‘আমি আঁকতে চাই মানবতা, মানবতা। এবং শেষ পর্যন্ত মানবতা।’- ভ্যান গখ

This world was never meant for one as beautiful as you …

কোন শক্তি মানুষকে বড় করে তোলে? মহৎ করে তোলে? মানুষের প্রতি ভালোবাসা – যে মানুষ নিপীড়িত-বঞ্চিত, হতভাগ্য-পদদলিত যে মানুষ, সেই মানুষের প্রতি ভালোবাসা। এ কথা সত্য বিজ্ঞানে, রাজনীতিতে। এ কথা আরো প্রবলভাবে সত্য শিল্পের সাধনায়।


This world was never meant for one as beautiful as you …

কোন শক্তি মানুষকে বড় করে তোলে? মহৎ করে তোলে? মানুষের প্রতি ভালোবাসা – যে মানুষ নিপীড়িত-বঞ্চিত, হতভাগ্য-পদদলিত যে মানুষ, সেই মানুষের প্রতি ভালোবাসা। এ কথা সত্য বিজ্ঞানে, রাজনীতিতে। এ কথা আরো প্রবলভাবে সত্য শিল্পের সাধনায়।

পিতা ছিলেন পল্লীগ্রামের একজন নিষ্ঠাবান ধর্মযাজক। পিতার কাছ থেকে সে পেয়েছিল খ্রিস্টান ধর্মের প্রতি গভীর বিশ্বাস। কিন্তু সেই সাথে তার মধ্যে ছিল মানুষের প্রতি গভীর দরদ ও মমত্ববোধ। শৈশব থেকেই সে ছিল অত্যন্ত আবেগপ্রবণ, একই সঙ্গে অন্তর্মুখী। কথাবার্তায়, চলনে-বলনেও সে ছিল অপটু, আনাড়ি। দেখতে সে মোটেও সুদর্শন ছিল না, প্রকৃতি তাকে রূপ দেয় নি – আরো রূঢ় ভাষায় বললে সে ছিল কুদর্শন। তার নাকটা ছিল বিরাট, বিকট। মুখমণ্ডলে সৌন্দর্য্যের ছিটেফোঁটাও ছিল না। শিশুরা তাকে দেখলে ভয়ে পালাত। অথচ তার চোখদুটো ছিল গভীর সবুজাভ, যে-চোখ দিয়ে সে পৃথিবীর দিকে তাকাত শিশুর মতো অপলক বিস্ময়ে, অনিশ্চয়তা ভরা অস্থিরতায়।

স্কুল জীবন শেষে পরিবারের সহায়তায় তার চাকুরি জুটল প্যারিসের এক শিল্প-ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানে সহকারি কর্মচারী হিসাবে। চাকুরির সুবাদেই তাকে যেতে হল লন্ডনে। সেখানে বিকট-দর্শন এই তরুণটি প্রেমে পড়ল বাড়িওয়ালার মেয়ের। মেয়েটিকে সে ভালোবেসেছিল আকুলভাবে, কিন্তু প্রত্যাখ্যান ছিল অবধারিত। এরকম একটি কুৎসিত-দর্শন তরুণের প্রেমে সাড়া কে দেবে? শুধু তাই নয়, মেয়েটির বিদ্রূপাত্মক হাসি আর ঘৃণা তার হৃদয়টাকে দুমড়ে-মুচড়ে রক্তাক্ত করে দিল। অফিসের কর্তাব্যক্তিদের সহায়তায় সে ফিরে এল প্যারিসে।
প্যারিসে সে ফিরলো ঠিকই কিন্তু চাকুরিটা টিকল না, কর্তৃপক্ষ তাকে বরখাস্ত করল। উদভ্রান্তের মতো সে পুনরায় ফিরে গেল লন্ডনে – বস্তির মানুষের মধ্যে ধর্মপ্রচার করতে। নিজের ভাগ্যটাকে যাচাই করার উদ্দেশ্যে পুনরায় সে গিয়ে দাঁড়াল মেয়েটির সামনে। আবারো প্রত্যাখ্যান। এরপর কিছু দিন এক বোর্ডিং স্কুলে শিক্ষকতার চাকুরি। কিন্তু অস্থিরতা তাকে সেখানেও টিকতে দিল না। এবার পরিবারের সহায়তায় সে গেল যাজক-বৃত্তি শেখার জন্য। শিক্ষার্থী হিসাবে সে মোটেও সফল হয়নি, কিন্তু কর্তৃপক্ষ তাকে দয়া করে পাঠিয়ে দিল বেলজিয়ামের কয়লাখনি অঞ্চল বরিনেজ-এ।

