মুসলমানদের ইহুদিত্ব ও সাবেইনদের বিলুপ্তি

এক
নিশ্চিতভাবে জেনে রেখো,যারা শেষ নবীর প্রতি ঈমান আনে কিংবা যারা ইহুদি, খ্রিষ্টান অথবা সাবেইন, তাদের মধ্য থেকে যে ব্যক্তিই আল্লাহ‌ ও শেষ দিনের প্রতি বিশ্বাস রাখে এবং সৎকাজ করে তার প্রতিদান রয়েছে তাদের রবের কাছে এবং তাদের জন্য কোন ভয় ও মর্মবেদনার অবকাশ নেই। (সুরা বাকারাহ, আয়াত ৬২)

ইহুদিরা নিজেদের আল্লাহর নির্বাচিত জাতি মনে করে। তাদের বিশ্বাস আল্লাহর রহমত শুধু তাদেরই প্রাপ্য, অন্য কারো নয়। কোন কোন তাফসির মতে সুরা বাকারাহর এই আয়াত ইহুদিদের এই ধরণের বিশ্বাসের বিপরীতেই নাজিল হয়েছিল। পাশাপাশি মুসলমানরা যাতে নিজেদেরকে আল্লাহর নির্বাচিত জাতি না মনে করে তার নির্দেশনাও বোধহয় ছিল। সৎ কাজের জন্যে শুধু মুসলমানই পুরস্কার পাবে, খ্রিষ্টান অথবা ইহুদি পাবেনা কোরআনের এই আয়াত তা বলেনা। এখানে ইহুদি, খ্রিষ্টানদেরকে তো চেনা যায়, মুসলমানরা তাদেরকে আহলে কিতাব হিসাবে চেনে। কিন্তু সাবেইন কারা? সেই প্রশ্নের উত্তর হাজার বছর ধরে কম খোঁজা হয় নাই। অনেকে অনেক মত দিয়েছেন। বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ধর্মের অনুসারীদের সাবেইন বলে চিহ্নিত করা হয়েছে। মধ্যযুগের বিভিন্ন বিশেষজ্ঞের লেখনি থেকে এইটুকু বুঝা যায় যে সাবেইন বলতে কোন একক ধর্মের অনুসারীদের কখনোই আলাদাভাবে চিহ্নিত করা যায় নাই, বরং মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন একত্ববাদী এমনকি আপাত পৌত্তলিক ধর্মের অনুসারীদেরকেও একত্রে সাবেইন বলে অভিহিত করা হতো। তাদের কেউ কেউ নস্টিক, কেউ কেউ হারমেসবাদী, মিথ্রায়িক এবং নানান মিশেল ধর্মের অনুসারী ছিলেন। উল্লেখ্যযে, ইসলামপূর্ব মধ্যপ্রাচ্যে ইহুদি ও খ্রিষ্টান ছাড়াও নানারকম ইব্রাহিমী, হেলেনিস্টিক ও পার্সি ধর্ম এবং এসবের বিভিন্ন মিশেল ধর্মের অনুসারীরা ছিলেন যাদের অধিকাংশই পরবর্তিতে বিলুপ্ত হয়ে গেছে। যারা টিকে আছে তারা এই একবিংশ শতকে বিলুপ্ত হচ্ছে।

দুই
ইসলামি খেলাফতের অধিনে প্রথম সাবেইন নাগরিক হিসাবে পরিচিত হয় খুব সম্ভবত ইরাকের মানদিয়ান ধর্ম সম্প্রদায়ের জনগণ। রাশিদুন খলিফাদের যুগে মুসলমানদের ইরাক বিজয় সম্পন্ন হয়। সেইসময় মানদিয়ানদের তৎকালিন নেতা আনুশ বিন দানকা মুসলিম কর্তৃপক্ষের সামনে হাজির হয়ে নিজেদেরকে সাবেইন বলে দাবি করেন। তিনি সাথে করে মানদিয়ানদের পবিত্র ধর্মগ্রন্থ ‘গিনজা রাব্বা’ নিয়া আসেন এবং দাবি করেন যে ইউহান্না তাদের নবী। ইউহান্না খ্রিষ্টান ধর্মে জন দি ব্যাপ্টিস্ট নামে পরিচিত, তার হাতেই ঈসার বাপ্তিস্ম ঘটেছিল। মানদিয়ানরা ইউহান্নাকে নবী মানলেও ঈসাকে মানতেন না। রাশিদুন খলিফাদের আমলে ইরাকের মানদিয়ানরা কোরানে উল্লেখিত সাবিয়ান হিসাবে ‘আহলে কিতাব’ পরিচয় ও ইসলামী রাষ্ট্রের নাগরিকের মর্যাদা লাভ করে।

