‘এক পাগলের রোজনামচা’ : লু স্যুন-এর গল্প

[পাঠ প্রবেশ : ‘এক পাগলের রোজনামচা’ গল্পটি লিখেছেন আধুনিক চীনা সাহিত্যের উজ্জ্বল নক্ষত্র লু স্যুন। উইলিয়াম লায়েল-এর করা ইংরেজি অনুবাদ থেকে বাংলায় এটি অনুবাদ করেছেন ফজল হাসান। চীনা ভাষায় লু স্যুন-এর এই গল্পটি ১৯১৮ সালে ‘নিউ ইয়ুথ’ ম্যাগাজিনে প্রথম প্রকাশিত হয় এবং পরবর্তীতে ‘কল টু আর্মস্’ ছোটগল্প সংকলনে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। গল্পটি আধুনিক চীনা ভাষার (ভ্যারন্যাকিউল্যার ল্যাঙ্গুয়েজ) প্রথম ছোটগল্প হিসেবে সর্বজন স্বীকৃত।

লু স্যুনকে বলা হয় আধুনিক চীনা সাহিত্যের বরপুত্র। তার বিশেষ বৈশিষ্ট্যধর্মী লেখনী চীনা গল্পসাহিত্যকে দিয়েছে আধুনিকতার ছোঁয়া। কবি হিসেবে রয়েছে তার বিরাট খ্যাতি। আবার তাকে চীনা ছোটগল্পের জনকও বলা হয়। তার ‘এক পাগলের রোজনামচা’ মূলত একটি রূপক গল্প। গত শতাব্দীর দ্বিতীয় দশকের শেষার্ধে যখন চীনজুড়ে রাজনৈতিক অস্থিতিশীল পরিবেশ বিরাজ করছিল এবং ‘৪ঠা মে আন্দোলন’ ছিল তুঙ্গে, সে সময় গল্পটি লেখা হয়। এতে একদিকে চীনের পুরনো সামন্ত সমাজব্যবস্থার কঠোর সমালোচনা করা হয়েছে। অন্যদিকে চীনা জনগণের প্রতি স্বাধীনতার লড়াইয়ে নামার আহ্বান জানানো হয়েছে। তাই গল্পটিকে ‘নতুন সাংস্কৃতিক আন্দোলন’ বা ‘নিউ কালচারাল মুভমেন্ট’য়ের অত্যন্ত প্রয়োজনীয় অংশ হিসেবে গণ্য করা হয়।

লু স্যুনের পরিচয়ের আরেকটি বিশেষ দিক রয়েছে। যে কারণে তিনি আমাদের মতো নয়া ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রের জনগণের জন্য গুরুত্বপূর্ণ এবং অপরিহার্য। চীনা জনগণের মুক্তির লক্ষ্যে ১৯১৯ সালে গড়ে ওঠা ‘৪ঠা মে আন্দোলন’-এর একজন অগ্রদূত ছিলেন তিনি। চীনা কমিউনিস্ট পার্টিতে কখনও যোগ না দিলেও গণমুক্তির লড়াইয়ে তার ভূমিকা পার্টির কোনো একজন নেতার চেয়েও কম ছিল না। বিষয়টা সংক্ষেপে স্পষ্ট হবে চীন বিপ্লবের স্থপতি মহান কমরেড মাও সেতুঙের একটি উদ্ধৃতি থেকে-

চীনের সাংস্কৃতিক বিপ্লবের তিনি ছিলেন প্রধান সেনাপতি। তিনি শুধু একজন মহান সাহিত্যিকই ছিলেন না, তিনি একজন মহান চিন্তাবিদ ও মহান বিপ্লবীও ছিলেন। লু স্যুন ছিলেন প্রস্তরের মতো দৃঢ়, সকল রকমের মোসাহেবি ও আজ্ঞানুবর্তিতা থেকে তিনি মুক্ত ছিলেন। তাঁর এই চরিত্র বৈশিষ্ট্য ঔপনিবেশিক ও আধা-ঔপনিবেশিক দেশের জনগণের এক অমূল্য সম্পদ। সাংস্কৃতিক ফ্রন্টে, সমগ্র জাতির বিরাট সংখ্যাধিক্যের প্রতিনিধি হিসেবে লু স্যুন শত্রুর দুর্গ বিদীর্ণ করেন এবং তার উপর প্রচণ্ড আক্রমণ চালিয়েছিলেন; এতে তিনি ছিলেন সবচেয়ে নির্ভুল, সবচেয়ে নির্ভীক, সবচেয়ে দৃঢ়, সবচেয়ে সত্যনিষ্ঠ, সবচেয়ে উৎসাহী জাতীয় বীর, আমাদের ইতিহাসে এই বীরের কোনো তুলনা নেই। লু স্যুন-এর পথ চীনা জাতির নতুন সংস্কৃতির পথ।

গল্পটি কলেবরে একটু বড়। কিন্তু পাঠক হিসেবে খেয়াল করেছি, দৈর্ঘ্যটা টের পাওয়া যায় না। তবে যাদের কাছে এটাকে কেবলই পাগলের প্রলাপ মনে হবে, তারা যেকোনো স্থানেই থামতে পারেন।]

দুই ভাই, যাদের নাম আমি এখানে উল্লেখ করার প্রয়োজন মনে করি না, হাইস্কুলে লেখাপড়া করার সময় আমার খুব ভালো বন্ধু ছিল। কিন্তু মাঝখানে অনেক বছর কোনো যোগাযোগ না থাকায় আমাদের মধ্যে দূরত্ব বেড়ে যায়। তবে কয়েক বছর আগে আমি জানতে পারি, ওদের মধ্যে একজন ভীষণ অসুস্থ ছিল। একদিন আমি বাড়ি যাওয়ার পথে যাত্রা ভঙ্গ করে ওদের বাড়ি যাই এবং খানিকক্ষণ সময় কাটাই। তখন দুই ভাইয়ের মধ্যে আমি একজনের সাক্ষাৎ পেয়েছি। সে-ই আমাকে বলেছে যে তার ছোট ভাই মানসিকভাবে অসুস্থ এবং অক্ষম ছিল।

‘এতটা দীর্ঘ পথ পেরিয়ে আমাদের দেখতে আসার জন্য সত্যি আমরা কৃতজ্ঞ এবং গৌরব বোধ করি।’ কৃতজ্ঞতার মোলায়েম স্বরে সে বলল। একটু থেমে সে আরও বলল, ‘কিন্তু আমার ভাইটি অনেক আগেই সুস্থ হয়ে গেছে এবং সে একটা সরকারি কাজ নিয়ে অন্য জায়গায় চলে গেছে।’ তারপর হাসতে হাসতে সে আমার দিকে তার ভাইয়ের পুরনো দুই খণ্ড ডায়েরি এগিয়ে ধরে বলল যে, এগুলো পড়লে তার ছোট ভাইয়ের অসুস্থতার কথা জানা যাবে। পুরনো কোনো বন্ধুকে ডায়েরিগুলো দেখাতে তার কোনো আপত্তি বা অসুবিধে নেই। আমি ডায়েরি দুটি নিয়ে বাড়ি ফিরে আসি এবং আগাগোড়া পড়ে অনায়াসে বুঝতে পারি, ছোট ভাইটি এক ধরনের জটিল মানসিক রোগে আক্রান্ত ছিল। লেখাগুলো খুবই বিভ্রান্তিকর এবং অগোছালো। তবে সে অনেক কঠোর মন্তব্য করেছে এবং মাঝে মাঝে অপ্রিয় সত্য কথা বলেছে। উপরন্তু সে লেখাগুলোতে কেনো দিনক্ষণ বা তারিখ উল্লেখ করেনি। তাই শুধু বিভিন্ন রঙের কালি এবং হাতের লেখার ধরন দেখে অনায়াসে বলা যায়, ডায়েরির লেখাগুলো একদিনে লেখা হয়নি।

