গেম অফ ইসলামিক থ্রোন (পর্ব-৪)

আয়েশা-তালহা-জুবায়ের জোটের বক্তব্য ছিল, খলিফা হিসাবে আলীর প্রথম কাজ হওয়া উচিত উসমান হত্যার বিচার করা। তারা সরাসরি আলীর খেলাফতে অনাস্থা আরোপ করেছিলেন কি না তা নিয়া বিতর্ক আছে। তবে তাদের বাহিনীর একটা বড় অংশ ছিল উমাইয়া গোত্রভুক্ত, যারা মুয়াবিয়ার নেতৃত্বে আলীর খেলফাতের বিরোধী ছিলেন। আলী কেনো উসমান হত্যার বিচার করেন নাই, বা করতে পারেন নাই তাও একটি বিতর্কের বিষয়। আলীর সমর্থকদের মধ্যে উসমান বিরোধী বিদ্রোহীরা ছিলেন, হত্যাকারীরাও ছিলেন। অধিকাংশ ঐতিহাসিকদের মতে মদিনার সামরিক নিয়ন্ত্রন তখন পর্যন্ত উসমান হত্যাকারী ও তাদের পক্ষের লোকদের হাতেই ছিল এবং নিজের সমর্থক গোষ্ঠিকে বিভক্ত ও দুর্বল করার পাশাপাশি নিজের রাজনৈতিক ক্ষমতা দুর্বল করা ছাড়া আলীর পক্ষে উসমান হত্যার বিচার করার উপায় ছিল না। তিনি হয়তো নিজের অবস্থান পোক্ত করে বিচারের কাজে হাত দিতেন। কিন্তু একদিকে আয়েশা-তালহা-জুবায়েরের বিরোধীতা আরেকদিকে মুয়াবিয়ার বিদ্রোহে পরিস্থিতি আরো জটিল আকাড় ধারণ করে। উসমান হত্যার বিচার দাবিকারীরা যদি মদিনায় গিয়ে আলীর সমর্থন শক্ত করার পাশাপাশি বিচার দাবি করতেন তাহলে পরিস্থিতি হয়তো ভিন্ন হতো। কিন্তু তারা মদিনায় না গিয়ে গেলেন ইরাকে, আলীর বিরুদ্ধে জনসমর্থন ও সৈন্য সংগ্রহের পরিকল্পনা নিয়ে। এই পরিস্থিতিতে নিজের সব সমর্থকদের একজোট করে বিরোধীদের মোকাবেলা করা ছাড়া আলীর আর কোন উপায় ছিল না। তবে যাই হোক না কেনো, উসমান হত্যার বিচার করতে আলী চুরান্ত ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছেন তা নিঃসন্দেহে বলা যায়। ভুল রাজনৈতিক স্বিদ্ধান্তের কারনে তিনি বন্ধুর বদলে শত্রু বাড়িয়ে তুলেছেন। তিনি যদি তালহা এবং জুবায়েরকে মদিনা ছাড়তে না দিয়ে বরং নিজের উপদেষ্টা হিসাবে কাজে লাগাতেন তাহলে হয়তো পরিস্থিতি ভিন্ন হতো। মদিনা থেকে বের হয়ে তারা যে আলীর বিরুদ্ধে আয়েশার সাথে জোট পাকাবেন আলী তা আন্দাজই করতে পারেন নাই।

