বিপ্লবের শক্তিকেন্দ্রগুলোকে পাঠ গ্রহণ করতে হবে

শাহরিয়ার কবিরের একটি সাক্ষাৎকার নিয়েছিলাম ‘সাপ্তাহিক’-এর ঈদ সংখ্যার জন্য। যেখানে তার বাম রাজনীতি সংশ্লিষ্টতার কথা এসেছে স্বাভাবিকভাবেই। কমরেড বদরুদ্দীন উমর, তাদের পার্টি ও লেখক শিবির নিয়ে সেখানে তিনি অনেক কথাই বলেছেন। তার একাংশ তুলে এর আগে পোস্ট দিয়েছিলাম ব্লগে। পোস্টের শিরোনামে উমর ভাইয়ের প্রতি কমরেড সম্বোধনটার পাশাপাশি, ভেতরে যোগ করেছিলাম যে, এখানে আমার ব্যক্তিগত কোনো মত নেই। তার পরেও এ নিয়ে নানামুখী বিতর্ক হয়েছে। কিন্তু আমার মনে হয়েছে, অধিকাংশ কথা বার্তা হয়েছে ভুল পথে। শাহরিয়ার কবির এখন পরিক্ষীত আওয়ামী বুদ্ধিজীবী। আর কমরেড বদরুদ্দীন উমর আমাদের লোক, এদেশের কমিউনিস্ট আন্দোলনের একাংশ। আমি চেয়েছিলাম, শাহরিয়ার কবিরের এসব বক্তব্যের সত্য-মিথ্যা যাচাই করে এবং এখানে যেসব মত এসেছে তা সম্পর্কে উমর ভাই বা তাদের পার্টি থেকে বক্তব্য দেয়া হবে। ব্যস, এই পর্যন্তই। কিন্তু তা না হয়ে বিনা কারণে জল ঘোলা হলো। এতে খারাপ লেগেছে।

আগের পোস্টে দেয়া অংশে সাক্ষাৎকারের আরেকটা দিক আসেনি। যেখানে শাহরিয়ার কবির দাবি করেছেন যে, উমর ভাইকে তিনিই পার্টিতে আসার আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। সেই অংশটা এখানে তুলে দেই প্রথমে। তারপর আমার কিছু কথা বলব।

”শাহরিয়ার কবির : বদরুদ্দীন উমরের সঙ্গে সংস্কৃতির সূত্রেই যোগাযোগ। তখন সংস্কৃতিতে একটা দারুণ লেখা বেরিয়েছিল। চারু মজুমদারের পার্টির সমালোচনা করে চীনা পার্টির নেতা চৌ এন লাই ও কাঙশেঙ-এর একটা চিঠি। এটা ছাপার পরে মতিন-আলাউদ্দিনদের পার্টিতে বদরুদ্দীন উমরকে নিয়ে কড়া প্রতিক্রিয়া হলো। তারা প্রায় সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলল যে, উমর ভাইকে মেরে ফেলতে হবে। এটা আমাকে বড় রকমের নাড়া দিয়েছিল। আমার বাড়িতে বসে তারা এসব ভাবছে। আমি তো ভীষণ রেগে গেছি! পত্রিকায় কি লেখা হয়েছে তা নিয়ে সমালোচনা থাকতে পারে, তাই বলে খতম করতে হবে! এতে বিপ্লব কিভাবে লাভবান হবে আমি তো এটা বুঝতে পারছি না। তারা যুক্তি দেখালেন, আওয়ামী লীগের থেকেও বেশি ক্ষতি করছেন তিনি। তখন আমি তাদের বলে দিলাম, আপনারা যদি এই খতমের লাইন ত্যাগ না করেন তাহলে আপনাদের সঙ্গে আমরা নেই।

