কমরেড বদরুদ্দীন উমর সম্পর্কে শাহরিয়ার কবিরের কথকতা

[প্রাক কথন – ‘সাপ্তাহিক’-এর এবারের ঈদ সংখ্যার জন্য অফিসের কাজ হিসেবেই সাক্ষাৎকার নিয়েছিলাম শাহরিয়ার কবিরের। বিরাট সাক্ষাৎকার- প্রায় ৬০ হাজার শব্দের। এর মধ্যে তার রাজনৈতিক জীবনের কথা ঘুরেফিরে বারবার এসেছে। যৌবনে তিনি প্রথমে মস্কোপন্থি ছাত্র ইউনিয়নের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। এরপর মতিন-আলাউদ্দিনের নেতৃত্বাধীন ‘পূর্ব বাংলার কমিউনিস্ট পার্টি’র সঙ্গে যুক্ত হন। তার ভাষায়, উমর ভাইকে পার্টিতে যোগদানের প্রস্তাব নিয়ে গিয়েছিলেন তিনিই। তারই ধারাবাহিকতায় এক পর্যায়ে কাজ করেন বদরুদ্দীন উমরের নেতৃত্বাধীন পার্টিতে। ‘লেখক শিবির’-এর সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন প্রায় চার বছর। পুরো সময়টা নিয়ে অনেক কিছুই বলেছেন তিনি। লেখক শিবির থেকে তার বেরিয়ে যাওয়া সম্পর্কে উমর ভাইয়ের ভূমিকা সম্পর্কে বলেছেন বিস্তারিত। সেখান থেকে খানিকটা এখানে তুলে দিলাম। বিস্তারিত আলাপটা অনেক বড়। সেটা ‘সাপ্তাহিক’-এর ঈদ সংখ্যায় পাবেন। উল্লেখ্য, এখানে ব্যক্তিগতভাবে আমার কোনো মত কোথাও নেই।]

আনিস রায়হান : লেখক শিবিরে যুক্ত হওয়া সম্পর্কে বলছিলেন।
শাহরিয়ার কবির : ‘লেখক শিবির’ করা হয়েছিল একাত্তরের আগেই। আহমদ ছফা, আহমদ শরীফরা এটা করেছিলেন। পরে আবরার চৌধুরী এটার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তিনি ছিলেন ছফার ডান হাত। ‘৭৯ সালের কথা বলছি। ছফা লেখক শিবিরের ক্ষেত্রে তখন খুব বেশি আগ্রহী ছিলেন না। তখন আবরার আমাকে এসে বললেন, শাহরিয়ার ভাই, আপনি লেখক শিবিরের দায়িত্ব নেবেন বলে আমরা ঠিক করেছি। আপনি এটার দায়িত্ব নেন। আমি তখন বললাম, তোমরা এটাকে একটা পকেট সংগঠন বানিয়ে ফেলেছো। আমি এটার দায়িত্ব নিলে এটা হবে সব প্রগতিশীল লেখকদের একটা ফোরাম। কোনো সংগঠনের নিজের পকেট না। উমর ভাইকে আমি জিজ্ঞেস করলে তিনি বললেন, এটা ভালো বিষয় তো! নিয়ে নিন। তখন শরীফ স্যার সভাপতি ছিলেন। স্যারও বললেন, লেখক শিবিরটা ভালো করে দাঁড় করানো দরকার। আমাকে সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব দেয়া হলো। শরীফ স্যার সভাপতি, এটা অবশ্য ছফা ভাই খুব একটা পছন্দ করেননি। প্রকাশ্যেই সমালোচনা করে বেড়াতেন। লেখক হিসেবে আহমদ ছফা অসাধারণ ছিলেন। কিন্তু সংগঠক হিসেবে তার মধ্যে কতগুলো হঠকারী ব্যাপার ছিল। তখন তার সঙ্গে লিবিয়ার গাদ্দাফির গ্রিন রেভল্যুশনারিদের যোগাযোগ ছিল। সেখান থেকে টাকা পয়সা নিয়ে প্রেস করেছিলেন।