আয়েশার নেতৃত্বে তালহা, জুবায়ের এবং মারওয়ান প্রায় তিন হাজার সেনা সমেত ইরাকের বসরা দখল করে নিলেন। বসরা দখল শান্তিপূর্ণ হয় নাই। বসরার আলী সমর্থক ও উসমান বিরোধী বিদ্রোহীদের একাংশ বাধা দেয়ার চেষ্টা করলেও সংখ্য্যয় কম হওয়ায় তাদেরকে প্রায় কচুকাটা করা হয়। আলী নিযুক্ত প্রশাসককে গ্রেফতার করা হয়। এরপর উসমান হত্যার সাথে জড়িত থাকার অভিযোগে আরো কিছু উসমানবিরোধী বিদ্রোহীকে হত্যা করা হয়। সব মিলিয়ে প্রায় ৬৪০ জনকে হত্যা করা হয়। ঠিক কার হাতে উসমান নিহত হয়েছিলেন তা আজ অবধি একটা রহস্য। হয়তো সেই সময়ে কেউ কেউ জানতেন, কিন্তু কোন হত্যাকারীর নাম ইতিহাসে পাওয়া যায় না। সুপরিচিত মুসলমানদের মধ্যে একমাত্র মুহাম্মদ ইবনে আবু বকরের নাম আসে, যার নেতৃত্বে উসমানের বাড়িতে হত্যাকারিরা ঢুকে পরেছিল। তিনি আয়েশার সৎ ভাই, তার মৃত্যুর পর আয়েশা তার পুত্র সন্তানকে দত্ত্বক নেন। শিয়া এবং সুন্নি দুই পক্ষের ঐতিহাসিকরাই মুহাম্মদ ইবনে আবু বকরকে উসমান হত্যার ক্ষেত্রে দায়মুক্তি দিয়েছেন। উসমান বিরোধী বিদ্রোহীদের সবাইকেই যদি তার হত্যাকারী গন্য করা হয়, তাহলে মুহাম্মদ ইবনে আবু বকর, তালহা, জুবায়ের, আয়েশা এদের কাউকেই দায়মুক্ত করার উপায় নাই। উসমান হত্যাকান্ডের সাথে কিছুটা হলেও বাংলাদেশের বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডের মিল আছে। তার হত্যায় প্ররোচনা দিয়েছেন অথবা নানাভাবে বিরোধীতায় যুক্ত হয়ে কিংবা বিদ্রোহীদের সমর্থন দিয়ে অথবা বিদ্রোহীদের বিরোধীতা না করে অনেকেই তার হত্যাকান্ডের জন্যে কম বেশি দায়ি ছিলেন। কিন্তু উসমান হত্যার পরে দেখা গেলো কেউ তার হত্যার দায় নিচ্ছে না, বরং সবাই একে অপরের উপর দোষ চাপাচ্ছে। মোট কথা, বসরার বিদ্রোহী সবাইকেই উসমান হত্যার অভিযোগে হত্যা করে আয়েশা মোটেই সুবিচার করেছেন তা বলার উপায় নাই। এই হত্যাকান্ড রাজনৈতিক দূরদর্শিতার পরিচয়ও ছিল না। যারা নিহত হয়েছেন তাদের বেশিরভাগই বসরা ও তার আশেপাশের বিভিন্ন পরিবার ও গোত্রভুক্ত ছিলেন। এইসব গোত্রের মধ্যে যারা সরাসরি কোন পক্ষ গ্রহণ না করে নিরপেক্ষ ভুমিকা পালন করছিল, এবার তারা খোলাখুলিভাবেই আলীর পক্ষ নিয়ে আয়েশার বিপক্ষে অবস্থান নেয়।

