আমাদের সম্পর্কগুলো…

পৃথিবীর কঠিনত কাজ কি বলতে পারেন? আর্টসের ছাত্রের কাছে অংক, সাইন্সের ছাত্রের কাছে বিলাসীর চরিত্র মুখস্ত করা…অথবা ধরেন ছাগুদের কাছে শুদ্ধ বাংলায় একটি বাংলা বাক্য লিখতে বলা:P মানুষভেদে বিভিন্ন হয় তা। কিন্তু যদি সবাইকে বিবেচনাতে আনি তাহলে পৃথিবীর সবচাইতে কঠিন কাজ হচ্ছে, আরেকজন মানুষকে বুঝতে পারা। শুদ্ধ বাংলায় বললে “প্রেডিকশান” করা:P একজন মানুষের সাথে আপনি একশ বছর বসবাস করেও তাকে সম্পূর্ণভাবে পড়তে পারবেন না। কিছুদিন আগে কানে দুল পরা ছেলে আজকে দেখবেন পুরা মোল্লা সেজে ঘুরে বেড়াচ্ছে আবার মাদ্রাসা থেকে আলেম হয়ে বেড়িয়ে কানে দুল পরে ইয়ো ইয়ো সাজার চেষ্টা করছে…এমন অসংখ্য উদাহরন দেয়া যাবে। এগুলো হচ্ছে একদম মৌলিক পরিবর্তন বা শুদ্ধ বাংলায় বলতে গেলে “ইউ টার্ন” নেয়া। যাক গে সে কথা। আসুন মানুষ-মানুষের সম্পর্ক নিয়ে একটু বাতচিত করি।

