নিজাম, খৈয়াম ও এসাসিনের মৃত্যু

১১ শতকের শেষভাগে মুসলিম দুনিয়ায় দুইটি প্রতিদ্বন্দী খেলাফত ছিল। স্পেনের উমাইয়া খেলাফত এই শতকের শুরুর ভাগেই পতনের শিকার হয়। টিকে থাকা দুই খেলাফতের একটি সুন্নি আব্বাসিয় খেলাফত, যা গোটা মধ্যপ্রাচ্য, পারস্য ও মধ্য এশিয়ার মুসলিম অঞ্চলগুলোতে শাসন করতো। অপর খেলফতটি ছিল মিশর ও উত্তর আফ্রিকার শিয়া ফাতেমিয় খেলাফত। মহানবীর কন্যা ফাতেমার বংশধর হওয়াতে এই নাম। এই সময়টাকে মধ্যপ্রাচ্যে ইসলামী স্বর্ণযুগের শেষ সময় বলা যায়। স্পেনে অবশ্য এই স্বর্ণযুগ আরো এক শতাব্দির বেশি সময় স্থায়ী হয়েছিল।

৮ শতকে আব্বাসিয় খেলাফতের উত্থান মুসলিম দুনিয়ায় অনারব মুসলমানদের সামাজিক ও রাজনৈতিক উত্থানে ভুমিকা রেখেছিল। উমাইয়া খেলাফতের আমলে তুর্কি জনগোষ্ঠি ইসলাম ধর্ম গ্রহণ শুরু করলেও মাওয়ালি হিসাবে তারা দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক গণ্য ছিল। হানাফি সুন্নি মজহাবের প্রতিষ্ঠাতা ইমাম আবু হানিফা “একজন সদ্য ইসলাম গ্রহণকারী তুর্কি এবং হিজাজের একজন আরব মুসলমান এক সমান” এই কথা বলায় উমাইয়াদের কোপানলে পরে জেল খেটেছিলেন। কিন্তু আব্বাসিয়দের আমলে তুর্কি মুসলমানরাই প্রধান রাজনৈতিক ও সামরিক শক্তিতে পরিণত হয়। ১১ শতক নাগাদ দেখা গেলো যে আব্বাসিয় খলিফারা কেবল নামে মাত্রই মুসলিম জাহানের অধিপতি, রাজনৈতিক ক্ষমতা তখন পুরোপুরি সাচুক (Seljuk) তুর্কি সুলতানদের হাতে। বলা যায় আব্বাসিয় খলিফাদের হয়ে সাচুক তুর্কিরাই সেসময় খেলাফতের দেকভাল করেন।

১১ শতকের শেষ নাগাদ আব্বাসিয় ভূখন্ডে সবচেয়ে ক্ষমতাধর ব্যক্তি ছিলেন সাচুক সুলতান মালিক শাহ (১০৫৫-১০৯২) এবং তার উজির নিজাম উল মুলক (১০১৮-১০৯২), যার আসল নাম ছিল আবু আলি আহসান। ইরানের ইসফাহান ছিল তাদের রাজধানি। আবু আলি আহসান ইরানের ইতিহাসে একজন কিংবদন্তি। তিনি শক্ত হাতে সাচুক সুলতান আল্প আর্সলান এবং তার পুত্র মালিক শাহএর রাজত্ব প্রতিষ্ঠিত ও রক্ষা করেছিলেন বলেই তার টাইটেল হয়েছিল নিজাম উল মুলক, এই টাইটেলই পরে তার নাম হয়ে গেছে। মালিক শাহ এবং নিজাম উল মুলক দুইজনেই শিক্ষা দিক্ষা ও জ্ঞান বিজ্ঞানের পৃষ্ঠপোষক হিসাবে খ্যাতিমান ছিলেন। জ্ঞানীদের পৃষ্ঠপোষক হওয়ার কারনে ঐতিহাসিকরা নিজাম উল মুলককে বাগদাদের প্রমুখ (বারমাইক) উজিরদের সাথে তুলনা করেন। মালিক শাহ এবং নিজাম উল মুলকের সরাসরি পৃষ্ঠপোষকতা পেয়েছেন এমন দুইজন বিখ্যাত ব্যক্তি হচ্ছেন দার্শনিক, বিজ্ঞানী ও কবি ওমর খৈয়াম এবং ধর্মতাত্ত্বিক, আইনবিদ ও সুফি আল গাজ্জালি। ফাতেমিয়দের ইসমালিয়া শিয়া মতবাদের অনুসারীরা ইরানেও ছিল, মূলত তাদের প্রভাব রুখতেই নিজাম উল মুলক বহু সুন্নি শাফি আইনশাস্ত্রের মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেন। নিজাম উল মুলকের হাত ধরেই এমন একটি মাদ্রাসায় শিক্ষকতার জীবন শুরু করেন গাজ্জালি। অন্যদিকে মালিক শাহের নির্দেশ এবং নিজাম উল মুলকের পৃষ্ঠপোষকতায় ওমর খৈয়াম ইসফাহানে গড়ে তোলেন তার সময়ের অন্যতম শ্রেষ্ঠ জ্যোতির্বিদ্যার মানমন্দির। ওমর খৈয়াম সহ আরো আটজন সমসমায়িক বিজ্ঞানীদের একটি দল এই মানমন্দিরে গবেষনা করতেন। এই মানমন্দিরে বসেই ওমর খৈয়াম ১০৭৯ সালে জালালি ক্যালেন্ডার হিসাবে খ্যাত সৌর ক্যালেন্ডার প্রনয়ন করেন যা সেই সময়কার সবচেয়ে সঠিক সৌর ক্যালেন্ডার ছিল। আধুনিক ইরানে এই জালালি ক্যালেন্ডারের ইষৎ সংশোধিত রূপ ব্যবহৃত হয়। এই মানমন্দিরেই তিনি তৈরি করেন তৎকালিন সময়ে জানা মহাবিশ্বের একটি মানচিত্র, এই মানচিত্র এখন হাড়িয়ে গেছে। এই মানমন্দিরে গবেষনার ফলাফল থেকেই তিনি জিওসেন্ট্রিক সৌর মডেলের সমালোচনা করে হেলিওসেন্ট্রিক মতবাদের পথ প্রশস্ত করেন।