কয়লা খনির মজুরদের অবস্থা তার চোখে জগতের আরেকটা চেহারা উন্মোচিত করল। এই তাহলে মানুষের জীবন! ভোরের আলো ফুটে ওঠার আগেই জীবন হাতে নিয়ে শ্রমিকদের নেমে যেতে হয় দেড় হাজার, দু’হাজার ফুট মাটির তলায়, গভীর অন্ধকারে। পাথর কেটে কেটে তুলে আনতে হয় কয়লা। ১০-১১ বছরের ছোট শিশুরাও কাজ করে কয়লাখনিতে। হাড় ভাঙা এই খাটুনির বিনিময়ে কি পায় তারা? পেট ভরে দু’মুঠো খেতেও পায় না। বাসস্থানগুলো নোংরা, অস্বাস্থ্যকর। পোশাকগুলো ছেঁড়া। এই তো খনিশ্রমিকদের জীবন! এসব দেখে তার সংবেদনশীল মন বেদনায় ভরে গেল। নিজের সামান্য টাকাপয়সা যা ছিলো সব ওদের মধ্যে বিলিয়ে দিয়ে নিজে উপোস করতে লাগল। গায়ের জামাটুকু ছাড়া অন্য জামাগুলোও সে বিলিয়ে দিল। খনি শ্রমিকদের শিশুদের পড়ানো, আহত-অসুস্থদের সেবা-শুশ্রূষায় নিজেকে নিয়োজিত করল। ওই সময় ছোট ভাইয়ের কাছে এক চিঠিতে সে লিখেছিল : ‘আমি আমার সত্তাকে বাঁচানোর চেষ্টা করছি, পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম শিল্পী খ্রিস্টের মতোই রক্তমাংসের জীবন্ত মানুষদের নিয়ে কাজ করছি।’

শ্রমিকদের এই দুর্দশাপীড়িত জীবন তার মনে যে অভিঘাত সঞ্চার করল, সেটা ব্যক্ত করতেই সে শুরু করল ছবি আঁকা। কয়লাখনির মজুরদের স্কেচ করতে শুরু করল সে। ছবি সে এর আগেও কিছু এঁকেছে লন্ডনের বস্তিবাসীদের, সেটা ছিল খানিকটা শখের বশে। কিন্তু এবার ছবি আঁকতে গিয়ে তার মনে বিদ্যুৎ-ঝলকের মতো এই উপলব্ধি জেগে উঠল যে সে শিল্পী। শিল্পের সাধনাতেই তার মুক্তি। তখন তার বয়স ছাব্বিশ! এ সময় একটি চিঠিতে সে লিখেছিল, ‘আমি আঁকতে চাই মানবতা, মানবতা। এবং শেষ পর্যন্ত মানবতা।’

শ্রমিকদের প্রতি তার এই সহানুভূতি খ্রিস্টের বানী-প্রচারকারী কর্তৃপক্ষের পছন্দ হল না। বিতাড়িত হল সে। এরপর কিছুদিন সে হল্যান্ডের নানা জায়গায় ঘুরে বেড়ালো ছন্নছাড়ার মতো। তারপর প্যারিস হয়ে একসময় ফিরে এল নিজের বাড়িতে। তখন সে অসুস্থ। কিন্তু তার মাঝেও চলছে ছবি আঁকা। এসময় আরো একবার প্রেমে পড়ল সে। নিজের বিধবা মাসতুতো বোনকে বিয়ে করতে চেয়েছিল এবং প্রত্যাখ্যাত হল। নির্মম এক সত্যের মুখোমুখি দাঁড়ালো সে – ভালোবাসা নামক মহৎ মানবিক সৌন্দর্য্যের পরশ এ জীবনে সে পাবে না। প্রত্যাখ্যানের এই কথাগুলোকে তার ভাষায় ‘বরফ পিণ্ডের মতো ঘষতাম আমার বুকে, হৃদয়ের উষ্ণতায় সেগুলোকে গলিয়ে ফেলার জন্য।’

