ইবনে তাইমিয়ার ঢিলা স্ক্রু ও সালাফিদের উত্থানের ইতিহাস

এক
১২৯৩ সালে আসসাফ নামে একজন সিরিয়ান খ্রিষ্টানের বিরুদ্ধে ইসলামের নবী হজরত মুহাম্মদ (সঃ)কে গালিগালাজ করা ও সম্মানহানীর অভিযোগ আনা হয়। বিচারে অপরাধ প্রমানিত হয়। বিচারের বিস্তারিত বিবরণ আমার জানা নাই। তবে সিরিয়ায় সেই সময়ে সুন্নি আইন প্রচলিত ছিল এবং সুলতান বাইবারের প্রচেষ্টায় ততোদিনে সুন্নি চার মাজহাবের আইনই সমান হিসাবে স্বিকৃত হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু একজন অমুসলিম যদি ইসলামের নবীর বিরুদ্ধে ব্লাশফেমি করে তাহলে তার বিচার কি হতে পারে সেই বিষয়ে সুন্নি চার মাজহাবের আইনে ফারাক আছে। লঘু শাস্তি থেকে মৃত্যুদন্ড বিভিন্নরকম মতামত পাওয়া যায়। আসসাফের ক্ষেত্রে কোন আইন অনুসরণ করা হয়েছিল জানি না। তবে দামেস্কের তৎকালিন প্রশাসক তাকে ইসলাম গ্রহণের মাধ্যমে ক্ষমা পাওয়ার সুযোগ করে দেন। আসসাফ ইসলাম গ্রহণ করে অব্যহতি পান। এইখানেই এই ঘটনা শেষ হতে পারতো। কিন্তু বাধ সাধলেন দামেস্কের একজন সম্মানিত হাম্বলি আইনবীদ তকিউদ্দিন মুহাম্মদ ইবনে তাইমিয়া। তাইমিয়া দাবি করেন যে মুসলমান হইলেও আসসাফের ক্ষমা নাই এবং মৃত্যুদন্ডই তার একমাত্র শাস্তি। ২০১৩ সালে বাঙলার হেফাজতে ইসলামের ন্যায় ১২৯৩ সালে ইবনে তাইমিয়া ও তার অনুসারীরা বিরাট সংখ্যায় জমায়েত হয়ে ‘আসসাফের কতল চাই’ আন্দোলন শুরু করেন এবং এক পর্যায়ে দামেস্কের প্রশাসকের বাড়ির সামনে অবস্থান অথবা অবরোধ জাতীয় একটা কর্মসূচী পালন করেন। ফলাফলস্বরূপ ইবনে তাইমিয়াকে গ্রেফতার করে জেলে পাঠানো হয়। জেলে বসে লিখলেন তিনি তার অন্যতম বিখ্যাত বই, ‘মহানবীর অপমানকারীদের বিরুদ্ধে উত্থিত তলোয়ার’। এই ঘটনা ইবনে তাইমিয়ার প্রথম জেলে যাওয়ার ঘটনা। এরপর তিনি আরো বহুবার কারা বরণ করেন।