তিন
নবম শতাব্দিতে আব্বাসিয় খেলাফতের স্বর্ণযুগে তুরস্কের হাররান অঞ্চলের তারকা উপাসক হিসাবে পরিচিত হারমেসবাদী ধর্মসম্প্রদায়ের জনগণ সাবেইন হিসাবে পরিচিত ছিল। এই ধর্ম বর্তমানে বিলুপ্ত। তবে আব্বাসিয় খেলাফতের স্বর্ণযুগে বাগদাদে এই ধর্মসম্প্রদায়ের জনগণ বিশেষ সম্মানের সাথে বসবাস করতো। মধ্যযুগের বিখ্যাত গনিতবিদ ও জ্যোতির্বিদ ‘থাবিত ইবনে কুররা’ এই ধর্ম সম্প্রদায়ের মানুষ ছিলেন। এই ধর্মে তারকাকে ফেরেশতা মনে করা হতো, তারকাকেন্দ্রীক ধর্ম হওয়ায় এই ধর্মের অনুসারীরা জ্যোতির্বিদ্যায় বিশেষ পারদর্শি ছিলেন। থাবিত ইবনে কুররা কম বয়সেই বহুভাষাবিদ হিসাবে বিশেষ পারদর্শি হয়ে ওঠেন। বিখ্যাত মুসলিম গনিতবিদ মুহাম্মদ বিন মুসা একবার হাররান পর্যটনে গিয়ে তরুন থাবিতএর সাথে পরিচিত হন এবং তাকে বাগদাদে পড়াশোনা করতে আমন্ত্রন জানান। বাগদাদ সেই সময়ে ছিল জ্ঞান বিজ্ঞান শিক্ষার জন্যে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম স্থান। বাগদাদে পড়াশোনা শেষ করে থাবিত হাররানে ফিরে গিয়েছিলেন, কিন্তু তার দার্শনিক চিন্তা ভাবনার কারনে তার নিজ ধর্মের কট্টর ধার্মিকরা তার বিরুদ্ধে ধর্মদ্রোহের অভিযোগ আনে। সেইযুগে কট্টর ধার্মিকদের কাছে যারা ধর্মদ্রোহী হিসাবে পরিচিত তাদের জন্যে বাগদাদের চেয়ে উৎকৃষ্ট কোন স্থান ছিল না। তাই তিনি আবার বাগদাদে ফিরে আসেন। বাগদাদে অবশ্য তিনি নিজ ধর্মসম্প্রদায়ের নেতৃত্বের ভুমিকায় ছিলেন। বহুভাষাবিদ হওয়ায় থাবিত সিরিয়ান এবং গ্রিক ভাষা থেকে বহু বিজ্ঞানের বই আরবি ভাষায় অনুবাদ করেন। ইউরোপিয় বিজ্ঞানী কোপার্নিকাসের মতে থাবিত সৌর বছরের দিন গননা করেন ৩৬৫ দিন ৬ ঘন্টা ৯ মিনিট ১২ সেকন্ড, আধুনিক হিসাবের সাথে যার পার্থক্য মাত্র ২ সেকেন্ডের। পিথাগোরাসের উপপাদ্য প্রমানের যে কয়টি পদ্ধতি আছে তার মধ্যে একটি থাবিতের করা। গনিতে ‘থাবিত নাম্বার’ এবং চাঁদের ‘থাবিত ক্রেটার’ তার নাম অনুসারে করা হয়েছে। থাবিত ইবনে কুররা বাগদাদে আব্বাসিয় খলিফা আল মুতাদিদের পৃষ্ঠপোষকতা লাভ করেন। তিনি খলিফার দরবারের অন্যতম রত্ন এবং খলিফার বিশেষ বন্ধুতে পরিণত হন।

চার
ইরাকের ইয়াজিদিরাও একত্ববাদী। তাদের ধর্মবিশ্বাসকে সহজেই ‘সাবেইন’ ক্যাটাগোরিতে ফেলা যায়। আইসিসের খেলাফতের ভেতরে কোনরকমে বেঁচে থাকার জন্যে এই সুযোগ তারা নিতে পারবে কিনা ভাবলাম। এই কথা ভাবতে ভাবতে ইরাকের মানদিয়ানরা যারা সেই রাশিদুন খলিফাদের যুগ থেকে সাবেইন পরিচিতি পেয়ে আহলে কিতাবের মর্যাদা লাভ করেছিল তাদের খবর নিতে গেলাম। জানতে পারলাম ২০০৩ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইরাক হামলা করার পর থেকে ইসলামী জঙ্গীদের হাতে মরতে মরতে বর্তমানে ইরাকে তাদের নব্বই শতাংস বিলুপ্ত হয়ে গেছে। আল্লাহ কেয়ামত দিবসে তাদেরকে নির্ভয় থাকতে বলেছেন, কিন্তু দুনিয়ায় তাদেরকে আইসিসের হাত থেকে কেউ রক্ষা করতে আগায়া আসেনাই।তারপরি চিন্তা করলাম, আমি কতো বোকা। যেই ইসলামিক খেলাফতের অধিনে সুস্পষ্ট আহলে কিতাব খ্রিষ্টান ধর্মাবলম্বীদেরই জায়গা হয় না, সেইখানে অস্পষ্ট সাবেইনদের জায়গা হবে কিভাবে?