ধরা যাক কোনো নর-নারী গভীর প্রণয়ে আবদ্ধ। জান থাকতে তারা একজন আরেকজনকে ছেড়ে থাকতে পারবেনা;পুরাই “কেয়ামাত সে কেয়ামত তাক” টাইপ প্রেম আর কি! হঠাত কন্যার পিতা ব্যাপারটি জেনে গেলেন। অতঃপর যা হবার তাই হবে। আমাদের সমাজে প্রেম করাই একটি অন্যায়ের পর্যায়ে পরে(যারা ঢাকাতে বড় হইছেন তারা অফ যান,আমি মফঃস্বলের কথা বলতেছি) । যেহেতু “প্রেম” মানেই “অন্যায়” সেহেতু এখানে আর কোনো ইস্যুই বিবেচ্য না। ছেলে রিক্সা চালাক বা কম্পিউটারে প্রোগ্রাম চালাক ঐটা কোনো বিবেচ্য ব্যাপার না। আসল কথা হইল , “তোর এত বড় কলিজা ? প্রেম করস?”। .প্রেম করাই যেহেতু অন্যায় সেখানে পাত্রের খোঁজ খবর নেয়ার ত প্রশ্নই আসেনা। মেয়ে গৃহবন্দী আর ছেলে পার্কে পার্কে একা ঘুরে বেড়ায় আর সিগারেটের পর সিগারেট জ্বালায়। যুগ পাল্টাইছে ,এখনকার মেয়েরা আর সেই ৮০’র দশকের মেয়েদের মতো বালিশে মুখ বুঝে কাদেনা। এখন তারা প্রতিবাদ করে। প্রথমে শুরু হয় “হাংগার স্ট্রাইক” দিয়ে। “আক্কাসের সাথে আমার বিয়ে না দিলে আমি কিছু খাবোনা,না খেয়ে মরে যাবো” মার্কা ডায়লগ দেয়।দুই-একদিন হাংগার স্ট্রাইক চলার পর মা এসে যখন বুঝায় “এমন করিস না মা, এমন করলে ত অসুস্থ হয়ে যাবি। আমি তোর বাবার সাথে কথা বলব,তুই খা” তখন এক-দুইবার গাইগুই করে মেয়ে কিন্তু পাকস্থলীত আর প্রেম দিয়ে ভরা যায়না ভাই।হাঙ্গার স্ট্রাইক খতম হয়। কিন্তু মায়ের দেয়া এই কমিটমেন্ট যে আসলে তাকে বোকা বানানোর চক্রান্ত এইটা যখন যখন টের পায় তখন মেয়ে আবার বেকে বসে। এইবার আরো হার্ড লাইনে যায়। “আমি গলায় দড়ি দিমু”, “আমি বিষ খামু” , “আমি ছাদ থেকে লাফ দিমু” এইসকল আল্টিমেটাম দেয়া শুরু হয় তখন। কিন্তু মেয়েরা যেমন ৮০ এর দশকে আটকে নেই তেমনি অভিভাবকরাও ৮০ এর দশকে আটকে নেই। তারা জানে এইগুলা সব ডায়লগবাজি। বড়োজড় আট –দশটা ঘুমের ট্যাবলেট খাবে। হাসপাতালে নিয়ে গিয়ে মুখ দিয়া নল ঢুকায়ে পেট পরিষ্কার করলেই সিধা হয়ে যাবে। তাই বাবা মেয়ের এই কুমন্ত্রেও পটেনা। এরপর মেয়ে ছাড়ে তার “ব্রহ্মাস্ত্র”।. কি সেই অস্ত্র? বাপের ঠিক করে দেয়া ছেলেকে বিয়ে করে ফেলে,আর কি? এবং দুই মাস পর নতুন জামাইকে নিয়ে গাউছিয়াতে শপিং করার সময় যদি হঠাত আক্কাসের সাথে দেখা হয় তাহলে বলে, “আরে আক্কাস ভাই যে, দেখ দেখ(জামাইকে উদ্দেশ্য করে) উনি হচ্ছেন আমাদের আক্কাস ভাই। আমাদের পাড়াতেই থাকেন। খুব ভালো ছাত্র। ঢাকা ভার্সিটি থেকে ইংলিশে গ্র্যাজুয়েশন করেছেন কিন্তু এখনো চাকরি যোগার করতে পারেনি। এই তুমি তাকে একটা কার্ড দিয়ে দাও ত,আর তোমার অফিসে উনার জন্য কোনো চাকরি পাও কিনা দেখ।”জামাই বাবাজিও সুবধ বালকের মতো কার্ড দিয়ে,”একদিন বাসায় আসেন ,জমিয়ে আড্ডা দেয়া যাবে” বলে নবপরিণীতা স্ত্রীকে নিয়ে চলে যান। আক্কাস কার্ডটি হাতে নিয়ে বোকার মতো দাঁড়িয়ে থাকে। কারন বাসার ঠিকানা ত উনি দিয়ে যান নি,কিভাবে যাবে? উল্টো ঘটনাও যে ঘটেনা সেই দাবি করছিনা তবে সেটি সংখ্যায় কম। কারন ছেলেকে ত আর গৃহবন্দি করা যায় না কিন্তু ছেলে যদি বাবার ধন-সম্পত্তির উপর নির্ভরশীল হয় তাইলে খবর আছে। “সখিনারে যদি বিয়া করস তাহলে আমার সম্পত্তি থাইকা তোরে এক কানা-কড়িও দেবোনা”…এই এক অমর বানীতেই সেই প্রেম ফুড়ুৎ করে উড়ে যায়। “দেখো আমার বাবা হার্টের পেশেন্ট,এখন যদি উনার অমতে বিয়ে করি তাহলে উনি স্ট্রোকও করতে পারেন,আমি তা পারবোনা সখিনা”…এই কথা বলে বাবার নির্দেশ মোতাবেকই বিয়ে করে। কিন্তু এই ছেলে যদি তার নয়া বউকে নিয়ে গাউছিয়াতে সখিনার মুখোমুখি হয় তবে ভুলেও পরিচয় করিয়ে দেয়না।কারন ছেলেরা যত সহজে পূর্ব পরিচয়গুলো মেনে নেয় মেয়েরা তত সহজে মানেনা। তারা সবকিছুর মধ্যেই “ডাল ম্যা কুছ কালা হ্যা” খুঁজে বেড়ায়। জেনেশুনে কে নিজের পায়ে নিজে ধার দেয়া কুড়াল মারে বলেন? রাতে ত বিছানা থেকে দৌড়াবে। তাই উল্টো দিকে ফিরে, “আরে এইদিকে ভালো দোকান নাই,চলো তোমাকে নিয়ে আজকে ইস্টার্ন প্লাজাতে যাবো” বলে কোনোমতে পালায়। গাউছিয়ার বদলে ইস্টার্ন প্লাজা শুনে কোন মেয়ে আর স্থীর থাকতে পারে বলেন? তাই মেয়েও লাফ দিয়ে রাজী হয়ে যায়।”এইটা গেলো অভিভাবকদের হস্তক্ষেপে বিচ্ছেদ,এছাড়াও আবার নিজে নিজেও প্রেম ভেঙ্গে যায়। হয়ত কোনো নর-নারীর দীর্ঘদিনের প্রণয়। অনেক পাহাড় পর্বত অতিক্রম করে তারা এখন এই পর্যায়ে এসেছে। কিন্তু খুব সামান্য একটা কারনে সেই প্রেম ভেস্তে গেলো,যার কোনো ব্যাখ্যা নাই। আবার দুই মাস প্রেম করেই চারিদিকে বইতে থাকা প্রেমের সাগর দেখে অনেকে বিয়েও করে ফেলে। ৪মাস পর ডিভোর্স…৬মাস পর কেস…৮মাস পর দেনমোহরের টাকার জন্য ছেলের দৌড়াদৌড়ি…এইরকম ঘটনাও ঘটে অসংখ্য। মানুষের চরিত্র তাই অসম্ভব জটিল একটি মেকানিজম। সে কখন কোন এ্যাকশনে কি রি-এ্যাকশন দিবে তা আপনি ১০০বারের মধ্যে হয়ত ৯৯বার মিলাতে পারবেন। কিন্তু ১০০তে ১০০ পাবেন না,নিশ্চিত।