বর্তমান দুনিয়ার রাজনীতি বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক রাজনীতিতে সরাসরি না হলেও ইবনে তাইমিয়ার জীবন ও চিন্তা ভাবনার পরোক্ষ প্রভাব অস্বিকার করার উপায় নাই। সিরিয়া ও ইরাকে সম্প্রতি যারা খেলাফত প্রতিষ্ঠা করেছেন তারা সালাফি জিহাদী বলে পরিচিত। সালাফি মুসলমানদের কাছে ইবনে তাইমিয়া হলেন শায়খুল ইসলাম। অবশ্য সব সালাফি মুসলমানই জিহাদী নয়। মূলত নব্বই দশক থেকে সালাফি মুসলমানরা জিহাদী কর্মকান্ডে জড়িয়ে পরেছেন। কট্টর হাদিসকেন্দ্রীক শরিয়ত অনুসরণ, কোরান হাদিসের কঠোর শব্দগত ব্যাখ্যা করা এবং অমুসলিম, বেশরিয়তি মুসলিম ও শিয়া মুসলিমদের বিরুদ্ধে জিহাদ করা, ইসলামের প্রাথমিক যুগে ফিরে যাওয়ার চেষ্টা ইত্যাদি সালাফি মতবাদের প্রচার ও প্রসারের ক্ষেত্রে সালাফিরা ইবনে তাইমিয়াকেই গুরু মানেন। সালাফ শব্দের অর্থ পূর্বপুরুষ। সালাফি ইসলাম মানে পূর্বপুরুষের ইসলাম। মূলত ইসলামের প্রথম তিন প্রজন্ম যে ধরণের জীবন যাপন করেছেন, যে ধরণের আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করেছেন তাতে ফেরত যাওয়ার চেষ্টাই সালাফিবাদ। ইসলামের প্রথম তিন প্রজন্ম যা করে নাই এমন কিছু করাকে বিদআত হিসাবে ঘোষনা করেছিলেন ইবনে তাইমিয়া। মহানবীর জন্মদিনে ঈদে মিলাদুননবী উদযাপন, সাহাবি ও সুফিদের কবর কেন্দ্র করে মসজিদ নির্মান ইত্যাদিকে তিনি বেশরিয়তি ও অনৈসলামিক বলে প্রচার করা শুরু করেন। তার জীবনের একটা বড় অংশ তিনি ব্যয় করেছেন ভিন্ন মতাবলম্বিদের সাথে তর্ক ও বিবাদ করে, তার অন্যতম টার্গেট ছিল সমসাময়িক সুফিবাদীরা। জিহাদী ফতোয়া দেয়ার ক্ষেত্রে তাকে আধুনিক জিহাদীদের পূর্বসূরী বলা খুব বেশি ভুল হবেনা। এসব ফতোয়া তিনি দিয়েছেন মিশর ও সিরিয়ার তৎকালিন মামলুক সালতানাতের পক্ষে তাদের শত্রুদের বিরুদ্ধে। ১২৯৭ সালে তৎকালিন মামলুক সুলতানের অনুরোধে তিনি সিসিলির আর্মেনিয়ান খ্রিষ্টানদের বিরুদ্ধে জিহাদ করা কর্তব্য বলে ফতোয়া দেন। এরপর তিনি তৎকালিন ইরানের মোঙ্গল শাসকদের বিরুদ্ধে জিহাদ করার ফতোয়া দেন। উল্লেখ্যযে, ইরানের তৎকালিন মোঙ্গল শাসক মাহমুদ গাজান খান ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে মুসলমান হয়েছিলেন এবং তার শাসনে মোঙ্গলদের মধ্যে ইসলাম ধর্ম জণপ্রিয় হয়ে ওঠে। কিন্তু তাইমিয়া ফতোয়া দেন যে মোঙ্গলরা মুসলমান হলেও শরিয়তি আইন অনুসরণ না করে চেঙ্গিস খানের তৈরি ‘ইয়াসা আইন’ অনুযায়ী শাসন করে, তাই তাদের বিরুদ্ধে জিহাদ করা কর্তব্য হয়ে উঠেছে। জিহাদ সম্বন্ধে তিনি লেখেন ‘একমাত্র জিহাদের মাধ্যমেই একজন মানুষ ইহকালে ও পরকালে সুখি হতে পারে। জিহাদ পরিত্যাগ করা মানে ইহকাল ও পরকাল দুই জীবনেই সুখ থেকে বঞ্চিত হওয়া’।