যাই হোক, এর কিছু কিছু অংশ যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ এবং মেডিকেল গবেষণার জন্য আমি নির্দিষ্ট ও প্রয়োজনীয় অংশগুলো টুকে নিয়েছি। ডায়েরির একটা অপ্রয়োজনীয় কিংবা ফালতু শব্দও আমি পরিবর্তন করিনি। তবে গোপনীয়তা রক্ষার্থে আমি শুধু লোকজনের নাম পরিবর্তন করেছি। যদিও লোকগুলো সাধারণ গ্রামবাসী, আর তারা বাইরের জগতে অপরিচিত, বিশ্ব দরবারে তাদের বিশেষ কোনো মূল্য নেই। তাই তাদের নাম বদল করলেও কিছু যায়-আসে না। সুস্থ হওয়ার পর ডায়েরির লেখকই লেখাগুলোর মূল শিরোনাম নির্ধারণ করে দিয়েছে। তাই আমি ওটা সংশোধন কিংবা পরিমার্জন করিনি।

॥ এক ॥
আজ চাঁদনীপশর রাইত। চারপাশে থই থই করছে অমলধবল জ্যোৎস্না।
গত ৩০ বছরে আমি এ রকম ভরা পূর্ণিমার রাত কখনও দেখিনি। আজ যখন আমি প্রথম ভরা পূর্ণিমা দেখলাম, তখন আমার কাছে আকাশের গায়ে ঝুলে থাকা রুপালি চাঁদটাকে অপূর্ব লেগেছে। আমার মনে হয়েছে, আসলে গত ৩০ বছর আমি এক অন্ধকার জগতে নিমজ্জিত ছিলাম। যা-হোক, এখন আমাকে আরও সতর্ক হতে হবে। তা নাহলে চাওয়ের বাড়ির কুকুর কেন আমার দিকে অমন করে দুবার তাকাবে?
আমার ভয় পাওয়ার একাধিক কারণ আছে।

॥ দুই ॥
আজ রাতে বিশাল আকাশের গায়ে কোথাও চাঁদ নেই। আমি জানি, এই চাঁদ না ওঠা এক ধরনের অমঙ্গলের লক্ষণ। আজ সকালে যখন আমি ঘর থেকে সাবধানে বের হয়েছিলাম, তখন মিস্টার চাও এমন অদ্ভুত দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়েছিল যে আমাকে সে ভীষণ ভয় পায় এবং আমাকে খুন করতে চায়। সেখানে আরও সাত কিংবা আটজন লোক ছিল। তারা আমার সম্পর্কে ফিসফিস করে কিছু বলছিল। আমার তির্যক চাহনি দেখে ওরা ভয় পেয়েছিল। আমি যাদের পাশ কেটে এসেছি, তাদের সবার দৃষ্টিভঙ্গি ছিল একই ধরনের। যা-হোক, ওরা ঠোঁটের ফাঁকে বিদ্রƒপের হাসি ঝুলিয়ে রেখে আমার দিকে তাকিয়েছিল। ওরা সম্পূর্ণ প্রস্তুত জানা সত্ত্বেও তখন কেন জানি আমার মাথা থেকে পা অবধি থর থর করে কেঁপেছিল।

যা-হোক, আমি নির্ভয়ে পথ চলতে থাকি। সামনে একদল ছেলেমেয়েও আমার সম্পর্কে আলোচনা করছিল। ওদের চাহনিও ছিল মিস্টার চাওয়ের মতো অদ্ভুত, কিন্তু মুখমণ্ডল ছিল মৃতদের মতো ফ্যাঁকাসে। আমি কিছুতেই ভেবে পাই না, আমার প্রতি ওদের কিসের আক্রোশ, যার জন্য ওরা অমন করে আমার দিকে তাকিয়েছিল। আমি জিজ্ঞেস না করে পারিনি, ‘আমাকে বলো !’ আমার কণ্ঠস্বর শোনার সঙ্গে সঙ্গেই ওরা দৌড়ে পালিয়ে যায়।

আমি কোনো কূল-কিনারা খুঁজে পাই না, আমার প্রতি মিস্টার চাও কেন ঈর্ষান্বিত, এমনকি রাস্তার লোকজনেরও কিসের এত আক্রোশ। আমি বাড়তি কিছুই চিন্তা করতে পারি না। তবে আমার যদ্দুর মনে পড়ে, কুড়ি বছর আগে আমি মিস্টার কু চিউ’র জন্মবৃত্তান্ত এবং তার বংশের ইতিহাস নিয়ে মেতেছিলাম। তাতে মিস্টার কু ভীষণ রাগ করেছিল আমার ওপর, নাখোশ হয়েছিল। আমার জানামতে, মিস্টার চাও তাকে চেনে না। তবে মনে হয় সে কোথাও সেই পুরনো ঘটনা শুনেছে এবং এখন আমার ওপর প্রতিশোধ নিতে চায়। তাই সে রাস্তার অন্য লোকদের সঙ্গে আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে। কিন্তু ছেলেমেয়েদের কী হয়েছে? তখন তো ওদের জন্মই হয়নি। তবে ওরা আজ আমার দিকে কেন অমন কটাক্ষ এবং খুনির দৃষ্টিতে তাকিয়েছিল। তাহলে ওরা কি আমাকে খুন করতে চায়? সবার এ ধরনের ভয়ঙ্কর দৃষ্টিতে তাকানো আমার জন্য রীতিমতো ভীতিকর এবং মানসিক অত্যাচার, এমনকি আমাকে হতভম্ব করার মতো বিষয়।
আমি জানি। নিশ্চয়ই আমার অতীতের ঘটনা ওরা ওদের মা-বাবার কাছে শুনেছে।

