ছায়াযুদ্ধের আড়ালে বিশ্বযুদ্ধের পদধ্বনি?

এ মুহূর্তে গাজায় চলছে ইসরায়েলি বর্বরতা। অমানবিক, নিষ্ঠুর পাশবিক আক্রোশে ইসরায়েল হামলা করছে গাজাবাসী ফিলিস্তিনি নারী-পুরুষ-শিশুদের ওপর। যুদ্ধ নাম দিয়ে আসলে একতরফা আগ্রাসন চালাচ্ছে ইসরায়েল। এর বাইরে সারা পৃথিবীর কোথায়, কোন দেশে যুদ্ধ চলছে? অনেকেই উত্তর দেবেন ইরাক অথবা ইউক্রেন। কিন্তু অস্ত্র হাতে মুখোমুখি লড়াই চলছে, এই হিসাবটি করতে বসলে এর ভেতর সিরিয়া, নাইজেরিয়া, মিসর, লেবানন, লিবিয়া, তুরস্ক, পাকিস্তান, আফগানিস্তানসহ আরও অনেক দেশের নাম ঢুকে পড়বে। যুদ্ধ বাধাচ্ছে এমন দেশের নাম বলতে গেলে দেখা যাবে ইসরায়েল, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, রাশিয়ার নাম। এখানেই দৃষ্টি দেয়া দরকার যুদ্ধ বাধাচ্ছে কারা! আর যুদ্ধটা হচ্ছে কোথায়! খালি চোখেই দেখা যাচ্ছে, বড় অর্থনৈতিক ক্ষমতাধর দেশগুলো যুদ্ধ বাধাচ্ছে। আর যুদ্ধ হচ্ছে প্রধানত জ্বালানিসমৃদ্ধ দেশগুলো এবং কিছুদিন আগেও আঞ্চলিকভাবে প্রভাব বিস্তারে সক্ষম ছিল এমন দেশগুলোতেই।

মার্কিন-সোভিয়েত স্নায়ুযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর বিশ্বজুড়ে কয়েকটি যুদ্ধ হয়েছিল ঠিকই, কিন্তু সেগুলো ছিল একতরফা মার্কিন ও তার মিত্রদের ইচ্ছায়। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে, পরিস্থিতির কিছুটা পরিবর্তন ঘটেছে। নানা প্রক্রিয়ায় অন্য ক্ষমতাধর দেশগুলো একে অপরের মুখোমুখি হচ্ছে! ক্ষমতাধর দেশগুলোর মধ্যে এখনো মুখোমুখি যুদ্ধ লাগার সম্ভাবনা তেমন প্রবল না হলেও ইউক্রেন পরিস্থিতি ভিন্ন বার্তাই বয়ে এনেছে। ইউক্রেনে রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র একটা ছায়াযুদ্ধ পরিচালনা করছে। যেখানে পুরোটাই এই দুই পরাশক্তির স্বার্থ, অথচ বলি হচ্ছেন ইউক্রেনের সাধারণ জনগণ।

হঠাৎ করে পরাশক্তিগুলো মুখোমুখি হয়ে গেল কেন? উত্তরটা খুঁজে পাওয়া জটিল। ইসরায়েল-ফিলিস্তিন দ্বন্দ্ব তো সারা বছরই চলে। কিন্তু কোন স্বার্থে ইসরায়েল এই মুহূর্তে ফিলিস্তিনে আগ্রাসন চালাচ্ছে? একটু গভীর থেকে বিশ্লেষণ করা যাক।

১.
সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে রাশিয়া বেশ খানিকটা পিছিয়ে পড়ে। রাশিয়ার নেতা পুতিন প্রায় এক দশক ধরে নানা উপায়ে দেশটির কর্তৃত্ব নিজের হাতেই রেখেছেন। সেখানে তার মেয়াদে খুব বড় কোনো অস্থিতিশীলতা দেখা যায়নি। কতিপয় সেবা চালু থাকলে রুশরা শাসক কে, সে ব্যাপারে তেমন মাথা ঘামায় না। এটা তাদের প্রাচীন অভ্যাস। স্বাভাবিকভাবেই এই স্থিতিশীলতা সে দেশের বড় বড় কোম্পানিগুলোকে উঠে দাঁড়াতে সাহায্য করেছে।