এরপর কিছুদিন হেগ-এ চলল ছবি আঁকার সাধনা। এখানে একটি মেয়ের সাথে তার পরিচয় হয়। এই মেয়েটি পেশায় দেহপসারিনী। একে তার মুখজুড়ে অজস্র বসন্তের দাগ, তার উপর তখন সে সন্তানসম্ভবা আর তাই বাজারে তার কোনো চাহিদা নেই। মেয়েটির কোনো আয়-রোজগারও নেই। এই মেয়েটি তার মডেল হতে রাজি হয়। কিছুদিন এর সাথেই বসবাস করে সে। এ সময় মেয়েটির একটি ছবি এঁকে নাম দেয় sorrow বা ‘বেদনা’, আর তার নীচে সে লেখে : ‘একজন নারী কীভাবে এমন নিঃসঙ্গ ও পরিত্যক্তা হয়?’ একটি সন্তান জন্ম দিল মেয়েটি, আয়-রোজগারহীন সংসারে টানাটানি বাড়ল। ঝগড়াও হয়ে দাঁড়াল নিত্য দিনের সঙ্গী। পরিস্থিতি চরমে পৌঁছালো যখন মেয়েটি রোজগারের আশায় গোপনে আবার দেহ বিক্রি শুরু করল। শেষ পর্যন্ত ছোট ভাই এসে তাকে এই জরাজীর্ণ, অর্ধাহারী ও অসহায় অবস্থা থেকে পুনরুদ্ধার করে।

হেগ থেকে ফিরে বাড়িতে দু’বছর ছিল সে। এসময় প্রতিবেশী একটি মেয়ের সাথে তার বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে। মেয়েটি তাকে বিয়েও করতে চায়। কিন্তু এ যেন নিয়তির মতো – মেয়েটির বাড়ির লোকজন আপত্তি জানায় বিয়েতে। মেয়েটি আত্মহত্যার চেষ্টা করে। আর তরুণ শিল্পী কিছুদিন পর ফিরে গেল প্যারিসে। গ্রামে থাকতে সে এঁকেছিল জমিতে কাজ করা চাষীদের ছবি। এ সময় সে আঁকে ‘দ্য পটেটো ইটার্স’ নামের একটি ছবি। একটি চাষী পরিবার টেবিলে বসে খাচ্ছে – অতি সাধারণ দৃশ্য, কিন্তু তার মাঝেই ফুটে উঠল শিল্পীর যন্ত্রণাবিদ্ধ হৃদয়ের গভীরে থাকা মৌলিকতার আভাস।

প্যারিসে এই প্রথম শুরু হল তার প্রথাগত চিত্রকলা শিক্ষা। এ সময় তার সাথে তখনকার বেশ কয়েকজন নামকরা শিল্পীর ঘনিষ্ঠতা গড়ে ওঠে। তারা হলেন পিসারো, লত্রেক ও স্যেউরা (Seurat), যারা প্রত্যেকেই তার দক্ষতা স্বীকার করে নিয়ে তাকে উৎসাহিত করেছে। ছোট ভাইয়ের সহায়তায় এরপর সে চলে গেল দক্ষিণ ফ্রান্সের শহর আর্ল-এ। এখানে সে ডেকে আনল শিল্পীবন্ধু গগ্যাঁকে। কিন্তু দু’জনের মিল হল খুব সামান্যই। অল্পতেই লেগে যেত তুমুল ঝগড়া। তার ছবি দেখে নাক সিঁটকাতো গগ্যাঁ, আর হতাশায় শিউরে উঠত সে। আর্ল-এ রোদের তাপ প্রচণ্ড তীব্র। কিন্তু সেই রোদের মধ্যেই টুপি ছাড়া দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে শত শত ছবি এঁকে চলে সে। তার ক্যানভাসে যেন রঙের বন্যা বয়ে যাচ্ছিল। এটিই সেই অফুরন্ত, স্বতঃস্ফূর্ত সৃজনশীলতার কিংবদন্তীয় পর্যায়। এ সময় ‘দ্যা নাইট ক্যাফে’-সহ প্রায় ২০০ ছবি আঁকা হয়।

