ইহুদি জাতির ইতিহাস ও একেশ্বরবাদ

[ পাঠ প্রবেশ : প্রকাশিত: অনুষ্টুপ, কোলকাতা, Vol. XXXI, সংখ্যা -৪, ১৯৯৭। লিখেছেন : মর্ত্তুজা খালেদ। মূল শিরোনাম : একেশ্বরবাদের উদ্ভব : ওল্ড টেস্টামেন্ট-এর আলোকে। উল্লেখ্য যে, এই লেখাটি থেকে হুবহু কপে পেস্ট মেরে এর আগে এই ব্লগে এবং পরে অন্য একট ব্লগে ডা. লজিক্যাল বাঙালি নামক এক ব্লগার অনেকগুলো পোস্ট দিয়েছেন। তার পোস্টগুলো পড়ে কোথাও মূল লখকের নাম স্বীকারোক্তি পাইনি। মূল লেখক এখানে মূলত বাইবেলীয় ধারাবাহিকতা অক্ষুণ্ণ রেখে ইতিহাস বর্ণনা করেছেন। যদিও বাইবেলীয় ইতিহাসকে আবার প্রত্নতত্ত্ববিদেরা অনেক ক্ষেত্রে বাতিল করে দিয়েছেন।]

বিশ্বের ধর্ম-বিশ্বাসীদের বড় অংশ একেশ্বরবাদে বিশ্বাসী। পৃথিবীর অন্যতম তিনটি গুরুত্বপূর্ণ সেমেটিক ধর্ম হিব্রু, খৃস্টান ও ইসলামের মূল বৈশিষ্ট্য হলো একেশ্বরবাদ। একেশ্বরবাদ প্রথম দেখা যায় হিব্রু ধর্মে পরবর্তী দু’টি ধর্ম এই বৈশিষ্ট্য অর্জন করেছিল উত্তরাধিকার সূত্রে। হিব্রু ধর্মেই প্রথম প্রকাশ করা হয় যে, “ঈশ্বর কোন বিমূর্ত ধারণা নয়, তা হলো এক জীবন্ত বিষয়।”১ হিব্রুগণ ইসরাইলি, ইহুদি ও জুডান এবং হিব্রু ধর্ম ইহুদি ধর্ম বা জুডাইজম নামেও পরিচিত। প্রায় দেড় হাজার খ্রিস্ট পূর্বাব্দে মধ্যপ্রাচ্যে ইহুদিগণ ছিল ক্ষুদ্র ও দুর্বল জনগোষ্ঠীর মানুষ যারা বারে বারে ভিন্ন জনগোষ্ঠীর দ্বারা নির্যাতিত ও নিপীড়িত হয়েছে। তারা বিশ্বের ইতিহাসে যুদ্ধ, কূটনীতি, স্থাপত্য বা শিল্পক্ষেত্রে খুব সামান্যই অবদান রেখেছে কিন্তু নীতিশাস্ত্র ও ধর্মীয় ক্ষেত্রে ইহুদিগণ যে ভূমিকা রাখে তা অভূতপূর্ব। বস্তুত রাজনৈতিক শক্তিতে এত দুর্বল আর কোনো জনগোষ্ঠী পৃথিবীর ইতিহাসকে এতটা গভীরভাবে প্রভাবিত করেনি, যতটা করেছিল হিব্রুগণ।২

হিব্রু বা ইহুদিগণ বিশ্বে প্রথম একেশ্বরবাদের বাণী প্রচার করেছিল। কিন’ তারা প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকেই একেশ্বরবাদী ছিল না। একেশ্বরবাদের ধারণায় তারা উপনীত হয়েছিল কয়েক শত বছরের দীর্ঘ এক প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে। হিব্রু জাতির ইতিহাসের সাথেই অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িয়ে আছে তাদের ধর্মগ্রন্থ ওল্ড টেষ্টামেন্ট। এই গ্রন্থে ধারাবাহিকভাবে বর্ণিত হয়েছে ইহুদি জাতির উত্থান, পতন ও বিশ্বাসের কাহিনী। বস্তুত ইহুদি বা হিব্রু ধর্ম সম্পর্কে কিছু বলতে গেলেই অপরিহার্যভাবে এসে পড়ে হিব্রু জনগণের ও তাদের জীবনযাপন প্রণালীর কথা।৩ ইহুদি জনগণকে বাদ দিয়ে তাদের ধর্ম সম্পর্কে বলতে গেলে তা সম্পূর্ণ বলা হয় না। মোটামুটিভাবে খ্রিস্টপূর্ব ১৪০০ থেকে খ্রিস্টপূর্ব ৩৫০ পর্যন্ত ইহুদি জাতির জীবনের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো তুলে ধরা হয়েছে ওল্ড টেষ্টামেন্টে। এই গ্রন্থের অংশ বিশেষ লেখা হয় আরামিক ভাষায় বাকি অংশ হিব্রু ভাষায়। পরবর্তীতে খ্রিস্টধর্মাবলম্বীগণও ওল্ড টেস্টামেন্টকে তাদের ধর্মগ্রন্থ হিসাবে স্বীকৃতি প্রদান করে, এবং এর সাথে যিশুখ্রিস্ট কর্তৃক প্রচারিত বাণীসমূহ যোগ করে। এই উভয় অংশ একত্রে সাধারণভাবে বাইবেল নামে পরিচিত। অবশ্য যিশু কর্তৃক প্রচারিত বাণীসমূহ লিখিত হয়েছিল গ্রিক ভাষায়। আলোচ্য প্রবন্ধে ওল্ড টেস্টামেন্টের উপর ভিত্তি করে ইহুদি জাতির একেশ্বরবাদে উপনীত হবার পর্যায়গুলো তুলে ধরা হয়েছে। কিন্তু এর পরও প্রশ্ন থেকে যায় এই গ্রন্থে প্রাপ্ত সব তথ্যকে কি সত্য বলে গ্রহণ করা যায়? এ বিষয়ে Theophile James Meek এর মন্তব্য প্রণিধানযোগ্য: “All the Biblical tradition cannot be accepted as fact, but facts do lie behind and within the biblical records, and it is the task of the historian to discover facts and give them their true setting”4