এর মধ্যে পোয়াবারো ঘটিয়েছে মার্কিনের রণসাজ। গত এক দশকে ইরাক, আফগান যুদ্ধ, ভারত-পাকিস্তান উত্তেজনা, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধাবস্থা, আরব বসন্ত, ইরান, কোরিয়া, সিরিয়া ইস্যু, চীনের অস্বাভাবিক উত্থান- সব মিলিয়ে অস্ত্র ব্যবসার দিক থেকে রাশিয়া পেয়েছে বিরাট সুবিধা। ২০১৩ সালে তারা ১৫শ’ ৭০ কোটি ডলারের বন্দুক, মিসাইল ও ফাইটার জেট বিদেশে বিক্রি করে। গত বছর অস্ত্র বিক্রির ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের পরই অর্থাৎ দ্বিতীয় অবস্থানে ছিল রাশিয়া। বিশ্বের ৬৬টি দেশে এখন তারা অস্ত্র সরবরাহ করছে এবং ৮৫টি দেশের সঙ্গে তাদের সামরিক, কারিগরি সহযোগিতা চুক্তি রয়েছে। রুশ প্রসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিন গত সপ্তাহে বলেছেন, চলতি বছরের প্রথম ৬ মাসে রাশিয়া ৫৬০ কোটি মার্কিন ডলারের অস্ত্র রফতানি করেছে। এসময়ে অগ্রিম বুকিং প্রায় ৫০ বিলিয়ন ডলার বেড়েছে।

প্রশ্নটা শুধু অস্ত্র বিক্রির নয়, মূলত রাশিয়ার অর্থনীতির। এই মুহূর্তে রাশিয়া পৃথিবীর ৮ম অর্থনীতি। এই হিসাবটা করা হয় জিডিপি দ্বারা। জাতিসংঘ, বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ সবার হিসাবের ফলাফলই সমান। এই হিসাবে দেখা যায় রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের মাঝে আরও ছয়টি দেশ আছে- চীন, জাপান, জার্মানি, ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য ও ব্রাজিল। আর রাশিয়ার ঠিক পরেই আছে ভারত। ভারত যেকোনো সময়ই রাশিয়াকে অতিক্রম করে যেতে পারে। কিন্তু তাতে মার্কিনিদের ভ্রূ কোঁচকানো একটুও কমবে না। কারণ, জিডিপির হিসাবটা রাশিয়ার অর্থনীতিকে খুব ভালোভাবে উপস্থাপন করতে পারে না।

আকারের দিক থেকে ঠিক দেশের মাপের মতোই রাশিয়ার অর্থনীতিও বিরাট ও ব্যাপক, মার্কিনেরও তাই। কিন্তু অন্য দেশগুলোর অর্থনীতির আকার এত বড় নয়। টাকা-পয়সা লেনদেনের ওপর ভিত্তি করে যে জিডিপি গোনা হয় সেখানে বার্ষিক হারে বাংলাদেশও যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়ার চেয়ে অনেক ওপরে। বছরে আমাদের জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ৬-এর ওপরে। আর মার্কিনের জিডিপি প্রবৃদ্ধির শতকরা হার ১.৯ ও রাশিয়ার ১.৩। এত বড় অর্থনীতির প্রবৃদ্ধির হার যদি একও হয়, তা আমাদের শতেকের চেয়েও বহুগুণ বেশি হবে। বোঝাই যাচ্ছে, রাশিয়া যে গত কয়েক বছরে ৮ম অর্থনীতিতে উন্নীত হয়েছে, এজন্য তাকে উৎপাদন বাড়াতে হয়েছে অনেক। বিরাট অর্থনীতির সব খাতেই উন্নতি করতে হয়েছে। এটাই হয়েছে মার্কিনের চিন্তার কারণ!