আমি লেখক শিবিরকে খুব গুরুত্বের সঙ্গে নিলাম। এতদিনে লেখক হিসেবে আমার পরিচিতি হয়ে গেছে, বিরাট একটা পাঠকশ্রেণীও তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে খতম লাইনের বিরুদ্ধে লেখা ‘ওদের জানিয়ে দাও’ প্রকাশের পর থেকে। এখান থেকে ওখান থেকে চিঠি লিখত এবং আমি চিঠির জবাব দিতাম। এভাবে সারা বাংলাদেশে পাঠকদের মাধ্যমেই আমার একটি নেটওয়ার্ক তৈরি হয়। আরেকটা ছিল ব্যক্তিগত সম্পর্ক এবং পরিচয়। আমরা ঠিক করলাম লেখক শিবিরের একটি সম্মেলন করব। ১৯৮০ সালে এই লেখক শিবির করতে গিয়েই কিছু সমস্যা হয় উমর ভাইয়ের সঙ্গে।

আনিস রায়হান : কী ঘটেছিল তখন?
শাহরিয়ার কবির : লেখক শিবিরে তখন আহমদ শরীফ, সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, আবুল কাশেম ফজলুল হক, মুনতাসীর মামুন, হাসান আজিজুল হক, শওকত আলীরা ছিলেন। বদরুদ্দীন উমর বললেন, আপনারা শুধু ফিকশন লেখকদের, সাহিত্যিকদের নিচ্ছেন কেন? যারা নন-ফিকশন লেখেন, তাত্ত্বিক লেখা লেখেন তাদেরও নেয়া দরকার। আমি আর ডাক্তারদা, আমরাও লেখক শিবিরে যুক্ত হব। তিনি এলে তো তাকে সরাসরি কেন্দ্রীয় কমিটিতে নিতে হয়। আমি শরীফ স্যারকে বললাম, শরীফ স্যার বললেন ঠিক আছে। তিনি খুব একটা আপত্তি করেননি। কিন্তু সিরাজ স্যারের একটু আপত্তি ছিল। বললেন, উনি দল করেন ঠিক আছে, কিন্তু দলীয় রাজনীতিটা যেন এখানে টেনে না আনেন। আমরাও দেখলাম, তিনি স্বনামধন্য বুদ্ধিজীবী, লেখক হিসেবে তো তাকে অস্বীকার করা যায় না। যেহেতু তিনি চেয়েছেন, স্যারও বলেছেন তাহলে তিনি আসুন।

তিনি এলেন কেন্দ্রীয় কমিটির ভেতর। কিন্তু আমি দেখলাম, কেন্দ্রীয় কমিটির বেশিরভাগই অস্বস্তিবোধ করছেন। উমর ভাই প্রথমদিকে চুপচাপই থাকতেন। এর মধ্যেই লেখক শিবির এগিয়ে যেতে থাকল। তরুণ যারা তখন বিচিত্রায় লেখালেখি করছে, কলাম লিখছে, এমন অনেকে আমাদের সঙ্গে যুক্ত হলো। আমাদের কিছু মার্কসবাদী পাঠচক্র ছিল, যার মধ্যে আনু মুহাম্মদরা ছিল, তারাও যুক্ত হলো লেখক শিবিরের সঙ্গে। আমি বলতে পারি, চার বছরের মধ্যে লেখক শিবিরকে, প্রগতিশীল লেখক সাহিত্যিকদের সবচেয়ে বড় সংগঠনে পরিণত করেছিলাম। শুধু এই নয়, সেখানে লেখক শিবিরের নাটকের একটা শাখা হয়েছে। চলচ্চিত্রের একটা শাখা, নাটকের মঞ্চায়ন, ছোটদের নিয়ে খুদে লেখক শিবির করা হলো।