এবার আরেকটু গভীরে আসি (বদ পোলাপান,বদ চিন্তা করবানা) “গভীর” মানে পারিবারিক সম্পর্কের কথা বলতে যাচ্ছি। যেহেতু এটি জেনেটিক সম্পর্ক বা আঞ্চলিক ভাষায় “রক্তের সম্পর্ক” সেহেতু এখানে আমরা আরেকটু বেশি মোহাব্বত আশা করি। কিন্তু আমাদের সমাজের বাস্তব চিত্রটা পুরাই ভিন্ন। আমাদের পারিবারিক সম্পর্কগুলো আরো অনেক জটিল। অবশ্যই এর পিছনে আর্থসামাজিক পরিস্থিতি বেশি দায়ী। পশ্চিমা সংস্কৃতির আমদানীও একটা গুরুত্বপূর্ণ কারন। কয়েক দশক আগের “সমিষ্টগত পারবারিক” ভিত্তি থেকে আমরা এখন “একক পরিবার” ভিত্তিক সমাজ ব্যাবস্থার দিকে মুখ ফেরাচ্ছি। “যৌথ পরিবার” ব্যাপারটি এখন শুধু গ্রামেই দেখা যায় তাও সেটি সংখ্যায় কমছে। দেখা যাচ্ছে একই ভিটা দুই-তিন ভাই মিলে ভাগ করে আলাদাভাবে বসবাস করছে। আমরা পশচিমা সংস্কৃতি থেকে একক পরিবারের ধারনা আমদানী করলাম ঠিকি কিন্তু পশ্চিমারা রাষ্ট্রগুলোতে বৃদ্ধ পিতা-মাতারা রাষ্ট্র কর্তৃক যে সুবিধা পেয়ে থাকে সেই দাবিটি কেউ উত্থাপন করিনি। এটা অবশ্য আমাদের জাতিগত একটি সমস্যা। আমরা অনুকরনপ্রিয় জাতি। উদ্ভাবন-স্বকীয় চিন্তাধারার প্রতি আমাদের তেমন কোনো একটা ঝোক নেই। জনাদ আব্দুল জলিল যখন তাঁর ৩২ সাইজের বুক আর ৪২ সাইজের ভূড়ি এবং ভুল উচ্চারন,ভাঁড়ামিপূর্ণ অভিনয় দিয়ে হিন্দি-তামিল-হলিউডি সিনেমা থেকে কাহিনী মেরে হাই ডেফিনেশন ফরমেটের সিনেমা বানায় তখন আমরা সবাই “বসুন্ধরা সিনেপ্লেক্সে” হুমরি খেয়ে পরি কিন্তু তারেক মাসুদের মতো প্রতিভাবান চলচিত্রকাররা যখন মৌলিক সিনেমা বানিয়ে আমাদের ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির একটি নিজস্ব ভাবধারা তৈরি করতে চেষ্টা করে তখন মিডল ফিঙ্গার দেখিয়ে চলে যাই। আমরা তাই স্বার্থপরের মতো একক পারিবারিক পদ্ধতির সমাজ ব্যবস্থাতে শিফট করছি কিন্তু বৃদ্ধা পিতা-মাতা শেষ বয়সে কিভাবে বেঁচে থাকবে সেই চিন্তা আদৌ করছিনা।এখানেও কিছু মজার ব্যাপার আছে যা আমাকে গোলক ধাঁধায় ফেলে দেয়। আমার নিজের পরিবার থেকেই উদাহরন দেই।আমার তিন মামা। তিনজনই প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী। বিয়ে করে সবাই যার যার স্ত্রী-সন্তান নিয়ে ঢাকায় বসবাস করছে। আমার নানা মারা যাবার পর নানু যখন একা হয়ে যায় তখন ত মামারা মহাবিপদে পরে গেলো। যদিও নানু আমার তখনও পুরো ফিট। রোগ বলতে শুধু ডায়বেটিক ,আর কোনো রোগ বালাই নেই। এখন এই উটকো বোঝাটি কে বহন করবে? একটু ভুল বলেছি, নানু তখন পুরুপুরি উটকো বোঝা হননি কারন নানুর নামে জেলা শহরে বেশ বড় প্লট আছে যার মূল্য কোটি টাকার উপরে। কিন্তু সেই জমি ত নানুর মৃত্যুর আগে হাতে আসবেনা। নানু ছিলেন বৃটিশ আমলের মহিলা। ঐসময়কার চেতনা যারা ধারন করতেন তারা মরে যাবেন কিন্তু কোনো অবস্থাতেই মেয়ের বাড়িতে আশ্রয় গ্রহন করবেন না। তাই আমাদের বাড়িতে থাকার সাধাসাধিতে কোনো ফায়দা হলোনা। প্ল্যান করা হলো নানু পালাক্রমে সব মামাদের বাসায় থাকবেন। তিন মামা ৪মাস করে নানুকে পালবেন। গ্রামে বেড়ে উঠা আর মফঃস্বল শহরের খোলামেলা পরিবেশে বসবাসে অভ্যস্ত নানু আমার ঢাকার বদ্ধ চারদেয়ালের মাঝে কেমন যেনো লাশের মতো হয়ে গেলেন। এই ফাঁকে জমির কাগজ পত্র করাও শেষ। সব সম্পত্তি মামাদের নামে লিখে দিয়েছেন বা প্যাসিভ ভয়েসে বললে লিখিয়ে নেয়া হয়েছে। এইভাবে বছরখানেক কাটারপর ধুম করে নানু মারা গেলেন ,মামারাও শান্তি পেলো। কিন্তু সেই মামাদের মধ্যে বড়জন তাঁর শ্বশুর বাড়ির লোকজের জন্য পারলে জীবন দিয়ে দেয়। উনার শ্বাশুরী “সিজোফ্রেনিয়াক”। উনার ধারনা উনার আপন ছেলে উনাকে মেরে ফেলবে। উনাকে তাই বদ্ধ ঘরে রাখতে হয়। মামার বাড়িতেও এনে রাখা হয়। মামা তখন তাঁর সর্বাংশ দিয়ে শ্বাশুরির সেবা করেন। মেঝো মামারও একই হাল। উনার শালী থাকেন উনার বাসায়,শ্বাশুরীও থাকেন উনার বাসায়। খোলামেলা বলে ফেললাম আমার পারিবারিক ব্যাপার এবং আমি বাজি ধরে বলতে পারি যারা এই লেখাটি পরছেন তাদের পরিবারেও এই ধরনের ঘটনা আছে।