প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জার্মানির অতি উৎপাদন ও তা বিক্রির বাজার না থাকাটাই ছিল যুদ্ধের মূল কারণ। নিজের অর্থনীতিকে টিকিয়ে রাখতে গেলে তাকে বাজার দখল করতেই হতো। রাশিয়াকেও এখন তাই করতে হবে। তাকে উৎপাদিত পণ্যের জন্য বাজার খুঁজতে হবে, যা যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে বিলি-বণ্টিত।

২.
রাশিয়ার সঙ্গে যোগ হবে চীন, জাপান ও জার্মানির উত্থান। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও রাশিয়ার ক্ষমতার মঞ্চে তারাও অংশীদার। আর এই পক্ষগুলো কেউই কাউকে ছেড়ে কথা বলার মতো নয়। সকলের মধ্যেই পুরনো শত্রুতার তিক্ত ইতিহাস রয়েছে। বেশ কিছুকাল জাপান ও জার্মানি মার্কিন ব্লকে অবস্থান করে শান্ত, নিরস্ত্র থাকলেও সেই পরিস্থিতি দ্রুতই বদলে যাচ্ছে। গোয়ান্দাবৃত্তি ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন ইস্যুতে মার্কিন ও তার প্রধান মিত্র যুক্তরাজ্যের সঙ্গে জার্মানির দূরত্ব বাড়ছে। এখনো সামরিক ব্যয় বৃদ্ধির ঘোষণা না দিলেও যেকোনো সময় অস্ত্র উৎপাদনের হার চতুর্গুণ করার কাঠামোগত সক্ষমতা সারা বিশ্বে একমাত্র জার্মানিরই আছে। তার পরও সামরিক ব্যয়ের দিক থেকে তারা পৃথিবীর ৮ম। বাকিরা হচ্ছে যথাক্রমে যুক্তরাষ্ট্র, চীন, রাশিয়া, যুক্তরাজ্য, জাপান, ভারত ও ফ্রান্স।

জাপান সম্ভবত আগামী বছরই সামরিক ব্যয়ের দিক থেকে প্রথম তিনের মধ্যে চলে আসবে। সে লক্ষ্যে সেদেশের প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে নতুন আইন প্রণয়ন করেছেন। রক্ষণাত্মক নীতি থেকে সরে এসে জাপানের সামরিক বাহিনীকে আক্রমণাত্মক ঢঙে ঢেলে সাজাচ্ছেন তিনি। গেল মাসেই জাপান এই নয়া প্রতিরক্ষানীতি গ্রহণ করল। গত বছরের শেষে, ২৬ ডিসেম্বর শিনজো আবে যুদ্ধাপরাধীদের সমাধিস্থল ইয়াসুকুনিতে শ্রদ্ধাজ্ঞাপন করেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে মৃত্যুদণ্ড পাওয়া কয়েকশ’ যুদ্ধাপরাধীকে এখানে সমাহিত করা হয়েছে। এর মধ্যে ১৯৪৮ সালে মৃত্যুদণ্ডে নিহত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কার জাপ বাহিনীর সর্বাধিনায়ক জেনারেল হাইডেকি তোজোও আছেন।

 

