জলবায়ু পরিবর্তনে দেশের ৩ কোটি মানুষ হুমকির মুখে, অবশেষে জরীপ শুরু

জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। শিল্পোন্নত দেশগুলোর কলকারখানা থেকে নির্গত কার্বন বায়ুমণ্ডলে প্রভাব ফেলায় পৃথিবী উষ্ণ হয়ে যাচ্ছে। যার ফলে আবহাওয়ার বদলে প্রতিনিয়তই বাংলাদেশে ধেয়ে আসছে আইলা, সিডর ও মহাসেনের মতো ঘূর্ণিঝড়। অসময় খরা, বন্যা, অতিবৃষ্টি দেখা দিচ্ছে। অথচ এসব প্রাকৃতিক দুর্যোগে এ পর্যন্ত ক্ষয়ক্ষতির ফলে বাংলাদেশের কী পরিমান আর্থিক ক্ষতি হয়েছে এ সম্পর্কে কোন তথ্য নেই সরকারের কাছে। স্বাধীনতার পর এখন পর্যন্ত দেশে ঘূর্ণিঝড় ও বন্যার ক্ষয়ক্ষতি নিয়ে কোনো জরিপও হয়নি। এমনই মত জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক আন্তঃসরকার সংস্থা বা আইপিসিসি ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকসহ (এডিবি) সকলের।

এর পরিপ্রেক্ষিতে প্রথমবারের মতো জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব নিয়ে জরিপ শুরু করেছে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস)। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সুনির্দিষ্ট ক্ষয়ক্ষতির পরিমান জানা থাকলে, জলবায়ু ক্ষতিগ্রস্ত দেশ হিসেবে উন্নত দেশগুলোর কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ আদায়টা সহজ হবে। সুনির্দিষ্ট তথ্য ও গবেষনার ভিত্তিতে জলবায়ু পরিবর্তনকারী দেশগুলোর কাছে তখন নির্দিষ্ট ক্ষতিপূরণ চাইতে পারবে বাংলাদেশ।

জলবায়ু সর্ম্পকিত বিভিন্ন তথ্য মতে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে দেশে ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, অতিবৃষ্টি, বন্যা, আকস্মিক বন্যা, জলমগ্নতা লেগেই আছে। এসব কারণে নদীভাঙন, ভূমিধস, লবনাক্ততা এবং রোগ-ব্যাধিও বেড়ে গেছে। কৃষি উৎপাদনে এর প্রভাব পড়ছে। একই সঙ্গে মানুষের অর্থনৈতিক ও সামাজিক অবস্থার ব্যাপক পরিবর্তন ঘটছে। কিন্তু জনজীবনে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব বিষয়ে কোনো তথ্য নেই। এ কারণে সঠিকভাবে পরিকল্পনা প্রণয়ন করা সম্ভব হয় না। দারিদ্র্য নিরসনে যেসব সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি নেওয়া হয়, তাতেও তেমন সুফল মেলে না। এসব বিষয় বিবেচনায় এই জরিপের সিদ্ধান্ত।

বিবিএস সূত্রে জানা যায়, জরিপটি পরিচালিত হবে তিন বছর মেয়াদে। গত এপ্রিল থেকে এর প্রাথমিক কাজ শুরু হয়েছে। উপকূলীয় অঞ্চলসহ দেশের সব জেলা থেকে তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করা হচ্ছে। ৬৪ জেলায় সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত মৌজা বা মহল্লা বাছাই করা হয়েছে সাড়ে চার হাজার। এই সাড়ে চার হাজার মৌজা বা মহল্লা থেকে দৈব চয়নের ভিত্তিতে দেড় লাখ পরিবারের ওপর জরিপ পরিচালিত হবে। ২০১৬ সালের জুনে ফলাফল ঘোষণা করা হবে বলে জানিয়েছেন কর্মসূচির সমন্বয়ক। তিনি জানান, বন্যা, জলমগ্নতা, ঘূর্ণিঝড়, টর্নেডো, জলোচ্ছ্বাস, বজ্রপাত, নদী ও উপকূলীয় অঞ্চলে ভাঙন, ভূমি ধস, লবনাক্ততা, খরা এই ১০টি দুর্যোগের ওপর জরিপটি পরিচালিত হবে।

সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত মৌজা বা মহল্লা নির্বাচিত করা হয়েছে ঢাকা বিভাগে (১২৭৪টি), দ্বিতীয় সর্বোচ্চ খুলনা বিভাগে (৭৩৮টি) ও তৃতীয় সর্বোচ্চ চট্টগ্রাম বিভাগে ৭২৫টি। এছাড়া রাজশাহীতে ৭১৮টি, রংপুরে ৫৭১টি, বরিশালে ৪৯২টি এবং সিলেট বিভাগে ৪২৭টি মৌজা বা মহল্লার ওপর এই জরিপ পরিচালিত হবে। জানা গেছে, শিল্প কারখানার কারণে বিশ্বব্যাপী বর্তমানে যে হারে কার্বন নির্গমন, তাপমাত্রা, এবং পরিবেশ দূষণ বাড়ছে, তাতে হিমালয়ে দ্রুত বরফ গলে যাচ্ছে। এ কারণে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতাও বাড়ছে। লবনাক্ত পানি ফসল নষ্ট করছে।