তবে নিজের জীবদ্দসায় তাইমিয়া সবচেয়ে বেশি বিখ্যাত এবং কুখ্যাত হয়েছেন কোরআন ও হাদিসের কঠোর শব্দগত ব্যাখ্যা করার কারনে। ইসলামের ইতিহাসে কোরানের শব্দগত ব্যাখ্যাকারী কেউ কেউ আল্লাহর হাত, পা, কান, মুখ, নিতম্ব ইত্যাদি আছে বলে বিশ্বাস করতেন। যেহেতু কোরআনে লেখা আছে আল্লাহ শোনেন তাই তার কান আছে, যেহেতু তিনি সিংহাসনে বসেন তাই তার নিতম্ব আছে এইরকম অনেকে ভাবতেন। এই ধরণের বিশ্বাসের অভিযোগেও ইবনে তাইমিয়াকে একবার জেলে পাঠানো হয়। তাইমিয়া পরবর্তিতে এই অভিযোগের জবাব দিয়ে একটি বই লেখেন এবং তাতে আল্লাহর আকৃতি প্রকৃতির এইরকম শব্দগত অর্থ অথবা তার কোন রকম ব্যাখ্যা তৈরির মাঝামাঝি পন্থা অবলম্বন করতে যুক্তি দেন। অর্থাৎ আল্লাহ শোনেন এই কথার অর্থ আল্লাহর মানুষের মতো কান আছে এমন বোঝা উচিত হবে না, আবার আল্লাহর কান নাই এই কথা বলে আল্লাহ কিভাবে শোনেন তার কোন যৌক্তিক অথবা আধ্যাত্বিক ব্যাখ্যাও দেয়া যাবে না। বিখ্যাত পরিব্রাজক ও লেখক ইবনে বতুতা দামেস্ক ভ্রমন করার সময় ইবনে তাইমিয়ার সাক্ষাৎ পেয়েছিলেন। ইবনে বতুতা এক শুক্রবারে ইবনে তাইমিয়াকে মসজিদের মিম্বরে দাঁড়িয়ে বক্তৃতা করার সময় ‘আল্লাহ পৃথিবীর আকাশে ঠিক এইভাবে নেমে আসেন যেইভাবে আমি নামছি’ বলে মিম্বরের একধাপ সিড়ি বেয়ে একধাপ নিচে নামতে দেখেছিলেন। বতুতার মতে তাইমিয়া ছিলেন কঠোর ধর্মনিষ্ঠ কিন্তু রগচটা একজন ব্যক্তি যার মানসিক ভারসাম্য নিয়ে তিনি সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। ইবনে বতুতার ভাষায় – “ দামেস্কের হাম্বলি ফিকহবীদদের প্রধান ছিলেন তকিউদ্দীন তাইমিয়াহ। যদিও তিনি তার অনুসারীদের কাছে খুবি সম্মানিত ছিলেন, কিন্তু তার একটা স্ক্রু ঢিলা ছিল”। (বতুতা স্ক্রু ঢিলা থাকার কথা লিটারালি বলেছেন)

দুই
ইবনে তাইমিয়া নিজে অবশ্য সালাফিবাদ নামে কোন মতাদর্শের জন্ম দেন নাই। শরিয়তের দিক থেকে তিনি ছিলেন সুন্নি হাম্বলি মজহাবপন্থী। সুন্নি চার মাজহাবের মধ্যে হাম্বলিবাদীরাই সবচেয়ে কট্টর হাদিসপন্থী। নয় শতকের ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল ছিলেন এই মাজহাবের প্রতিষ্ঠাতা। সালাফিবাদীরা ইবনে তাইমিয়ার পাশাপাশি ইমাম হাম্বলকেও নিজেদের অন্যতম গুরু মানেন। তাইমিয়া এবং হাম্বল এই দুইজন সালাফিদের কাছে ‘দুই শায়েখ’ হিসাবে পরিচিত। ইমাম হাম্বলের জন্ম ইরাকের বাগদাদে আব্বাসিয় খলিফাদের স্বর্ণযুগে। কোরান লিখিত না অলিখিত এই ধর্মতাত্ত্বিক বিতর্ক কেন্দ্র করে তিনি মুতাজিলা ও আব্বাসিয় খলিফাদের সাথে বিবাদে জড়িয়ে পরেন। শুরুর দিকের আব্বাসিয় খলিফারা ছিলেন মুতাজিলা ধর্মতাত্ত্বিকদের পৃষ্ঠপোষক। বিখ্যাত খলিফা আল মামুন মিনহা ব্যবস্থা প্রনয়ন করে ধর্মতাত্ত্বিক বিষয়ে উলামাদের উপর খলিফার প্রাধান্য বিস্তার করেন। মুতাজিলাদের মতে, কোরআনের বানি চিরকাল ছিল না, আল্লাহ বিশেষ সময়ে কোরআন রচনা করেছেন। খলিফা মামুন এই মতের সমর্থক ছিলেন। অন্যদিকে ইমাম হাম্বল ও তার অনুসারিরা এর প্রবল বিরোধী ছিলেন, তাদের মতে আল্লাহর মতোই কোরানের বানি অনন্তকাল ধরে বিরাজমান। এই বিবাদের কারনে খলিফা মামুন ইমাম হাম্বলকে গ্রেফতার করে জেলে পাঠান। খলিফা আল মুতাসিমের সময় তাকে পিটিয়ে অজ্ঞান করার ঘটনা সুন্নি মুসলমানদের মধ্যে ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দেয়। পরবর্তিতে তাকে ইরাক থেকে বহিস্কার করা হয়। আব্বাসিয় খলিফাদের হাতে অত্যাচারের শিকার হয়ে হাম্বলের জণপ্রিয়তা আরো বৃদ্ধি পেয়েছিল।