এই ঘটনায় চীন আবেকে তিরস্কার করলেও যুক্তরাষ্ট্র একেবারেই চুপ ছিল। অথচ বিশ্বযুদ্ধের পর মার্কিনের অব্যাহত অর্থনৈতিক ও সামরিক চাপের মুখে পড়েই জাপান তার সামরিক বাহিনীকে দুর্বল করে। আর এখন মার্কিনের মদদেই বড় হচ্ছে তার সামরিক বাহিনী। লক্ষ্যটা চীনকে শায়েস্তা করা। পুরো ইউরোপ হিটলারকেও প্রথমদিকে যা খুশি তাই করতে দিয়েছিল কেবল স্ট্যালিনকে শায়েস্তা করার উদ্দেশ্যেই। সেই ফল তারা পেয়েছে। শিনজো আবে যুক্তরাষ্ট্রকে কী উপহার দেবে তা কেবল সময়ের বিষয়।
অন্যদিকে চীন-জাপান দ্বৈরথে স্বাভাবিকভাবেই যুক্ত হচ্ছে ভারত। চীন-ভারত দ্বন্দ্বের ফলশ্রুতিতে ভারত এখন নয়া নীতির জাপানকে পাশে পেতে চাচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী মোদি ক্ষমতায় এসেই জাপান সফরের সময়সূচি প্রস্তুত করেছেন। আগস্টে অনুষ্ঠেয় এই সফরে প্রকাশ্যে আলোচনা হবে পরমাণু সহযোগিতা নিয়ে। আর গোপন আলাপের বিষয়বস্তু হবে জাপান-ভারত সামরিক মৈত্রী। মোদি তার দেশে হিটলার অভিধা পেয়েছেন, শিনজো আবে তার চেয়েও এগিয়ে আছেন। যুদ্ধবাজ নেতা হিসেবে তাকে আখ্যা দিয়ে সেদেশের সাধারণ মানুষ মিছিল-সমাবেশ পর্যন্ত করে ফেলেছে। এরকম পরিস্থিতিতে চীন মোটেও বসে নেই। তারা রাশিয়া ও জার্মানির সঙ্গে সমঝোতা বাড়ানোর চেষ্টা চালাচ্ছে।

৩.
মার্কিন, চীন, জাপান, জার্মানি ও রাশিয়ার এই দ্বন্দ্বে দক্ষিণ এশীয় মোড়ল ভারত যেভাবে যুক্ত হচ্ছে, ঠিক সেভাবেই এই দ্বন্দ্বে ব্যতিক্রমহীনভাবে সব আঞ্চলিক শক্তিগুলোই জড়িয়ে যাবে। ভারতের সঙ্গে জাপানের মৈত্রী এই অঞ্চলে ভারতের আধিপত্যকে আরও বাড়াবে। এর ফলে আবার চীন-পাকিস্তান সহযোগিতা বৃদ্ধি পাবে। বাংলাদেশ এর বাইরে থাকবে না। শুধু বাংলাদেশ নয়, এভাবে হিসাব কষলে দেখা যাবে, কোনো দেশই এর বাইরে থাকবে না। অর্থাৎ দুনিয়াজুড়েই উত্তেজনা বৃদ্ধি পাবে। যুদ্ধ পরিস্থিতি আসন্ন, দিকে দিকে রণসাজ, এমন পরিস্থিতি তৈরি হতে আর খুব বেশি দেরি নেই।

কিন্তু যুদ্ধ প্রধানত কীভাবে হবে? কোথায় হবে? আর আজকের যুগে কি ওভাবে যুদ্ধ হওয়া সম্ভব? এর সঙ্গে ওই প্রশ্নটিও যুক্ত, কেন ফিলিস্তিনেই এ মুহূর্তে যুদ্ধ চলছে? ফিলিস্তিন ও বিশেষ করে ইউক্রেন প্রশ্নে বিশ্ব মানবতার কোনো বিকারই চোখে ধরা পড়েনি। সে হিসেবে বলা যায়, যুদ্ধ হতে কোনো বাধা নেই। যুদ্ধযুগ এখনো মানুষ অতিক্রম করতে পারেনি বলেই মনে হচ্ছে। কিন্তু তার সঙ্গে এটাও পরিষ্কার যে, এখন আর নিউইয়র্ক, লন্ডনের মতো শহরে বোমা ফেলাটা সহজ হবে না। বরং যুদ্ধক্ষেত্রটা হবে যুদ্ধরতদের সীমানা থেকে অনেক দূরে। এ মুহূর্তে আমরা তাই দেখতে পাচ্ছি।