এ সময়ই তার মধ্যে উন্মাদনার প্রকোপ প্রকাশিত হতে থাকে। একবার সে ক্ষুর হাতে গগ্যাঁকে তাড়া করে। পালিয়ে আত্মরক্ষা করে গগ্যাঁ। তারপর ঘটে সবার জানা সেই ঘটনা – নিজের কান কেটে পাঠিয়ে দেয় এক গণিকাকে। মেয়েটি তাকে নিয়ে চরম উপহাস করেছিল। সে যে কুৎসিত এটা তো সে জানতো। মেয়েটি সেই ক্ষতেই আঘাত করে : ‘তুমি খুবই সুন্দর আর সবচেয়ে সুন্দর হল তোমার কানদুটো। এর একটা আমাকে বড়দিনের উপহার হিসাবে দাও।’ অর্ধোন্মাদ অবস্থায় সে ফিরে আসে নিজের ঘরে, বিষয়টা তাকে ক্রমাগত পীড়িত করতে থাকে। অবশেষে থাকতে না পেরে মানসিকভাবে চরম বিপর্যস্ত অবস্থায় একটি ক্ষুর দিয়ে নিজের ডান কানটি কেটে তার হাতে দিয়ে আসে।

হাসপাতালে চিকিৎসার পর খানিকটা সুস্থ হল সে। কিন্তু মানসিক ভারসাম্য ফিরে এল না। আশেপাশের লোকজনও তাকে দেখলেই উত্যক্ত করত। তার বাড়ির বাইরে ভিড় করত। তখন তাকে পাঠানো হয় প্যারিসের নিকটবর্তী আভার্স-এর একটি বেসরকারি উন্মাদাশ্রমে। এক বছর তাকে কাটাতে হয় এই নিরাময় কেন্দ্রে। কাজ চলছিল আগের গতিতেই। এই সময় আঁকা হয় ‘সানফ্লাওয়ার’, ‘স্টারি নাইট’-এর মতো ছবিসহ প্রায় ১৫০টি ছবি। মানসিক বিকারগ্রস্ত অবস্থায় শেষ তিন বছর এই শিল্পী যেসব ছবি এঁকেছিল তার জন্যেই শিল্পের ইতিহাসে সে অমর হয়ে আছে।

তার মৃত্যুর কাহিনীও সবার জানা। নিরাময় কেন্দ্র ছেড়ে আসার পর প্যারিসের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে অভঁরো-তে শিল্পীবন্ধু ক্যামিলো পিসারোর সাথে থাকতে গেল সে । সেখানে ড. গাঁচের চিকিৎসাধীন থেকে মহা উৎসাহে আঁকতে লেগে গেল। কিন্তু সে বুঝতে পারছিল, আর কোনো আশা নেই – উন্মাদনা তার জীবনে চিরস্থায়ী হয়ে গেছে। এ জীবন তাকে কী দিয়েছে? তাহলে আর জীবনের এই দুর্বিসহ বোঝা বহন করা কেন? ২৭ জুলাই ১৮৯০। রিভলবার দিয়ে নিজের পেটে গুলি করল সে। খবর পেয়ে প্যারিস থেকে ছোট ভাই ছুটে এল। তার কোলে মাথা রেখে অত্যন্ত শান্ত ভঙ্গিতে নিজের পুরনো পাইপটাতে টান দিয়ে চিরদিনের মতো ঘুমিয়ে পড়ল শিল্পী। তার বয়স তখন মাত্র সাঁইত্রিশ বছর! যে গম খেতের ছবি আঁকতে ভালোবাসত সে, তার পাশেই তাকে সমাহিত করা হয়।

জীবনব্যাপী অনাদর ও উপেক্ষার মধ্যে নিঃসঙ্গ এই মানুষটির সান্ত্বনা ছিল তার ভাইয়ের ভালোবাসা ও গুণগ্রাহীতা। সে সম্পর্ক ভালোবাসার, বন্ধুত্বের, ভ্রাতৃপ্রেমের অতীত কোনো কিছু। যুক্তির হিসেব-নিকেশের ঊর্ধ্বে। দুই ভাইয়ের সম্পর্ক মহকাব্যের কাহিনীর মতো শাশ্বত আবেদনে মর্মস্পর্শী। ছোট ভাইটির এমন কোনো আর্থিক সঙ্গতিপূর্ণ অবস্থা ছিল না। তারপরও যে আবেগ, স্নেহ, গুণগ্রাহিতা ও গর্ববোধ নিয়ে সে তার চার বছরের বড় ভাইটিকে – যে একাধারে বিশৃঙ্খল, বাউন্ডুলে, অবুঝ, অভিমানী, অসমাদৃত, পরিত্যক্ত – সমর্থন জানিয়ে গেছে, ছবি আঁকার খরচ যোগানো থেকে শুরু করে তার সমস্ত দায়িত্ব পালন করে গেছে তা প্রায় তুলনারহিত।