হিব্রু ধর্ম গুরুত্বপূর্ণ এইজন্য যে, এই ধর্মেই প্রথমে একেশ্বরবাদের প্রকৃতি ব্যাখ্যা করা হয়েছিল এবং পরবর্তীকালের দুটি গুরুত্বপূর্ণ ধর্ম খ্রিস্টান ও ইসলামে তা অনুসৃত হয়েছে। ইহুদিগণ ঈশ্বরকে যেভাবে দেখেন তা হলো;

ক. বিশ্বজগতের স্রষ্টা একক এক সত্তা;৫
খ. স্রষ্টা সর্বশক্তিমান;৬
গ. স্রষ্টা নিরাকার, তাঁর বস্তুগত কোন আকার নেই;
এ ছাড়া ঈশ্বরের বিধান লঙ্ঘন করলে পাপ হয় এবং পাপের ফলে শাস্তি পেতে হয়, এ ধারণারও বিকাশ ঘটায় হিব্রুগণ। ইহুদি জাতি এই বৈশিষ্ট্যগুলোর বিকাশ ঘটিয়েছিল সুদীর্ঘকালব্যাপী এক বিবর্তন প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে, যার সাথে অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িয়ে আছে এই জাতির ভাগ্য বিপর্যয়ের দীর্ঘ ইতিহাস।

এক
ইহুদি জাতির আদি বাসস্থান ছিল মেসোপটেমিয়া বা বর্তমান ইরাকে। তৎকালীন মেসোপটেমিয়া ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র নগর রাষ্ট্রে বিভক্ত ছিল যারা অধিকাংশ সময়ে একে অন্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত থাকতো। ওল্ড টেস্টামেন্টের ভাষ্য অনুযায়ী ইহুদি জাতির পূর্বপুরুষ আব্রাহম এই মেসোপটেমিয়ার উর নগরের অধিবাসী ছিল।৭ এই পর্যায়ে ইহুদি বা হিব্রু ধর্ম ছিল অন্য সব ধর্মের মতোই প্রকৃতি-পূজারী ও বহু-ঈশ্বরবাদী।৮ দেবতা বা ঈশ্বরগণ ছিল মানুষের মতো আকৃতিবিশিষ্ট। ওল্ড টেস্টামেন্টে উল্লেখ আছে যে, ঈশ্বরগণ মানুষ সৃষ্টি করেছেন তাদের প্রতিমূর্তিতে।৯ এই পর্যায়ে ঈশ্বর মানুষের মুখোমুখি হতো, কথা বলতো। আব্রাহামের পৌত্র জেকবের উপাধি ছিল ইসরাইল, তা থেকে ইহুদি জাতির নাম হয় ইসরাইল।১০ জেকব তাদের দেবতার সাথে যুদ্ধ করে দক্ষতা প্রদর্শন করেন বলে তার নামকরণ করা হয় ইসরাইল বা ঈশ্বরের সাথে যুদ্ধকারী।১১

যাযাবর হিব্রুগণ উর থেকে স্থানান্তরিত হয়ে কানান বা বর্তমান ইসরাইলে বসতি স্থাপন করা শুরু করে। মোটামুটিভাবে ১৪০০ থেকে ১২০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ পর্যন্ত হিব্রুদের এই স্থানান্তরণ প্রক্রিয়া চালু থাকে।১২ কানানে দুর্ভিক্ষজনিত কারণে ইহুদি জাতির একাংশ মিশরে গমন করে। মিশরে প্রাথমিক পর্যায়ে সমাদৃত হলেও পরবর্তীকালে মিশরীয় শাসক ফারাহ-এর নির্যাতনের শিকার হয় তারা। এ বিষয়ে ওল্ড স্টেটমেন্টে বলা হয়েছে; এক নতুন ব্যক্তি মিশরের রাজা হন যার যোসেফ সম্পর্কে কোন ধারণা ছিল না, ফলে হিব্রুগণ বাধ্য হয় বাধ্যতামূলকভাবে শ্রমিকদের কাজে নিয়োজিত হতে।১৩ এই পর্যায়ে ইহুদিদের মাঝে ত্রাণকর্তা হিসাবে আবির্ভূত হন মোজেজ। তার নেতৃত্বে ইহুদিগণ মিশর থেকে পুনরায় কানানে প্রত্যাবর্তন করে। খ্রিস্টপূর্ব ১৩০০-এর দিকে এই প্রত্যাবর্তন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়।১৪ হিব্রুদের এই মিশর থেকে প্রত্যাবর্তনের কাহিনী বর্ণিত হয়েছে ওল্ড স্টেটমেন্টের Exodus বা যাত্রা পুস্তকে। হিব্রুধর্ম বিবর্তনের প্রথম ধাপ অর্জন করে কানানে প্রত্যাবর্তনের নেতৃত্ব প্রদানকারী মোজেজ-এর হাতে।

দুই
মোজেজ হিব্রুদের মধে এই ধারণার প্রচলন করেন যে, ইহুদি জাতির গোত্রীয় দেবতা হলো YHWH ইংরেজীতে যার উচ্চারণ হবে JEHOVAH,১৫ এবং বাংলায় একে ‘যিহোভা’ লিখা যায়। তার আগের যুগে এই নাম ইহুদিদের কাছে অজানা ছিল।১৬ একটি জ্বলন- ঝোপের উপর মোজেজকে দেখা দিয়ে নিজের নাম প্রথমবারের মতো জানান যিহোভা।১৭ সমসাময়িককালে এক এক জাতি এক এক দেবতাদের তাদের নিজস্ব দেবতা বলে মনে করতো, কাজেই মোজেজ কর্তৃক যিহোভাকে ইহুদি জাতির নিজস্ব দেবতা হিসাবে স্বীকৃতি দান খুবই স্বাভাবিক বিষয় ছিল। মোজেজ অন্যান্য দেবতাকে অস্বীকার না করে যিহোভাকে প্রধান দেবতা হিসাবে স্বীকৃতি দিয়ে তার উপাসন করার জন্য ইহুদিদের অনুপ্রাণিত করেন।১৮ দেবতা যিহোভা যে অন্য কোনো দেবতার চাইতে কোনো অংশে কম ক্ষমতাসম্পন্ন নন তা প্রমাণ করতে উদ্যোগী হন।১৯