‘৭৯ সালের দিকে নাটকের প্রশিক্ষণের একটা কোর্স শুরু করলাম আমরা। নাটকের প্রশিক্ষণ নিত অনেকে এসে। এর সঙ্গে যুক্ত হলেন মামুনুর রশীদ ও রামেন্দু মজুমদারের মতো নাট্য নির্দেশকরা। তারা ক্লাস নিতেন। উমর ভাই এটা পছন্দ করলেন না। তিনি বললেন, এরা কেন আসবে লেখক শিবিরে। আমি বললাম, এরা সকলেই তো প্রগতিশীল। আমার ব্যাপারটা ছিল, আমি দুই ধারার সঙ্গেই কাজ করেছি। কিন্তু যারা পিকিংপন্থি ছিলেন তাদের কাছে আইয়ুব খানের চেয়েও বড় শত্রু ছিল মস্কোপন্থিরা। মস্কোপন্থিদেরও একই চোখ ছিল পিকিংপন্থিদের প্রতি। কিন্তু আমরা যারা দুটোর সঙ্গেই ছিলাম, তারা এভাবে দেখতাম না। আমরা দুই পক্ষের ত্যাগ ও অবদানটা ধরতে পারতাম। কিন্তু তারা একপক্ষ আরেকপক্ষকে দালাল ছাড়া কিছু ভাবত না। আমি এই বিরোধটাকে লেখক শিবিরের কাঠামোর মধ্যে কমিয়ে আনার চেষ্টা করেছিলাম।

আনিস রায়হান : বিরোধ কি আসলে কমানো যায়?
শাহরিয়ার কবির : এই বিরোধটা নামিয়ে আনার চেষ্টা করতে গিয়েই উমর ভাইয়ের তীব্র বিরোধিতার মুখে পড়লাম। আমি বললাম, পার্টির পুরো নিয়ন্ত্রণ লেখক শিবিরের ওপর থাকুক, এটা সিরাজ স্যার, শরীফ স্যারও পছন্দ করবেন না, আমিও চাই না। এটা করতে গেলে অনেকেই চলে যাবেন। সংগঠন নিষ্ক্রিয় হয়ে যাবে। এখন যে বৃহৎ পরিসরের কাঠামোটা গড়ে উঠেছে সেটা আর ধরে রাখতে পারব না। তখন উমর ভাই ঘুরে ঘুরে, পার্টির লোক ও লেখক শিবিরে যুক্ত লেখকদের মধ্যে যারা তার প্রতি বন্ধুভাবাপন্ন, তাদের পক্ষে টানতে লাগলেন। আমাদের সমালোচনা শুরু করলেন। তিনি তখন সার্বক্ষণিক। তার মতো তো আর আমি সময় দিতে পারি না। আমি তখন একইসঙ্গে বিচিত্রায়ও কাজ করছি। পরিস্থিতি ঘোলা হতে লাগল।

আমরা তখন বলছি সদস্য হতে হলে লেখক হতে হবে। উমর ভাই তত্ত্ব দিলেন পাঠকরাও লেখক শিবিরের সদস্য হতে পারবে। পাঠক ছাড়া লেখকের তো কোনো অস্তিত্ব নেই। এই তত্ত্ব দিয়ে মৎস্যজীবী সমিতি ছিল তাদের বরিশালে, তাদেরও লেখক শিবিরে আনলেন। আমি খুব বিরক্ত হয়ে বললাম, ওরা তো মৎস্যজীবী সমিতি করে! তিনি বললেন, না-না ওরা পাঠক তো। এগুলো আস্তে আস্তে বড় হতে লাগল। এর মধ্যে ১৯৭৯ সালে আমরা আরও বড় পরিসরে অনেকগুলো সামাজিক সাংস্কৃতিক দল মিলে ‘সাংস্কৃতিক ফ্রন্ট’ নামে একটা মোর্চা করেছিলাম। যতগুলো বামপন্থি সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন ছিল সবগুলো মিলে কলকাতা থেকে কিংবদন্তির গণসংগীতশিল্পী হেমাঙ্গ বিশ্বাসকে নিয়ে এসে সংবর্ধনা দিয়েছিলাম। কাজ এগুচ্ছিল, আবার শঙ্কাও বাড়ছিল। ৮০ সালে লেখক শিবিরের যে সম্মেলন হয়, সে সময়ই নিশ্চিত হয়ে গেল যে আমরা যেভাবে লেখক শিবিরকে দেখতে চেয়েছিলাম তা আর হচ্ছে না।

