গেম অফ ইসলামিক থ্রোন (পর্ব-৩)

উসমান হত্যাকান্ডের সময় আয়েশা ছিলেন মক্কার পথে। জনগণের উপর আয়েশার প্রভাবের কারনে উসমান তাকে মদিনায় থেকে যাওয়ার অনুরোধ করলেও তিনি হজ্জের উদ্দেশ্যে মদিনায় রওয়ানা দেন। খলিফায়ে রাশেদিনের আমলে ইসলামকে ব্যবহার করে নারীদের বিরুদ্ধে পুরুষতান্ত্রিক রাজনীতিতে মুহাম্মদের স্ত্রীরা ছিলেন কেন্দ্রীয় বিষয়। বিশ্বাসীদের মাতা হিসাবে তারা সব নারীদের জন্যে উদাহরণস্বরূপ। তাদের জীবন যাপন নিয়ন্ত্রন করা মানে বাকি নারীদেরকে নিয়ন্ত্রন করা। বিপদের সময় আয়েশা উসমানকে পরিত্যাগ করেছিলেন সত্য, কিন্তু ইসলামের ভেতরে নারী অধিকারের জায়গা থেকে এর বিশেষ গুরুত্ব আছে। নবী মুহাম্মদের জীবদ্দসায় মসজিদ অথবা হজ্জে যাওয়া নিয়ে নারীদের উপর কোন নিষেধাজ্ঞা ছিল না। মদিনার মসজিদে নারীরা পুরুষদের সাথেই নামাজ আদায় করতেন। মাঝখানে কোন দেয়াল বা অন্য কোন পার্টিশনের ব্যবস্থা ছিল না। এখানে উল্লেখ করা দরকার যে মসজিদ সেই সময় শুধু নামাজের জায়গা ছিল না, বরং ধর্ম শিক্ষার কেন্দ্র এবং সামাজিক সংসদ হিসাবেও ব্যবহৃত হতো। মসজিদে যাওয়া মানে সামাজিক কর্মকান্ডের সাথে যুক্ত থাকা। তবে তৎকালিন আরবের পুরুষতান্ত্রিক সমাজ নারীদের মসজিদে যাওয়া সহজভাবে মেনে নিতে পারতো না। বিভিন্ন সময়ে অনেকে মুহাম্মদের কাছে অনুরোধ করেছেন নারীদের মসজিদে যাওয়া নিষিদ্ধ করার জন্যে, কিন্তু তিনি তা করেন নাই। উমর ব্যক্তিগতভাবে তার স্ত্রীদের মসজিদে যাওয়া পছন্দ করতেন না। কিন্তু যেহেতু মুহাম্মদ এই ধরণের নিষেধাজ্ঞা দেয়ার ক্ষেত্রে পরিস্কার আপত্তি জানিয়ে গেছেন তাই খলিফা হওয়ার পরও তিনি নারীদের মসজিদে যাওয়া নিষিদ্ধ করেন নাই। তিনি তার স্ত্রীদের মসজিদে যাওয়া নিয়ে আপত্তি জানিয়েছেন, কিন্তু নিষিদ্ধ করতে পারেন নাই। শেষ পর্যন্ত নারী ও পুরুষের জন্যে আলাদা ইমামের পেছনে নামাজ পড়ার ব্যবস্থা করেছেন। তবে উমর কিছুকালের জন্যে মহানবীর স্ত্রীদের হজ্জে যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছিলেন। পরবর্তিতে তাদের অনুরোধে হজ্জ করতে অনুমতি দিয়েছিলেন। তারপর থেকে নবীর স্ত্রীরা হজ্জে যাওয়ার সময় খলিফাদের অনুমতি নিতেন। কিন্তু ৬৫৬ সালে আমরা দেখতে পাই, আয়েশা অনুমতি দূরে থাক খলিফা উসমানের অনুরোধ উপেক্ষা করে হজ্জে যাচ্ছেন।