মানুষের জীবনে দুইটি অধ্যায় থাকে। একটি বিয়ের আগে আরেকটি বিয়ের পর। একজন মানুষের সম্পর্ক থেকে শুরু করে আচার-আচরন এমনকি চিন্তাভাবনাতেও একটি ব্যাপক পরিবর্তন আসে বিয়ের পর। বিয়ের আগে জীবনান্দের কবিতা পড়া ছেলেটি দেখা যায় বিয়ের পর টিভিতে বউ এর সাথে খুব আগ্রহ নিয়ে মডেল মোনালিসার সাক্ষাৎকার দেখছে বা স্টার প্লাসের সিরিয়াল দেখছে। আড্ডা ছাড়া যার একদিনও চলতোনা সেই ছেলে মাসে একবারও আড্ডাত দূর কি বাত কোনো বন্ধুকে ফোন করেও খবর নেয়না। বউয়ের আঁচলেই দুনিয়ার সকল সুখ পেয়ে যায়। উল্টো ঘটনাও ঘটে। যে মেয়েটি বিয়ের আগে হুমায়ুন আহমেদেরও কোনো বই পড়েনি সেই মেয়েও হয়ত বিয়ের পর আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের “চিলেকোঠার সেপাই” নিয়ে আলোচনা করছে বরের সাথে। এখানে মূল ফ্যাক্টর হচ্ছে, কে কাকে ইনফ্লুয়েন্স করতে পারে তা।