॥ তিন ॥
রাতে আমার ভালো ঘুম হয় না। আমি জানি, কোনো কিছু সঠিকভাবে বুঝতে হলে বুদ্ধিমত্তা এবং সতর্ক বিবেচনার প্রয়োজন আছে।
লোকগুলোর কয়েকজনকে ম্যাজিস্ট্রেট দোষী প্রমাণ করে শাস্তি দিয়েছিলেন। এছাড়া স্থানীয় লোকজন তাদের মুখে চড়-থাপ্পড় মেরেছিল, এমনকি সরকারি কর্মকর্তারাও লোকগুলোর স্ত্রীদের অন্যত্র সরিয়ে নিয়েছিলেন। উপরন্তু পাওনাদারদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে তাদের বাবা-মা আত্মহত্যা করতে বাধ্য হয়েছিল। তখন তাদের মুখমণ্ডলে যতটা ভয় বা হিংস্রতা ছিল, গতকাল তাদের মুখ তার চেয়ে অনেক বেশি ভীতিপূর্ণ এবং হিংস্র ছিল।
তবে গতকাল সবচেয়ে অস্বাভাবিক যে ঘটনাটি ঘটেছিল, তাহলো রাস্তায় এক মহিলা তার ছেলের পাছায় চড় দিয়ে রাগান্বিত স্বরে বলেছিল, ‘শয়তানের বাচ্চা, ইচ্ছে হয় তোকে কামড়ে টুকরো টুকরো করে চিবিয়ে মনের ঝাল মিটাই।’

পুরোটা সময় মহিলা আমার দিকে ট্যারা চোখে তাকিয়েছিল। আমিও ভয়ঙ্কর দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়েছিলাম। আমাকে নিয়ে কুৎসিত মুখওয়ালা লোকগুলো বিশ্রী দাঁত বের করে বিদ্রƒপাত্মক ভঙ্গিতে হেসেছিল। একসময় আমি নিজেকে সংযত করতে পারিনি। সেই সময় ত্বরিতগতিতে বুড়ো চেন এগিয়ে এসে আমাকে রীতিমতো টেনেহিঁচড়ে বাড়িতে পৌঁছে দিয়েছিল।

যা হোক, শেষ পর্যন্ত বুড়ো চেন আমাকে বাড়ি পৌঁছে দিয়ে প্রাণে বাঁচিয়েছিল। কিন্তু বাড়িতে যারা উপস্থিত ছিল তারা আমাকে না-চেনার ভান করে এবং অন্যদের মতো তাদের দৃষ্টিও কেমন যেন অস্বাভাবিক ছিল। আমি যখন পড়ার ঘরে ঢুকেছিলাম, তখন সন্ধ্যেবেলা খোঁয়াড়ে মোরগ-মুরগি এবং হাঁস বন্দী করার মতো তারা আমাকে বাইরে থেকে তালা দিয়ে দরজা বন্ধ করে দিয়েছিল। এ ঘটনা আমাকে আরও বেশি বিস্মিত করেছিল।
কয়েক দিন আগে আমাদের উলফ্ কাব গ্রাম থেকে একজন গ্রামবাসী এসে বলেছে যে জমির সব ফসল নষ্ট হয়ে গেছে। এছাড়া সে আমার ভাইকে আরও বলেছে যে গ্রামের একজন কুখ্যাত লোককে পিটিয়ে মেরে ফেলেছে। তারপর কয়েকজন সেই মৃত লোকটির হৃৎপিণ্ড ও কলিজা বের করে গরম তেলে ভেজেছে এবং মনের ভেতর সাহস বৃদ্ধির জন্য ওরা ওগুলো খেয়েছে। আমি যখন বাধা দিতে চেয়েছিলাম, তখন সেই গ্রামবাসী এবং আমার ভাই আমার দিকে কটমট করে তাকিয়েছিল। আজই আমি বুঝতে পারলাম যে তাদের সেই তাকানোর ভঙ্গি এবং বাইরের লোকগুলোর তাকানোর ভঙ্গি অবিকল একই রকমের। সেই মুহূর্তে ভয়ে আমার মাথার তালু থেকে পায়ের পাতা অবধি কেঁপে ওঠে। লোকগুলো নরখাদক। সুতরাং একসময় ওরা আমাকেও খেতে পারে।
মহিলা নিজের ছেলেকে কামড়ে টুকরো টুকরো করে খাওয়ার হুঙ্কার, সেই বিশ্রী দাঁতওয়ালা মুখের লোকগুলোর বিদ্রƒপাত্মক হাসি এবং গ্রামের লোকটির কাহিনী- সবগুলো ঘটনা যেন কোন এক গোপন কিছুর ঈঙ্গিত বহন করে। ওদের কথার মর্ম এবং হাসির কারণ আমি এখন অনায়াসে বুঝতে পেরেছি। ওদের দাঁতগুলো ঝকঝকে সাদা এবং উজ্জ্বল; ওরা সবাই নরখাদক।

যদিও আমি মন্দ লোক নই, কিন্তু অগোচরে কেন জানি মনে হয়, মিস্টার কু’র জন্মবৃত্তান্ত নিয়ে মাতামাতি করার পর থেকেই এ রকম ধারণা আমার মনের ভেতর আসে-যায়। ওরা রীতিমতো গোপনীয়তা বজায় রেখেছে। আমি তা উপলব্ধি করতে পারি না। তবে যখন ওদের মেজাজ ভীষণ খারাপ হয়, তখন ওরা অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করে এবং বাজে নাম ধরে ডাকে। আমার মনে আছে, বড় ভাই যত ভালো মানুষই হোক না কেন, যখন সে আমাকে রচনা লেখার কৌশল শিখিয়েছিল, তখন আমার কোনো ভালো লেখা তার মনঃপূত হয়নি, এমনকি সেই লেখাগুলোকে সে মোটেও আমল দেয়নি। কিন্তু খারাপভাবে লেখা আমার রচনাগুলোকে বড় ভাই প্রশংসা করে বলতো, ‘ভালো লিখেছিস। এসব লেখায় তোর নিজস্ব চিন্তা-ভাবনার প্রকাশ ঘটেছে।’ নরখাদকেরা যখন মানুষ ভক্ষণ করার জন্য অপেক্ষায় থাকে, তখন আমি কেমন করে ওদের মনের গোপন খবর জানব ?

কোনো কিছু বুঝতে হলে চাই সতর্ক এবং সঠিক বিবেচনা। আমার যতদূর মনে পড়ে, প্রাচীন যুগে মানুষেরা মানুষের মাংস খেতো। তবে এ ব্যাপারে আমার কেন জানি খটকা লাগে। সাদামাঠাভাবে আমি বিষয়টা নিয়ে পর্যালোচনা করতে চেয়েছি, কিন্তু ইতিহাসের সব ঘটনাই এলোমেলো এবং তাতে কোন ধারাবাহিকতা নেই। বরং প্রতি পৃষ্ঠায় লেখা রয়েছে দুটি শব্দ- সততা ও নৈতিকতা। যা হোক, যেহেতু রাতে আমার ভালো ঘুম হয় না, তাই অর্ধেক সময় আমি বই পড়ে কাটাই। তবে যতক্ষণ পর্যন্ত আমার চোখ বইয়ের অক্ষরগুলো দেখতে পারে। বইজুড়ে হা করে আছে শুধু দুটি শব্দ- ‘মানুষ খাও’।
শব্দ দুটি বইয়ে আছে এবং চারপাশের সবাই আমার দিকে অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকিয়ে এ শব্দ দুটি উচ্চারণ করে।
নরখাদক লোকগুলোর মতো আমিও একজন রক্ত-মাংসের মানুষ, কিন্তু ওরা আমাকে খেতে চায়।