সারাজীবন নিজের দুঃখ-যন্ত্রণা, শিল্প ও জীবন নিয়ে ভাবনার কথাগুলো চিঠির পর চিঠিতে লিখে গেছে সে। তার শেষ চিঠিটি পাওয়া যায় অসমাপ্ত অবস্থায়। ভাইয়ের কাছে লেখা এই চিঠিটির তারিখ ছিল ২৩ জুলাই ১৮৯০। নিজেকে গুলিবিদ্ধ করার পর তার পকেটে চিরকুটটি পাওয়া যায়। তার মৃত্যুর পর ছোট ভাইও আর বেশি দিন বাঁচে নি। ভাইয়ের মৃত্যুর তিন মাসের মাথায় সেও উন্মাদ হয়ে যায় আর ছ’মাসের মধ্যে তার মৃত্যু ঘটে। শিল্পীর মৃত্যুর পর ১৯১৪ সালে ছোটো ভাই থিওকে লেখা পত্রাবলী পত্রিকায় প্রকাশিত হওয়ার পর থেকে তার খ্যাতির সূচনা হয়।

সে জন্মেছিল ১৮৫৩ সালের ৩০ মার্চ হল্যান্ডে, ১৮৯০ সালের ২৯ জুলাই ফ্রান্সে তার জীবনাবসান ঘটে। এই পৃথিবীর আলোয় সে বেঁচেছিল মাত্র ৩৭ বছর। আর এর মধ্যে শিল্পী-জীবন মাত্র দশ বছরের – ১৮৮০ থেকে ১৮৯০! এই দশ বছরে সে এঁকেছিল নয়শটি তেলরঙ, জলরঙ আর ড্রয়িং মিলিয়ে সর্বমোট এগারোশটি ছবি। চিত্র-সমালোচকদের ভাষায়, ভ্যান গখ হচ্ছেন শিল্পীদের মধ্যে সেই দলের যারা ক্যানভাসে জগৎ সৃষ্টি করেছেন, দৃশ্যমান জগতের প্রতিচ্ছবি আঁকেন নি। কোনো একটি বিষয়বস্তু শিল্পীর মনে কোন ধরনের প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করত, সে তাই রঙে ও আকৃতিতে অভিব্যক্ত করত।

তলস্তোয় ও ডিকেনসের মতো, পৃথিবীর আরো অনেক শিল্পীর মতো গখ বিশ্বাস করত, শিল্পের একটি উদ্দেশ্য থাকতে হবে, ইচ্ছে করলে তাকে বার্তাও বলা যেতে পারে। তবে তা কোনো নীতিমালার বোঝা নয়, বরং মানুষের মনন জগতের চাহিদা পূরণের প্রয়োজনে। সমাজের মানুষে মানুষে বিভেদ ও দূরত্ব দূর করে মানুষকে এক মোহনায় একত্রিত করার প্রকৃত ধর্ম হিসাবে কাজ করবে শিল্প এবং পৃথিবীকে সকলের জন্য একটি সুন্দরতর স্থানে পরিণত করবে – এই ছিল তার বিশ্বাস। কিন্তু সব কিছুই তার বিরুদ্ধে ছিল – প্রশিক্ষণ ছিল এলোমেলো, স্বভাবের ছিল তীব্র অস্থিরতা, জীবন তাকে কিছুই দেয় নি। সে ছবি আঁকত যেনো নিজের খাপছাড়া যৌবনের ক্ষতিপূরণ করার দুর্বার তাড়নায়। আর যাবতীয় সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও আজ সে সবচেয়ে আধুনিক শিল্পীদের একজন হিসেবে উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। তাকে ধরা হয় সেই মুষ্টিমেয় শিল্পীদের একজন হিসাবে যার চিত্রাঙ্কনের ধারণা নিয়ে গভীর বিশ্লেষণের প্রয়োজন হয়। ছবিগুলো তার তোলপাড়-করা দুর্দশার প্রতীক, অস্বাভাবিক সংবেদনশীল সজীব সত্তার সঙ্গে আলো, রঙ ও মানবিকতার তীব্র উদ্দীপকের ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার শৈল্পিক ফসল।