এই সময়ের আরেকজন বিখ্যাত ব্যক্তি ছিলেন হাসান ইবনে সাব্বা। খৈয়াম এবং গাজ্জালির মতো তার জন্মও ইরানে। কুরান, হাদিস, দর্শন ও বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় তারও ছিল অগাথ জ্ঞান। কিন্তু কালক্রমে তিনি একজন কট্টর ইসমাইলি শিয়ায় পরিণত হন এবং আব্বাসিয় ও সাচুক সুলতানদের বিরুদ্ধচারণ করাই তার প্রধান রাজনৈতিক কর্তব্য হয়ে ওঠে। তার হাতেই গড়ে ওঠে পৃথিবীর প্রথম ফেদাইন সংগঠন যারা ইতিহাসে হাসিসিন এবং ইংলিশে এসাসিন বলে পরবর্তি সময়ে পরিচিত হয়ে ওঠে। হাসান ইবনে সাব্বা মিশর সফর করে এসে সাচুক সুলতানদের বিরুদ্ধে তার রাজনৈতিক মিশনে ঝাপিয়ে পরেন। তিনি ইরানের পার্বত্য অঞ্চলের দূর্গ আলামুত দখল করে সেখানেই জীবনের বড় সময় পাড় করে দেন। জানা যায়, তিনি দূর্গ থেকে বের হতেন না, পড়ালেখা এবং ইবাদত করেই আলামুত দূর্গে বাকি জীবন পাড় করে দিয়েছেন। কিন্তু আলামুতে বসেই তিনি তার অনুসারীদের মাধ্যমে একের পর এক রাজনৈতিক হত্যাকান্ড পরিচালনা করে। মার্কো পোলো এবং ফাতেমিয় তথ্যসূত্র অবলম্বন করে ইউরোপিয় ব্যাখ্যা হলো যে তার অনুসারীরা হাসিস খেয়ে এইসব হত্যাকান্ড চালাতো এবং একারনেই তাদের নাম হয়েছিল হাসিসিন অর্থাৎ হাসিস খোড়। বর্তমানে আরেকটি মতামত হচ্ছে, হাসান ইবনে সাব্বা তার অনুসারিদেরকে আসাসিয়ুন নামে ডাকতেন, যার অর্থ বিশ্বাসের ভিত্তি। এই মত অনুসারে হাসিসিন না, আসাসিয়ুন থেকে এসাসিন শব্দের আবির্ভাব। হাসান ইবনে সাব্বার নির্দেশে তার এসাসিনরা যে কয়টি রাজনৈতিক হত্যাকান্ড সংগঠিত করেছিল তার মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত এবং কুখ্যাত হলো নিজাম উল মুলকের হত্যাকান্ড। ইসফাহান থেকে বাগদাদ যাওয়ার পথে ১০ রমজান (১৪ অক্টোবর, ১০৯২) সালে নিজাম উল মুলক এসাসিনদের হাতে নিহত হন। এই হত্যাকান্ডের ফলাফল ছিল যুগান্তকারী।