প্রথম ফিতনার সময় আলীর বিরুদ্ধে আয়েশার রাজনৈতিক অবসথানকে সুন্নি ও শিয়া ঐতিহাসিকরা খুবি ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গী থেকে বিবেচনা করেছেন। শিয়াদের মতে আল্লাহর খলিফার বিরুদ্ধে অবসথান নিয়ে আয়েশা অপরাধ করেছেন। সুন্নিদের মতে আয়েশা তার ইজতিহাদের জায়গা থেকে সঠিক ছিলেন, আলীও তার জায়গা থেকে সঠিক ছিলেন। কিন্তু এই সময়টিতে ইসলামী দুনিয়ার ক্রমবর্ধমান পুরুষতান্ত্রিকতার বিরুদ্ধেও যে আয়েশার ক্রমাগত লড়াই করতে হয়েছে তা বিবেচনা করতে এই দুই পক্ষই ব্যর্থ হয়েছে। উসমান যেমন আয়েশাকে ঘরে থাকতে বলেছেন, আলীও বলেছেন। নবীর স্ত্রীদের ঘরে থাকতে বলা, নবীর মৃত্যুর পর তাদের বিবাহে নিষেধাজ্ঞা এইসবের ভিত্তি হিসাবে কোরানের বানীকে ব্যবহার করা হয়েছে। কোরানের এসব আয়াত আল্লাহর নিজস্ব ইচ্ছা, নাকি মুহাম্মদের ইচ্ছা পুরণে আল্লাহর স্বিদ্ধান্ত, নাকি তৎকালিন পুরুষতান্ত্রিক সমাজের ইচ্ছা পুরণের আয়াত সেই বিতর্কে এই লেখায় যাবো না। এই বিষয়ে ভবিষ্যতে লিখার ইচ্ছা রাখি। তবে খলিফায়ে রাশেদিনের আমলে নবীর স্ত্রীদের উপর এইধরণের নিয়ন্ত্রনের বিশেষ রাজনৈতিক গুরুত্ব ছিল। তৎকালিন আরবে বিধবা বিবাহ খুবি স্বাভাবিক ঘটনা ছিল। সমাজের উঁচু শ্রেণীর, পরিবারের ও সম্মানিত নারীদের বিয়ে করা ছিল সামাজিক ও রাজনৈতিক দিক থেকে পুরুষদের জন্যে বিশেষ মর্যাদার। রাজনৈতিক বিবাহের গুরুত্ব কতোটা সুদূরপ্রসারি হতে পারে সেই বিষয়ে আগের পর্বেই উল্লেখ করেছি। খলিফায়ে রাশেদিনের যুগে আমরা দেখতে পাই খলিফাদের বিধবা স্ত্রীদের বিয়ে করার জন্যে মুসলিম সমাজের অন্য প্রভাবশালিরা বিশেষভাবে আগ্রহী ছিলেন। যেমন আবু বকরের মৃত্যুর পর তার স্ত্রী আসমাকে বিয়ে করেছিলেন আলী যিনি পরবর্তিতে খলিফা হয়েছেন এবং আবু বকর ও আসমার পুত্র মুহাম্মদ ছিলেন আলীর অন্যতম অনুসারি ও সেনানায়ক। এই বিয়ের সূদুরপ্রসারী ফলাফল সম্বন্ধে আগের পর্বে লিখেছি। আরেকটি উদাহরণ হতে পারেন খলিফা উমরের স্ত্রী আতিকা বিনতে জায়েদ। আতিকা তার সৌন্দর্য এবং ধর্মনিষ্ঠা এই দুইয়ের জন্যেই খ্যাতিমান ছিলেন, ইসলাম ধর্মগ্রহণ করে মদিনায় হিজরতকারী প্রথম প্রজন্মের মুসলমানদের একজন ছিলেন তিনি। খলিফা উমরের মৃত্যুর পর তাকে বিয়ে করেন জুবায়ের, যিনি পর পর দুইবার খলিফা হিসাবে মনোনয়ন পেয়েছেন। উটের যুদ্ধে জুবায়েরের মৃত্যুর পর আতিকাকে বিয়ে করেন আলী পুত্র হুসাইন, তিনিও খেলাফতের দাবিদার ছিলেন। আতিকার বিষয়ে কিছু বিষয় উল্লেখ করলে সামাজিক কর্মকান্ড ও ধর্মের ক্ষেত্রে নারীরা কি ধরণের পুরুষতান্ত্রিকতার শিকার হতেন, তার কিছু চিত্র পরিস্কার হবে। আতিকা নিয়মিত মসজিদে যেতেন, উমর তা পছন্দ করতেন না বিধায় তাদের মধ্যে ঝামেলা ছিল। উমরের মৃত্যুর পর জুবায়ের যখন আতিকাকে বিয়ে করতে চাইলেন, তখন আতিকা দুইটা শর্তের ভিত্তিতে বিয়েতে রাজি হন। প্রথম শর্ত হলো তাকে মসজিদে যেতে দিতে হবে, দ্বিতীয় শর্ত হলো, পেটানো যাবে না। জুবায়ের এই দুই শর্ত মেনেই আতিকাকে বিয়ে করেছিলেন। তবে উমর রাগ দেখিয়ে যা করতে পারে নাই, জুবায়ের বুদ্ধি খাটিয়ে তা করতে সক্ষম হয়েছিলে, অর্থাৎ আতিকার মসজিদে যাওয়া বন্ধ করেছিলেন। আসমা কিংবা আতিকা ছিলেন খলিফাদের স্ত্রী। অন্যদিকে মুহাম্মদের স্ত্রীরা ছিলেন খোদ আল্লাহর নবীর স্ত্রী, খলিফারা সেই নবীর উত্তরাধীকার মাত্র। মুহাম্মদের স্ত্রীরা ছিলেন সমাজের সবচেয়ে এলিট শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত। যদি নবীর মৃত্যুর পর তারা বিয়ে করার ক্ষেত্রে স্বাধীন থাকতেন, তাহলে তাদেরকে বিয়ে করা নিয়ে রাজনীতি কম হতো না এবং বিয়ে করার মাধ্যমে অনেকেই রাজনীতিতে নিজেদের প্রভাব বিস্তার করতেন । তাদের বিয়ে করার ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা এই ধরণের রাজনীতির সম্ভাবনা পুরোপুরি বন্ধ করে দিয়েছিল। নবীর মৃত্যুর পর আয়েশাকে গণ্য করা হতো নবীর সবচেয়ে হাই র‍্যাংকিং স্ত্রী। আয়েশা যাকেই বিয়ে করতেন, সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবে তার মর্যাদা যে বহু গুন বৃদ্ধি পেতো তা অস্বিকার করার উপায় নাই। নবীর স্ত্রীদের বিশ্বাসীদের মাতা ঘোষনা করে তাদের বিয়ের ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা জারির যে আয়াত তার নাজিল হওয়ার পেছনের যে ইতিহাস সুন্নি এবং শিয়া দুই ধরণের সূত্র থেকেই পাওয়া যায় তাতে মূলত আয়েশার প্রসঙ্গই আসে। কিছু কিছু হাদিসে আয়েশার পাশাপাশি উম্ম সালামার নামও আসে, যাকে শিয়ারা সবচেয়ে হাই র‍্যাংকিং বলে দাবি করে। সবচেয়ে প্রচলিত ব্যাখ্যা হচ্ছে যে, তালহা আয়েশাকে পছন্দ করতেন। তালহা নাকি একবার জনসম্মক্ষেই ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন, নবীর মৃত্যু হলে তিনি আয়েশাকে বিয়ে করবেন। তারপরই নাকি নবীর বিধবাদের বিবাহ নিষেধ করে কোরানের এই আয়াত নাজিল হয়।