মোজেজ এর যিহোভা নিরাকার ছিল না, সে মানুষের মতেই দৈহিক আকৃতিবিশিষ্ট ছিল। মিশর থেকে পলায়ন করার সময় লোহিত সাগর অতিক্রম করার পরে যে বিজয়-গাঁথা রচিত হয় সেখানে যিহোভাকে চিত্রিত করা হয়েছে মানব সাদৃশ্য এক সত্তা হিসেবে। এখানে বলা হয়েছে, “হে যিহোভা, তোমার দক্ষিণ হস- শত্রু চূর্ণকারী।২০ আরও বলা হয়েছে “তোমার নাসিকার জলরাশি পুঞ্জীভূত হলো।২১

তিন
অবশেষে হিব্রুগণ মিশর থেকে প্যালেস্টাইনে প্রত্যাবর্তনে সমর্থ হয়। প্যালেস্টাইন তখন অধিকার করে নিয়েছে ফিলিস্তিন জাতি। তাদের সাথে সহ-অবস্থান ও ক্রমান্বয়ে নিজেদের প্রভাব প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে এক পর্যায়ে এখানে হিব্রু রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়। স্যামুয়েল, ডেভিড ও সলোমনের গৌরবময় রাজত্বকাল শেষে ইহুদি জাতি ইসরাইল ও জুডা রাজ্যে বিভক্ত হয়ে পড়ে। এই বিভক্তি আসে খ্রিস্টপূর্বাব্দ ৯৩০ পরবর্তী কোন এক সময়ে। উত্তরে প্রতিষ্ঠিত ইসরাইল রাজ্য ছিল সম্পদশালী। তার ছিল উর্বর ভূমি ও বৈদেশিক বাণিজ্যের দ্বারা অর্জিত সম্পদরাশি। অপর পক্ষে দক্ষিণের জুডা রাজ্য ছিল দরিদ্র। অধিবাসীরা পূর্বের সেই যাযাবর জীবনই যাপন করতো,বাস করতো তাঁবুতে। পক্ষান্তরে ইসরাইল রাজ্যের ইহুদিদের যাযাবর জীবনের অবসান ঘটে। ফলে একই ইহুদি জাতির মধ্যে বৈষম্য দেখা দেয়। একদিকে থাকে সম্পদের প্রাচুর্য অন্যদিকে সীমাহীন দারিদ্র্য। এই পর্যায়ে ইহুদি জাতির মাঝে আবির্ভাব ঘটে একদল সমাজ ও ধর্মসংস্কারকদের, যাদের হিব্রুগণ ‘নবী’ (Nabi) বলে অভিহিত করতো। এই নবীগণ হিব্রুধর্মে গুণগত পরিবর্তন ঘটান। হিব্রুধর্মের বিকাশের পরবর্তী ধাপ সূচিত হয় এই নবীদের হাতে।

‘নবী’ আক্কাদীয় উৎস থেকে উদ্ভুত শব্দ, যার আক্ষরিক অর্থ ডাকা, চিৎকার করা, সেই অনুসারে এর অর্থ কথক বা বাণী প্রদানকারী।২২ সমসাময়িক প্যালেস্টাইনি ও সিরীয় ধর্মে ঐশী বাণী প্রচারের রীতি থেকে ইহুদিদের মাঝে এর প্রচলন হয়।২৩ নবী ঈশ্বরের প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করেন। তার কাজ হলো ঈশ্বরের কী ইচ্ছা তা জনসাধারণের কাছে ব্যক্ত করা, পাগ্যান ধর্মের মতো মানুষের অনুসন্ধিৎসার জবাব দেওয়া নয়।২৪ খ্রিস্টপূর্ব অষ্টম শতাব্দী থেকে ইহুদী জাতির জীবনে একের পর এক যে দুর্বিপাক ও বিপর্যয় নেমে আসে তা থেকে তাদের রক্ষা করতে এগিয়ে আসে এই নবীগণ। বিভিন্ন সময়ে জাতিকে বিপর্যয় থেকে রক্ষা করতে গিয়ে তারা বিভিন্ন ঘটনার ব্যাখ্যা প্রদান করেন। কোনো পরিবর্তনের উদ্দেশ্যে নয়, সংকটময় মুহূর্তে জাতিকে রক্ষা ও ধর্মকে টিকিয়ে রাখার উদ্দেশ্যে এই সব ব্যাখ্যা প্রদান করা হয়েছিল। ইহুদিদের কাছে তিনিই হলেন সত্যিকার নবী যার মন উন্মুক্ত থাকে নতুন ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা থেকে ঈশ্বরের কী ইচ্ছা তা যেন অনুধাবন করতে পারে।২৫ নবীদের নতুন নতুন ব্যাখ্যার ফলে হিব্রুধর্ম এক নতুন রূপ পরিগ্রহ করে।

প্রথম প্রখ্যাত নবী ছিলেন আমোস (Amos), তার জন্মস্থান ছিল জুডান রাজ্যের টিকোয়।২৬ প্রথম জীবনে আমোস ছিলেন মেষপালক। খ্রিষ্টপূর্ব ৭৬০-এ তাঁর আবির্ভাব ঘটে ইসরাইল রাজ্যের বেথেলহাম নগরে। তিনি একই ইহুদি জাতির দুই রাজ্য, জুডা ও ইসরাইলের মধ্যেকার বৈষম্যের বিরুদ্ধে সরব হন। উত্তরের অধিবাসীদের স্বার্থপরতা, হৃদয়হীনতা, দক্ষিণের অধিবাসীদের সাহায্যে তাদের এগিয়ে না-আসার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানান তিনি। আমোস ঘোষণা করেন ইসরাইলিদের এই স্বার্থপরতার পরিণতি হলো তাদের ধ্বংস হয়ে যাওয়া।২৭ তাঁর মতে যিহোভাই হল সব কিছু; মানুষ, পৃথিবী সবই অ-গুরুত্বপূর্ণ। মানুষের কাজ শুধু যিহোভার উপাসনা করা।২৮ প্রখ্যাত মিশরিয় ইতিহাস বিশেষজ্ঞ জে. এইচ, বেরস্টেড-এর মতে, “আমোসের এই সকল ধারণা ছিল সমসাময়িক মিশরিয় ও ব্যবিলনীয় ধর্মের অনুরূপ চেতনা।” ২৯ ইহুদি জাতি এই সময় থেকেই তাদের জাতীয় ইতিহাস লেখা শুরু করে এবং আমোস ছিল হিব্রুদের লেখা সর্বপ্রথম ধর্মগ্রন্থ।৩০