॥ চার ॥
সকালে আমি বেশ খানিকক্ষণ চুপচাপ বসেছিলাম। দুপুরে খাওয়ার জন্য বুড়ো চেন আমার জন্য এক বাটি সবজি এবং অন্য আরেক বাটিতে মাছ নিয়ে আসে। মাছের চোখ দুটি সাদা এবং ভীষণ শক্ত। নরখাদক লোকগুলোর মতো মাছের মুখ হা করে আছে। কয়েকবার মুখভর্তি খাওয়ার পরও আমি বলতে পারিনি যে পিচ্ছিল খাবারটা আসলে মাছ ছিল, নাকি মানুষের মাংস ছিল। ফলে অস্বস্তিতে আমি সব খাবার উগরে দিয়েছি।

একসময় আমি অনুরোধের ভঙ্গিতে বললাম, ‘বুড়ো চেন, আমার ভাইকে বলুন যে এখানে আমার দম বন্ধ হয়ে আসছে এবং আমি স্বাভাবিকভাবে নিঃশ্বাস নিতে পারছি না। খোলা বাতাসে বাগানে আমি কিছুক্ষণ পায়চারি করতে চাই।’
আমার অনুরোধের কোনো জবাব না দিয়ে বুড়ো চেন বেরিয়ে যায়। কিন্তু কিছুক্ষণ পর সে ফিরে এসে কোনো উচ্চবাচ্য না করে দরজা খুলে দেয়।

আমি নড়াচড়া করিনি। তবে আমার সঙ্গে ওরা কেমন ব্যবহার করে, তা দেখার জন্য আমি অপেক্ষা করেছিলাম। আমার ভেতর এক ধরনের বিশ্বাস জন্মেছিল যে, ওরা আমাকে কিছুতেই ছেড়ে দেবে না। এ ব্যাপারে আমি মোটামুটি নিশ্চিত ছিলাম। আমার বড় ভাই একজন বুড়ো লোককে সঙ্গে করে ধীর পায়ে ঘরে ঢুকলেন। লোকটির চোখে খুনের লেলিহান শিখা জ্বলছিল। পাছে আমি দেখে ফেলি, সেই ভয়ে সে মাথা নিচু করে এবং চশমার ফাঁক গলিয়ে চোরাদৃষ্টিতে আমাকে পরখ করে।

‘আমার মনে হয় আজ তুই ভালোই আছিস’, একসময় বড় ভাই বলল।
‘হ্যাঁ’, আমি সম্মতি জানিয়ে বললাম।
‘তোকে পরীক্ষা করার জন্য মিস্টার হো-কে আজ এখানে আসতে বলেছি’, পুনরায় বড় ভাই বলল।
‘ঠিক আছে’, যদিও আমি হালকা স্বরে বললাম, কিন্তু আমি জানি এই লোকটা ছদ্মবেশী কসাই। সে আমাকে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখবে আমার শরীরে কতটুকু মেদ জমেছে। এটুকু দেখার জন্য সে পারিশ্রমিক বাবদ আমার দেহের খানিকটা মাংস পাবে। এসব জানার পরও আমার কেন জনি কোনো ভয় করছে না। আমি নরখাদক নই, কিন্তু আমার মনোবল ওদের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী। বুড়ো লোকটি আমাকে কী ধরনের পরীক্ষা করবে, তা দেখার জন্য আমি তার সামনে মুষ্টিবদ্ধ দুহাত এগিয়ে ধরি। বুড়ো লোকটি চোখের পাতা বন্ধ রেখে খানিকক্ষণ ইতঃস্তত করে। তারপর একসময় সে চোখের পাতা খোলে এবং আমাকে উদ্দেশ করে বলল, ‘স্বপ্নের অলীক ভুবনে সময় নষ্ট করো না। চুপচাপ কয়েক দিন বিশ্রাম নাও। সব ঠিক হয়ে যাবে।’

‘স্বপ্নের অলীক ভুবনে সময় নষ্ট করো না। চুপচাপ কয়েকদিন বিশ্রাম নাও।’ আপন মনে আমি কথাগুলো পুনরায় উচ্চারণ করি এবং গভীরভাবে ভাবতে থাকি। একসময় আমার মস্তিষ্কে একটা বিষয় স্পার্ক করে। তাহলে লোকটির কথার অর্থ এই যে, কয়েক দিন বিশ্রাম নিলে আমার শরীরে বেশি মেদ জমবে এবং তখন ওরা অধিক পরিমাণে মাংসের ভাগ পাবে। কিন্তু তাতে আমার কী যায়-আসে ? আমি কিছুতেই ভেবে পাই না, কেমন করে ‘সব ঠিক হয়ে যাবে’। লোকগুলো মানুষের মাংস খাওয়ার জন্য উদগ্রীব হয়ে আছে। কিন্তু একই সঙ্গে ওরা চোখমুখের অঙ্গভঙ্গি গোপন রাখতে চায়। যা হোক, ওরা তাৎক্ষণিক কাজ সমাধা করার জন্য সাহস দেখায় না। এসব বিষয় নিয়ে ভাবার সময় আমি দারুণ আনন্দ পাচ্ছিলাম। কিছুতেই শব্দ করে হাসি চেপে রাখতে পারিনি। তখন আমার বেশ মজাই লাগছিল। আমি জানি, এ ধরনের প্রাণখোলা হাসি মানুষের মনের ভেতর দুর্বার শক্তি এবং সাহস বাড়ায়। আমার মনের জোর, আত্মবিশ্বাস এবং সাহস দেখে বড় ভাই এবং লোকটির মুখ ফ্যাঁকাসে হয়ে ওঠে।

যেহেতু আমি সাহসী এবং আত্মবিশ্বাস হারাইনি, তাই ওরা আমাকে খাওয়ার জন্য খুবই উৎসাহী। কেননা আমাকে খেলে হয়তো ওদের আত্মবিশ্বাস এবং সাহস বাড়বে। বুড়ো লোকটি দরজার বাইরে যায় এবং যাওয়ার সময় আমার বড় ভাইয়ের কানে ফিসফিসিয়ে বলল, ‘অবিলম্বে খাওয়া যাবে।’ আমার বড় ভাই সম্মতিসূচক ভঙ্গিতে মাথা দোলায়। তাহলে আমিই ওদের পরবর্তী শিকার। যদিও এই বিস্ময়কর অনুভূতি দৈবক্রমে আমার মস্তিষ্কে এসে জমা হয়েছে, কিন্তু আমার কোনো ধারণাই ছিল না যে, আমার বড় ভাই আমাকে খেতে পারে।
মানুষের মাংস ভক্ষণ করা লোকটি আমার বড় ভাই।
হতভাগা আমি সেই নরখাদকের ছোট ভাই।
নিঃসন্দেহে অন্যরাও আমাকে খেতে পারে। কিন্তু তা সত্ত্বেও আমি এক নরখাদকের ছোট ভাই।

॥ পাঁচ ॥
গত কয়েক দিন আমি একই বিষয় নিয়ে বারবার ভেবেছি। আমি যদি মনে করি বুড়ো লোকটি ছদ্মবেশী কসাই নয়, বরং একজন সাচ্চা ডাক্তার, কিন্তু তার পরও সে মানুষের মাংস খেতে পারে। সেই ভেষজবিদ্যার বইয়ে, যা তার পূর্ববর্তী লি সি-চেন লিখেছেন, স্পষ্ট করে লেখা আছে যে মানুষের মাংস সিদ্ধ করে খাওয়া যায়। তার পরও কি বুড়ো লোকটি বলতে চায় যে সে মানুষের মাংস খায় না?