আর সবার চোখে যে-বিষয়গুলো অতি সাধারণ, সেগুলিই তাকে নিয়ে যেত অন্য এক জগতে। একজোড়া পুরনো জুতো, ফুলদানীতে রাখা একগুচ্ছ সূর্যমুখী ফুল, গমের খেতের উপর উড়ন্ত কাক, জমিতে কাজ করা চাষী – এসবই তার কল্পনাকে উদ্দীপ্ত করত, ঠিক যেমন যিশুর জন্ম বা ক্রুশবিদ্ধ হওয়ার ঘটনা উদ্দীপ্ত করত প্রাচীন শিল্পীদের কল্পনাকে। সেই তাৎক্ষণিক উদ্দীপনাকে ধরে রাখার তাড়নায় সে রঙ ব্যবহার করত আঁকাবাঁকাভাবে, তার ভেতরের আগ্নেয়গিরি থেকে গলিত লাভার উদগীরণের মতো ছিটকে বেরিয়ে আসা হলুদ ও নীল রঙ ছড়িয়ে যেত ক্যানভাসে। তার শেষ জীবনের ছবিগুলো দেখলে বোঝা যায়, শিল্পী নিজে যখন যুক্তির শেষ সীমায় উপনীত হয় তখন তার মডেলগুলির কী পরিণতি হয়। শান্ত পৃথিবীকে সে দেখছে কম্পমান অবস্থায়, শস্যক্ষেত্রকে দেখছে যন্ত্রণায় ছুটে যেতে, ঘরবাড়িগুলো তাকিয়ে আছে এক ভয়ংকর ও নাটকীয় আকাশের দিকে – সবই তার বিপুল মানসিক আলোড়ন ও প্রত্যয়ের প্রতিচ্ছবি, যে-আলোড়ন ও প্রত্যয়ই প্রতিফলিত হয়েছে তার শিল্পে এবং তাকে টেনে নিয়ে গেছে তার অনিবার্য পরিণতির দিকে।

সে চেয়েছিলেন পৃথিবীর জন্য ছবি আঁকতে, চেয়েছিল লোকে যেমনভাবে শেকসপীয়র বা ডিকেনস বা মার্ক টোয়েনের কথা শোনে, ঠিক তেমনভাবেই তার কথাও শুনবে। শুধু ধনী ক্রেতা নয়, সাধারণ মানুষ তার ছবিকে ভালোবাসুক, সে তাই চেয়েছিল। সে এঁকেও ছিল সাধারণ মানুষদের ছবি, সমাজর নীচু স্তরের মানুষের ছবি, কোনো শিল্পী যাদের ছবির বিষয়বস্তু করার কথা ভাবে না। তার ছবিতে এসেছে ছিন্ন বসনের ভিখিরি, মলিন হয়ে যাওয়া ঢলঢল করতে থাকা জামা গায়ে শিশু, বয়স্ক নারী – তার ভাষায় ‘যাদের মুখ ঘাসের ধুলো-জমা ডগার মতো’।

এসব ছবি আজ বিশ্ববিখ্যাত হলেও বেঁচে থাকতে কোনো সমাদর হয়নি এসব চিত্রকলার। তার সমসাময়িক বন্ধুদের মধ্যে রেনোয়া, মোনে, পিসারো, গ‍ঁগ্যা প্রমুখ শিল্পী যথেষ্ট প্রশংসা পেলেও এই শিল্পী কারো কাছ থেকে কোনো প্রশংসা বা সহানুভূতি পায় নি। মৃত্যুর পরেও অন্তত দশ বছর তার ছবির কোনো কদর হয়নি। অথচ আজ তার একটি চিত্রকর্মের মূল্য পঁচাশি মিলিয়ন ডলার কিংবা তারও বেশি। ডাচ সরকার দু’টি মিউজিয়াম তার ড্রয়িং দিয়ে সাজিয়ে রেখেছে অতি যত্নে। একটি আমস্টারডমের ভিনসেন্ট ভ্যানগগ মিউজিয়াম, অপরটি এটারলুর ক্রয়েলার ম্যুলার মিউজিয়াম।