সুন্নি শরিয়তের প্রধান চার মাজহাব হলো হানাফি, শাফি, মালেকি এবং হাম্বলি। মাজহাবের প্রতিষ্ঠাতাদের নামানুসারে এই নামকরণ করা হয়েছে। এরমধ্যে সবচেয়ে পুরাতন মাজহাব হলো হানাফি মাজহাব এবং সবচেয়ে নবিন হলো হাম্বলি মাজহাব। উল্লেখ্য যে এসব মাজহাবের মধ্যে হানাফিরা হচ্ছে সবচেয়ে কম হাদিসপন্থী এবং হাম্বলিরা সবচেয়ে কট্টর হাদিসপন্থী। হানাফী মাজহাবের প্রতিষ্ঠাতা ইমাম আবু হানিফা ছিলেন একজন তাবিউন অর্থাৎ সাহাবিদের পরের প্রজন্মের একজন। তার জন্ম হয়েছিল মহানবীর মৃত্যুর ৬৭ বছর পর। কিন্তু তার তরুন বয়স পর্যন্ত একাধিক সাহাবি জীবিত ছিলেন এবং তিনি তাদের মধ্যে অন্তত তিনজনের কাছ থেকে হাদিস সংগ্রহ করেছেন বলে জানা যায়। আবু হানিফা নিঃসন্দেহে প্রথম ইসলামী আইন বিশারদ ছিলেন। তিনি কোরান, হাদিস, ইজমা, কিয়াস, ইশতিহান এবং বিভিন্ন অঞ্চলের প্রচলিত আইন অনুসরণ করতেন। বর্তমান ইসলামী আইন অনেকবেশি হাদিস নির্ভর হলেও আবু হানিফার সময়ে ততোটা ছিল না। সেই সময় পর্যন্ত হাদিস শাস্ত্রের কোন বইও লিখিত হয় নাই। আবু হানিফা নিজেও কোন হাদিস সংকলন লিখে যান নাই। তবে তার ছাত্ররা পরবর্তিতে তার উল্লেখিত হাদিস নিয়ে কিছু হাদিস সংকলন প্রকাশ করেন। ঠিক কতো সংখ্যক হাদিস তিনি সহিহ মনে করতেন তা নিয়ে বিতর্ক আছে। তবে বাকি তিন ইমামের তুলনায় তিনি অনেক কম হাদিসকে সহিহ বলে স্বিকৃতি দিয়েছেন। তার ছাত্র ও অনুসারীদের হাতে তার নামে যেসব হাদিস সংকলন রচনা হয়েছে তাতে সাধারণত পাঁচশ থেকে চার হাজার হাদিস পাওয়া যায়। কারো কারো মতে তিনি মাত্র শ তিনেক হাদিসের উল্লেখ করে গেছেন। কোন কোন ঐতিহাসিকের মতে তিনি মাত্র ১৭টি হাদিসের উল্লেখ করে গেছেন। সঠিক যাই হোক না কেনো অন্য যেকোন ইমামের চেয়ে তিনি অনেক কম হাদিসের উল্লেখ করে গেছেন এবং আইনের ক্ষেত্রে হাদিসের ব্যবহারও করেছেন সবচেয়ে কম। বিখ্যাত ঐতিহাসিক এবং ইতিহাস শাস্ত্রের জনক হিসাবে পরিচিত ইবনে খালদুন তার বিখ্যাত গ্রন্থ মুকাদ্দিমায় লিখেছেন যে আবু হানিফা খুব সহজে কোন হাদিসকে সহিহ বলে গন্য করতেন না, তার উল্লেখিত হাদিসের সংখ্যা এই কারনেই এতো কম। আবু হানিফার জন্ম ৬৯৯ সালে এবং মৃত্যু ৭৬৭ সালে। তার জীবদ্দসায় লিখিত হাদিসের সংখ্যা ছিল খুবি কম। কম হাদিস নির্ভর হওয়ার এটিও একটি কারন।