খতমের লাইন নিয়ে তখন প্রশ্ন উঠে গেল গোটা পার্টিতে। আমি একা নই, বিভিন্ন দিক থেকে এবং দেখা গেল আলাউদ্দিন ভাই নিজেও খতমের রাজনীতির বিরুদ্ধে দাঁড়ালেন। তখন পার্টির সাধারণ সম্পাদক ছিলেন মনিরুজ্জামান তারা, সিরাজগঞ্জে বাড়ি তার। তিনি বললেন, না খতমই বিপ্লবের লাইন। আমরা ঢাকায় যারা ছিলাম, ঢাকা কমিটি এর বিরুদ্ধে দাঁড়ালাম। আমরা ভাবলাম এটা বন্ধ করতে হবে, মানুষের মধ্যে যেতে হবে। গণ আন্দোলন ছাড়া কিছু হবে না। খতম বর্জন করতেই হবে। এই বিতর্কটাকে কেন্দ্র করেই পরে ১৯৭৪ সালে ‘বিচিত্রা’য় আমার একটা উপন্যাস বেরিয়েছিল ‘ওদের জানিয়ে দাও’। পার্টির এই বিতর্কগুলোকে উপন্যাস আকারে প্রকাশ করেছিলাম। কারণ আমার মনে হয়েছিল প্রবন্ধ আকারে লিখে বেশি মানুষের কাছে পৌঁছানো যাবে না। তাই উপন্যাসে গোটা পরিস্থিতিটা তুলে ধরলাম। …

আলাউদ্দিন ভাই যখন খতমের বিপরীতে তখন আমি বললাম যে, আমাদের পক্ষে তাত্ত্বিকভাবে এটাকে বর্জন করার কোনো লাইন দাঁড় করানো কঠিন, সম্ভবই না। এখানে ব্যাপক তাত্ত্বিক জ্ঞান আছে এমন নেতা দরকার। পার্টিতে আলোচনা হলো বদরুদ্দীন উমর ভাইকে আমরা এটা বলতে পারি, তাকে পার্টিতে আমন্ত্রণ জানাতে পারি। তারা রাজি হলেন, আমি প্রস্তাব নিয়ে গেলাম। উমর ভাই বললেন, ঠিক আছে। তিনি পার্টির নেতাদের সঙ্গে কথা বলতে চাইলেন। কারণ তার কিছু লাইন আছে, আমাদেরও কিছু লাইন আছে। সামন্তবাদ, বিপ্লবের স্তর, এসব নিয়ে। মুক্তিযুদ্ধের বিষয়টাও ছিল গুরুত্বপূর্ণ। এই ইস্যুতে তিনি তখন তোয়াহাদের পার্টি ছেড়ে দিয়েছিলেন। তার কথা ছিল, আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে মুক্তিযুদ্ধ হলে বিপ্লব হবে না। কিন্তু তা সত্ত্বেও যুদ্ধ করতে হবে। পাকিস্তান থেকে মুক্তি পেতে হবে। এ ক্ষেত্রে পাকিস্তানিদের সঙ্গে কোনো সহযোগিতা, সমঝোতা করার সুযোগ নেই। এই ইস্যুতে তিনি পার্টি ছেড়ে দিয়েছিলেন। মতিন-আলাউদ্দিদের পার্টিতে দু’ রকমের মতই ছিল। পার্টির কোনো স্পষ্ট অবস্থান ছিল না। কেউ বলছে যুদ্ধ ঠিক হয়নি, আওয়ামী লীগের কাঁধে চেপে ভারত ক্ষমতায় এসেছে এই করে। কেউ বলছে, না যুদ্ধ ঠিকই আছে, তবে যুদ্ধ এখনো শেষ হয়নি। যুদ্ধ চালিয়ে যেতে হবে।

উমর ভাই এসব নিয়ে কথা বললেন। পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটিতে তাকে সরাসরি অন্তর্ভূক্ত করা হলো। তিনি তখন বললেন, পার্টির এই নাম চলবে না। বাংলাদেশে বসে পূর্ব বাংলা নাম রাখা যায় না। পার্টির কংগ্রেস করতে হবে। কংগ্রেস সব নিয়ম মেনেই হলো। উমর ভাই নিজেই কংগ্রেসের প্রতিবেদন লিখলেন। তখন বোধহয় আলাউদ্দিন ভাই জেলে চলে গেছেন। বাকি যারা ছিল তাদের নিয়েই কংগ্রেস হলো।…”