 

বিশ্ব অর্থনীতির সাধারণ সমীকরণগুলো দেখাচ্ছে যে, আধিপত্য তারই হবে যার কাছে থাকবে জীবাশ্ম জ্বালানির কর্তৃত্ব। এখন পর্যন্ত গোটা দুনিয়ার জীবাশ্ম জ্বালানির কর্তৃত্ব যুক্তরাষ্ট্রের হাতেই রয়েছে। কিন্তু গত কয়েক বছরে মার্কিনের শক্তিক্ষয়টা প্রবলভাবে দৃশ্যমান হয়েছে। প্রথম মার্কিন রাষ্ট্রপতি হিসেবে ওবামা জাপানের সম্রাটের সামনে মাথানত করে এসেছেন। মার্কিন সংসদ বিনা যুদ্ধে পরাস্ত হয়ে ফিরে এলো সিরিয়া থেকে। ইরাকে তাদের মিত্ররা ভয়াবহ সঙ্কটের মুখে। মার্কিনের এই শক্তিক্ষয়ের যুগে ক্রমাগত শক্তি বাড়ছে তার প্রতিপক্ষগুলোর।

স্বাভাবিকভাবেই চীন, রাশিয়া, জাপান ও জার্মানি- সবাই বিশ্বের জ্বালানি সম্পদের ওপর মার্কিনের একচেটিয়া কর্তৃত্বের অবসান চাইছে। জাপান সেই বার্তা দিয়েছে আইন সংশোধন করে। ক্রিমিয়া দখল করে রাশিয়া তার পূর্ব ইউরোপের মিত্রগোষ্ঠীকে আবার ঘুরে দাঁড়ানোর বার্তা পাঠিয়েছে। মধ্যপ্রাচ্য প্রশ্নে চীনকে সে পাশে পেয়েছে। মার্কিনও এই বার্তাগুলো খুব ভালোভাবেই পাচ্ছে। ফলে মরিয়া হয়ে উঠছে সেও। ইসরায়েলকে দিয়ে ফিলিস্তিন ইস্যুতে মধ্যপ্রাচ্য গরম করে মার্কিন পাল্টা বার্তা পাঠাচ্ছে যে, যুদ্ধের মানসিকতা বা শক্তি কোনোটাই তাদের কমেনি। অনেকে তো অভিযোগ তুলেছে, ইউক্রেন সীমান্তে বিমান ভূপাতিত করেছে মার্কিনই! রাশিয়ার ওপর দায় চাপিয়ে তাকে বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন করার পরিকল্পনা থেকেই এ কাজ করেছে তারা!

বিশ্ব মানচিত্র পরিবর্তনের জন্য আবারও প্রস্তুত। আর সেই খেলাটা ক্রিমিয়ার রাশিয়ায় অন্তর্ভুক্ত হওয়া দিয়ে শুরু হয়ে গেছে। একের পর এক ছায়াযুদ্ধ সংঘটিত হচ্ছে বিভিন্ন দেশে। আধুনিক বিশ্ব আধুনিক কায়দা রপ্ত করেই নয়া বিশ্বযুদ্ধে নেমেছে। সারা পৃথিবীর শান্তিকামী মানুষদের এই সত্যটা বুঝতে হবে। আর এড়িয়ে গেলে প্রস্তুত থাকতে হবে যে কোনো সকালে লাশ হয়ে পড়ে থাকা বা ঘুম ভেঙে উঠে লাশ গোনার জন্য।

[স্বীকার করছি, লেখাটির বস্তুভিত্তির চেয়ে যুক্তিভিত্তি বেশি। তবে যুক্তিগুলো চিন্তার দাবি রাখে বলেই মনে হচ্ছে।]

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

১১ thoughts on “ছায়াযুদ্ধের আড়ালে বিশ্বযুদ্ধের পদধ্বনি?