অন্যদিকে ইমাম হাম্বলের জন্ম ৭৮০ সালে এবং মৃত্যু ৮৫৫ সালে। তার সময়ে লিখিত হাদিসের পরিমান ছিল বেশি। পাশাপাশি আব্বাসিয় খলিফাদের বদৌলতে মুদ্রনযন্ত্রের ব্যবহার চালু হয়েছিল। ইমাম হাম্বল ছিলেন চার ইমামের মধ্যে সবচেয়ে নবিন এবং তিনি সবচেয়ে বেশি পরিমান হাদিসকে সহিহ হাদিস বলে গ্রহণ করেছেন। তার লিখিত হাদিস সংকলনে হাদিসের পরিমান প্রায় পঞ্চাশ হাজার। ইমাম হাম্বল ইসলামি শরিয়ায় ইজমা, কিয়াস, ইশতিহানের ব্যবহারের বিরোধিতা করতেন এবং কোরানের বাইরে একমাত্র হাদিসকেই আইনের উৎস হিসাবে মানতেন। কট্টর হাদিস নির্ভর হওয়ায় আল তাবারি তাকে আইনবিশারদ বলে স্বিকার করতেন না, তার মতে তিনি নেহাত একজন হাদিস সংকলক ছিলেন। ইসলামের স্বর্ণযুগে হাম্বলিবাদ ইসলামী আইনের ক্ষেত্রে বাকি তিন মাজহাবের সমান গুরুত্বপূর্ণও ছিল না। তবে ইবনে তাইমিয়ার সমসাময়িক দুনিয়ায় মামলুক সুলতান বাইবার হানাফি, শাফি, মালেকি এবং হাম্বলি এই চারটি মাজহাবকে সমান গুরুত্ব দেয়ায় হাম্বলি মাজহাব প্রথমবারের মতো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

তিন
ইবনে তাইমিয়া এবং ইমাম হাম্বলকে প্রধান দুই গুরু মানলেও সালাফিবাদের জনক আসলে এই দুইজনের একজনও নয়। প্রকৃতপক্ষে সালাফিবাদ একেবারেই আধুনিক একটি মতবাদ। সালাফিবাদের জন্মদাতা হচ্ছেন মুহাম্মদ ইবনে আবদুল ওয়াহাব (১৭০৩-১৭৯২), যার অনুসারীরা ওয়াহাবি/সালাফি হিসাবে পরিচিত। আদী ইসলামে ফিরে যাওয়ার ডাক দিয়ে তার নেতৃত্বে যে ইসলামী সংস্কার আন্দোলন শুরু হয় তার মাধ্যমেই সালাফিবাদের জন্ম। সালাফিরা অবশ্য আবদুল ওয়াহাবকে এই মতবাদের জনক বলে মানে না, কারন তাদের মতে সালাফি মতাদর্শ হলো প্রাচিনতম ইসলাম। তাদের মতে আবদুল ওয়াহাব হলেন ইবনে তাইমিয়ার একজন মতাদর্শিক উত্তরসূরী এবং তার হাত ধরেই হাম্বলিবাদ আধুনিক দুনিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। তবে আবদুল ওয়াহাব এবং তার সালাফিবাদের প্রচার ও প্রসারে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করেছে সৌদি রাজ পরিবার। সৌদি রাজ বংশের প্রতিষ্ঠাতা মুহাম্মদ বিন সৌদ (তৎকালিন দিরিয়ার শাসক) এবং আবদুল ওয়াহাব ১৭৪৪ সালে একে অপরের বায়াত গ্রহণ করেন যার মাধ্যমে একে অপরকে ধর্মীয় এবং রাজনৈতিক নেতা হিসাবে ঘোষনা করেন। এই দুইজনের প্রচেষ্টাতেই প্রাথমিক সৌদি রাজত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়। তখন পর্যন্ত আরবের এই অঞ্চল খাতা কলমে তুর্কি ওসমানি সাম্রাজ্য/খেলাফতের অধিন ছিল এবং মক্কার শাসন ছিল হজরত মুহাম্মদ (স) এর বংশধর হাশেমিদের হাতে। ১৮০৬ সালে প্রথম সৌদি রাজত্ব প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর ওয়াহাবি সেনাবাহিনী মদিনায় মসজিদে নববির পাশে অবস্থিত জান্নাতুল বাকি গোরস্থানে হামলা চালায় এবং মহানবীর পরিবারের সদস্য ও সাহাবিদের বহু কবর গুড়িয়ে দিয়ে নিজেদের অবস্থান জানায়। শেষ পর্যন্ত তারা খোদ মহানবীর কবর ভাঙার পরিকল্পনা করে এবং তাতে সারা পৃথিবীতে প্রতিবাদের ঝড় উঠলে তারা খান্ত দেয়। পরবর্তিতে তুর্কিদের হাতে পরাজিত হয়ে তারা মক্কা ত্যাগ করে।