এই হলো শাহরিয়ার কবিরের বক্তব্য। এখন আমার কথা হচ্ছে, এই যে, তিনি এসব তথ্য দিচ্ছেন, এগুলো সম্পর্কে উমর ভাইদের পার্টি থেকে বক্তব্য আসা দরকার। এ থেকে সৃষ্ট যেকোনো বিতর্ক সুষ্ঠু পথে এগুনো দরকার। কমরেড উমর এ দেশের কমিউনিস্ট আন্দোলনের অগ্রদূতদের একজন। আমরা আজ কমিউনিস্ট আন্দোলনের পথযাত্রী। আমাদেরকে ইতোপূর্বের ভুল থেকে শিক্ষা নিতে হবে।

আগের পোস্টে গণসংগঠনের ওপর কর্তৃত্বারোপ প্রশ্নে কিছু মতামত ও তথ্য এসেছে শাহরিয়ার কবিরের কাছ থেকে। শুধু শাহরিয়ার কবির এ নিয়ে কথা বললে আমি গায়ে মাখতাম না। কিন্তু কিছুদিন আগে যখন অধ্যাপক আনু মুহাম্মদের সাক্ষাৎকার নিয়েছিলাম, তখন আনু ভাইও একই ধরণের কিছু কথা বলেছিলেন। সেই সাক্ষাৎকারটি এখন সিপিবির কিছু লোক প্রচার করে বেড়াচ্ছে। বোঝাই যাচ্ছে, সেটা কোনো না কোনোভাবে তাদের স্বার্থের সেবা করছে। গণসংগঠন পরিচালনা প্রশ্নে উমর ভাই প্রসঙ্গে একই ধরণের কথা জোনায়েদ সাকিও বিভিন্ন জায়গায় বলেছেন। যাদের কাছে বলেছেন, তারা সাক্ষ্য দেয়ার সাহস রাখেন।

তাহলে দেখা যাচ্ছে যে, গণসংগঠন প্রশ্নে উমর ভাই সম্পর্কে এ ধরণের বক্তব্য অনেকেই দিচ্ছেন। আমাদের দেশে সাধারণত পার্টিগুলো ভাঙন বা কর্মীদের দলত্যাগের পর এই অপবাদ দেয় যে, তারা সুবিধাবাদি। এক্ষেত্রেও তাই দেখলাম। কাল ফেসবুকে ফার্মার ভাইয়ের ওয়ালে ফারুক আহমেদ নামক একজনের একটা স্ট্যাটাস দেখলাম, যেখানে বলা হচ্ছে যে, যারা পার্টি থেকে চলে গেছে , তারা অবিপ্লবী ও সুবিধাবাদি। ওই অংশটা হুবহু তুলে দেই- ”বহু কাছের মানুষ বদরুদ্দীন উমরকে ছেড়ে গিয়েছেন এটা বলে শাহরিয়ার কবীররা সেই সুবিধাবাদীদের চলে যাওয়ার দায়ও তাঁর ওপর দিতে ছাড়েন না । অন্য কিছু বুঝবারতো দরকার নেই, যাঁরা চলে গিয়েছেন তাঁদের পরবর্তী রাজনৈতিক এবং সামাজিক অবস্থানই বলে দেয় তাঁরা কেন চলে গিয়েছিলেন ।”

কথা হচ্ছে, ডা. সঈফ-উদ-দাহার, কর্নেল কাজী নূরুজ্জামান, ড. আহমদ শরীফদের পার্টিজানরা সুবিধাবাদি, অবিপ্লবী বা আদর্শহীন বলতে পারেন। কিন্তু আমি তার সঙ্গে একমত নই। অনেক ক্ষেত্রেই এদের সমালোচনা করা চলে, কিন্তু এরা কেউ রাষ্ট্রের দালাল ছিলেন না। জনগণের একটা পার্টিকে যদি বিপ্লব করতে হয়, তাহলে এদের জয় করতে হবে। না করতে পারলে লাইনগত দ্বিমত হবে, পার্টি ভাঙবে। কিন্তু এরা পার্টিতে নেই বিধায় সুবিধাবাদি- এই লাইন ভুল এবং এটার অনেক চর্চ্চা হয়েছে।

