর্ষে আসতে হয়েছে। কেননা এ হচ্ছে রবীন্দ্রনাথের নিজস্ব জিনিস নিয়ে আধুনিকের বোঝা-পড়া।”

এই উক্তি এবং এর তাৎপর্য কিছুটা বিশ্লেষণসাপেক্ষ। মাইকেল, রবীন্দ্রনাথের অক্ষরবৃত্ত যে লয়ে চলতো তার চেয়ে বিলম্বিততর লয়েই জীবনানন্দের শুরু। এবং ‘কেউ যাহা জানে নাই-কোনো এক বাণী-আমি বহে আনি’ কিংবা ‘মনে পড়ে কবেকার পাড়াগাঁর অরুণিমা সান্যালের মুখ’-এই গতি থেকে শুরু করে যতোটা বিলম্বিত সম্ভব সেই চলন পর্যন্তই জীবনানন্দ কবিতা রচনা করেছেন। ধূসর পাণ্ডুলিপি, বনলতা সেন-এর চেয়ে মহাপৃথিবী’র, সাতটি তারার তিমির এবং বেলা অবেলা কালবেলা’র সুর মন্থরতর:

নব-নব মৃত্যুশব্দ রক্তশব্দ ভীতিশব্দ জয় ক’রে মানুষের চেতনার দিন
অমেয় চিন্তায় খ্যাত হয়ে তবু ইতিহাসভুবনে নবীন
হবে না কি মানবকে চিনে-তবু প্রতিটি ব্যক্তির ষাট বসন্তের তরে!
সেই সব সুনিবিড় উদ্বোধনে-‘আছে, আছে, আছে’ এই বোধির ভিতরে
চলেছে নক্ষত্র, রাত্রি, সিন্ধু, রীতি মানুষের বিষয় হৃদয়;
জয় অস্তসূর্য, জয় অলখ অরুণোদয়, জয়!
[সময়ের কাছে (সাতটি তারার তিমির)]

যতক্ষণ পর্যন্ত বিষয় সূক্ষ্মতম লয়ের সাহায্য নিয়ে গরীয়ান হয়ে উঠতে পারে, জীবনানন্দ মাত্রাকে ডিঙিয়ে যাননি। বোধি, অবসরের গান, ক্যাম্পে এমনকি আট বছর আগের একদিন অক্ষরবৃত্তে লিখেছেন। ভাবা যেতে পারে এইসব কবিতায় যদি সূক্ষ্মতম লয় না থাকতো তবে এই কবিতাগুলোর সংবেদন কীভাবে এবং কতোখানি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে শেলতীব্র হয়ে উঠতো! ভাবলেই বোঝা যায় ধীর-মাত্রার এই কবিতাগুলোর বিষয়, বোধ ও গভীরতার অঙ্গাঙ্গি। একইভাবে হাওয়ার রাত কিংবা আদিম দেবতারা তাদের নিজস্ব সারপদার্থ গদ্য জাতীয় ধারালো আঙ্গিক বিনা আত্মপ্রকাশে অসমর্থ।