সমাজসংস্কারের পাশাপাশি ধর্মীয় ক্ষেত্রেও আমোস গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন ঘটান। তিনি মানুষ ও যিহোভার মধ্যে সুনির্দিষ্ট পার্থক্য টানেন। আমোস বলেন, যিহোভার কোন বস্তুগত আকার নেই, তাকে শুধু অনুভব করা যায়।৩১ এতদিন পর্যন্ত ইহুদিগণ মনে করতো যিহোভা মানব সাদৃশ্য এক সত্তা, সে ধারণার বিলোপ ঘটিয়ে যিহোভাকে নিরাকার রূপে প্রতিষ্ঠা করেন আমোস। হিব্রুধর্ম পরবর্তী নবী ইসাহ (Isaiah)-i দ্বারা আরও বিকশিত হয়।

চার
হিব্রুজাতির এক ক্রান্তিলগ্নে আবির্ভূত হন ইসাহ। তিনি তাঁর মত প্রচার করেন আনুমানিক ৭২৪ থেকে ৬৮০ খ্রিস্ট পূর্বাব্দ পর্যন্ত। জেরুজালেম যখন অ্যাসিরিও রাজা সিন্নেসিরেব কর্তৃক আক্রান্ত হতে যাচ্ছিল তখন ইসাহ তাঁর বাণী প্রচার করেন।

খ্রিস্টপূর্ব দশম শতাব্দীতে মধ্যপ্রাচ্যে অ্যাসিরিও শক্তির উত্থান ঘটে। দুর্ধর্ষ, নৃশংস এই জাতি একের পর এক মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন জাতিকে পরাস্ত করে বিশাল এক সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করে। ৯১০ খ্রি. পূর্বাব্দে ব্যাবিলনের পতন ঘটে তাদের হাতে এবং ৮৭০ খ্রি. পূর্বাব্দের মধ্যে তারা সমগ্র ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চল দখল করে। অ্যাসিরিও সম্রাট তৃতীয় টিগলাথ পাইলসার দামোস্কাস দখল করেন ৭৩২ খ্রি. পূর্বাব্দে। পরবর্তী অ্যাসিরিও সম্রাট পঞ্চম সালমিনিসার ইহুদি রাজ্য ইসরাইল আক্রমণ করেন। ৭২২ খ্রি. পূর্বাব্দে ইসরাইলের রাজধানী সামারিয়ার পতন ঘটে অ্যাসিরিও সম্রাট দ্বিতীয় সারগনের হাতে। ইসরাইলের পতনের পর অধিকাংশ ইহুদিকে এখান থেকে উচ্ছেদ করেন অ্যাসিরিওগণ। দ্বিতীয় সারগন পরবর্তী অ্যাসিরিও সম্রাট সিন্নোসিরেব সম্রাট হন ৭০৫ খ্রি. পূর্বাব্দে। পূর্বসূরিদের অনুসরণ করে তিনিও সাম্রাজ্য সম্প্রসারণে উদ্যোগী হন এবং ইহুদিরাজ্য জুডা দখল করতে এগিয়ে আসেন। দুর্দান্ত অ্যাসিরিওদের হাতে জুডার পতন ছিল এক অবশ্যম্ভাবী বিষয়। এই ধরনের পরিস্থিতিতেই ইসাহ্‌ তাঁর মতবাদ প্রচারে অগ্রসর হন।

এতদিন পর্যন্ত ইহুদিগণ জানতেন তাদের দেবতা যিহোভা সমগ্র প্যালেস্টাইনের দেবতা। এখন তারা উপলব্ধি করতে পারে যে, প্যালেস্টাইন হলো মধ্যপ্রাচ্যের এক ক্ষুদ্র অংশ মাত্র। সুতরাং এই পর্যায়ে ইহুদি মাত্রই সংশয়ে আচ্ছন্ন ছিল, তাদের দেবতার কী ক্ষমতা আছে প্যালেস্টাইনের বাইরের বিশাল পৃথিবীতে, যেখানে বিভিন্ন শক্তিশালী জাতি যুদ্ধরত।৩২ সমগ্র পশ্চিম এশিয়া জয়কারী অ্যাসিরিওদের দেবতা অসুর কি ইহুদিদের দেবতা যিহোভার চাইতে কম শক্তিশালী? বিশাল অ্যাসিরিও সেনাবাহিনী নিয়ে সম্রাট স্বিেসেরাব যখন জুডা রাজ্য আক্রমণে উদ্যত হন তখন অনেকে ইহুদিই ভাবতে শুরু করেছিল এই যুদ্ধ হচ্ছে অ্যাসিরিওদের দেবতা অসুর ও ইহুদিদের দেবতা যিহোভার মধ্যকার যুদ্ধ দুই দেবতা শক্তি পরীক্ষায় মুখোমুখি, জয়-পরাজয়ের মধ্যে দিয়ে নির্ধারিত হবে কে বেশী শক্তিশালী। যুদ্ধে যেহেতু ইহুদিদের পরাজয় প্রায় অবশ্যম্ভাবী ছিল তাই অনেক ইহুদি এই সময় হিব্রুধর্ম ও তাদের দেবতা যিহোভার উপর আস্থা হারিয়ে ফেলেছিল। এই ধর্মীয় সংকট থেকে ইহুদিদের উদ্ধারে এগিয়ে আসেন ইসাহ্‌।

ইসাহ্‌ অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে প্রচার শুরু করেন যে, এই যুদ্ধ যিহোভা ও অসুরের যুদ্ধ নয়। ইহুদি জাতি তাদের প্রভু যিহোভাকে ভুলে গেছে, তারা অন্যায় অনাচার করেছে তাই ইহুদিদের শাস্তি দেবার জন্য যিহোভা অ্যাসিরিওদের পাঠিয়েছেন। এ বিষয়ে সরাসরি ওল্ড টেস্টামেন্ট থেকেই উদ্ধৃতি দেওয়া ভাল, ” …. But they themselves have revolted against me. A bull wel known is buyers, and the ass manager of its owner; Israel has not known, my own people have not behaved understandingly. [Isaiah 1 :2-3]

Woe to the sinful nation, the people heavy with error. an evilding seed, ruinous sons? They have left Jehovah, They have treated the holy one of Israel with disrespect. They have turned backwards. [Isaiah 1 :4]