আমার বড় ভাইয়ের প্রতি সন্দেহ পোষণ করার মতো অজস্র ভালো কারণ রয়েছে। যখন আমাকে পড়াত, তখন সে নিজের মুখেই বলেছে, ‘খাওয়ার জন্য লোকজন তাদের ছেলেমেয়েদের অদল-বদল করত।’ শুধু তা-ই নয়, একবার এক বাজে লোক প্রসঙ্গে গল্প করার সময় আমার বড় ভাই বলেছিল যে, লোকটিকে শুধু হত্যা করা নয়, বরং ‘তার মাংস খাওয়া উচিত এবং শরীরের চামড়া বিছিয়ে ঘুমানো উচিত …।’ তখন আমি ছোট ছিলাম এবং ভয়ে আমার বুক অনেকক্ষণ খুব দ্রুত কেঁপেছিল।

সেদিন উলফ্ ক্লাব গ্রামের লোকটির মুখে মানুষের হৃৎপিণ্ড এবং কলিজা খাওয়া নরখাদকের গল্প শোনার পরও আমার বড় ভাই আশ্চর্যান্বিত হয়নি, বরং হ্যাঁ-সূচক ভঙ্গিতে ক্রমাগত মাথা দুলিয়েছিল। আগের মতোই সে এখনও নির্দয়, পাষণ্ড। যেহেতু ‘খাওয়ার জন্য লোকজন তাদের ছেলেমেয়েদের অদল-বদল’ করত, তাহলে যে কোনো কিছুই অনায়াসে বিনিময় করা যেতে পারে, এমনকি যে কেউ অন্যের খাদ্যবস্তু হতে পারে। অতীতে আমি শুধু বড় ভাইয়ের ব্যাখ্যা এক কান দিয়ে শুনতাম এবং অন্য কান দিয়ে বের করে দিতাম। কিন্তু এখন আমি বুঝতে পারি, সে যখন আমাকে বিশদভাবে বলল, তখন তার ঠোঁটের কোণায় শুধু মানুষের চর্বি লেগে ছিল না, বরং মানুষের মাংস খাওয়ার জন্য তার মনটা রীতিমতো আনচান করছিল।

॥ ছয় ॥
ঘুসঘুসে গাঢ় অন্ধকার। আমি জানি না, এখন দিন, নাকি রাত। চাওয়ের বাড়ির কুকুর আবারও ঘেউ ঘেউ শুরু করে।
সিংহের হিংস্রতা, খরগোশের ভীরুতা, খ্যাঁকশিয়ালের ধূর্ততা …।

॥ সাত ॥
আমি নরখাদকদের চিনি। তড়িঘড়ি করে কিংবা সরাসরি ওরা কাউকে হত্যা করে না, এমনকি পরবর্তী ভয়াবহ ঘটনার জন্য ওরা মোটেও সাহস দেখায় না। তার বদলে ওরা সবাই একত্র হয়ে আমার জন্য সব জায়গায় ফাঁদ পেতে রেখেছে, যেন আমি স্বেচ্ছায় আত্মহত্যার পথ বেছে নিই। কয়েক দিন পূর্বে রাস্তায় পুরুষ ও মহিলার আচরণ এবং কিছুদিন আগে আমার বড় ভাইয়ের চালচলন ও কথাবার্তা এ ধরনের পরিস্থিতির কথাই আমার মনে বারবার অনুরণিত হতে থাকে। তবে ওরা সবচেয়ে বেশি পছন্দ করে, লোকজন যদি কোমর থেকে বেল্ট খুলে সিলিংয়ের কড়িকাঠের সঙ্গে বেঁধে আত্মঘাতী হয়। তাতে ওদের মনোবাসনা পূর্ণ হবে, কিন্তু খুনের জন্য দোষী হবে না। স্বভাবতই এ ধরনের ঘটনা ঘটলে খুশিতে ওরা অট্টহাসিতে ফেটে পড়ে। অন্যদিকে যদি কেউ আত্মহত্যা করতে ভয় পায়, কিংবা দিনের পর দিন যারা আতঙ্কে ভোগে এবং শুকিয়ে আমসি হয়ে যায়, তখন সে ভীরু লোকদের ভক্ষণ করার প্রতিও ওদের কোনো আপত্তি নেই।

লোকগুলো শুধু মরা মানুষের মাংস খায়। আমার মনে পড়ে, আমি কোথাও পড়েছিলাম যে একধরনের বন্য প্রাণী আছে, যাদের চোখ খুবই কুৎসিত এবং তাদের ‘হায়েনা’ বলে, যারা মৃত জন্তু-জানোয়ারের মাংস খায়, এমনকি বড় বড় হাড়ও চিবিয়ে টুকরো টুকরো করে খেয়ে ফেলে। একজনের ভয় পাওয়ার জন্য এটুকুই যথেষ্ট। হায়েনার সঙ্গে নেকড়ের সম্পর্ক রয়েছে। আবার নেকড়েরা একধরনের বিশেষ কুকুর সম্প্রদায়ের প্রাণী। একদিন চাওয়ের বাড়ির কুকুর কয়েকবার আমার দিকে লুলুপ দৃষ্টিতে তাকিয়েছিল এবং সেটাও ছিল একধরনের গভীর ষড়যন্ত্র। যা হোক, আমার দিকে বুড়ো লোকটির দৃষ্টি আটকে ছিল। কিন্তু সে আমার চোখকে ফাঁকি দিতে পারেনি।

তবে সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হলো আমার বড় ভাই। সে-ও তো আমার মতো একজন মানুষ। তাহলে সে কেন ভয় পায় না? কেন সে অন্যদের সঙ্গে আঁতাত করে আমাকে ভক্ষণ করার জন্য পাঁয়তারা করছে? যখন থেকে সে বুঝতে পেরেছে যে মৃত মানুষের মাংস খাওয়া কোনো অন্যায় নয়, তখন থেকেই কি সে এ কাজ করছে? নাকি এ ধরনের কাজ করার জন্য সে আগেই মনকে পাথর বানিয়েছে?
নরখাদকদের অভিশাপ দিতে হলে প্রথমে আমার বড় ভাইকে দিতে হবে এবং যদি কাউকে সৎ উপদেশ দেয়া থেকে বিরত থাকতে হয়, তাহলেও আমার বড় ভাইকে দিয়ে শুরু করতে হবে।