কিছুদিন আগে উমর ভাইয়ের একটা লেখার সমালোচনা করে আমি একটা লেখা লিখি এই ব্লগেই। উমর ভাই তার ওই লেখায় এদেশের মাওবাদি আন্দোলনকে এক পাল্লায় তুলে বলে দেন যে, তারা নাকি কোনো পরিবর্তন চোখে দেখে না। মাওবাদিদের গালি দিতে দিতে শেষ পর্যন্ত তার অবস্থানটা দাঁড়ায়- ‘এ দেশের নারী শ্রমিকদের ওপর নির্যাতন প্রায় শেষ হয়েছে’। এর বিরোধিতা করে লেখার পর তাদের পার্টির ‘জনযুগ’ পত্রিকায় আমাকে প্রায় শত্রু সাব্যস্ত করে একটা লেখা প্রকাশ করা হয়। যার শিরোনাম ছিল, ‘বিপ্লবের শক্তিকেন্দ্রগুলোকে পাঠ গ্রহণ করতে হবে’। আর সেটাই আমি এই পোস্টের শিরোনাম হিসেবে ব্যবহার করেছি। কারণটা যথেষ্ট যুক্তিসঙ্গত।

খোলা চোখেই দেখা যায়, এক সময় লেখক শিবির, ট্রেড ইউনিয়ন ফেডারেশন এবং ছাত্র ফেডারেশন, গণসংগঠন হিসেবে অনেক দূর এগিয়েছিল। কিন্তু সেই অগ্রগতিটা ধরে রাখা যায়নি। একে একে অনেকে দল ছেড়েছেন। কেউ বুর্জোয়া বনেছেন। কেউ পার্টি করেছেন, কেউ বা বিশেষজ্ঞ। অনেকে বিপ্লবে এখনো লেগে আছেন। এটাকে ‘সুবিধাবাদীদের বিপ্লবী পার্টিতে টিকতে না পারা’ হিসেবে আখ্যায়িত করাটা সমীচীন মনে করি না। আমি মনে করি, গণসংগঠন প্রশ্নে এই পার্টিটা যথেষ্ট ভুলভাল করেছে। এ বিষয়ে তাদের আত্মসমালোচনা করা উচিত। কমিউনিস্ট আন্দোলনের অংশ হিসেবে অগ্রদূতদের কাছ থেকে আমরা আত্মসমালোচনাটাও শিখতে চাই। মহান কমরেড মাও সেতুঙ সতত যার ওপর জোরারোপ করতেন। আশা করি, পূর্ব পুরুষরা আমাদের হতাশ করবেন না। সকল সাম্যবাদ আকাঙ্খী কমরেডদের প্রতি লাল সালাম।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

৩ thoughts on “বিপ্লবের শক্তিকেন্দ্রগুলোকে পাঠ গ্রহণ করতে হবে

  1. আপনার কমরেড উমর এদেশের বাম
    আপনার কমরেড উমর এদেশের বাম আন্দোলনের বারোটা বাজিয়েছেন। রাজনীতি হতে হবে গণমানুষের সম্পৃক্তার মাধ্যমে। বিপ্লবের নামে কিছু সন্ত্রাসি দিয়ে সংগঠন গড়ে তোলা যায়, কিন্তু বিপ্লব হয় না। বামদর্শন বর্তমানে গোপন কোন দর্শন না। তাহলে আন্ডারগ্রাউন্ডে গিয়ে রাজনীতি করতে হবে কেন? কমরেড উমররা বর্তমান প্রজন্মের কাছে বাতিল জিনিস।

  2. গণমানুষের রাজনীতিতে যখন সংগঠন
    গণমানুষের রাজনীতিতে যখন সংগঠন বা সংগঠনের নেতা সম্পর্কে কোন বিতর্ক তৈরী হয়, পার্টির উচিত বক্তব্যের মাধ্যমে বিতর্কের জবাব দেওয়া। যদি সেই পথে না যায়, তাহলে বুঝতে হবে ‘ডাল ম্যা কুছ কালা হে’।

    উমর ভাইকে নিয়ে আপনার পোস্টগুলোর পর তাদের পার্টির এবং তার সুষ্পষ্ট বক্তব্য যদি আসত তাহলে বিভ্রান্তি দুর হত। যতক্ষণ কোন বক্তব্য না আসছে ততক্ষণ পর্যন্ত উমর ভাই সম্পর্কে যতগুলো বক্তব্য এসেছে সবগুলোকে আমরা সত্য বলেই ধরে নেব।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

30 − 24 =