তাই এই অবাধ্য জাতিকে শাস্তি দেবার জন্য যিহোভা অ্যাসিরিওদের পাঠিয়েছেন। “And he has raised up a signal to a great nation far away, and he has whistled to it at extremity of the earth; and look! in haste it will swifly come in. [Isaiah 5 :26] শাস্তি দেবার জন্য এই অ্যাসিরিও জাতি ইহুদিদের যিহোভার হাতের দন্ডস্বরূপ “Aha, the Assyrian, the rod for my anger, and the stick that is in their hand for my denunciation! . [Isaiah 10 :5]

Against an apostle nation I shall send him, and against the people of my fury. I shall issue a command to him, to take much spoil and to take much plunder and to make it a trampling place like the clay of the street. [Isaiah 10 :6]

সুতরাং ইসাহ যে বাণী প্রচার করেন তার সারমর্ম হলো, যিহোভা-ই একমাত্র ও সত্যিকার দেবতা তিনি শুধু প্যালেস্টাইল নন, সমগ্র বিশ্বের স্রষ্টা। ইহুদি জাতি এই দেবতাকে ভুলে গিয়েছে বলে তিনি অ্যাসিরিওদের পাঠিয়েছেন ইহুদিদের সাজা দেবার জন্য। অ্যাসিরিওগণ সর্বশক্তিমান যিহোভার হাতের দন্ডবিশেষ যা অপরাধীদের শাস্তি দেবার জন্য ব্যবহৃত হচ্ছে। এইভাবে ইসাহ ক্ষুদ্র এক গোষ্ঠী-দেবতা যিহোভাকে সর্বশক্তিমাণ ঈশ্বরে রূপান্তরিত করে বিশ্বে প্রথম একেশ্বরবাদের প্রচলন ঘটান।

শেষ পর্যন্ত অনেকটা আকস্মিকভাবেই হিব্রুগণ অ্যাসিরিওদের হাত থেকে রক্ষা পায়। অবরোধ করে থাকা অ্যাসিরিও সৈন্যশিবিরে প্লেগ দেখা দেয়, ফলে রাতারাতি সেনাবাহিনীর এক বিরাট অংশ মৃত্যুমুখে পতিত হয়। বাধ্য হয়ে সম্রাট সিন্নেসেরাব অবরোধ তুলে নিয়ে বাকি সৈন্যসহ তার রাজধানী নিনেভে প্রত্যাবর্তন করতে এবং সেখানে সে তার পুত্রদের হাতে নিহত হন। এখানে উল্লেখ্য, অ্যাসিরিও শিবিরের ঐ মহামারী যিহোভার অবদান বলে দাবি করা হয়েছে ওল্ড টেস্টামন্টে।৩৩ ইসাহ কর্তৃক প্রবর্তিত একেশ্বরবাদের ভিত্তি আরও দৃঢ় হয় পরবর্তীকালের নবী যিরিমিয়াহ্‌-র হাতে।

পাঁচ
নবী যিরিমিয়াহ্‌-র মতবাদ প্রচারের সময় মোটামুটিভাবে ৬৩৫ থেকে ৫৮৬ খ্রি. পূর্বাব্দ পর্যন্ত ইসাহ্‌-র মতোই ইহুদি জাতির অপর এক বিপর্যয়ের মুহূর্তে আবির্ভূত হন যিরিমিয়াহ্‌। ইতিমধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক অবস্থা পাল্টে গেছে। ৬১২ খ্রি. পূর্বাব্দে শক্তিধর অ্যাসিরিওদের পতন ঘটেছে যৌথ শক্তি মেডেস ও ক্যালিডিয়দের হাতে। অ্যাসিরিওদের স্থলে মধ্যপ্রাচ্যে প্রাধান্য প্রতিষ্ঠা করেছে ক্যালডিয়গণ। তাদের সম্রাট নেবুক্যাডনেজার মধ্যপ্রাচ্যের স্বাধীন রাজ্যগুলি দখল করে ক্রমাগত অগ্রসর হচ্ছেন। ৫৮৬ খ্রি. পূর্বাব্দে তিনি জেরুজালেম অবরোধ করেন। এবার পরাক্রমশালী ক্যালডিয়দের হাতে জেরুজালেমের পরাজয় অবশ্যম্ভাবী। এবারও ইহুদি জাতি পূর্বের মতোই অদৃষ্টনির্ভর হয়ে পড়েছিল। তারা আশা করেছিল হয়তো জিহোভা পূর্বের মতোই তাদের উদ্ধার করবে। এই সংকটময় মুহূর্তে যিরিমিয়াহ্‌ তার মতবাদ প্রচার করেন।

যিরিমিয়াহ্‌ ঘোষণা করেন, হিব্রু জাতি তাদের দেবতা যিহোভাকে ভুলে গিয়ে বৃক্ষ, শিলা প্রভৃতির উপাসনা করছে।৩৪ তাই তাদের শাস্তি দেবার জন্য যিহোভা বিদেশিদের পাঠিয়েছেন। বিদেশিদের হাতে ইহুদিদের পরাজয় অবশ্যম্ভাবী। যিহোভা ইহুদিদের পক্ষে আর নেই বলেই তাদের পরাজিত হতে হবে। ইহুদিদের ব্যাবিলনরাজ নেবুক্যাডনেজারের দাসত্ব করতে হবে।৩৫

যিরিমিয়াহ্‌-র মতে যিহোভা অতিপ্রাকৃত ক্ষমতার অধিকারী। তিনি তাঁর খেয়ালখুশি মতো সব কিছুই করতে পারেন। তিনি যা করেন তা এক জাতির জন্য নয় বিশ্বের সব মানুষের কথাই মনে করে তা করে থাকেন। ইহুদিদের উচিত এই সর্বশক্তিমানের খেয়ালখুশির উপর নিজেদের সমর্পণ করে শুধু তাঁরই আরাধনা করা। এভাবে যিরিমিয়াহ্‌ যিহোভাকে বিশ্বের সব জাতির ঈশ্বর হিসাবে প্রতিষ্ঠা করতে সচেষ্ট হন।