আমি, আহমদ শরীফ, সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, মুনতাসীর মামুন, আবু জাফরÑ আমরা যেভাবে চেয়েছিলাম উমর ভাই সেটা চাচ্ছেন না। আবরার, আনুরা তখন উমর ভাইয়ের পক্ষে। তখন তারা পার্টি সদস্য হয়ে সক্রিয়ভাবে কাজ করছে। শরীফ স্যার, সিরাজ স্যার আমাকে বললেন, শাহরিয়ার সম্মেলন কর ঠিক আছে, কিন্তু বদরুদ্দীন উমরকে এখন থেকে বাদ দিয়ে দাও। তিনি যা করতে চাচ্ছেন, তা করলে লেখক শিবির থাকবে না। পরিস্থিতি তখন এমন যে লেখক শিবিরের বিভক্তি প্রায় নিশ্চিত হয়ে গেল। তারা ঠিক করলেন সম্মেলনে উমর ভাই সভাপতি হবেন। তিনি আমার সম্পাদকের পদ নিয়ে আপত্তি করলেন। শরীফ স্যারকে তারা বাদ দিতে চাইলেন। আমার মত ছিল শরীফ স্যারকে বাদ দিয়ে লেখক শিবির করব না। কারণ লেখক শিবিরের জন্মই দিয়েছেন আহমদ শরীফ। তাকে বাদ দেয়ার অর্থ পিতাকে অস্বীকার করা। আমার মনে আছে যে, মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে একুশে ফেব্রুয়ারিতে শরীফ স্যার সব লেখককে একত্রিত করে শহীদ মিনারে নিয়ে দাঁড় করিয়ে হাত তুলে শপথ করিয়েছিলেনÑ শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে হলেও মুক্তি আনব।

এই অবস্থায় ভাঙনটা অবধারিত হয়ে গেল। বোঝা গেল লেখক শিবির দুটি হতে যাচ্ছে। সম্মেলন হলে দুটো ভাগে ভাগ হয়ে যাবে পরিষ্কার। সদস্যদের মধ্যে বদরুদ্দীন উমরের সমর্থক কম না। কিন্তু কেন্দ্রীয় কমিটিতে প্রায় পুরোটাই আমরা। আবরার, আনুরা ওদিকে ছিল। বাকি সব শিক্ষক, লেখক যারা ছিলেন মুনতাসীর মামুনসহ আমরা সবাই একদিকে। আমি শরীফ স্যারকে বললাম, আমরা লেখক শিবির ছেড়ে দিই, এটা ভাগ করা ঠিক হবে না। লেখক শিবির একটা হবে শরীফ-শাহরিয়ার আরেকটা হবে উমর-আবরার, এটা আমার ভালো লাগছে না। এটা আমাদের তৈরি করা, আমাদের সন্তানের মতো আমরা নিজের সন্তানকে কীভাবে কেটে দুভাগ করব! এটা আমার দ্বারা হবে না। কেন্দ্রীয় কমিটিতে এ নিয়ে আমরা যখন আলোচনা করলাম, আবু জাফর থেকে শুরু করে আবুল কাশেম ফজলুল হক, সাঈদুর রহমান, তারা প্রত্যেকে বললেন, বদরুদ্দীন উমর লেখক শিবিরের সভাপতি হলে আমরা থাকব না।