জীবনানন্দের গদ্য কবিতা সংজ্ঞাসূত্রে মাত্রাহীন হলেও সূক্ষ্ম সুর এবং স্পন্দনহীন মোটেও নয়।
শুধু ঝরা পালক’এই জীবনানন্দ প্রথাসিদ্ধ স্তবকের চর্চা করেছিলেন। ধূসর পাণ্ডুলিপি থেকেই জীবনানন্দ ঠিক স্তবক রচয়িতা আর নন। ধূসর পাণ্ডুলিপি’র একমাত্র জীবন কবিতার ৩৪টি অংশ স্তবকধর্মী। শকুন কিংবা কবির জীবদ্দশায় অপ্রকাশিত রূপসী বাংলা’র সনেটসমূহও ধ্বনি বিচারে স্তবকরূপী হয়েও স্তবক ধ্বনি-চারিত্র্য থেকে মুক্ত। তেমনি মৃত্যুর আগে ধূসর পাণ্ডুলিপি ‘কুয়াশায়, কবেকার, পাড়াগাঁয়’, ‘মুখের গন্ধ, ঘাস, রোদ, মাছরাঙা, নক্ষত্র, আকাশ’, ‘জানি না কি আহা’, ‘শুনিনি কি’-এইসব স্বরবর্ণ মিল, বিরামচর্চিত ধ্বনির বিস্তার, বাকস্পন্দ, প্রশ্ন-এইসব শ্রুতিকল্প সমন্বিত হয়ে ৮টি স্তবকের প্রত্যেকটি নিজস্ব ধ্বনি-চারিত্র্য নিয়ে কোনোটিই অন্যটির অনুরূপ নয়। শুধু প্রত্যেকটি স্তবক ‘আমরা হেঁটেছি যারা,’ ‘আমরা বেসেছি যারা’, ‘দেখেছি সবুজ পাতা’, ‘আমরা বুঝেছি যারা’-এমন ৮ মাত্রায় শুরু হয়েছে এবং শেষ হয়েছে সুরের পরে ঠিক সমে ফেরার মতো প্রত্যাশিত-অপ্রত্যাশিত ধ্বনিবেগ নিয়ে। স্তবক হিসেবেই যদি ওকে স্বীকার করতে হবে, তবে এও মানতে হবে যে এটি না মধুসূদনের, না রবীন্দ্রনাথের, না সুধীন্দ্রনাথের স্তবক। লয়ের সূক্ষ্ম স্তরভেদের জন্য জীবনানন্দ ক্রিয়াপদকেও দ্বিবিধ সুরে ব্যবহার করেছেন। দেখিয়াছি, করিয়াছি, শুনেছিল, চিনেছিলে-প্রভৃতির ৮ মাত্রার প্রয়োগ কিংবা বেসেছি, হেঁটেছি’র ৩ মাত্রাকে ৮ মাত্রার মধ্যে যোজন অক্ষরবৃত্তের ঢিলে লয়ে মিশিয়ে দিয়েছেন। কিন্তু ধ্বনি যখন মাত্রাহীন, চলিত ক্রিয়ার প্রক্ষেপধ্বনি তাঁর গদ্য কবিতার বৈশিষ্ট্য হয়ে উঠেছে: ‘জীবনের গভীর জয় প্রকাশ করবার জন্য’-হাওয়ার রাত (বনলতা সেন); ‘আবার কি ফিরে আসবো না আমি পৃথিবীতে’-কমলালেবু (বনলতা সেন)। পূর্বোদ্ধৃত ফুটপাথে (মহাপৃথিবী) কবিতাটি তো আগাগোড়াই শিল্পিত এবং নির্মিত মূলত ক্রিয়াধ্বনির পুনশ্চতার মধ্যে: ‘হবে না’, ‘উঠবে না’, ‘ঘষবে না’, ‘পড়বে না’, ‘তুলবে না’, ‘খসিয়ে আনবে না’, ‘নিবিড় হয়ে উঠবে না’।

জীবনানন্দের গদ্য কবিতা একটি স্বতন্ত্র আলোচনার বিষয়। শ্রুতিকল্পের লক্ষ্য নিয়ে শুধু এতটুকুই ইঙ্গিত দেবো যে তিনি গদ্য কবিতার মাত্রাহীনতার মধ্যে প্রায় সর্বত্রই ধ্বনির স্পন্দন বর্জন করেন নি বরং লালন করেছেন। অব্যয়, ক্রিয়াপদের পুনশ্চতা কিংবা ধ্বনির বাঁটেই সূক্ষ্ম ঢেউ উঠেছে, থেমেছে, নেমেছে। অর্ন্তনিহিত এই স্পন্দনের চড়া ব্যতিক্রম তাঁর মৃত্যুর পরে প্রকাশিত কবি এবং মৃদুতরভাবে উনিশ শো চৌত্রিশ, এই সব পাখি-এই তিনটি কবিতা:

কবিকে দেখে এলাম
দেখে এলাম কবিকে
… … …
‘শেয়ার মার্কেটে নামলে কেমন হয়’, জিজ্ঞেস করলে আমাকে
হায়; আমাকে।
‘লাইফ ইনসিওরেন্সের এজেন্সি নিলে হয় না’, শুধায়
‘লটারির টিকিট কিনলে কেমন হয়? ডার্বির নয় আইরিশ সুইপ
নয়-গোয়ার কিংবা বউবাজারের?’-এই বলে
শীতের সকালে চামসে চাদরখানা ভালো করে জড়িয়ে নেয় গায়ে
[কবি (উত্তরসূরী, কার্তিক-পৌষ, ১৩৬২)]

এই তিনটি কবিতার সুর অ্যান্টি-পোয়েট্টি বলা যেতে পারে। এই মেজাজের কবিতাকে আরো সুস্থির প্রয়াস দিয়ে বৃহত্তর আয়তনে কোনো পুস্তকে রূপ দেবার সূযোগ জীবনানন্দের ঘটেনি। কিন্তু রূপ এবং ধ্বনিভঙ্গিটিকেও তিনি বুঝেছিলেন এবং ‘সমাজ ও সভ্যতার শববাহনের’ কাজ এড়িয়ে কাঁটা-কাঁটা বক্তব্যের পিছনেও সংবেদশীলতাকে গ্রাহ্য করে গেছেন।
শেষ পর্বে কিছু স্বরবৃত্তের চর্চাও জীবনানন্দ করেছিলেন। ‘যুগের অবাধ উচ্ছৃঙ্খলতা দমন করার জন্য সর্বব্যাপী নিপীড়নের যে পরিচয় পাওয়া যায় রাষ্ট্রে ও সমাজে সেইটে কাব্যের ছন্দালোকে নিঃসংশয়রূপে প্রতিফলিত হলে মাত্রাবৃত্ত মুক্তকের জন্ম হয় কি না ভেবে দেখা যেতে পারে।’ এইসব এবং নাট্য-কবিতার সম্ভাবনাও তিনি ভেবে গিয়েছিলেন। এই প্রবন্ধে এই প্রসঙ্গগুলো ব্যাপকভাবে আলোচনার অবকাশ নেই। এটি স্বতন্ত্র আলোচনার বিষয়।

সারমর্ম হচ্ছে:
জীবনানন্দ দাশ লয়, ধ্বনি, বিশ্লিষ্ট শব্দচয়ন, বাকস্পন্দ, তদ্ভব শব্দ এবং তার লৌকিক ব্যবহারজাত ক্ষমতার প্রয়োগ, নিঃশব্দতার ব্যবহার, বিশেষণ ও ক্রিয়াপদের কৌশলে বাঙলা কবিতায় একটি অদ্বিতীয় শ্রুতিকল্পের জন্ম দিয়েছিলেন-যা আগে ছিলো না এবং যার পরবর্তী অনুসরণ করতে গেলে নিজস্ব কণ্ঠস্বর থাকে না:

একদিন শুনেছ যে-সুর-
ফুরায়েছে,-পুরানো তা-কোনো এক নতুন-কিছুর
আছে প্রয়োজন,
তাই আমি আসিয়াছি,-আমার মতন
আর নাই কেহ!
[কয়েকটি লাইন (ধূসর পাণ্ডুলিপি)]

