শুটকি

“শঙ্খচিলের ডানা”র মেসের ঘটনা পড়ে, গল্পটা পোস্ট করার লোভ সামলাতে পারলাম না।

বুয়া সকালে আজকের রান্না করে দিয়ে গিয়েছিল। বিকেলে আসার কথা না থাকলেও তাকে ডেকে আনা হয়েছে। অনু বাড়ী থেকে ফিরেছে কিছুক্ষণ আগে। আসার সময় কয়েক জাতের মাছের শুটকি নিয়ে এসেছে। রাজিব মিনতি করে বলেছে যেভাবেই হোক আজ রাতে অন্তত রূপচাঁদা শুটকিটা খেতেই হবে। অনুর সাথে রাজিবেরও চট্টগ্রাম যাওয়ার কথা ছিল কিন্তু শেষ পর্যন্ত সে যেতে পারেনি। বড়লোক বাবা মা’র একমাত্র আদরের সন্তানদের নানান ঝামেলা। এখানে যেতে পারবে ওখানে যেতে পারবে না, এটা খেতে পারবে ওটা খেতে পারবে না- একশ একটা নিষেধের বেড়া। রাজিবের টিকেটে শেষ মুহুর্তে শান্তুনু গিয়েছিল।

নীরু এখন পার্কের বেঞ্চিতে আনমনা হয়ে বসে, তার আজ খুবই মন খারাপ। দুপুরে শাপলা চত্বরে এক ষন্ডা মার্কা লোকের সাথে তার বুলবুলিকে একই রিকশায় দেখতে পেয়েছে সে। সাথে সাথে ফোন করে দেখেছে, বুলা’র মোবাইল বন্ধ। সেই থেকে মনটা খারাপ। আজ দুপুরে খাওয়াও হয়নি। আবার খারাপ লাগছে এই ভেবে যে না খেয়েও মিলের টাকাটা দিতে হবে। পিয়াল হারামজাদা এই ব্যাপারে খুবই কষা। পিয়াল ছাড়া বাকী তিনজনই শুচিবায়গ্রস্থ, বাইরে কেউই খায় না। যে সপ্তাহে পিয়ালের উপর বাজারের দায়িত্ব পড়ে সেই সপ্তাহে বাড়িঅলার পানি খরচা তেমন হয় না। রুচি খুব একটা পাওয়া যায়না বলে খাওয়া দাওয়া খুবই কম হয়। যার কারণে বড় কাজে বাথরুমে যাওয়ার প্রয়োজন খুব একটা পড়েনা।

বেছে বেছে মাটির নীচের হাতে গোনা কয়েকটি খাদ্যই পিয়ালের বেশী পছন্দ। এই যেমন আলু, কচু, গাজর, শালগম। তার মতে মাটির নীচের খাদ্যে খাদ্যগুণ বেশী থাকে। সুযোগ পেয়ে শান্তুনু একবার বলেছিল বাইং মাছ আনতে। ওগুলো নাকি মাটির নীচে কাদার মধ্যে থাকে, সুতরাং মাটির নীচের খাদ্য। পিয়াল বাইং মাছের আবাসস্থল সম্পর্কে জ্ঞাত হলেও টাকা বাঁচাতে গিয়ে সে শান্তুনুর মনোবাসনা পূরণ করেনি আজ পর্যন্ত।

মেসে অবশ্য তারা চারজনই থাকে। আর রাজিব থাকে বাবা মা’র কোলে। রাজিবের বাসা এখান থেকে ছ’সাত মাইল দূরে হলেও সে প্রায়ই আড্ডা দিতে এবং মেসের অমৃত খেতে এখানে চলে আসে। তবে বিনা মূল্যে নয়। রাজিব ওদের সাথে খাওয়াতে পিয়াল ভীষন খুশী। কারণ সারা মাসে রাজিব হাতে গোনা আট দশ মিল খেলেও গোটা মাসের মিলের টাকাটাই সে দিয়ে দেয়। এবং এখানে বলাটা অত্যন্ত বাহুল্য হবে যে, রাজিবের বাড়তি টাকাটার সাথে পিয়াল নিজের টাকাটা অনায়াসে সমন্বয় করিয়ে নেয়। বাকীরা ব্যাপারটা জানলেও তাকে তেমন ঘাঁটায় না। কষা এবং পিছল মানুষদের অনেক সুবিধা, অন্যেরা ঘাঁটাতে কম চায়। রাজিবকে ফোন করা হয়েছে। সে সময় মত চলে আসবে। শুটকির তরকারি অবহেলা করার পাত্র সে নয়।