খলিফায়ে রাশেদিনের আমলে সামাজিক ও ধর্মীয় দিকথেকে উচ্চমর্যাদা সম্পন্ন হলেও নবীর স্ত্রীদের জীবন ছিল তাই নানাবিধ নিষেধাজ্ঞায় নিয়ন্ত্রিত। আগেই বলেছি, তাদেরকে গণ্য করা হতো মুসলিম নারীদের মডেলস্বরূপ, সুতরাং তাদের জীবনযাত্রা নিয়ন্ত্রন করা মানে সকল মুসলিম নারীদের জীবনযাত্রা নিয়ন্ত্রনের উপায় তৈরি করা। মুহাম্মদের জীবন, বিশ্বাস সর্বোপরি সুন্নাহ সম্বন্ধে প্রখর জ্ঞানসম্পন্ন হওয়া সত্ত্বেও তাকে সামাজিক ও ধর্মীয় দায়িত্ব পালনে বারবার বৈষম্যের শিকার হতে হয়েছে এবং পুরুষতান্ত্রিকতার মোকাবেলা করতে হয়েছে। উমর আয়েশাকে বাড়তি মর্যাদা ও সুযোগ সুবিধা দিতেন, তার শলা পরামর্শ গ্রহণ করতেন এবং আয়েশার ভাষায় উমর ছিলেন একজন ভালো মানের ম্যানেজার। রাগী বলে উমরকে সবাই ভয় করতো, অন্যদিকে তার নানাবিধ গুনাবলি ও রাষ্ট্র পরিচালনায় দক্ষতার কারনে তাকে শ্রদ্ধাও করতো। সব মিলিয়ে আয়েশা উমরের বিরুদ্ধে কখনো সমালোচকের ভুমিকা নেন নাই। কিন্তু উসমানের সময় বিভিন্ন ইস্যুতে আয়েশা তার সাথে বিতর্কে জরিয়ে পরেন এবং তার সমালোচকের ভুমিকায় আবির্ভুত হন (প্রথম পর্বে বিস্তারিত)। এইরকমই একটি বিতর্কে উসমান আয়েশার বিরুদ্ধে অনধিকার চর্চার অভিযোগ এনে তাকে আল্লাহর নির্দেশ অনুযায়ি ঘরে থাকতে বলেন, অর্থাৎ সামাজিক ও রাজনৈতিক কর্মকান্ড থেকে দূরে থাকতে বলেন। পরবর্তিতে আলীর সাথে বিরোধে জড়িয়ে পরলে আলীও তার সাথে একি ধরণের আচরণ করেছিলেন বলে জানা যায়।

আয়েশা মক্কা যাওয়ারা পথে খবর পান যে উসমান নিহত হয়েছেন এবং আলীকে তার জায়গায় খলিফা নির্বাচিত করা হয়েছে। খবরটি আয়েশা কিভাবে নিয়েছিলেন সেই বিষয়ে শিয়া ও সুন্নিদের মাঝে বিতর্ক আছে। শিয়াদের মতে, আয়েশা নিজেই উসমান হত্যায় একসময় প্ররোচনা দিয়েছেন, কিন্তু আলী খলিফা হয়েছেন এই খবরে তিনি ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন। শিয়াদের মতে, আয়েশা আলীকে খুবি অপছন্দ করতেন। তাদের মতে, আলীর বিরুদ্ধে আয়েশার বিদ্বেষের শুরু সেই সময় থেকে যেই সময় আয়েশার বিরুদ্ধে কিছু মুসলমান ব্যাভিচারের অভিযোগ এনেছিল। শিয়াদের মতে, আলী এইসময় মুহাম্মদকে পরামর্শ দিয়েছিলেন আয়েশাকে তালাক দেয়ার জন্যে। অন্যদিকে সুন্নিদের বক্তব্য হচ্ছে, আলী মোটেই তালাকের পরামর্শ দেন নাই, বরং মহানবীকে এইটুকু বলেছিলেন যে তিনি চাইলেই আয়েশাকে তালাক দিতে পারেন এবং তারজন্যে ভালো স্ত্রীর অভাব হবে না, তবে