গবেষক ও চিত্র সমালোচক টমাস ক্র্যাভেন লিখেছেন : “বাইবেলের সেই সত্য, বিশ্বাসেই পূর্ণ হওয়া যায়; অথবা প্রাচীন নন্দনতত্ত্বের সেই সত্য, এক আউন্স প্রত্যয়ের দাম এক টন প্রতিভার সমান – এই দুই সত্যেরই আধুনিক মূর্ত প্রতীক হল ভ্যান গখ। একেবারে শুরু থেকেই এই কুদর্শন ডাচটির ভাগ্যের বিপরীতে সাজানো ছিল যাবতীয় তাস, কিন্তু শেষ পর্যন্ত জিতলেন তিনিই, পরিণত হলেন পরবর্তীকালের একজন সবচেয়ে মৌলিক ও আবেদনসমৃদ্ধ চিত্রকরে।”

চারপাশের মানুষের চোখে সে ছিল কু-দর্শন, কিন্তু মানুষের জন্যেই সে সৃষ্টি করে গেছে সৌন্দর্য্যের এক অনন্ত অফুরন্ত ভাণ্ডার। সে ছবি আঁকতে চেয়েছিল সমাজের নীচুস্তরের মানুষদের জন্য – সাধারণ চাষী, শ্রমিক, নাবিক, জীবনযুদ্ধে ব্যর্থ-হতাশ মানুষ। আর ভাগ্যের এমনই পরিহাস যে তার প্রতিটি ছবিই আজ পরিণত হয়েছে বাণিজ্যের উপাদানে, নিলাম ঘর থেকে গিয়ে পৌঁছে যাচ্ছে ধনী সংগ্রাহকদের সাজানো ড্রইং রুমে অথবা মিউজিয়ামে। হাতো গোনা কয়েকজন সৌভাগ্যবান ব্যক্তি ছাড়া আজ আর কারুর পক্ষেই ভ্যান গখের মূল ছবি কেনা সম্ভব নয়। দেখার সুযোগও নেই সবার। কিন্তু যখনই সর্বসাধারণের জন্য তার ছবির কোনো প্রদর্শনী হয়েছে, তখনই মানুষ দেখেছে কী অপরিসীম যন্ত্রণায় কাতর এক মানবতার আশ্চর্য অভিব্যক্তি!

নোট : লেখার শিরোনামটি Don Mclean বিখ্যাত গান Vincent (Starry, Starry Night)থেকে নেয়া (লিংক : http://www.youtube.com/watch?v=n7tx1Un4shU)। এর বাংলা রূপান্তর আমার সাধ্যের অতীত।
কৃতজ্ঞতা :
ফেমাস আর্টিস্টস অ্যান্ড দেয়ার মডেলস – টমাস ক্র্যাভেন
পাশ্চাত্য চিত্রশিল্পের কাহিনী – বিশ্বনাথ মুখোপাধ্যায়
লাস্ট ফর লাইফ – আরভিং স্টোন

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

৫ thoughts on “‘আমি আঁকতে চাই মানবতা, মানবতা। এবং শেষ পর্যন্ত মানবতা।’- ভ্যান গখ

  1. অনেক তথ্যপূর্ণ লেখা !! জানতাম
    অনেক তথ্যপূর্ণ লেখা !! জানতাম না। জানানোর জন্যে অনেক ধন্যবাদ !! আশা করি আরো অনেক কিছু সম্পর্কে লিখা পাব !

  2. অনেক সুন্দর। ভাল লাগার পোস্ট
    অনেক সুন্দর। ভাল লাগার পোস্ট

    ==============================================
    আমার ফেসবুকের মূল ID হ্যাক হয়েছিল ২ মাস আগে। নানা চেষ্টা তদবিরের পর গতকাল আকস্মিক তা ফিরে পেলাম। আমার এ মুল আইডিতে আমার ইস্টিশন বন্ধুদের Add করার ও আমার ইস্টিশনে আমার পোস্ট পড়ার অনুরোধ করছি। লিংক : https://web.facebook.com/JahangirHossainDDMoEduGoB

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

− 2 = 7