এই বিকেলে কিছুতেই গোসল করতে ইচ্ছে করছিল না অনু’র। কিন্তু দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে সারা শরীর চিট চিট করছে। অনু গোসল সেরে বের হতেই শান্তুনু ঢুকে পড়ল বাথরুমে। পিয়াল হায় হায় করে উঠল, ‘দুস্ত একটু দয়া কর, আমার বড়টা পাইছে।’ শান্তুনু বিরক্তি নিয়ে বলল, ‘কষা নাকি?’ পিয়াল ভাল ভাবেই জানে এখন এই কথাটা অন্যদিকে মোড় নেবে। হেনস্থা হওয়ার ভয়ে সে চুপ মেরে যায়।

অনু একটু দূরে দড়িতে গামছা শুকাতে দিতে দিতে বুয়াকে বলল, ‘বুয়া.. ধুইছো ভালভাবে?’ বুয়া রান্না ঘরে শুটকি কাটছিল, চেঁচিয়ে বলল, ‘কি.. পুটকি?’ বাথরুম থেকে বালতি জাতীয় কিছু পড়ে যাওয়ার শব্দ শোনা যায় এবং সেই সাথে শান্তুনুর অট্টহাসি। পিয়াল সম্ভবত লজ্জা পেয়েছে সে নাক ফুলিয়ে হাসি চেপে অন্য রুমে চলে গেল। ভাগ্যিস এই সময়ে কলিংবেল বেজে ওঠে। অনু চট করে ফিরে দরজা খোলার জন্য রওনা দেয়।

নীরু ফিরেছে। তাকে খুবই উৎফুল্ল দেখাচ্ছে। কিছুক্ষণ আগে বুলাকে ফোনে পেয়েছিল সে। বুলা নাকি আজ শাপলা চত্বরের আশেপাশে যায়ই নি। নীরুটা কি বোকা, সবই বিশ্বাস করে।

টিভিতে আজ প্রমীলা ক্রিকেটের ফাইনাল। শ্রীলংকা বনাম পাকিস্তান। পিয়াল চোখ বড় বড় করে মন দিয়ে খেলা দেখছে। নাকি ব্যাটিং দেখছে? পাকিস্তানের ক্যাপ্টেন ব্যাটিং করছেন। তাঁর চুলগুলো ছেলেদের মত ছোট ছোট, তবে শুধু চুলগুলোই।

প্রমীলা ক্রিকেট নিয়ে পিয়ালের মনে অনেক প্রশ্ন। কারো কাছ থেকেই সে আজ পর্যন্ত
সেসব প্রশ্নের সদুত্তর পায়নি। তার সবচেয়ে বেশী কৌতুহল মেয়েরা ছেলেদের মত প্যাড, গ্লাভস্, হ্যালমেট পড়লেও বিশেষ গার্ডটা কোথায় পড়ে? ক্যাপ্টেন পঞ্চাশ রান করার পর হ্যালমেট খুলে দু’হাত উঁচিয়ে দর্শক আর টিমমেটদের করতালির জবাব দিচ্ছেন। ক্যামেরাটা সাঁই করে ক্যাপটেনকে ক্লোজ শটে নিয়ে এল। পিয়ালের কৌতুহল মধ্যগামী হল। ঠিক তখনই বিদ্যুৎটা বেরসিকের মত চলে গেল।