১৯৩২ সালে আবদুল আজিজ ইবনে সউদ হাশেমি বংশকে ক্ষমতাচ্যুত করে বর্তমান কিংডম অফ সৌদি আরব প্রতিষ্ঠিত করেন। তারপর থেকে সালাফি/ওয়াহাবিরা এই অঞ্চলের নেতা হয়ে আছে এবং সারা পৃথিবীতেই সালাফিবাদের উত্থানে অগ্রনি ভুমিকা পালন করেছে। পাশাপাশি মুহাম্মদের পরিবারের স্মৃতিচিহ্ন ধ্বংস করার ক্ষেত্রেও বিশেষ ভুমিকা পালন করেছে। উমাইয়া খলিফারা যেমন নির্দয়ভাবে মুহাম্মদের পরিবারের সদস্য ও বংশধরদের হত্যা করেছে ও নিশ্চিহ্ন করতে চেয়েছে, তেমনি ওয়াহাবি/সালাফিরা সেই একি ভুমিকা পালন করছে তাদের স্মৃতিচিহ্ন ধ্বংস করার মাধ্যমে। গত কয়েকশ বছরে তাদের হাতে ইসলামের প্রাথমিক যুগের যেসব স্মৃতিচিহ্ন ধ্বংস হয়েছে তার মধ্যে মুহাম্মদের চাচা হামজার কবর, কন্যা ফাতিমার মসজিদ, মুহাম্মদের স্ত্রী খাদিজার বসতভিটা, মুহাম্মদের মদিনার বসতভিটা, মুহাম্মদের তৈরি করা প্রথম বিদ্যালয়, আলীর বসত ভিটা, মা আমিনার কবর, সাহাবি সালমান আল ফারসির মসজিদ অন্যতম। শিরকের জন্ম দিতে পারে এই ফতোয়া দিয়ে এসব ঐতিহাসিক স্মৃতিচিহ্ন ধ্বংস করা হয়। শুরুতে শিরকের নামে করা হলেও বর্তমানে এইধরণের কর্মকান্ড ‘হজ্জ ব্যবসা’র প্রসারের জন্যে নতুন স্থাপনা তৈরির উদ্দেশ্যে খোলামেলা ভাবেই করা হচ্ছে। সিরিয়া ইরাকে জন্ম নিয়া আইসিসের খেলাফত ওয়াহাবি/সালাফিবাদের উত্থানের ধারাবাহিকতা মাত্র। নবী, সাহবাদের কবর ধ্বংস করে পূর্বসূরীদের কর্মকান্ড তারা অব্যাহত রেখেছে।

আইসিসের উত্থান এবং ফান্ডিংএর পেছনে সৌদি আরবের ভুমিকা সবচেয়ে বেশি। সৌদি পেট্রো ডলার ছারা তারা এতোদুর আসতেই পারতো না। আবার মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় বন্ধুও সৌদি রাজপরিবার। এবং দিনশেষে সারা দুনিয়ার মুসলমানদের হজ্জ করতে সৌদি আরবেই যেতে হবে এবং তাদের বার্ষিক হজ্জ ব্যবসা অব্যাহত রাখতে সহযোগিতা করতে হবে। সেই হজ্জ ব্যবসার জন্যে নতুন স্থাপনা তৈরি করতে মুহাম্মদের স্মৃতিচিহ্ন ভাঙাও অব্যাহত থাকবে। ইবনে তাইমিয়ার ঢিলা স্ক্রু টাইট দিয়ে কতোকিছু করা সম্ভব সৌদি সালাফিরা তা দেখিয়ে দিয়েছে। পুঁজিবাদী দুনিয়ায় আল্লাহর লীলা বোঝা বড় দায়।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