যিরিমিয়াহ্‌-র ভবিষ্যৎ বাণী সত্য হয়। ক্যালডিয়দের হাতে জেরুজালেমের পতন ঘটে ৫৮৫ খ্রি. পূর্বাব্দে। সম্রাট নেবুক্যাডনেজার অধিকাংশ ইহুদিকে বন্দী করে জেরুজালেম থেকে ব্যাবিলনে নিয়ে যায় শ্রমিক হিসাবে ব্যবহার করার জন্য। সেখানে ইহুদিগণ বন্দী থাকে ৫৪৯ খ্রি. পূর্বাব্দ পর্যন্ত। এই ঘটনা ইতিহাসে Babylonian Captivity নামে পরিচিত। হিব্রুধর্মের বিকাশের আরও এক ধাপ সূচিত হয় এই ব্যাবিলনিয় বন্দী দশায়।

ছয়
ব্যাবিলনে ইহুদিদের মতো পারাসিক, আরামিক প্রভৃতি জাতির মানুুষদেরও বন্দী করে রাখা হয়েছিল। ব্যাবিলনে ইহুদিগণ অন্যান্য জাতি, বিশেষ করে পারসিক জরথুষ্টবাদীদের সংস্পর্শে এসে তাদের পাপ-পুণ্য সংক্রান্ত ধারণার ধারা প্রভাবিত হয়। পূর্বে হিব্রুধর্মে পাপ ও শাস্তি সংক্রান্ত ধারণাসমূহ অস্পষ্ট ছিল। মনে করা হতো, যিহোভার বিধান লঙ্ঘন করা পাপ এবং পাপের dj¯^iƒc শাস্তি ভোগ করতে হয়। পাপ ছিল সমষ্টিগত বিষয়, ব্যক্তিবিশেষের কার্যকলাপ পাপ হিসেবে গণ্য করা হতো না।

আগে হিব্রুগণ মনে করতো যিহোভার সাথে তাদের চুক্তি অনুয়ায়ী ইহুদি জাতির প্যালেস্টাইন লাভ করা উচিত। কিন্তু কার্যত ইহুদিগণ বার বার প্যালেস্টাইন থেকে বিতাড়িত হচ্ছিল। জাতির এই ভাগ্য বিপর্যয়কে ইহুদিরা যিহোভার বিধান লঙ্ঘন বা পাপের ফল বলে মনে করতো। তারা ভাবত যথার্থভাবে তাদের দেবতার বিধান পালন করা হচ্ছে না, ইহুদি জাতি বিভিন্ন প্রকার পাপ করছে বলেই এইসব বিপর্যয় ঘটছে। কিন্তু বাস্তবে দেখা যেত, যারা দুরাচারী তারাই ভাল থাকছে। ইসরাইলের রাজা দ্বিতীয় যিরোবোয়াস ও জুডার রাজা মানাসাহ অধার্মিক হওয়া সত্ত্বেও দীর্ঘকাল রাজত্ব করেন এবং জুডার রাজা যোশিয়াহ ধার্মিক হওয়া সত্ত্বেও যুদ্ধে নিহত হন। ফলে পরবর্তীকালে হিব্রু নবীগণ পূর্বের পাপ-পুণ্য সংক্রান্ত বিধান সম্পর্কে সন্দিহান হয়ে পড়ে।

এই সময় ইহুদিগণ নতুন ব্যাখ্যা খোঁজেন ইহুদি জাতির ভাগ্য বিপর্যয়ের। এই সময়ে ইহুদি নবীগণ প্রচার শুরু করেন যে, হিব্রুগণ যিহোভা নির্বাচিত জাতি, যাদের উদ্দেশ্য হচ্ছে সারা বিশ্বে যিহোভার বাণী পৌঁছে দেওয়া। বার বার বিভিন্ন বিপর্যয় সৃষ্টি করে যিহোভা ইহুদি জাতিকে পরীক্ষা করে দেখছেন- এ কাজের তারা কতটা উপযুক্ত? ব্যাবিলনীয় বন্দীদশা ও তৎপরবর্তীকালের নবীগণ এই মতবাদের ব্যাপ্তি ঘটান। এ বিষয়ে অগ্রণী ছিলেন দ্বিতীয় ইসাহ্‌।

দ্বিতীয় ইসাহ্‌ তাঁর মত প্রচার করেন সেই সময়ে যখন ইহুদিদের ব্যাবিলিনিয় বন্দী জীবনের অবসান ঘটতে চলেছিল। এই সময়ে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন আরো এক শক্তি পারস্যের উত্থান ঘটতে চলেছিল, যাদের হাতে ক্যালডিয় সাম্রাজ্য ও তার রাজধানী ব্যাবিলনের পতন অবশ্যম্ভাবী ছিল। দ্বিতীয় ইসাহ শুধু শেষ মহান নবী ছিলেন না, তিনি শ্রেষ্ঠ নবীদের একজন ছিলেন। ওল্ড টেস্টামেন্টের ইসাহ পর্বের ৪০ থেকে ৫৫তম অধ্যায় পর্যন্ত তাঁর লেখা এবং ৫৬ থেকে ৬৬তম অধ্যায় অপর কোন এক বা একাধিক ব্যক্তির লেখা।৩৭

দ্বিতীয় ইসাহ্‌ প্রচার করা শুরু করেন যে, হিব্রুগণ যিহোভার নির্বাচিত জাতি।৩৮ বিভিন্ন বিপর্যয় সৃষ্টি করার মাধ্যমে যিহোভা এই জাতিকে পরীক্ষা করে দেখছেন, ইহুদি জাতি তাদের কর্তব্য সফলভাবে পালনে সক্ষম হয় কিনা। তিনি আরও প্রচার করেন, ইহুদিরা যদি তাদের কর্তব্য সফলভাবে পালন করে তবে বিশ্বে এক সময় ন্যায়ের রাজ্য প্রতিষ্ঠিত হবে।৩৯ এই ন্যায়ের রাজ্য প্রতিষ্ঠা করবেন ম্যাসায়া (Messia)| হিব্রু জাতির উচিত এই ম্যাসায়া-এর আবির্ভাবের পটভূমি তৈরী করে যাওয়া। অবশ্য এই ধারণা তৈরীতে সাহায্য করেছিল ওল্ড টেস্টামেন্টের দু’টি শ্লোক : ….. Look! The maiden herself will actually become pregnant. and she is giving birth to a son and she will certainly call his name Immanuel. Butter and honey he will eat by the time he knows how to reject the bad and choose the good. [Isaiah 7 : 14-15] মূলত পাপ ও শাস্তি সংক্রান্ত জটিল সমস্যা এই হিব্রু নবীকে বাধ্য করেছিল ম্যাসায়া সংক্রান্ত সিদ্ধান্তে উপনীত হতে।