পিয়াল একটি দীর্ঘশ্বাস ফেলে সিগারেট ধরায়। ততক্ষণে অনু গান শুনতে শুনতে ফ্লোরে আর নীরু স্বপ্ন দেখতে দেখতে সোফায় ঘুম। শান্তুনু বিছানায় আধ শোয়া হয়ে মোবাইলের এফ এমে কি যেন শুনছে। পিয়াল বলল, ‘শন্তু চট্টগেরামে থোরা কেমন মজা করলিরে?’ চোখ বন্ধ রেখেই শান্তুনু বলল, ‘হ্যাঁ ভাল, শোন.. রাজিব তো মরিচ বেশী খায়, নতুন বুয়া বুঝবে না.. তুই একটু বলে আয় ঝাল যাতে বেশী দেয়।’ রান্না ঘরে গিয়ে পিয়ালের কৌতুহলী চোখ দু’টো কিঞ্চিত বিস্ফারিত হল। বুয়া দরজার সামনা সামনি বসে পেঁয়াজ কুটছে, কিছুটা বেপর্দা। পিয়াল ‘ভু ভু’ করতে করতে বুয়া তার দিকে তাকিয়ে একটি হাসি দিল। বেমক্কা হাসিতে সে থতমত খেয়ে বলল, ‘ভুয়া থরকারীতে জাল একটু বেশী দিও।’ সামনের রুমে রাজিবের উচ্ছ্বাস শোনা যায়। পিয়াল কিছুটা অপূর্ণতা নিয়ে ফিরে আসে।

রাজিব অনু’র পিঠে হালকা চাটি দিয়ে বলে, ‘ওই শালা ঘুমাস্ ক্যান.. ওঠ্।’ শান্তুনু বলল, ‘ওর মাথা ধরেছে.. বোস্।’ রাজিব না বসে বলল, ‘শুটকি কি দিয়ে খাব রে?’ শান্তুনু পিয়ালের দিকে তাকিয়ে দুষ্টু হেসে রাজিবকে বলল, ‘জানিনা.. বুয়াকে জিজ্ঞেস কর।’ রাজিব চনমনে মনে রান্না ঘরের দিকে এগিয়ে গেল। বিদ্যূৎ এসেছে, পিয়াল নিশব্দে হেসে টিভিটা অন করে। হাসির শব্দ লুকাতে গিয়ে তার সমস্ত শরীর কাঁপছে।

রাজিবকে দেখে বুয়া সালাম দিল। রাজিব জিজ্ঞেস করল, ‘বুয়া কি রান্ধো?’ বুয়া হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে নাক চুলকাতে চুলকাতে বলল, ‘পুটকির মইধ্যে আলু দিয়া রান্ধি।’ রাজিবের চোখ দুটো সরু হয়ে গেল। তারপর একটু ধাতস্থ হয়ে ঢোক গিলে বলল,
-তা.. পুটকি ভাল ভাবে ধুইছো?
-জ্যা।
-দেখো আলু না আবার বেশী গলে যায়।

রাজিব ধীর পায়ে ড্রইং রুমে ফিরে আসে। তাকে দেখে শান্তুনু খিক্ খিক্ করে হেসে ওঠে। রাজিব একটু সহজ হওয়ার পর বলে, ‘আলু না দিয়ে বেগুন দিলে ভাল হত।’ টিভি’র শব্দে কিছুক্ষণ আগে অনুর ঘুম ভেঙ্গেছে। সে গম্ভীর গম্ভীল গলায় বলল, ‘গোল নাকি লম্বা?’ শান্তুনু আবার হাসে।

ফ্লোরে মাদুর পেতে খাবার আয়োজন হয়েছে। তরকারী দুটো। সকালের রান্না করা ছোট চিংড়ি দিয়ে মূলা। মূল আকর্ষন শুটকি দিয়ে আলু। পিয়াল মূলা দিয়ে খাচ্ছে, শুটকিতে তার রুচি নেই। রাজিব খুব আয়েশ করে ভাতের সাথে শুটকির তরকারী মিশিয়ে নিল। কিন্তু এক লোকমা মুখে দিতেই তার মুখটা বিকৃত হয়ে গেল। মরিচ ভালভাবে দেয়া হয়নি। শান্তুনু রাজিবের দিকে তাকিয়ে পিয়ালকে বলল, ‘কিরে পিয়াল.. ঝাল বেশী দিতে বলিস নি?’ পিয়াল বুয়াকে ডাক দিল, ‘ভুয়া, বলছিলাম না জাল বেশী দিতে?’ বুয়া রান্নাঘর থেকে চেঁচিয়ে বলল, ‘জ্বাল দিতে দিতে আর কত দুমু.. দেহেন না আলুগুলান কেমুন গলা গলছে।’ রাজিব একটু কাঁচা লবন মুখে দিয়ে বলল, ‘কেমন একটা বাজে গন্ধ, ভালভাবে ধোয়ও নাই।’ শান্তুনু ইঙ্গিতপূর্ণ ভাবে খিক্ খিক্ করে হেসে উঠল। নীরু কিছু বুঝতে না পেরে জিজ্ঞেস করল, ‘কি ধোয় নাই রে?’ অনু কিছু একটা বলতে গিয়ে ‘পুট’ পর্যন্ত বলে হাসির দমকে থেমে যায়। আর শুটকি প্রেমিক রাজিব ‘ওয়াক ওয়াক’ করতে করতে বাথরুমের দিকে এগিয়ে যায়।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