আলী মদিনা থেকে মাত্র সাতশ সৈন্য নিয়ে বসরার উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেন। যাত্রাপথে তিনি তার ছেলে হাসানকে কুফায় পাঠিয়ে আরো সৈন্য সংগ্রহ করেন। বসরার জনগণ ছিল বিভক্ত, তারা কেউ আয়েশা এবং কেউ আলীর পক্ষে ছিলেন। দুই পক্ষই চুরান্ত যুদ্ধের জন্যে বিভিন্ন গোত্র থেকে সৈন্য সংগ্রহ করতে থাকে। দুই পক্ষে মিলিয়ে প্রায় পঞ্চাশ হাজার মুসলমান এই যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন বলে ধারণা করা হয়। বসরা শহরের কাছে দুই পক্ষ একে অপরের মুখোমুখি হয়। আলী শুরুতে শান্তিপূর্ণভাবে সমাধানের জন্যে আয়েশাকে আমন্ত্রন জানান। আয়েশা সম্মত হন এবং দুইপক্ষ আলোচনায় বসে। আলোচনার বিষয়বস্তু নিয়ে মতভেদ আছে। উসমান হত্যার জন্যে একে অপরকে অভিযোগের ঘটনা ঘটে এবং আলীকে ক্ষমতা ছেড়ে দিয়ে খলিফা নির্বাচনের জন্যে নতুন কমিটি করার আহবান জানানো হয় বলে বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা যায়। তবে দুই পক্ষই প্রাথমিকভাবে যুদ্ধ না করতে সম্মত হয়। কিন্তু শান্তি প্রতিষ্ঠার এই সম্ভাবনায় আলী এবং আয়েশার পক্ষের কট্টরপন্থীরা সুখি ছিলেন না। আলীর পক্ষের যারা উসমান বিরোধী বিদ্রোহী ছিলে এবং তার হত্যার সাথে জড়িত ছিলেন, তারা শান্তির পক্ষে ছিলেন না। শান্তি প্রতিষ্ঠা হলে তারা বিচারের সম্মুখিন হতে পারেন এই ভয় ছিল। অন্যদিকে আয়েশার বাহিনীর একটা বড় অংশ ছিল উমাইয়ারা, যারা উসমান হত্যাকান্ডের বিচার দাবিকে পুরোপুরি নিজেদের পারিবারিক স্বার্থের রাজনীতি হিসাবে ব্যবহার করছিল। অধিকাংশ ঐতিহাসিকদের মতে, আলীর পক্ষের একটি অংশ কোন নির্দেশ ছাড়াই রাতের আধারে আয়েশার বাহিনীর উপর হামলা চালায়। জবাবে মারওয়ানের নেতৃত্বে উমাইয়ারাও যুদ্ধ শুরু করে। এরপর আর এই যুদ্ধ থামানো সম্ভব হয় নাই। শান্তি প্রতিষ্ঠার আলোচনায় জুবায়ের ঈতিবাচক ভুমিকা পালন করেছিলেন। তিনি যুদ্ধ করতে রাজি ছিলেন না। যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগেই অথবা শুরু হওয়ার পরপরই তিনি যুদ্ধক্ষেত্র ত্যাগ করে মক্কার পথে রওয়ানা হন। কিন্তু আলীর বাহিনী থেকে তিনজন তাকে অনুসরণ করে হত্যা করে। অধিকাংশ ঐতিহাসিকের মতে তালহাও যুদ্ধক্ষেত্র ত্যাগ করার চেষ্টা করেন এবং মারওয়ান তাকে পেছন থেকে তীর ছুড়ে আহত করে। এই আঘাতেই তিনি পরে মৃত্যুবরণ করেন। তালহা এবং জুবায়েরকে হারালেও আয়েশার নেতৃত্বে তার বাহিনী যুদ্ধ চালিয়ে যেতে থাকে। আয়েশা বিরাট সাইজের একটি উটের পিঠে চড়ে যুদ্ধ পরিচালনা করতে থাকেন। এর জন্যেই এই যুদ্ধ ইসলামের ইতিহাসে ‘জঙ্গে জামাল’ বা ‘উটের যুদ্ধ’ নামে পরিচিত হয়ে আছে। কিন্তু যিনি উটের পিঠে ছিলেন তার নামে পরিচিত না হয়ে এই যুদ্ধ উটের নামে কেন পরিচিত হলো সেই প্রশ্ন তোলা যায়। ফাতেমা মেরিনিসির মতে, পুরুষতান্ত্রিক মুসলিম ঐতিহসিকরা খুব সচেতনভাবে এই কাজটি করেছে। মুসলিম নারীরা আয়েশার নামে একটি যুদ্ধের নাম খুঁজে পেলে মুশকিল, যুদ্ধ যেহেতু নিতান্তই পুরুষদের কাজ। আয়েশা একটি যুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়েছেন, এই ইতিহাস সুন্নিরা ঢেকে রাখতে পছন্দ করে, আর শিয়ারা ব্যবহার করে আয়েশার বদনাম করার ক্ষেত্রে।