সম্মেলন তো ডাকা হয়েছে, সম্মেলন করতে হবে। মনে আছে, সম্মেলনে প্রায় দুইশ’র ওপরে শাখা এসেছিল। আমি সরাসরি বললাম যে, এ সম্মেলনে আপনারা নতুন নেতৃত্ব ঠিক করুন, আমরা লেখক শিবিরে থাকছি না। এটা নিয়ে প্রচুর হৈ চৈ হয়। কেন্দ্রীয় কমিটি থেকে আমরা ৩৫ জন পদত্যাগ করলাম। বদরুদ্দীন উমর সভাপতি আর আবরার সম্পাদক হলেন। তাদের সঙ্গে তখন শওকত আলী, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস ছিলেন। লেখক শিবির ছাড়ার মধ্য দিয়েই আনুষ্ঠানিক পার্টির সঙ্গেও আমার বিচ্ছেদ ঘটে গেল। পার্টি থেকে পদত্যাগ করলাম। গণসংগঠনের ওপর পার্টির কর্তৃত্ব, গণসংগঠনকে এককভাবে চলতে দেয়া, না দেয়ার বিতর্কটা কিন্তু শেষ হয়ে যায়নি। সমস্যাটা যেহেতু রয়ে গিয়েছিল, এটা পরে ক্রিয়া করে।

আনিস রায়হান : কীভাবে?
শাহরিয়ার কবির : আমরা বের হবার পর পার্টির নেতৃত্ব নিয়ে একটা বড় রকমের গণ্ডগোল হলো। উমর ভাইয়ের নেতিবাচক দিকটা হচ্ছে, তিনি ভীষণ কর্তৃত্বপরায়ণ। এটা সবাই জানে। বুদ্ধিবৃত্তিক জায়গায় তিনি অনেক উঁচুতে হলেও সাধারণ কর্মীদের সঙ্গে, মাঠপর্যায়ের কৃষক নেতাদের সঙ্গে তার একটা বড় রকমের দূরত্ব ছিল। তারা এত বড় মাপের এই মানুষটার সামনে এসে সহজ হতে না পারাটাই স্বাভাবিক। কিন্তু উমর ভাইও এই দূরত্বটা ঘোচাতে ব্যর্থ হয়েছিলেন। যেমন তখন আমাদের কৃষক নেতৃত্বে ছিলেন পাবনায় হাসান আলী মোল্লা, পটুয়াখালীতে ছিলেন সাত্তার খান। কৃষক সম্মেলনে তারা সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক হয়েছিলেন। কৃষক সম্মেলন হলো ৭৮ বা ৭৯ সালে, বিশাল সম্মেলন। প্রথমটা পাবনায় হয়েছিল। তারপর আমি যখন ছিলাম, তখন সবচেয়ে বড়টা হয় পটুয়াখালীতে। সেখানে সাত্তার খান সভাপতি হন। পাকিস্তান আমল থেকেই সাত্তার খান কৃষক আন্দোলনে ছিলেন। কৃষক পরিবার থেকে এসেছেন, কৃষকদের ভাষা বোঝেন। তাত্ত্বিকভাবে মার্ক্সীয় তত্ত্ব অত না বুঝলেও মার্ক্সবাদের মৌলিক জ্ঞানটা ঠিকই ছিল। তারা যখন জানলেন যে, আমরা এভাবে চলে গেছি, তারা পার্টি ছেড়ে দিলেন।