জীবনানন্দীয় ধ্বনির শ্রুতিকল্প গঠনের কৌশল নিয়ে কথা বলেছি। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়-কৌশল আগে, না ভাবনা আগে। ভাবনা, মানে কবিতায় হাত দেবার আগে জগৎ, জীবন, ব্যক্তি, সমাজ, ইতিহাস এসব সম্পর্কে ধারণা। আর এ দুয়ের, মানে বোধ ও কৌশলের পারস্পরিক আদান-প্রদান ও নির্ভরতার সূত্র কী? সব কবির বেলায় সেই সূত্র কি একই? নাকি কবি নির্বিশেষে সেই তত্ত্ব পাল্টায়? এসব আলোচনার অবকাশ এখানে নেই। তবে টেকনিকের সঙ্গে বোধের পারস্পরিক রসায়নে বোধই নিরূপক: মুখ্য ও মৌলিক। কল্পনা-প্রতিভাই নিয়ন্ত্রণ করে কবিতার রূপ। ‘স্মরণীয় বাণী’ নয়, বিশ্ব-রহস্য সম্বন্ধে নতুন ‘দায়িত্বর্পূণ মহদুক্তি’ করবার মতো প্রতিভায় তিলে তিলে জন্মায় কবিতার আত্মা; কবিতার আত্মা জড়িয়ে ওঠে এবং জড়িয়ে থাকে কবিতার রূপ; জড়িয়ে থেকেই বিচ্ছুরিত করে কবিতার আত্মা ও রূপের ঐশ্বর্য্য। তাই অর্ন্তদীপ্ত হয়ে উঠে আমরা অনুভব করি কবি জীবনানন্দ দাশের জগৎ, জীবন ও কালকে বুঝে ওঠার প্রতিভা, অবলোকন ও অবগাহন থেকে পরিস্রুত সারাৎসার পরিগ্রহণের প্রতিভা। এবং এই অর্ন্তদৃষ্টির আলোকেই তাঁর পৃথিবী তাঁর পূর্বজনদের পৃথিবীর থেকে পৃথক এবং তাঁর সহচরদের থেকে তিনি কতো বেশি প্রভাস্বর।

দুর্ঘটনায় আহত জীবনানন্দ যখন হাসপাতালে, জীবনাবসানের দুদিন আগে খুব ভোরে জেগে গিয়ে প্রশ্ন করেছিলেন:

“এখন ক’টা বাজে?”
‘ভোর পাঁচটা।’

‘লিখে রাখ আজকের তারিখটি, আজ থেকে গত এক-বৎসর খুব গুরুত্বপূর্ণ সময়। এখন ভোর না সন্ধ্যে? আমি কি দেখতে পাচ্ছি জান? বনলতা সেন-এর পাণ্ডুলিপির রঙ।’

জীবনানন্দ কি সেই পাণ্ডুলিপির সঙ্গে সঙ্গে শুনেছিলেন জলের মতো ঘুরে ঘুরে, থেমে, চলে, বেঁকে উপল এড়িয়ে তাঁর কবিতার অন্তঃসার স্রোতের ধ্বনি-প্রতিধ্বনি?