  1. অনেকদিন পর একটা সেই মাপের
    অনেকদিন পর একটা সেই মাপের লেখা পেলাম আন্তর্জাতিক রাজনীতি নিয়ে। নিঃসন্দেহে বলা চলে অসাধারণ একটি জ্ঞানগর্ভ পোস্ট এবং ধারণা করছি যে এই লেখাটি তৈরীতে ব্যাপক সময় ব্যয় করেছেন। ব্লগ কর্তৃপক্ষকে শুরুতেই সাধুবাদ জানিয়ে রাখি স্টিকি করার জন্য। বলে রাখা ভালো, ব্যক্তিগতভাবে স্টিকি পোস্টগুলোকে যতটা সম্ভব গুরুত্ব দিয়ে পড়ার চেষ্টা করি।

    যাই হোক পোস্টের বিষয়বস্তুতে আসি, আমার ক্ষুদ্র জ্ঞান থেকে যেই জিনিসটা সবসময়ই ভাবি সেটা হলো, এই পৃথিবীতে এতো সংঘাত, হানাহানি, দ্বন্দ্ব এর পেছনে মূল কারণ হলো জনসংখ্যা সমস্যা। সহজভাবেই দেখতে পাই প্রাচীন আমলে জনসংখ্যা কম থাকাতে ঝগড়া, বিবাদ, ফ্যাসাদ এসব সেই পরিমাণে ছিলো না যা এখন আছে। সেই সময়ে কোন নতুন মতাদর্শকে স্থান দখল করে নিতেও সময় লাগতো না, যেটা ভালো সেটা নিজে নিজেই তার স্থান দখল করে নিয়েছে জনগণের সহায়তায়। অন্যদিকে মানুষের সাথে সাথে চাহিদাও বেড়ে যাচ্ছে এবং এই চাহিদার অন্য আরেকটি নাম অভাব। প্রচলিত বাক্য আছে, “অভাবে স্বভাব নষ্ট।” এবং, এটিই হচ্ছে এখন সারা বিশ্বজুড়ে। কোটি কোটি মানুষের লক্ষ লক্ষ মতবাদ, আদর্শ, চিন্তা, চাহিদা, অভাব ইত্যাদি আজ ঘুরে ফিরে একে অপরের সাথে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ছে। যেমন ধরুন আপনি বাম পন্থা সমর্থন করেন কিন্তু সেটা মস্কো পন্থী, পিকিং পন্থী না। সংঘর্ষ শুরু হচ্ছে এখানেই, মস্কো মতাদর্শী আর পিকিং মতাদর্শীরা ভাবছেন তিনি যেই পন্থায় আছেন সেটিই ঠিক, আর এজন্যই সমস্যাগুলো হচ্ছে। এখানেও এটিও স্বীকার্য যে, জনগন তখনই বিদ্রোহ করে এবং সেই বিদ্রোহ তখনই বিশাল রূপ ধারণ করে যখন শাসক বা পরিচালক কিনবা ক্ষমতাসীনদের মতাদর্শ ঐ সময়ে, ঐ সমাজের জন্য হিতকর হয় না। সহজ একটা উদাহারণ যদি দেই, তাহলে দিতে হবে আমাদের দেশের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের জন্য আন্দোলন। এই আন্দোলনের পক্ষে জনমত গড়ে তুলে একটি সফল আন্দোলন করতে পেরেছিলো বাংলাদেশ আওয়ামীলীগ, কিন্তু