ঐতিহাসিকদের ভুমিকা যাই হোক না কেনো, প্রধান দুইজন নেতা হাড়িয়েও আয়েশার নেতৃত্বে তার বাহিনী আলীর বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রবল প্রতিরোধ গড়ে তুলতে সক্ষম হয়। আলী বুঝতে পারেন যে যতক্ষন পর্যন্ত আয়েশার উট দাঁড়িয়ে থাকবে ততক্ষন পর্যন্ত তার বাহিনী প্রবল প্রতিরোধ গড়েই যাবে এবং রক্তক্ষয় বাড়বে। দ্রুত যুদ্ধ জয়ের উদ্দেশ্যে আলী তার সমস্ত মনযোগ কেন্দ্রিভুত করেন আয়েশার উটের দিকে। আয়েশার সৈন্যরাও সর্বশক্তি দিয়ে আয়েশাকে রক্ষা করার চেষ্টা করতে থাকে। ফলে রক্তক্ষয় বিশেষ এড়ানো সম্ভব হয় নাই। তবে শেষ পর্যন্ত আলীর সৈন্যরা আয়েশার উটের পায়ের রগ কেটে দিতে সক্ষম হয়। আয়েশা ও তার উট ভূপাতিত হওয়ার পর তার বাহিনীর মধ্যে বিভ্রান্তি ছড়িয়ে পরে এবং তারা রণেভঙ্গ দেয়। আয়েশা আটক হন। এই যুদ্ধে দুই পক্ষ মিলিয়ে দশ থেকে পনের হাজার মানুষ নিহত হয়েছিলেন বলে জানা যায়। আলী আয়েশার সৎ ভাই মুহাম্মদ বিন আবু বকরকে পাঠান আয়েশাকে মদিনায় ফেরত পাঠানোর জন্যে। আলীর পক্ষ থেকে মুহাম্মদ বিন আবু বকর আয়েশাকে স্মরণ করিয়ে দেন যে, মুহাম্মদের স্ত্রী হিসাবে আয়েশার উচিত তার নিজের ঘরে থাকা। এসময় আয়েশার বয়স ছিল তেতাল্লিশ। মদিনায় ফেরত যাওয়ার পর আয়েশা সবধরণের রাজনীতি থেকে নিজেকে সরিয়ে নেন। এরপর তিনি আরো বিশ বছরের বেশি সময় বেঁচে ছিলেন। ৬৪ অথবা ৬৭ বছর বয়সে মুয়াবিয়ার খেলাফতের আমলে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।

উটের যুদ্ধের সময় বসরায় আবু বাকরা নামে মুহাম্মদের একজন সাহাবি বসবাস করতেন। যুদ্ধের সময় তিনি নিরপেক্ষ ছিলেন। আলীর বিজয়ের পর তিনি খুবি দ্রুত আলীর পক্ষে চলে আসেন এবং প্রচার করতে থাকেন যে তিনি মহানবীকে বলতে শুনেছেন যে, কোন জাতি যদি তাদের নেতৃত্ব একজন নারীর হাতে তুলে দেয় তাহলে সেই জাতির কোনদিন উন্নতি হবে না। মুহাম্মদের মৃত্যুর পর পচিশ বছর পাড় হয়ে গেলেও এই হাদিসটি এর আগে শোনা যায় নাই। উটের যুদ্ধে আয়েশার পরাজয়ের পর শোনা গেলো। হাদিসটি হাজার বছর ধরে বিখ্যাত হয়ে আছে। বুখারি, মুসলিমের মতো সহিহ স্বিকৃত হাদিস গ্রন্থে স্থান পেয়েছে। আবু বাকরার এই হাদিসের জোরেই জামায়াতে ইসলামী পাকিস্তান আমলে ‘নারী নেতৃত্ব হারাম’ এই প্রচারণা চালিয়ে ফাতিমা জিন্নাহ নেতৃত্বাধীন আইয়ুব খান বিরোধী জোটের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়। স্বাধীন বাংলাদেশেও নারী নেতৃত্ব হারামের এই প্রচারণা তারা দীর্ঘদিন চালিয়ে গেছে শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে। তবে যখন বাঙলার মসনদে যাওয়ার সুযোগ পেয়েছে তখন আবু বাকরার হাদিসের চেয়ে খালেদা জিয়ার নেতৃত্ব তাদের কাছে অধিক পছন্দনিয় হয়েছে। (চলবে)

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

৪ thoughts on “গেম অফ ইসলামিক থ্রোন (পর্ব-৪)

  1. আবু বাকরার এই হাদিসের জোরেই

    আবু বাকরার এই হাদিসের জোরেই জামায়াতে ইসলামী পাকিস্তান আমলে ‘নারী নেতৃত্ব হারাম’ এই প্রচারণা চালিয়ে ফাতিমা জিন্নাহ নেতৃত্বাধীন আইয়ুব খান বিরোধী জোটের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়। স্বাধীন বাংলাদেশেও নারী নেতৃত্ব হারামের এই প্রচারণা তারা দীর্ঘদিন চালিয়ে গেছে শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে। তবে যখন বাঙলার মসনদে যাওয়ার সুযোগ পেয়েছে তখন আবু বাকরার হাদিসের চেয়ে খালেদা জিয়ার নেতৃত্ব তাদের কাছে অধিক পছন্দনিয় হয়েছে।

    দারুন

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

− 3 = 1