কর্নেল জামানও তখন পার্টিতে ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধে ৭নং সেক্টরের যিনি সেক্টর কমান্ডার ছিলেন। পার্টির তখন একটা বড় অবলম্বন ছিলেন তিনি। টাকা-পয়সা, আশ্রয়, সবদিক থেকে তার সহযোগিতা ছিল। তার বাড়িটা ছিল পার্টির আশ্রয়কেন্দ্র। তিনিও পার্টি থেকে বেরিয়ে এলেন। এরপর দেখা গেল কেন্দ্রীয় কমিটির একটা বড় অংশই পার্টি ছেড়ে চলে গেল। তখন তারা বেরিয়ে আমার ওপর চাপ দিলেন পাল্টা পার্টি করার জন্য। আমি বললাম, না আমার দ্বারা কমিউনিস্ট পার্টি হবে না। কারণ যে সঙ্কটগুলো আমি দেখেছি, এগুলো খুবই জটিল। তত্ত্বের সঙ্গে অনুশীলনের সমন্বয় ঘটানো, তার ওপরে বিদ্যমান পার্টি ও পুরনো কমরেডদের পাশে থেকে তাদের বিরোধিতা করাÑ এ আমার পক্ষে সম্ভব নয়। আমার মধ্যে সব সময় চিন্তা ছিল বৃহৎ পরিসরে কাজ করা। কিন্তু সেটা করা সম্ভব না। পার্টির দলীয় চিন্তা বা তত্ত্ব অনেক ক্ষেত্রেই এটাকে অনুমোদন দেয় না। আমি পিছিয়ে এলাম।

আনিস রায়হান : এরপর কী করলেন?
শাহরিয়ার কবির : ‘৮০ সালেই আমি বুঝে গিয়েছিলাম যে, আমার দ্বারা পার্টি করা সম্ভব না। তখন আমি আর কর্নেল জামান ঠিক করলাম নাগরিক সমাজের আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। সমাজের সচেতন অংশটাকে সক্রিয় করতে হবে। তাহলে অন্যদের সচেতন করা সহজ হবে। আমরা ঠিক করলাম, সাংস্কৃতিক সচেতনতা সৃষ্টির কাজ করতে হবে। সাত্তার খানরা আরও কয়েক বছর পার্টি গড়ে তুলতে চেষ্টা করলেন। তারা কৃষক সংগঠনটা ধরে রেখেছিলেন। হাসান আলী মোল্লা পরে সিরাজুল হোসেনরা যখন জিয়াউর রহমানের সঙ্গে চলে গেলেন, তাদের সঙ্গে যোগ দিলেন। হাজী দানেশ, মশিউর রহমান যাদুরাও জিয়ার সঙ্গে গিয়েছিলেন। কিন্তু সাত্তার খানরা জিয়ার সঙ্গে যাননি। বরং জিয়ার বিরুদ্ধে আন্দোলন করার জন্য তার পুরো আমলটাই সাত্তার খান জেলে কাটিয়েছিলেন। এই পরিস্থিতিতে দেখলাম উমর ভাইয়ের সবচেয়ে কাছের লোকটা, ডাক্তরদা, তিনিও তাকে ছেড়ে চলে গেলেন।

আনু মুহাম্মদ থেকে শুরু করে উমর ভাইয়ের পাশে তখন আর কেউ নেই। তিনি একা হয়ে গেলেন। যারা আমরা ওই সময় ছিলাম তারা প্রত্যেকে আলাদা কেন্দ্র করলেন। আনুর আলাদা গ্রুপ হলো। ডাক্তারদার সঙ্গে উমর ভাইয়ের মন কষাকষি রাজনৈতিক পর্যায় থেকে ব্যক্তিগত পর্যায়ে চলে গিয়েছিল। এ বিষয়গুলো আমার খুব খারাপ লাগত। একসঙ্গে পার্টিতে যখন ছিলেন তখন মহান বিপ্লবী, আর যখন ছেড়ে দিচ্ছি তখন আমি সিআইএর এজেন্ট হয়ে যাচ্ছি। উমর ভাই আমার সম্পর্কে তখন বলেছিলেন যে, আমি সিআইএ, কেজিবির এজেন্ট হয়ে গেছি। এই যে উমর ভাই আমাকে এসব বললেন এবং তার সঙ্গে এত মতপার্থক্য, তা সত্ত্বেও কিন্তু কোনো পাবলিক ফোরামে, আমি উমর ভাইয়ের বিরুদ্ধে কিছু বলিনি বা লিখিনি, এখনও না।