১৪ thoughts on “ইবনে তাইমিয়ার ঢিলা স্ক্রু ও সালাফিদের উত্থানের ইতিহাস

  1. সালাফিদের উত্থানের ইতিহাস
    সালাফিদের উত্থানের ইতিহাস জানা ছিল না। অসংখ্য ধন্যবাদ পারভেজ ভাই। পারভেজ ভাইয়ের ইতিহাস বিষয়ক লেখাগুলো নিয়ে একটা ই-বুক বানানোর প্রস্তাব দিলাম ইস্টিশন কর্তৃপক্ষকে।

  2. আপনার মাধ্যমে ইতিহাসের অনেক
    আপনার মাধ্যমে ইতিহাসের অনেক কিছু জানতে পারছি। আপনার এই ধরনের পোস্ট অব্যাহত থাকুক। ই-বুক করার প্রস্তাবটি মাস্টার সাহেব ভেবে দেখতে পারেন। চমৎকার প্রস্তাব।

  3. খুব গবেষনালব্ধ একটা লেখা তা
    খুব গবেষনালব্ধ একটা লেখা তা বোঝা যাচ্ছে।অসাধারন ধন্যবাদ পারভেজ ভাই এই লেখাটির জন্য।আপনার জন্যই অাজ ইতিহাস সম্বন্ধে জানতে পারছি।