২১ thoughts on “শুটকি

  1. বিদ্যুৎ চলে যাওয়াটা সবসময়ই
    😀 😀 😀 😀 😀 😀 😀 😀 😀 😀 😀 😀 বিদ্যুৎ চলে যাওয়াটা সবসময়ই বেরসিক…তবে আপনার শুটকি’তে যে পরিমাণ রস, বিদ্যুৎ চলে গেলেও তার বেরসিকতা বহুক্ষণ টের পাবোনা।

  2. পিয়াল তাহলে চামার কোয়ালিটির?
    পিয়াল তাহলে চামার কোয়ালিটির? :হাসি: :হাসি: :হাসি: :হাসি: :হাসি:
    এত্তোসব ঝামেলা দেইখ্যাইতো আমি ফুনি (শুটকির আঞ্চলিক চট্টগ্রাম ভাষায়) হেইট করি।

  3. বন্ধু, প্রথমে প্রশংসা পর্ব =
    বন্ধু, প্রথমে প্রশংসা পর্ব = মজার গল্প। ছোট পরিসরে এতগুলো মজার বিষয় একসাথে আনা খুব কঠিন। এই কাজ তুই বেশ ভাল ভাবে করেছিস। এই গল্পের একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে উচ্চারনগত সমস্যা (বিশেষত পিয়াল এবং বুয়া)। কোলকাতার মুভি “ভূতের ভবিষ্যত” এ এই “উচ্চারনগত সমস্যা” নিয়ে দারুন খেলেছিলেন পরিচালক। এবার বাঁশ পর্ব = মাঝে মাঝে খেই হারিয়ে ফেলছিলাম। কোনটা কার ডায়ালগ মাঝে মাঝে বুঝতে অসুবিধা হচ্ছিল কারন সবগুলো চরিত্রই কিছু না কিছু করছে ও বলছে। বুয়া কেন “শু” এর জায়গায় বারবার “পু” বলছিল সেটা বোধগম্য হল না। এটা যদি দেশের কোন অঞ্চলের ভাষা হয়ে থাকে তাহলে বুয়াকে সেই অঞ্চলের সাথে রিলেট করে দেয়া যেত। যেমন রংপুরের লোকেরা “র” কে “অ” বলে, রঙ কে বলে অং। কিংবা বুয়ার কোন Speech impediment Problem থাকতে পারে। এই বিষয়টা একটু দু এক লাইন যোগ করে Justify করে দিতে পারলেই আর চরিত্র গুলোকে একটু ছাড়া ছাড়া করে দিতে পারলেই ১০০ তে ১০০। আপাতত ১০০ তে ৮০ দিলাম। তুই তো জানিস, আমাদের সময় সাহিত্যে ৩৩ মার্ক তোলা কত কঠিন ছিল। আর তোকে তো লেটার মার্ক দিয়ে দিলাম….. :বুখেআয়বাবুল:

  4. আসলেই একটা মজার গল্প ।। খোদার
    আসলেই একটা মজার গল্প ।। খোদার কসম দিয়ে বলতে পারবো যেই এই গল্প পরবে মুখের কোণায় হাসির ঝিলিক তার আস্তেই হবে………মাগার শুটকি ইজ অচাম খানা ফর অ্যাঁরা চাটগাইআরলাই( শুটকি অনেক ভাল খাবার আমরা চিটাগাং এর লোকের জন্য ) …………

  5. শুটকিতে আমার চরম অরুচি হলেও
    শুটকিতে আমার চরম অরুচি হলেও গল্পটা চমৎকার…
    শুটকি নামে অভক্তি নিয়ে শুরু করলেও লিখনিতে পোষায় দিয়েছেন!!
    :রকঅন: :রকঅন: :রকঅন: :রকঅন: :রকঅন: :রকঅন: :রকঅন: :রকঅন:

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

99 − 92 =