 

॥ আট ॥
আসলে এসব যুক্তিতর্কে লোকগুলোর মনমানসিকতা অনেক আগেই পরিবর্তন হওয়ার কথা ছিল।
অকস্মাৎ কেউ একজন এলো। তার বয়স আনুমানিক কুড়ি বছর হবে এবং আমি তাকে ভালো করে দেখতে পারিনি। তবে তার চোখেমুখে ছিল নিঃশব্দ হাসি। কিন্তু যখন সে আমাকে অভিবাদনের ভঙ্গিতে মাথা নত করে, তখন আমি বুঝতে পারি ওটা আসলে মেকি হাসি ছিল।
যা হোক, উৎসুক হয়ে আমি একসময় তাকে জিজ্ঞেস করি, ‘মানুষের মাংস খাওয়া কি ঠিক কাজ ?’
তখনো তার ঠোঁটের ফাঁকে হাসি লেগেছিল। আমার প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে বরং সে হাসিমুখেই পাল্টা প্রশ্ন করে, ‘যখন কোনো দুর্ভিক্ষ থাকে না, তখন কেমন করে মানুষ মানুষের মাংস খেতে পারে?’

তৎক্ষণাৎ আমি বুঝে গেছি, সে-ও নরখাদক দলের একজন। তবুও আমি সাহস করে পুনরায় তাকে জিজ্ঞেস করি, ‘এটা কি ঠিক কাজ?’
‘কিসের জন্য এ ধরনের প্রশ্ন তুমি জিজ্ঞেস করছো? সত্যি তুমি … কৌতুক করতে পছন্দ করো।’ বলেই লোকটি এক পলকের জন্য থামল। তারপর প্রসঙ্গ পাল্টিয়ে স্বাভাবিক কণ্ঠস্বরে বললো, ‘আজকের এই রাতটা খুব সুন্দর লাগছে।’
সম্মতির ভঙ্গিতে আমি বললাম, ‘হ্যাঁ, তা ঠিক। আকাশের গায়ে উজ্জ্বল চাঁদ ঝুলে আছে। কিন্তু আমি আপনাকে জিজ্ঞেস করতে চাই, এটা কি ঠিক কাজ?’
লোকটি অপ্রতিভ দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে বলল, ‘না’।
‘না ? তাহলে এখনও কেন ওরা এ কাজ করে ?’
‘তুমি কোন কাজের কথা বলছো?’
‘আমি কি কাজের কথা বলছি? ওরা এখন গলফ্ ক্লাব গ্রামের মৃত মানুষের মাংস খাচ্ছে এবং বইজুড়ে এই ঘটনা লাল কালিতে লেখা রয়েছে।’
পলকেই লোকটির মুখের আদল পাল্টে গিয়ে রীতিমতো ফ্যাকাসে হয়ে যায়।
‘হয়তো তা-ই হবে’, তবুও আমার দিকে তাকিয়ে লোকটি বলল। ‘সেই আদিকাল থেকে ব্যাপারটা এ রকম হয়ে আসছে যে …।’
‘সব সময় একই রকম হয়ে আসছে বলে ব্যাপারটা কি ঠিক?’
‘এ বিষয়ে আমি আর কথা বাড়াতে চাই না। যা-হোক, এ নিয়ে তোমার কথা বলা উচিত নয়। এ বিষয়ে যেই কথা বলুক না কেন, তার ধারণা সম্পূর্ণ ভুল’, বিরক্তির সঙ্গে লোকটি বলল।

আমি চোখ দুটি বড় বড় করে তাকিয়ে দেখি লোকটি হাওয়া হয়ে গেছে। সেই মুহূর্তে আমি ঘামতে থাকি। লোকটি আমার বড় ভাইয়ের চেয়ে ছোট হবে। কিন্তু তার পরও সে নরখাদকের দলে যোগ দিয়েছে। নিশ্চয়ই তার বাবা-মা তাকে শিখিয়েছে এবং আমার ভয় হয়, ইতোমধ্যে সেও তার সন্তানদের এ বিষয়ে শিক্ষা দিয়েছে। তাইতো ছেলেমেয়েরা অমন অদ্ভুত দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকায়।

॥ নয় ॥
অন্যের মাংস খেতে চাওয়ার বাসনা এবং একই সঙ্গে নিজেরা অন্যের খাদ্যবস্তুতে পরিণত হওয়ার ভয়ে নরখাদকেরা একজন আরেকজনকে গভীর সন্দেহের চোখে দেখে।
নরখাদকদের জীবনটা কতই না সুন্দর হতো, যদি ওরা এ কুসংস্কার ছেড়ে দৈনন্দিন কাজের ভেতর নিজেদের ডুবিয়ে রাখত এবং স্বাভাবিক জীবনযাপন করত। ওদের শুধু একেকটা কাজ করতে হবে। বাবা-মা, ভাই-বোন, স্বামী-স্ত্রী, আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব এবং ছাত্র-শিক্ষক মিলে একে অপরকে এ কুসংস্কার থেকে বিরত থাকার কথা বলতে হবে এবং একই সঙ্গে নিরুৎসাহিত করতে হবে।

॥ দশ ॥
আজ খুব ভোরে আমি বড় ভাইকে খুঁজতে গিয়েছিলাম। সে তখন হলঘরের বাইরে দাঁড়িয়ে খোলা আকাশের দিকে তাকিয়েছিল। আমি পেছন দিয়ে হেঁটে গিয়ে দরজা এবং তার মাঝখানে দাঁড়াই। অত্যন্ত ভদ্র এবং নমনীয় গলায় আমি বললাম, ‘বড় ভাই, তোমাকে কিছু জরুরি কথা বলার ছিল।’
‘কী কথা?’ চট করে আমার দিকে ঘাড় ঘুরিয়ে বড় ভাই সঙ্গে সঙ্গে জিজ্ঞেস করে।
‘যদিও ব্যাপারটা খুবই ছোট, তবুও কথাটা বলতে আমার খুব সংকোচ হচ্ছে। যা হোক, আদিমকালে প্রত্যেকে হয়তো সামান্য পরিমাণে মানুষের মাংস খাওয়া শুরু করেছিল। যেহেতু পরবর্তীতে তাদের দৃষ্টিভঙ্গি বদলে যায়, তখন অনেকে সেই কুঅভ্যাস ছেড়ে দিয়ে সত্যিকারের আসল মানুষ হিসেবে স্বাভাবিক জীবনযাপন করেছে। কিন্তু অনেকে আবার নিজেদের সংশোধন করেনি এবং তারা মৃত মানুষের মাংস ভক্ষণ করে, যেমন সরীসৃপ প্রাণী। যারা নিজেদের পরিবর্তন করতে পারেনি, তাদের মধ্যে অনেকে মাছ, পাখি, বানর এবং সবশেষে নরখাদক মানুষ হয়েছে। যেসব মানুষ মৃত মানুষের মাংস খায়, তারা সুস্থ স্বাভাবিক মানুষ দেখলে ভীষণ লজ্জাবোধ করে।