এগুলো ছোটোখাট ব্যাপার। এর চাইতেও অনেক ভয়ংকর ব্যপার ঘটে বিয়ের পর আমাদের সমাজে। যে ছেলেটির বাবা-মা-ভাই-বোনদের প্রতি অসম্ভব টান ছিলো দেখা গেলো বিয়ের ৬ মাস পর সে আর কারো খোঁজ খবরই নিচ্ছেনা। ছোট ভাইটার হয়ত প্রাইভেট ভার্সিটিতে পড়ার টাকা সে দিতো কিন্তু বিয়ের পর সেই টাকাটা দেয়া হঠাত করে তাঁর পক্ষে অসম্ভব হয়ে উঠে। বাবা-মায়ের অসুখ বা ওষুধের খরচ যোগানো তার পক্ষে আর সম্ভব হয়না কারন বউ এর জন্য ডাভ সাবান আর মেকাপ কিটসের যে অনেক দাম(এখানে কেউ যদি আমাকে নারীবিদ্বেষী ভেবে গালাগাল দেন তাতে আমার আপত্তি নাই, আমি কি বাদি সেটা আমি জানি,আমি প্র্যাক্টিকেল সিনারিওটা তুলে ধরতে চেয়েছি খালি)!উল্টো ঘটনাও ঘটে। বউকে দিয়ে শুধু বাবা-মা না লতায় পাতায় জড়িত আত্মীয় স্বজনের সর্বোচ্চ সেবাযত্ন করিয়ে ছাড়ে… পান থেকে চুন খসলেই “বাবা-মা কিছু শিখিয়ে দেয়নি নাকি?” এই ধরনের রোমান্টিক বাক্যবান ছুটে আসে মুখ থেকে।