সেই একই ইস্যুতে কোনভাবেই সফল হতে পারছে না বিএনপি। অথচ খেয়াল করে দেখুন ঘটনা একই, সেই সময়ে প্রথমে দলীয় পরে নিজেদের একজনকে দিয়ে নির্বাচন করতে চেয়েছিল বিএনপি কিন্তু প্রবল জনরোষের বিএনপি সরে যেতে বাধ্য হয়েছিল, অথচ আজকের সময়ে এসে বিএনপি রাজপথে জনসমর্থন নিয়ে দাড়াতে পারছে না। এর কারণ হিসেবে শুধু যে তাদের অপকর্মই দায়ী তা নয়, বরং সময়টাও অনেক বেশী গুরুত্বপূর্ণ। জনগন যেহেতু এই সময়ে এই ধরণের আন্দোলন চাইছে না সুতরাং এই সময়ে এই আন্দোলন বৃথা হবেই। একথা সর্বজন স্বীকৃত যে যে পরিমাণ অর্থ জামাত-বিএনপি’র ফান্ডে জমা আছে তার অর্ধেকও আওয়ামীলীগে নেই, সুতরাং এই দৃষ্টি থেকেও বলা যায় না অর্থের অভাবে আন্দোলন সফল হচ্ছে না, বরং জনগণের অনিচ্ছাই মূল কারণ। আর এই জনগনই সারা দেশে ক্ষেত্রে বিশেষে সময়ের কারণে একেক সময়ে একেক রকমের আন্দোলন করছে। সত্যি কথা বলতে কি ভাবতেও পারিনি ভারতের মসনদে মোদী বা বিজেপি বসবে, কিন্তু সব ভাবনাকে জলাঞ্জলি দিয়ে মোদীকেই বসিয়েছে সেই দেশের জনগণ। কেননা জনগণের চাহিদা আছে, এমনকি সেই নির্বাচনে আমেরিকাও তার যথাসাধ্য চেষ্টা করেও খুব একটা সুবিধা করতে পারে নাই। এখন যদি আমরা বলি মোদী বা বিজেপিকে ক্ষমতায় আনার মাধ্যমে ভারতীয়রা পরিচয় দিলো, যে তারা সাম্প্রদায়িক সহিংসতা চায়, তাহলে সেটা ভূল। মূল ব্যাপারটা হচ্ছে, ভারতের এখন মূল সমস্যা দূর্নীতি আর এই দূর্নীতি থেকে রেহাই পেতে তারা ক্ষমতাসীনকে ক্ষমতাচ্যুত করলো, ঠিক যেমনটা ঘটেছিলো বিগত চট্টগ্রাম সিটই কর্পোরেশন নির্বাচনের সময়ে, দক্ষ, পরীক্ষিত মেয়র থাকা স্বত্ত্বেও চট্টগ্রামবাসী বেছে নিয়েছিলো অদক্ষ একজনকে, এর মানে কি যাদের ভোটে মঞ্জু সাহেব মেয়র হয়েছে তারা সবাই বিএনপি!!! কিনবা দেশের সমকালীন অন্যান্য নির্বাচনে যেসব এলাকায় বিএনপি জিতেছে সেসব কি বিএনপি নিয়ন্ত্রাধীন? মোটেও না, ব্যাপারগুলো অন্য স্থানে, জনগণ সময়ের সাথে সাথে চাহিদার কারণে একেক সময় একেক পন্থা বেছে নেয় আর সেজন্যেই যাবতীয় সমস্যাদি সৃষ্টি হয়।