প্রাচীনকালে চিয়াহ্ এবং চাওয়ের খাদ্য হিসেবে ই ইয়া তার ছেলেকে সেদ্ধ করে দিয়েছিল।৪ কিন্তু প্যান কু-র স্বর্গ-নরক এবং পৃথিবী সৃষ্টির পর থেকে মানুষ মানুষের মাংস খাওয়া শুরু করে। সেই ই ইয়ার ছেলের সময় থেকে সু সি-লিন৫-য়ের সময় এবং সু সি-লিনের সময় থেকে গলফ্ ক্লাব গ্রামের লোকটির ঘটনা পর্যন্ত মানুষে মানুষের মাংস খাওয়ার রেওয়াজ চলে আসছে। গত বছর শহরে একজন অপরাধীকে নরখাদকেরা হত্যা করেছিল। তারপর অপরাধীর রক্তের মধ্যে একজন নরখাদক এক টুকরো রুটি ভিজিয়ে খেয়েছিল।

নরখাদকেরা আমাকে খেতে চায়। আমি জানি, তুমি একলা হাতে ওদের বিরুদ্ধে কিছুই করতে পারবে না। কিন্তু তুমি কেন ওদের দলে ভিড়েছ? নরখাদক হিসেবে ওরা যেকোনো কাজ করতে দ্বিধাবোধ করবে না। যদি ওরা আমাকে খেতে পারে, তাহলে তোমাকেও খেতে ওরা কোনো কসুর করবে না। এছাড়া ওদের দলের একজন আরেকজনকে নির্দ্বিধায় খেয়ে ফেলবে। তবে তুমি যদি শীঘ্রই তোমাকে এ পথ থেকে সরিয়ে আনতে পারো এবং নিজেকে শোধরাতে সক্ষম হও, তাহলে সবাই বেঁচে যাবে এবং সুখ-শান্তিতে বসবাস করতে পারবে। যদিও যুগ যুগ ধরে এই অমানবিক প্রথা চলে আসছে, কিন্তু অবশ্যই আজ আমরা ভালোর জন্য একটা মহৎ কিছু করতে পারি। আমি নিশ্চিত যে তুমি আমার সঙ্গে সহমত পোষণ করবে। মনে আছে, সেদিন যখন ভাড়াটে ভাড়া কমাতে অনুরোধ করেছিল, তুমি তখন বলেছিলে তা করা যাবে না।

আমার কথা শুনে বড় ভাই প্রথমে উপহাসের ভঙ্গিতে হেসে ওঠে। তারপর তার চোখের তারায় খুনিদের মতো ক্রোধের আগুন জ্বলে ওঠে। যখন আমি তাদের দলের গোপন ফাঁস করে দিচ্ছিলাম, তখন ক্রমশ তার মুখ বিবর্ণ হয়ে যাচ্ছিল। গেটের বাইরে একদল লোক দাঁড়িয়েছিল, এমনকি সেখানে মিস্টার মাও এবং তার পোষা কুকুরটিও ছিল। ওরা সবাই গলা বাড়িয়ে আমাদের কথা শোনার চেষ্টা করছিল। সবার মুখ আমি স্পষ্ট দেখতে পারিনি। তবে মনে হয়েছে যে ওদের মুখে কাপড়ের মুখোশ ছিল। কয়েকজনের মুখ পাণ্ডুর দেখাচ্ছিল এবং তারা হাসি লুকিয়ে রেখেছিল।

আমি জানি, ওরা সবাই মৃত মানুষের মাংস খাওয়া দলের লোক। তবে আমি এ-ও জানি যে ওদের সবার মত এক নয়। কয়েকজন মনে করে যে মৃত মানুষের মাংস খাওয়ার রীতি সেই আদিকাল থেকে চলে আসছে এবং আগামীতেও চলবে। আবার অনেকে মনে করে, যদিও মৃত মানুষের মাংস খাওয়া ঠিক না, কিন্ত তবুও তারা খাওয়ার জন্য রীতিমতো উদগ্রীব হয়ে আছে। যা-হোক, তাদের মনে ভয় যে হয়তো অন্য লোকজন তাদের গোপন অভ্যাসের কথা জেনে যাবে। তাই নরখাদক লোকগুলো যখন আমার কথা শুনছিল, তখন ওরা আমার ওপর ভীষণ ক্ষেপে গিয়েছিল। কিন্তু তারপরও ওরা রাগান্বিত অবস্থায় ওদের বন্ধ ঠোঁটের ফাঁকে একধরনের কাষ্ঠহাসি ফুটিয়ে রেখেছিল।

হঠাৎ আমার বড় ভাই ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠে এবং ভীষণ জোরে চিৎকার করে লোকগুলোর উদ্দেশে বললো, ‘দূর হও। এখান থেকে সবাই চলে যাও। একটা পাগলের দিকে অমনভাবে হা করে তাকিয়ে কী দেখছো?’
সেই মুহূর্তে আমি লোকগুলোর চালবাজির বিষয়টা অনুধাবন করতে পারি। ওরা কখনোই ওদের জায়গা থেকে একচুল পরিমাণও নড়বে না এবং ইতোমধ্যে ওদের পরিকল্পনার পূর্ণাঙ্গ ছক কাটা হয়ে গেছে। ইতোমধ্যে ওরা আমার কপালে পাগলের তকমা এঁটে দিয়েছে। ভবিষ্যতে কেনো এক সময়ে ওরা যখন আমাকে ভক্ষণ করবে, অবশ্য সেই সময় ওদের কোনো অসুবিধে হবে না, তখন অন্য নরখাদকেরা ওদের প্রতি কৃতজ্ঞ থাকবে। একদিন সেই লোকটা বলেছিল যে গ্রামের মানুষেরা একটা খারাপ মৃত লোকের মাংস খেয়েছে। এটাও সেই একই ধরনের কাহিনী। এসব ওদের পুরনো কৌশল।

বুড়ো চেনও এসেছিল এবং সে ছিল ভীষণ উত্তেজিত। কিন্তু লোকগুলো কিছুতেই আমার মুখ বন্ধ করতে পারেনি। জনসাধারণের উদ্দেশে আমার কিছু কথা বলার আছে।
‘আপনাদের পরিবর্তন হওয়া জরুরি। আপনারা অন্তরের অন্তঃস্থল থেকে নিজেদের পরিবর্তন করুন’, উপদেশের ভঙ্গিতে আমি বললাম। ‘আপনারা জানেন, ভবিষ্যতে নরখাদকের জন্য এই দুনিয়ায় কোথাও কোনো জায়গা থাকবে না।’
‘আপনারা যদি এখনই নিজেদের পরিবর্তন না করেন, তাহলে একদিন আপনারাই আপনাদের মাংস ভক্ষণ করবেন। যদিও প্রতিদিন অনেক শিশু জন্মগ্রহণ করছে, কিন্তু শিকারির হাতে নেকড়ে গুম হওয়ার মতোই বড়রা ওদের হাপিশ করে ফেলবে।’