আনিস রায়হান : বদরুদ্দীন উমর সম্পর্কে আপনার এখনকার মূল্যায়ন কী?
শাহরিয়ার কবির : তিনি অসম্ভব সৎ, বিপ্লবী ও পণ্ডিত মানুষ। অনেক বিষয়ে তার সঙ্গে আমার মতপার্থক্য আছে। কিন্তু নানা ক্ষেত্রে তার বিরাট অবদান রয়েছে যেগুলো কেউ অস্বীকার করতে পারবে না। ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস লেখার ক্ষেত্রে তার অবদান অসামান্য। আইয়ুববিরোধী আন্দোলনের সময় এখানে প্রগতিশীল সংস্কৃতির যে আন্দোলন হয় তাতেও তার বিরাট অবদান ছিল। আমাদের মানসলোক গড়ে তোলার ক্ষেত্রেও তার ভূমিকা আছে। তার ‘সাম্প্রদায়িকতা’, ‘সাংস্কৃতিক সাম্প্রদায়িকতা’ আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় পেয়েছিলাম। সেখান থেকে আমরা শিখেছি। তিনি আমাদের পথ দেখিয়েছিলেন। ফলে তার প্রতি শ্রদ্ধাটা রয়েই গেছে।

কিন্তু এটাও বলতে হবে, উমর ভাই সক্রিয়ভাবে পার্টিতে আসায় বুদ্ধিজীবী, গবেষক, লেখক বদরুদ্দীন উমরকে আমরা হারিয়েছি। তিনি সক্রিয়ভাবে দলীয় রাজনীতিতে না এসে যদি তার লেখালেখিতে থাকতেন তাহলে অনেক বেশি কিছু দিতে পারতেন। সেই ক্ষমতা কেবল তারই ছিল। শুধু বাংলাদেশ নয়, পুরো ভারতবর্ষেই তার মতো যোগ্যতাসম্পন্ন পণ্ডিত লেখক পাওয়া মুশকিল। বিনয় ঘোষ থেকে শুরু করে হীরেন মুখার্জি এদের সঙ্গে কথা বলেছি কিন্তু বদরুদ্দীন উমরের যে পাণ্ডিত্য, তেমনটা কারও মধ্যে দেখিনি। তিনি শুধু মার্ক্সবাদ পড়তেন না। অনেক মার্ক্সবাদীকেই দেখেছি, মার্ক্সবাদের বাইরে তাদের লেখাপড়া, জানাশোনা তেমন নেই। কিন্তু উমর ভাইকে দেখেছি, তিনি প্রচুর গল্প, উপন্যাস, নাটক পড়েছেন। প্রচুর চিরায়ত সাহিত্য পড়েছেন, তা সোভিয়েত হোক, ফরাসি হোক আর ইংরেজি হোক। সিনেমা, নাটক, সবগুলো মিলিয়ে তাকে পূর্ণাঙ্গ মনে হতো। মার্ক্সবাদী নেতাদের সাহিত্য সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে দেখবেন তারা অধিকাংশই মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ে এসে থেমে যাবেন। আধুনিক নেতাদের মধ্যে কতজন মানিক পর্যন্ত যেতে পারবেন, তা-ও বলা মুশকিল। কিন্তু উমর ভাই এসব ক্ষেত্রে অনেক অগ্রসর ছিলেন। আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের সঙ্গে থাকার ফলে এই বিষয়টা তার জন্য অনেকটা সহজ হয়েছে। তার প্রতি শ্রদ্ধাটা তাই এখনও হারাইনি। যদিও দলীয় রাজনীতি তার উচ্চতাকে খর্ব করেছে।
… (চলমান)

