শামসুর রাহমানের অপ্রকাশিত কবিতা : কেন তুমি

কেন তুমি
(রচনাকাল ১৯৭২ খ্রিস্টাব্দ)

কেন তুমি মুখ নিচু করে থাকো সারাক্ষণ
কেন লোকলোচনের অন্তরালে থাকতে চাও
তোমার কিসের লজ্জা
কোন পাপবোধে আজকাল তোমাকে ওমন দীন ছায়াছন্ন করে রাখে
কেন তুমি ম্লান মুখচোরা হয়ে রইবে সর্বদাই
না বললেও বুঝি, গলায় কলস বেঁধে
ভয়ানক নদীর গহনে চলে যেতে চাও তুমি

অথবা হঠাৎ

আগুনে ঝাঁপিয়ে পড়ে ভষ্ম হতে চাও
কিংবা ভয়প্রদায়িনী আঁধারে ঘুমের বড়ি খেয়ে
অনরোলা ক্রুর যন্ত্রণার থেকে মুক্তি পেতে চাও
জানি, তুমি পিপাসার্ত পথিকের মুখে
কখনো পারনি দিতে এক ফোঁটা জলও
ক্ষুধার্তের ভিড় তোমার দরজা থেকে ফিরে গেছে

কিংবা হায়

ঝুলিয়ে হারমোনিয়াম সুর পরায়ন গলায়
বন্যার্তের জন্য চাঁদা তোলা হলো না তোমাকে দিয়ে
ক্যাম্পে আহত ব্যক্তির ক্ষঁতে কোনদিন বাঁধনি ব্যান্ডেজ
পাতনি মাইন ব্রিজে, উড়াওনি কনভয়
দুর্দার গ্রেনেড ছুড়ে ফ্রগম্যান সেজে বঙ্গোপসাগরে
পারনিকো ক্ষিপ্ত ডোবাতে জাহাজ
কিংবা দখলদার সৈনিকের বুকে বন্দুকের নল চেপে
তার বুক ঝাঁঝড়া করে দেয়া সাধ্যাতিত জেনেও ছিলে মুখ ঢেকে অন্ধকারে একা
কতদিন স্পষ্টত তোমারই চোখের সম্মুখে শিশু হারিয়েছে প্রাণ,
নারী তার সলাজ আরক্ত মাধুরিমা, তুমি কাকতাড়–য়ার ভূমিকাও করনি পালন

না! তুমি আঁধার নিবাসে মুখ রেখো না লুকিয়ে
আর থেকো না অমন নতজানু হয়ে
যেমন ভয়ার্ত পাপী ধর্মযাজকের প্রকোষ্ঠের সম্মুখে
একাকী হাঁটু গেড়ে বসে কাঁপায় অধর

বরং সহজ হও

সমুন্নত হোক গ্রীবা মরালের মতো আবার মোহন অহংকারে
হে আমার কবিতা কল্পনা লতা তুমি
ধিক্কারে ঘৃণায় ক্ষোভে কখনো যেয়ো না বনবাসে
ভয়ানক মারের সাগরে ভেলা যে ভাসিয়ে ছিলে
ছিলে আমার হৃদয়ে, ছিলে সর্বদায়
তার নিভৃত মাইফেলে সন্ত্রাসের প্রহরে প্রহরে

তাই হে আমার সিন্ডারেলা
বেলা-অবেলায় তোমারই উদ্দেশে শ্লোকরাজি আজও করি উচ্চারণ
তোমারই উদ্দেশে কেমন পুষ্পিত হয় অলৌকিক জমিজমা কিছু
শূন্যতায় গাঢ় আর চৈতন্যের মধুচন্দ্রিমায়।

প্রাসঙ্গিক ভূমিকা
ড. মো. আনোয়ার হোসেন

১৯৭২ সালে শামসুর রাহমান-এর রচিত ‘কেন তুমি’ কবিতা নিয়ে আলোচনা করবো। এই কবিতাটি আমার কাছে দীর্ঘদিন সংগ্রহে ছিলো, অবশেষে আমার সন্তানসম প্রিয় ছাত্র রুদ্র সাইফুল’কে প্রকাশ করার জন্য দেই।

৭২ সালে কার্জন হল প্রাঙ্গণে আমাদের প্রাণরসায়ন বিভাগের সামনে ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবস উদযাপন অনুষ্ঠানে আমি কবিতাটি আবৃত্তি করেছিলাম। যারা সক্রিয়ভাবে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিতে পারেনি বলে আত্মগ্লানি ও হতাশায় নিমজ্জিত ছিলো, তাদের উদ্দেশ্যে তিনি এই কবিতাটি লিখেছিলেন। আমাদের মস্তিষ্কের ধূসর স্মৃতি কোষে নানা তথ্য আমরা সঞ্চয় করে রাখতে পারি। সেই ৭২ সালে আবৃত্তির জন্য কবিতাটি মুখস্ত করেছিলাম। পরে ৭৫ পরবর্তী প্রায় ৫ বছর কারাবাসকালে স্মৃতিকোষ থেকে কবিতাটি মনে করে বারবার আবৃত্তি করেছি।

সম্ভবত ২০০৩ সালের বাঙলা একাডেমীর বইমেলায় গিয়েছি, সাথে কল্পনা ও দীপান্বিতা। শামসুর রাহমানের শ্রেষ্ঠ কবিতা বইটি দেখে কিনলাম। উদ্দেশ্য সেই ৭২ সালে লেখা কবির কবিতা ‘কেন তুমি’ খুঁজে পাওয়া। বাসায় এসে পুরো বই খুঁজলাম, ভারী অবাক হলাম ! শ্রেষ্ঠ কবিতা সংকলনে আমি খুঁজে পেলাম না এই কবিতাটি। এতো ভালো একটি কবিতা শ্রেষ্ঠ কবিতা সংকলনে স্থান পেলো না ! কবির বাসার ফোন নাম্বার সংগ্রহ করে ফোন করলাম কবি পত্নী ফোন ধরে বললেন কবি দেশের বাইরে চিকিৎসার জন্য গেছেন, সপ্তাহখানিক পরেই ফিরবেন। সময় অনুযায়ী সপ্তাহখানিক পরে এক শ্রক্রবার সকালে ফোন করলাম, কবিকে পেলাম; তিনি বললেন চলে আসুন। পরিবারের সবাইকে নিয়ে কবির শ্যামলীর বাসায় গেলাম। সাথে নিয়ে গেছি আমার সংগ্রহে থাকা কবিতাখানি। কুশল বিনিময়ের পর আমার আসল উদ্দেশের কথা জানালাম কবিকে। তাঁর হাতে কবিতাখানি দিতেই তিনি বললেন, ‘এই কবিতা কোথায় ছিলো এতো দিন? আমি মনে করেছিলাম হারিয়ে ফেলেছি। এই কবিতা আমার কোনো কবিতার বইতেও নেই।’

এই হলো শামসুর রাহমান, বাঙলাদেশের প্রধান কবি। তাঁর অমূল্য এই সৃষ্টিকর্ম দীর্ঘদিন সংগ্রহে রাখার পরে অবশেষে সন্তানসম রুদ্র সাইফুল’কে ছাপতে দিয়ে আমি কিছুটা ভারমুক্ত।

অধ্যাপক ড. মো. আনোয়ার হোসেন, উপাচার্য জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

৫ thoughts on “শামসুর রাহমানের অপ্রকাশিত কবিতা : কেন তুমি

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

− 4 = 2