একই পরিবারের দুই/তিনজন ভাইয়ের একমাত্র অবলম্বন হয় যদি পিতার রেখে যাওয়া সম্পদ বা ব্যবসা তাহলে দেখা যায় ভাইদের মাঝে শুরু হয় ভয়ংকর বিবাদ। তাদেরকে দোষ দেয়ারই বা কি আছে বলুন। আগে ত বাঁচার লাইসেন্সটি পেতে হবে। সম্পর্ক দিয়ে ত আর পেট ভরেনা। তবে আমাদের সমাজে শুধু বাঁচার তাগিদে না কোন ভাইয়ের চাইতে কোন ভাইয়ের সম্পদ-সম্পত্তি বেশি সেটিও বিবেচ্য বিষয় বটে। নিজের ত চিন্তা আছেই তার সাথে যোগ হয় বউ এর গবেষনালব্ধ উপলব্ধি। হাসান ভাই কিন্তু জিগাতলা প্লটটিতে ফ্ল্যাট করে ফেলছে। “আমাদেরও মোহাম্মদপুরের জমিটাতে ফ্ল্যাট বানিয়ে ফেলো” ।. “জিসান ভাই কিন্তু ২০ লাখ টাকা দিয়ে গাড়ি কিনেছে,আমাদের গাড়িটা যেনো ২৫ লাখ টাকার নিচে না হয়”…ব্লা ব্লা ব্লা।

ফ্রয়েড সবকিছুর মাঝেই যৌনতার সম্পর্ক খুঁজতেন। কিন্তু সেই তত্ত্ব সঠিক প্রমানিত হয়নি। কিন্তু সমাজ ব্যবস্থা আর সামাজিক সম্পর্ক (পারিবারিক সহ) এর পিছনে মূল ইনগ্রেডিয়েন্ট হচ্ছে “অর্থনৈতিক নির্ভরতা”।. নারীরা যে এক ছেলের সাথে প্রেম করে আরেকজনকে বিয়ে করে,এর পিছনে কাজ করে “অর্থনৈতিক নির্ভরতা”।. শ্বাশুরী আর বউ এর মধ্যে যে দ্বন্দ্ব চলে তার পিছনেও কাজ করে এই “অর্থনৈতিক নির্ভরতা”।. স্ত্রীর কাছে “স্বামী” এবং মায়ের কাছে “ছেলে” দুইজনই অর্থনৈতিক নির্ভরতার জায়গা।ঋত্বিক ঘটকের “মেঘে ঢাকা তারা” ছবিতে আমরা তাই দেখি পরিবারের একমাত্র উপার্যনের ভরসা যে মেয়েটি সেই মেয়ে যখন তার প্রেমিকার সাথে দেখা করে তখন মায়ের চোখে আশংকার ছায়া আর ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিকে ভাত ফোটার শব্দ(যার মানে মেয়ের বিয়ে হয়ে গেলো ভাতের যোগান কে দিবে?)।. যত বড় বড় কথাই আমরা বলিনা কেনো সবার আগে “পাকস্থলীর দাবি”।. পাকস্থলীর নিশ্চয়তা আসার পর আমরা সম্পর্কের অন্যান্য দিকের দিকে আলোকপাত করি। কিন্তু যেখানে পেটের চিন্তা থাকে সেখানে চাইলেও কেউ অন্য চিন্তা করতে পারেনা। একটি দুপুর না খেয়ে দেখেন ত।ক্ষুধার্ত অবস্থায় আপনার প্রেমিকা যদি আপনাকে দেখা করার জন্য ডাকে তাহলে কি আপনি আগে তার মিষ্টি মুখখানা দেখতে যাবেন নাকি আগে খাবারের প্রয়োজনখানা মিটিয়ে তারপর “রাস্তায় জ্যাম ছিলো জান”…এই মিথ্যা কথাটি বলবেন?