[ছবির ক্যাপশন : ২৪ জানুয়ারি, ১৯৭৭, লেখক শিবিরের সেমিনারে বক্তৃতা করছেন কবি নূরুল হুদা মির্জা। মঞ্চে ড. আহমদ শরীফের পাশে শাহরিয়ার কবির।]

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

১১ thoughts on “কমরেড বদরুদ্দীন উমর সম্পর্কে শাহরিয়ার কবিরের কথকতা

  1. অনেক অজানা তথ্য জানলাম।
    অনেক অজানা তথ্য জানলাম। বাংলাদেশে বাম রাজনীতি সফল না হওয়ার জন্য বদর উদ্দিন উমর ভাই অনেকাংশে দায়ী।

    1. বদরুদ্দীন উমরকে চিনেন? তার
      বদরুদ্দীন উমরকে চিনেন? তার অ্যাকাডেমিক জ্ঞান সম্পর্কে আপনার কোন ধারণা আছে?
      তার লেখাগুলো (দৈনিক পত্রিকার হিবিজীবী লেখাগুলো বাদে) আপনি শুধু এ জীবনে নয় আরো চারটি জীবন দিলেও বাতিলতো দুরে বুঝেই উঠতে পারবেন না। সেই এলেম প্রকৃতি আপনেরে দেয়নি।

      1. উমর সাহেবের বিপ্লব যদি কোন
        উমর সাহেবের বিপ্লব যদি কোন কামে না আসে তাকে দিয়া মানুষ কি করবে? এলেম কাজে লাগাবার জিনিস, এটা শোকেইছে সাজায়া রাখার জিনিস না। উমর সাহেবের এলেম এদেশের মানুষের কোন কাজে লাগছে বলে প্রমাণ দিতে পারবেন?

  2. শোনেন মিয়া ভাইজানরা, এ দেশে
    শোনেন মিয়া ভাইজানরা, এ দেশে বুর্জোয়া মতাদর্শের পার্টি গুলান ক্ষমতায় জন্ম থেকেই আজবধি। কিন্তু একটি মিনিমাম সভ্য রাজনৈতিক সাংস্কৃতিক মান কেন দাড় করাতে পারেনি? কারণ আবদুর রাজ্জাক মারা যাবার পর তাদের আর কোন তাত্বিক নাই।
    অ্যাকাডেমিশিয়ানের কত দরকার তা চট করে ধরা যায় না। আর বাঙালী কথিত জাতীয়তাবাদী আ.লীগের লোকজনের একটু বেশিই মন খারাপ তাকে উমর ভাইয়ের উপর।
    রাজনৈতিক শত্রুতা শেষ পর্য়ন্ত উমর ভাইয়ের তত্বের ওপর গিয়ে পড়েছে কি আর করা।

    1. ‘কে ভেঙেছে এদেশের বামরাজনীতির
      ‘কে ভেঙেছে এদেশের বামরাজনীতির কোমর,
      তার নাম বদরুদ্দিন উমর।’
      এটা যেমন সত্যি, তেমনি আওয়ামি দালাল শাহরিয়ার কবিরের মত নষ্ট বাম এদেশের বাম আন্দোলনের বারোটা বাজাবেই। নিঝুমদের সাথে শাহরিয়ার কবিরদের যখন ঘোষনা ছাড়া খাতির হয়ে যায়, তখন শাহরিয়ার কবিরদের প্রতি ভক্তি শ্রদ্ধা আর থাকেনা। শাহরিয়ার কবিরের ব্র্যান্ডিং ইস্টিশন থেকে বন্ধ করা হোক। তার অনেক কুকর্ম আছে, সেসব প্রকাশ করা হোক।

  3. কমরেড বদরউদ্দিন উমর,
    কমরেড বদরউদ্দিন উমর, লেখকশিবির ও উমর ভাইয়ের পার্টির বক্তব্য আশা করছি। না হলে ধরে নেব শাহরিয়ার কবির ভাইয়ের একথাগুলো সত্য।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

+ 71 = 79