দ্বিতীয় ইসাহ্‌ একেশ্বরবাদকে আরও সুসংহত করেন। তিনি ইসরাইলিদের জোরালোভাবে প্রচার করেন যে, যিহোভা সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী এবং শুধুমাত্র তিনিই ঈশ্বর। তাঁর ভাষায়, “তিনিই প্রথম, তিনিই শেষ, যিহোভা ছাড়া অপর কোনে ঈশ্বর নেই।”৪০ “যিহোভা এই ব্যাহিক পৃথিবীর স্রষ্টা।”৪১ “সারা বিশ্বের সকল জাতির তিনিই স্রষ্টা। কোন জাতির উত্থান ও পতন তাঁর কাছে তুচ্ছ এক বিষয়।”৪২ ওল্ড টেস্টামেন্টে দ্বিতীয় ইসাহ-ই সর্বপ্রথম অবিসংবাদিতভাবে একেশ্বরবাদের কথা প্রচার করেন। ৪৩ এ বিষয়ে Caluin Keene-Gi মন্তব্য উল্লেখ্য, “…. Second Isaiah as the prophet who gave the clearest and most precise meaning and expression regarding a spiritual conception of Monotheism.” ৪৪ এভাবে দ্বিতীয় ইসাহ ইহুদি জাতিকে তাদের নির্যাতন ভোগ করার ব্যাখ্যা ও একেশ্বরবাদকে আরো দৃঢ় ভিত্তির উপর দাঁড় করিয়ে হিব্রুধর্মের ক্ষেত্রে অবদান রেখে গেছেন।

কিন্তু দ্বিতীয় ইসাহ্‌-র ব্যাখ্যাতেও সমস্যা থেকে যায়। তাঁর ব্যাখ্যায় ব্যক্তিবিশেষকে বা তার কর্মকে মূল্যায়ন করা হয় না। ব্যক্তি জীবনে নৈতিকতার গুরুত্ব কতখানি? ব্যক্তি জীবনে সৎকর্মে কি গুরুত্ব পাবে না? এই জাতীয় প্রশ্নের জবাব এতে পাওয়া যায় না। এই সমস্যার সমাধান করেছিলেন ব্যাবিলনীয় বন্দীদশাকালীন অন্য নবী ইজিকেল।

সাত
ইহুদি জাতি ব্যাবিলনে নির্বাসনকালীন সময়েই ইজিকেল তাঁর মতবাদ প্রচার করেছিলেন। পাপ-পুণ্য ছিল এতদিন ইহুদি জাতির কাছে সমষ্টিগত এক বিষয়। জরথুষ্টরদের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে তা ব্যক্তিগত বিষয় বলে প্রচার করেন ইজিকেল। তাঁর মতে, “A son himself will bear nothing because of the error of the father, and a father himself will bear nathing because of the error of the son. Upon his ownself the very righteousness of the righteous one will come to be, and upon his own self every wickedness of a wicked one will come to be. [Ezekiel 18:20].

এভাবে ইজিকেল পাপকে ব্যক্তিগত বিষয় হিসেবে চিহ্নিত করে হিব্রুধর্মের ক্ষেত্রে আরো এক নতুন মাত্রা সংযোজন করেন। কিন্তু পাপ-পুণ্য এলেই অপরিহার্যভাবে এসে পড়ে পাপের শাস্তি ও পুণ্যের পুরস্কারের বিষয় বা মৃত্যুপর্ববর্তী জীবনের প্রশ্ন। এই বিষয়গুলি সম্পর্কে কোনো স্পষ্ট মত ওল্ড টেস্টামেন্টে পাওয়া যায় না। ওল্ড টেস্টামেন্টের দুই জায়গায় ইসাহ ২৬: ১৯ ও দানিয়েল ১২: ২-৩-এ মৃত্যুর পরে জীবন থাকতে পারে বলে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। খ্রিষ্টিয় প্রথম শতাব্দীতে ইহুদিগণ মূলত দু’টি গোষ্ঠীতে বিভক্ত হয়ে পড়েছিল। ফেরেসী (pharices) গোষ্ঠী বিশ্বাস কতো মৃত্যু পরবর্তী জীবনে। অপর দিকে সাজেমী (Sadducees) গোষ্ঠী মৃত্যুর পরে কোন জীবন নেই বলে মনে করতো। পরবর্তীতে ইহুদি পরিবারে জন্মগ্রহণকারী যিশু হিব্রুধর্ম তত্ত্বের সাথের জুরথুষ্ট মতবাদের সমন্বয় করে তাঁর মতবাদ প্রচার করেছিলেন। তিনি মৃত্যু-পরবর্তী জীবন, পাপ-পুণ্য, স্বর্গ-নরক ও শয়তানের ধারণার সাথে হিব্রু ঐতিহ্যের সমন্বয় সাধন করেন।৪৫ তিনি নিজেকে ওল্ড টেস্টামেন্টের ম্যাসায়া বলে দাবি করে তাঁর মতবাদ প্রচার করেছিলেন। খ্রিস্টান ধর্ম হিব্রু ধর্মের অনেক অমীমাংসিত তাত্ত্বিক প্রশ্নের জবাব দিয়েছিল।

উপসংহার
সুতরাং আমরা দেখি যে, ইহুদিগণ প্রথমে মেসোপটেমিয়ার অন্যান্য জাতির মতোই বহু ঈশ্বরবাদে বিশ্বাসী ছিল। মোজেজ ইহুদিদের মধ্যে এই ধারণার উন্মেষ ঘটান যে, যিহোভা তাদের জাতির নিজস্ব দেবতা।৪৬ মোজেজ-এর ঈশ্বর যিহোভা ছিল মানব আকৃতিবিশিষ্ট সত্তা। পরবর্তীতে খ্রি. পূর্ব অষ্টম থেকে পঞ্চম শতাব্দী পর্যন্ত হিব্রু জাতির বিভিন্ন বিপর্যয়ের সময় যেসব নবীর আবির্ভাব ঘটে তাঁরা এই ধর্মের আরও বিকাশ সাধন করেন।