সুলতান মালিক শাহের শত্রুর অভাব ছিল না। নিজাম উল মুলকের মৃত্যুতে পুরো সাম্রাজ্যের রাজনৈতিক ভিত্তি দুর্বল হয়ে পরে। এক বছর পাড় হওয়ার আগেই খোদ সুলতান অজানা শত্রুর হাতে নিহত হন। প্রায় সাথে সাথেই আব্বাসিয় খেলাফতের অন্তর্গত দুনিয়ার রাজনৈতিক ও সামাজিক স্থিতিশিলতা পুরোপুরি নষ্ট হয়ে যায়। হতাশ আল গাজ্জালি শিক্ষকতা ছেড়ে দিয়ে মুসাফির হয়ে ঘুড়ে বেড়াতে থাকেন এবং সুফিবাদের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পরেন। পরে আবার মহা উৎসাহে ইবনে সিনা, আল ফারাবির মতো দার্শনিকদের ইসলাম বিরোধী আখ্যা দিয়ে প্রচার প্রচারণা চালতে থাকেন। এর ফলাফল ছিল সুদূর প্রসারি। ওমর খৈয়াম নিজ শহর নিশাপুরে ফিরে যান। কিন্তু নিশাপুরে তখন সামাজিক অস্থিরতার প্রভাবে দার্শনিকদের বিরুদ্ধে শুরু হয় ইনকুইজেশন। খৈয়ামের বিরুদ্ধে ধর্মদ্রোহের অভিযোগ আগেও ছিল, কিন্তু সরকারী পৃষ্ঠপোষকতা থাকায় তিনি নিরাপদ ছিলেন। বাধ্য হয়ে ইনকুইজেশন থেকে বাঁচতে তিনি হজ্জ করতে মক্কা চলে যান। তার সমসাময়িক লেখক আল কিফতির মতে, ইবনে সিনা মোটেই ধর্ম পালন করতে হজ্জ করেন নাই, ধর্মীয় মৌলবাদীদের হাত থেকে বাঁচার জন্যে করেছেন। ধর্মীয় উন্মাদনা শান্ত হওয়ার পর তিনি আবার নিশাপুর ফেরত আসেন। ততোদিনে মুসলিম দুনিয়ায় বড় ধরণের পরিবর্তন হয়ে গেছে। গভির বেদনা নিয়ে ওমর খৈয়াম তার বাকি জীবন নিশাপুরেই পাড় করে দেন। শেষ জীবন পর্যন্ত তিনি তার ইবনে সিনার দর্শন শিক্ষা দিয়ে গেছেন। তারপর মৃত্যুর মধ্য দিয়ে মুসলিম দুনিয়ার ঐতিহাসিক অন্ধকারে হাড়িয়ে গিয়েছিলেন বহু শতাব্দির জন্যে।

নিজাম উল মুলক এবং মালিক শাহর মৃত্যুর পর যে রাজনৈতিক অস্থিতিশিলতার সৃষ্টি হয় তার প্রভাব ছিল সূদুররপ্রসারি। ঠিক এই সময়েই প্রথম ক্রুসেডারদের আগমন ঘটে। আব্বাসিয় ভুখন্ডে কোন কেন্দ্রিয় রাজনৈতিক শক্তি না থাকার সুবিধা ক্রুসেডাররা শতভাগ পেয়েছিল। ক্রুসেডারদের আগমনে বহু মুসলমান বাস্তুচুত হয়ে বাগদাদসহ বর্তমান ইরাক ও ইরানের বিভিন্ন অঞ্চলে সরণার্থি হিসাবে আবির্ভুত হয়। রাজনৈতিকভাবে দূর্বল জনগোষ্ঠির মধ্যে শিক্ষা দিক্ষার প্রসারের চেয়ে জীবন বিমুখ সুফিবাদ অথবা কট্টর মৌলবাদী ইসলাম জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। হাসান ইবনে সাব্বার অনুসারীরাও খুব বেশিদিন তাদের রাজনৈতিক শক্তি টিকিয়ে রাখতে পারে নাই। পশ্চিম থেকে ক্রুসেডারদের মতোই পূর্ব থেকে আবির্ভাব হয়ে মোঙ্গলদের। মোঙ্গলরা আলামুত দুর্গ ধ্বংস করে এসাসিনদের রাজনৈতিক শক্তি পুরোপুরি ধ্বংস করে দেয়। এরপর থেকে এসাসিনরা কেবল ভাড়া খাটা খুনি হিসাবেই টিকে ছিল, তারপর বিলুপ্ত হয়ে গেছে।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

৪ thoughts on “নিজাম, খৈয়াম ও এসাসিনের মৃত্যু

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

22 − 19 =