আমাদের সমাজের অর্থনৈতিক বৈষম্য বেড়ে চলছে ভয়ানক আঁকারে। দেশের মাত্র কয়েকভাগ মানুষের হাতে দেশের ৯০ ভাগ সম্পদ। মধ্যবিত্তের তাই এখন বেঁচে থাকতেই নাভীশ্বাস হচ্ছে। সেখানে এই সম্পর্কের দায়বদ্ধতা টিকিয়ে রাখা সম্ভব না। তারপরও আমরা যেহেতু মানুষ,আমরা যেহেতু বিবেক নিয়ে জন্মাই তাই অন্তত কিছু সম্পর্ক একটু কষ্ট করে হলেও স্বার্থের উপরে উঠে টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করা উচিৎ। বাবা-মা-ভাই-বোন-স্ত্রী এই সম্পর্কগুলো যেনো শুধু “কাগুজে” বা “মৌখিক” সম্পর্ক হিসেবে না থাকে। সম্পর্কগুলোতে যেনো “প্রান” থাকে। ঐ পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলোর মতো আমাদের যেনো “মাদার্স ডে”,”ফাদার্স ডে”,”সিস্টার্স ডে” বা “ভ্যালেন্টাইন ডে” খুঁজতে না হয়। আমাদের সম্পর্কগুলো শুধু যেনো কিছু “গিফট আইটেমে”র মাঝে বদ্ধ না থাকে। আমাদের সম্পর্কগুলো যেনো হয় উন্মুক্ত… গ্রামের খোলা মাঠে বয়ে যাওয়া বাতাসের মতো।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

২০ thoughts on “আমাদের সম্পর্কগুলো…

  1. খুব ডিটেইলসে আমাদের
    খুব ডিটেইলসে আমাদের সম্পর্কগুলা নিয়ে লিখেছেন। সবচে ভালো লাগছে বাস্তব অভিজ্ঞতা তুলে ধরে লিখেছেন। থিয়োরি আর বাস্তব এক না। লেখায় এ প্লাস দিলাম। ভিটামিন- এ প্লাস না। 😀

  2. আমাদের সম্পর্কগুলো যেনো হয়

    আমাদের সম্পর্কগুলো যেনো হয় উন্মুক্ত… গ্রামের খোলা মাঠে বয়ে যাওয়া বাতাসের মতো।

    অনেক বড় লেখা। প্র্যাক্টিকেল কথা বার্তা । মিলে গেলো কথাগুলো :কনফিউজড:

    1. আপনার মন্তব্য উপ্রে গেছেগা।
      আপনার মন্তব্য উপ্রে গেছেগা। এই কাজটা খালি আমার সাথেই হয়। দুনিয়ার সব আকাম-কুকাম খালি আমার সাথেই কেন হয় :মাথাঠুকি: :মাথাঠুকি:

  3. আমাদের সম্পর্কগুলো শুধু যেনো

    আমাদের সম্পর্কগুলো শুধু যেনো কিছু “গিফট আইটেমে”র মাঝে বদ্ধ না থাকে

    :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ:
    সম্পর্ক শব্দটা বড়ই অদ্ভুত আমি অধম(আপনে আপনে) আর কি কইতাম

  4. অনেকদিন পর অনেক বড়মাপের পোস্ট
    অনেকদিন পর অনেক বড়মাপের পোস্ট লিখেছেন,মনে আছে তো দাদা আমাকে?
    এই ব্লগের নেশা ধরানোর পিছনে আপনার দায়টাও কিন্তু অনেক বেশি।
    বরাবরের মতোই ক্ষুরধার লেখা।

    ইস্টিশন মাস্টাররে কি ঘুষ দেওয়া লাগবো স্যালুটের ইমো যোগ করার জন্য? (প্লিজ বো ইমো দেখাইয়েন না আঙুল দিয়া)

    1. আমি মানুষের নাম ভুলে যাই। তবে
      আমি মানুষের নাম ভুলে যাই। তবে যদি কারোরটা মনে রাখি তাহলে জীবনেও ভুলিনা। আপনারটা মনে রেখেছিলাম। ব্লগের নেশা বজায় থাকুক… :বুখেআয়বাবুল:

  5. একমাত্র নিজে প্রেমে ছ্যাক না
    একমাত্র নিজে প্রেমে ছ্যাক না খাইলে এমুন কইরা প্রেম বিষয়ক জটিল সম্পর্ক বিশ্লেষন করা যায় বলে মনে হয় না :ভেংচি: :ভেংচি: :ভেংচি:
    লেখা ভালো লেগেছে তবে আমার কাছে অনেক টাই এক পাক্ষিক লেগেছে, বিয়ের পর একটা ছেলের ফ্যামিলির প্রতি দায়িত্বশীলতার পসিটিভ বা নেগেটিভ দিক গুলি যত সুন্দর ভাবে উঠে এসেছে, একই ভাবে একটা মেয়ের ও বিয়ের পর শ্বশুরবাড়ি এবং বাবার বাড়ি দুই দিকেই যে পজিটিভ এবং নেগেটিভ দিক গুলির মুখোমুখি হতে হয় সেই কথা গুলি আসেনি, সম্পর্ক তো শুধু ভাই ছেলেরা ভাঙ্গে না বিয়ের পর। এখনকার যুগে বিয়ের পর ছেলেরা যদি বাবার বাসা বিমুখ হয় তো এই সঙ্খ্যার অন্ততঃ ৫গুন বেশি মেয়ে আছে যাদের কে শ্বশুর বাড়িতে এসে নানারকমক সম্পর্কের টানাপোড়েনে পড়তে হচ্ছে, সে কথা গুলি না আসলে লেখাটা বড্ড বেশি একপেশে হয়ে যায় অধম ভাই :ফেরেশতা: :ফেরেশতা: :ফেরেশতা:

    1. মেয়েদের পার্সপেক্টিভে যদি
      মেয়েদের পার্সপেক্টিভে যদি কোনো প্যারা লিখতে যেতাম তাহলে এই ব্লগের সাইজ দুইগুন হয়ে যেতো। মেয়েদের ব্যাপারে যদি কোনো নেগেটিভ মন্তব্য আমার লেখাতে এসেও থাকে তবে সেটি কি কারনে এসেছে সেটি উল্লেখ করে দিয়েছি। সেই জায়গা থেকে আবার আমাকে কেউ নারী বিদ্বেষী ভেবে বসলে আমার কিছু করার নাই কারন আমি ত আমার সব লেখার লিংক এইখানে দিয়া নিজের এথিক্স প্রমান করতে পারবোনা।

      মেয়েদের শ্বশুরবাড়ি এসে অনেকধরনের সমস্যার সম্মুখিনই হতে হয় সেটা অবশ্যই স্বীকার করি। শহর থেকে শুরু করে গ্রামে এই সমস্যা আরো ঘনীভুত হয়। সুযোগ হলে সে বিষয় নিয়েও লেখা যাবে আরেকদিন। তাই বলে লেখাটা “একপেশে” না বলে ” অসমাপ্ত” বললে খুশি হতাম :ভাঙামন:

  6. আপনি লেখা দিয়ে খুশি করবেন না
    আপনি লেখা দিয়ে খুশি করবেন না আর আমি কমেন্ট দিয়া খুশি করুম? অসমাপ্ত হইলে সমাপ্ত করেন 😀 😀
    নারীবিদ্বেষী কিন্তু এখনো কেউ আপনাকে বলেনি, এথিক্স ও প্রমান করতে বলেনি, শুধু যেটা ওয়ান সাইডেড মনে হয়েছে সেটা বলেছি 😀 😀
    এইবার তাইলে অসম্পূর্ণ লেখা সম্পূর্ণ করেন, পাঠক হিসেবে তো চাইতেই পারি :ভেংচি: :ভেংচি: :ভেংচি: :ভেংচি: :ভেংচি: :ভেংচি:

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

+ 35 = 36