  4. পারভেজ ভাই কে ধন্যবাদ। সাল
    পারভেজ ভাই কে ধন্যবাদ। সাল ফি দের উত্থান নিয়ে আগেই পড়েছিলাম। আপ্নার সুন্দর উপ স্থাপ না পড়তে ভাল লাগ্ল। সালাফি সৌদিয়া সরকার যে যে স্মৃতিচিহ্ন ধ্বংস করেছে তার সঠিক ইতিহাস।
    মসজিদ:
    ১) সাইয়্যিদুশ শুহাদা হযরত হামজা রদ্বিয়াল্লাহু
    তায়ালা আনহু’র ঐতিহাসিক মসজিদ ও মাজার শরীফ।
    ২) হযরত ফাতিমাতুজ জাহরা রদ্বিয়াল্লাহ
    তায়ালা আনহা ঐতিহাসিক মসজিদ।
    ৩) আল মানরাতাইন মসজিদ।
    ৪) নবী করিম সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার
    সম্মানিত বংশধর হযরত জাফর ইবনে ছদ্বিক রহমতুল্লাহি’র
    পুত্র হযরত আলী আল উরাইদি রহমতুল্লাহি মসজিদ
    এবং মাজার শরীফের গম্বুজ। ২০০২ সালের ১৩ আগস্ট
    তা ডিনামাইট দিয়ে ধ্বংস করা হয়।
    ৫) খন্দকের ময়দানে ৪টি ঐতিহাসিক মসজিদ।
    ৬) আবু রাশিদ মসজিদ
    ৭) হযরত সালমান ফারসী রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু
    মসজিদ, মদীনা শরীফ।
    ৮) রাজত আল শামস মসজিদ, মদীনা শরীফ।
    মাজার শরীফ:
    ১) জান্নাতুল বাক্বি, মদীনা শরীফ। যেখানে প্রায় ৭
    হাজার সাহাবীর মাজার শরীফ বিদ্যামান ছিলো।
    ১৯২৫ সালের ৮ই শাওয়াল সউদ ইহুদীরা জান্নাতুল
    বাকিতে হামলা ও লুটপাট চালায়। তারা নবীজির
    পবিত্র বংশধর এবং সম্মানিত সাহাবীগণের পবিত্র
    মাজার শরীফগুলো সাথে জঘণ্যধরনের বেয়াদবি করে।
    (নাউযুবিল্লাহ)।
    ২) জান্নাতুল মুয়াল্লা, মক্কা শরীফ।
    সেখানে নবীজির পারিবারিক অতি ঘনিষ্টজনদের,
    যেমন: নবীজির সম্মানিত পূর্বপুরুষ এবং উম্মুল মু’মীনিন
    হযরত খাদিজাতুল কুবরা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহা
    ‘র পবিত্র মাজার শরীফ ছিলো। ১৯২৫ সালে এ
    পবিত্রস্থান ধ্বংস করে সউদী ইহুদীরা।
    ৩) নবীজি সম্মানিত আব্বাজানের পবিত্র মাজার
    শরীফ ধ্বংস করা হয়।
    ৪) নবীজির সম্মানিত আম্মাজানের পবিত্র মাজার
    শরীফ ধ্বংস করা হয় ১৯৯৮ সালে।
    ৫) নবীজির সম্মানিত বংশধর হযরত মুসা কাজিম
    রহমতুল্লাহির সম্মানিত আম্মাজান এবং হযরত জাফর
    ছাদিক রহমতুল্লাহি’র সম্মানিত স্ত্রী’র পবিত্র মাজার
    শরীফ ধ্বংস করা হয়।
    ৬) উহুদের ময়দানে শহীদান সাহাবীগণের পবিত্র
    মাজার শরীফ ধ্বংস করা হয়।
    ৭) ১৯৭৫ সালে জেদ্দায় সকল মানুষের মাতা হযরত
    হাওয়া আলাইহাস সালামের সম্মানিত রওজা শরীফ
    ধ্বংস এবং সিলগালা করে দেয়া হয়।
    ঐতিহাসিক সম্মানিত স্থান সমূহ:
    ১) নবীজি যে পবিত্র ঘরে জন্মগ্রহণ করেছিলেন।
    ২) হযরত খাদিজাতুল কুবরা রদ্বিয়াল্লাহু
    তায়ালা আনহার উনার পবিত্র ঘর। যেখনে জন্ম গ্রহণ
    করেন সম্মানিত নবী কন্যা হযরত ফাতিমাতুজ
    জাহরা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহা এবং সম্মানিত
    নবী পুত্র হযরত কাসিম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু।
    ৩) হিজরতের
    পরে নবীজি মদীনা শরীফে যে ঘরে গিয়ে অবস্থান
    করেছিলেন।
    ৪) দ্বার-ই-আরকাম, ইসলামের প্রথম শিক্ষাকেন্দ্র।
    ৫) সম্মানিত নবীপূত্র হযরত ইব্রাহীম রদ্বিয়াল্লাহু
    তায়ালা আনহু’র পবিত্র জন্মস্থান।
    ৬) নবীজির সম্মানিত বংশধর হযরত জাফর ছাদিক
    রহমতুল্লাহির পবিত্র ঘর।
    ৭) হযরত আলী রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু’র পবিত্র ঘর,
    যেখানে হযরত ইমাম হাসান রদ্বিয়াল্লাহু এবং হযরত
    ইমাম হুসাইন রদ্বিয়াল্লাহু জন্মগ্রহণ করেন।
    উল্লেখ্য, প্রায় ১৩০০ বছর ইসলাম
    একভাবে চলে আসছিলো। কিন্তু ১৯২৫ সালে ব্রিটিশ
    সহযোগীতায় সউদী ইহুদীরা ক্ষমতায় বসার পর তাদের
    ফতওয়া বিভাগ থেকে অপব্যাখ্যামূলক
    ফতওয়া দিতে থাকে এবং এ জঘন্য অপকর্মে লিপ্ত হয়। এই
    জঘন্য কর্মের মাধ্যমে তারা একদিক থেকে সম্মানিত
    ব্যক্তিদের সাথে বেয়াদবি করে,
    অন্যদিকে মুসলমানদের ইতিহাস-ঐতিহ্যশূণ্য
    করে ফেলে।
    বলাবাহুল্য মুসলমানদের কেন্দ্রস্থালে আসন
    গেড়ে ফেলা এ ইহুদীদের বিরুদ্ধে অনেক আগেই
    জিহাদ করা ফরজ ছিলো। কিন্তু আফসুস মুসলমানদের জন্য,
    যারা জ্ঞানের অভাবে এখনও গাফ

  5. ইমাম আবু হানিফা প্রায় প্রচলিত
    ইমাম আবু হানিফা প্রায় প্রচলিত প্রায় ৬ লাখ হাদিস পরীক্ষা করেন এবং মাত্র তিন হাজার হাদিসের প্রামাণ্যতার ব্যাপারে নিঃশংসয় হন।এবং হানাফি মাজহাব অনুযায়ী কিয়াসের ব্যাপারে যেখানে পরিস্থিতি অনুযায়ী কোরান হাদিসের বর্হিভুত সমস্যার ব্যাপারে প্রজ্ঞা ব্যবহারের অনুমতি আছে সেইখানে সালাফি কিংবা হাদীসপন্থীরা কুরান সুন্নাহর বাইরে সবকিছুকে বাতিল ঘোষনা করে।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

− 2 = 6