আমোস, সিরিমিয়াহ, ইসাহ, দ্বিতীয় ইসাহ, ইজিকেলসহ আবির্ভূত অনেক নাম না জানা ইহুদি নবী এই ধারণাই প্রতিষ্ঠা করেন যে, তাঁদের দেবতা যিহোভা সর্বশক্তিমান নিরাকার, তিনি সীমাহীন ক্ষমতার অধিকারী ও সমগ্র বিশ্ব-জগতের তিনিই স্রষ্টা। এভাবে বিশ্বে প্রথম একেশ্বরবাদের উদ্ভব ঘটে হিব্রুধর্মে। এছাড়াও হিব্রুগণ পাপ-পুণ্য সংক্রান্ত ধারণার বিকাশ ঘটিয়েছিল। হিব্রু জাতি তাদের ধর্ম এবং ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রাখার স্বার্থেই ইহুদি নবীগণ বাধ্য হয়েছিল এ জাতীয় মৌলিক সিদ্ধান্তে উপনীত হতে। পরবর্তীকালে ইহুদি ধর্মের এ সকল দর্শন গ্রহণ এবং সেগুলির মধ্যকার অসামঞ্জস্যতা দূর করেছিল খৃষ্টধর্ম। সুতরাং বিশ্বে একেশ্বরবাদ উদ্ভবের কৃতিত্ব ইহুদি জাতির।

টীকা ও তথ্য নির্দেশ
১. Argus, J.B. The Evolution of Jewish Thought; From Biblical Times to the Opening of the Modern Era. London. 1959 P. 13.
২. Wallbank, T.W. & A.M. Taylor. Civilization : Past and Present, Chicago. 1949. P. 79.
৩. Silvar, D.J. & B. Marlin, A History of Judaism Vol. 1, New York, 1963, P.5.
৪. Meek, T. J., Hebrew Origins, Glocester, 1973, P. 2.
৫. Yehezkel, K., The Religion of Israel, From its Biginning to the Babylonial Exile, London, 1961, P. 60.
৬. Ibid.
৭. Genesis 11 : 31.
৮. Genesis 35 : 28.
৯. Genesis 1 : 26-2.
১০. Nicholas D. L. Judaism, New York 1968.
১১. Genesis 32 : 28.
১২. Breasted, J.B. Ancient Time, A History of the Early World, Boston. 1944. P. 220.
১৩. Exodus 1 : 8-11.
১৪. Silvar, D.J.& A. M. Taylor. op cit.
১৫. Breasted, J. B. op cit.
১৬. Yehezkel, K., op cit. P. 222.
১৭. অতঃপর পুনরায় ঈশ্বর মোজেজকে বললেন, “তুমি ইসরাইলের সন্তানদের বলো, “যিহোভা তোমাদের পূর্বপুরুষের ঈশ্বর, তিনি আব্রাহামের ঈশ্বর, তিনি ইসহাকের ঈশ্বর, তিনি জেকবের ঈশ্বর ….।! [Exodus 3 : 15]
১৮. Exodus 7 : 16, 10 : 3.
১৯. Exodus 15 : 11.
২০. Exodus 15 : 6.
২১. Exodus 15 : 8.
২২. Meek, T. J., op cit. P. 150.
২৩. Swain, J. E., A History of World Civilization, New Delhi 1984, p. 89.
২৪. Yehezkel, K., op cit. P. 213.
২৫. Swain, J. E. op cit.
২৬. Amos 1 : 1.
২৭. Amos 1 : 4-15.
২৮. Swain, J. E. Ibid.
২৯. Breasted, J. H. op cit. P. 228.
৩০. Ibid.
৩১. Swain, J. E. op cit.
৩২. Breasted, J. H. op cit. P. 229.
৩৩. Zking 19 : 35-37.
৩৪. “They are saying to tree, ‘you are my father,’ and to a stone, ‘you yourself brought me to birth.’ But to me they have turned the back of the neck and not the face, and in the time of their calamity they will say, Do rise up and save us!” [Jereniha 2 : 27].
৩৫. “And now I myself have given all these land into the hand of Nebuchadnezzar the king of Babylon, my servant, and even the wild beasts of the field I have given him to serve him. [Jereniha 27 : 6].
৩৬. Steward. Easton, Heritage of Past, New York. 1955. p. 125.
৩৭. Keene, J.C., The Western Heritage of Faith and Reason, New York. 1963, p-93.
৩৮. Isaiah 40 : 28.
৩৯. Isaiah 40 : 1-4; 49: 1-6; 50: 4-9; 52: 13; 53: 12.
৪০. Isaiah 44 : 6.
৪১. Isaiah 40 : 28.
৪২. Isaiah 40 : 16.
৪৩. Ackroyd, P.R., Israel Under Babylon and Persia, London. 1970. p. 111,
৪৪. Keene, J.C., op cit, p. 96.
৪৫. Steward, Easton op cit, p. 125.
৪৬. Yehezkel, K., op cit, p. 222.
* টেস্টামেন্টের উদ্ধৃতিগুলো New World Translation of the Holy Scriptures, New York, 1984. থেকে সংগৃহীত। গ্রন্থটি মূল হিব্রু,আরামিক ও গ্রিক ভাষা থেকে আক্ষরিকভাবে ইংরেজিতে অনূদিত।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

৫ thoughts on “ইহুদি জাতির ইতিহাস ও একেশ্বরবাদ

  1. ভালো লেখা। পড়ব। বুকমার্ক করে
    ভালো লেখা। পড়ব। বুকমার্ক করে রাখলাম। লজিক্যাল সাহেব তো এই লেখা দিয়ে ইহুদীদের পক্ষে দাঁড়ানোর যুক্তি বের করেছিলেন। কিন্তু এখানে তো ভূমিকা ও উপসংহারে দেখলাম ভিন্ন উদ্দেশ্য। যাই হোক যার যেটা দরকার, সে তাই খুঁজবে এটাই স্বাভাবিক। আপনাকে ধন্যবাদ।

  2. এই সময় ইহুদিগণ

    এই সময় ইহুদিগণ নতুন ব্যাখ্যা খোঁজেন ইহুদি জাতির ভাগ্য বিপর্যয়ের। এই সময়ে ইহুদি নবীগণ প্রচার শুরু করেন যে, হিব্রুগণ যিহোভা নির্বাচিত জাতি, যাদের উদ্দেশ্য হচ্ছে সারা বিশ্বে যিহোভার বাণী পৌঁছে দেওয়া।

    ওরা জিহোবার বানী প্রচার করেনি কেন?

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

1 + 4 =