তথ্যপঞ্জি:
১. শঙ্খ ঘোষ, নির্মাণ ও সৃষ্টি, বিশ্বভারতী, ২২ শে শ্রাবণ, ১৩৮৯ বঙ্গাব্দ, পৃষ্ঠা: ২.২:
‘জলের উচ্ছ্বাসে পিছে ধূ-ধূ জল তোমারে যে ডাকে’ বা নক্ষত্রের মতন হৃদয়/পড়িতেছে ঝরে’র মত কথার স্বাদ যে জানবে সকলে, জীবনানন্দ তা জানেন, কেননা ‘জান নাকো তুমি তার স্বাদ,/তোমারে নিতেছে ডেকে জীবন অবাধ,/জীবন অগাধ।’ কিন্তু রবীন্দ্রনাথও কি জানবেন না? ‘যে নক্ষত্র মরে যায়, তাহার বুকের শীত/লাগিতেছে আমার শরীরে’, জীবনানন্দের এই ছবি ও গান কি রবীন্দ্রনাথের থেকে এতই দূরের? তারকার আত্মহত্যা’র মতো কবিতায় যেখানে ‘শত মৃত তারকার মৃতদেহ রয়েছে শয়ান’, সেখান থেকেই কি একদিন শুরু হয়নি এই কবিরও চলা?’
ধ্বনিগতভাবে সন্ধ্যাসঙ্গীত থেকে জীবনানন্দীয় সুর কতোটা আলাদা, কেনো আলাদা, কীভাবে আলাদা-সে কথা বলেছি, লক্ষ করার বিষয়, নির্মাণ ও সৃষ্টির ২০২ পাতা ছাড়া অন্য কোথাও শঙ্খ ঘোষের এই ভাবনার পুনরুক্তি শুনিনি; ছন্দের বারান্দা’ বইতেও না। বুদ্ধদেবের পরে শঙ্খ ঘোষের ‘শত জলঝরনার ধ্বনি’ ছন্দের বারান্দা প্রবন্ধটি জীবনানন্দের ছন্দ-ধ্বনি বিষয়ে প্রবলভাবে গূঢ় এবং অর্ন্তভেদী রচনা।
২. জীবনানন্দের ধ্বনি-চারিত্র্য বিষয়ে মৌলিক আলোচনা করেছেন:
২.ক বুদ্ধদেব বসু, প্রকৃতির কবি, কবিতা, চৈত্র ১৩৪৩ বঙ্গাব্দ।
২.খ শঙ্খ ঘোষ, শত জলঝরনার ধ্বনি, ছন্দের বারান্দা, অরুণা প্রকাশনী, ষষ্ঠ মৃদ্রণ, ১৩৯৮ বঙ্গাব্দ।
২.গ দেবীপ্রসাদ বন্দ্যোপাধ্যায়, ছন্দ-গদ্যছন্দ, জীবনানন্দ বিকাশ-প্রতিষ্ঠার ইতিহাস, দ্বিতীয় সংস্করণ, ভারত বুক এজেন্সি, ১৯৯৭ খ্রিস্টাব্দ।
২.ঘ দেবেশ রায়, গন্ধের কথাও তুলিনি, বিভাব, জীবনানন্দ জন্মশতবর্ষ সংখ্যা, ১৯৯৮ খ্রিস্টাব্দ।
৩. Charles Baudelaire, The Flowers of Evil, A Selection edited by Marthid and Jackson Mathews, New Directions. 10th Printing.
৪. Ed. Bradford Cook, Mallarme:Selected Prose, Essays and Letters, The Johns Hopkins University Press, 1956.
Crisis in Poetry প্রবন্ধে মালার্মে সঙ্গীত ও কবিতার সম্পর্কে তাঁর ধারণা বিবৃত করেছেন।
৪.ক মালার্মের শ্রুতিকল্প বিষয়ক ভাবনাকে বিস্তৃতভাবে আলোচনা করেছেন জাঁ পল সার্ত্র : What is Literature, Jeau Paul Sartre, Harper & Row Publishers.1965.
৫. The Music of Poetry, Selected Prose of T.S. Eliot, A Harvest Book, Harcourt Brace and Company. The Centenary Edition.
৬. সমর চক্রবর্তী, শেষের ক’দিন, বিভাব, জীবনানন্দ জন্মশতবর্ষ সংখ্যা, ১৯৯৮ খ্রিস্টাব্দ।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

৯ thoughts on “জীবনানন্দের শ্রুতিকল্প : একটি মূল্যায়ন

  1. আমার একটা কবিতার গবেষনা করে
    আমার একটা কবিতার গবেষনা করে দিয়েন তো রুদ্র ভাই। আমার কবিতা অপাঠ্য। আপনি কোন ভাবে বুঝিয়ে দিতে পারবেন আমার কবিতা শ্রেস্ঠ। :p

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

+ 37 = 43