    হাতের পাঁচ আঙ্গুল যেমন সমান নয় তেমনি সব মানুষের মতাদর্শ এক নয়, যেমন ধরুণ আমি আওয়ামীলীগের সমর্থক। বেশিদিন আগের কথা না, বছরখানেক আগেও আমি গলা ফাটিয়ে নিজেকে একজন আওয়ামীলীগের কর্মী হিসেবে পরিচয় করিয়ে দিতাম। কিন্তু এখন কি সেইভাবে করি, যেটা সেইসময়ে করতাম? তার মানে কি আমি আওয়ামীলীগ সমর্থন ছেড়ে দিয়েছি? মোটেও না, সমর্থক ছিলাম, সমর্থক আছি এবং সমর্থক থাকবোই। শুধু সময়ের কারণে, চাহিদার প্রেক্ষিতে কিছুটা পরিবর্তিত হয়েছি। এরও কতকগুলো স্পষ্ট কারণ রয়েছে, দল ক্ষমতায় বসে সরকারের হয়ে ইসলামী ব্যাঙকের পক্ষে সাফাই দিচ্ছে, বায়াত পড়িয়ে শিবিরের কর্মীকে আওয়ামীলীগ করছে, একটা সময়ে গণহারে জামাত-শিবিরের গ্রেফতার করা কর্মীদের মুক্তি দিচ্ছে, পারলে পরে জামাত-শিবিরের পক্ষে গিয়ে ওকালতি করছে মুক্তির জন্য…. এইসবই বাধ্য করেছে আগের অবস্থান থেকে সরে আসতে কিছুটা। কিন্তু তাই বলে আওয়ামীলীগের সমর্থন ছেড়ে দেই নাই, যৌক্তিকভাবে নিজের স্বল্প জ্ঞান দিয়ে যতটা সম্ভব বাংলাদেশ আওয়ামীলীগের পক্ষেই থাকি। এখানে এও উল্লেখ্য যে আমি যেভাবে দলকে চেয়েছি সেভাবে দল চলেনি, আবার অন্য একজন যেভাবে চেয়েছে সেভাবেই হয়তো এগিয়েছে। এই মত রক্ষা আর বর্জন এসবের কারণেও অনেক সময় সমস্যা তৈরী হয়ে যায়।

    উপরের এতো কথা বলার একটাই কারণ আর সেটা হলো, মূল পোস্টে বর্ণিত দেশে দেশে এতো সমস্যার পেছনে যেই সমস্যাটিকে মূল হিসেবে জানি সেই সমস্যাটিকে তুলে ধরলাম। যাবতীয় সমস্যা মানব সৃষ্ট, এবং তাদের ব্যক্তিগত কিনবা দল অথবা দেশগত মতাদর্শের কারণেই। যার ক্ষমতা বেশি সে স্বভাবতই চেষ্টা করবে, ক্ষমতার প্রয়োগ ঘটিয়ে হলেও সর্বময় ক্ষমতার শীর্ষে আরোহন করা। আর এসব সমস্যা সমাধান যোগ্য নয় কখনোই। কেননা মানুষ স্বাধীন জীব আর এই স্বাধীন স্বাদ উপভোগ করা জীবটি কখনোই পরাধীনতার শৃংখলে আবদ্ধ থাকতে চাইবে না, অন্যদিকে শাসকগোষ্ঠীও কখনো তার ক্ষমতা ত্যাগ করে ক্ষমতাহীন হতে চাইবে না। সেটি দেশে-দেশে যেমন সত্য তেমনি আমাদের ব্যক্তিজীবনেও।

    পরিশেষে লেখককে আবারো ধন্যবাদ জানাই যে, দারুণ একটি পোস্ট অল্প কথায় চমৎকারভাবে উপস্থাপন করার জন্য।

  2. পদধ্বনি আমিও শুনতে
    পদধ্বনি আমিও শুনতে পাচ্ছি…ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছে…প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মতোই নিষ্ঠুর…

  3. ছোট এই লেখাটিতে বিশ্ব
    :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ:
    ছোট এই লেখাটিতে বিশ্ব রাজনীতির অস্থিরতার কারন খুব সুন্দরভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। ধন্যবাদ পোস্টদাতাকে।

  4. বিশ্ব রাজনীতি নিয়ে বাংলা
    বিশ্ব রাজনীতি নিয়ে বাংলা অনলাইনে এত চমৎকার লেখা সাম্প্রতিক সময়ে চোখে পড়ে নাই। লেখক থেকে আমাদের প্রত্যাশা বেড়ে গেল।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

1 + 6 =