বুড়ো চেন সবাইকে সরিয়ে দিয়েছে। ইতোমধ্যে আমার বড় ভাইও হাওয়া হয়ে গেছে। একসময় বুড়ো চেন আমাকে আমার কক্ষে যাওয়ার জন্য বলল। ঘরের ভেতর ঘুসঘুসে অন্ধকার। আমার মাথার ওপর কাঠের বিম হালকাভাবে নড়তে শুরু করে এবং কিছুক্ষণের মধ্যেই প্রচণ্ড জোরে ঝাঁকুনি দিতে থাকে। একসময় হুড়মুড় করে কাঠের বিম ভেঙে আমার ওপর স্তূপাকারে জমা হয়।
কাঠের বিম এত ভারী ছিল যে আমি একচুল পরিমাণও এদিক-ওদিক নড়াচড়া করতে পারিনি। আমি স্পষ্ট বুঝতে পারি, নরখাদক লোকগুলো মনেপ্রাণে চাচ্ছিল আমি যেন কাঠের বিমের চাপে মারা যাই। যা-হোক, কোনোক্রমে আমি নিজেকে উদ্ধার করি। কিন্তু আমাকে বলতে হয়, ‘এই মুহূর্তে আপনারা নিজেদের পরিবর্তন করুন এবং তা অন্তরের অন্তঃস্থল থেকে করতে হবে। অবশ্যই আপনারা জানেন যে, ভবিষ্যতে নরখাদকের জন্য এই দুনিয়ায় কোথাও কোনো জায়গা থাকবে না।’

॥ এগারো ॥
সূর্র্যের তেজদীপ্ত আলো নেই, বন্ধ ঘরের দরজা খোলা হয় না, প্রতিদিন দুবেলা আহার …।
আমি চপস্টিক তুলে নিই এবং তারপর মনে মনে বড় ভাইয়ের কথা ভাবতে থাকি। এখন আমি জানি, আমার ছোট বোন কীভাবে মারা গেছে। ছোট বোনের মৃত্যুর জন্য দায়ী একমাত্র আমার বড় ভাই। মৃত্যুর সময় ছোট বোনের বয়স ছিল মাত্র পাঁচ বছর। এখনো আমার স্পষ্ট মনে আছে, মৃত্যুর সময় ওকে ভীষণ মায়াময়ী কিন্তু করুণ দেখাচ্ছিল। ছোট বোনের মৃত্যুর সময় মা প্রচণ্ড কেঁদেছিলেন। বড় ভাই তাকে কাঁদতে বারবার বারণ করেছিল। হয়তো সে নিজেই ছোটবোনকে খেয়েছে। তাই মায়ের কান্না আমার ভাইয়ের কাছে ভালো লাগেনি। হয়তো তখন বড় ভাই ভীষণ অনুতপ্ত ছিল। তবে আদৌ যদি ওর কোনো লজ্জা-শরম থেকে থাকে …।
আমার মৃত ছোট বোনকে বড় ভাই সাবাড় করেছে। কিন্তু আমি জানি না, মা কি আদৌ ব্যাপারটা জানে, নাকি কিছুই জানে না।

আমার মনে হয়, ব্যাপারটা মা জানে। হয়তো অশোভন দেখাবে ভেবে মা কান্নার সময় কথাটা সরাসরি বলেনি। মনে পড়ে, আমার বয়স যখন চার কিংবা পাঁচ বছর, তখন আমি একদিন শীতের মধ্যে বারান্দায় বসেছিলাম। সেদিন আমার বড় ভাই আমাকে বলেছিল যে যখন কারোর মা-বাবা অসুস্থ থাকে, তখন ছেলের উচিত তার শরীরের এক টুকরো মাংস কেটে সেদ্ধ করে অসুস্থ মা-বাবাকে খাওয়ানো। মা-বাবার ভালো এবং যোগ্য ছেলে হতে চাইলে অবশ্যই এ কাজ করা উচিত। সেদিন বড় ভাইয়ের কথায় মা কোনো উচ্চবাচ্য করেনি। এক টুকরো মাংস খেতে পারলে পুরো দেহটাই খাওয়া যাবে। ছোট বোনের মৃত্যুর কথা মনে হলেই আমার হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হতে থাকে। ছোট বোনের মৃত্যুটা এখনো আমার কাছে সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয়।

॥ বারো ॥
আমি আর এসব ভাবতে পারছি না।
শুধু উপলব্ধি করতে পারছি যে, এত বছর আমি এমন এক জায়গায় বসবাস করেছি, যেখানে বিগত চার হাজার বছর ধরে মানুষ মানুষের মাংস খায়। যখন আমার ছোট বোন মারা যায়, সেই সময় বড় ভাই সংসারের সব দায়ভার গ্রহণ করেছিল। আমরা যাতে অজান্তে খাই, তাই সে হয়তো আমাদের খাবারের সঙ্গে মৃত বোনের মাংস মিশিয়ে দিয়েছিল।
এটা সম্ভব যে আমিও হয়তো অনিচ্ছাকৃতভাবে মৃত বোনের কয়েক টুকরো মাংস খেয়েছি এবং এখন আমার পালা।
আমার মতো একজন মানুষ, যার চার হাজার বছরের পুরনো মানুষ খাওয়ার ইতিহাস আছে, যদিও আমি আগে জানতাম না এখন কীভাবে সত্যিকারের মানুষদের মোকাবেলা করব?

॥ তেরো ॥
হয়তো এখনো অনেক শিশু বেঁচে আছে, যাদের নরখাদকেরা এখনো ভক্ষণ করতে পারেনি।
নরখাদকের হাত থেকে শিশুদের বাঁচাও…।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

৮ thoughts on “‘এক পাগলের রোজনামচা’ : লু স্যুন-এর গল্প

  1. বিশ্বাস করেন, প্রথমে পড়ব কি
    বিশ্বাস করেন, প্রথমে পড়ব কি পড়বোনা দ্বিধাদ্বন্ধে ছিলাম। পড়া শুরু করার পর কখন শেষ হয়ে গেল টেরই পেলাম। অসাধারণ। বেশ আগে লু স্যুনের আরো দু’টি ছোট গল্প পড়ে চমকে উঠেছিলাম। তিনি অসাধারণ এক লেখক।

  2. এক সময় চীনা গল্পের বাংলা
    এক সময় চীনা গল্পের বাংলা অনুবাদ পাওয়া যেত। ফ্রি পেতাম বেশির ভাগ সময়। এখন খুঁজলেও পাওয়া যায় না। লু স্যুন বিশ্ব সাহিত্যে এক বাস্তববাদী ও বিপ্লবী লেখক। বিশেষভাবে তার ছোট গল্প বেশ কয়েকটা আগে পড়েছিলাম। ধন্যবাদ এটি শেয়ার করার জন্য।

  3. পড়া’তে ধৈর্য কম তবে কষ্ট করে
    পড়া’তে ধৈর্য কম তবে কষ্ট করে পড়ে ঠকতে হয়নি।
    আপনাকে অনেক অনেক ধন্যবাদ।
    আশা করি এ রকম আরো বেশ কিছু লেখা পাবো।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

+ 68 = 69