তার আগে সত্য উদঘাটনে কিছু খোঁজ খবর নেয়ার পরামর্শ দেন। শিয়ারা আয়েশার বিষয়ে খুবি নেতিবাচক ধারণা পোষন করে আগেই বলেছি। যদিও আয়েশার বিরুদ্ধে আনা ব্যাভিচারের অভিযোগের দায় মুক্তি দিতে কোরআন শরিফের আয়াত পর্যন্ত নাজিল হয়েছে, তারপরও পরবর্তি যুগের শিয়াদের কেউ কেউ এমন দাবিও তুলেছে যে এই আয়াত আয়েশার নয় মারিয়া কিবতিয়ার দায় মুক্তিতে নাজিল হয়েছিল। এমনকি বারোপন্থী শিয়াদের মধ্যে কেউ কেউ এই প্রচারও করেছেন যে উটের যুদ্ধের আগে আয়েশা তালহাকে বিয়ে করেছিলেন। তালহাকে খলিফা করার জন্যেই তিনি তার সাথে জোট বেধে আলীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছেন। উল্লেখ করা দরকার যে আয়েশার প্রেম অথবা বৈবাহিক জীবন নিয়ে এইসব অভিযোগের ঐতিহাসিক মূল্য খুবি কম, প্রামানিক ভিত্তি নাই বলতে গেলেই চলে। শিয়াদের আয়েশা সমালোচনাতে পুরুষতান্ত্রিকতার প্রভাব অত্যন্ত প্রবল এবং তাতে আয়েশার চরিত্রহানী করার চেষ্টা চোখে পরার মতো। তবে আয়েশা আলীর বদলে তালহার খেলাফতের সমর্থক ছিলেন তা নিশ্চিত ভাবেই বলা যায়। তালহা ছিলেন আয়েশার রক্তের সম্পর্কের আত্মিয় এবং ছোট বোনের জামাই। পাশাপাশি তালহা একজন ভালো নেতা হবেন বলে আয়েশা আশা প্রকাশ করেছিলেন বলে জানা যায়। তবে তাদের জোট মোটেই আয়েশা-তালহা জোট ছিল না। তাদের সাথে জুবায়েরও জোটবদ্ধ হন। জুবায়ের ছিলেন মহানবীর মামাতো ভাই, সেই হিসাবে আলীর আত্মিয়।

খলিফা উমর আততায়ীর হাতে আহত হয়ে দুইদিন পর মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুর সময় তিনি ছয়জনের একটি কমিটি গঠন করে যান পরবর্তি খলিফা নির্বাচনের জন্যে। এই কমিটির দায়িত্ব ছিল তাদের মধ্যে থেকে একজনকে খলিফা নির্বাচন করার। এই ছয়জনের মধ্যে আলী, তালহা এবং জুবায়ের ছিলেন। ছয় জনের ভোটের ভিত্তিতে উসমান খলিফা নির্বাচিত হন। উসমান হত্যাকান্ডের পর আলীর খলিফা হওয়ার প্রক্রিয়া অবশ্য মোটেই শান্তিপূর্ণ ছিল না। উসমান বিরোধী বিদ্রোহীরা মদিনা একরকম দখল করে রেখছিল এবং দ্রুত খলিফা নির্বাচন করার চেষ্টা করছিল। বিদ্রোহীদের আলাদা আলাদা দল আলী, তালহা এবং জুবায়েরকে খলিফা হওয়ার প্রস্তাব দেয়। কিন্তু এইভাবে খলিফা নির্বাচিত হতে তিনজনের কেউই রাজি ছিলে না। এই অবস্থায় বিদ্রোহীরা মদিনাবাসীকে দ্রুত খলিফা নির্বাচনের আল্টিমেটাম দেয়। এক পর্যায়ে বিদ্রোহীদের অধিকাংশের সমর্থন এবং