ভাবছি, দিনে দিনে মুসলমানরা কিভাবে ইহুদি হইয়া উঠলো। আমেরিকানরা কিভাবে আল্লাহর নির্বাচিত জাতি এবং সাবেইনরা বিলুপ্ত হইয়া গেলো।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

১১ thoughts on “মুসলমানদের ইহুদিত্ব ও সাবেইনদের বিলুপ্তি

  1. ইরাকের জন্য সাদ্দামের কোন
    ইরাকের জন্য সাদ্দামের কোন বিকল্প নেই,কোনদিন আসবেও না ।সাদ্দাম অনেক দোষ ত্রুটি ছিল কিন্তু তার সময়েই সংখ্যালঘু খ্রিষ্টান ও ইয়াজেদীরা সবচেয়ে নিরাপদে ছিল ।শুধুমাত্র ধর্মবিশ্বাসের জন্য সাদ্দাম কাউকে হত্যা করেছে একথা আমেরিকানরাও বলবে না ।ইরাক ত্রিখন্ডিত হওয়া সময়ের ব্যাপার মাত্র ।

  2. হুম, আচ্ছা আপ্নি কি ফেসবুকে
    হুম, আচ্ছা আপ্নি কি ফেসবুকে রক্তস্নাত দ্রোহি পুরুষ। চলুক আপ্নার লিখা।
    আর কি কি বই হতে তথ্য নিচ্ছেন, রেফারেন্স দিলে বিস্তারিত পডে দেখতাম।

    1. জ্বি না, আমি চিরকাল পারভেজ
      জ্বি না, আমি চিরকাল পারভেজ আলম নামেই লিখেছি। কেনার মতো কোন বইয়ের রেফারেন্স দিতে পারছিনা, আমার জানামতে বাংলা কোন বই নাই। মানদিয়ানদের ইতিহাস সম্বন্ধে বিস্তারিত পাবেন জেকবসেন বাকলের ‘The Mandaeans : Ancient Texts and Modern People’ বইটিতে। বইটার পিডিএফ ভার্সন অনলাইনে পাবেন। বর্তমান অবস্থা জানতে নিচের অনলাইন লিংক পড়ে দেখতে পারেন
      http://www.ipsnews.net/2012/01/the-ancient-wither-in-new-iraq/

      আর থাবিথ ইবনে কুররা সম্পর্কে জানতে গুগল করলেই এনাফ, তার বহু বায়োগ্রাফি অনলাইনে আছে।

  3. ১। আশ্চর্য্য মুসলিমরা নিজেদের
    ১। আশ্চর্য্য মুসলিমরা নিজেদের কেন আল্লাহ এর মনোনীত জাতি মনে করবে না ? ইসলাম আল্লাহ এর কাছ একমাত্র গ্রহণযোগ্য দ্বিন আর যারা ইসলামের অনুসারি তারাই মুসলিম । সুতরাং মুসলিম রা যে আল্লাহ এর মনোনিত এই ব্যাপারে সংশয়টা কোথায় । কোরানের কোন আয়াতের ব্যাপারে ‘ বোধহয় ‘ শব্দটা পরিহার করে সঠিক যুক্তি দ্বারা উপস্থাপন ই কাম্য ।
    ২। ইহুদি , খ্রিস্টানরা তাদের ভালো কাজের পুরস্কার অবশ্যই পাবে । কিন্তু সেটা ইহজগতে । পরকালে তাদের জন্য শুধুই আযাব রয়েছে । আখিরাতের পুরস্কারে তাদের কোন অংশই নাই। পরকালের পুরস্কারের অংগিকার শুধুমাত্র ইমানদারের জন্য ( মোটা/ সাদা কথায় মুসলমানের জন্য )। এই সাধারন মৌলিক (বেসিক ) গ্যান টুকু প্রত্যেক মুসলমানের ই থাকবে /আছে বলে আশা করেছিলাম । এখন দেখছি কেউ কেউ তার নিজের বিভ্রান্তি অন্যের মাঝে ছড়ানো চেস্টা করছেন !!
    পারভেজ ভাই কে অনুরোধ আরো পড়াশোনা করুন , আলেমদের সহবতে সময় কাটান । আল্লাহ আপনার বিভ্রান্তি দুর করুন । আমিন

  4. বরাবরের মতই ভাল লাগলো। আকাশ
    বরাবরের মতই ভাল লাগলো। আকাশ এর সাথে সহমত। কোন বই থেকে রেফারেন্স নিচ্ছেন লিখে দিলে ভাল হত। এই বিষয়ে জানার আগ্রহ আছে। তাহলে বইগুলো কিনে পড়ে দেখতে পারতাম।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

+ 6 = 7