কর্মসূচির সমন্বয়ক রফিকুল ইসলাম বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে কৃষি খাত। কিন্তু এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য উপাত্ত নেই। এই জরিপের মাধ্যমে ধান, আলু, গম, ভুট্টা, ডাল, ফলমূল, পাট ও আখের কি পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতি হয়, তার হিসাব নিরুপণ করা সম্ভব হবে। এছাড়া প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে বসত ভিটা, বাগান, ফসলাধীন জমি, পতিত জমি এবং কলকারখানার জমির ক্ষতির পরিমাণও বের করা হবে।

এদিকে বাংলাদেশের জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব নিয়ে গত ০৭ আগস্ট’১৪ আইপিসিসি তাদের পঞ্চম মূল্যায়ন প্রতিবেদন প্রকাশ করে। তাতে বলা হয়, কার্বন নির্গমনের কারণে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা যেভাবে বাড়ছে, তাতে ২০৫০ সাল নাগাদ দেশে সাড়ে তিন কোটি মানুষ উদ্বাস্তু হবে। হুমকির মধ্যে পড়বে খাদ্য নিরাপত্তা। দারিদ্র্যের পাশাপাশি বৈশ্বিক তাপমাত্রা পাঁচ থেকে সাত ডিগ্রি বেড়ে যাবে।

এদিকে গত মঙ্গলবার প্রকাশিত এডিবির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তনের বর্তমান ধারা অব্যাহত থাকলে ২০৫০ সাল নাগাদ বাংলাদেশের জাতীয় আয়ের ক্ষতি দুই শতাংশ এবং একুশ সালে তা বেড়ে ৯.৪ শতাংশ হতে পারে। এডিবি বলছে, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর একটি বাংলাদেশ। ঝুঁকিতে আছে বাংলাদেশের উপকূলের ৪৭ হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকা এবং সাড়ে তিন কোটিরও বেশি মানুষ। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা এক মিটার বেড়ে গেলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে খুলনা অঞ্চলের মানুষ। রাজধানীর ১৪ ভাগ এলাকা তলিয়ে যাবে। এতে করে এখানকার প্রায় দেড় কোটি মানুষের জীবন হুমকির মধ্যে পড়বে। এছাড়া খারাপ আবহাওয়া এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে ক্ষতির মুখে পড়তে পারে বন ও কৃষি জমি এবং বিশ্বের সবচেয়ে বড় ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন। আর বন্যা, ঘুর্ণিঝড় ও অনাবৃষ্টিতে ধান, গম আর আলুর ফলন দুই তৃতীয়াংশে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করছে ম্যানিলাভিত্তিক এই সংস্থাটি।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

৩ thoughts on “জলবায়ু পরিবর্তনে দেশের ৩ কোটি মানুষ হুমকির মুখে, অবশেষে জরীপ শুরু

  1. বন্যা, জলমগ্নতা, ঘূর্ণিঝড়,
    বন্যা, জলমগ্নতা, ঘূর্ণিঝড়, টর্নেডো, জলোচ্ছ্বাস, বজ্রপাত, নদী ও উপকূলীয় অঞ্চলে ভাঙন, ভূমি ধস, লবনাক্ততা, খরা এই ১০টি দুর্যোগের ওপর জরিপটি পরিচালিত হবে——– খুব ভাল উদ্যোগ ।

    বিভিন্ন এনজিও ও বেরকারি সংস্থা কিছু ছোট পর্যায়ে কিছু বিষয়ে জরিপ চালিয়ে জাছিল ।

  2. আমার কেন জানি মনে হয় আমাদের
    আমার কেন জানি মনে হয় আমাদের দেশের মানুষ জলবায়ুর প্রভাব নিয়ে খুব একটা চিন্তিত নয়। তাদের হয়তো ধারনা এর প্রভাব আমাদের দেশে পড়বে না অথবা বিজ্ঞানীরা ভোজবাজির মতো কিছু একটা করবে আর সব সমাধান হয়ে যাবে। জলবায়ুর ক্ষতিকর প্রভাবের কারনে প্রাপ্ত ট্যাকা পয়সা কি আমাদের আদৌ কোন উপকারে আসবে?

  3. জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে অন্যতম
    জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে অন্যতম ক্ষতিগ্রস্থ দেশ হল বাংলাদেশ অথচ এ বিষয়ে আমাদের নির্লিপ্ততা ভবিষ্যতে ভয়াবহ পরিণাম ডেকে আনবে

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

11 − 8 =