মদিনাবাসীদের অনুরোধ ও সমর্থনে আলী খলিফা হন। এইসময় তালহা এবং জুবায়েরও আলীকে বায়াত দেন। তাবারি লিখিত ইতিহাস অনুযায়ি তাদেরকে জোর করে তলোয়ারের মুখে বায়াত দিতে বাধ্য করা হয়। তবে অধিকাংশ ঐতিহাসিক এই বক্তব্যের সাথে একমত না। কারন বায়াত গ্রহণের ঘটনা ঘটেছিল মসজিদে জনগণের সামনে। শিয়া এবং সুন্নি দুইপক্ষের বক্তব্যের সাথেই জোর করে বায়াত নেয়ার ইতিহাস সংগতিপূর্ণ না। বায়াত দেয়ার পর তালহা এবং জুবায়ের মদিনা ত্যাগ করে মক্কায় হজ্জ করতে যাওয়ার অনুমতি চান আলীর কাছে। আলী তাদের অনুমতি দিয়ে দেন। রাজনীতিক হিসাবে যে আলী দক্ষ ছিলে না এতে তা প্রমানিত হয়। আবু বকর বা উমর কখনো এই ভুল করতেন না। উমর তার সময়ে কোন বিখ্যাত সাহাবাকে মদিনা ত্যাগ করতে দিতে চাইতেন না। তার ভয় ছিল, মদিনার বাইরে এই সাহাবীদের কেন্দ্র করে বিভিন্ন আলাদা আলাদা গ্রুপ তৈরি হতে পারে যা কেন্দ্রীয় শাসনকে দুর্বল করবে। অন্যদিকে আলী তার খেলাফতের প্রধান দুই দাবিদারকে খেলাফত গ্রহণের পর পরই মদিনা ছাড়তে দিয়েছেন।

তালহা ও জুবায়ের যেসময় মক্কায় উপস্থিত হলেন ততোদিনে আয়েশা উসমান হত্যার বিচার দাবিতে বক্তৃতা দিয়ে বড় ধরণের জনমত গঠন করতে সক্ষময় হয়েছেন। তালহা, জুবায়ের এবং আয়েশা একজোট হয়ে উসমান হত্যার বিচার দাবিতে আন্দোলন শুরু করলেন। তাদের সাথে যোগ দিলেন মক্কায় উসমানের আত্মিয় উমাইয়ারা। উসমানের জ্ঞাতি ভাই উমাইয়া নেতা মুয়াবিয়া ছিলেন সিরিয়ার প্রশাসক, তিনিও ওসমান হত্যার বিচার দাবি তুললেন, পাশাপাশি আলীর খেলাফত অবৈধ ঘোষনা করে আলীর প্রতিদ্বন্দী হিসাবে আবির্ভুত হলেন। আরেক উমাইয়া, ওসমানের চাচাতো ভাই মারওয়ান মদিনার জনগণের একাংশকে আলীর বিরুদ্ধে খেপিয়ে তুললেন। আলী মুয়াবিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার স্বিদ্ধান্ত নিলেন। আয়েশা, তালহা ও জুবায়ের তাদের বাহিনী নিয়ে ইরাকের বসরায় রওয়ানা দিলেন, মাঝপথে তাদের সাথে মিলিত হইলেন মদিনা থেকে নিজের বাহিনী নিয়ে মারওয়ান। সবমিলিয়ে প্রায় তিন হাজার জনের এই বাহিনীর খবর শুনে আলী খুবি দ্রুত গতিতে সাতশ জনের একটি বাহিনী গঠন করে নিজেও বসরার উদ্দেশ্যে যাত্রা করলেন। (চলবে)

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

৯ thoughts on “গেম অফ ইসলামিক থ্রোন (পর্ব-৩)

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

+ 17 = 26